বাংলাভাগ

       বিচার বিশ্লেষন করলে বোঝা যায় মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল বাংলার দলিত সমাজের মধ্যে আজ অবধি সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা, তাঁর ধারেকাছে আর কেউ নেই। আবার খোঁজ নিয়ে এও জানা যায় যে, তিনি দলিত সমাজের এক বড় অংশের দ্বারা আজও নিন্দিত। এই নিন্দার কারণ হলো— এইসব মানুষেরা যোগেন্দ্রনাথকে দেশভাগ এবং বাংলাভাগের জন্য মূল কারিগর বলে জানে। তাদের উদ্বাস্তু জীবনের কষ্টের জন্য তাঁকে খলনায়ক বলে জানে ; কিন্তু এই ধারণা কি ঠিক, না বেঠিক?

       সমসাময়িককালের আরেকজন দলিত নেতা হলেন মতুয়াগুরু প্রমথরঞ্জন ঠাকুর। তিনি বরাবর যোগেন্দ্রনাথের বিপরীত মেরুতে ছিলেন। ঠাকুরমশায় ছিলেন হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের সাথে ; কাছাকাছি ও পাশাপাশি! দেশভাগের সাথে সাথে ঠাকুরমশায় দেশত্যাগ করেন এবং দলিতদের, বিশেষ করে মতুয়া ও নমশূদ্রদের দেশত্যাগ করার জন্য উৎসাহিত করেন। যোগেন্দ্রনাথ নিজে মাতৃভূমি আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করেন এবং দলিতদের দেশত্যাগ না করার পরামর্শ দেন। তখনকার দিনে এই দুজন নেতারই পূর্ববঙ্গের দলিত সমাজের মানুষের উপর যথেষ্ট প্রভাব ছিল।

       ব্রিটিশের বিরুদ্ধে শত শত কৃষক বিদ্রোহে কৃষক হিসাবে দলিতদের অংশগ্রহণ ছিল ঠিকই ; কিন্তু তা সত্ত্বেও বলা যায়— পূর্ববঙ্গের দলিতরা, বিশেষ করে নমশূদ্ররা গুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে স্বতন্ত্র পরিচয় নিয়ে রাজনীতিতে সর্বপ্রথম অংশগ্রহণ করে ১৯০৫ সালে, বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন ও স্বদেশী আন্দোলনের সময়কালে। মুসলমান নেতা ঢাকার নবাব সলিমুল্লা সাহেব এবং তৎকালীন মন্ত্রী চৌধুরী নবাব আলী সাহেবের সাথে আলোচনা করেই পূর্ববঙ্গের  কৃষকশ্রেণীর স্বার্থে নমশূদ্র এবং মুসলমানরা ইংরেজদের বঙ্গভঙ্গ সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়ায়। এই সিদ্ধান্তের পক্ষে গুরুচাঁদের যুক্তি ছিল—


"সুদিনে মোদেরে যারা করিয়াছে ঘৃণা।

আজ কেন আসে তারা কিছুই বোঝনা।।

স্বার্থরক্ষা এরা সবে জানে ভাল করে।

তোমাদের কাছে আসে স্বার্থের খাতিরে।।

শিক্ষিত বিদ্বান যারা ধনী জমিদার।

স্বদেশী স্বদেশী বলি করে চিৎকার" (গুরুচাঁদ চরিত, পৃষ্ঠা ১৭০)।। 

       

স্বদেশী নেতারা নমশূদ্রদের দলে টানার চেষ্টা করে। তার বিরুদ্ধে গুরুচাঁদ এইসব কথা বলেছিলেন। তবে গুরুচাঁদের কথায় যুক্তি যাই থাকুক, কংগ্রেস তথা বর্নহিন্দু নেতৃত্ব বিষয়টিকে ভালভাবে নেয় নি। কারণ মুসলমান ও নমশূদ্ররা বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে যোগদান না করার ফলে, আন্দোলন আশানুরূপ গতি পায় নি। অবশ্য স্তিমিত আন্দোলন শেষ পর্যন্ত জয়যুক্ত হয় সম্রাট বদল হবার কারণে। বঙ্গভঙ্গের প্রশ্নে মুসলমান-হিন্দুর এই ন্যায্য- অন্যায্য স্বার্থের টানাপোড়েন দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে আশা-আশঙ্কা ও সন্দেহের বাতাবরণ সৃষ্টি করে এবং বাংলায় সাম্প্রদায়িকতার জন্ম দেয়।

       আরেকটু পিছিয়ে গেলে আমরা দেখতে পাই— ১৮৮২ সালে ভারতবর্ষে জনগণনা শুরু হয় ; কিন্তু দলিতদের বা অস্পৃশ্যদের জনগণনায় হিন্দু হিসাবে গণনা করা হয় না। তাঁদের পৃথক পরিচয় 'অস্পৃশ্য' হিসাবে গণনা করা হয়। অস্পৃশ্যরা নিজেদের হিন্দু হিসাবে দাবি করলেও বর্নহিন্দুরা তাঁদের হিন্দু হিসাবে মেনে নিতে অস্বীকার করে। দলিতদের প্রতি ঘৃণা, অবজ্ঞা, অবহেলা, নির্যাতন, অবিচার চলতেই থাকে। তারই প্রতিক্রিয়ায় ১৯০৫ সালে গুরুচাঁদ ঠাকুর উপরোক্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

       ১৯১৯ সালে ভারত শাসন আইন প্রবর্তিত হয়। বলা যায় যে, এই সময় থেকে ব্রিটিশভারতে সংসদীয় রাজনীতির সূচনা হয়। এই সময়কালে বাংলার প্রাদেশিক আইন সভায় সর্বপ্রথম পূর্ববঙ্গের একজন নমশূদ্র সদস্য মনোনীত হয়। তিনি ছিলেন ভীষ্মদেব দাস। এই ঘটনার দুবছর আগে বাংলার অনুন্নতশ্রেণীর পক্ষে মন্টাগ চেমসফোর্ডকে একটা স্মারকলিপি দেওয়া হয়। সম্ভবত সেই স্মারকলিপিতে ভীষ্মদেব দাস সই করেছিলেন। এটা ছিল মনোনয়ন ব্যবস্থা, এই মনোনয়ন ব্যবস্থায় দলিতরা খুশি ও সন্তুষ্ট ছিল না। তাঁরা নিজেদের দ্বারা নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচনের দাবি করতে থাকে এবং সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি তোলে।

       সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে এই সময়কাল থেকে ডক্টর আম্বেদকর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করেন। ১৯১৯ সালের জানুয়ারি মাসে সাউথ বরো কমিটি ভারতে আসে, ডক্টর আম্বেদকর ওই কমিটিতে সাক্ষ্য দেন এবং অস্পৃশ্যদের জন্য সংখ্যার অনুপাতে সংরক্ষণ এবং তাঁদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার দাবি তোলেন। ওই ১৯১৯ সালেই ভারত শাসন আইন ঘোষিত হয়। তাতে অস্পৃশ্যদের দাবি মেনে নেওয়া না হলেও, তাদের পৃথক অস্তিত্ব স্বীকার করে নেওয়া হয় এবং বাংলার একজন অস্পৃশ্য ভীষ্মদেব দাসকে বাংলার প্রাদেশিক আইন সভায় মনোনীত করা হয়।

       অস্পৃশ্য এবং ভারতীয়দের অন্যান্য অংশের মানুষেরাও ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাই  দাবি দাওয়া ও আন্দোলন চলতে থাকে। এই সময়ে ১৯২৮-২৯ সালে সাইমন কমিশন ভারতে আসে দুবার। লোথিয়ন কমিটি (ভোটাধিকার সংক্রান্ত, ১৯৩২ সাল) মানুষের নানা অংশের মতামত নেয়, তিনটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩০, ১৯৩১ এবং ১৯৩২ সালে। যার ফলশ্রুতিতে তৈরি হয় ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন। ডক্টর আম্বেদকর সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে অস্পৃশ্যদের প্রতিনিধিত্ব ও নেতৃত্ব করলেও দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনায় বাংলার অস্পৃশ্যদের ভূমিকা ছিল। প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁরা স্মারকলিপি ইত্যাদির মাধ্যমে নিজেদের দাবি ও মতামত পেশ করেছিল।

       ১৯১৯/২০ সালের পর থেকে ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে বোঝা যাচ্ছিল— ভারতে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা আসন্ন, যেখানে সংখ্যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে। সেক্ষেত্রে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ যুক্তবাংলায় তুলনামূলক বেশি শিক্ষিত, ধনী-জমিদার ও অগ্রসর উচ্চবর্ন হিন্দুদের পক্ষে চলমান একাধিপত্য ধরে রাখা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। যারফলে বিশের দশকের শুরু থেকে উচ্চবর্ন হিন্দুরা জনগণনায় এবার বাংলার অস্পৃশ্যদের হিন্দু হিসাবে গণনা করে দলভারি করার জন্য উঠেপড়ে লাগে  এবং ১৯৩১ সালের জনগণনায় অস্পৃশ্যদের হিন্দু হিসাবে গণনা করাতে সক্ষম হয়।

       অন্যদিকে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে ডক্টর আম্বেদকর এবং বাংলার ক্ষেত্রে যোগেন্দ্রনাথ, মুকুন্দবিহারী মল্লিক, প্রমথরঞ্জন ঠাকুর প্রমুখ অস্পৃশ্য নেতৃবৃন্দ উচ্চবর্ন হিন্দুর চালাকি বুঝে যান। তাঁরা যে অস্পৃশ্যদের কোনরূপ গুরুত্ব এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা না দিয়ে কেবল সংখ্যার প্রশ্নে নিজেদের স্বার্থে অস্পৃশ্যদের ব্যবহার করতে চায়, এই সত্য তাঁদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। তবুও উচ্চবর্ন হিন্দুর এই সুবিধাবাদী মনোবৃত্তির বিরুদ্ধে যোগেন্দ্রনাথ যে রাজনৈতিক দৃঢ়তা দেখাতে পেরেছিলেন, অন্যরা নানা কারণে সবক্ষেত্রে তা পারে নি। আর হয়তো এই কারণেই যোগেন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে সীমাহীন কুৎসা প্রচার করা হয়েছে।

      ১৯৩২ সালে ঘোষিত সম্প্রদায়গত রোয়েদাদে অন্যান্য প্রদেশের মত বাংলার প্রাদেশিক আইন সভার মোট আসন সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেয় এবং একইসাথে হিন্দু, বৌদ্ধ, দলিত অস্পৃশ্য, ইউরোপিয়ান, জমিদার, শ্রমিক, ব্যবসায়ী-শিল্পপতি ইত্যাদি বিভিন্ন সম্প্রদায় ও অংশের মানুষের জন্য আসন সংরক্ষিত করে দেয়। বাংলার প্রাদেশিক আইনসভার মোট ২৫০ আসনের মধ্যে  উচ্চবর্ন হিন্দুদের জন্য ৭০ টি আসন অর্থাৎ ২৬.৪০% বর্নহিন্দু পায় ২৮% আসন, পৃথক নির্বাচনসহ দলিতদের জন্য ১০টি আসন (হিন্দুদের মোট ৮০ টি আসনের মধ্যে দলিতদের জন্য ন্যূনতম ১০ টি আসন বরাদ্দ হয়) অর্থাৎ ১৭.৬০% দলিতরা পায় ৪% আসন ;  আর মুসলমানদের জন্য ১১৯ টি আসন অর্থাৎ ৫৪% মুসলমানরা পায় ৪৭.৬০% আসন এবং অন্যান্যদের জন্য বাকি আসনগুলি সংরক্ষিত করে দেওয়া হয়। পরে অবশ্য গান্ধীজি অনশন করে পুনা চুক্তির মাধ্যমে দলিতদের পৃথক নির্বাচনের অধিকার রদ করে দেন। বিনিময়ে বাংলার দলিতদের আসন সংখ্যা ১০ থেকে বেড়ে ৩০ হয়। দলিতদের পৃথক নির্বাচনের মূল্যে সারাভারতের প্রতিটি প্রেসিডেন্সিতে দলিতদের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয় ; কিন্তু একমাত্র বাংলার বর্নহিন্দুরা পুনা চুক্তির বিরুদ্ধে অর্থাৎ দলিতদের আসনসংখ্যা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তোলে, যদিও আসন বৃদ্ধির পরেও বাংলার দলিতরা তাঁদের সংখ্যানুপাতে কম আসন পেয়েছিল।

       এভাবে আসন বন্টন ও বরাদ্দ হবার ফলে একরকম নিশ্চিত হয়ে যায় যে, বাংলা যদি অবিভক্ত থাকে, তাহলে এই প্রদেশে মুসলমানদের নেতৃত্বে সরকার গঠনের সম্ভাবনা প্রবল এবং বাস্তবত ১৯৩৭ সালের নির্বাচন এবং ১৯৪৫ সালের নির্বাচনে মুসলমানদের নেতৃত্বে যুক্ত বাংলায় সরকার গঠিত হয়।

       এই অবস্থায় বাংলার ভদ্রলোকশ্রেণির সর্বক্ষেত্রে তাঁদের চিরাচরিত আধিপত্য ধরে রাখার একমাত্র উপায় ছিল বাংলাকে খণ্ডিত করে খণ্ডিত বাংলায় আধিপত্য কায়েম রাখা এবং তাঁরা তাই করেছিল।

       যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা, মুসলিম লীগ বা কৃষক প্রজা পার্টির সভ্য বা সমর্থক ছিলেন না। একসময়ে তিনি ছিলেন 'তফসিলি ফেডারেশনের' বাংলার সভাপতি এবং ওই পার্টির সর্বভারতীয় সভাপতি ছিলেন ডক্টর আম্বেদকর। যোগেন্দ্রনাথ দলিতদের জন্য স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার পক্ষে ছিলেন এবং সারাজীবন সেই লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন, সেই চেষ্টা করেছেন। ১৯৪৫ সালের নির্বাচনে এই পার্টির বিপর্যয় ঘটে এবং সারাভারতে এই পার্টির একমাত্র নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন যোগেন্দ্রনাথ, ডক্টর আম্বেদকরও এই নির্বাচনে পরাজিত হন। ফলে দেশবিভাগের প্রাক্কালে গুরুত্বপূর্ন সময়ে এই পার্টি গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।

       বাংলায় প্রথম পর্বের (১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর) মন্ত্রিসভার প্রথম দিকে (এই পর্বে ভাঙাগড়ার ফলে মোট চারবার মন্ত্রিসভা গঠিত হয়) শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা গঠিত হয়— যেখানে ফজলুল হক ছিলেন প্রিমিয়ার এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ডেপুটি প্রিমিয়ার ছিলেন। এই পর্বের শেষ দিকে ১৯৪৩ সালে প্রিমিয়ার হন খাজা নাজিমুদ্দিন। দলিতদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ন দাবি মেনে নেবার শর্তে যোগেন্দ্রনাথ নাজিমুদ্দিনের কোয়ালিশন মন্ত্রিসভায় যোগদান করেন। এই মন্ত্রিসভা দলিতদের দাবিগুলি পূরণ করে। ১৯৪৫ সালের নির্বাচনের পর যোগেন্দ্রনাথ সোহরাওয়ার্দীর কোয়ালিশন মন্ত্রিসভায় যোগদান করেন এবং কয়েকমাস পরেই তিনি অবিভক্ত ভারতের অন্তর্বর্তী সরকারের আইনমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন  বরিশালের মানুষ এবং ঐ জেলা থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি। দেশভাগের পর তিনি পাকিস্তানের মন্ত্রী হয়েছিলেন।

       ইতিহাসের ছাত্ররা জানে যে, দেশভাগের প্রশ্নে আলোচনায় ব্রিটিশ প্রতিনিধি এবং কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ ডাক পেয়েছিল,  আলোচনায় অংশ নিয়েছিল এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। শিখ এবং নবাব-রাজন্যবর্গের প্রতিনিধিদের মতামতও নেওয়া হয়। কিন্তু কোন সভায় ডক্টর আম্বেদকর বা যোগেন্দ্রনাথকে আমন্ত্রণ জানানো হয় না এবং তাঁদের মতামত নেওয়া হয় না। কারণ ১৯৪৫ সালের নির্বাচনে শোচনীয় ফলাফলের জন্য তাঁরা ও তাঁদের পার্টি গুরুত্ব হারায়। ফলে দেশভাগের জন্য তাঁদের বা কোন দলিত নেতাকে কোনভাবেই দায়ী করা যায় না। দেশভাগের প্রাক্কালে গুরুত্বপূর্ন আনুষ্ঠানিক বৈঠকগুলিতে আমন্ত্রণ পান নি, তাই দেশভাগ প্রশ্নে তাঁরা মতামত প্রকাশ করেন নি— বিষয়টি এমন নয়। যোগেন্দ্রনাথ বহুবার বহু ক্ষেত্রে দেশভাগ ও বাংলাভাগের বিরুদ্ধে প্রচার করেছেন। এমনকি ১৯৫০ সালে তাঁর পদত্যাগপত্রেও সেকথা পরিষ্কার ভাষায় লিখেছেন।

       বাংলাভাগের জন্য বাংলার উচ্চবর্ন হিন্দু নেতৃত্ব চক্রান্ত করে এবং এই কাজে তাঁরা তাঁদের রাজনৈতিক সংগঠন কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভাকে কাজে লাগায়। বলা যায় কংগ্রেসের শরৎচন্দ্র বসু, কিরণশঙ্কর রায়, অখিলচন্দ্র দত্ত, নিশীথনাথ কুন্ডু— এইরকম আর ২/১ জন নেতা ছাড়া আর সব উচ্চবর্ন হিন্দু নেতাগণ এই চক্রান্তে সামিল হয়েছিল এবং পার্টির বেড়া ডিঙিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছিল। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি শুরুতে এই চক্রান্তে ছিলেন না ; কিন্তু ১৯৪৬ সালে তিনিও বাংলাকে ভাগ করার জন্য কোমর বেঁধে নেমে পড়েন। কিন্তু অধিকাংশ দলিত নেতারা ছিল ব্যতিক্রম, তারা বাংলাভাগের বিরুদ্ধে ছিল। তবে এই চক্রান্তে সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে যুগান্তর, আনন্দবাজার, অমৃতবাজার পত্রিকা, স্টেটসম্যান পত্রিকা প্রভৃতি প্রিন্ট মিডিয়া! তারা রাতকে দিন বলে প্রচার চালিয়ে যায়। জয়া চ্যাটার্জির ' বাংলা ভাগ হল' নামের বিখ্যাত বই থেকে জানা যায়— বাংলাভাগের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করতে ওই সময়কালে কংগ্রেস একাই করে ৫৯ টি বড় ধরণের জনসভা, হিন্দু মহাসভার নেতৃত্বে হয় ১২ টি জনসভা এবং এই দুই দল যৌথভাবে উদ্যোগ নিয়ে ৫ টি জনসভা করেছিল।

       পক্ষান্তরে একমাত্র যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল বাংলাভাগের বিরুদ্ধে পথে নেমেছিলেন। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে ঘুরে সভা করে বাংলাভাগের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করার চেষ্টা করেন। শরৎচন্দ্র বসু প্রমুখ বাংলাভাগের বিরুদ্ধে ছিলেন ঠিকই ; কিন্তু কংগ্রেসের সঙ্গে থাকায় হয়তো তাঁর কিছু বাধ্যবাধকতা ছিল, তিনি সেভাবে রাস্তায় নামেননি।

      বাংলা প্রদেশ কংগ্রেস ১৯৪৭ সালের শেষার্ধে কলকাতার সিংহী পার্কের সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাভাগের দাবি জানিয়ে প্রস্তাব পাশ করে— যা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। যোগেন্দ্রনাথ দিল্লিতে বসে খবরের কাগজে এই সংবাদ জানতে পারেন। তখন তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের আইনমন্ত্রী। পরদিন ২১ এপ্রিল, ১৯৪৭ তারিখে তিনি দিল্লিতে সাংবাদিক সম্মেলন আহবান করেন। সেখানে তিনি বাংলাপ্রদেশ ভাগ করার চেষ্টার বিরুদ্ধে বিবৃতি দেন। হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকায় তাঁর বিবৃতির পূর্ণ বয়ান প্রকাশিত হয়। বিবৃতিতে তিনি বলেন, "বাংলাভাগের মাধ্যমে বাঙালি হিন্দুর কোন সমস্যার সমাধান হবে না। বাংলা ভাগ করা হলে বহু হিন্দুকে ভিটেমাটি ছেড়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে হবে। সম্প্রদায়গত সমস্যার সমাধানের জন্য যে ওষুধ প্রস্তাব করা হচ্ছে, তাতে নিরাময়ের বদলে রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাবে। পূর্ববঙ্গের হিন্দুরা আরো বেশি সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে এবং তাঁদের সমস্যা বাড়বে"। সেজন্য তিনি এই পরিকল্পনা পরিত্যাগ করার জন্য আহবান করেন এবং স্পষ্ট করে দেন যে, "বাংলার দলিতরা বাঙলাভাগের বিরুদ্ধে, তাঁরা বিভক্ত করার এই প্রস্তাব ও পরিকল্পনা সমর্থন করে না"।

       বর্নহিন্দুরা, কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভা বাংলাভাগের দাবি জনপ্রিয় করার জন্য কলকাতা ও নোয়াখালীর দাঙ্গাকে হাতিয়ার করে প্রচার চালাতে থাকে। তাঁদের যুক্তি এইসব বীভৎস দাঙ্গার পর আর হিন্দু এবং মুসলমান একসাথে এক রাজ্যে, এক দেশে বসবাস করতে পারে না।

       এই অপপ্রচারের মোকাবিলা করার জন্য যোগেন্দ্রনাথ দিল্লি থেকে কলকাতায় আসেন। তিনি বলেন— "সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চিরস্থায়ী নয় ; কিন্তু দাঙ্গার সমাধান হিসাবে বাংলাকে ভাগ করা কোন কাজের কথা নয়। তা দাঙ্গার থেকেও খারাপ হবে। বিশেষ করে দলিতদের চরম ক্ষতির কারণ হবে। কলকাতা দাঙ্গার তদন্তের জন্য ভারতের প্রধান বিচারপতি স্যার পেট্রিক স্পেন্স-এর নেতৃত্বে কমিশন তৈরি হয়েছে। তাতে দোষীদের সনাক্ত করে বিচার করে শাস্তির ব্যবস্থা হবে"।— এভাবে মানুষকে সচেতন করার জন্য ২৪ পরগনা, রংপুর, দিনাজপুর, যশোর, খুলনা, বর্ধমান, হাওড়া, হুগলি, বাঁকুড়া, বীরভূম, নদীয়া, বরিশাল, ফরিদপুর, জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং জেলায় তিনি জনসভা করে বাংলাভাগের বিরুদ্ধে এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা নামে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার কাজ করেন। ১৯৪৭ সালের ১৬ মে তিনি সভা করেন কলকাতার ভারত সভা হলে, যেখানে জেলে পাড়ার গুন্ডাদের দিয়ে তাঁর উপর হামলা চালানোর চক্রান্ত করা হয়েছিল।

       বাংলাভাগের দাবি ও পাল্টা দাবির প্রেক্ষাপটে বড়লাট মাউন্ট ব্যাটেন বাংলা ভাগ করা বা না করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার ছেড়ে দেন বাংলার প্রাদেশিক আইন সভার সদস্যদের উপর এই শর্তে যে, হিন্দু সদস্য এবং মুসলমান সদস্যরা আলাদা আলাদাভাবে ভোটাভুটি করবে এবং দুইপক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বাংলাভাগের বিপক্ষে ভোট দিলে বাংলাভাগ হবে না ; কিন্তু কোন এক পক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য বাংলাভাগের পক্ষে ভোট দিলে বাংলাকে ভাগ করা হবে। হিন্দু সদস্যরা ভোটাভুটি করে বর্ধমানের মহারাজা উদয়চাঁদ মেহতাবের নেতৃত্বে; আর মুসলমান সদস্যরা ভোটাভুটি করে জনাব নুরুল আমিনের নেতৃত্বে। প্রাদেশিক আইন সভার অধিকাংশ মুসলমান সদস্য বাংলাকে ভাগ করার বিরুদ্ধে ভোট দেয়। পক্ষান্তরে অধিকাংশ হিন্দু সদস্যরা বাংলাকে ভাগ করার পক্ষে ভোট দেয়। তাই ভারত ভাগ করার সিদ্ধান্তের ৫৫ দিন আগে বাংলাকে ভাগ করার সিদ্ধান্ত পাকা হয়ে যায়। প্রাদেশিক আইন সভার ৭৯ জন হিন্দু সদস্য এই ভোটাভুটিতে অংশ নিয়েছিল। তারমধ্যে ৫৭ জন সদস্য বাংলাভাগের পক্ষে ভোট দেয়। প্রয়াত জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে তিনজন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য বাংলাভাগের পক্ষে ভোট দেয়। আর বাংলাভাগের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া ২২ জন হিন্দু সদস্যের মধ্যে ১৯ জন ছিল দলিত বর্গের সদস্য— যারা যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের নেতৃত্বে বাংলাভাগের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেয়। শরৎচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে মাত্র ৩ জন বর্নহিন্দু সদস্য বাংলাভাগের বিরুদ্ধে ভোট দেয়।

       এইসব ঘটনার ৮/৯ মাস আগে একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। ১৯৪৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর কংগ্রেস দলের ৪ জন বাংলার প্রাদেশিক আইন সভার দলিত সদস্য দলের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়ে দল ত্যাগ করে এবং তফসিলি ফেডারেশন দলে যোগ দেয়। ওই ৪ জন সদস্য হল দ্বারিকনাথ বারুরী (ফরিদপুর), ভোলানাথ বিশ্বাস (যশোর), হারানচন্দ্র বর্মন (পাবনা/বগুড়া) এবং গয়ানাথ বিশ্বাস (ময়মনসিংহ)। ওই বিবৃতিতে তাঁরা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে  বলে যে, "কংগ্রেস ও উচ্চবর্ন হিন্দুরা দলিতদের কোনক্ষেত্রে সহযোগিতা করছে না ; বরং প্রতিটি ক্ষেত্রে দলিতদের স্বার্থের বিরোধিতা করে চলেছে। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে ইংরেজ ও মুসলমানরা দলিতদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে কংগ্রেস ও উচ্চবর্ন হিন্দুরা বাধাদান করে চলেছে" (যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল : প্রকাশক, মহাপ্রাণ পাবলিশিং সোসাইটি)।

       একই রাষ্ট্রের মধ্যে হিন্দু (প্রকৃতপক্ষে বর্নহিন্দু) এবং মুসলমানের সমান স্বার্থ এবং সমান বিকাশের প্রশ্নে নানা দাবি ও পাল্টা দাবি, আলোচনা এবং পর্যালোচনা চলে দীর্ঘ কয়েকবছর ধরে ; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থ হয়। দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের কাছেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, একই রাষ্ট্রের মধ্যে থেকে হিন্দু ও মুসলমান উভয়পক্ষের আশা- আকাঙ্খার মীমাংসা সম্ভব নয়। ফলে তারা ইংরেজদের উপস্থিতিতে দেশভাগ করে নেবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রথমে বাংলা এবং অব্যবহিত পরে দেশ ভাগ হয়ে যায়। ফলে যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের সব চেষ্টা বিফলে যায় ; আর স্বাভাবিক কারণেই তিনি পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। নেতৃস্থানীয় মানুষ হিসাবে শুধুমাত্র তিনিই যে নিজেদের মাতৃভূমি আকড়ে থাকতে চেয়েছিলেন এমন নয়। তাঁর মতো ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, কামিনীকুমার দত্ত, সতীন্দ্রনাথ সেন, বসন্তকুমার দাস, প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ী প্রমুখ বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দও পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

       আজকের ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাংলাভাগ এবং বিভাগ পরবর্তী সাম্প্রদায়গত ঘটনাবলী ; অর্থাৎ বাংলাভাগ ও দেশত্যাগ এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু—বলা যায় পশ্চিমবঙ্গে একটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দলের মূল এজেন্ডাই হল এই দুঃখজনক ইতিহাসের সাম্প্রদায়িকরণ। সেজন্য এই প্রশ্নে সংঘ পরিবারের এক বিশিষ্টজনের উল্লেখ করা কিছু তথ্য নিয়ে আলোচনা করে এই প্রবন্ধে ইতি টানবো এই কারণে যে, যদি তা কিছু হিন্দুত্ববাদী মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়—

       তথাগত রায় তাঁর লেখা 'যা ছিল আমার দেশ' বইয়ে সঠিক কথাই লিখেছেন যে— "স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে যখন পশ্চিম পাকিস্তানে রক্তের নদী বয়ে যাচ্ছিল, তখন কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান অনেকটাই শান্ত ছিল।…লাহোর বা অমৃত্সরে যা হচ্ছিল তার তুলনায় কলকাতা নস্যি" (পৃষ্ঠা ১০০)।—আমরা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনায় ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ইতিহাস জানি। তাহলে কীভাবে ১৯৪৭/৪৮ সালের বাংলা ব্যতিক্রম হয়ে রইল তা বিস্ময়কর। তাই তা  নিয়ে ভাবা দরকার, হিসাবে রাখা প্রয়োজন।

       অথচ "১৯৪৮ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত যখন আনুমানিক  ৫৫ ০০ ০০০ জন হিন্দু-শিখ পশ্চিম পাঞ্জাব ছেড়ে ভারতে এসেছেন (প্রায় সমসংখ্যক মুসলমান পূর্ব পাঞ্জাব থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান), সেই সময়ের মধ্যে ১২ ৫০ ০০০ জন হিন্দু পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে চলে আসেন" (ওই, পৃষ্ঠা ১০১)।— তথাগত বাবুর উল্লেখ করা তথ্য থেকে পাঞ্জাবের ক্ষেত্রে দেশত্যাগের কারণ বোঝা যায় ; কিন্তু ৬/৭ মাসের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান থেকে এই ১২ ৫০ ০০০ হিন্দুর দেশত্যাগ করার কারণ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। কারণ এই সময়কালে ওই অঞ্চলে কোন দাঙ্গা হাঙ্গামা হয় নি। পরের সময়কালে পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে হিন্দু মানুষের দেশত্যাগ নিয়ে তথাগত বাবু এবং তাঁর দল বহু গল্প বললেও উল্লিখিত এই ১২ ৫০ ০০০ মানুষগুলির দেশত্যাগের কারণ সম্পর্কে কোন কথা বলেন নি বা কোন অজুহাত খাড়া করতে পারেন নি। 

       পূর্ব পাকিস্তান থেকে দুই ধরণের হিন্দুই (বর্নহিন্দু এবং দলিত) দেশত্যাগ করেছে ; আর বলা যায় বাংলাদেশ থেকে (১৯৭১ সালের পরে) ভারতে এসেছে শুধুমাত্র দলিত হিন্দুরা। পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের দেশত্যাগের কারণ সম্পর্কে কয়েকজন বিশিষ্ট বাঙালি হিন্দুর লেখা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তথাগত বাবুর  উল্লিখিত বইয়ের 'হিন্দু বিতাড়ণের শুরু' অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। ওইসব তথ্যের কয়েকটি আমরা দেখে নেব, তাতে অন্তত হিন্দুদের একাংশের (ভদ্রলোকশ্রেণীর) দেশত্যাগের কারণ সম্পর্কে আমরা ধারণা পাবো।—-

       "লেখক প্রফুল্লকুমার চক্রবর্তী পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের যন্ত্রনা খুব যত্ন সহকারে বর্ণনা করেছেন—-'হিন্দুদের প্রতি মুসলিমদের মনোভাব দেশভাগ হবার সঙ্গে সঙ্গে যেন বদলে গেল। আগে নিঃসন্দেহে হিন্দুরা মুসলমানদের অশ্রদ্ধা করতেন— হেরারে আমরা দাওয়ায় উঠতে দিই নাই, নীচে দারা করাইয়া কথা কইতাম।— এই পরিস্থিতি যে আমূল বদলে যাবে তারজন্য ভদ্রলোক হিন্দু সমাজ তৈরি হয়েছিল।…এই সময় সাধারণ মুসলিমদের হিন্দুঘৃণা নানা কারণে এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে, সেই জনতার মুখোমুখি হবার চাইতে বাস্তুত্যাগই হিন্দুরা শ্রেয় মনে করেছিলেন"।

       "সন্দ্বীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, '১৯৪৮-৪৯ সালে হিন্দুদের পূর্ববাংলা ত্যাগ করার মূল কারণ এটাই যে, তাঁরা স্বাধীনতা পরবর্তী পরিস্থিতি মেনে নিতে পারছিলেন না এবং একথা সত্য যে, স্বাধীনতা বা দেশভাগের আগে হিন্দুরা মুসলমানদের তুলনায় যেরকম সামাজিক উচ্চতায় বাস করতেন, সেখান থেকে তাঁদের পতন অবশ্যম্ভাবী ছিল এবং হয়েওছিল"।

       "হিরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় এই সামাজিক উচ্চতা থেকে পতনের বেশ কিছু উদাহরণ দিয়েছেন।—'বিক্রমপুরের একজন ব্রাহ্মণ ভারতে চলে যাবেন বলে সিদ্ধান্ত করেছিলেন। তার কারণ, তাঁর পরিচিত একজন মুসলমান একদিন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলেন এবং তাঁর সামনে রাখা একটি বেঞ্চিতে বসলেন। স্বাধীনতার আগে হলে তিনি মাটিতে বসতেন'।

       অবস্থাপন্ন হিন্দুরা বেশ অস্বস্তিবোধ করতেন এই দেখে যে, মুসলমানরা এখন তাদের নাম ধরে ডাকছে, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে কথা বলছে— স্বাধীনতার আগে তাঁদের কাছে যা অকল্পনীয় ছিল।

       ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার পালং থানার কাকদ্বীপ গ্রামের অনেক হিন্দু মনে করেছিলেন যে, 'তাঁরা আগে মুসলিমদের যেরকম অপমান করতেন, তাঁরা এইবার তার বদলা নেবে— এইবেলা তাই দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়াই ভাল'। মুসলিমরা হিন্দু ভদ্রলোকদের সোজাসুজি বলতেন, মনে রেখ কর্তা, পাকিস্তান হয়ে গেছে, এখন আমরা আর ছোট নই"।

       এইসব বিভিন্ন লেখকের লেখা পড়লে এবং তাঁদের উল্লেখ করা নানা তথ্যাদি বিশ্লেষন করলে পূর্ববাংলার হিন্দু ভদ্রলোকদের দেশত্যাগ করার মূল কারণগুলো বোঝা যায়। তবে দেশত্যাগ যে শুধুমাত্র ভদ্রলোক হিন্দুরা করেছে তা নয়, দলিত হিন্দুরাও দেশত্যাগ করেছে। দেশ স্বাধীন হবার শুরুতে মূলত ভদ্রলোক হিন্দুরা দেশত্যাগ করেছে, তখন নগন্য সংখ্যক হলেও কিছু দলিতও দেশত্যাগ করেছে। আর দেরিতে, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের পরে বিপুল সংখ্যক দলিত হিন্দু দেশত্যাগ করেছে এবং এই পর্যায়ের দেশত্যাগীদের মধ্যে ভদ্রলোক হিন্দুরা প্রায় নেই বললেই চলে।

       ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত অর্থাৎ দেশভাগ হবার পর দুবছর চার মাস পূর্ব পাকিস্তানে উল্লেখ করার মত কোন অশান্তি হয় নি। তবুও এই পর্যায়কালে ভদ্রলোক হিন্দুদের বড় অংশ 

দেশত্যাগ করে। তাঁরা কেন দেশ ছেড়েছিল তার  কারণ সম্পর্কে সবটা নাহলেও কিছু ধারণা ইতিমধ্যে পাওয়া গেছে। আলোচিত এইসব কারণগুলি যে দলিত হিন্দুদের দেশত্যাগ করার কোন কারণ হতে পারে না, তা যেকেউ বোঝে। তবুও কিছু সংখ্যক দলিত হিন্দু এই পর্যায়কালেও দেশত্যাগ করেছিল। নিজের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি— ১৯৫০ সালের আগে যে সব দলিত হিন্দুরা দেশত্যাগ করে ভারতে এসেছিল, তাঁদের অধিকাংশ ছিল নিতান্ত গরিব ভূমিহীন দুস্থ মানুষ। বাঁচার তাগিদে ও ভবিষ্যতে ভাল কিছুর আশায় তাঁরা ঝুঁকি নিয়ে অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়ায়। তাঁরা শুনেছিল ভারত সরকার দেশান্তরিত উদ্বাস্তু মানুষদের জমি দেবে, পুনর্বাসন দেবে। তাছাড়া পাকিস্তানে এক ধরণের আশংকা তো ছিলই। কয়েক বছর ধরে মুসলমানদের যেভাবে 'নৃশংস দানব' হিসাবে চিত্রিত করে প্রচার করা হয়েছিল, তাতে গোটা হিন্দু সমাজের কাছে মুসলমান ও পাকিস্তান শব্দদুটি এক ভয়ের বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল। এই ভয় ও আশংকা ছিল ভদ্রলোক ও দলিত— উভয় হিন্দুর কাছে এক 'কমন' কারণ। এই আশংকা যুক্তিযুক্ত হোক বা অমূলক হোক, পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের আশংকা ছিল এবং আজও আছে। ভবিষ্যতের জন্য দুশ্চিন্তা হিন্দুদের দেশত্যাগের ক্ষেত্রে এক বড় কারণ। তাছাড়া হিন্দু সমাজের মধ্যে নেতা, প্রভাবশালী, ধনী ও ক্ষমতাধর ছিল ভদ্রলোক হিন্দুরাই। তাঁরা দেশত্যাগ করতে থাকায় দলিত হিন্দুদের মধ্যকার অনেকেই অসহায়বোধ করে এবং এই অবস্থা তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করে, উৎসাহিত করে। গরিব মানুষের সমস্যা উপলব্ধি করার জন্য ১৯৪৮ সালের ২০ অক্টোবরের আনন্দবাজার পত্রিকার একটা রিপোর্টের দিকে আমরা নজর দিতে পারি। তখন পূর্ববাংলায় সাধারণ চালের দাম দাঁড়িয়েছিল প্রতিমন ৫০ টাকা, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে ওই চালের দাম ছিল মাত্র ২১ টাকা। ১৯৪৮ সালে দলিতদের দেশত্যাগের পিছনে অন্যান্য কারণের সাথে অর্থনৈতিক ভূমিকা ক্রিয়াশীল ছিল, আজও সেই কারণ পাল্টায় নি।

      পাকিস্তান সৃষ্টির কিছুকালের মধ্যে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু হয় এবং লিয়াকত আলীর নেতৃত্বে  মুসলিম লীগের মধ্যকার মৌলবাদী অংশ পার্টি ও সরকারের দখল নিয়ে নেয়। যার জন্য এমনকি মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দী, ফজলুল হকের মত নেতারাও পার্টি ও সরকারে ব্রাত্য হয়ে যায়। এই সময়ে ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসে পূর্ব পাকিস্তানের  ৩/৪ টি পকেটে সাম্প্রদায়িক সমস্যা হয় ও কিছু মানুষ মারা যায়, মূলত হিন্দুরাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় আবার দাঙ্গা শুরু হয়, অনেক মানুষ মারা যায়। মূলত হিন্দুরাই মারা যায়। এই অবস্থায় পাকিস্তানের মন্ত্রী যোগেন্দ্রনাথ ক্ষতিগ্রস্থ  হিন্দুপল্লীগুলি পরিদর্শন করেন এবং প্রশাসনকে শক্ত হাতে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য চাপ দেন। কিন্তু প্রশাসন তাঁকে পাত্তা দেয় না।

       কয়েকমাস ধরে লিয়াকত আলীর নেতৃত্বধীন সরকারের নানা সিদ্ধান্ত ও কাজের জন্য মন্ত্রী যোগেন্দ্রনাথ ক্ষুব্ধ ছিলেন। লিয়াকত আলী ও তাঁর সহযোগিরা তাঁকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করতে থাকে। লিয়াকত আলী সাহেবের সরকার ও প্রশাসন বেশি বেশি হিন্দু বিদ্বেষী শক্তিকে প্রশ্রয় দিতে থাকে এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও দাঙ্গা পরবর্তী ঘটনায় হিন্দুদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব করতে থাকে। যোগেন্দ্রনাথ ওই সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সরব হন। ফলে তাঁর জীবনসংশয় হয়, তিনি দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং লিয়াকত মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন (যোগেন্দ্রনাথের ১৯৫০ সালের ৮ অক্টোবরের পদত্যাগপত্র)।

       ১৯৫০ সালের ৮ এপ্রিল নেহেরু-লিয়াকত চুক্তি সই হয়। এই চুক্তিতে দুই দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দানের কথা বলা হয়। তাতে সংখ্যালঘুরা খানিকটা ভরসা পায়। তাছাড়া যোগেন্দ্রনাথের চেষ্টায় পাকিস্তানে দলিত হিন্দুদের জন্য চাকরিতে ১০% সংরক্ষণ রাখা হয়েছিল (সংরক্ষণ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় : কার্তিক ঠাকুর, বাংলাদেশ)। সেটাও পাকিস্তানের প্রতি দলিত হিন্দুদের একধরনের আকর্ষণের কারণ ছিল। কিন্তু লিয়াকত আলি নেতৃত্বাধীন সরকার ও প্রশাসনের কট্টর সাম্প্রদায়িক মানসিকতা ও ভূমিকার ফলে মানুষ হতাশ হয়ে পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করতে থাকে। যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল দেশত্যাগ করে চলে আসার জন্যও সেদেশের দলিতরা নিজেদের বেশি বেশি অসহায় মনে করতে থাকে। আর ১৯৬৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ব পাকিস্তানে আবারও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধে। এরফলে আরেক দফায় দুদেশেরই বহু ভীতসন্ত্রস্ত সংখ্যালঘু মানুষ দেশান্তরিত হতে বাধ্য হয়। তবে এত কিছুর পরেও পূর্ববঙ্গের দলিতরা তুলনায় কম দেশত্যাগ করেছে। আজও বাংলাদেশে যথেষ্ট সংখ্যক দলিত হিন্দু বসবাস করে। কৃষিজীবী- জলজীবী মানুষগুলি মূলত জীবন-জীবিকা অর্থাৎ আর্থিক কারণেই  দেশত্যাগ করতে পারে নি। একটা সময়ে আর্থিক প্রয়োজনে কিছু দলিত পরিবার পূর্ববঙ্গ ত্যাগ করেছিল, পরবর্তীকালে আর্থিক সমস্যার কারণেই তাঁদের মধ্যকার অনেকের দেশত্যাগের আকাঙ্খা পূরণ হয় নি।

       ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের সৃষ্টি সেদেশে অনেক বদল এনে দিয়েছে। বহু মানুষের মনে, চিন্তায় ও চেতনায় পরিবর্তন এসেছে। সেদেশের মুসলমান মানুষের মনে অসাম্প্রদায়িক চেতনার উন্মেষ হয়েছে। সাম্প্রদায়িক প্রশ্নে সেদেশের রাজনীতি ও প্রশাসনে অনেকটা প্রগতি এসেছে। বাংলাদেশে হিন্দুরা যথেষ্ট সংখ্যায় চাকরিতে আছে, তাঁদের সংখ্যার অনুপাতে তাঁরা বরং অনেকটা বেশি চাকরি  পেয়ে থাকে। বড় বড় পদেও হিন্দুরা আছে। রাজনীতি ও প্রশাসন সাম্প্রদায়িক হলে এটা সম্ভব ছিল না। কিন্তু মনে হয় সেদেশের হিন্দুরা, বিশেষ করে দলিতরা ; আরো নির্দিষ্ট করে বললে বলতে হয় নমশূদ্ররা যেন উল্টোপথে হেঁটেই চলেছে। মুসলমান বিদ্বেষের বিষ তাঁদের আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। এপার বাংলায় যেমন, ওপার বাংলাতে যেন আরো বেশি!

      রাজনৈতিক ক্ষেত্রে  ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের সাম্প্রদায়িক শিক্ষার রেশ এতদিনে হয়তো ধীরে ধীরে কেটে যেতে পারতো ; কিন্তু বাস্তবত তা হয় নি। অন্তত গত দুদশক ধরে বাংলাদেশের দলিতদের মধ্যে মুসলিম বিদ্বেষী প্রচার গতি পেয়েছে। একটি সংগঠনের নেতৃত্বে নানা কৌশলে এই সম্প্রদায়িক প্রচার চলছে। যেকেউ জানে যে, বাংলাদেশের হিন্দু অঞ্চলগুলি আওয়ামী লীগের ঘাঁটি অঞ্চল। তবুও একথা জোরের সাথে বলা যায় যে, ওইসব হিন্দু অঞ্চলে যদি ভারত ও বাংলাদেশের দুই প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে গণভোট করা হয়, তাহলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জমানত চলে যাবে!

       ১৯৭১ সালের পরে বাংলাদেশের হিন্দুদের দেশত্যাগের মূল কারণ ওইসব মানুষের 'হিন্দুমন' এবং ভারতবর্ষকে নিজের দেশ বলে মনে করার ভ্রান্ত ধারণা। কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেই তার মোকাবিলা করার জন্য চেষ্টা না করে, বাংলাদেশের হিন্দুরা দেশত্যাগ করাকেই একমাত্র সমাধান বলে মনে করে। এই কথা বলার অর্থ এই নয় যে, সেদেশে সংখ্যালঘুদের উপর কোন অন্যায়, অত্যাচার বা অবিচার হয় না। অবশ্যই সেদেশে কিছু কিছু ঘটনা ঘটেছে, ঘটে ; কিন্তু তা দেশত্যাগের জন্য যথেষ্ট কারণ নয়। আরো বড় কথা হলো— সংখ্যালঘুদের উপর কোন নিপীড়ন হলে, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যা বাংলাদেশে যথেষ্ট সংখ্যায় আছে, তাঁরা আক্রান্ত সংখ্যালঘু মানুষের পাশে দাঁড়ায়।

       ১৯৭১ সালের পরে বাংলাদেশ ত্যাগ করে যারা ভারতে এসেছে তাঁরা মূলত দলিত হিন্দু বা তাদের কাছাকাছি বর্গের মানুষ। এইসব দলিতদের আবার দুভাগে ভাগ করা যায়। এক অংশ হল তুলনায় বেশি গরীব ও কম শিক্ষিত। অন্য অংশ শিক্ষিত। বেশি গরিব ও কম লেখাপড়া জানা মানুষগুলি তাঁদের সহায় সম্বল যতটুকু ছিল, বিক্রি করে গোটা পরিবার নিয়ে ভারতে চলে এসেছে। আর তুলনায় শিক্ষিত পরিবারের যোগ্যতম কাউকে প্রথমে ভারতে পাঠানো হয়েছে। চাকরি পেয়ে বা কোনভাবে আয়ের পথ তৈরি হলে একটু একটু করে পরিবারের বাকিরা এসেছে। গত তিন দশক ধরে যখন বাংলাদেশের শিক্ষাবোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাগত যোগ্যতায় ভারতে চাকরি পাবার পথ বন্ধ হয়ে যায় (সিটিজেনশিপ সার্টিফিকেট দেওয়া বন্ধ হয়), তখন বাংলাদেশের শিক্ষিত হিন্দুরা তাঁদের কিশোর সন্তানদের ভারতে পাঠিয়ে স্কুলে ভর্তি করা শুরু করে এবং চাকরি ও অন্যান্যভাবে প্রতিষ্ঠিত হবার চেষ্টা করে। অতি সাম্প্রতিককালে এনআরসি ইত্যাদির প্রচারে বাংলাদেশি হিন্দুর দেশত্যাগের প্রবণতায় ধাক্কা খেলেও, তা পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে, এমন নয়।

        বাংলাদেশি হিন্দুদের দেশত্যাগ করার প্রক্রিয়া নিয়ে এত কথা বলা এইজন্য যে, এর থেকে বোঝা যায় বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলমান সমস্যা বা সাম্প্রদায়িক গন্ডগোল ও অত্যাচার তাঁদের দেশত্যাগ করার মূল কারণ নয় ; মুসলমানদের অত্যাচার, সাম্প্রদায়িক গন্ডগোল ইত্যাদি হলো দেশত্যাগের জন্য অনেকগুলি কারণের মধ্যকার একটি গৌণ কারণ মাত্র। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে মানুষের দেশত্যাগের ধরণ অন্যরকম হয়, তা হয়েছিল পাঞ্জাবের ক্ষেত্রে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ক্ষেত্রে একই পরিবারের ২/৩ প্রজন্মকাল ধরে দেশত্যাগ সম্পুর্ন করার সুযোগ থাকে না। বাংলাদেশ থেকে যারা দেশত্যাগ করেছে, তাদের অধিকাংশ পরিবারের বা বংশের সব মানুষের আজও সেদেশ ত্যাগ করার কাজ  সম্পুর্ন হয় নি; তাঁদের মধ্যকার কিছু মানুষ ভারতে এসেছে, কিছু মানুষ আজও বাংলাদেশেই থেকে গেছে। যাঁরা বাংলাদেশে থেকে গেছে, তাঁরা সেখানে মোটামুটি ভালোই আছে।

       তবে বাংলাদেশের নুতন প্রজন্মের অনেক হিন্দুদের মধ্যে নিজের মাতৃভূমি ও দেশত্যাগ নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির কিছু পরিবর্তন শুরু হয়েছে বলে মনে হয়। তাঁরা বাংলাদেশকে নিজের দেশ বলে ভাবতে শুরু করেছে।

       

       



       


       

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

তৃণমূল নেত্রী ফের সংসদে

যদা যদা হি ধর্মস্য... গীতার এই শ্লোকে ঠিক কী বলা হয়েছে?

ভাতে কেরোসিন যাত্রাপুরে, অভিযোগ বাংলাদেশী