ভূমিকার অংশ : সোজা চোখে বিবেকানন্দ

 


এদেশে স্বামী বিবেকানন্দ এক অদ্ভুত চরিত্র, হয়ত একই সাথে অভূতপূর্ব চরিত্রও বটে। তাহলো, তিনি একজন আপাদমস্তক ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, একজন ধর্মপ্রচারক সন্ন্যাসী। ধর্মকেই তিনি শিক্ষা ও জাতীয় জীবনের সবক্ষেত্রে ভিত্তি করার জন্য জোর সওয়াল করেছেন। এই পরিচয়ের বাইরে তাঁর আর কোনো  বিশেষ পরিচয় নেই। 


তিনি কোন বিখ্যাত লেখক নন, গবেষক নন, অর্থনীতিবিদ নন, রাজনীতিক নন; এমনকি একজন সমাজ সংস্কারকও তিনি ছিলেন না। অথচ দেশ-বিদেশে ও সমাজের প্রতিটি অংশের অসংখ্য মানুষের কাছে তিনি প্রিয়, পূজ্য ও অনুকরণীয়। এর কারণ ও রহস্য কী ? - এই তথ্যানুসন্ধানের জন্য বহু মালমশলা ও ইঙ্গিত, আগ্রহী পাঠকবৃন্দ এই বইয়ের পাতা থেকে খুঁজে নিতে পারবেন বলে মনে হয়।


মার্কসবাদীরা বলেন ধর্ম নাকি আফিম! মোটা চোখে সিপিআই, সিপিআই (এম), নকশাল – এরা হলেন এদেশের মার্কসবাদী সমাজ। এছাড়াও সোস্যালিস্ট, উদারবাদী-গণতান্ত্রিক-ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের মধ্যকার এক বড় অংশ স্বামী বিবেকানন্দের ভক্ত; আরও অনেকেই ঠিক তাঁর ভক্ত না হলেও অনুরাগী! 


দলিত আন্দোলনের সাথে যুক্ত মানুষের অধিকাংশের হিন্দুধর্ম ও ধর্মযাজকদের সম্পর্কে অনীহা ও বিরোধিতা আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের এক বড় অংশ এবং দলিত- মার্কসবাদী প্রয়াত কমরেড অনিল সরকার ও কমরেড কান্তি বিশ্বাসদের মতো মানুষদেরও স্বামী বিবেকানন্দের প্রতি বিশেষ আগ্রহ, দুর্বলতা ও শ্রদ্ধার কথা জানা যায়। - কিন্তু কেন ?


উপরে আলোচিত মতাদর্শ ও মতাদর্শীদের সাথে আরএসএস - বিজেপি-র ভাবনা-চিন্তার বিরোধের কথা সবাই জানেন; কিন্তু উভয়পক্ষই স্বামী বিবেকানন্দ সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত – ঠিক সবাই না হলেও, তাদের মধ্যকার এক বড় অংশ যে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সেকথা বলা যায়। তাই অনুসন্ধান করা দরকার যে, কী সেই ম্যাজিকসূত্র?


স্বামী বিবেকানন্দ সতীদাহ প্রথার পক্ষে বলেছেন, বিধবা বিবাহের বিরোধিতা করেছেন ও বাল্যবিবাহের গুণকীর্তন করেছেন, এই কথা কমবেশি মানুষের অজানা নয়। কোষ্ঠী, গণ – এসব মেনে তিনি বিবাহের পরামর্শ দিয়েছেন এবং যুবক-যুবতীদের নিজের পছন্দমত বিবাহ করার বিষয়টিকে ভয়ানক আক্রমণ করেছেন। তবুও তিনি আধুনিকতা ও প্রগতির প্রতীক এবং যুব সমাজের আইকন! – কীভাবে মেলানো যায়? অথচ বর্তমান সমাজ জীবনের স্রোতে তেলেজলে এই মিল বাস্তবত হয়ে আছে!


স্বামী বিবেকানন্দ সন্ন্যাসী; কিন্তু সংসার ভোলেন না। সারা জীবন ছুটেছেন অর্থ আয় করার জন্য এবং তা সংগ্রহের পিছনে! তিনি যোগী - বই লেখেন রাজযোগ, ভক্তিযোগ, জ্ঞানযোগ বিষয়ে এবং তার কোচিং দেন নিরলসভাবে। শেখান সুস্থ থাকা ও শতায়ু হবার কলাকৌশল; অথচ নিজে একটা দিন সুস্থ থাকতে পারেন না। তিনি সন্ন্যাসী ; কিন্তু রাজগৃহে ছাড়া আতিথ্য নেন না, ফার্স্টক্লাস ছাড়া রেল চড়েন না। তিনি অদ্বৈতবাদী অথচ পুতুলপূজারী!


তিনি শিক্ষা দেন বেদ অনাদি, অনন্ত ও চিরন্তন; কিন্তু এও বলেন যে, বেদ ধীরে ধীরে বিকাশপ্রাপ্ত হয়েছে। তিনি বলেন উপনিষদের সূত্রসমূহ রাজাদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত বিদ্বৎসভায় আলোচনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এবং তা ক্ষত্রিয়দের সৃষ্টি'। —  তাঁর এসব কথায় মানুষ যে শুধু হোঁচট খান তা নয়, মাঝে মাঝে ঠুল খেয়ে যেন মাথা ফাটিয়ে নেন! কিন্তু তিনি তবুও মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেন, ভালবাসা কুড়িয়ে নেন। মৃত্যুর এতবছর পরেও তা অক্ষুণ্ণ, শুধু একথা বলা যথেষ্ট নয়; বরং তিনি সময়ের সাথে আরও বেশি বেশি জনপ্রিয় হয়েছেন।


আজকাল অনেকেই বলেন যে, স্বামী বিবেকানন্দের জীবন ও বাণী নাকি স্ববিরোধিতায় ভরা; কিন্তু কেউ কি প্রশ্ন করবেন না যে, সত্যি কী শুধু তাই - না, তাঁর গুণমুগ্ধরাও স্ববিরোধিতার রঙে রঞ্জিত? অথবা এ সবকিছুই প্রচার শক্তির কেরামতি!


নতুন আর পুরনো, ধর্ম আর বিজ্ঞান, যুক্তি আর বিশ্বাসের লুকোচুরি স্বামী বিবেকানন্দের জীবনের সমগ্রকালব্যাপী কাজ, কথা ও চিন্তার মধ্যে। চেনা দায় কোন্‌টা মুখ ; আর কোনটা মুখোশ। আমি এই বইয়ে চেষ্টা করেছি খোলা মনে পাঠকদের সামনে সবকিছু মেলে ধরার। পাঠকরা পড়বেন, জানবেন ; আর হয়তো দোল খাবেন একবার এদিকে, আবার ওদিকে। আশা নিয়ে অপেক্ষা করব যে, একদিন এই দোলাচলের অবসান হবে, যুক্তি ও সত্যের জয় ঘোষিত হবে। সেই লক্ষ্যে এই বই যদি কিছুটা সহায়ক হয়, তাহলে মনে করব আমার এই প্রচেষ্টা অসফল নয়।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

তৃণমূল নেত্রী ফের সংসদে

যদা যদা হি ধর্মস্য... গীতার এই শ্লোকে ঠিক কী বলা হয়েছে?

ভাতে কেরোসিন যাত্রাপুরে, অভিযোগ বাংলাদেশী