মায়াবতী আপনি কে, কাদের জন্য?
মায়াবতী
আপনি কে, কাদের জন্য ?
সূচি —
কিছু বাঁকা কথা
গণতন্ত্রই দলিতদের একমাত্র অস্ত্র
মায়াবতী বিরোধিতায় নমঃশূদ্রদের তফসিলী করা হলো না।
আয়নায় নিজের মুখটা দেখুন
বুধবারের চিঠি
প্রেস বিবৃতি
© শ্রীমতী বিশাখা বিশ্বাস
প্রকাশক : রিপাবলিকান বার্তা প্রকাশনী।
প্রথম প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০০
প্রচ্ছদ : সুমন বিশ্বাস
শুভেচ্ছা মূল্য : ১০ টাকা
—------------------------------------------------------
ভূমিকা
শুনুন দু'টো কথা!
উত্তরপ্রদেশে মায়াবতীর নির্বাচনী সাফল্য এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে যে, ও নিয়ে কোন কথা চলে না! কথা বলা মানেই, তুমি দলিত বিরোধি—এমন একটা ভাব!
এমন হওয়াটা যে একেবারেই অস্বাভাবিক তা বলবো না। বহু শত বছরের রাজনৈতিক ক্ষমতার ক্ষুধা দলিতদের ঐ জায়গায় নিয়ে গেছে। তাই, মানুষ বিচার বিশ্লেষণ করার কথা ভুলে যাচ্ছেন।
কিন্তু পরিকল্পনা, প্রস্তুতি ও বিচার বিশ্লেষণ ছাড়াতো বেশিদূর এগোনো যাবে না। মুখ থুবড়ে পড়তে হবে। সারাদেশ জুড়ে লক্ষ লক্ষ দলিত কর্মিরা ঘাম-রক্ত দিয়ে তিল তিল করে দলিত উত্থানের যে সম্ভাবনা তৈরি করেছেন, তা অন্ধগলিতে পথ হারিয়ে ফেলবে।
প্রতিকূল অবস্থা জেনেও, শুভানুধ্যায়িদের পরামর্শ উপেক্ষা করে মতাদর্শগত সংগ্রামটা চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তারই ফলাফল হিসাবে একটি নিবন্ধ, বিভিন্ন পত্রিকার উদ্দেশ্যে লেখা তিনটি চিঠি, একটি লিফলেট ও তিনটি প্রেস বিবৃতি এক জায়গায় করে পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেবার চেষ্টা হলো এই ছোট্ট পুস্তিকা।
আমি যা বলছি, বিচার বিশ্লেষণ করেছি, তাই ঠিক—এ দাবি আমি করছি না। বিষয়গুলি দেখার, বিশ্লেষণ করার ও বোঝার জন্য কোন নতুন দৃষ্টি ও সূত্রের সন্ধান যদি এই লেখাগুলি পাঠকদের দিতে পারে, তাহলেই তা যথেষ্ট বলে ভাববো।
সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস
লেখক
—-----------------------------------------------------
'দলিত সমন্বয় সমিতি' নিবেদিত
দলিত উন্নয়ণে ঐক্য-ভাবনা বিষয়ে ওয়ার্কশপ-২০০৭ তারিখ : ২৩/০৯/০৭, সম্পর্কে
কিছু বাঁকা কথা
সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস
'দলিত সমন্বয় সমিতির' সাধারণ সম্পাদক শ্রদ্ধেয় নীতীশ বিশ্বাস কর্তৃক প্রচারিত প্রচারপত্রটির কিছু কথা ও ভাবনাকে আশ্রয় করে আমার এই নিবন্ধ। আমার লেখার সাথে অনেকেই একমত হবেন না, একথা আমি জানি। অনেকে ক্ষুব্ধও হতে পারেন। তা হোন। তবুও আশা করবো যে, লেখাটা অন্ততঃ পড়বেন এবং আবেগ পরিহার করে যুক্তিকে আশ্রয় করে বিচার বিশ্লেষণ করবেন।
প্রচারপত্রটিতে সংক্ষিপ্ত পরিসরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উল্লেখ আছে। তার সবদিক নিয়ে এখানে আলোচনা করছি না। আমি এখানে মাত্র দু'টি বাক্য নিয়ে কিছু আলোচনা করতে চাই। প্রথম বাক্যটি হলো— "যখন সাম্যবাদী দলসমূহও তাদের শ্রেণী-সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবে বর্ণসংগ্রাম বা সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণের ঘোষণাপত্র প্রকাশ করছে।” দ্বিতীয় বাক্যটি—“যারা এতদিন ‘দলিতই দলিতের মুক্তিদাতা' একথা ভাবতেন, তাদের যেমন আত্মপ্রশ্নের সম্মুখীন করেছে....।”
এখানে দলিত উন্নয়ণ, দলিত ঐক্য, এসব শব্দগুলির ব্যবহার যখন হচ্ছে, তখন ধরে নেওয়া যেতে পারে ড. আম্বেদকরের মতাদর্শ এই আন্দোলনের দিক্দর্শন। তাই, ড. আম্বেদকরের চিন্তা-চেতনার আলোকে বর্তমান ভারতের দলিত-আন্দোলনের বাঁক-মোড়কে সঠিক-বেঠিক হিসাবে চিহ্নিত করতে কারুর আপত্তি থাকার কথা নয়।
আম্বেদকরবাদ কোন ‘ডগ্ম্যা' বা যুক্তিহীন বদ্ধমূল ধারনা নয়। তা হলো এক সৃজনশীল মতবাদ। সময়ের সাথে নানা পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে ড. আম্বেদকরের চিন্তা-চেতনার প্রয়োগ কৌশল ভিন্নতর হতেই পারে; কিন্তু তার মৌলিক উদ্ভাবনগুলি তাতে নস্যাৎ হয়ে যায় না। ভারতীয় সমাজে হিন্দুধর্ম ও ঐ ধর্মের অভ্যন্তরে ব্রাহ্মণ, অব্রাহ্মণ এবং অস্পৃশ্যদের মধ্যকার দ্বন্দ্বসংঘাত ও সংগ্রামের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের যে বিচার-বিশ্লেষণ তিনি করেছেন, তা তাঁর এক অনন্য সৃষ্টি। ব্রাহ্মণের একাধিপত্য নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এই দ্বন্দ্বের সমাধান হবে না। ফলে, এই সংগ্রাম চলতেই থাকবে।
কার্ল মার্কস শোষক ও শোষিত শ্রেণীকে চিহ্নিত করেন। শ্রেণী ঐক্য ও শ্রেণী সংগ্রামের তত্ত্ব তার এক ঐতিহাসিক মৌলিক অবদান। পৃথিবীতে যতদিন শ্রেণী থাকবে, শ্রেণীসংগ্রাম চলবে; চলতেই থাকবে। সচেতন ও সংঘবদ্ধভাবে তা হতে পারে; আবার সচেতনভাবে নাও হতে পারে। শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আগে যেকোন পর্যায়কালেই শোষকরা কখনওই শোষিতের বন্ধু হতে পারে না। যদি কেউ শোষক-শোষিতের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার তত্ত্ব ফেরি করেন, তিনি নিশ্চিতভাবেই শোষকের দূত, অন্যকিছু নন।
কার্লমার্কস শ্রেণী ঐক্যের কথা বললেন। শ্রমিকশ্রেণীর পার্টির অপরিহার্যতার কথা বললেন। 'ডিক্লাস' বলে একটি শব্দ মার্কসবাদী মহলে প্রচলিত আছে। মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, এমনকি বুর্জোয়া-জমিদার পরিবারের সদস্য চিন্তা-চেতনা ও কাজের উৎকর্ষতা ঘটিয়ে মেহনতী মানুষের সংগ্রামের সাথী হতে পারেন। কিন্তু শ্রেণী হিসাবে বুর্জোয়া-জমিদারশ্রেণী কখনওই গরিব, মেহনতী মানুষের বন্ধু হতে পারে না।
১৯২৪ সালের ২০শে জুলাই ড. আম্বেদকর 'বহিষ্কৃত হিতকারিণী সভা' নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এক বছর কাজের পর সংস্থার প্রথম বার্ষিক বিবরণীতে তিনি লেখেন, “কোন সংস্থা কাংখিত ফল আহরণ করতে পারে না, যদি না একই রকম সমস্যার মধ্যে সমাজের যেসব মানুষেরা আছেন, তাদের মধ্য থেকে সমর্থক ও কর্মি বের করে আনা যায়। ... সংস্থা যে বিশাল কর্মসূচী ইতিমধ্যে শেষ করেছে, তা সফল হতো না, যদি বর্ণহিন্দু মানুষের সমর্থন ও সহযোগিতা না পাওয়া যেত। বর্ণহিন্দুদের দেওয়া সহযোগিতা নিতে অস্বীকার করা আত্মহত্যার সামিল।”
ড. আম্বেদকর বর্ণহিন্দুদের সহযোগিতা অস্বীকার করেন নি এবং অস্বীকার করতে বলেন নি। কোন একটি রাজনৈতিক দল ব্রাহ্মণ-দলিত ঐক্যের রসায়ন ঘটিয়ে উত্তর প্রদেশে ভোটের লড়াইয়ে যে সাফল্য পেয়েছে, তারা ড. আম্বেদকরের এইসব উক্তি ‘কোট’ করে নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধাবাদের সাফাই গাইছেন। 'দলিত সমন্বয় সমিতি'ও এই জাতীয় সমন্বয়-সহযোগিতাকে সমর্থনই করছেন। আমি এ প্রসঙ্গে ড. আম্বেদকরের অন্য আরেকটি কথা স্মরণ করে দিতে চাই। তাহলো— “একজন উচ্চবর্ণ হিন্দু, তিনি অস্পৃশ্যদের উন্নতির জন্য যত কঠোর পরিশ্রমই করুন না কেন, তিনি কখনওই একজন অস্পৃশ্যের মনের যন্ত্রণার গভীরতা উপলব্ধি করতে পারেন না।” –সেজন্য মৌলিকভাবে কোন বর্ণহিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত অস্পৃশ্য উদ্ধারকারি সংস্থা-সংগঠনের বিরোধিতা করতেন ড. আম্বেদকর।
সামাজিক সমস্যা সম্পর্কে ড. আম্বেদকরের উপলব্ধি ও মূল্যায়ণ হলো— “বর্ণব্যবস্থার মধ্যে লুকিয়ে আছে বর্ণহিন্দুদের কায়েমী স্বার্থ, হাজার বছর ধরে চলমান তথাকথিত শ্রেষ্ঠত্বের সম্মানের গ্যারান্টি। এ জিনিষ তারা স্বেচ্ছায় ছাড়তে পারেন না।” –তাই, ডাক দিলেন নিজেদের পায়ের উপর দাঁড়াতে। নিজেদের চেষ্টায় ও আত্মবিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে, আপন অধিকার ছিনিয়ে নিতে। তিনি বললেন, “সেপ্ হেল্প—সেপ্ হেল্প ইজ দ্য বেস্ট হেল্প।”
১৯১৮ সালের মার্চ মাসে বম্বে শহরে 'ডিপ্রেসড্ ক্লাসেস মিশনের' একটি সর্বভারতীয় সম্মেলন হয়। দেশের সব বড় বড় নেতারা ঐ সম্মেলনে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে ‘সর্বভারতীয় অস্পৃশ্যতা বিরোধি ম্যানিফেস্টো' নামে একটা ঘোষণাপত্র তৈরি হয়। ব্যক্তিজীবনে অস্পৃশ্যতা অনুশীলন করবেন না বলে ঘোষণা করার কথা তাতে লেখা ছিল। ঐ সভায় বক্তৃতায় বালগঙ্গাধর তিলক বলেছিলেন, “যদি ভগবান অস্পৃশ্যতাকে বরদাস্ত করে, তাহলে আমি তাকে আদৌ ভগবান বলে স্বীকৃতি দিই না। আমি স্বীকার করি—ভগবান নয়, ব্রাহ্মণরাই এই অস্পৃশ্য প্রথা সৃষ্টি করেছিল। অস্পৃশ্যতা এক জঘন্য সামাজিক ব্যাধি এবং সুস্থ্য সমাজ গঠনের প্রয়োজনেই এই প্রথাকে উচ্ছেদ করতে হবে।”
মজার ব্যাপার হলো, এত বাগাড়ম্বরের পরেও তিলক ঐ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেন। কারণ হিসাবে বলেন, সমর্থক বা সমাজের চাপের ফলে তিনি স্বাক্ষর করতে অপারগ। —ব্রাহ্মণ বা উচ্চবর্ণীয় সমাজ মানসিকতার কোন মৌলিক পরিবর্তন আজও হয়েছে কিনা বা এমনকি সাম্যবাদী দলগুলিও উচ্চবর্গীয় সমাজের চাপ ঠেলে বেরিয়ে আসার জায়গায় আছে কি না— বিচার্য সেটাই।
১৮৮৬ সালে কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে অস্পৃশ্যতা দূর করার ব্যাপারে এক প্রস্তাবের বিরোধিতা করে সভাপতি বলেন, “কংগ্রেস রাজনৈতিক দল, সমাজ সংস্কার করা তাদের কাজ নয়।” ১৮৮৭ সালে মাদ্রাজ অধিবেশনে অস্পৃশ্যতার প্রশ্নটি আবার ওঠে। সভাপতি জবাবি ভাষণে বলেন, “কংগ্রেস সমস্ত ধর্ম ও সম্প্রদায়ের পার্টি। ঐসব সমাজ সংস্কারের কাজ কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের।” ১৮৯২ সালে কংগ্রেসের এলাহাবাদ অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “আমাদের কিছু কিছু বন্ধু সমাজ সংস্কারের প্রশ্নটি তুলে আমাদের মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বানচাল করে দিতে চায়।"
১৮৯৫ সালে কংগ্রেসের পুণা অধিবেশনের সভাপতি সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় অস্পৃশ্যতার প্রশ্নে বলেন, “উকিলরা কেন ডাক্তারি করছেন না— এ প্রশ্ন কেউ তুলতেই পারেন। তাতে উকিল নিশ্চয়ই ডাক্তারি করতে ছুটবেন না। আমাদের এটা রাজনৈতিক দল, আমাদের কাজ সমাজ সংস্কার নয়।” —বলাই বাহুল্য, এইসব সিদ্ধান্ত বিপুল করতালির মধ্যে পাশ হয়ে যায়।
এরপর ২২ বছর পার হয়ে যায়। আর কেউ কংগ্রেস অধিবেশনে অস্পৃশ্যতার প্রশ্ন তোলেন নি। ১৯১৭ সালে কলকাতা কংগ্রেসে বিষয়টি আবার উত্থাপিত হয়। তখন কংগ্রেস সভানেত্রী ছিলেন এ্যানি বেশান্ত। তিনি অস্পৃশ্যতা দূর করার প্রয়োজনীয়তা, ন্যায়পরায়ণতা ও যৌক্তিকতা বোঝার জন্য দেশবাসীকে আবেদন জানান।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—কংগ্রেসের এই মত পরিবর্তন কি দলের উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ, না অন্যকোন উদ্দেশ্য সাধনের তাগিদ? —এই সত্য অনুমান করতে এ্যানি বেশান্তের লেখা একটি নিবন্ধের দিকে নজর দিতে হবে। নিবন্ধের নাম 'The uplift of the Depressed Classes। তিনি লিখেছেন, “অস্পৃশ্য ছাত্রদের মেধা একেবারেই নিম্নস্তরের। তাদের উচ্চবর্ণের ছাত্রদের সাথে একসঙ্গে পড়াশুনার ব্যবস্থা করার অর্থ উচ্চবর্ণের ছাত্রদের নীচুতে টেনে নামানো। এছাড়া, অস্পৃশ্য সমাজের মানুষেরা আজেবাজে খাবার খায়। ফলে, তাদের গায়ে উৎকট গন্ধ এবং তারা নানা দুরারোগ্য সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত, যা সংক্রামিত হতে পারে।” –এই বেশান্তের নেতৃত্বে কংগ্রেস অস্পৃশ্যতা দূর করার কাজে ঝাঁপ দিতে চায়! এটা কি বিশ্বাসযোগ্য!
যাহোক, এরপর ঢাক ঢোল পিটিয়ে কংগ্রেস অস্পৃশ্যতা দূরীকরণের ঘোষণা করে এবং অস্পৃশ্যদের নিজেদের দিকে টেনে নিতে অনেকটাই সমর্থ হয়। কংগ্রেস পার্টি এই কাজের জন্য ৫ লক্ষ টাকার কর্মসূচী ঘোষণা করে। সাব কমিটি গঠন করে এবং শেষ পর্যন্ত প্রস্তুতি মিটিং ও তার চা খরচ বাবদ মাত্র ৫০০ টাকা খরচের মধ্য দিয়ে মহাযজ্ঞের সমাধি রচিত হয়।
কিন্তু হঠাৎ কংগ্রেসের এই বাগাড়ম্বের প্রয়োজন হলো কেন? —কারণ অস্পৃশ্যরা তাদের নিজস্ব পরিচয়ে ও নেতৃত্বে রাজনৈতিক রণাঙ্গনে জায়গা করে নেবার চেষ্টা শুরু করেছিলেন।
১৯১৭ সালের ২০শে আগষ্ট ভারত বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সচিব মন্টেগ ব্রিটিশের অধীনে ভারতে একটি দায়িত্বশীল সরকার গঠনের কথা ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ঘোষণা করেন। মন্টেগ ভারতে আসেন। মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির অস্পৃশ্যদের সংগঠন 'পুঞ্চমা কলভী অভিভারতী অভিমনা সংঘ' ; আদিবাসী সংগঠন 'দি মাদ্রাজ আদি দ্রাবিড় জনসংঘ' এবং বাঙলার অস্পৃশ্যদের একটি সংগঠন (নাম জানা না গেলেও অনুমান গুরুচাঁদ ঠাকুরের অনুগামী ভীষ্মদেব দাস স্বাক্ষরিত স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়। সম্ভবত এই স্মারকলিপির স্বাক্ষরকারি হবার সুবাদেই ভীষ্মদেব দাস ১৯১৯ সালে অস্পৃশ্যদের মধ্যে সর্বপ্রথম এম এল সি মনোনীত হন) মন্টেগের সাথে দেখা করেন ও স্মারকলিপি দেন। তারা যেকোন ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিরোধিতা করে ব্রাহ্মণদের ঘৃণা ও অত্যাচার থেকে তাদের মুক্ত করতে আবেদন জানান। তারা অস্পৃশ্যদের প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষমতা অস্পৃশ্যদের হাতে ছেড়ে দেবার জন্য দাবি করেন। ঠিক এর আগে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে পূর্বভারতে কংগ্রেসকে অস্বীকার করে গুরুচাঁদের নেতৃত্বে দলিত মুসলমানরা একজোট হবার প্রক্রিয়া শুরু করেন (১৯০৫-১৯১১)। এই সময়ে মুসলিম লীগও মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। এসবের জন্য উচ্চবর্ণ হিন্দু সমাজ প্রমাদ গুণতে শুরু করে। এরপর ১৯১৯ সালে 'সাউথ বরো’ কমিটি ভারতে আসে। ড. আম্বেদকর তাদের সাথে দেখা করেন এবং অস্পৃশ্যদের সমস্যা ও দাবি দাওয়া তুলে ধরেন। অতঃপর ১৯১৯ সালে ভারত শাসন আইন' ঘোষিত হয়—যেখানে সরকারিভাবে অস্পৃশ্যদের আলাদা অস্তিত্ব স্বীকার করে নেওয়া হয়।
এইসব পরিপ্রেক্ষিত মাথায় রেখে অস্পৃশ্যদের প্রতি কংগ্রেসের নীতি পরিবর্তনের কারণ ও উদ্দেশ্যের বিচার, বিশ্লেষণ করতে হবে। এসব ঘটনার মধ্যে স্পষ্ট যে, অস্পৃশ্যদের প্রতি মানবিকতার দৃষ্টি থেকে কংগ্রেস তাদের নীতির এই পরিবর্তন করে নি; বরং এমনকি অস্পৃশ্যরা নিজেরাও নিজেদের উন্নত করার কোন সুযোগ যাতে না পায়, সে জন্যই এই জঘন্য ষড়যন্ত্র! অতীতের ন্যায় ভবিষ্যতেও যাতে ব্রাহ্মণরা অস্পৃশ্যদের পদানত করে রাখতে সমর্থ হয় কংগ্রেসের ঐ সিদ্ধান্ত ছিল সেজন্যই।
দেশের সাম্যবাদী দলগুলির বয়সও খুব কম নয়। ঐসব দলের অধিকাংশ নেতা আজ বৃদ্ধ না হলেও তার কাছাকাছি। নেতৃত্ব বদলের ফলে সাম্যবাদী দলগুলির তফসিলীদের প্রতি নীতির পরিবর্তন ঘটেছে— এক্ষেত্রে সে কথাও বলা যায় না। ঐসব দল ও তার নেতৃত্বের দেশকে নতুন কিছু দেবার সাধ ও সাধ্য কোনটাই নেই। বর্ণবাদী ও বড়লোকদের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলির মত এইসব সাম্যবাদী দলগুলিও শতাব্দীকাল ধরে উচ্চবর্ণ-শ্রেণী স্বার্থকেই সেবা করেছে এবং দলিতবর্গের মানুষকে প্রতারিত করেছে। তথাকথিত কমিউনিস্টদের দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে ড. আম্বেদকর একবার বলেছিলেন, “একথা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, শ্রমিকদের সুবিধা-অসুবিধার থেকে এই ধর্মঘটের লক্ষ্য কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করা। তাই, শ্রমিক স্বার্থেই ঐ ধর্মঘট সমর্থনযোগ্য নয়।” তিনি “অস্পৃশ্যদের রাজনৈতিকভাবে শোষণ” করার অভিযোগও তুলেছিলেন ঐসব সাম্যবাদী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে। এদেশের যে কেউ স্বীকার করবেন যে, অতীতের তুলনায় এইসব সাম্যবাদী দলের অধঃপতন আরও বেশী ঘটেছে। কংগ্রেস-বি. জে. পি-র মত পার্টিগুলির বদলে ক্ষমতায় নিজেদের প্রতিষ্ঠা করাই এইসব সাম্যবাদী দলগুলির আশু এবং অন্তিম লক্ষ্য। তাই, সাম্যবাদীদের দলিত অভিমুখী শ্লোগান তাদের উপলব্ধি বা নীতিগত অবস্থান নয়, ধোঁকা দেবার জন্য তা যে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের পুরনো কৌশলের এক নতুন রূপ—একথা মনে করার যথেষ্ট যুক্তি আছে।
সাম্যবাদী দলগুলি যদি সত্যিই সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য সচেষ্ট হতো, তাহলে, প্রথমেই তার অনুশীলন ঘটতো পশ্চিমবঙ্গে – যেখানে তারা তিন দশক ধরে একটানা ক্ষমতায়। কিন্তু তা হয়নি; বরং বহুক্ষেত্রে আগের জমানার তুলনায় দলিতদের অগ্রগমন মন্থর হয়েছে, বঞ্চনা বেড়েছে। সরকারি নানা তথ্যে তার প্রমাণ স্পষ্ট।
মরিচঝাঁপির ঘটনা ঘটেছিল প্রায় ৩০ বছর আগে। অনেকের স্মৃতিতে তা ঝাপসা হয়ে যেতে পারে, বা নতুন প্রজন্মের অনেকেই তা না জানতেও পারেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে রেল লাইনের দু'ধারে, খালের পাড়ে, রাস্তার পাশে বা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে নীচু ধানের জমিতে ঘর বেঁধে যে দুঃসহ অবস্থার মধ্যে উদ্বাস্ত দলিতরা বসবাস করেন, তাদের প্রতি সাম্যবাদীদের উদাসীনতা, অবজ্ঞা ও অবহেলাতো মানুষ নিত্যদিন দেখছেন। এই সমস্ত উদ্বাস্তুদের অবস্থা অনেকাংশে ভিন্ রাজ্যের উদ্বাস্তুদের থেকে খারাপ। অথচ ভিন্নরাজ্যের উদ্বাস্তুদের নিয়ে সাম্যবাদীরা কখনও দু'কথা বললেও, পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তুদের সম্পর্কে দৃষ্টিকটুভাবে নীরব। এই ব্যবহারের মধ্যেও সাম্যবাদীদের দুরভিসন্ধির গন্ধ বেরিয়ে আসে।
নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ২০০৩ পাশ হয়েছে দিল্লীর আইন সভায়। এই আইন নিতান্তই দলিত বাঙালি নয়, গোটা বাঙালি জাতির জন্যই এক মৃত্যু
ফাঁদ। অথচ সাম্যবাদী সাংসদরা — যারা প্রায় গোটাটাই বাঙালি, তারা এই বিলকে সমর্থন করে আইনে পরিণত করলেন। পরে যখন শোরগোল শুরু হলো, তখনও তারা এর প্রতিবাদ করতে এগিয়ে এলেন না। আজও তথাকথিত সাম্যবাদী দলগুলি ১৯৭১ সালের সীমারেখাকে চ্যালেঞ্জ করতে এগিয়ে আসছেন না; বরং তা যে মেনে নিয়েছেন, এটাই সত্য ঘটনা। গত নির্বাচনের প্রাক্কালে কয়েক লক্ষ ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে —যাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে অভিযোগ যে, তারা ১৯৭১ সালের পরে ভারতে এসেছেন। উদ্বাস্তুদের বিরুদ্ধে তথাকথিত সাম্যবাদী এই সরকারের সাম্প্রতিক আক্রমন হলো—ধীরেন বাছাড় ও অন্যান্য ৮৪ জনের বিরুদ্ধে ১৪ ফরেনার্স এ্যাক্ট অনুযায়ী মামলা দায়ের করা। বর্ধমানের পুলিশ সুপার ভাতার থানার ও সি. কে ঐসব উদ্বাস্তুদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবার নির্দেশ দিয়েছেন। চিঠির নং ৩৭১৫/৪১-০৫, তারিখ ১৯/০৪/২০০৬। অভিযোগ এই সমস্ত মানুষেরা ১৯৭১ সালের পরে ভারতে এসেছেন। এইসব মানুষের প্রত্যেকের ভোটার তালিকায় নাম আছে, রেশন কার্ড ও অন্যান্য কাগজপত্র আছে।
সাচার কমিটির রিপোর্ট প্রমাণ করে দিয়েছে—শুধু বর্ণবৈষম্য প্রশ্নে নয়, মুসলমানদের প্রতি বঞ্চনা বা সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নেও এই সরকার দেশের মধ্যে শীর্ষে। এমনকি গুজরাটের নরেন্দ্র মোদির সরকার থেকেও পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার উচ্চশিক্ষা, চাকরি ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার ক্ষেত্রে মুসলমানদের বেশী বঞ্চিত করেছে।
এ রাজ্যের ও. বি. সি.-রাও প্রতারিত হয়েছে। তাই, যেখানে সাম্যবাদীরা ক্ষমতায় নেই, সেইসব রাজ্যের মানুষকে মিথ্যা 'চমক' দিয়ে কিছু পরিমানে বিভ্রান্ত করা সম্ভব হলেও, তারমধ্যে যে সত্য নেই, একথা বুঝতে হবে।
উত্তরপ্রদেশে মায়াবতীর নেতৃত্বে নির্বাচনে ‘ঐতিহাসিক বিজয়' কিছু মানুষকে উজ্জিবিত করেছে—একথা যেমন ঠিক, তেমনি এরমধ্যে বিপদের বীজ লুকিয়ে থাকার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অস্পৃশ্য- অব্রাহ্মণ বনাম ব্রাহ্মণ সমাজের দ্বন্দ্ব ভারতীয় সমাজের এক মৌলিক দ্বন্দ্ব। উত্তরপ্রদেশে মায়াবতীর রসায়ণ শত্রু-মিত্র চিহ্নিতকরণে বিভ্রান্তি তৈরি করবে নাতো! কার সঙ্গে কার জোট বা ঐক্য এবং কাদের বিরুদ্ধে লড়াই? –বিধায়ক জেতানো জরুরি; কিন্তু রাজনৈতিক সাফল্য বলতে যে আরও অনেক কিছু এটা অন্ততঃ ‘দলিত সমন্বয় সমিতির' তো ভুলে যাবার কথা নয়।
শ্রমিকশ্রেণীর পার্টিতে শ্রমিকের বদলে মধ্যবিত্তের প্রাধান্য ও নেতৃত্বের ফলাফল পশ্চিমবঙ্গ তথা গোটা ভারতের খেটে খাওয়া মানুষেরা দেখছেন। দলিতদের পার্টিতে ব্রাহ্মণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ভিত্ মায়াবতী রচনা করলেন কিনা—সমালোচনার সেই দৃষ্টিকে অন্ধ করে দেবেন না।
উত্তরপ্রদেশ বিধানসভায় ২০৬ জন বহুজন সমাজ পার্টির বিধায়কের মধ্যে অর্ধেকের বেশী উচ্চবর্ণীয়—যার মধ্যে ব্রাহ্মণরাই সংখ্যাভারী। দলিত বিধায়ক ২০৬ সংখ্যার এক চতুর্থাংশের অনেক কম। বিধানসভার মোট শ’চারেক বিধায়কের মধ্যে উচ্চবর্ণীয় বিধায়ক তিন চতুর্থাংশের বেশী। বহুজন সমাজ পার্টির নির্বাচিত দলিত বিধায়কেরা কতটা আম্বেদকরবাদী, দলিত বন্ধু বা আয়ারাম-গয়ারাম—এ প্রশ্নও অবান্তর নয়। যারা টিকিট পেতে ৩০ লক্ষ থেকে ৮০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ডোনেশন দিয়েছেন, তাদের সম্পর্কে এ প্রশ্ন উঠবেই। তাই, এ অবস্থাকে দলিতের ক্ষমতায়ন কতটা বলা যায়, তার সংজ্ঞা নির্ধারণ করা জরুরি। তবুও দলিতরা যদি একে মন্দের ভাল বলতে চান—তা না হয় মেনে নেওয়া যায়। তবে এই জয় স্রেফ মায়াবতীর—আম্বেদকরবাদীদের জয়তো নয়ই; এমনকি কাশীরামের নীতি-কৌশলের জয় বলেও একে বলা যাবে না।
মায়াবতীর এই নির্বাচনী সাফল্য দেশজুড়ে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে তার সব থেকে বিপদজনক দিক হলো—ইতিমধ্যে একশ্রেণীর দলিত বুদ্ধিজীবী কাশীরাম-মায়াবতীকে ড. আম্বেদকরের থেকেও বড় বলে প্রতিপন্ন করার কাজে নেমে পড়েছেন। তারা বোধহয় ভুলে যাচ্ছেন, রাজনৈতিক সাফল্য, আর নির্বাচনী সাফল্য ঠিক এক নয়। নির্বাচনী সাফল্য যে রাজনৈতিক সাফল্যের একটা অংশমাত্র একথা বুঝতে হবে। দলিতদের স্বার্থে এবং উন্নয়নে মতাদর্শগত সংগ্রাম, আইন ও নীতি প্রনয়ণ, অনুশীলন—কাজ কতটা করা গেল, রাজনৈতিক সাফল্যের মাপকাঠি—মূলতঃ এটাই। ড. আম্বেদকর রাষ্ট্র ক্ষমতা হাতে না পেয়েও এই লড়াইয়ে অনেক বেশী সফল। ড. আম্বেদকর বলেছেন— “রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলই সর্বরোগ বিনাশকারি কোন ওষুধ নয়।”পশ্চিমবঙ্গে একজন নিবন্ধ লেখক শ্রী মনোহরমৌলি বিশ্বাস ‘চতুর্থ দুনিয়ায়' লিখেছেন, 'He (Kanshi Ram) is beyond Ambedkar in Political Strategy." —যার বাংলা অর্থ হলো—“রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনি (কাশীরাম) ড. আম্বেদকরের থেকেও অপেক্ষাকৃত অধিকতর অগ্রবর্তী।” এ ভাবনা এক আত্মঘাতী প্রবণতা ও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সুপ্রীমো ধারণার সাথে স্বৈরতন্ত্র বা গণতন্ত্রহীনতার একটা যোগসূত্র আছে। একজন স্বৈরাচারির নেতৃত্বে এই নির্বাচনী সাফল্যকে পূঁজি করে এইসব বুদ্ধিজীবীরা গণতন্ত্রের ধারণাকে নস্যাৎ করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বা পরিকাঠামো রিপাবলিকান পার্টিতে প্রয়োগ করার জন্য তারা ড. আম্বেদকরকে সমালোচনা করতেও পিছপা হচ্ছেন না। অতি উৎসাহী হয়ে অগ্র-পশ্চাৎ বোধহয় না ভেবে 'অধিকার' পত্রিকা এই নিবন্ধের পুণর্মুদ্রন করছে ধারাবাহিকভাবে। বুঝতে হবে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে দলিতদের সব থেকে বড় অস্ত্র হলো গণতন্ত্র। গণতন্ত্রহীন পরিবেশ ও পরিস্থিতি ব্রাহ্মণ্যবাদের সাথে খাপে খাপে মিলে যায়! নেত্রীর ব্যক্তিগত বিপুল সম্পত্তির পরিমান আড়াল করতে ‘নির্ভীক সংবাদ' বহুজনের টাকা ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির সীমারেখা তুলে দিতে বা পার্টি এ্যাকাউন্ট ও ব্যক্তিগত এ্যাকাউন্টের প্রভেদ মুছে ফেলতে লেখা ছাপছে। প্রচার মাধ্যমের শাক্ দিয়ে মাছ ঢাকার এই প্রবণতা ক্ষতিকর! ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না যে, মায়াবতী এমনকি কোন প্রতিভাদীপ্ত স্বৈরাচারী (benevolent dictator) নন; বরং কাশীরামের একান্ত প্রশ্নয়ই হলো তার উত্থানের একমাত্র চাবিকাঠি। লড়াই- সংগ্রাম ও ত্যাগ-তিতিক্ষার প্রতিমূর্তিও তিনি নন যে, তাকে অন্ধের মত বিশ্বাস করা যায়!
কেউ কেউ ইতিমধ্যে মায়াবতীকে দেশের প্রধানমন্ত্রি হিসাবে দেখছেন। এবং সে প্রচার শুরু করেছেন। উচ্চাকাঙ্খা না থাকলে বড় হওয়া যায় না—এটা ভাল। আর রাজনীতিতে সাফল্যের জন্য প্রচার হলো প্রাথমিক শর্ত। এসব নিয়ে দ্বিমত থাকার কোন অবকাশ নেই। কিন্তু যেটা জানতে ইচ্ছা করে, তাহলো— তিনি যদি প্রধানমন্ত্রিত হন, তাহলে তা কি দলিতদের প্রতিনিধি হিসাবে, না ব্রাহ্মণ্যবাদীদের ঢাল হিসাবে ঐ পদ অলঙ্কৃত করবেন?
দলিত মানুষের সাফল্যের ‘বীজমন্ত্র' হিসাবে ড. আম্বেদকর তিনটি শব্দ ব্যবহার করতেন—শিক্ষিত হও, সংঘর্ষ করো, সংগঠিত হও। বাস্তবতঃ তিনি বহু আন্দোলনে নেতৃত্বও করেছেন। তার নেতৃত্বে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের শুরু চৌদার পুকুর অভিযানের মধ্য দিয়ে। এমনকি মিঃ এম. সি. রাজার নেতৃত্বাধীন বিপথগামী দলিত সংগঠনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ড. আম্বেদকরপন্থি দলিত কর্মির শহীদ হওয়ার মত ঘটনাও ঘটেছে, তবুও সংঘর্ষের পথকে তিনি পরিহার করেন নি। অন্যদিকে মুখে ড. আম্বেদকরের কথা বললেও বহুজন সমাজ পার্টি লড়াই- আন্দোলনের পথ সব সময়ই এড়িয়ে যায়। কানপুরে ড. আম্বেদকর মূর্তির অবমাননার জন্য মহারাষ্ট্র উত্তাল হলেও উত্তরপ্রদেশে বি. এস. পি. রাস্তায় নামার প্রয়োজনবোধ করে না—যদিও মূর্তি স্থাপন তাদের এক অন্যতম রাজনৈতিক কর্মসূচী। একের পর এক ড. আম্বেদকরের মূর্তির অবমাননার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে ১৯৯৭ সালের জুলাই মাসে তিনটি পৃথক ঘটনায় মহারাষ্ট্রের ২১জন দলিত শহীদ হন পুলিশের গুলিতে। সে সময়ে মহারাষ্ট্রের ক্ষমতায় শিবসেনা-বি. জে. পি. সরকার। একই সময়ে বি. জে. পি. - র সহযোগিতায় মায়াবতী প্রথমবারের জন্য উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। আম্বেদকর মূর্তির অবমাননা বা এই গণহত্যার বিরুদ্ধে বি এস পি রাস্তায় নামেনি। এমনকি কাশীরাম বিশাল জনসভায় “তাদের (মহারাষ্ট্রের দলিত) সাথে এমন ব্যবহারই করা উচিৎ”—বলে মহারাষ্ট্র সরকারকে সার্টিফিকেট দেন (বহুজন সংগঠক ১৪ই আগষ্ট, ১৯৯৭)। বি এস পি বা মায়াবতীর পক্ষ থেকেও এই ঘটনার বিরুদ্ধে একটা বিবৃতি দেওয়ার ক্ষমতা হয় নি। বি জে পি বা ব্রাহ্মণ- ব্রাহ্মণ্যবাদীদের সাথে আঁতাতেরই ফলাফল এই সব ঘটনা। বি. এস. পি-র এই ভুল পথকে তাত্ত্বিক ভিত্তি দিতে একশ্রেণীর দলিত বুদ্ধিজীবীরা কলম ধরেছেন। তারা লিখেছেন—নীরব বিপ্লব বা আন্দোলন বর্জন নীতি নাকি কাশীরামের রাজনৈতিক দর্শনের এক মৌলিক ভিত্তি! হতে পারে। তবে এর সঙ্গে ড. আম্বেদকরের চিন্তা ও কাজের কোন মিল নেই, একথা মাথায় রাখতে হবে। লড়াই-সংগ্রামের প্রশ্নে ড. আম্বেদকর এক জায়গায় বলেছেন, “অস্পৃশ্যতা এমন এক অভিশাপ, সমাজের বুক থেকে তা মুছে দিতে যদি কিছু জীবনও বলি দিতে হয়, তা এমন কিছু নয়।” – আন্দোলনের ধরণ সম্পর্কে বলেছেন, “নীতি হওয়া উচিত যথাসম্ভব অহিংস; কিন্তু প্রয়োজনে হিংসার আশ্রয় নিতে হবে।” উত্তরপ্রদেশে মায়াবতীর নির্বাচনী সাফল্য এবং উদ্ভ্রান্ত দলিত বুদ্ধিজীবীদের এই লেখালেখি ও বিচার-বিশ্লেষণের প্রভাব যে মারাত্মক হবে, তাতে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয় !
অতি সম্প্রতি মায়াবতী সরকার গঠনের পর এক বিভৎস ঘটনা ঘটেছে উত্তর প্রদেশে। মায়াবতীর মন্ত্রিসভার এক ব্রাহ্মণ সদস্যের ভাইয়ের নেতৃত্বে এক দলিত পল্লীর মায়েদের গণহারে ধর্ষণ করা হয়েছে। দলিত মায়েদের অপরাধ—ঐ পল্লীর কোন এক যুবক একজন ব্রাহ্মণ কন্যাকে বিয়ে করেছেন। কারুর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয় নি। পক্ষান্তরে দলিত রাজত্বে মায়াবতী প্রথম যে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাটি করেছেন, তাহলো—'গরিব ব্রাহ্মণদের সংরক্ষণের ব্যবস্থা করবে তার সরকার'—যে কথা বলতে দেশের অন্য কোন রাজ্যসরকারকে আজও শোনা যায় নি। পরিশেষে বলি, মরিচঝাঁপিতে যখন জঘন্য অর্থনৈতিক অবরোধ ও গণহত্যা ঘটে, বামফ্রন্টের প্রতি অন্ধ আবেগের বশবর্তী হয়ে অনেকেই তার প্রতিবাদ করেন নি, বোবা হয়ে ছিলেন। ভেবেছিলেন, বামফ্রন্ট মেহনতী মানুষের বন্ধু সরকার! বহুজন সমাজ পার্টি পার্লামেন্টে যখন নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন ২০০৩ সমর্থন করে পাশ করিয়ে দেয়—রাজ্যের দলিত মানুষ তখন চোখ বন্ধ করে থাকেন—ভাবেন, বি. এস. পি-তো আমাদের পার্টি। ২০০৭ সালের জুন মাসে মায়াবতী সরকার যখন উত্তর প্রদেশের নমঃশূদ্রদের তফসিলীভুক্ত করার প্রস্তাব নাকচ করতে কেন্দ্রকে চিঠি দেয়—তখনও যারা বহিনজির ভুল দেখেন না—তারা কি চোখ বুজে আছেন, না তারা প্রকৃতই অন্ধ! যদি অন্ধ হন—জমিতে হাত বুলিয়ে দেখুন, মায়াবতী সরকার ইতিমধ্যে উত্তরপ্রদেশের থানাগুলিতে নির্দেশ দিয়েছেন—যেন দলিতদের উপর নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত করা না হয়। প্রমাণ করতে হবে যে, বহিনজির উত্তরপ্রদেশে দলিত নির্যাতনের ঘটনা একেবারেই নির্মূল হয়ে গেছে!
—---------------------------------------------------
ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রই দলিতদের একমাত্র অস্ত্র
মাননীয় নির্বাহী সম্পাদক ‘চতুর্থ দুনিয়া' পত্রিকা
কলকাতা।
মহাশয়,
পত্রিকার মার্চ ২০০৭ সংখ্যায় মনোহরমৌলি বিশ্বাস মহাশয়ের ‘কাশীরামের রাজনৈতিক দর্শন ও দলিত আন্দোলন' শীর্ষক লেখাটির পরিপ্রেক্ষিতে আমার এই চিঠি। শুরুতেই কৈফিয়ৎ দিয়ে রাখি—আমার এই চিঠি লেখা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা; কারণ আমি নিজেই এই পত্রিকার সম্পাদনা কমিটির সদস্য। আর এও জানলাম—গতকাল রাত ১১টা পর্যন্ত পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক শ্রী অমর বিশ্বাস মহাশয়ও এই লেখা ও তার বিষয়বস্তু সম্পর্কে কিছুই জানেন না। এসব কিছুর ফলে মনে হচ্ছে—আলোচ্য নিবন্ধে মনোহরমৌলি বিশ্বাস কাশীরামজীর যে গণতান্ত্রিক ধ্যানধারণার মৌলিকতার উল্লেখ করেছেন, তার প্রয়োগ চতুর্থ দুনিয়াতে শুরু হয়েছে (কাউকে কিছু না জানিয়ে নিজের ইচ্ছামত পত্রিকা চালানো)। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, 'চতুর্থ দুনিয়া' পত্রিকা মূল সংগঠন 'বাঙলা দলিত সাহিত্য সংস্থার' মুখপত্র—যে সংস্থার সম্পাদক স্বয়ং মনোহরমৌলি বিশ্বাস ।
চিঠির শুরুতে বলে রাখি—এই লেখায় মনোহরমৌলি বিশ্বাস চোয়াড়- বাউরী- বাগদীদের আন্দোলনের সময়কাল হিসাবে ১৭৬০ সালের যে উল্লেখ করেছেন, তা সঠিক তথ্য নয়। ঐ আন্দোলনের শুরু ১৭৬৬ সালে। ১৭৫৭ সালের পর ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রথম ঐতিহাসিক সংগ্রাম সন্নাসী বা ফকির বিদ্রোহ। তার শুরু ১৭৬৩ সালে এবং লড়াই চলে দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে। এই একই প্যারাগ্রাফে নিবন্ধ লেখক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন প্রবর্তন ও বর্ণহিন্দুদের আধিপত্যবাদের শুরুর সময়কাল ইত্যাদি সম্পর্কে যে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন তাও বিভ্রান্তিকর ও অর্ধসত্য।
মনোহরমৌলি বিশ্বাস নিবন্ধের নামকরণ করেছেন 'কাশীরামের রাজনৈতিক দর্শন....'। ফলে নিবন্ধে কিছু মৌলিক রাজনৈতিক অবদানের কথা, ব্যাখ্যা ইত্যাদি পাঠকরা আশা করতেই পারেন। কাশীরামের তেমন কোন অবদান আদৌ আছে কি-না, তা আমার জানা নেই। পাঠকরাও এই প্রবন্ধের মাধ্যমে তেমন কোন অবদানের সন্ধান পেলেন বলে আমার মনে হয় নি। অবশ্য 'দর্শন' শব্দটি একটি জটিল ব্যাপার। ফলে, আমি তা আদৌ বুঝতে পারিনি, এমনও হতে পারে। তবে আমার মনে হয়—নিবন্ধটির শিরোনাম যদি ‘কাশীরামের জীবন দর্শন'—এমন কিছু একটা করা হতো, তাহলে তা কিছুটা নামকরণের সার্থকতা পেত।
“কাশীরামের মৌলিক রাজনৈতিক দর্শন'—এ জাতীয় শব্দ সমষ্টি লেখক অন্ততঃ ১৭ বার উল্লেখ করেছেন নিবন্ধটিতে; কিন্তু সে বস্তু বা ধারণাটা যে কি, একটি মাত্র ক্ষেত্র ছাড়া তার কোন ব্যাখ্যা তিনি করেন নি। অন্য একটি/দু'টি জায়গায় কাশীরামের মৌলিক অবদান বলে যার উল্লেখ করেছেন, তা মোটেই কাশীরামের চিন্তা-ভাবনার ফসল নয়; অর্থাৎ তাতে কোন মৌলিকতা নেই।
—ঐসব কথা ড. আম্বেদকর ও তার পূর্বসূরী মণীষীরা বহুবার বলেছেন, ব্যাখ্যা করেছেন এবং এমনকি সেসব নিয়ে অনুশীলন করেছেন। এ ছাড়াও নিবন্ধে পরস্পর বিরোধি বক্তব্য; এমনকি বেঠিক কথাও কম নেই। —দীর্ঘ নিবন্ধটি মনোযোগ দিয়ে পড়লে যেকোন পাঠক এ সবই বুঝতে পারবেন।
যে একটিমাত্র ক্ষেত্রে কাশীরামের ভাবনায় মৌলিকতা আছে বলে আমার মনে হয়েছে, তাহলো— গণতন্ত্রের প্রশ্ন। মনোহরমৌলি বিশ্বাস লিখেছেন— কাশীরামের ‘গণতন্ত্রের ধারণা' এক মৌলিক অবদান। অর্থাৎ গণতন্ত্রের কোন প্রয়োজন নেই। উদাহরণ হিসাবে লেখক লিখছেন, “তাই নতুন দল (কাশীরাম) গড়লেন বটে; কিন্তু সংবিধান রচনা করে গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো বানাতে চাইলেন না দলের ভিতরে।” এ কাজের জন্য লেখক যুক্তি হিসাবে বললেন, .."(কর্মি/নেতারা) তর্ক জুড়বেন, দলাদলি করবেন এবং দলিত মুক্তির যে আসল 'স্পিরিট' তা ভেঙে তছনছ করবেন।” – শুধু এইটুকু মাত্র বলে মনোহরমৌলি বিশ্বাস ক্ষান্ত হন নি। তিনি ড. আম্বেদকরের ভুল ধরিয়ে দিতে লিখলেন, “ড. আম্বেদকরও রাজনীতির ক্ষেত্রে এই একই ধারাবাহিক প্রক্রিয়া (অর্থাৎ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া) পদ্ধতিগতভাবে গ্রহণ করেছিলেন তার নিজস্ব রাজনৈতিক দলে। এক্ষেত্রে কাশীরাম ছিলেন স্বতন্ত্র মানুষ।” –আজকে যারা এভাবে ড. আম্বেদকরের ভুল চিহ্নিত করছেন, আগামিদিনে তারা ড আম্বেদকরের নিন্দায় মুখর হবেন নাতো! গণতন্ত্রের যে কোন দরকার নেই, তা বোঝাতে এই নিবন্ধ লেখক 'আনন্দবাজারের' গৌতম রায়কে ‘কোট’ করেছেন। গৌতম রায় কত দরের দার্শনিক তা অবশ্য আমার জানা নেই। তবে, ভেবে চিন্তে তাকে ‘কোট' করছেন তো? –তার আগামিদিনের অন্য কোন লেখা বুমেরাং হবে না তো!
জিযে গণতন্ত্রহীনতাকে মনোরহমৌলি বিশ্বাস মহিমান্বিত করেছেন, এ পর্যন্ত তার ফলাফল কি? দলাদলি, ভাঙাভাঙি বন্ধ করার জন্য কাশীরামের যে মৌলিক উদ্ভাবন তাতে দল ভাঙাভাঙি বেড়েছে না কমেছে? তথ্য হলো—দল ভাঙার ইতিহাসে বা দলত্যাগের ইতিহাসে গুণগত ও পরিমাণগত উভয় ক্ষেত্রে এই স্বল্প সময়েই বি. এস. পি দল ও তার বিধায়করা সবাইকে টেক্কা মেরে এগিয়ে গেছেন। আর পশ্চিমবঙ্গেতো ‘গণতন্ত্রের' এই নয়া দর্শনের জ্বালায় বহুজনেরা বহুবছর ধরে জ্বলে-পুড়ে মরছেন! মনোহরমৌলি বিশ্বাস কি ভুলে গেছেন যে, ব্রহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য গণতন্ত্র ছাড়া দলিতদের হাতে অন্য কোন অস্ত্র নেই। অগণতান্ত্রিক পরিবেশ-পরিস্থিতি সব থেকে বেশি খাপ খায় ব্রাহ্মণ্যবাদের সাথে। গণতন্ত্রহীন জলবায়ুতে ব্রাহ্মণ্যবাদের ডালপালা মেলা সহজ হয়।
শুধু উত্তরপ্রদেশেই বি. এস. পি ভেঙেছে কম করে সাতবার। তৈরি হয়েছে (১) ভারতীয় সমাজ পার্টি (২) রাষ্ট্রিয় সমানতা দল (৩) আম্বেদকর ন্যাশনাল দল (৪) সমাজ পার্টি (৫) গণতান্ত্রিক বহুজন সমাজ পার্টি (৬) বহুজন সমাজ পার্টি (কাশীরাম) (৭) আম্বেদকরবাদী দল প্রভৃতি। এসব দলই জিন্দা আছে, মুছে যায় নি। তাছাড়াও বি এস পি দল ভেঙে একাধিক দল হয়েছে পাঞ্জাবে এবং মধ্যপ্রদেশে। অন্ধ্রপ্রদেশে বি. এস. পি. ভেঙে ঐ দলের রাজ্য সভাপতি তৈরি করেন বহুজন-রিপাবলিকান পার্টি। পশ্চিমবঙ্গে গণতান্ত্রিক বহুজন পার্টি। এমন সব বহু ছোট ছোট রাজনৈতিক দলের সৃষ্টি হয়েছে বি এস পি ভেঙে। ‘মূলদল ছুট' এই সব দলগুলি কতটা সাফল্য পেয়েছে বা পায়নি, সে কথা আলাদা। তবে বি এস পি-র যে ক্ষতি হয়েছে তাতে কোন ভুল নেই। এবং এইসব ভাঙনের মূল কারণ পার্টিতে গণতন্ত্রহীনতা একথা বুঝতে হবে। তবে এইসব ভাঙনের জন্য অন্য কিছু কারণও থাকতে পারে, বা আছে।
মনোহরমৌলি বিশ্বাস দাবি করেছেন, “দলিত মানুষদের মুক্তি দিতে হলে দেশের প্রচলিত আধিপত্যবাদ ভেঙে ফেলতে হবে....।” –এই উক্তি নাকি কাশীরামের দর্শনের মৌলিক ভাবনা! তাই কি? —তাহলে সারা জীবন ধরে ড. আম্বেদকর যা লিখলেন, বললেন ও করলেন, সেটা কি? – লেখকের স্মৃতিভ্রংশ হয়নি তো? –অন্য এক জায়গায় লেখক আবার লিখলেন, “রাজনীতিতে বর্ণগত এই আধিপত্যবাদের প্রশ্ন প্রথম উত্থাপন করেছিলেন ড. বি. আর আম্বেদকর এবং গঠন করেছিলেন রিপাবলিকান পার্টি অফ ইণ্ডিয়া।” পরস্পর বিরোধি এইসব মন্তব্যে আমার মত পাঠকরা বিভ্রান্ত।
কাশীরামের ‘সমাজ ও রাজনৈতিক দর্শনের মৌলিকতা' বোঝাতে মনোহরমৌলি বিশ্বাস অন্য আরেক জায়গায় লিখেছেন, “স্তরীকৃত সমাজটাকে উন্নন্বিত অবস্থান থেকে অনুভূমিক করার পরিকল্পনা মাথায় রেখেই দিক খুঁজেছে কাশীরামের সমাজ ও রাজনৈতিক দর্শন।”আমার মনে হয় গৌতম বুদ্ধ, হরি- গুরুচাঁদ, জ্যোতিবা ফুলে প্রভৃতি মণীষীরা নিজেদের উপলব্ধিতে এই সত্য বুঝেছিলেন এবং সমাজটাকে অনুভূমিক করার সংগ্রাম করেছেন। পরবর্তীতে পেরিয়ার, ড. আম্বেদকর, মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল—এরাও আধুনিক রাষ্ট্রে নিজেদের মত সংগ্রাম করেছেন। কাশীরামও তা নিশ্চয়ই করেছেন। কেউ তাতে সফলতা বেশী পেয়েছেন, কেউ কম পেয়েছেন; কিন্তু এর মধ্যে দর্শনের নতুনত্ব বা মৌলিকতা' লেখক কোথায় এবং কি পেলেন? –দর্শন, নীতি ও কৌশল—এ সবই এক জিনিষ নাকি!
মনোহরমৌলি বিশ্বাস লিখেছেন, “দলিত মানুষের মুক্তি দিতে হলে দেশের প্রচলিত আধিপত্যবাদ ভেঙে ফেলতে হবে এবং প্রতিষ্ঠা করতে হবে এক নতুন আধিপত্যবাদ।” –একথা কাশীরাম বলেছেন নাকি? — যদি বলে থাকেন স্বীকার করতে হবে— তাহলে তাতে মৌলিকতা না হলেও নতুনত্ব আছে। কিন্তু আমি যতদূর জানি কাশীরাম এমন কথা কোথাও কোনদিন বলেন নি। এতো ‘শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্বের অপরিহার্যতার' অনুরূপ শ্লোগান। এ শ্লোগানের সাথে গৌতম বুদ্ধ বা ড. আম্বেদকরের দর্শনের কিছু পার্থক্য আছে। এমনকি পার্থক্য আছে, “যার যেমন সংখ্যাভারী, তার তেমন অংশীদারি” —এই শ্লোগানের সাথেও। মনোহরমৌলি বিশ্বাসের কাছে বিনীত প্রশ্ন, “যারা ছিলেন কলমে, তারা আসুন লাঙলে এবং যারা ছিলেন লাঙলে, তারা আসুন কলমে”—এই শ্লোগান কাশীরাম দিয়েছেন নাকি? মনে হয় না। তাছাড়া এই শ্লোগানটি ঠিকও নয়। আগে শ্লোগান শুনেছি, “ লাঙল ছেড়ে কলম ধরো।” —এটা পাল্টে গেল বুঝি! নিবন্ধ লেখককে অতীতের তুলনায় অনেক বেশি আক্রমণাত্মক মনে হচ্ছে। তবে তার স্বপ্নের উত্তরপ্রদেশ কিন্তু উল্টো পথে হাঁটছে; হেঁটেই চলেছে শত্রুর সাথে আপসের রাস্তা ধরে।
মনোহরমৌলি বিশ্বাস লিখেছেন, রূঢ় কথনে কাশীরাম বলতেন, “তিলক, তরাজু আউর তলোয়ার; তিনোকো মার জুতা চার।” –এসব কথাও কাশীরামের রাজনৈতিক দর্শনের ব্যাপার বুঝি! —তাহলেতো বলতে হবে— তার মৃত্যুর পর মায়াবতী ঐ দর্শন থেকে বিচ্যুত !
“ড. আম্বেদকরের মৃত্যুর পরে দলিত রাজনীতির মহাকাশে যে এক ভয়ংকর শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল, অক্লান্ত পরিশ্রম আর নৈষ্ঠিক তাত্ত্বিকতা দিয়ে কাশীরাম পূরণ করেছিলেন তা। রাজনৈতিক দার্শনিকতায় তিনি আম্বেদকরবাদকে আরও বহুদূরে পৌঁছে দিয়েছেন। তাই বলা হয়, হি ইজ বিইওণ্ড আম্বেদকর ইন পলিটিক্যাল স্ট্রাটেজি” (He is beyond Ambedkar in Political Strategy)—নিবন্ধটির এই প্যারাগ্রাফটি সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে আমার মনে হয়। আগামীদিনে ড. আম্বেদকরের উর্ধে কাশীরামকে প্রতিষ্ঠিত করার একটা সর্বাত্মক চেষ্টা যে হবে, তার ভ্রুণের সন্ধান – বিশেষ করে এই প্যারাগ্রাফে এবং সাধারণভাবে গোটা নিবন্ধের মধ্যেই পরিস্ফুট।
মনোহরমৌলি বিশ্বাস অতি গুরুত্বপূর্ণ বাক্যটি ইংরেজীতে লিখেছেন—যা ইংরেজীতে লেখার কথা নয়। ইংরেজী বাক্যটার বাংলা অনুবাদ করে লেখা যেতে পারে 'রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনি (কাশীরাম) ড. আম্বেদকরের থেকে অপেক্ষাকৃত অধিকতর অগ্রবর্তী বা উৎকৃষ্ট বা উর্ধে।' কেউ তর্ক করতে পারেন যে, নীতি নয় এখানে কৌশলের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ বলতে চাওয়া হয়েছে যে, কাশীরাম অনেক বেশী কুশলী রাজনীতিবিদ। আমি এখানে অন্য একটি ইংরেজী শব্দের কথা মনে করিয়ে দিতে চাই—তাহলো ট্যাটিক্স (tactics)। নিবন্ধ লেখক কিন্তু এই শব্দটি ব্যবহার করেন নি। তা যদি করতেন, তাহলে কিছু পরিমানে যথার্থ হতো বলে আমার মনে হয়। পক্ষে- বিপক্ষে কিছু আলোচনার জায়গা তৈরি হতো। কাশীরামের অক্লান্ত পরিশ্রম, কিছু মাত্রায় সাফল্য—নিশ্চয়ই এসব কেউ নসাৎ করে দিতে চান না। তা উচিতও নয়। তবে মনে রাখতে হবে, ড. আম্বেদকর মূল নেতা ও সেনাপতি- যিনি লড়াইয়ের নীতি, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, কর্মসূচী রচনা করেন ও সার্বিক লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন। আর কাশীরাম, মায়াবতী, আতাউলে-রা ঐ লড়াইয়ের কুশলী সৈনিক।
“দলিত রাজনীতির শূণ্যতা কাশীরাম পূরণ করে ফেলেছেন” –এ কি সত্য ভাষণ! লেখককে আমার বিনীত পরামর্শ—আবেগ দিয়ে, কল্পনার রং চড়িয়ে গল্প রচনা করা যায়, তা দিয়ে প্রবন্ধ রচনা করলে দাঁড়ায় না। প্রবন্ধ লিখতে হলে সততা, যুক্তি, আর তথ্যের উপর দাঁড়াতে হয়।
আমার মনে হয়—ড. আম্বেদকরের আগেও দলিত রাজনীতিতে শূণ্যতা ও অসম্পূর্ণতা ছিল। ড. আম্বেদকরের জীবদ্দশাতেও সে শূণ্যতা পূরণ হয় নি। তিনি আজীবন সংগ্রাম চালিয়ে কিছু পথ অগ্রসর হতে পেরেছিলেন। বলেছিলেন—যতটুকু অর্জন করা গেছে, তাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে হবে। বহুক্ষেত্রে আমরা তা পারিনি। মতাদর্শগত সংগ্রাম, আইন-কানুন, নীতি রক্ষার ক্ষেত্রে যেমন; প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যর্থতা আরও বেশী। হ্যাঁ, কাশীরামের উত্থান ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী গোটা পর্যায়কালের বিশ্লেষণ করলেও এই সত্য বোঝা যাবে। নিশ্চয়ই দলিত মানুষেরা কিছু অর্জনও করেছেন এবং তাতে কাশীরামের নিশ্চিতভাবেই ভূমিকা আছে। তবে শূণ্যতা পূরণ হয়ে গেছে, একথা বলা যায় না।
যে কোন আন্দোলনে জোয়ার-ভাটা, উত্থান-পতন, বাঁক-মোড় আছে, থাকবে। গোটা পৃথিবীতেই দেখা যাবে বিকাশের গতি মসৃণভাবে চলেনি। কখনও ত্বরণ, কখনও মন্দা—এভাবে পর পর পর্যায় অতিক্রম করতে হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে তা প্রগতির অভিমুখী। দলিত আন্দোলন ও রাজনীতির ক্ষেত্রে ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত; অর্থাৎ ড. আম্বেদকরের মৃত্যু থেকে ‘বহুজন সমাজ পার্টির' প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত ভারতে দলিত রাজনীতির মহাকাশে মনোহরমৌলি বিশ্বাস বর্ণিত নিঃশব্দ শূণ্যতা ছিল না। ‘ভয়ংকর শূন্যতার মহাকাশে' কিছু কিছু বোমা-পট্কার শব্দ নিশ্চয়ই শোনা গেছে। যিনি 'দলিত সাহিত্যের দিগ্বলয়' বই রচনা করেন, তার একথা অজানা থাকার কথা নয়। প্রয়োজন সত্য কথন। বিকৃত ইতিহাসের পাচন খাইয়ে জাতিকে জাগানো যায় না। সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। মনোহরমৌলিকে কলম ধরার প্রেরণা পশ্চিম জুগিয়েছে, না উত্তর জুগিয়েছে—তা, তার থেকে বেশী আর কে জানে! আমরা তার অতীতের লেখা ও বক্তৃতা শুনে কিছুটা আঁচ যে পাই নি, এমন নয়। অগণিত দলিত কর্মি, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক কর্মি-নেতা তৈরির পিছনে ভূমিকা পালন করেছে ১৯৫৬ থেকে ১৯৮৪ সময়কাল।
এমনকি কাশীরাম যদি পাঞ্জাবে জন্মগ্রহণ না করতেন এবং মহারাষ্ট্রে তার চাকরি জীবন না কাটতো, তাহলে এমনও হতে পারতো আমরা কাশীরামকে এভাবে নাও পেতে পারতাম। এসব অনুমান প্রমাণযোগ্য নয় জেনেও লিখছি এই কারণে যে, দলিতদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং তার উত্থানের প্রকৃত ইতিহাস সামনে আসুক। দলিতরা যে পাতে খেয়েছেন, সেটাই যেন নোংরা না করি!
একটা সময়কাল পর্যন্ত কংগ্রেস দলের সারা দেশে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। আমি যে কথা বলছি, এ ঘটনা কংগ্রেসের সেই একক আধিপত্যের সময়ের কথা। চতুর্মুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝে ৩০ শতাংশ মানুষের ভোটে জিতে যাবার গল্প নয় বা উচ্চবর্ণের সাথে দেওয়া-নেওয়ার (give & take) সহাবস্থানের কাহিনীও নয়—একটা সময়ে পাঞ্জাবের বিধান সভায় রিপাবলিকান পার্টি ছিল প্রধান বিরোধি দল। দেড় ডজন বিধায়কের নেতা ছিলেন জগজিৎ সিং চৌহান। ড. আম্বেদকরের মতবাদ ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবার নিরলস চেষ্টায় ব্রতী ছিলেন এল, আর, বালী ও তার কাগজ ‘ভীম পত্রিকা'। রিপাবলিকান পার্টির এই কাজের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব কাশীরামের উপর পড়েনি— একথা বলা যায় না। চাকুরি জীবনে পূণায় থাকাকালীন তিনি রিপাবলিকান পার্টি ও দলিত প্যান্থার আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ রিপাবলিকান রণজিত শিকদারের কথায়—তিনি পূণায় রিপাবলিকান পার্টির সম্মেলনে কাশীরামকে ভ্যলুনটিয়ার-ইন-চার্জ হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে দেখেছেন। ১৯৭৮ সালে মারাঠাওয়াড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের লড়াইয়ে দলিত প্যান্থার নেতা অরুণ কাম্বলে ও রামদাস আতাউলে যেদিন জেল থেকে ছাড়া পাচ্ছেন, নিজের ছোট কাগজের জন্য সাক্ষাৎকার নিতে কাশীরাম সিদ্ধার্থ কলেজ হস্টেলে প্যান্থার অফিসে বসে আছেন ঘন্টার পর ঘন্টা। শুধু কাশীরাম নন, হাজার হাজার মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়েছেন এই আন্দোলনের ফলে।
১৯৭২ সালে দলিত প্যান্থার আন্দোলনের শুরু। তাকি ফেলনা? বাঙলা দলিত সাহিত্য সংস্থাও ঐ আন্দোলনের এত বছর পরেও কলকাতায় দলিত প্যান্থার দিবসে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে, সে তো এমনিতে নয়! কালা ভূমিসংস্কার বিলের বিরুদ্ধে অথবা ড. আম্বেদকরের লেখা বই বাতিল করার জন্য উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে পাল্টা লড়াই—এসবকে কি শুধুই শূণ্যতা বলা হবে? উত্তর প্রদেশে রিপাবলিকান পার্টি ১৯৬২ সালে ৩ জন এম.পি. ও ৮ জন এম.এল.এ নির্বাচিত করেন; ১৯৬৭ সালে ১ জন এম.পি. ও ১০ জন এম.এল.এ নির্বাচিত করেন; ১৯৭৭ সালে ১৪ জন এম.এল.এ জিতিয়ে আনে। এম.পি.-রা হলেন— বি.পি. মৌর্য, মোজাফ্ফর হোসেন, জ্যোতি স্বরূপ ও রামজীবন। ২ জন মন্ত্রি হলেন—দেবী দয়াল এবং বদন সিং যাদব। আর.পি. আই-এর হয়ে মহারাষ্ট্র, কর্ণাটকে লোকসভায় নির্বাচিত হয়ে আসা। মধ্যপ্রদেশ, অন্ধ্র, তামিলনাড়ু, হরিয়ানা, গুজরাট নানা রাজ্যে বার বার একাধিক বিধায়ক নির্বাচিত হওয়া কি কোন ঘটনাই নয়! বরং প্রকৃত ঘটনা হলো— রিপাবলিকান পার্টির চাষ করা জমিতে কাশীরাম কিছু পরিমানে ফসল ফলাতে সমর্থ হয়েছেন। সাফল্যের এই কৃতিত্ব অবশ্যই কাশীরামের প্রাপ্য। কিন্তু অব্যবহিত আগের ইতিহাস মুছে দেওয়া ঠিক নয়।
বহুজন সমাজ পার্টির প্রভাব যেটুকু যা, তা মূলতঃ ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হয়। উল্লেখ করার মত কোন আন্দোলন, লড়াই-সংগ্রাম, তারা আজও করতে পারে নি। সাম্প্রতিককালের রমাবাঈ আম্বেদকর কলোনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে লড়াই, ঝুপড়ী বস্তি উচ্ছেদ বিরোধি লড়াই, কোর্টরুম থেকে ড. আম্বেদকরের ছবি অপসারণের নির্দেশের বিরুদ্ধে আন্দোলন, শ্রীকৃষ্ণ কমিশনের সুপারিশ কার্যকরী করার দাবিতে লাগাতার আন্দোলন বা অতি সম্প্রতি কানপুরে ড. আম্বেদকর মূর্তির অবমাননার বিরুদ্ধে যে রক্তক্ষয়ী লড়াই রিপাবলিকান পার্টি করে চলেছে, তার সাথে তুলনীয় কোন সংগ্রাম/আন্দোলন বি. এস. পি আজও গড়ে তুলতে পারে নি, তাদের সে পরিকল্পনা ও চেষ্টা নেই। বি. এস. পি-র আন্দোলন হলো ড. আম্বেদকর, সাহু মহারাজের নামে পার্ক তৈরি করা ও মূর্তি স্থাপন এবং তার মধ্যেই পার্টিকে সীমাবদ্ধ রাখা। যদিও মূর্তির সম্মান রক্ষার জন্য ময়দানে নামতে তারা কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়! ভুলে গেলে চলবে না—ঐসব মূর্তির সম্মানের সাথে দলিতদের আত্মমর্যাদার প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।
ভোটের বাক্সে বহুজন সমাজ পার্টির প্রভাব কিছুটা প্রতিফলিত হয়েছিল পাঞ্জাব, হিমাচল প্রদেশ, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ, বিহার এবং উত্তর প্রদেশে (উত্তরাখণ্ড সহ)— সেই প্রভাব আবার কাশীরামের জীবদ্দশাতেই পুনরায় শুধুমাত্র উত্তরপ্রদেশেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। বড় বড় নীতিগত ভুল ও বিচ্যুতি এবং নীতিহীনতার জন্যই এই বিপর্যয় হয়েছে বলে মনে হয়। তাঁর জীবনে বড় সাফল্য উত্তরপ্রদেশে ৯৭ জন বিধায়ক (সংখ্যায় কোন ভুল হলে মাফ করবেন) জিতিয়ে আনা। যদিও তারমধ্যে দলিতবর্গের প্রতিনিধিত্ব হতাশাব্যঞ্জক। অধিকাংশই নীতি- নৈতিকতাহীন আয়ারাম-গয়ারাম, গুন্ডা- মাফিয়া —যাদের সমাজ পরিবর্তন ও নতুন সমাজ গড়ার জন্য কোন কাজেই লাগে না। বর্তমানে যে ২০৬ জন বিধায়ক, তারমধ্যে দলিত বিধায়ক কজন? – ৩৭ জন। ব্রাহ্মণ বিধায়ক? – ৫৭ জন, ঠাকুর বা রাজপুত বিধায়ক ৩৩। এদের প্রায় কেউই ড. আম্বেদকর ভাবাদর্শের মানুষ নন।
ড. আম্বেদকর মুসলমানদের সম্পর্কে বলেছিলেন যে, তারা দলিতবর্গের মানুষের স্বাভাবিক মিত্র। সংবিধানে ৩৪০ ধারা সৃষ্টি করে অন্যান্য অনগ্রসরশ্রেণীর মানুষও যে দলিতদের মিত্র, তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। দলিত- মুসলমান এবং ও. বি. সি-দের মধ্যে ঐক্য ও মেরুকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কাশীরামও উচ্চস্বরে ৮৫ শতাংশ মানুষের ঐক্যের কথা বলছিলেন। কিন্তু যেনতেন প্রকারে ক্ষমতা দখলের লোভ ও বিচক্ষণতার অভাব এই ঐক্য প্রচেষ্টাকে এক মোক্ষম আঘাত করেছে। পরিণতিতে মসনদ দখলের মোহ ও হাতছানিতে মূল শত্রু ব্রাহ্মণ সমাজের দিকে সাহায্যের হাত বাড়াতে হচ্ছে— এর শেষ কোথায় কে জানে!
মনোহরমৌলি বিশ্বাস কাশীরামের মৌলিক ভাবনার এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত কীভাবে ভুলে গেলেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর! জনগণের টাকা বা পার্টির টাকা নেতা-নেত্রীর ব্যক্তিগত এ্যাকাউন্টে রাখার মহিমা কীর্তন দিয়ে নিন্ধটি শেষ করলে বৃত্তটি সম্পূর্ণ হতো!
—------------------------------------------------------
লিফলেট
মায়াবতী সরকারের বিরোধিতায় নমঃশূদ্রদের তফসিলীভুক্ত করা হলো না
[ সূত্র : অমর উজালা, হিন্দি দৈনিক ১৫/০৮/০৭]
সুধী নাগরিকবৃন্দ,
দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বসবাসকারি উদ্বাস্তু নমঃশূদ্ররা দীর্ঘকাল ধরে নিজ নিজ রাজ্যে তফসিলীভুক্ত হবার জন্য সংগ্রাম করে আসছেন। এ ব্যাপারে ভিন্ রাজ্যের নমঃশূদ্রদের পশ্চিমবঙ্গের দলিত আন্দোলনের কর্মীরাও নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করছেন। তফসিলীভুক্ত হবার জন্য আবেদনপত্র তৈরি করা এবং বিভিন্ন সময়ে রাজ্য ও কেন্দ্রিয় সরকারের এ সম্পর্কীয় নানা তথ্য ও প্রশ্নের জবাব, বিশেষ করে সম্প্রদায়ের অতীত ইতিহাস ইত্যাদি সম্পর্কে প্রশ্নসমূহের উত্তরপত্র তৈরির কাজে এ রাজ্যের অমর বিশ্বাস, প্রয়াত ড. অনিলরঞ্জন বিশ্বাস, সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস প্রমুখ তাদের প্রয়োজনীয় সাহায্য ও সহযোগিতা করেছেন। সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস একাধিকবার ভিন রাজ্যের নমঃশূদ্র প্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে কেন্দ্রের সামাজিক ন্যায়মন্ত্রকে গিয়ে তদ্বির করেছেন ও কাজের অগ্রগতির জন্য চেষ্টা করেছেন। রিপাবলিকান পার্টির সাংসদ রামদাস আতাউলে এ ব্যাপারে কেন্দ্রিয় সরকারকে চিঠি লিখে সুপারিশ করেছেন এবং এমনকি মন্ত্রকে গিয়ে মন্ত্রির সঙ্গে দেখা করে কাজটিকে ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করেছেন।
বহু চেষ্টার পর ছত্রিশগড়ের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অজিত জোগী ও উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মুলায়ম সিং যাদবের নেতৃত্বাধীন সরকার সেই সেই রাজ্যের নমঃশূদ্রদের তফসিলীভুক্ত করার জন্য কেন্দ্রের কাছে সুপারিশ করেন। পরবর্তীকালে ছত্রিশগড়ের বি. জে. পি. সরকারের বিরোধিতায় সেই রাজ্যের নমঃশূদ্রদের আশা আজও অপূরণ থেকে গেছে এবং সম্প্রতি মায়াবতী সরকারের বিরোধিতায় উত্তরপ্রদেশের নমঃশূদ্ররা বঞ্চিত হলেন।
মাত্র কিছুদিন আগে কেন্দ্রিয় সরকার উত্তর প্রদেশের রাজভর, নমঃশূদ্র, বীন, ধীমন, মধুয়ারা, কৈবর্ত, মোল্লাহ্, কাহার, কশ্যব ও গৌর সম্প্রদায়কে তফসিলীভুক্ত করার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। ১৪ই আগষ্ট ০৭ তারিখে রাজ্যসভায় এক প্রশ্নের জবাবে সামাজিক ন্যায়মন্ত্রকের মন্ত্রি মীরাকুমার এই কথা জানান। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শুধুমাত্র মহাতন, রায়শিখ ও তুড়ি সম্প্রদায়কে তফসিলীভুক্ত করা হয়েছে—যারা উত্তরপ্রদেশের আদি মানুষ নন। মীরাকুমার বলেন, উত্তরপ্রদেশের মায়াবতী সরকারের বিরোধিতার জন্যই নমঃশূদ্র ও ঐ রাজ্যের অন্যান্যদের তফসিলী জাতিভুক্ত করা যায়নি। সাংসদ অমর সিং প্রশ্ন করেন, উত্তরপ্রদেশের রাজভর, নমঃশূদ্র, বীন, ধীমন, মধুয়ারা, কৈবর্ত, মোল্লাহ্, কাহার, কাশ্যব ও গৌর সম্প্রদায়কে তফসিলী জাতিভুক্ত করার জন্য মুলায়ম সরকার সুপারিশ করে প্রস্তাব কেন্দ্রের কাছে পাঠিয়েছিলেন, তার ফলাফল কী? সাংসদ বৃন্দা কারাতও উত্তরপ্রদেশের নমঃশূদ্রদের তফসিলীভুক্ত করার কী হলো—তা জানতে চান।
জবাবে মন্ত্রি মীরাকুমার বলেন, ২৩/১১/২০০৫ তারিখে উত্তরপ্রদেশ সরকার ঐ সমস্ত সম্প্রদায়কে তফসিলী জাতিভুক্ত করার জন্য সুপারিশ করে প্রস্তাব কেন্দ্রে পাঠায়। নিয়ম অনুযায়ী সামাজিক ন্যায়মন্ত্রক এ ব্যাপারে ‘রেজিষ্টার জেনারেল'-এর মতামত জানার জন্য সমস্ত নথিপত্র 'রেজিষ্টার জেনারেল'-এর দপ্তরে পাঠিয়ে দেয়। ‘রেজিষ্টার জেনারেল' আরও কিছু তথ্য চেয়ে পাঠায়। সামাজিক ন্যায়মন্ত্রক ঐ সব প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর জানাতে উত্তর প্রদেশ সরকারকে চিঠি লেখে। সেই চিঠির জবাব দিয়েছে উত্তরপ্রদেশের মায়াবতী সরকার। সামাজিক ন্যায়মন্ত্রক উত্তরপ্রদেশ সরকারের জবাবী চিঠি পেয়েছে গত ৬/৬/০৭ তারিখে। তাতে বলা হয়েছে—কিছু সম্প্রদায়কে তফসিলী জাতিভুক্ত করার জন্য উত্তরপ্রদেশের আগের সরকার যে সুপারিশ করেছিল, তা বাতিল করা হলো।
আইন না থাকলেও পূর্ববর্তী সরকার উত্তরপ্রদেশের নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের ছাত্র-ছাত্রীদের কিছু স্টাইপেণ্ড দেবার নীতি চালু করেছিল। (সার্কুলার তারিখ— ১০/৯/৮৭)। জানা গেল বর্তমান সরকার তাও বাতিল করে দিয়েছে। অনুপ্রবেশকারি চিহ্নিতকরণ ও ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও মায়াবতী সরকার নতুন সার্কুলার জারি করেছে। উল্লেখ্য যে, নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ২০০৩ পাশ করার সময়ে বি. এস. পি. তাকে সমর্থন করে এবং পরবর্তীকালেও ঐ আইনের কোনরূপ বিরোধিতা তারা করেনি। পক্ষান্তরে রিপালিকান পার্টির দু'জন সাংসদ এই কালা নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে সংসদের ভিতরে এবং বাইরে যথেষ্ঠ সরব।
রিপাবলিকান পার্টি অফ ইণ্ডিয়া (RPI)
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি
(সহ-সভাপতি শ্রী ব্রজেন্দ্রনাথ হালদার, দম দম ক্যান্টনমেন্ট, কর্তৃক প্রচারিত)
—-------------------------------------------------------
বিনীত নিবেদন
আয়নায় নিজের মুখটা দেখুন!
[ বন্ধুগণ, দলিতবর্গের লেখক-বুদ্ধিজীবীদের একটা ক্ষোভ আছে যে, বাজারের প্রতিষ্ঠিত পত্র পত্রিকাগুলি ও অন্যান্য প্রচার মাধ্যম দলিত বিরোধি। তারা দলিত সমাজ ও লেখকদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট। ঐসব কাগজ দলিত সমাজের খবরা-খবর বা দলিত লেখকদের লেখা ছাপতে চান না। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধি মতামত প্রকাশের সুযোগ দেন না। এই ক্ষোভ ও অভিযোগ অসত্য নয়, সঠিক। কিন্তু এই ক্ষোভ যাদের, তাদের নিয়ন্ত্রিত অতি ছোট (প্রচার ২০০/৩০০ মাত্র) কিছু কিছু পত্রিকার পরিচালকদের মানসিকতায় আলাদা কিছু বৈশিষ্ট পাওয়া যায় না; বরং তারা আরও বেশী সংকীর্ণ।
'নির্ভীক সংবাদ’—নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয় অনিয়মিতভাবে। পত্রিকার স্বাস্থ্য বর্তমানে খুবই খারাপ। তারা একটি বিষয়ে বিতর্কমূলক কয়েকটি চিঠি ছাপে (এখন মনে হচ্ছে গট্ আপ কেস্)। আমিও উৎসাহিত হয়ে একটি চিঠি লিখি। কিন্তু হতাশ হলাম এই কথা শুনে যে, আমার চিঠি ছাপা হবে না।—না, চিঠি বড় বলে নয় বা কাগজের সুউচ্চ মানের সাথে বেমানান রদ্দা চিঠি বলেও নয়। কাগজের এক প্রধান কর্তার কথায়, 'আমার চিঠির বক্তব্য কর্তাব্যক্তিদের মনঃপুত নয় বলে চিঠিটি ছাপা হবে না। বাঃ, একেই বলে আম্বেদকরবাদী স্পিরিট!
যাহোক, অন্যকোন পথ না পেয়ে লিফলেট আকারে আমার বক্তব্য আপনাদের কাছে পৌঁছে দেবার চেষ্টা করছি। এখানে নিরীহ মূল চিঠিটিতে ৪/৫টি ছোট বাক্য যুক্ত করে একটু সতেজ করা হয়েছে। অতিরিক্ত বাক্যগুলিকে বোল্ড হরফে উল্লেখ করা হলো। পড়ার জন্য যদি একটু সময় দেন, তাহলে বাধিত হবো। ]
মাননীয় সম্পাদক
নিৰ্ভীক সংবাদ, কলকাতা
মহাশয়, উত্তরপ্রদেশে মায়াবতী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ায় দলিত সমাজ খুশী। খুশী আমরাও। রিপাবলিকানরা যে খুশী তার প্রমান মুম্বাইয়ের মহালক্ষ্মী রেসকোর্স ময়দানে ৫/৬ লক্ষ মানুষকে (সম্পাদকীয় নির্ভীক সংবাদ) সমাবেশিত করে মায়াবতীকে সম্বর্ধনা দেবার উদ্যোগ। আমন্ত্রিত মায়াবতী যান নি। হয়তো দলিতদের সমাবেশে যাবার প্রয়োজন অনুভব করেন নি!
উত্তরপ্রদেশে বি. এস. পি-র সাফল্যে খুশীর প্লাবনের সাথে একটা বিতর্কও তৈরি হয়েছে। নির্ভীক সংবাদ পড়েও সে বিতর্কের আঁচ পাওয়া যায়। ব্রাহ্মণ সমাজের সাথে রাজনৈতিক বোঝাপড়া ঠিক অথবা বেঠিক—তা নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। এই সমঝোতা দলিত মানুষকে কতটা সুবিধা এনে দিতে পারবে অথবা তা দলিত সমাজের (বহুজন সমাজ) জন্য ক্ষতির কারণ হবে কি-না তা নিয়ে আশা ও আশংকার জন্ম দিয়েছে।
ড. আম্বেদকরের রাজনৈতিক দর্শনের মৌলিক নীতি হলো—একটি সাম্য, মৈত্রী ও সৌভ্রাতৃত্বের সমাজ গড়ে তোলা এবং এই কাজ সফল করার জন্য প্রয়োজন ভারতবর্ষকে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা।
দলিত সমাজ বা বহুজন সমাজ—নাম যাই বলা হোক না কেন, ভারতবর্ষের তফসিলী জাতি-আদিবাসী, ওবিসি এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুশ্রেণীর মানুষেরা ঘৃণিত, বেশী সংখ্যায় নিরক্ষর ও গরিব। তাদের উন্নয়নের প্রশ্ন অর্থাৎ সম মর্যাদা, সমানাধিকার ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া আম্বেদকরবাদী আন্দোলনের লক্ষ্য। যেকোন ব্যক্তি বা দল—যারা নিজেদের আম্বেদকরবাদী বলে দাবি করেন, তারা এই লক্ষ্যপথে চলছেন কি-না, সেটাই বিচার্য। লক্ষ্যে পৌঁছতে দীর্ঘপথ চলতে হবে। ঠিক পথ ধরে ধীরে চললেও একদিন অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হবে। কিন্তু ভুল পথ ধরে চললে লক্ষ্য চিরকাল অধরা থেকে যাবে।
ভারতীয় সমাজ ক্রমানুসারে উচ্চ-নীচ্ বর্ণে বিভক্ত। সমাজের এই বিভাজন দূর করা আম্বেদকরপন্থিদের কাজ এবং সেজন্যই তারা রাজক্ষমতা করায়ত্ত করতে চান। বহুজন সমাজের সামাজিক ঐক্য এবং রাজক্ষমতা দখল—এই দুই বিষয় পরস্পরের পরিপূরক। অর্থাৎ বহুজন সমাজগুলির মধ্যে সামাজিক ঐক্য বেশ পরিমানে হলে রাজক্ষমতা দখল সহজ হয়; আবার এই ঐক্যের উপর দাঁড়িয়ে (গোঁজামিল নয়) রাজক্ষমতা দখল হলে, সমাজগুলির মধ্যে ঐক্য ত্বরান্বিত করা যায়।
সমাজ বিজ্ঞানের এই আলোচনায় আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যে, নেতৃত্বের এক-একটি সিদ্ধান্ত, সমাজের উপর বা আলাদা আলাদাভাবে সমাজের প্রতিটি সাধারণ মানুষের মনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে। ভাল বা মন্দ যাই হোক না কেন, সহজে তা মুছে দেওয়া যায় না।
পূর্ববঙ্গে গুরুচাঁদ ঠাকুরের শিক্ষা আন্দোলনের রেশ আজও, বিশেষ করে নমঃশূদ্র সমাজের মানুষের মধ্যে পাওয়া যায়। তফসিলী বর্গের অন্যান্য বর্ণের মানুষ যতটা তাদের সন্তানদের লেখাপড়া শেখাতে আগ্রহী, তুলনায় নমঃশূদ্ররা অনেকটা এগিয়ে।
মহারাষ্ট্রে মাহার সম্প্রদায় ড. আম্বেদকরকে সাথ দিয়েছেন; কিন্তু জগজ্জীবন রামের প্রভাবে এমনকি মহারাষ্ট্রের চামার সমাজ ড. আম্বেদকরকে সহযোগিতা করেন নি। সেই পরম্পরায় আজও মহারাষ্ট্রের চামার সমাজ আম্বেদকরপন্থি নন। উত্তরপ্রদেশে রিপাবলিকান পার্টির তৎকালীন সাংসদ ও নেতা বি পি মৌর্য এবং পাঞ্জাবে মি. এল আর বালী, জগজিৎ সিং চৌহান প্রমুখের নেতৃত্বে উত্তরভারতে কিছু পরিবর্তন আসে। দলিত মানুষ আম্বেদকরবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন। কিন্তু কাজটা সহজে হয় নি ও বহু সময় পার হয়ে যায়। আরও পরে কাশীরামজী অনুকূল অবস্থাকে কাজে লাগাতে সক্ষম হন। জীবনের শেষপ্রান্ত পর্যন্ত জগজ্জীবন রাম কংগ্রেস পার্টিতে উপযুক্ত সম্মান পেলে অবস্থা অন্যরকমও হতে পারতো।
মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ তফসিলী ফেডারেশনে/ রিপাবলিকান পার্টিতে যোগ দেন এবং ড. আম্বেদকরের সহযোগী ভূমিকা পালন করেন। ফলে পশ্চিমবঙ্গে আজও আম্বেদকরবাদের যেটুকু চর্চা, তার বেশিটাই নমঃশূদ্রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পরবর্তীতে যোগেন্দ্রনাথের সি পি এম-এর সাথে নির্বাচনী সমঝোতার (১৯৬৭-৬৮) ফলাফল হিসাবে — সি পি এম-পার্টির নমঃশূদ্রদের মধ্যে অনুপ্রবেশের একটা বড় কারণ হতে পারে। পৌন্ড্রক্ষত্রিয়দের মধ্যে দীর্ঘকাল যাবত কংগ্রেসের প্রভাব টিকে থাকার অনুরূপ কারণ আছে। মহান বীরেন্দ্রনাথ শাসমল ও মেঘনাদ সাহা মহাশয়ের কিছু ঐতিহাসিক ভুলের নেতিবাচক ভূমিকা আজও মিলিয়ে যায় নি। তাদের সমাজকে আজও মূল্য দিতে হচ্ছে!
অর্থাৎ নেতৃত্বের সঠিক বা বেঠিক — যে সিদ্ধান্তই হোক না কেন, তা আর শুধু নেতৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ক্রমেই নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা সমাজে ও সমাজের প্রতিটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। শত্রু-মিত্র সম্পর্কে একটা ধারণা গড়ে ওঠে। নেতৃত্ব চাইলেই তা আর তারা দ্রুত গুটিয়ে তুলতে পারেন না বা পরিবর্তন করতে পারেন না। তারজন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। ভুল সংশোধনের সময় ও সুযোগ নেতারা সবাই পাবেন, এমন নাও হতে পারে।
ব্রাহ্মণরা সমাজে শ্রদ্ধেয় ও পূজ্য। তারা সবার শ্রদ্ধা পাবার এবং সবাইকে ঘৃণা করার অধিকারি। যা কিছু ভাল—তা ভোগের অধিকার শুধু ব্রাহ্মণের; আর ব্রাহ্মণের উচ্ছিষ্ট শুদ্রের পবিত্র প্রসাদ। সুদীর্ঘকাল ধরে চলে আসা এই ধারণায় শুধু আঘাত শুরু হয়েছে। সেসব কিছু ভাঙাতো দূরের কথা, এমনকি আজও তার ভিত নড়ে নি এতটুকু। এই অবস্থায় উত্তরপ্রদেশে যে নয়া সমীকরণ, তা কী বার্তা ও শিক্ষা বয়ে নিয়ে যাবে গোটা দেশের বহুজনের কাছে, বিচার্য হতে পারে সেটাই।
সমঝোতার কিছু অতীত ইতিহাস আমাদের জানা আছে। ১৯০৫-১১ পর্যায়কালে বঙ্গভঙ্গ ও অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শুরুটাদ ঠাকুরের নেতৃত্বে মুসলমানদের সাথে এক ধরনের ঐক্যজোট তৈরি হয়। প্রতিপক্ষ ছিলো উচ্চবর্ণ সমাজ। রামস্বামী পেরিয়ার ও মহাত্মা জ্যোতিবা ফুলের আন্দোলনেও সরাসরি প্রতিপক্ষ ছিলো উচ্চবর্ণ সমাজ। পেরিয়ার বলতেন, 'ব্রাহ্মণ বিষধর সাপের থেকেও ভয়ংকর.........।' ১৯৩০-৩২ পর্যায়কালে গোলটেবিলে আলোচনার লড়াইয়ে মুসলমান সমাজ ও তাদের নেতৃত্বের সহযোগিতায় ড. আম্বেদকর উচ্চবর্ণ সমাজের প্রতিনিধিত্বকারি কংগ্রেসের বাধা অতিক্রম করেন। উচ্চবর্ণীয় সমাজের আগ্রাসী মনোভাবের মোকাবিলায় মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথও মুসলমানদের সঙ্গে ঐক্য গড়ে তোলেন। এই সমস্ত পর্যায়কালে ওবিসি. ধারণা সুস্পষ্টভাবে আসে নি, যদিও সংবিধানে ৩৪০ ধারা প্রবর্তন করে ড. আম্বেদকর আমাদের অন্য এক মিত্রশক্তির সন্ধান জানিয়ে যান। দলিত আন্দোলনের প্রাতঃস্মরণীয় নেতাদের এইসব মহান শিক্ষার কথা আমরা সবাই জানি; কিন্তু অনুশীলনের সময়ে আমাদের স্মৃতিভ্রংশ হয়। দলিত সমাজের সাথে ব্রাহ্মণ সমাজের ঐক্য!--- ভালকথা। কিন্তু প্রতিপক্ষ কারা ? – ওবিসি. সমাজ ? এ বুঝি বহুজন পার্টির সৃজনশীল ব্যাখ্যা!
তবে একথা ঠিক যে, ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে ড. আম্বেদকরের নির্বাচনী সহযোগী ছিল পূণার ব্রাহ্মাণ ভোপাটকারের ডেমোক্রাটিক স্বরাজ পার্টি। সে ছিল নেহাত নির্বাচনী সমঝোতা। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লড়াই করে ড. আম্বেদকর ১৯৪৬ সালে বাংলাপ্রদেশ থেকে গণপরিষদে নির্বাচিত হন এবং ১৯৪৭ সালের ২০শে জুন বাংলাভাগ হবার সাথে সাথে অন্য অনেকের সাথে তারও সদস্যপদ খারিজ হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে (শেখর মিস্ত্রি লিখিত ১৯৪৬ সাল নয়) তিনি পুননির্বাচিত হয়ে আসেন এবং সংবিধান রচনার দায়িত্ব পান ২৯শে আগষ্ট।
গণপরিষদে বিভিন্ন কমিটির সদস্য হিসাবে ড. আম্বেদকর অসামান্য সাফল্য ও যোগ্যতার জন্য গণ পরিষদের চেয়ারম্যান ড. Rajendra Prasad মহারাষ্ট্রের প্রিমিয়ার মি: খারেকে লেখেন," ড. আম্বেদকরের বিচক্ষণতার সুফল থেকে দেশকে বঞ্চিত করা চলে না। তাই, তাকে গণ পরিষদে পুননির্বাচিত করে পাঠান।" মহারাষ্ট্রের এক নেতা জয়কার ওই সময়ে গণ পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। প্রিমিয়ার খারে সেই সুযোগ নিয়ে আম্বেদকর পুনঃনির্বাচিত করে পাঠান। সেই ঘটনা উল্লেখ করে মায়াবতীর দলিত - ব্রাহ্মণ রসায়নের পক্ষে যুক্তি খাড়া করা ঠিক নয় বলেই মনে হয়।—দেশ স্বাধীন হবার সময়কালের পরিস্থিতি আজকের থেকে অনেকটা আলাদা ছিল। দেশে সর্বদলীয় বা জাতীয় সরকার গঠিত হয়েছিল। ফলে, উত্তরপ্রদেশের পরিস্থিতির ব্যাখ্যা ও সমর্থনের জন্য মিস্ত্রি মহাশয়ের যুক্তির প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে ভাবা দরকার।
আমাদের ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না যে, নির্বাচনী সমঝোতা, যুক্তফ্রণ্ট সরকার—এসব এক জিনিষ, আর পার্টির ক্ষমতা ভাগাভাগি করা অন্য জিনিষ। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশের ব্রাহ্মণদের সাথে, যারা সেই রাজ্যে যথেষ্ট সংখ্যাভারি। মায়াবতী যতই পার্টির সুপ্রিমো হোন—ব্রাহ্মণ দলিত সমীকরণ বা রসায়নে পার্টির বিভিন্ন স্তরে ক্ষমতার প্রশ্নে দলিতদের পিছু হটা ও ব্রাহ্মণদের কব্জা শক্তিশালী হবার প্রক্রিয়া চলবেই। দলিতদের হাতে পার্টির ক্ষমতা ধরে রাখার তাগিদে নীতি ও রীতি বর্হিভূত হস্তক্ষেপে পার্টিতে বিশৃঙ্খলা ও ভাঙনের সম্ভাবনা দেখা দেবে। এমনকি গোটা পার্টির ক্ষমতা বে-দখল হবার মত বিপদের মুখোমুখি পড়তে হতে পারে।
অতীতে মায়াবতীর সহযোগিতায় বিজেপি-র উত্তর প্রদেশের ক্ষমতা দখল সম্ভব হয়। উত্তর প্রদেশের রাজক্ষমতা বিজেপি-কে কেন্দ্রের রাজক্ষমতায় উন্নীত করে। এ হেন উত্তর প্রদেশের ব্রাহ্মণরা বেশ কিছুকাল রাজনৈতিক ক্ষমতাহারা হয়ে কোনঠাসা। কংগ্রেস-বিজেপি নামের হাতিয়ার যখন অকেজো—বিএসপি-কে আশ্রয় করে তারা ক্ষমতার অংশ পেতে চায়, রসদ জোগাড় করে চাঙা হয়ে উঠতে চায়।
১৯৯৭ সালে বিজেপি-র সমর্থনে মায়াবতী মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। পরিণতিতে মহারাষ্ট্রে আম্বেদকর মূর্তির অবমাননা ও ২১ জন দলিত মানুষকে হত্যার বিরুদ্ধে বিজেপি-শিবসেনা সরকারের বিরুদ্ধে একটা বিবৃতি প্রকাশ করতে পারেননি মায়াবতী। বিজেপি-র সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করায় মুসলমান সমাজ বিরূপ হয়। এবার ক্ষমতায় গিয়ে মায়াবতীকে প্রথমেই গরিব ব্রাহ্মণদের সংরক্ষণের কথা বলতে হচ্ছে—যা অন্য কোন সরকার আজও উচ্চারণ করেনি। মায়াবতী মন্ত্রীসভার বেপরোয়া ব্রাহ্মণ মন্ত্রীর পরিবার, দলিত পরিবারের উপর চড়াও হয়ে দলিতদের গণধর্ষন করতে পিছপা হচ্ছে না; অথচ তার বিরুদ্ধে বহুজন পার্টির কোন আন্দোলন নেই! ১৯৯১ সালের ১৪ এপ্রিল মায়াবতী বলেছিলেন (হামেশাই বলতেন) ‘কোনও ঠাকুর -ব্রাহ্মণ এই সমাবেশে উপস্থিত থাকলে তিনি চলে যান। কারণ এই সমাবেশ তাদের বিরুদ্ধে' —তাই আজকের অলিম্পিক স্টাণ্ডার্ড ডিগবাজিতে এই প্রশ্ন উঠবেই যে—কার কাছে, কার আত্মসমর্পণ? —এই বিশ্লেষণ হওয়া দরকার।
ব্রাহ্মণরা মূলতঃ বিএসপি-র ব্রাহ্মণ প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন। ফলে বিএসপি-র মোট ২০৬ জন এমএলএ-র মধ্যে দলিতবর্গের এমএলএ অতি নগন্য। এক চতুর্থাংশেরও কম—যা নিয়ে দলিত স্বার্থে আইন ও নীতি প্রবর্তন এবং প্রয়োগ-অনুশীলন প্রায় অসম্ভব। ফলে গতানুগতিকতার গণ্ডি পেরনো মুসকিল, ঝুঁকিপূর্ণ। এধরনের কোন প্রচেষ্টা সরকারের বিপদ ডেকে আনবে।
হালে পানি পাওয়া ব্রাহ্মণরা ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করবেই। টানা-পোড়েন চলবে। কে বা কারা জিতবে বা হারবে, ভবিষ্যৎ তা বলে দেবে। বিনীত প্রশ্ন হল—বিকৃত বিবেক ব্রাহ্মণ সমাজকে এমন সুযোগ কেন দেওয়া হবে!
ধন্যবাদসহ
সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস
নতুনপল্লী, মসলন্দপুর, উত্তর ২৪ পরগনা
(রিপাবলিকান পার্টির পক্ষে ব্রজেন্দ্রনাথ হালদার, দমদম ক্যান্টনমেন্ট কর্তৃক প্রচারিত, বিভূতি প্রিন্টিং ওয়ার্কস্, ৩১/১এ নবীন চাঁদ বড়াল লেন, কল-১২ থেকে মুদ্রিত)
—-------------------------------------------------------
মাননীয় সম্পাদক, 'নির্ভীক সংবাদ' পত্রিকা, কলকাতা,
তারিখ : ১৭-০৯-০৭
মহাশয়,
আপনাদের পত্রিকার ১৫ই সেপ্টেম্বর '০৭ সংখ্যাটি পেলাম। তাতে ‘নির্ভীক পত্র' শিরোনামে একটা লেখা পড়লাম। লেখাটিতে লেখকের নামধাম কিছু লেখা হয় নি। তবে অনুমান করতে কষ্ট হয় না যে, দিলীপ গায়েন মহাশয়ের লেখা এই নিবন্ধটি। একই সংখ্যায়, গায়েন মহাশয়ের 'আম্বেদকর প্রধানমন্ত্রি' শিরোনামে লেখাটি পড়লেই তা বোঝা যায়। তবে অনুমানতো, অনুমানই—তাতে ভুল হতেও পারে। ‘নির্ভীক পত্র' নিবন্ধটি নিয়ে আমি দু'চার কথা লিখতে চাই।—
আমার লেখা যে চিঠি বা লিফলেট পত্রটি নিয়ে এই নিবন্ধ, তা কিন্তু আপনারা ছাপেন নি। ছাপতে সাহস পান নি। পাঠকদের কাছে আমার লেখা চিঠির বিষয়বস্তু পৌঁছে দিলেন না, অথচ তার জবাব পৌঁছে দিচ্ছেন—এটা কেমন ব্যাপার? মিথ্যা জানিয়ে পাঠকদের বিভ্রান্ত করার জন্যই যে আপনাদের এই অপকৌশল, লেখাটি পড়েই তা বোঝা যায়। চিঠিটি আপনারা ছাপেননি— না ছাপতেই পারেন, সেটা কাগজের নিজস্ব ব্যাপার। জবাব ছাপছেন, ছাপতেই পারেন, তাও আপনাদের নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু জবাব লেখা লেখকের নাম ছাপার সাহসটুকু থাকবে না কেন! সাহস নেই, কারণ, লেখাটিতে মিথ্যার বেসাতি করা হয়েছে।
‘নির্ভীক পত্রে' লেখা হয়েছে—“লিফলেট পত্রে বলা হয়েছে, উঃ প্রদেশের মন্ত্রিসভায় ব্রাহ্মণমন্ত্রি নিয়োগে মায়াবতী ভুল করেছেন। দ্বিতীয়তঃ মায়াবতী ও বি সি বিরোধি।” –মহাশয়, এমন কথা লিফলেটটিতে কোথাও লেখা নেই। দয়া করে একবার পড়ে দেখুন! বক্তৃতাকে উল্টোপাল্টা বলে চালানো যায়, কারণ রেকর্ড না করলে তার তেমন কোন প্রমান থাকে না; কিন্তু লিফলেটটাতো ছাপা হয়েছে। তবে বাংলা পড়ে বুঝতে না পারলে অন্য কথা!
‘মন্ত্রিসভায় ব্রাহ্মণমন্ত্রি' এমন কোন শব্দই লিফলেটটিতে নেই বলেই মনে হয়। যা বলা হয়েছে, তাহলো—‘ব্রাহ্মণ সমাজের সাথে রাজনৈতিক বোঝাপড়া’ এবং ‘ব্রাহ্মণ সমাজের সাথে পার্টির কর্তৃত্ব ভাগাভাগি করার ব্যাপারটা ঠিক হয়েছে কি-না'। — তা নিবন্ধ লেখক এই প্রসঙ্গ নিয়ে দু'কথা লিখলে পাঠকরা হয়তো কিছুটা সমৃদ্ধ হতেন।
ও বি সি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, একটা রাজনৈতিক লড়াইয়ে শক্তি বাড়াতে ব্রাহ্মণদের সাথে জোট বাধা হয়েছে। কিন্তু সেখানে প্রতিপক্ষ কারা? রাজনৈতিক আলোচনায় আমরা মোটা দাগে সাধারণতঃ চারটি সমাজের কথা বলে থাকি (১) দলিত সমাজ (২) মুসলমান সমাজ (৩) ওবিসি সমাজ (৪) উচ্চবর্ণীয় সমাজ। উত্তরপ্রদেশে সাধারণভাবে গত নির্বাচনের সময় পর্যন্ত ওবিসি ও মুসলমানরা একজোট ছিলেন। তাই, স্বাভাবিকভাবেই এই জোটের মোকাবিলার জন্য ব্রাহ্মণদের সাথে নিয়ে মায়াবতীর নতুন সমীকরণ এবং জোট বাধাবাধির প্রভাব যে ধীরে ধীরে সামাজিক সম্পর্কে—বন্ধুত্ব বা শত্রুতার সৃষ্টি হয় বা হতে পারে কি-না, তা বিচার করার কথা বলা হয়েছে লিফলেটটিতে এবং তা রাখা হয়েছে ‘প্রশ্নবোধক' আকারে।
ওবিসিদের সাথে দলিতদের সামাজিক সম্পর্ক ভাল নেই। এই দূরত্ব কমানোর চেষ্টা হবে; না বাড়িয়ে তুলবো? –---প্রশ্ন এটাই। মুলায়মের বহুজন সমাজ গড়ার কোন দায়-দায়িত্ব নেই; কিন্তু আম্বেদকরবাদীদের বোধ হয় তা আছে। মায়াবতীর এই সিদ্ধান্তের ফলাফল কী হতে পারে—বিশ্লেষণের অভিমুখ সেটাই হওয়া বাঞ্ছনীয়।
মায়াবতীর মন্ত্রিসভায় ওবিসি আছেন কি-না বা কতজন এম. এল. এ আছেন, তা দিয়ে বিশেষ কিছু প্রমাণ হয় না। সি পি এম-এ অনেক দলিত এম এল এ আছেন, তাতে কী প্রমাণ হয়—তাতো এই লেখাতেই আছে। সি পি এম যদি ‘দালাল/চামচা' দলিত জোগাড় করতে পেরে থাকে, তাহলে ও বি সি বা মুসলমানদের মধ্যে মায়াবতী 'দালাল/চামচা' পাবেন না—এটা ভাবা কি আপনার ঠিক হচ্ছে?
আপনারা পার্টি করেন। সেই পার্টির কৃতিত্ব দাবি ও প্রচার আপনারা করবেন, এটাই স্বাভাবিক। তা করুন। তবে মণ্ডল কমিশন কার্যকরি করার একক কৃতিত্ব বি এস পি-র বলে যে দাবি আপনারা করেন, তা সত্য নয়। বহু আন্দোলনের ফসল ওটা। তার ভাগীদার অনেক দল ও ব্যক্তির সাথে বি এস পি ও কাশীরাম। কিন্তু যেন-তেন-প্রকারে ক্ষমতার লোভ মায়াবতীকে লাইনচ্যুত করছে কি-না, সেদিকে সতর্ক নজর রাখা জরুরি বলে আমার মনে হয়।
মায়াবতী বিরোধি হলেই তারা প্রতিহিংসা পরায়ন বা আম্বেদকর বিরোধি—এভাবে সমীকরণ কষাটা বোধহয় ঠিক নয় — লেখক একবার ভেবে দেখতে পারেন। তবে রাজনীতিতে যদি আপনি আমাকে বা আমার মত অনেককেই ‘শিশু’ বলেন, তাহলে, অন্যরা কী বলবেন জানি না, আমি যে ‘রাজনীতিতে শিশু’ একথা মেনে নিচ্ছি। জেনে রাখুন—আপনার মতো ‘রাজনৈতিক বোদ্ধাদের' বা 'প্রবীণ রাজনীতিকদের' সামনের সময়তো কমে এসেছে, শেষ হয়ে এসেছে; কিন্তু ‘শিশুদের' সামনে সুযোগ আছে—শেখার সুযোগ, সংশোধন হবার সুযোগ ও অনেক বেশি কাজ করার সময়ের সুযোগ।
শব্দটা হুবহু ব্যবহার না করলেও লিফলেট লেখক ‘মনুবাদীদের দালাল' এটা আপনি বলতে চেয়েছেন। এই সমাজের কিছু ‘রাজনৈতিক উন্মাদ' (Political fanatic) কথায় কথায় নানাজন সম্পর্কে 'দালাল', চামচা' এসব শব্দের অপব্যবহার করে সমাজের যথেষ্ট ক্ষতি করেছেন। নিজেদেরও হাসির খোরাকে পরিণত করেছেন। দয়া করে এগুলি এখন বন্ধ করুন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য, মতাদর্শগত লড়াই হবেই, হোক; কিন্তু এমন কথা, শব্দ, না বলা ভাল — যাতে ব্যক্তিগত সম্পর্ক খারাপ হয়, বন্ধুত্ব নষ্ট হয় বা সমাজের বিভিন্ন মানুষের মধ্যে শত্রুতা তৈরি হয়। বাজে কথা বললে, লিখলে; কথার পরে কথা পড়বে—সেটা বন্ধ করা যায় কি-না?
লিফলেট লেখককে আপনি/আপনারা চেনেন, জানেন। আপনাদের মতই আরও কিছু মানুষ চেনেন। আপনি লিফলেট লেখক সম্পর্কে যা লিখেছেন, সত্যিই কি তাই ভাবেন? না যা লিখেছেন, তেমন ভাবেন না? গত ১০/১৫ বছরে পশ্চিমবাংলায় যতটুকু যা আন্দোলন হয়েছে, তাতে আমি আছি। ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে যতটুকু কলমের লড়াই হয়েছে—তাতেও আমার অংশ আছে। কর্মচারি ক্ষেত্রে সারাভারত জুড়ে কাজ করেছি—খোঁজ করে দেখুনতো আপনার লেখার সমর্থনে কোন তথ্য প্রমান জোগাড় করতে পারেন কি-না। বরং আপনি যে মাটিতে দাঁড়িয়ে আজ কিছু কাজ ও দু’কথা বলার চেষ্টা করছেন, অঞ্চল হিসাবে তার মাটি তৈরিতেও আমার কিছু অবদান হয়তো আছে। ‘লাঙল ছেড়ে কলম ধরার' লক্ষ্য কিন্তু এই নয় যে, যা খুশি তাই লেখা যায়! আপনারা কেউ কেউ তাই করছেন।
ব্রাহ্মণ সমাজের একাধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম মানে প্রতিহিংসা? কী বলতে চেয়েছেন আপনি? লিফলেটে কোন ব্যক্তি হিংসার কথা লেখা নেই, ভাল করে পড়ে দেখুন। ব্রাহ্মণ সমাজের একাধিপত্যকে ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে সমানাধিকার, সমান মর্যাদা, সমান সম্মান প্রতিষ্ঠার জন্য গোটা অব্ৰাহ্মণ সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হবার কথাই হলো ড. আম্বেদকরের শিক্ষা। ব্রাহ্মণ সমাজের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে সে একাজ করা যায় না—লিফলেটে সেকথাই বলা হয়েছে। বলা হয়েছে—ব্রাহ্মণ সমাজের সাথে কোন দলিত পার্টি, পার্টির ক্ষমতা ভাগাভাগি করে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরোধিতা করতে পারে না, তাতে গোটা পার্টির ক্ষমতার ভরকেন্দ্র ব্রাহ্মণদের হাতে চলে যাবার মত বিপদ হতে পারে। লেখা হয়েছে “মায়াবতীর পদতলে ব্রাহ্মণরা থাকায়.....” —কার পদতলে কে বা কারা আছেন, সে আলোচনা এখন থাক; কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই মানসিকতাই বুঝি, সাম্য, মৈত্রী ও সৌভ্রাতৃত্ব? “তিলক, তরাজু, আউর তলোয়ার; তিনোকো মার জুতা চার”—এ শ্লোগানও বুঝি সৌভ্রাতৃত্বের নমুনা !
মহাশয়কে বলি, নির্বাচনে যে কেন্দ্রে যে দল জিতে যায়, তার মানে সেখানকার নমঃশূদ্ররা সেই দলপন্থি হয়ে যায়—এমন জ্ঞান নিয়ে লেখালেখি না করাই ভাল। তাতে ভালোর থেকে সমাজের ক্ষতি হয় বেশি।
লিফলেটে আমি লিখেছি— 'যোগেন্দ্রনাথের জন্য নমঃশূদ্রদের মধ্যে আম্বেদকর চিন্তার প্রবেশ ঘটে। আর, সি পি এমের সাথে মহাপ্রাণের নির্বাচনী সমঝোতার কারণে নমঃশূদ্রদের মধ্যে সি পি এমের অনুপ্রবেশের একটা বড় কারণ হতে পারে।' আর আপনি লিখছেন —“দেশভাগের পর যোগেনবাবুর অবস্থানে নমঃশূদ্ররা তার উপর আজও ক্ষিপ্ত। নমঃশূদ্ররা যোগেন্দ্ৰপন্থি কখনোই নয়” ইত্যাদি। আপনিতো দেখছি অসাধারণ ইতিহাসতত্ত্ববিদ ও ইতিহাস বিশ্লেষক! আপনার দৌড়টাতো জানলাম; কিন্তু কাগজটাতো আপনার একার নয়—সেখানেইতো খট্কাটা থেকে গেল !
—------------------------------------------------------
( চিঠিখানি 'বুধবার' পত্রিকা প্রকাশ করেছে কি-না, তা জানিনা। কারণ পরের আর কোন কপি আমি পাইনি। যাই হোক না কেন, পাঠকদের জন্য চিঠিখানি এখানে ছেপে দেওয়া হলো )
মাননীয় সম্পাদক,
“বুধবার' পত্রিকা
বীরনগর, নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ।
মহাশয়,
আপনাদের পত্রিকার ২য় এবং ৩য় সংখ্যাটি শ্রীমণিমোহন বৈরাগী ও শ্রী সুবোধ কাইয়া মহাশয়ের মাধ্যমে পেলাম। অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে তারা কপি দু'টি দিলেন; আমিও আগ্রহ সহকারে তা পড়ে ফেলি।
‘খুব ভাল লেগেছে’—শব্দগুলি লিখতে পারলে আমারও ভাল লাগতো। কিন্তু তা নিজের উপলব্ধির সাথে প্রতারণা করা হতো। আমি তা করি না, সেটা আমার স্বভাব বিরুদ্ধ।
আপনাদের ‘বুধবার’ প্রকাশ করার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। মতুয়াদের বিভিন্ন সভা ও খবরা-খবর প্রকাশ খুবই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। হরি গুরুচাঁদের ‘ভক্তদের’, হরি-গুরুচাঁদের অনুগামী ও অনুসারী করার কাজে এই পত্রিকা চেষ্টা চালিয়ে থাক। এ কাজে যদি কিছু মাত্রায়ও সাফল্য আসে, সে হবে এক যুগান্তকারি ঘটনা!
খট্কা যেখানে লাগছে, তাহলো—বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু কী হবে? ওড়াকান্দির লীলামৃত, না ঠাকুরনগরের লীলামৃত মেনে চলা উচিৎ—ঝগড়া কি এ নিয়ে হবে, না হরিচাঁদ ঠাকুরের মৌলিক নীতি ও নির্দেশগুলির পাঠোদ্ধার করার চেষ্টা চলবে?—বেশী জোর আমরা কোথায় দেব?
মতুয়ারা হিন্দু কি না—আমরা এই প্রশ্ন নিয়ে আজও বিতর্ক চালিয়ে যাব, না হিন্দু ধর্মের কুসংস্কার ও চাপিয়ে দেওয়া মানসিক দৈন্যতাকে কাটিয়ে উঠতে মানুষকে চাগিয়ে তুলবো? ১৮৭১/৭২ সালের জনগণনা থেকে ১৯৩১ সালের জনগণনা পর্যন্ত সরকার দলিতবর্গের মানুষকে হিন্দু বহির্ভূত জনগোষ্ঠী হিসাবে বর্ণনা করেছে কি-না, তা একটি বিষয় হলেও, সেটা খুব বড় কথা নয়। নিজে নিজেকে হিন্দু মনে করছেন কি না—সেটাই মূল প্রশ্ন। ইতিহাস জানা ও যুক্তি বোঝা জরুরি; কিন্তু এ সব জানা মূল্যহীন হয়ে যায়, যদি, ঐ ইতিহাস ও যুক্তির নির্যাস আমরা ব্যবহারিক জীবনে কাজে না লাগাই বা অনুশীলনে নিয়ে যেতে না পারি।
পূজো, বিয়ে, শ্রাদ্ধ, এসবে ব্রাহ্মণ ডাকা বা না ডাকা একটা বড় বিষয় ঠিকই। কিন্তু মৌলিক প্রশ্ন হলো— পূজো, বিয়ে, শ্রাদ্ধের চলমান রীতিনীতি সবই হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতির অঙ্গ। তাকে আমরা বিদায় জানাতে পারি কি না? শাখা- সিঁদুর, এ সবকিছুই পরিত্যাগ করার কথা ভাবতে পারছি কি না!
একই বিতর্কে কিছুদূর এগিয়ে আবার গোড়া থেকে শুরু করার কোন মানে হয় না। প্রগতির রথ তাতে এগোয় না, অযথা কালক্ষেপ হয়। বৃত্তাকার রেখা ধরে যতই আমরা এগিয়ে চলিনা কেন, তাতে, বার বার আমরা একই জায়গায় ফিরে আসবো।
হরি গুরুচাঁদকে আমরা ভক্তি করি; কিন্তু তার নির্দেশ মেনে চলি না। বর্তমানে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও আমাদের অনেকেই ড. আম্বেদকরকে শ্রদ্ধা করেন, ভক্তি করেন; কিন্তু তার নির্দেশিত পথ অনুসরণ করেন না। মায়াবতীকে মানেন; কিন্তু তার নির্দেশ, সিদ্ধান্ত, মানতে রাজি নন। নিজের মতের সাথে যতক্ষণ মেলে, ড. আম্বেদকর বা মায়াবতীকে ততক্ষণ মানি; আর নিজের ইচ্ছা ও পছন্দের সাথে তাদের নীতি নির্দেশ মেলে না যখন, তখন তাদের মানি না! —এ কোন্ ধরণের মানসিকতা। বি. এস. পি-র কেন্দ্রিয় নেতৃত্বের উপর যখন অগাধ, অন্ধ আস্থা, তখন পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে তাদের যে সাংগঠনিক নির্দেশ তা মেনে চলাই ডিসিপ্লিন নয় কি!
মতুয়া ভক্তদের ক্ষেত্রে না হয় বোঝা গেল যে, তারা অধিকাংশই নিরক্ষর বা অল্প শিক্ষিত। কিন্তু আম্বেদকরপন্থিদের বা মায়াবতীপন্থিদের মধ্যে এ অবস্থা কেন?—নিছক সুবিধাবাদ নয়তো!
ভারতবর্ষের মত আম্বেদকরবাদের প্রাসঙ্গিকতা ইউরোপীয় দেশগুলিতে নেই। কারণ সেখানে বর্ণাশ্রম প্রথা এদেশের মত নেই; যদিও সাদা-কালোর একটা সমস্যা সেখানে আছে। জাতব্যবস্থা ও আম্বেদকরবাদের মধ্যে একটা গভীর সম্পর্ক আছে। জাতব্যবস্থা, বর্ণঘৃণা ও শোষণ-অবিচার যতদিন থাকবে আম্বেদকরবাদের প্রাসঙ্গিকতা ও প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে না। বর্ণবাদ উচ্ছেদ হবার পর আম্বেদকরবাদ মিলিয়ে যাবে কি-না জানি না; তবে প্রাসঙ্গিকতা যে অনেকটাই হারাবে একথা বলা যায়।
আর এই বর্ণবাদের মূলকথা হলো—ব্রাহ্মণসহ উচ্চবর্ণের একাধিপত্যের চাবিকাঠি। যাকে ব্রাহ্মণ্যবাদ বলা হয়, তা হাওয়ায় ভেসে থাকে না। মূলতঃ ব্রাহ্মণ সমাজই ব্রাহ্মণ্যবাদের আঁধার ও আশ্রয়। তাই, ব্রাহ্মণদের একাধিপত্যের অবসান ঘটাতে আম্বেদকরবাদ হলো এক শাণিত অস্ত্র। হরিগুরুচাঁদ, জ্যোতিবা ফুলে, পেরিয়ার, এইসব মহামণীষীর ধারাবাহিক অভিজ্ঞতা ও মণীষার সঞ্চিত ভাণ্ডার হলো আম্বেদকরবাদ। সমাজের এই ব্রাহ্মণদের পাশে ডেকে ও সাথে নিয়ে রাজঘোটকে চড়ে যারা আস্ফালন করছেন, তাদের কী বলা হবে জানি না; তবে এই আস্ফালনকে যেসব আম্বেদকরবাদী দু'হাত তুলে সমর্থন করেন, তাদের আহাম্মক বললে কি খুব দোষের হবে!
আপনার কাগজে লেখা হয়েছে— 'জনগণের সাথে বেইমানী মায়াবতী বরদাস্ত করেন না। কিন্তু একই সাথে আপনাদের অনেকের লেখায় পড়ছি, মুখে শুনছি—'মায়াবতী বেইমানকে পছন্দ করেন।' —কাশীরামজী ও মায়াবতী ভাল; কিন্তু তারা পছন্দ করেন পশ্চিমবঙ্গের সেই লোকটিকে, যিনি বেইমান ও সি. পি. এমের দালাল'। যদিও এসব কথার সত্যাসত্য আমি জানি না। তা আপনারাই ভাল জানেন। এসব পরস্পর বিরোধি কথা ও চিন্তা আমার মত অনেকের মাথায় ঢোকে না!
ভোটে জিতেছেন বলে প্রমাণ হলো যে, তার (মায়াবতীর পূর্ব তিন দফা) শাসন ছিল স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত'— এ হলো অতি সরলীকৃত ব্যাখ্যা। ঐ ফর্মুলা মেনে নিলে সি. পি. এম, কংগ্রেস, বি. জে. পি-কেও সার্টিফিকেট দিতে হয়। কারণ তারা কেন্দ্র ও অনেক রাজ্যে পর পর ক্ষমতায় এসেছে। অথবা মায়াবতী হেরে গেলে (এর আগেও অনেকবার অনেক কম আসন পেয়েছেন) কি বলা হতো যে, তার শাসন অস্বচ্ছ ছিল! তাজ করিডর মামলার রায় কী হবে জানি না- তবে ব্যক্তিগত বিপুল সম্পত্তির হিসাব দিতে গিয়ে মায়াবতী যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা মেনে নেওয়া যায় না। আয় বহির্ভূত এত টাকা থাকলে অভিযোগ উঠবেই। কর্মি সমর্থকদের পাঠানো টাকা ব্যক্তিগত এ্যাকাউন্টে জমা করা দুর্নীতিরই অংশ। ‘বুধবারের' জন্য পাঠানো টাকা মনিমোহনবাবুর পকেটে গেলে, দিলীপবাবুর কী প্রতিক্রিয়া হবে—বিচার করতে হবে এই আলোকে। আমরা জানি, মনিমোহনবাবু এমন কুকাজ কখনওই করবেন না; কিন্তু মায়াবতীর বেলায় তা বলা যাচ্ছে না। তাছাড়া হলফ নামায় তিনি কিন্তু ঐ টাকা তার বাক্তিগত টাকা হিসাবেই উল্লেখ করেছেন।
আমার বিনীত নিবেদন, দয়া করে নীচের দু'টো লাইন একটু স্মরণে রাখবেন—তাতে সমাজের ভাল ছাড়া মন্দ হবে না—
"কর জোড় করি বিধু দাড়াইয়া কয়।
শুন প্রভু এ ব্যাপারে যাহা মনে হয়।।
তব আজ্ঞা শিরোধার্য অবশ্য করিব।
মানিবার পূর্বে তাহা বুঝিয়া মানিব।।”
[ গুরুচাঁদ চরিত—ডক্টর মীডের ওড়াকান্দি স্থিতি সম্বন্ধে স্বজাতি সভায় আলোচনা, পৃঃ ১৬৪ ]
সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস
নতুনপল্লী, মছলন্দপুর, উঃ ২৪ পরগনা। ফোন— ৯৮৩২১৫৭৪৮৭
—--------------------------------------------------------
Republican Party of India (RPI), West Bengal
Natunpally, P.O.-Maslandpur, Dist. - North 24 Parganas Phone: ৯৮৩২১৫৭৪৮৭ National President : Ramdas Athawale, M. P
State President: S. R. Biswas
Date: 23-08-07
প্রেস বিবৃতি
সি. পি. এম উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্রিশগড়ে বসবাসকারি নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের উদ্বাস্তুদের তফসিলী জাতিভূক্ত করার জন্য দাবি জানিয়েছে। কমঃ বৃন্দা কারাতের নেতৃত্বে গত ২১শে আগষ্ট তারা এ নিয়ে দিল্লীতে সমাবেশও করে। রিপাবলিকান পার্টি দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন রাজ্যে নমঃশূদ্র ও অন্যান্য তফসিলীভূক্ত বাঙালী উদ্বাস্তুদের নিজ নিজ রাজ্যে তফসিলীভূক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছে। দেরিতে হলেও সি. পি. এম পার্টি এই যে উদ্যোগ নিয়েছে, আমরা তাকে স্বাগত জানাই।
সি. পি. এম পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে ক্ষমতায়। তারা কিন্তু এই রাজ্যে মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ কার্যকরী করেনি। —যদিও দেশের অন্য রাজ্য সরকারগুলি তা করেছে। মণ্ডল কমিশন পশ্চিমবঙ্গের ১৭৭টি জাত-সম্প্রদায়কে ও.বি.সি. হিসাবে তালিকাভূক্ত করে। অথচ এই সরকার ‘সেন কমিশন' বসিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মাত্র ৬৬টি ছোট ছোট জাত-সম্প্রদায়কে ও.বি.সি. তালিকাভূক্ত করেছে এবং মাত্র ৭ শতাংশ সংরক্ষণ বরাদ্দ করেছে। দেশের অন্যান্য রাজ্য সরকারগুলি ও কেন্দ্রীয় সরকার ও.বি.সি. দের জন্য ২৭ শতাংশ সংরক্ষণ কার্যকরী করেছে। পশ্চিমবঙ্গে কাস্ট সার্টিফিকেট দিতে যারপরনাই হয়রানি করা হচ্ছে। ভিন্ রাজ্যের উদ্বাস্তু দলিত বাঙালীদের দাবির প্রতি সি. পি. এম যে আন্তরিক তা প্রমাণ করতে নিজের শাসনাধীন পশ্চিমবঙ্গে মাহিষ্য, সদগোপ, আগুরিসহ মণ্ডল কমিশন নির্দ্দিষ্ট সমস্ত জাত-সম্প্রদায়গুলিকে তারা ও.বি.সি. তালিকাভূক্ত করুক। বিশেষ করে মাহিষ্য সম্প্রদায়—যারা এমনকি এক সময়ে তফসিলী জাতি হিসাবে বিবেচিত হয়েছিল।
আশা করি কমঃ বৃন্দা কারাত ও অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেবেন—তাতে জনগণ সি. পি. এম-এর সদিচ্ছা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ
হবেন।
অরুণ মাজি সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস
সাধারণ সম্পাদক পঃ বঃ রাজ্য সভাপতি ।
মণ্ডল কমিশন এ্যাকশন কমিটি
[ বিবৃতিটি প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ]
—----------------------------------------------------
Republican Party of India (RPI), West Bengal
Natunpally, P.O.-Maslandpur, Dist. - North 24 Parganas Phone: ৯৮৩২১৫৭৪৮৭. National President : Ramdas Athawale, M.P State President : S. R. Biswas
Date: 16-09-07
প্রেস বিবৃতি
অতি সম্প্রতি বর্ধমান জেলার ভাতার বিধানসভা এলাকার ধীরেন বাছাড় ও অন্যান্য ৮৪ জন ভোটারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশি বলে অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের সবারই ভোটার তালিকায় নামতো আছেই; আছে রেশনকার্ড, জমির দলিল ও অন্যান্য কাগজপত্র। কিন্তু তাদের কাছে দাবি করা হচ্ছে নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র—সে বস্তু যে কী, তা ঐসব মানুষেরা বোঝেন না।
বর্ধমান জেলার পুলিশ সুপার (ডি. আই. বি) ঐ ৮৫ জনের নাম ও অন্যান্য নানা তথাকথিত তথ্যসহ তালিকা ভাতার থানার ওসি-কে পাঠিয়ে তাকে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। পুলিশ সুপার যে চিঠি লিখেছেন তার নম্বর ৩৭১৫/৪৬-০৫ তারিখ ১৯/০৪/০৬। ভাতার থানার ও.সি. ঐসব উদ্বাস্তু মানুষের বিরুদ্ধে 14 Foreigners' Act অনুযায়ী মামলা দায়ের ও ব্যবস্থা গ্রহণের কথা উল্লেখ করেছেন তার action taken report- এ।
ঐ সমস্ত মানুষেরা প্রায় সবাই নমঃশূদ্র। তারা বহুদিন আগে এদেশে এসেছেন এবং ঠাকুরনগর, মছলন্দপুর, অশোকনগর, হরিণঘাটা নানা জায়গায় দীর্ঘদিন বসবাস করার পর আশির দশকের বিভিন্ন সময়ে ভাতার থানার নানা গ্রাম ও কলোনীতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। ঐসব অঞ্চলে তাদের আত্মীয়- স্বজন 'বসতি' পেয়েছেন।
এই সমস্ত মানুষেরা যেকোন সময়ে গ্রেফতার হবার ভয়ে আতংকিত এবং বাড়িঘর ছেড়ে বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে গেছেন বা গ্রামের বাইরে রাত কাটাচ্ছেন। কোন বড় রাজনৈতিক দল তাদের পাশে দাঁড়ায় নি। অভিযোগ যে, থানার পুলিশ তাদের কাছে মোটা অংকের টাকা দাবি করছেন।
বিপদগ্রস্থ মানুষেরা অধিকাংশই মতুয়া। তাই, প্রতিকার দাবি করে তারা ঠাকুরনগর ঠাকুরবাড়িতে ‘মতুয়া মহাসংঘের' অফিসে ছুটে আসেন এবং বিহিত চেয়ে লিখিত আবেদন করেন। মতুয়া মহাসংঘ' এ ব্যাপারে আলোচনার জন্য আজ রবিবার (১৬/৯/০৭) সভা ডেকেছে বলে জানা গেল।
এদিকে ঘোলাজলে মাছ ধরার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বামঘেষা কিছু মানুষ ‘মতুয়া মহাসংঘের' কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন কলকাতায় সমাবেশ করার জন্য—যেখানে নাকি বামফ্রন্টের নেতারা ভাষণ দিতে চান।
বিজেপি, তৃণমূল, কংগ্রেস, বিএসপি ও বামফ্রন্ট্রের শরিক দলগুলি এবং সমস্ত রাজনৈতিক দলের সাংসদরা মিলে নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন ’০৩ পাশ করেছে। ফলে, তারা এইসব উদ্বাস্তুদের সহযোগিতা করতে কতটা আন্তরিক ও সমর্থ, বা ধোঁকা দিতে চায়—এ ব্যাপারে মতুয়া মহাসংঘ' কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখ করা প্রয়োজন – ২০০৪ সালে উদ্বাস্তুদের স্বার্থে এবং কালা নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে ‘মতুয়া মহাসংঘ’ ৭ দিনব্যাপী ঐতিহাসিক আমরণ অনশন আন্দোলন পরিচালনা করে ও প্রধানমন্ত্রির সাথে এ ব্যাপারে বৈঠক করে।
সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস
প. ব. রাজ্য সভাপতি রিপাবলিকান পার্টি অফ্ ইণ্ডিয়া
—-------------------------------------------------------
Republican Party of India (RPI)
West Bengal
Natunpally, P.O.-Maslandpur, Dist. -North 24 Parganas Phone : ৯৮৩২১৫৭৪৮৭. National President : Ramdas Athawale, M.P State President : S. R. Biswas
Date : 17-09-07
প্রেস বিবৃতি
উত্তর দিনাজপুর জেলার, জেলা সদর রায়গঞ্জ। এই রায়গঞ্জ ব্লকের বড়ুয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের একটি গ্রাম তারাইল। সম্প্রতি তারাইল গ্রামের ৯টা পরিবারের ৩৭ জন মানুষের ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড প্রভৃতি কেড়ে নিয়ে তাদের উঠোনে তা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্লকের বিডিও-র নেতৃত্বে এই অভিযান চলে।
তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। একথা সত্যি যে, তারা উদ্বাস্তু মানুষ। ওপার বাংলার রংপুর জেলার লালমনিরহাটে তাদের বাড়ি ছিল। ৩০/৩২ বছর আগে তারা ঐ দেশ ছেড়ে চলে এসে তারাইল গ্রামে বসবাস করছিলেন। বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারি বলে চিহ্নিত করে তাদের উপর এই অমানবিক অত্যাচার চলছে।
অভিযোগ যে, এইসব পরিবারগুলি সি পি এম-এর সমর্থক, তাই, তাদের বিরুদ্ধে তৃনমূল কংগ্রেস নালিশ করেছে প্রশাসনের কাছে। আবার—বর্ধমানের ভাতার থানার ঘটনা সম্পূর্ণ উল্টো। এক্ষেত্রে অভিযুক্ত ৮৫ জন মানুষ তৃনমূল কংগ্রেসের সমর্থক। তাই, জানা গেল—অভিযোগ করেছে সি পি এম।
সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি
[ সূত্র : সুভাষ চক্রবর্তী, তিনি ঐ গ্রামে গিয়েছিলেন ]
—-------------------------------------------------------
শুভেচ্ছা মূল্য : ১০ টাকা
লেখকের অন্যান্য বই
জীবন ও সংগ্রাম : ড. আম্বেদকর, ৫০ টাকা
প্রসঙ্গ : দলিত মুক্তি আন্দোলন, ১০০ টাকা
প্রসঙ্গ : দলিত মুক্তি আন্দোলন (২য় খণ্ড) রিপাবলিকান বার্তা সংকলন, ৫০ টাকা
প্রসঙ্গ : দলিতমুক্তি আন্দোলন (৩য় খণ্ড)
নীল আকাশ সংকলন, ১৫০ টাকা
প্রসঙ্গ : দলিতমুক্তি আন্দোলন, ৪র্থ খণ্ড (যন্ত্রস্থ), ১০০ টাকা
প্রসঙ্গ : দলিতমুক্তি আন্দোলন (৫ম খণ্ড)
প্রাপ্তিস্থান
চতুর্থ দুনিয়া, ২২ ভবানী দত্ত লেন কলেজস্ট্রীট, কলকাতা-৭০০০৭৩
নতুনপল্লী, মসলন্দপুর, উত্তর ২৪ পরগনা ফোন : ৯৮৩২১৫৭৪৮৭
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন