অনন্য হরিচাঁদ ঠাকুরের স্বতন্ত্র-স্বাধীন মতুয়াধর্ম
অনন্য হরিচাঁদ ঠাকুরের স্বতন্ত্র-স্বাধীন মতুয়াধর্ম
[প্রবন্ধটি ২৫.0১.২০১১ তারিখে লেখা এবং সামান্য সংক্ষিপ্ত আকারে সন্তোষকুমার বাড়ুই সম্পাদিত 'ঠাকুর শ্রীশ্রী হরিচাঁদ মানব পুরুষ : আধ্যাত্ম পুরুষ' গ্রন্থে প্রথম প্রকাশিত হয়]
সাধারণতঃ নতুন কিছু সৃষ্টি বা সৃষ্টি শুরুর কাজ আরম্ভ হয় প্রয়োজনের তাগিদ থেকে। সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন, রাজনীতি, ধর্ম প্রভৃতি সমস্ত ক্ষেত্রেই নব নব উদ্ভাবন ও সৃষ্টির পিছনে এই তাগিদ লক্ষ্য করা যায়, এমনকি মানুষ ও জীবজগতের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন মেটাতেও অহর্নিশ চলছে নতুন সৃষ্টির মিছিল।
সেদিন খুব বেশি প্রাচীন নয়, যখন পৃথিবীতে আজকের মত এতসব ধর্মের অস্তিত্ব ছিল না। গৌতমবুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেন যীশুখৃষ্টের জন্মের মোটামুটি ৬০০ বছর আগে। তিনি জন্মগ্রহণ করেন খৃষ্টপূর্বাব্দ ৫৬৩ সাল বা মতান্তরে ৬২৩ খৃষ্টপূর্বাব্দের ৯ই মে। তিনি বৌদ্ধধর্মের প্রতিষ্ঠাতা। তাই, বৌদ্ধধর্মের সৃষ্টি আজ থেকে ২৬০০ বছরের আগে নয়। খৃষ্টের জন্ম থেকেই ইংরেজী সাল গণনা। খৃষ্টধর্মের বয়স সামান্য কম ২০০০ বছর। হযরত মোহম্মদের জন্ম ৫৭০ খৃষ্টাব্দে। তাই, ইসলাম ধর্মের সৃষ্টিকাল ১৪০০ বছর। শিখধর্ম আরও পরে সৃষ্টি হয়, ১৪৬৯ খৃষ্টাব্দের পরবর্তীকালে শিখধর্মের সৃষ্টি হয়েছে। গুরুনানক জন্মগ্রহণ করেন ১৫ এপ্রিল ১৪৬৯ সালে। গৌরাঙ্গের লীলাকাল ১৪৮৬ সালের পরবর্তী ৪৮ বছর এবং মহামানব হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্ম ১৮১২ সালের ১১ই মার্চ (১২১৮ বঙ্গাব্দ)। মতুয়াদের লড়াই শুরু এই সময়কাল থেকে।
আজকের দিনে হিন্দুধর্ম বলতে আমরা যা বুঝি— অতীতে তাকে যে নামেই অভিহিত বা পরিচিত করা হোক না কেন, ব্রাহ্মণ্যবাদী এই ধর্ম অন্য ধর্মের তুলনায় কিছুটা বেশি প্রাচীন। হিন্দুধর্মের প্রভাব প্রাচীনকালে গোটা পৃথিবী ব্যাপ্ত ছিল কি-না জানি না—তবে আজ থেকে ২৬০০ বছর আগে, যখন বৌদ্ধ ধর্মের সৃষ্টি হয়, তখনও হিন্দুধর্মের ভরকেন্দ্র যে ভারত-আরব ভূখণ্ড ছিল, তাতে কোন সংশয় নেই।
ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুধর্মের সৃষ্টির তাগিদ, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং প্রচার-প্রসার যে স্বল্প সংখ্যক কিছু মানুষের সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থের প্রতিষ্ঠা ও তা রক্ষা করা—একথা আজ সামাজিকভাবে স্বীকৃত। মুষ্টিমেয়র একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার লক্ষ্যে ধর্মের মোড়কে মানুষ ও মানব সমাজকে উৎকৃষ্ট এবং নিকৃষ্ট—শুধু এই দুইভাগে বিভক্ত করা হয়নি; পর্যায়ক্রমিক মর্যাদা ও অমর্যাদার ভিত্তিতে বহুধা বিভক্ত করা হয়। এমনকি বিশাল সংখ্যক এক জনগোষ্ঠীকে স্পর্শ ও দর্শনের অযোগ্য ঘোষণা করে তাদের মনুষ্যতর ইতর পশুতে পরিণত করার ব্যবস্থা করা হয় ধর্মশাস্ত্রের দোহাই দিয়ে। তাদের বেঁচে থাকার প্রায় সব পথই বন্ধ করে দেওয়া হয়। যারজন্য মতুয়া ধর্মগ্রন্থ এইসব হিন্দু শাস্ত্রগ্রন্থের বিরোধিতা করে চলেছে। হরিচাঁদের মতে “ব্রাহ্মণ রচিত যত অভিনব গ্রন্থ, ব্রাহ্মণ প্রধান মার্কা বিজ্ঞাপন যন্ত্র।" — তাই, হিন্দুশাস্ত্রীয় নিষেধাজ্ঞা লংঘন করে, অস্বীকার করে, দু'পায়ে মাড়িয়ে মানুষের মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার মন্ত্র শেখায় মতুয়াধর্ম ।
স্বল্পসংখ্যক মানুষের একাধিপত্য, অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ, নিয়ন্ত্রণ, অবিচার ও ঘৃণা যে বিপুল সংখ্যাধিক মানুষ বহুকাল মুখ বন্ধ করে সহ্য করেন না, প্রতিবাদ করেন, মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেন, এটা শাশ্বত সত্য। ধর্মের নামে এই অত্যাচারের বিরুদ্ধেও নিশ্চয়ই সংগঠিত-অসংগঠিত বহু বিদ্রোহ ও লড়াই হয়েছে। ব্যর্থ লড়াইয়ের ইতিহাসের খবর সাধারণত জানা যায় না। আমরাও তার সবকিছু জানি না।
বহু ব্যর্থ লড়াইয়ের মাঝে উল্লেখযোগ্য ও সফল এক লড়াইয়ের নায়ক গৌতম বুদ্ধ, বৌদ্ধধর্ম। গৌতম বুদ্ধের লড়াই ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মের স্বরূপ উন্মোচন করে মানুষকে সজাগ ও সচেতন করার প্রক্রিয়া শুরু করে। বৌদ্ধধর্ম পৃথিবীব্যাপী ডানা মেলতে থাকে। দলে দলে মানুষ এই সাম্য ও মানবতাবাদী ধর্মকে গ্রহণ করতে থাকেন। এরপর একে একে আবির্ভূত হন যীশুখৃষ্ট, হযরত মোহম্মদ, গুরুনানক, শ্রীগৌরাঙ্গ ও হরিচাঁদ ঠাকুর। বিশ্বের মানব সমাজ হাঁটি হাঁটি পায়ে প্রগতির পথে এগিয়ে চলে।
বিচার-বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই—এইসব মহামনীষীরা শুরু করেছিলেন এক একটি আপোষহীন লড়াই। সেইসব লড়াইয়ের ইতিহাস, পথ প্রকরণ, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সংহত ও সন্নিবেশিত করে এবং বহুক্ষেত্রে সমর্পণ ও সমঝোতার মাধ্যমে গড়ে উঠেছে এক একটি মতাদর্শ ও জীবন দর্শন, আচার-আচরণ — যা আজ ধর্ম নামে পরিচিত। ধর্মই ছিল প্রতিবাদ ও নবনির্মাণের পথ-প্রকরণ।
এইসব ধর্মমতগুলিকে বিচার ও বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি ক্ষেত্রে আমরা ধর্মমতগুলির মধ্যে সাদৃশ্য খুঁজে পাই। — প্রথমতঃ আলোচিত সব ধর্মমতগুলিতে বর্ণাশ্রম প্রথার বিরোধিতা করা হয়েছে এবং প্রত্যেকটি ধর্মের অভ্যন্তরে সামাজিক সাম্যের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সব মানুষের সমান মর্যাদা ও সম্মানের কথা বলা হয়েছে, সমান সুযোগ সুবিধা ও বিকাশের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। যদিও কার্যতঃ এবং বাস্তবতঃ বহুলাংশে এইসব ধর্মের মধ্যে বর্ণবৈষম্যের বিষ চুঁইয়ে প্রবেশ করেছে। ধর্ম পরিবর্তন করলেও ধর্মীয় কুসংস্কারের প্রভাব সবাই, সবক্ষেত্রে, সবটা পরিত্যাগ করতে সক্ষম হননি। কোন কোন ক্ষেত্রে তা অবশ্য প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও কিছুমাত্রায় পেয়ে গেছে। দ্বিতীয়তঃ এইসব প্রতিটি ধর্মের জন্ম হয়েছে পৃথিবীর একই প্রান্তে—ভারত-আরব ভূখণ্ডে, ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুধর্মের কেন্দ্রভূমিতে। তাই, যুগে যুগে বিভিন্ন ধর্মমতের সৃষ্টি যে ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মের বিপরীত প্রতিক্রিয়ার ফসল, অমানবিক প্রতিক্রিয়াশীল হিন্দুধর্মকে উৎখাত করার শপথ—একথা ভাবার যথেষ্ট কারণ আছে।
ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুধর্মের বিপরীতে বৌদ্ধধর্ম, খৃষ্টধর্ম, ইসলাম ধর্ম এবং শিখধর্ম মতাদর্শ ও জীবনাদর্শের আচার-আচরণের বহুক্ষেত্রে হিন্দুধর্মের সাথে বৈসাদৃশ্য এবং কিছুক্ষেত্রে সাদৃশ্য সত্বেও, নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে এবং আলাদা পরিচয় ঘোষণা করে ধর্মমতগুলি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। পক্ষান্তরে বৈষ্ণব ধর্ম তা পারেনি। বৈষ্ণব ধর্ম হিন্দুধর্মের অভ্যন্তরে একটা গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে এবং তাতেই তাদের অনুসারীরা মহানন্দ অনুভব করেন।
মতুয়াধর্মের অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা। ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুধর্মের সাথে মতুয়াধর্মের মতাদর্শগত কোন সাদৃশ্য নেই। সেখানে পুরোপুরি বৈসাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু ধর্মীয় মতাদর্শের ক্ষেত্রে যে বৈসাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়, তার প্রতিফলন মতুয়া সমাজের মানুষের জীবনাদর্শে, আচার-আচরণে বা অনুশীলনে দেখা যায় খুব সামান্য বা প্রায় দেখা যায় না। মতুয়া সমাজের খুবই অল্পসংখ্যক মানুষ মতুয়াধর্ম নির্দেশিত আচার-আচরণ ঠিকমত পালন করেন। তারা আজও প্রায় হিন্দুদের মতই আচার-আচরণ পালন করে চলেছেন।
মতুয়াধর্মের মতাদর্শের সাথে মতুয়াদের জীবনাদর্শ বা আচার আচরণের যে বৈপরিত্য এবং আচার-আচরণে হিন্দুধর্মের সাথে মতুয়াদের যে নৈকট্য, তা আজ মতুয়াধর্মকে এক বড় প্রশ্ন চিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তাহলো—মতুয়াধর্ম কি কোন স্বতন্ত্র স্বাধীন ধর্ম, না হিন্দুধর্মেরই কোন এক স্রোতধারা বা সম্প্রদায়? মতুয়াধর্ম কি তার স্বতন্ত্র স্বাধীন পরিচয় নিয়ে বিকশিত হয়ে প্রতিষ্ঠা পাবে, না তার পরিণতি হবে বৈষ্ণব ধর্মেরই অনুরূপ?
কোন শিশু একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসাবে জন্মগ্রহণ করে না। কিন্তু একজন পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে বিকশিত হবার সব কিছুই একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক শিশুর মধ্যে থাকে। সময়ের সাথে সাথে শিশুরা সব ক্ষেত্রে বেড়ে উঠে একজন পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত হন। মতুয়াধর্ম ঠিক তেমন একটি বিপুল সম্ভাবনার নতুন ধর্ম – যে ধর্মমত এখনও ২০০ বছরের গণ্ডি পার হয়ে আসেনি। উপযুক্ত পরিচর্যা পেয়ে যার মহিরূহে পরিণত হবার সমস্ত সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে আছে। শুধু প্রয়োজন অত্যাধুনিক এই ধর্মকে সঠিকভাবে পরিচর্যা করা। মতুয়াধর্মের মতাদর্শের স্বকীয়তা, বিশিষ্টতা ও নীতি-নির্দেশ এবং তার বিপ্লবী চরিত্রকে নিপুণভাবে সূত্রায়িত করা এবং তারপর তাকে এক ভাষা ও ভাবধারায় ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচারের আলোয় নিয়ে আসা।
এক একটি পূর্ণ ধর্মমতের কয়েকটি করে বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। – যা মতুয়াধর্মের অধরা নয়। প্রতিটি ধর্মের থাকে এক বা একাধিক পবিত্র গ্রন্থ—যা ধর্মগ্রন্থ হিসাবে স্বীকৃত। বাইবেল, কোরাণ, গীতা-বেদ-পুরাণ-উপনিষদ, ত্রিপিটক, গ্রন্থসাহিব, শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত ইত্যাদি। মতুয়াধর্মের আছে শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত এবং শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ চরিত। এছাড়া ধর্মীয় গ্রন্থ শ্রীশ্রী হরি-গুরুচাঁদ চরিত্র সুধা, মহাসংকীর্তন, মতুয়া সংগীত, শ্রীশ্রী হরিসংগীত প্রভৃতি। প্রতিটি ধর্মের মানুষের থাকে একটি করে পবিত্র দিন, যে দিনটিতে ধর্মপ্রাণ মানুষেরা বিশেষ প্রার্থনা করেন। রবিবার, শুক্রবার প্রভৃতি। মতুয়াদের সে দিনটির নাম বুধবার। হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মবার—যাকে সমস্ত মতুয়া সমাজ পবিত্র বার হিসাবে মানেন এবং প্রার্থনা করেন। মঠ, মন্দির, গীর্জা, গুরুদোয়ারা, মসজিদের ন্যায় মতুয়াদের আছে অসংখ্য পবিত্র হরিমন্দির। ভগবান বুদ্ধ, ঈশ্বর, আল্লা ও ভগবানের ন্যায় মতুয়াদের আরাধ্য দেবতা ও দেবী শ্রীশ্রী হরিচাঁদ-শান্তিমাতা। পাদ্রী, যাজক, ভিক্ষু, ইমাম, মৌলবী, পুরোহিত সদৃশ মতুয়া সমাজের আছে অগণিত সাধু, পাগল, গোঁসাই, দলপতি — যারা মতুয়াধর্মের প্রচারক। মাথায় টুপি, পাগড়ি, গলায় ক্রস, কপালে চন্দন, মাথায় টিকি, মাথা মুন্ডন, গায়ে গেরুয়া বসন। গলায় আচার মালা চিনিয়ে দেয় মতুয়া ভক্তদের। মক্কা-মদিনা, বুদ্ধগয়া, শংকরাচার্যের মঠ, আশ্রম, স্বর্ণমন্দির, নবদ্বীপ-মায়াপুরী, পোপের আবাস ভাটিকান সিটির ন্যায় মতুয়াদের তীর্থ—শ্রীধাম ওড়াকান্দি ও শ্রীধাম ঠাকুরনগর ঠাকুরবাড়ি — যেখানে লক্ষ লক্ষ মতুয়া জমায়েত হয়ে নিজেদের ধন্য ও পবিত্র মনে করেন। মতুয়াদের উপাসনার পদ্ধতি হলো জয়ঢাক, লাল নিশান, শিঙা- কাশির সহযোগে বুক চিতিয়ে যুদ্ধ জয়ের ভঙ্গিতে কীর্তন, হরিনাম যা শুধু মতুয়াদের করায়ত্ত। স্বতন্ত্র-স্বাধীন ধর্মমতের সব বাহ্যিক গুণ ও বৈশিষ্ট্য মতুয়াধর্মে বিরাজমান, কোন ঘাটতি নেই!
মতুয়াধর্মকে বলা হয় ‘সহজ সরল গার্হস্থ্য ধর্ম' ; অর্থাৎ গার্হস্থ্য বা সংসারির ধর্ম। সংসার মানে পার্থিব জগতের কর্মক্ষেত্র, ইহকালের লড়াই-সংগ্রাম, না পাওয়া ও পাওয়ার, আনন্দ-বেদনার কথকতা। সুন্দর সংসার গড়ার মন্ত্রণালয় হলো মতুয়াধর্ম। সংসার জীবনকে অনিত্য বলে গৃহধর্মের গুরুত্ব লঘু করায় মতুয়াধর্ম শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুকে সমালোচনা করে। ধর্মের যাঁতাকলে পিষ্ট মানব সমাজের উদ্ধারের সংগ্রামে নেমে সংসার পরিত্যাগ করে সন্ন্যাস জীবন গ্রহণ করায় শ্রীগৌরাঙ্গ ও গৌতম বুদ্ধকে সমর্থন করতে পারেনি মতুয়াধর্ম। লীলামৃত গ্রন্থে তাই লেখা হয়েছে— “তাই দেখি গৃহধর্ম সকলের মূল/এইখানে বুদ্ধদেব করিলেন ভুল/এই ভুল এতকাল সারা নাহি হল/ভুল সেরে মুক্তি দিতে হরিচাদ এলো।” অর্থাৎ গৌতমবুদ্ধ এবং শ্রী গৌরাঙ্গের দর্শন ও আন্দোলনের অসম্পূর্ণতা এবং ভুলভ্রান্তি দূর করে মানব মুক্তির দিশারি হিসাবে কর্মমঞ্চে উপস্থিত হলেন হরিচাঁদ ঠাকুর। হরিচাঁদ ঠাকুরকে সেজন্যই অনন্য এবং পূর্ণ বলে অভিহিত করা হয়।
যে কোন লড়াইয়ে বিজয় অর্জন করতে হলে সমস্যাগুলিকে সঠিকভাবে বোঝা দরকার। সমস্যার ক্ষেত্রগুলিকে চিহ্নিত করতে না পারলে শত্রু-মিত্র পৃথক করা যায় না। আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু সনাক্ত করা যায় না। হরিচাঁদ ঠাকুর ঘোষণা করলেন যে, তিনি 'পতিত পাবক'। পতিত সমাজকে উদ্ধার বা মুক্ত করতে তিনি এসেছেন। মানুষের পতিত হবার কারণ হিসাবে মূলতঃ তিনি হিন্দুধর্মীয় নীতি নির্দেশকে দায়ি করলেন এবং ঐ ধর্মের প্রভাব বলয় থেকে মানুষকে বেরিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানালেন।
হিন্দুদের দেবী-দেবতার সংখ্যা ৩৩ কোটি। হরিচাঁদ ঠাকুর যখন জন্মগ্রহণ করেন। তখন ভারতে আনুমানিক (ধরে নেওয়া যাক) ১১ কোটি মানুষ পতিত-অস্পৃশ্য। তিনজন দেবী-দেবতা মিলে যদি একজন করে পতিতকে তারা উদ্ধার করতেন বা উদ্ধার করতে পারতেন, তাহলে ভূভারতে আর কোন পতিত থাকতেন না। কিন্তু তা হয়নি। বহুকাল ধরে পতিত মানুষেরা অভূক্ত, বিদ্যাশূন্য ও অমর্যাদার গ্লানি নিয়ে কোনমতে টিকে ছিলেন। সেজন্য আবির্ভূত হতে হলো হরিচাঁদ ঠাকুরকে। তিনি জানতেন ——ধর্মীয় নীতি-নির্দেশ স্বয়ংক্রিয় কোন ব্যবস্থা নয়। ধর্মের নিজস্ব ইচ্ছায় বা ক্ষমতায় তা কার্যকরি হয় না, তাকে কার্যকরি করতে হয়। তার ধারক এবং বাহক প্রয়োজন। ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুধর্মের ধারক- বাহক হিসাবে তিনি ব্রাহ্মণ সমাজকে সনাক্ত করে ডাক দিলেন, “বেদ বিধি নাহি মানি, না মানি ব্রাহ্মণ।"
কিন্তু পতিত উদ্ধারের ঘোষণা তো নতুন নয়। বরং বহু পুরনো। হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মের ২৪০০ বছর আগে গৌতমবুদ্ধ প্রায় ঐ একই কথা বলেছিলেন এবং কাজ করেছিলেন। গৌতমবুদ্ধের সাথে তুলনীয় না হলেও, আরও অনেক মহাপুরুষের ন্যায় শ্রী গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুও এসেছিলেন। তাদের চেষ্টায় সে কাজ যে একেবারেই এগোয়নি, তা নয়। কিন্তু উত্থান-পতন, জয়-পরাজয় ও এগোনো পিছনোর অমোঘ নিয়মের রেখা ধরে গোটা ভারতের জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ মানুষ যখন মনুষ্যতর জীবন যাপনে বাধ্য— সেই ঘন অন্ধকারের মধ্যে প্রভাত কিরণ রূপে আবির্ভূত হলেন হরিচাঁদ ঠাকুর।
হরিচাঁদের অন্য এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো – তিনি জন্মগ্রহণ করেন 'চণ্ডাল' পরিবারে। তিনি ছিলেন অস্পৃশ্য চণ্ডাল। বাংলার সমাজের সবচেয়ে ঘৃণিত জনগোষ্ঠী। যাঁদের নাম আজ নমঃশূদ্র নামে রূপান্তরিত। লীলামৃতের ভাষায় বলা হয়েছে— “নীচ হয়ে করিব যে নীচের উদ্ধার/অতি নিম্নে না নামিলে কিসের অবতার?" এ হলো এক যুগান্তকারি শিক্ষা –- যাঁদের লড়াই তাদেরই লড়ে নেবার ডাক, নিজেদের নেতৃত্বে লড়াই করে জয়ী হবার মন্ত্র। সমাজের সবচেয়ে পিছনের সারিতে বেঁধে রাখা, সর্বাধিক ঘূণিত-নিন্দিত বলে প্রচারিত বিশাল ও মহান এক জনগোষ্ঠীকে জাগিয়ে ও চাগিয়ে তোলার শপথ! লড়াই শুরু হলো। সময়ের বিচারে যে কাজ ও চিন্তা ছিল প্রায় অসম্ভব। হাজার হাজার বছরের গ্লানি ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বাংলার গোটা অন্ত্যজ সমাজ – চণ্ডাল, পোদ, জেলে-মালো-রা যে আজ ধীরে ধীরে মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করেছেন, এ প্রগতির রথ ও পথের রূপকার একমাত্র হরিচাঁদ। কোটি কোটি দেবতার বিপরীতে এক রক্তিম প্রভাত সূর্য!
সমাজে ও গ্রন্থে হরিচাঁদ ঠাকুরকে অবতার, পূর্ণব্রহ্ম প্রভৃতি নামে অভিহিত করা হয়। অথচ লীলামৃত গ্রন্থ একথাও বলছে যে, হরিচাঁদ ঠাকুর ছিলেন জীবজগতের অন্যদের মতই রক্ত-মাংসে গড়া, জন্ম ও মৃত্যু ঘেরা মানুষ, মহামানব। — “ঐযে সে মানুষ, মানুষে মিশে গেল” (লীলামৃত)। তাহলে হরিচাঁদ ঠাকুরকে ঈশ্বর, অবতার বা ভগবান বলা কি ঠিক নয়? —অথবা তাকে মানুষ বলে অভিহিত করা কি হরিচাঁদ ঠাকুরকে ছোট করা নয়? – আপাত দৃষ্টিতে এসব বাক্যগুলিতে এক ধরনের স্ববিরোধিতার সুর ধরা পড়ে ঠিকই। কিন্তু মতুয়াধর্মে ঈশ্বরের ধারণাকে বিচার করতে হবে পতিতমুক্তি আন্দোলনের নেতা হিসাবে। হরিচাঁদ ঠাকুর যখন জন্মগ্রহণ করেন, তেত্রিশ কোটি দেবী- দেবতার বিচরণ ক্ষেত্র ভারতবর্ষে তখনও কোটি কোটি অস্পৃশ্যের হাহাকারে বাতাস ভারি হয়ে থাকে। এই অধঃপতিত মানুষের জন্য যারা কিছুই করতে পারেননি বা করেননি, তাদের ঈশ্বর বা অবতার বলা যায় কি-না, তা নিয়ে লীলামৃত গ্রন্থ ব্যঙ্গাত্বক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে।
হরিচাঁদ ঠাকুর বাল্যকাল থেকেই ছিলেন বিদ্রোহী স্বভাবের এবং আপোষহীন। তাঁর বিদ্রোহের সূচনা ও প্রকাশ দেখা যায় বৈষ্ণব ভক্ত বা বৈরাগীদের বিরুদ্ধাচরণের মধ্য দিয়ে, ধর্মীয় গোঁড়ামীর বিরুদ্ধে। লীলামৃত গ্রন্থে তার বিশেষ বিবরণ আমরা পাই। —“পদরজঃ দূরে থাক দণ্ডবৎ নাই/প্রহার পীড়ন কর যাহা পূর্ব তাই/ঝোলা রাখি বৈষ্ণবেরা স্নানে পানে যায়/উজাড় করিয়া ঝোলা ঠাকুর ফেলায়/পিতৃকোলে থাকি হরি ক্রোধ করি বলে/ ভণ্ডবেটা বৈরাগীরা দূরে যাবে চলে।।”— হরিচাঁদ ঠাকুরের পরিণত বয়সের নানা কথা ও কাহিনীর মধ্য দিয়ে হিন্দুধর্ম ও হিন্দুধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে আমরা সুনির্দিষ্ট মতামত ও নির্দেশ পাই। তাঁর নিজের মুখে দেওয়া নির্দেশ লীলামৃত গ্রন্থের পাতায় আমরা দেখতে পাই এভাবে – “কুকুরের উচ্ছিষ্ট প্রসাদ পেলে খাই/বেদ-বিধি শৌচাচার নাহি মানি তাই/ সত্যবাদী জিতেন্দ্রিয় হইবেক যেই/না থাকুক ক্রিয়াকর্ম হরিতুল্য সেই।” --- অর্থাৎ বেদ ও অন্যান্য হিন্দুধর্মীয় শাস্ত্রগ্রন্থ, আচার-আচরণ এসব কিছুকে তিনি পরিহার ও অস্বীকার করেছিলেন। হিন্দুধর্ম ও তার দেব-দেবীকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। নিজেকে হিন্দুধর্মের একজন বলে কখনও ভাবেননি। হিন্দুধর্মকে মানব মুক্তির পথে শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করেন। তিনি আজীবন ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পতাকা উর্ধে তুলে ধরে বিদ্রোহের প্রতীক হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
তিনি কেন হিন্দুধর্মকে অস্বীকার করেছিলেন? — স্বাভাবিকভাবেই আমাদের এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয়। হরিচাঁদ ঠাকুর পতিত মানুষকে উদ্ধার বা মুক্ত করার যে ব্রত নিয়ে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন হিন্দুধর্মীয় শিক্ষা সে কাজের সম্পূর্ণ পরিপন্থি বলে তাঁর উপলব্ধি হয়েছিল। সেজন্যই তাঁকে হিন্দুধর্ম ও হিন্দুধর্মশাস্ত্রগুলিকে অস্বীকার করতে বাধ্য করে। তিনি বুঝেছিলেন— পতিত জনগোষ্ঠির দুদর্শার কারণ পক্ষপাতদুষ্ট হিন্দুধর্মীয় নানা নীতি ও নির্দেশ। তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে, হিন্দুশাস্ত্রীয় গ্রন্থ মানুষকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে। মানুষের চিত্ত এমনভাবে শাসন করেছে, যাতে, শোষণ ও যন্ত্রণা প্রতিরোধ বিহীন হয়। মানুষ যেন তাদের জীবন-যন্ত্রণাকে ঈশ্বরের আশীর্বাদ হিসাবে গ্রহণ করে অলীক পরকালের সুখ-স্বর্গলাভের আশায় বিভোর থাকে। – এইসব চক্রান্ত বাস্তবায়িত করা হয় সুবিধাভোগীদের শোষণ নির্যাতন দীর্ঘায়ত ও চিরস্থায়ী করার জন্য। বিশেষ করে অস্পৃশ্যতার অনুশীলন ও বর্ণাশ্রম প্রথাকে ব্যবহার করা হয় এই হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে।
হরিচাঁদ ঠাকুর বর্ণাশ্রম প্রথার গণ্ডি ভেঙে বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষকে মেলানোর সংগ্রামে ব্রতী হন এবং এই কাজে তিনি খানিকটা সফলতা লাভ করেন। লীলামৃত গ্রন্থে তার পরিষ্কার উল্লেখ পাওয়া যায়। — “ব্রাহ্মণ, কায়স্থ সাহা, শুদ্র সাধু নর/ছত্রিশ বর্ণের লোক হল একত্তর/ ব্রাহ্মণ, কায়স্থ কুণ্ডু, পাল, ঝালো, মালো/নমশূদ্র, সাহা, সাধু, একত্র হইল”। – এ হলো ভাগ করে শাসন-শোষণ করার ব্রাহ্মণ্যবাদী অপকৌশলের বিরুদ্ধে ঐক্যের জন্য তাঁর উদাত্ত আহ্বান। যে ডাকে মানুষ অভাবিত সাড়া দিলেন। — সময়ের বিচারে যা প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করার সামিল!
চিকিৎসা বিদ্যায় পারদর্শিতা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, অসীম সাহস ও তেজস্বীতা, নিজের বিশ্বাসে স্থির ও অটল থেকে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে বাড়ি বাড়ি ঘুরে কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি যে বিশ্বস্ত কর্মি ও ভক্তবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন, তাঁদের নিয়ে তিনি ধীরে ধীরে গোটা মানব সমাজের মুক্তির দিশা ছড়িয়ে দিতে থাকেন। এই পর্যায়কালে হরিচাঁদ ঠাকুরের মণীষার যে বিচ্ছুরণ হতে থাকে, তা এক কথায় অনবদ্য ও অকল্পনীয়।
হরিচাঁদ ঠাকুর মতুয়াধর্মকে প্রতিষ্ঠা দিলেন তার ১২টি মূল নির্দেশ বা আজ্ঞার ভিত্তির উপর। নির্দেশগুলি থেকে যে নির্যাস বেরিয়ে আসে তা এক বিশুদ্ধ যুক্তিবাদ বা বস্তুবাদ। যে বস্তুবাদ প্রচলিত ধর্ম ভাবনা তথা ভাববাদী যুক্তিহীন ধর্ম ভাবনার সম্পূর্ণ বিপরীত। সে দিক দিয়ে মতুয়াধর্মকে প্রচলিত ধারণার ধর্মমত বলা যায় না। এ হলো এক ধর্ম বিপ্লব — ধর্মের মোড়কে বস্তুবাদী দর্শনের কঠিন অনুশীলন। এ প্রশ্নে লীলামৃতের ভাষা হলো, – “ধর্মের নামেতে জীব অধর্ম করয়/ধর্ম দুঃখী তাই দেখি শ্রীহরি উদয় ।”
মতুয়াধর্মে পরলোক বা পরকালের হাতছানির কোন গল্প নেই। তাই, পরকালে সুখের জন্য ইহকালে অন্যায়, অত্যাচার ও অবিচারকে উপেক্ষা করা বা মেনে নেবার কুমন্ত্রণা দেয় না। পরকালের হাতছানি মানুষকে প্রতিবাদ বিমুখ করে এবং অন্যায়, অত্যাচার ও অবিচারের পথ মসৃণ করে দেয়। তাই বলে মতুয়াধর্ম ন্যায়-অন্যায় বা সুকর্ম-দুষ্কর্মকে এক করে দেখে না। পরলোকের অলীক কল্পিত ভয় দেখিয়ে মানুষকে নিরস্ত করার ভুল কৌশলও নেয় না। এ ব্যাপারে শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত স্পষ্ট শিক্ষা দিয়ে জানায়—“কর্মক্ষেত্রে সংসারেতে কর্ম মহাবল/ সকলেই পায় কর্ম অনুযায়ী ফল/ কর্মকর্তা ফল ভোগে না হয়ে কী যায়/ সুকর্ম-দুষ্কর্ম ফল অবশ্যই হয়।।” – অর্থাৎ সংসার জীবনে সর্বদাই সৎপথে থেকে ভাল কাজকর্ম করার শিক্ষা দেয়। খারাপ কাজ ও অসৎ চিন্তা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেয় লীলামৃত।
সংসার জীবনে সুখ-শান্তি, স্বাচ্ছন্দ ও প্রগতির জন্য হরিচাঁদ ঠাকুর যে উপদেশ দিলেন তার মর্মার্থ হলো – (১) সামাজিক ক্ষেত্রে কুসংস্কার দূর করা। সত্য, চেতনা ও চরিত্র গঠনের উপর সবিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। (২) শিক্ষাগ্রহণ ও শিক্ষাবিস্তারে যত্নবান হওয়া। (৩) অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্বাবলম্বী হওয়া। (৪) ব্যভিচার থেকে হাজার যোজন দূরে থাকা । (৫) নারীদের শিক্ষা দেওয়া। (৬) প্রশাসন ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কতৃত্ব প্রতিষ্ঠার নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া ইত্যাদি। — শুধু পতিত-দলিত সমাজ নয়, এ বিষয়গুলি গোটা মানব সমাজের টিকে থাকা ও বৃদ্ধির জন্য, প্রগতির জন্য অবশ্য প্রয়োজন এবং এই সক্রিয়তাই হরিচাঁদ ঠাকুর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মতুয়াধর্ম। -– “করিবে গার্হস্থ্য ধর্ম ল'য়ে নিজ নারী/গৃহে থেকে ন্যাসী বানপন্থী ব্রহ্মচারী/গৃহধর্ম রক্ষা করে বাক্য সত্য কয়/ বানপ্রস্থী পরমহংস তার তুল্য নয় ।...... পরনারী মাতৃতুল্য মিথ্যা নাহি কবে/ পর দুঃখে দুঃখী সদা সচ্চরিত্র রবে/..... যত যত তীর্থ আছে অবনী ভিতরে/সত্য বাক্য সমকক্ষ হইতে না পারে /...... দেহের ইন্দ্রিয় বশ করেছে যে জন/ তার দরশনে সব তীর্থ দরশন/...... জীবে দয়া নামে রুচি মানুষেতে নিষ্ঠা/ ইহা ছাড়া আর যত, সব ক্রিয়াভ্রষ্টা।” এছাড়াও “নিজ হাতে ব্যবসায় করে হরিচাঁদ/বাণিজ্য প্রণালী শিক্ষা সবে কৈল দান/.... বাণিজ্য করিয়া হরি শিখায় সকলে/গৃহী কত বড় হয় ব্যবসায়ী হলে/......অর্থ ছাড়া বাক্য যথা প্রলাপ বচন/ অর্থ শূন্য গৃহীজনে জানিবে তেমন/... 'অর্থ অনর্থের মূল' কহে যেই ভণ্ড/অর্থের জানে না অর্থ সেই অপগন্ড/ .....মম পিতৃদেব প্রভু শ্রী হরি ঠাকুর/তিন বাক্য বলে মোরে মধুর মধুর/এক বাক্যে বলে শিক্ষা দিতে পুত্রগণে/দ্বিতীয় অতন্দ্র থাকি বিজয়ে মরণে” ইত্যাদি সব যুগান্তকারি নির্দেশ দিয়েছেন হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদ - যা আজ ধর্মীয় বাণী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত। এসব নীতিকথাগুলি মুখে বলেই হরিচাঁদ তাঁর দায় শেষ করেননি। চাষাবাদ করে, ব্যবসা করে, নিজে সংস্কারমুক্ত জীবন যাপন করে, ছেলে গুরুচাঁদকে স্কুলে পাঠিয়ে – অর্থাৎ হাতে কলমে সবকিছু করে জীব-জগতকে শিক্ষা দিয়েছেন।
নির্দেশগুলি খুটিয়ে পরীক্ষা করলে বোঝা যায় যে, মতুয়াধর্মে ব্যক্তিমুক্তির কোন বাসনা ব্যক্ত করা হয়নি। এই ধর্মে রয়েছে সমষ্টিগত ভাবনা এবং সমষ্টি বা সামাজিক মুক্তির পথনির্দেশ। সেজন্যে সন্ন্যাস-বান প্রস্থের মত ব্যক্তিমুক্তির সংকীর্ণ স্বার্থ চিন্তা এখানে কোন ঠাঁই পায়নি। মতুয়াধর্মে সংসার ত্যাগ ও সন্ন্যাস গ্রহণকে লড়াই ছেড়ে পালিয়ে যাবার মত কাপুরুষতা বলে গণ্য করা হয়েছে। এ প্রশ্নে লীলামৃতের শিক্ষা হলো – “আদর্শ দেখাতে গোরা সন্ন্যাসী হইল/সংসারের জীব কিন্তু সংসারে রহিল/ জগত তারিতে এসে সংসার ছাড়িল/সংসার সং সার হলো জগত ডুবিল।” সুন্দর, সুখী সংসার গড়ার লড়াই হলো মতুয়াধর্মের অনুশীলন।
হরিচাঁদ ঠাকুরের মতে সাধারণ মানুষের সংসার ব্রত, সংসার জীবন বা সাংসারিক ক্রিয়াকাণ্ডই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ ও ব্রত। সংসারি মানুষেরাই এই বিশ্বের অপূর্ব সৃষ্টি জীব জগৎকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। সংসার বা পরিবার হলো বিশ্ব প্রকৃতির দিগন্ত বিস্তৃত সংগঠনের ক্ষুদ্রক্ষুদ্র শ্রেষ্ঠতম একক। দেশ ও জাতি গঠন এবং প্রগতির নিউক্লিয়স। লীলামৃত গ্রন্থ বলে “গার্হস্থ্য আশ্রমে ধরি নরকূল বাঁচে/ গৃহীকে করিয়া ভর-সকলে রয়েছে/ সহজ গার্হস্থ্য ধর্ম সর্বধর্ম সার/গৃহীকে বিলাবে মুক্তি শ্রীহরি আমার।।”—এই ধর্মীয় ঘোষণা পৃথিবীর ইতিহাসে তুলনা রহিত।
মতুয়াধর্মে ঈশ্বর বা ভগবানের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তা খুবই চিত্তাকর্ষক। লীলামৃত গ্রন্থে বলা হয়েছে—“যে যাহারে ভক্তি করে, সেই তার ঈশ্বর।” আবার শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ চরিতে বলা হয়েছে— “যে যাহারে উদ্ধার করে, সেই তার ঈশ্বর।” দুই গ্রন্থে দুই সংজ্ঞার মধ্যে কেউ কেউ বিভিন্নতা, বিভেদ বা বৈষম্যের গন্ধ খোঁজার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবত: তার কোন জায়গা নেই। কারণ সাধারণভাবে 'ভক্তি' শব্দটার মধ্যে এক ধরনের অন্ধত্ব বা যুক্তিহীন ভক্তির আভাস পাওয়া যায়। কিন্তু লীলামৃত গ্রন্থ যুক্তিহীন ভক্তির কথা বলেনি। এই গ্রন্থে দু'টি বিশেষ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে—'জ্ঞানমিশ্রভক্তি' এবং 'শুদ্ধ-প্রেমভক্তি'। অর্থাৎ যুক্তিপূর্ণ ভক্তি শ্রদ্ধার কথাই বোঝাতে চাওয়া হয়েছে— যে শ্রদ্ধার আসন রচিত হয় কর্মগুণে, মানব সমাজের সেবার মধ্য দিয়ে। ফলে, যে পতিত সমাজ হরিচাঁদের স্পর্শে প্রগতির আলোর সন্ধান পেয়েছে, তাদের একমাত্র ঈশ্বর বা ভগবান যে হরিচাঁদ, তাতে আর কোন প্রশ্নের অবকাশ থাকে না।
শ্রীশ্রীহরি লীলামৃত গ্রন্থের বিভিন্ন শ্লোক ও বক্তব্য উল্লেখ করে যতই ধর্মগ্রন্থটিকে এবং মতুয়াধর্মকে যুক্তিবাদের উপর দাঁড় করানো হোক না কেন, কেউ কেউ ঐ একই গ্রন্থের কিছু কিছু অংশ উল্লেখ করে নানা অলৌকিক কাহিনীরও অবতারণা করতে পারেন এবং বস্তুতঃ তা করা হয়। ফলাফল হিসাবে মতুয়া, সাধু, পাগল, গোঁসাই এবং সাধারণ মতুয়া ভক্তরা ঐসব অলৌকিক নানা কাহিনীর কথাই বেশি বেশি জানেন এবং তাতেই মজে আছেন। এ অবস্থা যে প্রকারান্তরে হরিচাঁদ ঠাকুরকে অবমাননার সামিল—একথা মতুয়া সমাজ যত তাড়াতাড়ি অনুধাবন করতে পারবেন, ততই মঙ্গল। 'সখ্য প্রেমে বিশ্বনাথের প্রাণরক্ষা', ‘মৃত গরুর জীবন দান’, বা ‘হীরামনের শ্রীরামরূপ দর্শন' লীলামৃত গ্রন্থের ইত্যাদি আখ্যানগুলি সঠিকভাবে বিশ্লেষণ ও প্রচার না হবার কারণে মতুয়াভক্তদের মনে এসব ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হয়েছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত গ্রন্থের রচয়িতা রসরাজ তারক সরকার। রসরাজ ছিলেন বাংলার বিখ্যাত কবিগান গায়ক। মূলকথা বলার পূর্বে বা মূল সিদ্ধান্তে আসার আগে নানা ধরনের উদাহরণ, শাস্ত্রকথা, উপমা ও বর্ণনার দ্বারা হেঁয়ালী সৃষ্টি করা কবিগান গায়কদের অতি পরিচিত শিল্পগুণ। ফলে, লীলামৃত গ্রন্থ রচনাকালে রসরাজের জীবনের এইসব নানা ধারণা, অভ্যাস ও শাস্ত্রশিক্ষার প্রভাব যে কিছু পরিমাণে পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। তাঁর জানা ও শোনা নানা কাহিনীর বর্ণনাতে তাঁর নিজস্বতার ছোঁয়া যে কিছু পরিমাণে লেগেছে, গভীরভাবে অনুসন্ধান করলে তা বোঝা যায়। ফলে, অনেক মতুয়ার ক্ষেত্রে মতুয়াধর্মের সারমর্ম আত্মস্থ করা কঠিন হয়ে পড়েছে, অনেক ক্ষেত্রে মতুয়ারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন! বহুক্ষেত্রে তাঁরা ভুল করে ফেলছেন বলে মনে হয়। মতুয়াধর্মের আলোচনায় এসব বিষয়াদি হিসাবে রাখা প্রয়োজন।
উদাহরণ হিসাবে উপরে আলোচিত তিনটি আখ্যান যদি ভালভাবে মনোযোগ দিয়ে পড়া যায়, তাহলে আমরা দেখবো – সেখানে মৃত গরু বা মৃত মানুষ বাঁচিয়ে তোলার কথা বলা হয়নি। বর্ণনা করা হয়েছে মুমুর্ষ রোগী বাঁচিয়ে তোলার কাহিনী। হীরামনের শ্রীরামরূপ দর্শনের কথাটিও হরিচাঁদ ঠাকুর পাত্তা দেননি। এসব ব্যাপারে লীলামৃতে লেখা শব্দগুলি হলো – “বিশের হয়েছে রাতে বিসূচিকা ব্যাধি/'মৃতপ্রায়' সবে করিতেছে কাদাকাদি” বা “বাঁচিবে না ঐ গরু 'প্রায়' মরে গেছে/উঠে এস থাক কেন বলদের কাছে” —ঠিক এসব শব্দগোষ্ঠীই লেখা হয়েছে লীলামৃত গ্রন্থে।
হীরামন হরিচাঁদ ঠাকুরের মধ্যে শ্রীরামরূপ দর্শন করে সাময়িক মূৰ্চ্ছা গেলেন। ধাতস্থ হয়ে তিনি হরিচাঁদ ঠাকুরকে ঘটনা বর্ণনা করে আরেকবার ঐ রূপ তাঁকে দেখাবার জন্য অনুরোধ করেন। হরিচাঁদ ঠাকুর এই কথায় কোন গুরুত্ব দেননি এবং তিনি যে ব্যাপারটি এড়িয়ে যান লীলামৃত গ্রন্থের কয়েকটি কথায় তা বোঝা যায়। — -“প্রভু কহে কহি তোকে ওরে হীরামন/ যদি কেহ কারো কিছু করে দরশন/ অসম্ভব দেখে জ্ঞানী প্রকাশ না করে/ শুনিলে সন্দেহ হয় লোকের অন্তরে”--- অর্থাৎ ঐসব কথা আর না বলার জন্য উপদেশ দেন।
হরিচাঁদ ঠাকুর মৃত জীব-জন্তুকে বাঁচিয়ে তুলতে পারতেন, কী পারতেন না – প্রশ্ন তা নয়। আমাদের বুঝতে হবে জীবন এবং মৃত্যু প্রকৃতির খেলা। এই পরিণতি শ্বাশত এবং সত্য। তাই, মৃতদেহে প্রাণ সঞ্চার প্রকৃতি বিরোধি। হরিচাঁদ প্রকৃতির সন্তান । প্রকৃতির বা সৃষ্টির সাবলীল স্রোতধারা আরও সুন্দর করতে ও বহমান রাখতেই তিনি গার্হস্থ্য ধর্ম প্রবর্তন করেন। তাই, আমাদের বুঝতে হবে— তিনি কখনই প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে কোন কাজে নিজেকে নিয়োজিত করবেন না।
হরিচাঁদ ঠাকুরের অমর বাণী হলো— “হাতে কাম, মুখে নাম।” এই শব্দ চারটি নিয়ে নানা মুনির নানা ব্যাখ্যা শুনতে পাওয়া যায়। প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো — সর্বক্ষণ শ্রীহরি ঠাকুরের নাম স্মরণ করতে করতে কাজ করে যাওয়া। অনেকে তাই-ই করেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে জয় হরিচাঁদ, জয় হরিচাঁদ' নাম জপ করেন। মনে হয় এই ব্যাখ্যা অতি সরলীকৃত ব্যাখ্যা এবং এক্ষেত্রে তা অন্ধত্ব বা যুক্তিহীন ভক্তির প্রকাশ। আমরা বরং আলোচিত অতি গুরুত্বপূর্ণ চারটি শব্দের ব্যাখ্যা এভাবে বলতে পারি— তাহলো, হরিচাঁদ ঠাকুরের বাণী, নির্দেশ ও নীতি মেনে চলা এবং স্মরণে রেখে সংসার ও সমাজ জুড়ে অহর্নিশ কাজ করে যাওয়া। হরিচাঁদ ঠাকুরের নীতি নির্দেশগুলি হলো: (১) এক নারী ব্রহ্মচারি (২) পরপতি, পরসতী স্পর্শ না করা। (৩) সত্য কথা বলা। (৪) অকারণ জীব হত্যা না করা। (৫) পরনারীকে মাতৃজ্ঞান করা ও নারীকে সমানাধিকার দান। (৬) অপরের দুঃখে দুঃখিত হয়ে, দুঃখীকে সহযোগিতা দান। (৭) জীবে দয়া ও মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও যত্নশীল হওয়া। (৮) সমস্ত নারী-পুরুষের শিক্ষাগ্রহণ এবং শিক্ষার প্রসার ও প্রচারে যত্নবান হওয়া। (৯) নির্মোহ হয়ে কর্তব্য সমাধা করা। (১০) সাধন, ভজন, দীক্ষা, তীর্থ পর্যটন প্রভৃতি আচার সর্বস্বতা পরিত্যাগ করা। কানে মন্ত্র, দীক্ষা পরিত্যাগ করে 'ধরা ও মরা' প্রথার প্রচলন। অর্থাৎ বুঝিয়ে শিখিয়ে হরিচাঁদ ঠাকুরের মতাদর্শ ও জীবনাদর্শে মানুষকে সামিল করা বা হরিচাঁদের চরণে সমর্পিত করা। হরিচাঁদই হলেন মতুয়াদের একমাত্র গুরু, অন্য কেউ তাঁর তুল্য নন। (১১) সৎসঙ্গের অভ্যাস গড়ে তোলা—তাস, দাবা, জুয়াখেলা পরিত্যাগ করা। (১২) শ্রম বিমুখতা ও অলসতা পরিত্যাগ করা প্রভৃতি। মুখে ‘হরি-হরি' বলা না বলা বড় কথা নয়, বরং হরিচাঁদ নির্দেশিত এসব গুণের অধিকারি একজন গৃহী হয়ে ওঠা আসল কথা। এসব গুণের অধিকারি কোন গৃহী যদি "না ডাক হরিকে, হরি তোমাকে ডাকিবে” (লীলামৃত)।
এতসব গুণ ও বৈশিষ্ট্য সত্ত্বেও, আজও মতুয়াধর্ম যে একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ধর্ম বা মতাদর্শ হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি-– একথা মোটেই ভুল নয়। এই না পারার কারণ মতুয়াধর্মের মতাদর্শের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না। মতুয়াধর্মের মতাদর্শ অন্য ধর্মমতগুলির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, স্বতন্ত্র ও স্বাধীন। তাই, কারণ খুঁজতে হবে হরি- গুরুচাঁদ ঠাকুর পরবর্তী প্রজন্মের মূল বিশিষ্ট নেতা ও ধর্ম প্রচারকদের ভাবনা, লেখনী ও কাজের সাফল্য এবং ব্যর্থতার মধ্যে।
শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত গ্রন্থের উৎসর্গ বাক্যে লেখা হয়েছে— (হরিচাঁদ ঠাকুরের কল্যাণে) “মৃতপ্রায় হিন্দু প্রাণ পাইয়াছে।”—একথা হলো হরিচাঁদ ঠাকুরের অমর সৃষ্টির সম্পূর্ণ বিপরীত ভাবনা। লীলামৃত গ্রন্থখানির ভূমিকাতে আচার্য মহানন্দ হালদার এক জায়গায় লিখেছেন— “...হিন্দু রক্ষা পাইল। গণ্ডী হিসাবে হিন্দু ও হিন্দুধর্মের রক্ষা করা এবং বিরাট বিশ্বজীবনে শান্তিময় গার্হস্থ্য জীবনের পূর্ণ শান্তি উপলব্ধি করানোই শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের আবির্ভাবের অন্তর্নিহিত সত্য।” মতুয়াধর্মে আচার্য মহানন্দ হালদারের অবদান তুলনাহীন। তাঁর অমর সৃষ্টি শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ চরিত মতুয়াধর্মকে যারপর নাই সমৃদ্ধ করেছে। তবুও বিনয়ের সাথে বলা দরকার—উপরে উল্লিখিত তাঁর কথাগুলি ভুল। তাই, ভুল ঝেড়ে ফেলে এগিয়ে চলা প্রয়োজন। মতুয়াধর্ম প্রচারকগণের মধ্যকার এইসব প্রাণ পুরুষদের আবেগতাড়িত ও অসাবধানতা প্রসূত এমন কিছু কিছু মন্তব্য ও লেখনী মতুয়াধর্মের স্বাধীন সত্ত্বার বিকাশে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে চলেছে এবং চিন্তা-চেতনায় ও আচার-আচরণে মতুয়ারা হিন্দু ধর্মের গ্লানি ঝেড়ে ফেলে বিকশিত হতে পারেননি, পারছেন না এখনও। শ্রীধাম ওড়াকান্দি ও শ্রীধাম ঠাকুরনগর ঠাকুর বাড়ি থেকেও আচার-আচরণগত ক্ষেত্রে কোন সুনির্দিষ্ট নীতি-নির্দেশ দেবার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠতা দেখাতে পারেনি। তবে চেষ্টা যে ঠাকুরবাড়ি একেবারেই করেনি তা নয়। সুষ্পষ্ট নির্দেশ দেবার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যাও ছিল। তবে বিগত দু'পাঁচ বছরের মধ্যে অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সে কাজ এখন তাদের করতে হবে। হরিচাঁদ ঠাকুর নিজে আচরণ করে, অনুশীলন করে জীব- জগতকে শিক্ষা দিয়েছেন। গুরুচাঁদ ঠাকুর পরবর্তী দীর্ঘ সময়ে একাজ অনেকাংশে ব্যাহত ও ব্যর্থ হয়েছে।
আচার্য মহানন্দ হালদার ও প্রমথরঞ্জন ঠাকুর মহাশয় তাঁদের কর্মজীবনে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সংস্পর্শে আসেন (সূত্র: অনন্ত বিজয় পত্রিকা)। শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন হিন্দুত্ববাদী এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। আচার্য মহানন্দ হালদারের চিন্তা- চেতনার উপর শ্যামাপ্রসাদের ভাবনার প্রভাব যে কিছুমাত্রায় পড়েছিল তা বোঝা যায় এবং এসব কারণেই তিনি ‘মতুয়া ধর্মকে হিন্দুধর্মের গণ্ডীবদ্ধ' বলে উল্লেখ করেছেন বা লীলামৃত গ্রন্থের উৎসর্গ বাক্যে মৃতপ্রায় হিন্দু প্রাণ পাইয়াছে' ইত্যাদি মত প্রকাশ করেছেন–- যে মত বেঠিক। বরং এক্ষেত্রে আমরা লীলামৃত গ্রন্থের প্রথম প্রকাশের যে ভূমিকা হরিবর সরকার মহাশয় লিখেছেন, তা একবার স্মরণ করলে বুঝতে পারি বা অনুমান করতে পারি যে, হরিচাঁদ ঠাকুরকে হিন্দুধর্মের অবতার বা তাঁর আন্দেলনকে হিন্দুধর্মের ধারাবাহিকতা হিসাবে দেখা, উল্লেখ করা এবং এসব উক্তি ও লেখনী হরিচাঁদের মোটেই পছন্দ ছিল না। যে কারণে তাঁর ভাবনা, চিন্তা ও কাজ সম্পর্কে রসরাজ তারক সরকার যা লিখেছিলেন, তার কিয়দংশপাঠ শ্রবণ করে হরিচাঁদ ঠাকুর তা বাতিল করে দেন এবং বই আকারে প্রকাশ করতে নিষেধ করেন। এমনকি মৃত্যুঞ্জয়কে ঐ গ্রন্থ প্রকাশ না করার জন্য কঠোর ভাষায় নির্দেশ দেন। তাঁর আপত্তির কারণ আর অনুমানের বিষয় থাকে না যদি তাঁর গোটা নির্দেশাবলী ও অনুশীলনকে আমরা সামগ্রিকভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করি। রসরাজ তারক সরকারের লিখিত প্রথম পাণ্ডুলিপির অপ্রয়োজনীয় কাল্পনিক কাহিনীর কাট-ছাঁট করা রূপ হলো বর্তমান লীলামৃত গ্রন্থখানি। সে জন্য হরিচাঁদ ঠাকুরের মতাদৰ্শ সম্যক উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে আমাদের পারদর্শিতা দেখাতে হবে। মতুয়াধর্ম ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুধর্মের মতাদর্শ ও অবিচার-অনাচারের বিরুদ্ধে যে এক মহাবিদ্রোহ, একথা আমাদের এক মুহূর্তের জন্য বিস্মৃত হওয়া উচিত নয়।
আচার্য মহানন্দ হালদার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। সমকালীন রাজনীতির প্রধান ব্যক্তিত্ব মহাত্মা গান্ধীর প্রভাবও তাকে অনেকটাই আচ্ছন্ন করেছিল। তার প্রমাণ পাওয়া যায় শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ চরিত গ্রন্থখানির মধ্যে। গুরুচাঁদ ঠাকুর মহাত্মা গান্ধী বা কংগ্রেসের সাথে কখনই সহমত হতে পারেননি। অথচ আচার্য হালদার মহাশয় মহাত্মা গান্ধীর প্রশংসা করতে যে বিশেষ দু'তিনটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন তা অনৈতিহাসিক। গুরুচাঁদ ঠাকুর বঙ্গভঙ্গ বিরোধি আন্দোলনের এবং অসহযোগ আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন; অথচ শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ চরিতের পাতায় আচার্য মহানন্দ হালদার বঙ্গভঙ্গ বিরোধি আন্দোলনকে সমর্থন করে ফেলেছেন। এমন দু'একটি প্রশ্নে তিনি যা লিখেছেন তা গুরুচাঁদ ঠাকুরকে নাকচ করার সামিল। ঐ গ্রন্থে সংরক্ষণ প্রশ্নে মহাত্মা গান্ধীকে কৃতিত্ব দেবার ঘটনাও প্রমাণ করে মহানন্দ হালদারের উপর কংগ্রেসী রাজনীতির প্রভাব। এ জাতীয় প্রভাব ও প্রভাবিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। স্বয়ং মহানন্দ হালদার লীলামৃত গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন- “গ্রন্থকর্তা কবি রসরাজ মহোদয় কবিগান করিতেন এবং চৈতন্য চরিতামৃত গ্রন্থ তাহার প্রিয় পাঠ্য ছিল, সুতরাং শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত রচনাকালে নিজের অজ্ঞাতসারে তাহার প্রিয় পাঠ্যের ভাবধারা নিজ গ্রন্থে ফুটিয়া উঠিয়াছে।” –আচার্য মহানন্দ হালদারের রচনাও যে রসরাজের মতই কিছুই পরিমাণে প্রভাবিত তা পাঠকদের বুঝতে হবে। তাই, গ্রন্থ দু'টির বিষয়াদির মূল্যায়ণের সময় আমাদের এ ব্যাপারে সজাগ ও সতর্ক থাকা জরুরি, নতুবা সত্যে উপনীত হওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। আর এ সবের ফলে যে বিভ্রান্তি ইতিমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে, এখনই তা দূর করা প্রয়োজন। লীলামৃত গ্রন্থ পাঠ করার সময়ে আমাদের বোঝার চেষ্টা করতে হবে যে, কোন কথাগুলি এবং নির্দেশাবলী হরিচাঁদ ঠাকুরের নিজের ; আর কোন কথাগুলি তারক সরকার ও অন্যান্যদের!
আমাদের বুঝতে হবে প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে প্রগতির শর্ত হলো অসত্যের বিরুদ্ধে সত্য, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়, ঘৃণার বিরুদ্ধে ভ্রাতৃত্ব, অন্ধত্বের বিরুদ্ধে চেতনা সৃষ্টি করা। হরিচাঁদ ঠাকুর সেই বিকল্প পথের সন্ধান দেন এবং আন্দোলনের সূচনা করেন। প্রতিষ্ঠা করেন মতুয়াধর্ম মতাদৰ্শ।
গৃহীর ধর্ম এবং সন্ন্যাস-বাণপ্রস্থের ধারণা পরষ্পর বিরোধি। ঠিক তেমনি বস্তুবাদী ভাবনা এবং আধ্যাত্মবাদী-ভাববাদী ধারণা—এই দু'টি বিষয়, মতবাদ বা দর্শনও পৃথক এবং একে অন্যের থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রকৃতপক্ষে সর্বনাশা আধ্যাত্ববাদী-ভাববাদী হিন্দুধর্মের প্রভাব বলয় থেকে পতিত মানুষকে মুক্ত করে জীবনে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই বস্তুবাদী গার্হস্থ্যধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছেন হরিচাঁদ ঠাকুর, কিন্তু অনেকেই বলার চেষ্টা করেন যে, আধ্যাত্মবাদের সংমিশ্রণে মতুয়াধর্মের সৃষ্টি হয়েছে। এই আলোচনায় আমরা দেখেছি যে, এসব ভাবা ঠিক নয়। কারণ হরিচাঁদ ঠাকুর সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, ভাল-মন্দ, বাস্তব-অবাস্তব – এমন সব পরস্পর বিরোধি ধারণা ও বিষয়াদি মিলিয়ে মিশিয়ে তালগোল পাকিয়ে এক খিচুড়ি মত ও মতবাদ পরিবেশন করেছেন—এসব ভাবা, বলা ও লেখা এই মহামণীষীর প্রতি ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ! হরিচাঁদ ঠাকুর ন্যায়-নীতি ও সত্যের প্রতি অত্যন্ত দৃঢ় ও অটল ছিলেন। সত্য চেতনায় কোন মাঝামাঝি বা আধা-আধি ব্যাপার থাকে না। কোন সমঝোতার মধ্যপন্থা থাকে না। সত্য সব সময় আপোষহীন। সেই জন্যই মতুয়াধর্ম প্রকৃতই এক ধর্ম বিপ্লব। আর হরিচাঁদ ঠাকুর হলেন পতিতদের আসল হরি, পূর্ণানন্দ হরি।।
৯৭
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন