আর্য, জাতিভেদ ইত্যাদি এবং স্বামী বিবেকানন্দ
স্বামী বিবেকানন্দের 'ভারতের ভবিষ্যত ' প্রবন্ধের অংশ এটা। পড়ুন এবং মতামত দিন ---
সমগ্র ভারত আর্যময়, এখানে অপর কোন জাতি নাই।....
আমাদের শাস্ত্রে এই সকল বিষয়ের কোন প্রমাণ আছে কিনা যদি অনুসন্ধান করা যায়, তবে দেখিতে পাইবে – আমাদের শাস্ত্রে এমন কোন বাক্য নাই যাহাতে আর্যদের ভারতের বাহিরে কোন স্থানের অধিবাসী মনে করা যাইতে পারে। আর আফগানিস্তান প্রাচীন ভারতের অন্তর্ভূক্ত ছিল। শূদ্রজাতি যে সকলেই অনার্য এবং তাহারা যে বহুসংখ্যক ছিল, এসব কথাও সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। সে সময়ে সামান্য কয়েকজন উপনিবেশকারি আর্যের পক্ষে শত সহস্র অনার্যের সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিয়া বাস করাই অসম্ভব হইত। উহারা ৫ মিনিটে আর্যদের চাটনির মত খাইয়া ফেলিত।
জাতিভেদের একমাত্র যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা মহাভারতেই পাওয়া যায়। মহাভারতে লিখিত আছে সত্যযুগের প্রারম্ভে একমাত্র ব্রাহ্মণজাতি ছিলেন। তাঁহারা বিভিন্ন বৃত্তি অবলম্বন করিয়া ক্রমশঃ বিভিন্ন জাতিতে বিভক্ত হইলেন। জাতিভেদ সমস্যার যতপ্রকার ব্যাখ্যা শুনা যায়, তন্মধ্যে ইহাই একমাত্র সত্য ও যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা। আগামী সত্যযুগে আবার ব্রাহ্মণেতর সকল জাতিই ব্রাহ্মণে পরিনত হইবেন।
সুতরাং ভারতের জাতিভেদ সমস্যার মীমাংসা এইরূপ দাঁড়াইতেছে: উচ্চবর্ণগুলিকে হীনতর করিতে হইবে না, ব্রাহ্মণ জাতিকে ধ্বংস করিতে হইবে না। ভারতে ব্রাহ্মণই মনুষ্যত্বের চরম আদর্শ – শঙ্করাচার্য তাহার গীতাভাষ্যের ভূমিকায় ইহা অতি সুন্দরভাবে প্রকাশ করিয়াছেন। শ্রীকৃষ্ণের অবতরণের কারণ বলিতে গিয়া তিনি বলিয়াছিলেন, শ্রীকৃষ্ণ ব্রাহ্মণত্ব রক্ষা করিবার জন্য অবতীর্ণ হইয়াছিলেন, ইহাই তাহার অবতরণের মহান উদ্দেশ্য। এই ব্রাহ্মণ, এই দিব্যমানব, ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ, এই আদর্শ ও পূর্ণমানবের প্রয়োজন আছে; তাঁহার লোপ হইলে চলিবে না। আধুনিক জাতিভেদ প্রথার যতই দোষ থাকুক, আমরা জানি ব্রাহ্মণজাতির পক্ষ হইয়া এটুকু বলিতেই হইবে যে, অন্যান্য জাতি অপেক্ষা তাহাদের মধ্যেই অধিকতর সংখ্যায় প্রকৃত ব্রাহ্মণত্ব সম্পন্ন মানুষের জন্ম হইয়াছে, ইহা সত্য। অন্যান্য জাতির নিকট ব্রাহ্মণদের এ গৌরবটুকু প্রাপ্য। যথেষ্ট সাহস অবলম্বন করিয়া আমাদিগকে তাঁহাদের দোষ দেখাইতে হইবে, কিন্তু যেটুকু প্রশংসা, যেটুকু গৌরব তাহাদের প্রাপ্য, সেটুকু তাহাদিগকে দিতে হইবে। প্রত্যেক ব্যক্তিকেই তাহার ন্যায্য প্রাপ্য দাও – - এই ইংরেজী প্রবাদবাক্যটি মনে রাখিও।...
অতএব বন্ধুগণ, বিভিন্ন জাতির মধ্যে বিবাদের প্রয়োজন নাই।... একচেটিয়া অধিকারের, একচেটিয়া দাবীর দিন চলিয়া গিয়াছে, ভারত হইতে চিরদিনের জন্য চলিয়া গিয়াছে, আর ইহা ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের অন্যতম সুফল। মুসলমান শাসনকালেও এই একচেটিয়া অধিকারলোপের যে সুফল ফলিয়াছে, সে জন্য আমরা উহাদের নিকট ঋণী। তাহাদের রাজত্বে যে সবই মন্দ ছিল, তাহা নহে। জগতের কোন জিনিষই সম্পূর্ণ মন্দ নহে, সম্পূর্ণ ভালও নহে। মুসলমানের ভারতাধিকার দরিদ্র পদদলিতদের উদ্ধারের কারণ হইয়াছিল। দারিদ্র ও অবহেলার জন্যই আমাদের এক পঞ্চমাংশ লোক মুসলমান হইয়া গিয়াছে। কেবল তরবারির বলে ইহা সাধিত হয় নাই। কেবল তরবারি ও শক্তির বলে ইহা সাধিত হইয়াছিল - একথা মনে করা নিতান্ত পাগলামী।
আর তোমরা যদি সাবধান না হও, তবে মাদ্রাজের এক পঞ্চমাংশ, এমনকি অর্ধেক লোক খ্ৰীষ্টান হইয়া যাইবে। মালাবার দেশে আমি যাহা দেখিয়াছি, তাহা অপেক্ষা অধিকতর মুর্খতা জগতে আর কিছু কি থাকিতে পারে? পারিয়া বেচারাকে উচ্চবর্ণের সঙ্গে এক রাস্তায় চলিতে দেওয়া হয় না, কিন্তু যে মুহূর্তে সে খ্রীস্টান হইয়া পূর্ব নাম লইয়া বা মুসলমান হইয়া মুসলমানী নাম লইল, আর কোন গোল নাই, সব ঠিক। এইরূপ দেখিয়া ইহাছাড়া আর কি সিদ্ধান্ত করিতে পারা যায় যে, মালাবারবাসীরা সব পাগল, তাহাদের গৃহগুলি এক একটি উন্মাদ আশ্রম....।
নিজেদেরই সন্তানগণ অনাহারে মরিতেছে – আর যে মুহূর্তে তাহারা অন্যধর্ম গ্রহণ করিল, অমনি তাহারা পেট পুরিয়া খাইতে পায়। বিভিন্ন জাতির ভিতর দ্বেষ-দ্বন্দ্ব আর থাকা উচিত নয়। উচ্চতর বর্ণকে নীচে নামাইয়া এ সমস্যার মীমাংশা হইবে না। নিম্নজাতিকে উন্নত করিতে হইবে।...
একদিকে ব্রাহ্মণ, অপরদিকে চণ্ডাল; চণ্ডালকে ক্রমশঃ ব্রাহ্মণত্বে উন্নীত করাই তাহাদের (যাদের মস্তিষ্ক ও ধারণাশক্তি আছে) কার্যপ্রণালী। যেগুলি অপেক্ষাকৃত আধুনিক শাস্ত্র, সেগুলিতে দেখিবে নিন্মতর জাতিদের ক্রমশঃ উচ্চাধিকার দেওয়া হইতেছে।
এমন শাস্ত্রও আছে, যাহাতে এইরূপ কঠোর বাক্য বলা হইয়াছে যে, যদি শূদ্র বেদ শ্রবণ করে তাহার কর্ণে তপ্ত সীসা ঢালিয়া দিতে হইবে। যদি তাহার বেদ কিছু স্মরণ থাকে তবে তাহাকে কাটিয়া ফেলিতে হইবে। যদি সে ব্রাহ্মণকে ওহে ব্রাহ্মণ বলিয়া সম্বোধন করে, তবে তাহার জিহ্বা ছেদন করিতে হইবে। ইহা প্রাচীন আসুরিক বর্বরতা সন্দেহ নাই, আর ইহা বলাও বাহুল্যমাত্র।
কিন্তু ইহাতে ব্যবস্থাপকগণের কোন দোষ দেওয়া যায় না, কারণ তাহারা সমাজের অংশ বিশেষের প্রথাবিশেষ লিপিবদ্ধ করিয়াছেন মাত্র । এই প্রাচীনদের ভিতর কখনো কখনো অসুর প্রকৃতি লোকের জন্ম হইয়াছিল। সকল যুগে সর্বত্রই অল্পবিস্তর অসুরপ্রকৃতির লোক ছিল।
পরবর্তী স্মৃতি সমূহে আবার দেখিবে শূদ্রের প্রতি ব্যবস্থার কঠোরতা কিছু কমিয়াছে। শূদ্রগণের প্রতি নিষ্ঠুর ব্যবহারের প্রয়োজন নাই, কিন্তু তাহাদিগকে বেদাদি শিক্ষা দিবে না।
ক্রমশ আমরা আরও আধুনিক বিশেষত যে গুলি এই যুগের জন্য বিশেষভাবে উপদিষ্ট – সেই সকল স্মৃতিতে দেখিতে পাই ‘যদি শূদ্রগণ ব্রাহ্মণের আচার-ব্যবহার অনুকরণ করে, তাহারা ভালই করিয়া থাকে, তাহাদিগকে উৎসাহ দেওয়া উচিত।'
এখনও যে সহস্ৰ সহস্ৰ জাতি রহিয়াছে, তাহাদের মধ্যে কতকগুলি আবার ব্রাহ্মণ জাতিতে উন্নীত হইতেছে। কারণ জাতি বিশেষ যদি নিজদিগকে ব্রাহ্মণ বলিয়া ঘোষণা করে, তাহাতে কে কী বলিবে? জাতিভেদ যতই কঠোর হউক, উহা এইরূপেই সৃষ্ট-হইয়াছে। মনে কর, কতকগুলি জাতি আছে প্রত্যেক জাতিতে ১০,০০০ লোক, উহারা যদি সকলে মিলিয়া নিজেদের ব্রাহ্মণ বলিয়া ঘোষণা করে, তবে কেহই তাহাদিগকে বাধা দিতে পারে না। আমি নিজে জীবনে ইহা দেখিয়াছি।.....
শঙ্করাচার্য প্রভৃতি যুগাচার্যগণ জাতি গঠনকারি ছিলেন। ... ভারত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হইতে আমি ইহার সন্ধান পাইয়াছি। আর আমি ঐ গবেষণায় অদ্ভুত ফললাভ করিয়াছি সময়ে সময়ে তাহারা দলকে দল বেলুচি লইয়া এক মুহূর্তে তাহাদিগকে ক্ষত্রিয় করিয়া ফেলিতেন, দলকে দল জেলে লইয়া এক মুহূর্তে ব্রাহ্মণ করিয়া ফেলিতেন। তাঁহারা সকলেই মুণি ঋষি ছিলেন আমাদিগকে তাহাদের কার্যকলাপ ভক্তিশ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখিতে হইবে। তোমাদিগকে মুণিঋষি হইতে হইবে। ইহাই কৃতকার্য হইবার গোপন রহস্য"
(যদি বন্ধুরা আগ্রহ দেখান তাহলে চলবে....)
275
২৭৩
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন