বেদান্ত নিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ

 বেদান্ত নিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৭ সালের ১২ নভেম্বর লাহোরে একটি ভাষণ দেন। এই বক্তৃতায় তিনি বলেন—


"বাল্যবিবাহ প্রথা যে সকল ভাব হইতে উদ্ভূত হইয়াছে, সেই সকল ভাব অবলম্বন করিয়াই প্রকৃত সভ্যতার সঞ্চার হইতে পারে, অন্য কিছুতেই নহে। যদি পুরুষ বা নারীকে অপর যে কোনো নারী বা পুরুষকে পত্নী বা পতিরূপে গ্রহণ করিবার স্বাধীনতা দেওয়া হয়; যদি ব্যক্তিগত সুখ ও পাশব প্রবৃত্তির পরিতৃপ্তি সমাজে অবাধে চলিতে থাকে, তাহার ফল নিশ্চয়ই অশুভ হইবে – দুষ্ট প্রকৃতি অসুর স্বভাব সম্ভানসমূহের উৎপত্তি হইবে। একদিকে প্রত্যেক দেশে মানুষ এই সকল পশুপ্রকৃতি সন্তান উৎপন্ন করিতেছে, অপরদিকে তাহাদিগকে বশে রাখিবার জন্য পুলিশ বাড়াইতেছে। এভাবে সামাজিক ব্যাধি প্রতিকারের চেষ্টায় বিশেষ ফল নাই। বরং কীভাবে সমাজ হইতে এই সকল দোষ, এই সকল পশুপ্রকৃতি সন্তানের উৎপত্তি নিবারিত হইতে পারে তাহাই সমস্যা। আর যতদিন তুমি সমাজে বাস করিতেছে, ততদিন তোমার বিবাহের ফল নিশ্চয়ই আমাকে এবং সকলকেই ভোগ করিতে হয়। সুতরাং তোমার কীরূপ বিবাহ করা উচিত এ বিষয়ে তোমাকে আদেশ করিবার অধিকার সমাজের আছে। ভারতীয় বাল্য বিবাহ প্রথার পশ্চাতে এই সকল উচ্চতর ভাব ও তত্ত্ব রহিয়াছে – কোষ্ঠীতে বরকন্যার যেরূপ ‘জাতি', 'গণ' প্রভৃতি লিখিত থাকে, এখনও তদনুসারেই হিন্দু সমাজে বিবাহ হয়। আর প্রসঙ্গক্রমে ইহাও বলিতে চাই যে, মনুর মতে কামোদ্ভুত সন্তান আর্য নহে। যে সন্তানের জন্মমৃত্যু বেদের বিধান অনুযায়ি সেই প্রকৃত আর্য। আজকাল সকল দেশেই এইরূপ আর্যসন্তান খুব কম জন্মিতেছে এবং তাহার ফলেই কলিযুগ নামক দোষরাশির উৎপত্তি হইয়াছে।....


যতদিন ব্যক্তিবিশেষ ঈশ্বরের ধারণা থাকিবে, ততদিন এই সকল পুরোহিত থাকিবে, আর সমাজে কোন প্রকার উচ্চনীতির অভ্যুদয়ের আশা করা যাইতে পারিবে না। যতদিন অলৌকিক পুরুষের নিকট মানুষকে নত হইয়া থাকিতে হইবে, ততদিনই পুরোহিতের অস্তিত্ব থাকিবে। - তাহাদের কথা ঈশ্বরকে জানাইবার জন্য পুরোহিত প্রয়োজন পড়িবে। আর পৌরহিত্য ও অত্যাচার চিরকালই একসঙ্গে থাকিবে।....


তবে হে দ্বৈতবাদিন, তোমার যুক্তি কোথায় রহিল, তোমার নীতির ভিত্তি কোথায় রহিল? যখন তোমরা অদ্বৈতবাদের উপর দোষারোপ করিয়া বলো যে, অদ্বৈতবাদ হইতে দুর্নীতির সৃষ্টি হইবে, তখন একবার ভারতের দ্বৈতবাদী সম্প্রদায়গুলির ইতিহাস আলোচনা করিয়া দেখ – দ্বৈতবাদীদের নীতিপরায়ণতার কীরূপ প্রমাণ পাও তাহাও আলোচনা করিয়া দেখ। যদি অদ্বৈতবাদী ২০০০ দুর্বৃত্ত হইয়া থাকে, তবে দ্বৈতবাদীরাও ২০০০ দেখিতে পাইবে। সাধারণভাবে দেখা যায় – দ্বৈতবাদী দুর্বৃত্তের সংখ্যাই অধিক, কারণ অদ্বৈতবাদ বুঝিতে উৎকৃষ্টতর চিত্তবৃত্তিসম্পন্ন মানুষের প্রয়োজন। তাই, তাহাদিগকে সহজে ভয় দেখাইয়া কোন কাজ করাইবার উপায় নাই। 


তবে তুমি দাঁড়াও কোথায়? বৌদ্ধদের হাত এড়াইবার উপায় নেই। তুমি শ্রুতিবচন উদ্ধৃত করিতে পারো; কিন্তু বৌদ্ধরা তো বেদ মানে না। সে বলিবে – আমার ত্রিপিটক একথা বলে না। ত্রিপিটক অনাদি অনন্ত – উহা বুদ্ধের লেখাও নহে। কারণ বুদ্ধ বলিয়াছেন, তিনি শুধু সনাতন সত্যেরই আবৃত্তি করিতেছেন। বৌদ্ধ আরও বলেন – তোমাদের বেদ মিথ্যা, আমাদের ত্রিপিটকই যথার্থ বেদ। তোমাদের বেদ ব্রাহ্মণ-পুরোহিতকূলের কল্পিত, সেগুলি দূর করিয়া দাও। এ যুক্তি এড়াইবে কী প্রকারে ?...


আমরা দেখিয়াছি – এই অদ্বৈতবাদের দ্বারাই কেবল আমরা যুক্তি-তর্ক ও বিজ্ঞানের আক্রমণের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াইতে পারি।... সর্বত্রই বিজ্ঞান ও ধর্মে কী বিরোধ? প্রচলিত ধর্মগুলি বহির্মুখী ব্যাখ্যায় এতদূর জড়িত যে, সূর্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা, চন্দ্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা এইরূপ অনন্ত দেবতার কল্পনা করে, আর ভাবে - যাহা কিছু ঘটিতেছে, সবই একটা না একটা দেবতা বা ভুতে করিতেছে। ইহার মোট কথা এই যে, ধর্ম কোন বস্তুর কারণ সেই বস্তুর বাহিরেই অন্বেষণ করে, আর বিজ্ঞান তাহার কারণ ঐ বস্তুর ভিতরে অন্বেষণ করে। বিজ্ঞান ধীরে ধীরে যত অগ্রসর হইতেছে, ততই উহা প্রাকৃতিক ঘটনার ব্যাখ্যা ভূত প্রেতের হাত হইতে নিজের হাতে লইতেছে। যেহেতু ধর্মরাজ্যে অদ্বৈতবাদ এই কাজ করিয়াছে, সেই হেতু অদ্বৈতবাদই সর্বাপেক্ষা বৈজ্ঞানিক ধর্ম।


 অদ্বৈতবাদ কার্যে পরিণত করিবার উপায় হলো নিজের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা। ..... জগতের ইতিহাসে দেখিবে, যে সকল জাতি নিজেদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছে, শুধু তাহারাই শক্তিশালী ও বীর্যবান হইয়াছে। প্রত্যেক জাতির ইতিহাসে ইহাও দেখিবে, যে সকল ব্যক্তি নিজেদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছে, তাহারাই শক্তিশালী ও বীর্যবান হইয়াছে। এই ভারতে একজন ইংরেজ আসিয়াছিলেন। তিনি সামান্য কেরানি ছিলেন। পয়সা কড়ির অভাবে ও অন্যান্য কারণে তিনি দুইবার নিজের মাথায় গুলি করিয়া আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। তখন তাহার বিশ্বাস হইল – তিনি কোন বড় কাজ করিবার জন্যই জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। সেই ব্যক্তিই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা লর্ড ক্লাইভ। . এখন অদ্বৈতবাদকে কার্যে পরিণত করিবার সময় আসিয়াছে। উহাকে এখন স্বর্গ হইতে মর্তে লইয়া আসিতে হইবে, ইহাই এখন বিধির বিধান।


বর্তমান ভারতে ধর্মের মূলতত্ত্ব অন্তর্হিত হইয়াছে। কেবল কতকগুলি বাহ্য অনুষ্ঠান পড়িয়া আছে। এখানকার লোক এখন হিন্দুও নহে, বৈদান্তিকও নহে – তাঁহারা চ্যুৎমার্গী। রান্নাঘর এখন তাহাদের মন্দির এবং হাঁড়ি তাহাদের দেবতা হইয়া দাঁড়াইয়াছে। এই ভাব দূর হওয়া চাই-ই চাই। আর যত শীঘ্র উহা চলিয়া _যায়, ততই মঙ্গল।


কলকাতার স্টার থিয়েটার প্রেক্ষাগৃহে এক বক্তৃতায় বেদান্ত নিয়ে  স্বামী বিবেকানন্দ বলেন —-রামানুজের মতে আহার শুদ্ধি আমাদের জীবনে একটি অতি প্রয়োজনীয় বিষয়। তাঁহার মতে খাদ্য তিনটি কারণে অশুদ্ধ হইয়া থাকে। প্রথমতঃ জাতিদোষ—খাদ্যের জাতি পেঁয়াজ, রসুন প্রভৃতি অশুদ্ধ। দ্বিতীয়তঃ আশ্রয়দোষ—যে ব্যক্তির হাত হইতে উহা পাওয়া যায়। তৃতীয়ত: নিমিত্তদোষ —খাদ্যে কেশ, কীট বা ময়লা পড়িলে খাদ্য অশুদ্ধ হয়।  আমাদিগকে এখন এই শেষ দোষটি নিবারণ করিবার চেষ্টা করিতে হইবে। ... এই জন্যেই যখন আমি বলি –--ধর্ম এখন রান্নাঘরে ঢুকিয়াছে, তখন লোকে আমার বিরুদ্ধে খেপিয়া উঠে। কিন্তু যদি মাদ্রাজে যাও, তবে তোমরাও আমার সহিত একমত হইবে। এ বিষয়ে তোমরা বাঙালিরা, তাহাদের চেয়ে অনেক ভাল। মাদ্রাজে যদি কোন ব্যক্তি খাদ্যের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, তবে উচ্চবর্ণের লোকেরা সেই খাদ্য ফেলিয়া দিবে। ....


এখানে বাংলায়তো চারিবর্ণ নাই। আমি এখানে কেবল ব্রাহ্মণ ও শূদ্রজাতি দেখিতেছি। যদি ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যজাতি থাকে, তবে তাঁহারা কোথায়? হিন্দুধর্মের নিয়মানুসারে ব্রাহ্মণগণ কেন তাহাদিগকে যজ্ঞোপবীত ধারণ করিয়া বেদপাঠ করিতে আদেশ করেন না? আর যদি এদেশে ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য না থাকে, যদি কেবল ব্রাহ্মণ ও শূদ্রই থাকে, তবে শাস্ত্রানুসারে যে দেশে কেবল শূদ্রের বাস, এমন দেশে ব্রাহ্মণের বাস করা উচিত নয়। অতএব তল্পিতল্পা বাধিয়া এদেশ ছাড়িয়া চলিয়া যাও। যাহারা ম্লেচ্ছখাদ্য আহার করে এবং স্লেচ্ছরাজ্যে বাস করে, ইহার প্রায়শ্চিত্ত কী, তোমরা কি তাহা জানো? ইহার প্রায়শ্চিত্ত তুষানল। তোমরা আচার্যের আসন গ্রহণ করিতে চাও, কিন্তু কার্যে কেন কপটাচারী হও? তোমরা যদি শাস্ত্রে বিশ্বাসী হও, তবে তোমরাও সেই ব্রাহ্মণবরিষ্ঠের মতো হও –---যিনি মহাবীর আলেকজান্ডারের সঙ্গে গিয়াছিলেন এবং ম্লেচ্ছখাদ্য ভোজনের জন্য নিজেকে তুষানলে দগ্ধ করেন। এইরূপ কর দেখি! দেখিবে, সমগ্রজাতি তোমাদের পদতলে আসিয়া পড়িবে। তোমরা নিজেরাই তোমাদের শাস্ত্রে বিশ্বাস কর না আবার অপরকে বিশ্বাস করাইতে চাও? যদি তোমরা মনে কর যে, এ যুগে ওরূপ কঠোর প্রায়শ্চিত্ত করিতে সমর্থ নও, তবে তোমাদের দুর্বলতা স্বীকার কর এবং অপরের দুর্বলতা ক্ষমা কর। অন্যান্য জাতির উন্নতির জন্য যতদূর পারো সহায়তা কর, তাহাদিগকে বেদ পড়িতে দাও এবং তাহারাও আর্যদের মত হউক। আর হে বঙ্গদেশীয় ব্রাহ্মণগণ, আমি অপনাদিগকে বিশেষভাবে সম্বোধন করিয়া বলিতেছি আপনারা প্রকৃত আর্য হউন।…




মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

তৃণমূল নেত্রী ফের সংসদে

যদা যদা হি ধর্মস্য... গীতার এই শ্লোকে ঠিক কী বলা হয়েছে?

ভাতে কেরোসিন যাত্রাপুরে, অভিযোগ বাংলাদেশী