বর্ন কীভাবে বংশানুক্রমিক হল?
একটা বিতর্ক প্রায়ই হয়। তাহলো--- হিন্দুধর্মের বর্ণ বিভাজন নাকি প্রথমে গুণ ও কর্ম ভেদে হয়, পরে তা জন্মভিত্তিক হয়। এই প্রশ্নে আম্বেদকর কিছু কথা লিখেছেন, তাহলো :--
বেদে কিছু কথা আছে ঠিকই, তবে নির্দিষ্টভাবে মনুস্মৃতিতে জাত-বর্ণ সৃষ্টির কথা বলা হয়। সময়কাল ১৭০ - ১৫০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ। এই সময়ে মনুসংহিতা নামের এই শাস্ত্র বা আইন গ্রন্থ লেখেন সুমতি ভার্গব নামে একজন ব্রাহ্মণ।
প্রাচীন ইতিহাসে মনু একজন মর্যাদাপূর্ণ চরিত্র ছিলেন। তাই মনুসংহিতার লেখক হিসাবে তার নাম ব্যবহার করা হয়, যাতে এই শাস্ত্রের নির্দেশসমূহ জনপ্রিয় ও গ্রাহ্য হয়। আরো বলা হয় যে, এই শাস্ত্রের বিষয়সমূহ হলো আসলে দৈব বানী। এটা ছিল ব্যাকডেট দেবার কৌশল।
পৃথিবীতে প্রথম ব্রাহ্মণ রাজা হলেন পুষ্যমিত্র শূঙগো ও তাদের বংশ। তিনি মৌর্য সম্রাটকে খুন করে সিংহাসন দখল করেন। এটা খ্রিস্টপূর্ব ১৮৫ সময়কালের ঘটনা।
এই রাজহত্যার কাজকে সে সময়ের মানুষেরা মেনে নিতে চান নি। কারণ তা আর্য ও অনার্য উভয় আইন বিরুদ্ধ ছিল। আর্য আইনে ছিল -- ১) রাজত্বের অধিকার একমাত্র ক্ষত্রিয়ের। ব্রাহ্মণ রাজা হতে পারেন না। ২) কোনো ব্রাহ্মণ অস্ত্র ধারণের পেশা গ্রহণ করতে পারবেন না। ৩) রাজার কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা পাপ ইত্যাদি।— পুষ্যমিত্র এইসব আইন লঙ্ঘন করায় সাধারণ মানুষ তা মেনে নিতে চাইছিলেন না। এজন্য আইন সংশোধন করার প্রয়োজন পড়ে এবং মনুসংহিতার সৃষ্টি করা হয়। ব্রাহ্মণদের উদ্যোগে তা করা হয়, তাই এই আইন ও নীতি হলো ব্রাহ্মণ্যবাদ।
আগের আইন পাল্টে বলা হয় — ১) ব্রাহ্মণ সেনাপতি হতে পারবে ও সম্রাট হতে পারবে। ২) ব্রাহ্মণের কর্তৃত্বের বিরোধিতা করলে যে কোনো প্রজাকে হত্যা করা যাবে। ৩) ব্রাহ্মণের বিদ্রোহ ও রাজ হত্যার অধিকার থাকবে।
ব্রাহ্মণের একচেটিয়া অধিকার থাকবে শিক্ষাদান, শিক্ষা গ্রহণ এবং অধ্যয়নের ক্ষেত্রে ; আর যজ্ঞ, ভিক্ষাদান ও ভিক্ষা গ্রহণে। ব্রাহ্মণ সব জাতি-বর্ণের অধিশ্বর। বিচারপতি অবশ্যই ব্রাহ্মণ হবেন। অতীত সম্পদের খোঁজ পেলে তার সবটাতে ব্রাহ্মণের অধিকার। রাজা মাটিতে লুকানো সম্পদ পেলে তার অর্ধেক পাবেন ব্রাহ্মণ, বাকিটা যাবে কোষাগারে। ব্রাহ্মণের কোনো সম্পত্তি রাজা অধিগ্রহণ করতে পারবেন না ইত্যাদি।
ব্রাহ্মণের জন্য বিশেষ ছাড় -- ব্রাহ্মণের উপর কর ধার্য করা যাবে না। ব্রাহ্মণকে হত্যা করা যাবে না। অপরাধ করলে একই অপরাধে অন্যের যেখানে মৃত্যুদণ্ড, ব্রাহ্মণের শাস্তি হবে মাত্র মস্তক মুন্ডন। মোটামুটি ব্রাহ্মণদের ফৌজদারি আইনের বাইরে রাখা হয়। ব্রাহ্মণ জঘন্য অপরাধ করলে তার নির্বাসনের ব্যবস্থাও রাখা হয়। তবে বিদেশি হবসের ভাষায় যা আসলে হাওয়া পরিবর্তন--- এরকম বহু নির্দেশ ।
জাত-বর্ণ ব্যবস্থার শুরু ব্রাহ্মণ রাজত্বের শুরু থেকে। তার আগে ভারতে বা মগধ সাম্রাজ্যে তিনটি বংশের রাজত্ব ছিল -- প্রথম নাগবংশ, শিশুনাগ এর প্রতিষ্ঠাতা। এটাই হলো ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের শুরু (খ্রীষ্টপূর্ব ৬৪২), নাগবংশ অনার্য ছিল। নাগবংশের পর নন্দবংশ, তারপর চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। মৌর্যরা নাগদেরই আত্মীয় ছিলেন, তারাও অনার্য।--- এরপর পুষ্যমিত্র, প্রথম ব্রাহ্মণ রাজা। তাদের আমলে মনুসংহিতা শাস্ত্রের সৃষ্টি এবং বংশানুক্রমিক জাত-বর্ণ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে যায়।
বৈদিক যুগের শেষ দিক থেকে এক ধরণের বর্ণ বিভাগ আর্য-অনার্য সমাজে ছিল। কিন্তু মনে হয় তাতে তেমন কোনো কঠোরতা ছিল না। শুরুতে সেটা পেশা দিয়ে নির্ধারিত হতো। তবে সে সময়ে আজকের মত কোন আনুষ্ঠানিক ধর্মের অস্তিত্ব ছিল না। সনাতন ধর্ম বা হিন্দু ধর্ম--- এইসব নামের অস্তিত্ব ছিল না।
যজ্ঞ, পশুবলি --- এসবের প্রচলন ছিল এবং এসব ছিল কিছু মানুষের অর্থাৎ ব্রাহ্মণদের বা পুরোহিতদের জীবন ধারণের উপায়। এসব কাজের ভিতর দিয়ে ব্রাহ্মণরা বেঁচে থাকতেন এবং আয়ের পথ ও মর্যাদা নিশ্চিত করেছিলেন। আর এইসব সুবিধা দীর্ঘায়িত করার জন্য নানা ফন্দি ফিকির করতেন। হতে পারে সেই সময়ে ব্রাহ্মণরাও ভাবতেন যে, যজ্ঞ, বলিদানে কিছু উপকার হয়। বৌদ্ধরা অর্থাৎ মৌর্যরা পশুবলি বন্ধ করে দেন। বামুনদের দশা খুব খারাপ হয়। ওরা বুঝতে পারেন যে, রাজা হওয়া দরকার এবং ষড়যন্ত্র করে রাজা হন তারা।
ব্রাহ্মণরা রাজা হয়ে বর্ণ প্রথাকে ধীরে ধীরে জাত প্রথায় রূপান্তরিত করেন। কিন্তু কীভাবে? --- তিনটি পর্যায়ে এই কাজ সাধিত হয়। প্রথম পর্বে বর্ণের স্থায়িত্ব অর্থাৎ ব্যক্তির পেশা ও মর্যাদা একটা সীমিত সময়ের জন্য ঠিক করা হতো। দ্বিতীয় পর্বে কারুর বর্ণ, পেশা ও মর্যাদা তাঁর জীবনকাল পর্যন্ত সীমিত ছিল। তৃতীয় পর্বে এসে কারুর পেশা, সম্পত্তি, মর্যাদা প্রভৃতি উত্তরাধিকার ভিত্তিক হয় অর্থাৎ বর্ণ এখানে জাতিতে অধঃপতিত হয়। এই অধঃপতন হলো এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, ত্রুটিপূর্ণ বর্ণাশ্রম প্রথার এই পরিণতি অনিবার্য ছিল। এইসব পর্বগুলি অতিক্রম করতে খুব বেশি সময় লাগেনি।
ব্রাহ্মণ শাসনে শুরুতে কোনো ব্যক্তির বর্ণ নির্ধারণ করতেন মনু এবং সপ্তর্ষি নামে একদল কর্মকর্তা। সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তারা চার বর্ণে সবাইকে ভাগ করে দিতেন এবং এই নির্বাচন হতো এক যুগ বা চার বছরের জন্য। তারপর আবার পর্যালোচনা করে নুতন তালিকা হতো, তাতে বর্ণের মধ্যে ওঠানামা হতো। এই সময় প্রাপ্ত বয়স্কদের বর্ণ নির্ধারণ হতো। এতে কোনো পূর্ব প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না। বিষয়টা খানিকটা এলোমেলো ধরনের ছিল।
কিছুকাল পরে এই ব্যবস্থা পাল্টে গুরুকুল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। শৈশবে গুরু বা আচার্য্যর কাছে শিক্ষা শেষে গুরু তার বর্ণ নির্ধারণ করতেন এবং সেমত কাজে নিয়োগ করার রীতি প্রচলিত হয়। স্বাভাবিকভাবেই বলা যায় এই পদ্ধতি তুলনামূলক ভালো ব্যবস্থা ছিলো। এরফলে বর্ণ জীবনকালব্যাপি ছিল ; কিন্তু উত্তরাধিকারমূলক বা বংশানুক্রমিক ছিল না।
আদি ব্রাহ্মণরা এই ব্যবস্থায় খুশি ছিলেন না। তাই মনু এই ব্যবস্থায় তিনটি পরিবর্তন আনেন। প্রথমত শিক্ষান্তে বর্ণ নির্ধারণ প্রথা রদ করা হয়। দ্বিতীয়ত উপনয়নকে ভগবানের অনুগ্রহলাভের অনুষ্ঠান বলা হয়। তৃতীয়ত উপনয়নের পর গুরুর কাছে শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। ঠিক হয় আচার্যের কাছে নয়, উপনয়ন হবে বাড়িতে পিতার কাছে। অর্থাৎ এহলো বর্ণ নির্ধারণের পর শিক্ষা। --- এভাবে বর্ণ বংশানুক্রমিক করা হলো বা বর্ণ রূপান্তরিত হলো জাতে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন