মুলনিবাসী তত্ত্ব বনাম ড. আম্বেদকর
(এটাই ফাইনাল লেখা)
মুলনিবাসী তত্ত্ব বনাম ড. আম্বেদকর
ড. আম্বেদকরের জীবন খুব দীর্ঘ ছিল না। কিন্তু তিনি সারাজীবন ধরে এক কঠিন লড়াই লড়েছিলেন। অন্যায়, অবিচার, অসাম্য এবং বর্ণঘৃনার বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। সবার জন্য সুবিচার, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। এসবের প্রয়োজনে তিনি দেশের স্বাধীনতা এবং গনতান্ত্রিক-ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন ; আর একইসাথে সমাজ সংস্কারের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন।
নিজের জীবনে ছোটবেলা থেকে তিনি জাত-বর্ণগত অন্যায়, অবিচার ও ঘৃনার শিকার হন এবং তাঁর চারিপাশে অন্যান্য আরো অনেকেরই এই একইরকম দুরবস্থা দেখেন। এসব কারণে তার মন ধীরে ধীরে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এবং নির্যাতিতশ্রেণীর মানুষের মুক্তির জন্য জীবন পণ করেন।
পরিণত বয়সে দলিত মুক্তির সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তাঁকে প্রচুর পড়াশুনা করতে হয়। ভারতের সমাজ ও সমাজব্যবস্থা নিয়ে তিনি নিবিড় গবেষণা করেন। একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, ভারতের প্রাচীনসমাজ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে আজকের আধুনিককাল অবধি, ভারতের সমাজ বিশ্লেষনের ক্ষেত্রে তিনি যে গভীর জ্ঞান ও পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন, তার কোন তুলনা আজও নেই।
ভারতবর্ষের নিপীড়িত বর্ণ ও বর্গের মানুষের এক বড় অংশ তাই দলিত মুক্তির সংগ্রামে আজও ড. আম্বেদকরের বিচার-বিশ্লেষনের উপর আস্থা ও ভরসা করেন। তাঁর নির্দেশিত পথ ও পদ্ধতিকে সঠিক বলে মনে করেন।
কিন্তু হাজার দুহাজার বছর ধরে যারা নিপীড়ক, যাঁরা সুবিধাভোগী, তাঁরা কখনও হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেন না! তারা নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে নেই। নিজেদের অন্যায় একাধিপত্য ধরে রাখার জন্য তারা মরীয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ও নিত্যনতুন চক্রান্তের জাল বুনছেন। দলিত মুক্তি আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের এইসব বিভিন্ন ধরণের চক্রান্ত বোঝার চেষ্টা চালাতে হবে এবং তা ব্যর্থ করে দিতে হবে।
যেকোন লড়াইয়ে প্রথমেই শত্রু- মিত্র সনাক্ত করতে হয় এবং শত্রুসংখ্যা কমিয়ে মিত্রসংখ্যা ও মিত্রশক্তি বৃদ্ধির চেষ্টা চালাতে হয়। ড.আম্বেদকর বর্ণাশ্রম প্রথায় যারা নিপীড়িত ও ঘৃণিত এবং অবিচারের শিকার, তাঁদের উপর ভিত্তি করে সমতার লক্ষ্যে লড়াই শুরু করেন এবং এই লড়াইয়ে অন্যান্য অংশের মধ্যে বন্ধু খোঁজার চেষ্টা ও উদ্যোগ নেন, তাদের সহযোগিতা গ্রহণ করেন।
ড. আম্বেদকর নিপীড়িত বর্ণ ও সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ করে লড়াই করেন। আর নিপীড়িত বর্ণ-সম্প্রদায়গুলি বাস্তবত বঞ্চিত ও ঘৃণিত বলেই তাঁর লড়াইয়ে আগ্রহ দেখান, সমর্থন করেন ও অংশগ্রহণ করেন। এই লড়াইয়ের ভিত্তি স্থাপনের জন্য তিনি যখন কোন নিপীড়িত বর্ণগোষ্ঠীর উপর আস্থা স্থাপন করেন, তখন ওই গোষ্ঠীর সুদূর অতীত কী ছিল, কেমন ছিল---- তা নিয়ে ড. আম্বেদকর ভাবেন নি, ভাবার প্রয়োজনবোধ করেন নি।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আজ একশ্রেণীর মানুষ ড. আম্বেদকরের নাম ব্যবহার করে, ড. আম্বেদকরের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে, দলিত মুক্তি আন্দোলনে শত্রু-মিত্র নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বর্ণগোষ্ঠীর মানুষের ৩০০০/৩৫০০ বছর আগেকার অবস্থান---তাদের মূলনিবাস, পরিচয়, যোগাযোগ ইত্যাদি খোঁজার আবশ্যকতার কথা বলছেন! তাঁরা মুলনিবাসী বনাম বহিরাগত শ্লোগান তুলছেন! তাঁদের মতে--- যাঁরা ভারত ভূখণ্ডের মুলনিবাসী তাঁরা দলিত মুক্তি আন্দোলনে মিত্র এবং বহিরাগতরা শত্রু বা বিরোধীপক্ষ! তাঁরা ভারতের মানুষকে আর্য এবং অনার্য---এই দুইভাগে আলাদা করছেন এবং এদেশের ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়কে বিদেশি ও আর্য বলে অভিহিত করেছেন! তারা DNA টেস্টের মাধ্যমে মুলনিবাসী এবং বহিরাহত গোষ্ঠীকে সনাক্ত করার কথা বলছেন এবং ব্রাহ্মণ গোষ্ঠীকে বহিরাগত হিসাবে নির্দিষ্ট করছেন। বলছেন--- ব্রাহ্মণদের DNA নাকি কোন এক বিদেশি জাতিগোষ্ঠী ইউরেশিয়নদের সাথে মিলে যাচ্ছে!
এই যুক্তিতে ব্রাহ্মণ বিদেশি, তাই তাঁরা দলিত আন্দোলনের শত্রু এবং তাঁদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন।
ব্রাহ্মণ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ড. আম্বেদকর সারাজীবন লড়াই করেছেন এবং তাঁদের অগণতান্ত্রিক একাধিপত্যের বিরুদ্ধে ততদিন লড়াই চালিয়ে যেতে বলেছেন, যতদিন না ব্রাহ্মণ্যবাদ উচ্ছেদ হয়।
এখন প্রশ্ন হলো---ড. আম্বেদকর কেন ব্রাহ্মণগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন এবং কেন এই লড়াই চালিয়ে যাবার নির্দেশ দিয়েছেন?--- কারণ ব্রাহ্মণরা অন্যায় ও অসাম্যের বীজ ব্রাহ্মণ্যবাদের জনক এবং ধারক ও বাহক। তাই ব্রাহ্মণ্যবাদকে পরাস্ত করার জন্য ড. আম্বেদকর এই নির্দেশ দিয়েছেন। ব্রাহ্মণগোষ্ঠী দেশি অথবা বিদেশি এবং তাদের মুল এদেশে না বিদেশে --- এই কথা ভেবে ড. আম্বেদকর ব্রাহ্মনগোষ্ঠীকে শত্রু বলে সনাক্ত করেন নি। বর্ণাশ্রমপ্রথার উচ্ছেদের প্রয়োজনে তিনি এই প্রথার সুবিধাভোগী ব্রাহ্মণ সমাজের বিরুদ্ধে বলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন এবং সাম্য ও সমতার লক্ষ্যে লড়াই চালিয়ে যেতে বলেছেন।
তাই, ব্রাহ্মণরা বিদেশি, মূলত সেই অজুহাতে ব্রাহ্মণদের শত্রু হিসাবে প্রচারের অন্য আরেক অর্থ দাঁড়ায় বর্ণাশ্রম প্রথার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বর্শামুখ খানিকটা ভোতা করে দেওয়া। সেজন্য নীতিগতভাবে ঠিক করা প্রয়োজন যে, দলিত মুক্তির জন্য মূল সমস্যা কী? ---অন্যায়, অত্যাচার, অসাম্য ও ঘৃনার আঁধার ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং বর্ণাশ্রম প্রথা ; না মানুষের বিদেশি মূল?
প্রাচীনকাল থেকে যদি হিসাব মেলানো হয়, তাহলে দেখা যাবে যে, শুধু ভারতবর্ষ নয়, পৃথিবীর এমন কোন দেশ নেই যেদেশে বহিরাগত নেই। এমন কোন দেশ ও এলাকা নেই যেখানে আগে ও পরে আসা মানুষের মধ্যে সংঘর্ষ ও সমঝোতা হয় নি। সাম্প্রতিক অতীতের হিসাব নিলেও দেখা যাবে--- মূল বাসিন্দা এবং বহিরাগতরা মিলেমিশে আছেন, সমস্যা মিটিয়ে সমঝোতা করে আছেন, থাকতে হয়। মূল বাসিন্দা ও বহিরাগতর মিলন হলো পৃথিবীর সভ্যতা বিকাশের এক অন্যতম শর্ত। এই ক্ষেত্রে বিভেদের প্রশ্ন তুলে কোন আন্দোলন দলিতদের সমস্যার কিছুমাত্র সমাধান করে না ; বরং তাতে আরো নুতন নুতন অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
ভারতবর্ষ একটি অতি প্রাচীন দেশ। ৬৫০০০ বছর ধরে এই ভূখণ্ডে আধুনিক মানুষের (হোমো স্যাপিয়েন্স) বসবাস। ইউরোপে আধুনিক মানুষের বসবাস শুরু হয় ভারতের থেকে ১৯০০০ বছর পরের সময়কালে। অর্থাৎ আজ থেকে ৪৬ হাজার বছর আগে আধুনিক মানুষ ইউরোপে পৌঁছেছেন। ভারতে মানুষের বসবাস অতি আদিম যুগ থেকে। তাই, মানুষের বসবাসের শুরুর সময়কালের কোন প্রামাণ্য ইতিহাস পাওয়া যায় না। এমনকি পৃথিবীর কিছু দেশ যতটা প্রাচীন সময়কালের ইতিহাস উদ্ধার করতে পেরেছে, ভারতবর্ষের ইতিহাস আজও জানা গেছে তারথেকে অনেকটাই কম! এদেশের ইতিহাসের বহু উপাদান আবিষ্কার হয়েছে ঠিকই ; কিন্তু আজও তার পাঠোদ্ধার, বিশ্লেষন ও ব্যাখ্যা করে ওঠা সম্ভব হয় নি।
তবুও দেশি ও বিদেশি নৃতাত্ত্বিক, ভাষাবিদ ও ঐতিহাসিকের বিভিন্ন বর্ণনা এবং গবেষণা থেকে যতটুকু জানা সম্ভব, সেই নির্যাস নিয়ে ড. আম্বেদকর ভারতীয় জনসমষ্টির গঠন, বর্ণাশ্রমপ্রথা এবং জাতপ্রথার সৃষ্টি, বিকাশ ও তার বিনাশ নিয়ে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন। এইসব প্রশ্নে ড. আম্বেদকর যখন কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, তারজন্য তার নিজের সময়কাল অবধি তিনি সমস্ত সমাজতত্ত্ববিদ, পর্যটক, প্রত্নতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক এবং বেদ-পুরান ইত্যাদি ধর্মভিত্তিক গ্রন্থাদির বর্ণনা, মতামত এবং সিদ্ধান্ত সবকিছুই পর্যালোচনা করেছেন ও ব্যাখ্যা করেছেন।
তাই, এই প্রশ্নে ড. আম্বেদকরের মতামতের উপর আস্থা স্থাপন করা খুব ভুল হবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া ড. আম্বেদকরের প্রয়ানের পর এইসব প্রশ্নে গবেষণার ক্ষেত্রে এমন কিছু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলেও জানা যায় না, যাতে ড. আম্বেদকরের সিদ্ধান্ত বাতিল বলে গণ্য করার যুক্তি আছে। বরং সাম্প্রতিককালের ডিএনএ গবেষণা ড. আম্বেদকরের মতামত ও সিদ্ধান্তকে শক্ত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তাই, আমরা এবার জেনে নেব--- এইসব প্রশ্নে ড. আম্বেদকর এবং অন্যান্য সমাজতত্ত্ববিদ ও ঐতিহাসিকরা ঠিক কী বলেছেন--- যাতে ভারতের কোন জনগোষ্ঠীকে মুলনিবাসী অথবা বহিরাগত বলে চিহ্নিত করা যায় কী না?
ড. আম্বেদকর লিখেছেন, "বিখ্যাত জাতিবিজ্ঞানীদের মতে ভারতীয়রা আর্য, দ্রাবিড়, মঙ্গোলীয় এবং সিদিয়ানদের সংমিশ্রনের ফল। ভারতবর্ষে এইসব গোষ্ঠীর মানুষেরা বিভিন্ন দিক থেকে বহু শতাব্দী পূর্বে প্রবেশ করেছিল যখন তাঁরা ছিল আদিম স্তরভুক্ত, তাঁদের সংস্কৃতি ছিল ভিন্ন ভিন্ন। আগে যাঁরা এসেছিল লড়াই মারফত তাঁদের পরাভূত করে পর্যায়ক্রমে নতুনরা পথ করে নেয় এবং কিছুকাল এরূপ করার পর শান্তিপূর্ণ প্রতিবেশী হিসাবে বসবাস করতে শুরু করে। নিরন্তর সংশ্রব এবং পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যদিয়ে তাঁরা একটি সাধারণ সংস্কৃতি গড়ে তোলে, যা তাদের নিজ নিজ সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট অতিক্রম করে যায়...."(ড. আম্বেদকর রচনা সম্ভার, ভারত সরকার, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ২০)।
এই একই বইয়ের আরেক জায়গায় ড. আম্বেদকর লিখেছেন, "জাত বিভাজনের উদ্দেশ্য মূলত কুলের পবিত্রতা বা রক্তের পবিত্রতা নিরাপদে রাখা। কিন্তু জাতি বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক মত, পবিত্র জাতিকুলের মানুষ কোনও জায়গায় নেই এবং পৃথিবীর সর্বাংশে জাতিকুলের সংমিশ্রণ ঘটেছে। বিশেষভাবে ভারতীয়দের ক্ষেত্রে একথা প্রযোজ্য। মি. ভাণ্ডারকর 'হিন্দু জনগণের মধ্যে বিদেশি উপাদান' আলোচনাপত্রে লিখেছেন---ভারতবর্ষে এমনকোন শ্রেণী বা জাত কদাচিৎ দেখা যায় না, যাঁদের মধ্যে বিদেশি বংশধারা নেই। ভিনদেশি রক্তের মিশ্রণ ঘটেছে শুধুমাত্র রাজপুত ও মারাঠি যোদ্ধাজাতির মধ্যেই নয়, এমনকি ব্রাহ্মণদের মধ্যেও---যাঁরা ভ্রান্ত সুখে আচ্ছন্ন যে, তাঁদের রক্তে বিদেশি প্রবাহ নেই। জাতিকূলের মিশ্রণ রোধ করার জন্য এবং রক্তের পবিত্রতা রক্ষার উপায় হিসাবে জাতিভেদপ্রথা বেড়ে উঠেছে। কিন্তু বিভিন্ন জাতি এবং জাতের রক্ত ও সংস্কৃতির পারস্পরিক সংমিশ্রনের অনেক পরে জাতভেদ প্রথার উদ্ভব হয়েছে।
জাতগুলির স্বাতন্ত্র অথবা জাতকুলের পার্থক্য ধারণা করে বিভিন্ন জাতকে ভিন্ন ভিন্ন কুল হিসাবে গণনা করা তথ্যের ঘোর বিকৃতি। পাঞ্জাবের ব্রাহ্মণ আর মাদ্রাজের ব্রাহ্মণদের মধ্যে কুল সাদৃশ্য আছে কি? বাংলার অস্পৃশ্য আর মাদ্রাজের অস্পৃশ্যদের মধ্যে কোনও কুল সাদৃশ্য কি আছে? পাঞ্জাবের ব্রাহ্মণ এবং চামারদের মধ্যেও কি কোন কুলগত পার্থক্য আছে? অথবা মাদ্রাজের ব্রাহ্মণ এবং পারিহাদের মধ্যে কোন কুলগত পার্থক্য? পাঞ্জাবের ব্রাহ্মণ এবং চামার একই মূল থেকে উদ্ভূত। মাদ্রাজের ব্রাহ্মণ এবং পারিহারাও তাই, একই মূলের। জাতভেদপ্রথা কুলের বিভাজন করে না। জাতভেদপ্রথা হলো, একই জাত-কুলের মানুষদের সামাজিক বিভাজন" (পৃষ্ঠা ৬৮)।
ড. আম্বেদকর লিখেছেন, "যে সব গোষ্ঠী মিলে ভারতীয়দের উদ্ভব স্বীকার করা যেতে পারে, তাঁদের সম্পূর্ণ সংমিশ্রণ ঘটেনি।.....শারীরিক গঠন, গাত্রবর্ণ বিচারে পশ্চিমের তুলনায় পূবে, উত্তরের তুলনায় দক্ষিণের মানুষদের পার্থক্য প্রকট। তবুও সংমিশ্রণ কোন জাতির একাত্ব লক্ষণের একমাত্র নির্ণায়ক হতে পারে না। জাতিগতভাবে সব মানুষের মধ্যে প্রভেদ বিদ্যমান। অভিন্নতার মূল সাংস্কৃতিক ঐক্যে। একথা স্বীকার করলে সাহসের সাথে বলতে পারি পৃথিবীতে এমন কোনও দেশ নেই, সাংস্কৃতিক ঐক্যের দিক দিয়ে যা ভারতীয় উপমহাদেশের সাথে তুলনীয়। কেবল ভৌগোলিক ঐক্য নয়, সর্বোপরি তার আছে গভীরতর এবং আরও মৌলিক একতা ---দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত সাংস্কৃতিক ঐক্য। এই সম-সাংস্কৃতিক কারণেই বর্ণ সমস্যা ব্যাখ্যা করা এত কঠিন। হিন্দু সমাজ পরস্পর বিচ্ছিন্ন এককের সমষ্টি হলে ব্যাপারটা সহজ হত ; কিন্তু বর্ণ হলো একটি অভিন্ন অবয়বের খণ্ডিকরণ।.....
ভারতবর্ষে বর্ণের অর্থ হলো, জনগণকে নির্দিষ্ট সুচিহ্নিত ভাগে কৃত্রিম উপায়ে বিভক্ত করা।.....(১) বিভিন্ন উপাদানে গঠিত হলেও হিন্দুদের মধ্যে একটি গভীর সাংস্কৃতিক ঐক্য বর্তমান (২) জাত হলো একটি ব্যাপকতর সাংস্কৃতিক মাত্রার বিভক্তিকরণ (৩) শুরুতে একটিই জাত ছিল এবং (৪) অনুকরণ এবং বহিষ্করনের মধ্যদিয়ে বিভিন্ন জাতের উদ্ভব হয়েছে" (ড. আম্বেদকর রচনা সম্ভার, ভারত সরকার, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ২০, ২২ এবং ৩৬-৩৭)।
ড. আম্বেদকরের এইসব আলোচনায় বোঝা যায় যে, বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে ভারতবর্ষের মানুষ মিশ্র প্রজাতি ও মিশ্র রক্তের মানুষ। তাঁদের মধ্যকার কোন বর্ণগোষ্ঠীর মানুষকে সুনির্দিষ্টভাবে মুলনিবাসী অথবা বিদেশি-বহিরাগত বলে চিহ্নিত করা যায় না।
ভারতের বর্ণাশ্রমপ্রথা এবং বর্ণ বিভাজনের উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে স্বচ্ছ চিত্র পেতে হলে সময়কাল ধরে ভারতের প্রাচীন ইতিহাসের ধারণা থাকা দরকার। কিন্তু সমস্যা হলো---ভারতের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে নানা মুনির নানা মত--- বিভিন্ন ঐতিহাসিক বহুক্ষেত্রে পরস্পর বিরোধী মত ব্যক্ত করেছেন এবং যুক্তি ও তথ্যবিহীন গল্পকথা লিখে গেছেন। তাই, সেসব জটিলতার মধ্যে না গিয়ে আমরা ড. আম্বেদকরের রচনার উপর নির্ভর করে জটিল বিষয়টিকে বোঝার চেষ্টা করবো।
প্রাচীন ভারতবর্ষে ছোট ছোট গোষ্ঠী এবং গোষ্ঠিপতি থাকলেও, কোন উল্লেখযোগ্য রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল না। "ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রথম দিকচিহ্ন হল ৬৪২ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে বিহারে মগধ রাজত্বের উদ্ভব। মগধ রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শিশুনাগ। তিনি অনার্য নাগ জাতিভূক্ত ছিলেন। আর্যরা এদের জয় করতে না পেরে শান্তি স্থাপন করে তাদের সমান মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়। এরাই পৃথিবীর ইতিহাসে ভারতকে বিরাট ও মহান করে তোলে। এই বংশের পঞ্চম রাজা বিম্বিসারের সময়ে এই রাজ্য সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। নাগবংশ ৪১৩ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিল" ( ড. আম্বেদকর রচনা সম্ভার, ভারত সরকার, খন্ড ৭, পৃষ্ঠা ১২৯)।
গৌতম বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেন খ্রিস্টপূর্ব 623 অব্দে ; অর্থাৎ নাগবংশের রাজত্বকালের সময়ে। তিনি উচ্চবংশোদ্ভূত রাজপুত্র। গৌতম বুদ্ধ বর্ণাশ্রম প্রথার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন এবং বৌদ্ধধর্ম প্রতিষ্ঠা করেন। "বুদ্ধ জাতপ্রথার তীব্র বিরোধিতা করেছেন। বর্তমান সমাজে জাতপ্রথা যেভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে, তখনকার সমাজে তেমন ছিল না। তখন ভিন্ন জাতের মানুষের একসঙ্গে প্রীতিভোজে মিলিত হওয়া এবং অসবর্ণের মধ্যে বিবাহে বিধিনিষেধ প্রচলিত হয় নি। জাতপ্রথাকে ঘিরে বর্তমানের মত গোঁড়ামি তখনও প্রতিষ্ঠা পায় নি। কিন্তু জাতপ্রথার ভিত্তি যে অসাম্য, তার প্রতিষ্ঠা বেশ ভালভাবেই হয়েছিল (ড. আম্বেদকর রচনা সম্ভার, ভারত সরকার, খন্ড ৭, পৃষ্ঠা ৭৩)।
তাহলে আমরা দেখতে পাই---গৌতম বুদ্ধের জন্মের পূর্বে অন্তত কয়েক হাজার বছর ধরে খেপে খেপে বিভিন্ন সময়ে নানা জাতিগোষ্ঠীর যেসব মানুষ ভারতে এসেছেন এবং বসবাস করছেন তাদের মধ্যে সংমিশ্রণ ঘটেছে। তাই, তাঁদের মধ্যকার কোন গোষ্ঠী— ভাষা, ধৰ্ম বা বর্নগোষ্ঠী তথাকথিত বিশুদ্ধ রক্ত বহন করছে না।
এদেশের একটি সংগঠন মুলনিবাসী নামক এক তত্ত্ব উদ্ভাবন করেছে। তাঁরা বলছেন উচ্চবর্ণের হিন্দু বিশেষ করে ভারতের ব্রাহ্মণরা আর্য বংশোদ্ভূত এবং তাঁরা বিদেশি। এই বিদেশিরা ভারতের শূদ্র-অতিশূদ্র (নির্যাতিত) মুলনিবাসীদের শত্রু! এই প্রশ্নে ড. আম্বেদকর কী ভেবেছেন এবং লিখেছেন তা আমরা একবার দেখে নেব।----
"এটা বলা ভুল যে, দস্যুরা জাতিগতভাবে অনার্য। দস্যুরা ভারতের আদিম জনজাতিভূক্ত কোনও প্রাগার্য জাতি ছিল না। তাঁরা আর্য সম্প্রদায়ের সদস্য ছিল কিন্তু আর্য অভিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কারণ আর্য সংস্কৃতির বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অংশের কিছু বিশ্বাস অথবা কৃষ্টির তারা বিরোধিতা করেছিল। দস্যুরা জাতিতে অনার্য ---এই ধারণা কী করে তৈরি হলো, তা বোঝা দুস্কর!.......
এমন বিশ্বাস করা ভুল হবে যে, আর্য যোদ্ধারা শূদ্রদের জয় করেছিল। প্রথমত গল্পে আছে যে, আর্যরা ভারতের বাইরে থেকে এসেছিল এবং এদেশের অধিবাসীকে পরাজিত করেছিল---এর সমর্থনে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নি। বরং ভারতই যে আর্যদের দেশ, সে সম্পর্কে ভুরি ভুরি প্রমান মিলবে। দ্বিতীয়ত, এমন কোথাও উল্লেখ নেই যে, আর্য এবং দস্যুদের মধ্যে কোনও যুদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু দস্যুদের সাথে শূদ্রদের কোন সম্পর্ক ছিল না। তৃতীয়ত, বিশ্বাস করা কঠিন যে, আর্যরা যথেষ্ট সামরিক বীরত্বে ক্ষমতাবান জাতি ছিল।.....আর্যদের এই দাসত্বের (দেবতাদের প্রতি দাসত্ব) কারণ হলো---দেবতারা সাহায্য ও রক্ষা না করলে তারা অসুরদের আক্রমণ প্রতিহত করতে পারতো না। বোঝার পক্ষে যথেষ্ট যে, এমন একটি জাতি কীভাবে শূদ্রদের পরাজিত করতে পারে! সবশেষে বলার যে, শূদ্রদের জয় করার কোনও প্রয়োজনই ছিল না। কারণ তারা আর্য এই অর্থে, যে অর্থে আর্য শব্দটি ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ আর্য সংস্কৃতির যাঁরা ধারক-বাহক। .....অন্যদিকে শূদ্ররা আর্য ছিল। তাঁরা জীবনের ক্ষেত্রে আর্য কৃষ্টিতে আস্থাশীল ছিল" (ড. আম্বেদকর রচনা সম্ভার, ভারত সরকার, খন্ড ৭, পৃষ্ঠা ২৭৪)।
আমরা দেখলাম যে, গৌতম বুদ্ধের সময়কালে জাত-বর্ণ ব্যবস্থা খুব কঠোর রূপ পরিগ্রহ করেনি। তা ধীরে ধীরে জাকিয়ে বসে আরো কয়েকশত বছর পর, যখন ব্রাহ্মণ্যবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা স্থায়িত্ব পায়। তাই রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে জাত-বর্ন ব্যবস্থার নিবিড় সম্পর্ক আছে, সেটা বোঝা দরকার।
আমরা জানি---গৌতম বুদ্ধের আগে মহাবীর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জৈনধর্ম প্রতিষ্ঠা করেন। জৈনরা বেদ বিরোধী ছিলেন। বেদকে বাজে আবর্জনা বলে বিরোধিতা করতেন। জৈনরা বর্ণাশ্রম প্রথারও বিরোধিতা করতেন। মোটামুটি গৌতম বুদ্ধের 24 বছর আগের সময়কাল হলো মহাবীরের আবির্ভাবের সময়কাল।
তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি যে, বৈদিক যুগের সমাপ্তিকাল হলো মহাবীরের জৈনধর্ম প্রচারের শুরুর সময়কাল পর্যন্ত। তারপর শুরু হলো বৌদ্ধযুগ।
ড. আম্বেদকর লিখেছেন যে, বৌদ্ধযুগের আগে অর্থাৎ বৈদিক যুগে বর্ণবিভাগ ছিল ; কিন্তু তা খুব কঠোর ছিল না। তাহলে ওই সময়কালে বর্ণাশ্রম প্রথার গঠন এবং রূপ ঠিক কেমন ছিল?
এই বিষয় নিয়ে ড. আম্বেদকর কিছু কথা লিখেছেন। তাঁর মতে বৈদিকযুগের এই সময়কালের বিভিন্ন বিষয়ের বর্ণনা ও ব্যাখ্যা সঠিকভাবে পাওয়া যায় না এবং তাই কোন কিছুই নিশ্চিত করে বলা যায় না। বিশেষ করে বর্ণাশ্রম প্রথার গঠন ও বিকাশের মত জটিল বিষয় ব্যাখ্যা করা আরো কঠিন। তবুও বিস্তারিত অনুসন্ধান ও বিচার-বিশ্লেষন করে তিনি যা লিখেছেন তার মূল কথা হলো---শুরুতে অর্থাৎ বৈদিক যুগে বর্ণ এবং বর্ণবিভাগ শুরু হয় এবং তার অস্তিস্ত ছিল ; কিন্তু জাত বিভাগ তখনও শুরু হয় নি। ড. আম্বেদকর বলেছেন--- বর্ণ এবং জাত এক নয় ; বরং আলাদা। তাঁর মতে--- মর্যাদা এবং পেশাকে জন্মভিত্তিক করাই হলো বর্ণকে জাতব্যবস্থায় অধঃপতিত করা। তাঁর মতে বর্ণকে জাতে রূপান্তরিত করা হয় ব্রাহ্মণ্যবাদী যুগে। অর্থাৎ খ্রিস্টের জন্মের সময়কাল থেকে বা তারও কিছু পরের সময়কালে। ব্রাহ্মণ্যবাদী যুগে মর্যাদা এবং পেশাকে জন্মভিত্তিক ও বংশভিত্তিক করা হয়।
ড. আম্বেদকর রচনা সম্ভার, খন্ড ৭, ভারত সরকার, কর্তৃক প্রকাশিত বইয়ের ১৪৪-৪৫ পৃষ্ঠায় বর্ণ নির্ধারণ করার ব্যবস্থা ও পদ্ধতির যে বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে তা এইরকম---গোষ্ঠীজীবনের প্রয়োজনীয়তার জন্য ব্যক্তির দৈহিক ক্ষমতা, মানসিকতা ও পেশা অনুযায়ী কারুর বর্ণ নির্ধারণ করা হত এবং বর্ণের পুনর্বিন্যাসও করা হতো। মনু এবং সপ্তর্ষি নামে ব্যক্তিদের এক স্বাধীন দল মানুষের বর্ণ নির্ধারণ করতো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। সপ্তর্ষিরা ঠিক করতো কারা ব্রাহ্মণ হবে বা ব্রাহ্মণ হবার যোগ্যদের। আর মনু ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যদের নির্বাচন করতো। এই তিন বর্ণের মানুষ বাঁচাই হবার পর যাঁরা অবশিষ্ট থাকতো, তাঁদের শূদ্র বলে গণ্য করা হতো।
এই ব্যবস্থায় তিনটি পর্ব চিহ্নিত করা যায়।---প্রথম পর্বে ব্যক্তির বর্ণ ঠিক হতো একটা সীমিত সময়ের জন্য। তা ছিল ৪ বছর বা এক যুগের জন্য। তারপর আবার পর্যালোচনা করা হতো এবং বর্নপ্রথায় কারুর স্থান ওঠা-নামা করতো। দ্বিতীয় পর্বে এই বাঁচাই বা বর্ণ নির্ধারণ করার নীতি চালু হয় ব্যক্তির জীবনকাল পর্যন্ত। অর্থাৎ একবার কারুর বর্ণ নির্ধারণ হলে, তিনি সারাজীবন সেই বর্ণের মানুষ বলে গণ্য হতেন।
আর এই ব্যবস্থার তৃতীয় পর্বে বর্ণ ঠিক হতে থাকে উত্তরাধিকার সূত্রে ; অর্থাৎ যার যে বর্ণ, তার উত্তরপুরুষ সেই বর্ণের মানুষ বলে বিবেচিত হতে থাকেন। উত্তরাধিকার সূত্রে বর্ণ নির্ধারণের এই ব্যবস্থা হলো বর্ণব্যবস্থা রূপান্তরিত হলো জাতব্যবস্থায়। এই জাতব্যবস্থা ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসনকালে দৃঢ়মূল হয়।
বর্নব্যবস্থার সময়কালে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হয়।--- তাহলো, শুরুতে মনু এবং সপ্তর্ষিরা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের বর্ণ নির্ধারণ করতো। সেক্ষেত্রে মনু আর সপ্তর্ষিরা ছিল অনেকটা ইন্টারভিউ বোর্ডের মত। এই ব্যবস্থা ছিল কিছুটা এলোমেলো ও ঢিলেঢালা। পরে এই ব্যবস্থার পরিবর্তন করা হয়।
এই ব্যবস্থা পরিবর্তন করে গুরুকুল ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। গুরুকুল বলতে বোঝাতো গুরুর পরিচালিত পাঠশালা। গুরুকে বলা হত আচার্য। এই ব্যবস্থায় ১২ বছর শিক্ষা সমাপ্তি শেষে ছাত্রদের বর্ণ নির্ধারণ করতেন আচার্য এবং আচার্যই উপনয়ন পরিয়ে দিতেন। গুরুকুল ব্যবস্থার সময়ে বর্ণ জীবনকালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা পুরুষানুক্রমিক ছিল না। তবে "আর্য সমাজে শূদ্র অথবা নিন্মবর্ণের মানুষ কখনোই ব্রাহ্মণ হতে পারতো না ; আর এই চারবর্ণের বাইরে আরো শ্রেণী ছিল—তারা চন্ন্ডাল, স্বপাক প্রভৃতি। তবে তাঁরা অস্পৃশ্য ছিল না— তাদের মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার স্বীকার করা হতো না।"---এই মন্তব্যও করেছেন ড.আম্বেদকর (ড. আম্বেদকর রচনা সম্ভার, ভারত সরকার, খন্ড ৭, পৃষ্ঠা ৯০ এবং ৩৯)।
আরো পরে আচার্যের পরিবর্তে পিতাকে উপনয়ন পরাবার অধিকারী করা হয় এবং উপনয়নের পরে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা চালু হয়। এই ব্যবস্থায় বর্ন জন্মাধীন হয় বা বর্ণ বংশানুক্রমিক হয় ; অর্থাৎ বর্ণ তখন জাতব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়---বলাইবাহুল্য যে, এই ব্যবস্থা ব্রাহ্মণ্যবাদী যুগে এসে আরো দৃঢ়মূল হয়।
ব্রাহ্মণ্যবাদী যুগ হল গৌতম বুদ্ধের কিছু পরের সময়কাল। এই নয়া ব্যবস্থার জনক হল শুঙ্গবংশ। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, নাগবংশের শাসন শেষ হয় খ্রিস্ট পূর্ব ৪১৩ অব্দে। তারপর খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ অব্দ পর্যন্ত মগধ সাম্রাজ্য শাসন করেন নন্দবংশের শাসকেরা। এরপর চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য মগধের শাসক হন। চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন নাগবংশের এক উত্তরপুরুষ। কোন কোন ঐতিহাসিক বলেন মৌর্যবংশের কেউ কেউ জৈনধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এই বংশের সুযোগ্য শাসক সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্ম গ্রহন করেন এবং ব্রাহ্মণদের বিশেষ সুবিধা, যাগযজ্ঞ এবং পশুবলি ইত্যাদি বন্ধ করে দেন। তাতে ব্রাহ্মণ তথা পুরোহিতরা খুবই সমস্যায় পড়েন। এই অবস্থায় আনুমানিক খ্রিস্ট পূর্ব ১৮৫ অব্দে মৌর্যদের ব্রাহ্মণ সেনাপতি পুষ্যমিত্র শুঙ্গ মগধ সাম্রাজ্য দখল করেন এবং বৌদ্ধধর্ম উচ্ছেদ করে ব্রাহ্মণ্যধর্ম প্রতিষ্ঠা করেন।
এই ব্রাহ্মণ্যধর্ম প্রতিষ্ঠা করার জন্য বা ব্রাহ্মণদের বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেবার জন্য আইনগ্রন্থ মনুস্মৃতি বা মনুসংহিতা লেখা হয়। "এটাই প্রথম মনুসংহিতা এবং তার রচনাকাল ধরা হয় খ্রিস্টপূর্ব ১৭০-১৫০ অব্দের কোন একসময়। যদিও এই গ্রন্থের নাম মনুসংহিতা, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এই গ্রন্থের প্রকৃত লেখক সুমতি ভার্গব নামে এক ব্রাহ্মণ কিন্তু আরো প্রাচীন যুগের বিখ্যাত মনুর নাম ব্যবহার করা হয়; যাতে এই গ্রন্থের বিষয়বস্তু জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে বেগ পেতে না হয়। অর্থাৎ ব্যাকডেট দেবার রীতি ব্যবহার করা হয়। কারণ এই গ্রন্থে এমনসব নির্দেশ জারি করা হয়, যা সম্পূর্ন নুতন এবং সমাজে চলমান রীতিনীতি বিরোধী ছিল" (ড. আম্বেদকর রচনা সম্ভার, ভারত সরকার, খন্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৩১)।
এই ব্রাহ্মণ শাসনের পর যাযাবরশ্রেণীর কুশানদের রাজত্ব শুরু হয়। কুশানরা বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে। জানা যায় --- এই সময়ে মগধ সাম্রাজ্য চীন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এই যাযাবর কুশান জাতি এবং পশুপালক ইউরেশিয়ানরা সমগোত্রীয় নন তো? এইসব পালাবদলের সাথে তাল মিলিয়ে দেশের আইন কানুন ও নীতিরীতিরও কিছু পরিবর্তন হয়। আর অনুমান করা যায় যে, ইতিহাসের এই সময়কাল পর্যন্ত বিভিন্ন জাত-বর্ণ-সম্প্রদায়গুলির মধ্যে যেকোন মাত্রাতেই হোক, বিয়ে ও অন্যান্য আচার অনুষ্ঠান, মেলামেশা চলতো, রক্তের মিশ্রণ অব্যাহত ছিল।
ভারতবর্ষের ইতিহাসে গুপ্তবংশের শাসন কালকে ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যবস্থার স্বর্ণযুগ বলা হয়ে থাকে। গুপ্তবংশের রাজত্বকাল ৩২০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ শুরু হয় এবং ৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে অবসান হয়। আর্যমঞ্জুশ্রীমুলকল্প গ্রন্থে গুপ্তদের জাঠজাতীয় মানুষ বলে অনুমান করা হয়েছে। জাঠরা নিন্মবর্গীয় মানুষ।
এই সময়কালে ব্রাহ্মণ্যবাদী সাহিত্য-সংস্কৃতির ব্যাপক বিকাশ হয়। রামায়ণ, মহাভারত গ্রন্থাদি রচিত হয়। যদিও এই পর্যায়কালেও বৌদ্ধধর্ম বিলুপ্ত হয়েছে, এমন নয়। এই সময়েও বৌদ্ধধর্মের যথেষ্ট উপস্থিতি ছিল। গুপ্তদের পরে এবং শশাঙ্কের সময়ে রাজা হর্ষবর্ধন বৌদ্ধ ছিলেন, যদিও এসময় বৌদ্ধধর্মের প্রচার-প্রসার সীমিত হয়ে এসেছিল। কিন্তু এরপরেই পালরাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে এবং পালবংশ রাজত্ব করে ১১৪৪ সাল পর্যন্ত। অর্থাৎ প্রায় ৪০০ বছর পালরাজারা শাসন করেন এবং তারফলে আশা করা যায় যে, পালরাজত্বেে ব্রাহ্মণ্যধর্মের মুলবৈশিষ্ট্য বর্নাশ্রম প্রথার কড়াকড়ি ছিল না। ফলে সব মানুষের মধ্যে সামাজিক আদানপ্রদান এবং বিয়ে ইত্যাদির চল ছিল বলে ভাবা যেতে পারে এবং তাহলে এই পর্যায়কালেও ভারতের এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে রক্তের মিশ্রণ অব্যাহত ছিল।
আমাদের মনে রাখা উচিত যে, পাল সাম্রাজ্য কোন ছোট রাজ্য ছিল না। রমেশচন্দ্র মজুমদারের বাংলাদেশের ইতিহাস গ্রন্থের মাধ্যমে জানা যায় যে, কোন একসময়ে এই সাম্রাজ্য সিন্ধুনদ ও পাঞ্জাবের উত্তরে হিমালয়ের পাদভূমি এবং পশ্চিমে গুজরাট পর্যন্ত প্রসারিত ছিল (পৃষ্ঠা ৬২)।
আর একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন--- মুলনিবাসী তত্ত্বের প্রবর্তকরা বহিরাগত বলছেন কাদের? অর্থাৎ কোন অঞ্চল থেকে আসা মানুষেরা তাঁদের হিসাবে বহিরাগত? বিশেষ করে যদি ইরান, আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান, চীন যদি মগধ সাম্রাজ্যের অংশ হয়?
তাঁরা DNA টেস্টের উল্লেখ করে এক বিদেশি এলাকা ইউরেশিয়ার নাম উল্লেখ করে থাকেন। আমাদের জানা প্রয়োজন যে, পৃথিবীর ঠিক কোন অঞ্চল এই ইউরেশিয়া এবং তার প্রাচীনকালের নাম কি ইউরেশিয়া, না অন্যকিছু ছিল? সেইসব মানুষেরা মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল কিনা?
আমরা প্রাচীন ইতিহাস পড়ার সময় 'ইউয়েহচি' নামের এক জাতির নাম জানতে পারি, যে জাতি আসলে ভারত সম্রাট কুশান বংশের সাথে সম্পর্কিত বলে সাম্প্রতিককালের পন্ডিতরা বলছেন। এই জাতির বাসস্থানকে 'ইউয়েহচিয়া' বলা হচ্ছে। আসলে এই ইউয়েহচিয়াকে পরিষ্কার করে ইউরেশিয়া বলা হচ্ছে নাতো?
সে যাই হোক, তবে একথা ঠিক যে, যারা আর্যদের বিদেশি ও বহিরাগত বলছেন, তাদের বক্তব্য হলো--- এইসব বিদেশিরা ভারতে এসেছিলেন রাশিয়া, তুর্কমেনিস্তান, কাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান, আফগানিস্তান ও অন্যান্য কিছু দেশ থেকে বা এক কথায় ইউরেশিয়া থেকে । কিন্তু মগধ সাম্রাজ্যের সময়কালে ওইসব দেশ ছিল ভারতেরই অংশ, মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। আর যাদের বিদেশি বলা হচ্ছে, তারাতো খ্রিস্টপূর্ব ১৯০০ অব্দ থেকে নীলনদ বা হরপ্পা সভ্যতার অঞ্চলে অর্থাৎ ভারতেই বসবাস করছিলেন।
"প্রাচীন জগতের বহু অঞ্চলের সাথে ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের ক্ষেত্রে কুশান যুগ তার বিশিষ্ট ছাপ রেখে গেছে। বহুবিচিত্র জাতি ও মানুষ কুশানদের এক ঐক্যবদ্ধ, অখন্ড সাম্রাজ্যের সীমানার মধ্যে একত্রিত হয়েছিল। ওই কাঠামোর মধ্যে গড়ে উঠেছিল সর্বজন গ্রাহ্য নানা রীতিপ্রথা। আর তা যে কেবল ওই সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তাই নয়, যোগসূত্র গড়ে উঠেছিল রোম, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহ এবং দুরপ্রাচ্যের মধ্যেও" ( ভারতবর্ষের ইতিহাস, কো অন্তনোভা, পৃষ্ঠা ১৬২)।
এই সবকিছু হিসাবে ধরলে বোঝা যায়— খ্রীষ্টের জন্মের সময়কালেও ভারতের মানুষের মধ্যে নিরন্তর আদান প্রদান মিশ্রণ হয়েছে এবং এভাবে সভ্যতার প্রগতি হয়েছে। এটাকে স্বাগত জানাতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে যে, আমরা একই মায়ের সন্তান হলেও আন্দামানের আদিবাসীরা সেই প্রাচীন যুগে পড়ে আছে শুধু যোগাযোগ ও সংমিশ্রণ হয় নি বলেই। সেজন্য সংমিশ্রনকে নিন্দা করা ঠিক নয়, মিশ্রণকে স্বাগত জানাতে হবে। সংমিশ্রণকে অস্বীকার করার চেষ্টা বোকামি ও প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তা।
আর একথাও বলা দরকার যে, আমাদের পূর্ববাংলা ছিল সেই সুদূরকাল কাল থেকে অনেক দূরের দেশ, এই যে ইতিহাস আমরা বলি এবং পড়ি, তার প্রায় বাইরের দেশ, অনেকটাই স্বতন্ত্র—তার ছিল আলাদা ইতিহাস এবং একইরকমভাবে দক্ষিণ ভারতও বহুক্ষেত্রেই আলাদা ; আবার একইসুত্রে গাঁথা।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন