সতীদাহ প্রথা ও স্বামী বিবেকানন্দ
সতীদাহ প্রথার ভয়াবহতা বোঝাতে উল্লেখ করা অসঙ্গত নয় যে, “১৮১৫ সাল থেকে ১৮২৮ সালের মধ্যে; অর্থাৎ মাত্র ১৩ বছরের মধ্যে ৮০০০ বিধবাকে স্বামীর চিতায় পুড়িয়ে মারা হয়।" The Calcutta Review (Vol. 46, No. 92, February 1868)। এগুলি ছিল রেকর্ডেড ঘটনা। নিশ্চয়ই প্রকৃত অবস্থা ছিল আরো অনেক বেশি খারাপ।
এই বর্বর প্রথার সঙ্গে ঐশ্বরিকতা, সতীত্ব, পবিত্রতা ইত্যাদি অনেক ভাল ভাল শব্দ জুড়ে দেওয়া হয় ঠিকই; কিন্তু প্রকৃত অবস্থা কী ছিল, তা আমাদের জানা জরুরী —“স্বামীর মৃত্যুর পর পরই তাঁহার বিধবা স্ত্রীকে একবাটি সিদ্ধি ও ধুতুরা পান করাইয়া মাতাল করিয়া দেওয়া হইত কেন? শ্মশানের পথে কখনওবা সে হাসিত, কখনো কাঁদিত, কখনওবা পথের মধ্যেই ঢুলিয়া ঘুমাইয়া পড়িতে চাহিত, এই তাঁর সহমৃতা হইতে যাওয়া! তারপর চিতায় বসাইয়া কাঁচা বাঁশের মাচা বুনিয়া চাপিয়া ধরা হইত, পাছে সতী দাহ-যন্ত্রণা আর সহ্য করিতে না পারে! এত ধূণা ও ঘি ছড়াইয়া অন্ধকার ধূয়া করা হইত যে, কেহ তাঁহার যন্ত্রণা দেখিয়া যেন ভয় না পায় এবং এত রাজ্যের ঢাক, ঢোল, কাঁশি ও শাঁক সজোরে বাজানো হইত যে, কেহ যেন তাহার চিৎকার, কান্না বা অনুনয়-বিনয় না শোনে! এই তো সহমরণ” (চট্টোপাধ্যায়: ১৪০০ বাংলা: ৪৭১-৪৭২। উদ্ধৃত: বিবেকানন্দ মানস: ড: কনিষ্ক চৌধুরী, পৃ: ১১২-১১৩)।
সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার জন্য রাজা রামমোহন রায় সরকারের কাছে আর্জি জানিয়ে বলেন যে, হিন্দুশাস্ত্রে বহু জায়গায় আত্মহত্যার বিরোধিতা করা হয়েছে; বলা হয়েছে আত্মহত্যা করা মহাপাপ – তার অর্থ সতীদাহ প্রথা হিন্দুশাস্ত্রসম্মত নয়। এছাড়াও তিনি পৃথিবীর ইতিহাস উদ্ধৃত করে সরকারকে লেখেন — পৃথিবীর কোন সভ্যদেশে এমন বর্বর প্রথা নেই। তাই, এই বর্বর ও নিষ্ঠুর প্রথা নিবারণ করতে আইন প্রণয়ন আবশ্যক। এটা একটা দিক।
এর বিপরীতে স্বামী বিবেকানন্দ বলছেন, “কোনও হিন্দু বিবাহিত না হইলে পুরোহিত হইতে পারে না। ভাবটা এই যে, অবিবাহিত ব্যক্তি অর্ধাঙ্গ ও অসম্পূর্ণ। পূর্ণ স্বাতন্ত্র্যই পূর্ণ নারীত্ব। আধুনিক হিন্দু নারীর জীবনের প্রধান ভাব তাহার সতীত্ব। পত্নী যেন বৃত্তের কেন্দ্র, ঐ কেন্দ্রের স্থিরত্ব নির্ভর করে তাহার সতীত্বের উপর। এই আদর্শের চরম অবস্থায় হিন্দু বিধবারা সহমরণে দগ্ধ হতেন” (বাণী ও রচনা, ১ম খণ্ড, পৃ: ৩০)। – এভাবে কার্যত স্বামী বিবেকানন্দ এই নিষ্ঠুর প্রথার সমর্থনে বক্তৃতা করলেন আমেরিকার শিকাগো বিশ্ব ধর্মমহাসভায়।
আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া শহর, ডেট্রয়েট শহর প্রভৃতি জায়গাতেও স্বামী বিবেকানন্দ কার্যত সহমরণ বা সতীদাহ প্রথার পক্ষেই যুক্তি খাঁড়া করেছেন। ডেট্রয়েট শহরে শ্রোতারা এই বিষয়ে তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করেন। উত্তরে স্বামী বিবেকানন্দ কী বলেছিলেন তা আমরা তার বাণী ও রচনা থেকে জেনে নেব। — বিধবাদের অগ্নিদগ্ধ করিয়া হত্যা করিবার কথা বিবেকানন্দ অস্বীকার করেন এবং বলেন, "হিন্দু বিধবাগণ অগ্নিতে আত্মাহুতি দিতেন স্বেচ্ছায় ৷
যে অল্প সংখ্যক ক্ষেত্রে এই ঘটনা ঘটিয়াছে, সেখানে মহাপ্রাণ ব্যক্তিরা, যাঁহারা সর্বকালে আত্মহত্যার বিরোধি, তাঁহারা বিধবাদের উক্ত কার্য হইতে বিরত হইবার জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ করিয়াছেন; এবং যে সকল ক্ষেত্রে সাধ্বী বিধবাগণ লোকান্তরে স্বামীর সহগামী হইবার জন্য ঐকান্তিক আগ্রহ প্রকাশ করিয়াছেন, তাহাদেরই এই অগ্নি পরীক্ষা দিতে অনুমতি দেওয়া হইয়াছে। অর্থাৎ যদি তাঁহার হস্ত দুইখানি অগ্নিতে সমর্পন করিয়া দগ্ধ করিতে পারিতেন, তাহা হইলে তাঁহাদের ঐকান্তিক বাসনা পুরণে আর কোন বাধা হইত না” (বাণী ও রচনা, খণ্ড-৫, পৃষ্ঠা ৩২১)।
স্বামী বিবেকানন্দের ঐসব বক্তব্যের সত্যাসত্য বিচার করে পাঠকদের চিনে নিতে হবে তার হৃদয় ও চিন্তা-ভাবনার জগৎটাকে।
আমেরিকার ডেট্রয়েট শহরে এক বক্তৃতায় স্বামী বিবেকানন্দ বলেন, “হিন্দু বিধবা যখন মৃত পতির সহিত স্বেচ্ছায় অগ্নিতে প্রবেশ করিয়া মৃত্যুবরণ করিতেন, তখন ভূরিভোজন এবং সঙ্গীতাদিসহ একটি উৎসবের পরিবেশ সৃষ্টি হইত। মহিলা নিজে তাঁহার সর্বাপেক্ষা দামী বস্ত্র পরিতেন। তিনি বিশ্বাস করিতেন, স্বামীর সহিত সহমরণে তাঁহার নিজের এবং পরিবারবর্গের স্বর্গালোকে গতি হইবে। আত্মবলীদাত্রীরূপে তাঁহাকে সকলে পূজা করিত এবং তাঁহার নাম পরিবারের বিবরণীতে চিরদিন গৌরবান্বিত হইয়া থাকিত (বাণী ও রচনা, খণ্ড-১০, পৃ: ৩১)।
আমেরিকার ওয়েসলি হলে স্বামী বিবেকানন্দ বলেন, “ভারতে স্ত্রীজাতির অনুন্নত অবস্থার কারণ হিন্দুদের নারীর প্রতি অত্যধিক সম্মান। নারীকে ঘরের বাহিরে যাইতে না দেওয়াই ঐ সম্মান রক্ষার অনুকূল মনে করা হইত। নারী সর্বসাধারণের সংস্পর্শ হইতে দূরে গৃহাভ্যন্তরে শ্রদ্ধা ও পূজা লাভ করিতেন। স্বামীর সহিত চিতায় সহমরণ যাইতেন; কারণ পত্নী পতিকে এত ভালবাসিতেন যে, তাঁহাকে ছাড়িয়া বাঁচিয়া থাকা তাঁহার পক্ষে অসম্ভব ছিল। বিবাহে তাঁহারা এক হইয়াছিলেন, মৃত্যুতেও তাঁহাদের এক হওয়া চাই” (বাণী ও রচনা, খণ্ড-১০, পৃ: ১-২)।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন