রবীন্দ্রনাথ কি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার বিরুদ্ধে ছিলেন?

 


অনেক দিন আগে কোন এক জনসভায় দলিত মুসলিমদের সমস্যা নিয়ে কিছু কথা বলেছিলাম। অনুমান ১০/১২ বছর আগের ঘটনা হতে পারে। আমার অজান্তে সেই কথাগুলি রেকর্ড করে কেউ ইউ টিউবে সেটা পোস্ট করেন। আবার সেই কথাগুলির একটা ছোট অংশ, যেখানে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা নিয়ে কিছু কথা বলেছিলাম, সেটুকু আলাদা করে প্রচার করা হচ্ছে। মনে হয় বাংলাদেশে এই রেকর্ড বেশি প্রচারিত হয়েছে।


ওই জনসভায় আমার মূল বক্তব্য ছিল বাংলার উচ্চবর্ন হিন্দু সমাজের বর্ন ধর্ম মানসিকতার ব্যাখ্যা — কীভাবে তারা দলিত ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈষম্য করেন, তাদের ঘৃনা করেন এবং তাদের প্রগতির পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা করেন ইত্যাদি। আমি সেই প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতার কথা বলেছিলাম। সাম্প্রতিককালে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপিত হয়েছে, আমার বক্তব্য নিয়েও কোন কোন ক্ষেত্রে বিতর্ক হয়েছে। কেউ কেউ আমাকে ফোন করেছেন, আর ফেসবুকে ঝগড়া হয়েছে। আমি মনে করি যে, ওই জনসভায় আমি বেঠিক কিছু বলিনি।


একশ' বছরের রাজনীতি নামে একটি বই লিখেছেন আবুল আসাদ। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুন নুর সাহেবের একটি বক্তৃতার উল্লেখ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সেমিনারে বলা ওই অধ্যাপকের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি  লিখেছেন যে, ১৯১২ সালের ২৮শে মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে বাংলার ভদ্রলোকশ্রেণী এক বিশাল জনসভা করেন। ইংরেজ সরকার ঘোষণা করেছিল, ঢাকায় একটি নুতন বিশ্ববিদ্যালয় গড়া হবে। ওই জনসভা ডাকা হয় ইংরেজ সরকারের সেই ঘোষণার বিরোধিতা করার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার বিরোধিতা করার জন্য ডাকা ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই কথা লেখা আছে আবুল আসাদের বইয়ের ৭১ পৃষ্ঠায়। আরো দুয়েকটি বইয়ে আমি একই রকম তথ্যের উল্লেখ পড়েছি।


ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার ঘোষণার দিন থেকে, বাস্তবত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময়কালের মধ্যে ব্যবধান ১০ বছর। অর্থাৎ ১০ বছর ধরে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন চলে। এই সময়কালে কলকাতার ভদ্রলোকশ্রেণীর মধ্যে যে সব মনীষীদের নাম শোনা যায়, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন — রাসবিহারী ঘোষ, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, গিরিশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ।— এইসব মনীষীরা প্রত্যেকেই ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার তীব্র বিরোধিতা করেছেন নানা যুক্তি ও কুযুক্তি খাড়া করে। তারা এই সময়কালের মধ্যে অনেকবার ইংরেজ সরকারের কাছে প্রতিবাদপত্র পাঠান, জানা যায় তারা ১৮ টি স্মারকলিপি দেন ইংরেজ সরকারের কাছে, যাতে সরকার ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার জন্য অনুমতি না দেয়।


ওই সময়কালে ঢাকার সবচেয়ে বড় উকিল ও গণ্যমান্য ব্যক্তি ছিলেন আনন্দচন্দ্র রায়। তার নেতৃত্বে ঢাকায় বসবাসকারী ২০০ জন বিশিষ্ট হিন্দু ভাইসরয়কে স্মারকলিপি দিয়েছিলেন, যাতে ইংরেজ সরকার যেন ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার অনুমতি না দেয় বা সরকার যেন ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় না গড়ে।


এইসব কথা ও তথ্য নিয়ে কোন বিরোধ বিতর্ক বিশেষ শোনা যায় না। অর্থাৎ এই কথাগুলি সত্য এবং তা মেনে নেওয়া হয়েছে। যত বিরোধিতা ও বিতর্ক হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বিতর্কে আবার দুটো অংশ আছে বলে মনে হয়, অন্তত আমার মতে দুইভাগে ভাগ করে এই সমস্যা বা বিতর্ক বোঝার চেষ্টা করা সঙ্গত। তাহলো — ১) রবীন্দ্রনাথ ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার পক্ষে, না বিপক্ষে ছিলেন? ২) আর ২৮শে মার্চের সভায় তিনি সভাপতিত্ব করেছিলেন কিনা?


আমার মতে দ্বিতীয় বিষয়টি গৌণ। আর যতদূর জানি রবীন্দ্র ভক্তরা দ্বিতীয় বিষয়টি নস্যাৎ করার জন্য কিছু কথা বলে থাকেন বা চেষ্টা করে থাকেন। ভক্তদের যুক্তি হলো — রবীন্দ্রনাথ ওইদিন শিলাইদহে ছিলেন, কবিতা লিখেছেন, সেই কবিতার নীচে তারিখ দেওয়া আছে ইত্যাদি। এভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয় যে, তিনি ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন নি।


এই নির্দিষ্ট প্রমাণটি নিয়ে দুটো সম্ভাবনার কথা বলা যায়। অবশ্য ভক্তবৃন্দকে এটা বলে কোন লাভ নেই বলেই মনে হয়। কারণ তারাতো ভক্ত, বিশ্বাসী —তাঁরা যুক্তির ধার ধারেন না! তারা রবীন্দ্রনাথকে অতিমানব হিসাবে কল্পনা করেন! তবু বলি —ওই কবিতা ও তারিখ নিয়ে কারচুপি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ করে থাকতে পারেন, অর্থাৎ তিনি নিজে কোন কবিতায় ব্যাকডেট দিয়ে থাকতে পারেন। উদ্দেশ্য হলো অতীতে নিজের কৃত কোন ফাউল ঢাকা দেবার চেষ্টা। অথবা ভক্তরা কোন কারচুপি করেছেন। জাতীয় সংগীতের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বর্তমান শাসকদেরও একটা বাধ্যবাধকতা আছে! 


আমি সম্ভাবনার কথা বলেছি। আমার এই কথাকে ভক্তরা কষ্ট কল্পনা বলতে পারেন বা হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিতে পারেন। কিন্তু ভক্তদের এইরকম ধারণা কেন ঠিক নয়, সে সম্পর্কে এখানে দুচার কথা বলবো এবং দেখাবো যে, দলিত ও মুসলমানদের স্বার্থের প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ খুব উদার ছিলেন না এবং দলিত ও মুসলমান প্রশ্নে তাঁর পাল্টি খাওয়ার অভ্যাস ছিল।


১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ করায় পূর্ববঙ্গের দলিত ও মুসলমান প্রজা কৃষকদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা পাবার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয় এবং বাস্তবত শিক্ষা, চাকরি ও নানাক্ষেত্রে বঙ্গভঙ্গের ওই অল্প সময়ের মধ্যে তাদের কিছু উন্নতি হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন — রাখিবন্ধন করেছিলেন এবং ডজন খানেক গান রচনা করে দলিত ও মুসলমানদের স্বার্থের বিরোধী ওই বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে গতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন। আবার ৩/৪ বছরের ব্যবধানে তিনি উল্টো অবস্থানে চলে যান। এই পাল্টি খেয়ে তিনি ঠিক বা বেঠিক করেছিলেন কিনা, সেটা বলছি না। তাঁর লেখা সদুপায়, পরিচয় এসব প্রবন্ধ পড়লে দেখা যায় তিনি মত পাল্টেছিলেন। হয়তো নিজের ত্রুটি ঢাকার চেষ্টা করেছিলেন।


 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়কাল পেরিয়ে আরো পরে ১৯৩২ সাল। সম্প্রদায়গত রোয়েদাদে দলিতদের অর্জিত সামান্য অধিকার কেড়ে নেবার জন্য গান্ধী পুনায় অনশন শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গান্ধীর সমর্থনে কলকাতার ভারত সভা হলে মিটিং ডাকেন। মিটিংয়ে গৃহীত গান্ধীসমর্থনের  সিদ্ধান্তপত্র হাতে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ পুনা রওনা হন এবং পুনা চুক্তিতে স্বাক্ষরও করেন। পরে কলকাতার ভদ্রলোকদের অনুরোধে বা চাপে সেই সই তিনি প্রত্যাহার করেন — বড়লাটকে টেলিগ্রাম করে লেখেন যে, তিনি নাকি না বুঝে সই করে ভুল করেছেন! সেজন্য সই প্রত্যাহার করে নেন।


 তিনি কলকাতার ভদ্রলোকদেরই একজন, তাঁকে আলাদা ভাবার কোন কারণ নেই। ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। অন্তত তিনি যে ব্যতিক্রম, তার কোন প্রমাণ নেই। একটা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার বিরোধিতা করা নিশ্চিতভাবে অসভ্যতা, এটা চলেছিল  ১০ বছর ধরে। এই অসভ্যতার বিরুদ্ধে একটিও বিবৃতি আছে রবীন্দ্রনাথের? একটি বিবৃতি আছে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার পক্ষে?  --- নেই, থাকলে সেটা উল্লেখ করা হোক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন রিপোর্টের বিভিন্ন খন্ডে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'প্রাক্তন উপাচার্য রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখিত  'জীবনের স্মৃতিদ্বীপ ' গ্রন্থ থেকেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার বিরোধিতার কথা জানা যায়। আরো জানা যায় যে —প্রতিষ্ঠার পরেও বিশ্ববিদ্যালয়টিকে পঙ্গু করে রাখার জন্য উচ্চবর্ন হিন্দু ভদ্রলোকেরা প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন।


রবীন্দ্রভক্তরা টানাপোড়েন চলা ১০ বছর সময়কালের মধ্যে বলা একটি বাক্য উল্লেখ করতে পারেন নি, যাতে বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথ ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার পক্ষে ছিলেন। বরং তাদের বুকে মাটি ঠেকে যাচ্ছে একথা প্রমাণ করতে যে, তিনি সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার বিরোধিতা করেন নি!


রবীন্দ্রভক্তরা বলছেন —পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁকে সম্বর্ধনা দেওয়া হয়, আদর যত্ন করা হয়, সন্মান দেওয়া হয় ইত্যাদি। এসব কিছুতে কী প্রমাণ হয়? প্রমাণ হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, ছাত্র ও মুসলমান সমাজের ভদ্রতা, সভ্যতা, মহানুভবতা এবং তাঁরা যে গুনী সাহিত্যিকের কদর করতে পারেন, ওইসব কথায় ও কাজে সে সবকিছুর  প্রমাণ পাওয়া যায়। তাতে প্রমাণ হয় না বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা সদর্থক ছিল!


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার সময়কাল একই। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেলে তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কপালে কী হবে, সেসব নিয়েও হয়তো রবীন্দ্রনাথের আশঙ্কা ছিল! সত্য জানার চেষ্টা করার সময় এসবই হিসাবে রাখা প্রয়োজন।


শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় গড়া হলো ঢাকায় ; কিন্তু তা শুধু মুসলমান ছেলেমেয়েদের জন্য নয়। সেখানে সব অংশের ছাত্র ছাত্রীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বার ছিল উন্মুক্ত। শিক্ষক, পরিচালন সমিতি, সেনেট সবক্ষেত্রে সবাই ছিলেন, সব অংশের মানুষ ছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গড়া শান্তিনিকেতনের চরিত্র কিন্তু তেমন ছিল না। নীরদ. সি. চৌধুরীর লেখা অটোবায়োগ্রাফি অফ অ্যান আননোন ইন্ডিয়ান বই থেকে জানা যায় (পৃষ্ঠা ৬৬৫) —   তিনি তা গড়েছিলেন প্রাচীন হিন্দু শিক্ষা ব্যবস্থার অনুকরণে, হিন্দু গুরুগৃহের আদলে — সেখানে থাকবে নিরামিষ খাবার, হতে লাঠি ও পরিধানে থাকবে জাফরান রঙের পোশাক ইত্যাদি। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে মুসলমানদের প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ। জানা যায় হায়দরাবাদের নবাব বিশ্বভারতীর জন্য এক লাখ টাকা চাঁদা দিয়েছিলেন এবং তারপর থেকে ২/৫ জন মুসলমান ছাত্র সেখানে শিক্ষার সুযোগ পান। গোরা উপন্যাসটিতেও তাঁর ধর্ম মানসিকতার কিছু পরিচয় ফুটে উঠেছে। ২০১৫ সালের এক হিসাব থেকে জানা যায় — বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬০০ জন শিক্ষকের মধ্যে মুসলমান শিক্ষক আছেন মাত্র ৬ জন! অর্থাৎ শতাংশের হিসাবে মাত্র ১ শতাংশ!


 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার বিরুদ্ধে ১৯১২ সালে ২৮শে মার্চে গড়ের মাঠের সভায় রবীন্দ্রনাথ সভাপতিত্ব করেছিলেন অথবা করেন নি — কোন একটি পুরনো ঘটনায় যখন বিশিষ্টজনেরা কেউ কেউ পক্ষে এবং অন্য কেউ কেউ বিপক্ষে লেখেন এবং মতামত দেন, সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নানা পারিপার্শিক ঘটনা ও তথ্য বিশ্লেষণ করেই আমাদের সত্য উদঘাটনের চেষ্টা করা ছাড়া আর বিকল্প কী আছে? বিষয়টি সেভাবে ভাবা হোক এবং ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হোক।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

তৃণমূল নেত্রী ফের সংসদে

যদা যদা হি ধর্মস্য... গীতার এই শ্লোকে ঠিক কী বলা হয়েছে?

ভাতে কেরোসিন যাত্রাপুরে, অভিযোগ বাংলাদেশী