বর্ণাশ্রম প্রথা এবং স্বামী বিবেকানন্দ
ভারতের বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা সম্পর্কে কার্ল মার্কসের মন্তব্য হলো – “ভারতের শক্তি ও ভারতীয় ক্ষমতার চূড়ান্ত প্রতিবন্ধক হলো ভারতের জাত ব্যবস্থা।” লন্ডনের লাইব্রেরিতে বসে পড়াশুনা করে ও ব্রিটিশের নানা রিপোর্ট, দলিল-দস্তাবেজ ঘেঁটে তাঁর এই ধারণা হয়েছিল।
ড. অম্বেদকর হিন্দুধর্মের জাত-বর্ণ ব্যবস্থাকে সবচেয়ে জঘন্যতম একটা ব্যবস্থা হিসাবে ঘোষণা করেন এবং সারাজীবন এই জঘন্য ব্যবস্থা, তার অনুশীলন ও ফলাফলের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তিনি লড়াই শুরু করেন ‘মনুসংহিতা দাহ' কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে।
স্বামী বিবেকানন্দ হিন্দুধর্ম প্রচারক ছিলেন। ভারতের জাত-বর্ণ ব্যবস্থাকে তিনি বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন এইসব হিন্দু শাস্ত্রীয় নীতি-নির্দেশের যাঁতাকলে ফেলে। হিন্দুধর্মের অবিচ্ছেদ্য অংগ, এই ব্যবস্থাকে তিনি কার্যত টিকিয়ে রাখার পক্ষেই মতদান করেছেন এবং এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোনরূপ পদক্ষেপ গ্রহণে বিরত থাকার কথা বলেছেন।
জাত-ধর্ম ও অস্পৃশ্যতার মত একটা জঘন্য ব্যবস্থার পক্ষে বলা স্বামী বিবেকানন্দ কেন, যেকোন পাবলিকম্যানের জন্যে কঠিন কাজ। তাই, এই জ্বলন্ত সমস্যাকে পাশ কাটাতে স্বামী বিবেকানন্দ যে কৌশল গ্রহণ করেন, তাহলো - তিনি জাত-বর্ণ ব্যবস্থা থেকে হিন্দুধর্মকে আলাদা করে দেখানোর চেষ্টা করেন। ১৮৯৪ সালের ৫ই এপ্রিল আমেরিকার ডেট্রয়েট শহরে এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, “জাতিভেদ
প্রথার সহিত ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই” (বাণী ও রচনা, খণ্ড-৫, পৃ: ৩২০)।
স্বামী বিবেকানন্দ জাত-বর্ণ ব্যবস্থাকে একটি সামাজিক সমস্যা হিসাবে বর্ণনা করেন। বলেন, ধর্মে জাতিভেদ নাই, জাতিভেদ কেবল সামাজিক ব্যবস্থা (বাণী ও রচনা, খণ্ড-১, পৃ: ২৫)। তিনি আরও ঘোষণা করেন যে, সমাজ সংস্কার করা সন্ন্যাসী অর্থাৎ তাঁদের সম্প্রদায়ের কাজ নয়। ১৮৯৪ সালের ২৪শে জানুয়ারি মাদ্রাজের ভক্তগণকে নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, “জাতিভেদ উঠিয়া যাইবে কী থাকিবে, এ সম্বন্ধে আমার কিছুই করিবার নাই।... জাতিভেদ থাকা উচিত কী-না এবং স্ত্রীলোকদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পাওয়া উচিত কী না - এ বিষয়ে আমার মাথা ঘামাইবার দরকার নাই” (বাণী ও রচনা, খণ্ড-৬, পৃ. ৩০৭)।
“আমি সমাগত শ্রোতৃবৃন্দের নিকট খোলাখুলি বলিতে চাই যে, আমি একজন জাতিভেদলোপকারি বা সমাজসংস্কারক মাত্র নই। জাতিভেদ বা সমাজসংস্কার বিষয়ে আমার কিছু করিবার নাই” (বাণী ও রচনা, খণ্ড-৫, পৃ: ৬৪)।
জাত-বর্ণ ব্যবস্থা হিন্দুধর্মের অংশ কিনা বা তা একটা সামাজিক বিধানমাত্র কি-না, সে প্রশ্ন নিয়ে আমরা কিছু আলোচনা এখানে করবো। তার আগে উপরে উল্লিখিত স্বামী বিবেকানন্দের বিভিন্ন মন্তব্য থেকে সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, তিনি ও তাঁর সম্প্রদায় জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে কিছুই করতে রাজি নন। আর তার অর্থ এই যে, তাঁরা চান হিন্দু সমাজ যেমন আছে, তেমনই থাকুক; অর্থাৎ জাতি-বর্ণ ব্যবস্থা চলতে দাও। কেন তিনি এই জঘন্য ব্যবস্থা চলতে দিতে ইচ্ছুক, তা আমরা এরপর তার কিছু মন্তব্য থেকে বোঝার চেষ্টা করবো।l
১৮৯৪ সালের ১৫ই মে আমেরিকার বস্টনে এক বক্তৃতায় স্বামী বিবেকানন্দ জাতিভেদ প্রথার গুণ ও সুফল সম্পর্কে বলেন, “ধনলিপ্সা হইতেই জন্মায় হিংসা, ঘৃণা, লোভ এবং চলে প্রচণ্ড কর্ম উন্মত্ততা, ছোটাছুটি কলবর। জাতিভেদপ্রথা মানুষকে এই সকল হইতে নিষ্কৃতি দেয়। জাতিভেদ প্রথায় মানুষ আত্মার চিন্তা করিবার অবসর পায়। আর ভারতীয় সমাজে ইহাই তো আমরা চাই। জাতিভেদপ্রথা আমাদিগকে হিন্দুজাতি রূপে বাঁচাইয়া রাখিয়াছে” (বাণী ও রচনা, খণ্ড-১০ পৃঃ ৫২-৫৩)।
তিনি বলেছেন, “আমাদের এই পরম পবিত্র মাতৃভূমির কালজীর্ণ আচার ও প্রথাসকলের নিন্দা করিও না। অতি কুসংস্কারপূর্ণ প্রথাগুলির বিরুদ্ধেও একটি নিন্দাসূচক কথা বলিও না; কারণ সেগুলি দ্বারাও অতীতে আমাদের কিছু না কিছু কল্যাণ সাধিত হইয়াছে। সর্বদা মনে রাখিও, আমাদের সামাজিক প্রথাগুলির উদ্দেশ্য যেরূপ মহৎ, পৃথিবীর আর কোন দেশেরই সেরূপ নহে। আমি পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র জাতিভেদ দেখিয়াছি; কিন্তু ভারতে উদ্দেশ্য যেরূপ মহৎ, অন্য কোথাও সেরূপ নহে, অতএব যখন জাতিভেদ অনিবার্য, তখন অর্থগত জাতিভেদ অপেক্ষা পবিত্রতা, কৃষ্টি ও আত্মত্যাগের উপর প্রতিষ্ঠিত জাতিভেদ বরং ভাল” (মাদ্রাজের কুম্ভকনমের বক্তৃতা, বাণী ও রচনা, খণ্ড-৫, পৃ: ৬৮)।
স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনার ১০ম খণ্ডের ৭২ পৃষ্ঠার ২/৩ টি বাক্য জেনে নেওয়া যাক। জাতিভেদপ্রথার পক্ষে স্বামী বিবেকানন্দ বলেন যে, উহাই সমতা ও ভ্রাতৃত্বের একমাত্র কার্যকর আদর্শ। ... (তাঁহার মতে) "জাতিভেদ দূর করিতে হইলে সামাজিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ পরিবর্তন করিতে হয় এবং দেশের সমগ্র অর্থনৈতিক প্রণালীর ধ্বংস সাধন একান্ত প্রয়োজন। ইহা অপেক্ষা বরং বঙ্গোপসাগরের জলে সকলকে ডুবাইয়া মারা শ্রেয়।”
এখন প্রশ্ন হলো — জাত-বর্ণ ব্যবস্থা হিন্দুধর্মের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ কী না ? স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ এক জায়গায় বলেছেন, “আমরা বিশ্বাস করি যে, ভারতবর্ষের বর্ণাশ্রমধর্ম মানবজাতিকে প্রদত্ত ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ সম্পদ সমূহের অন্যতম। আমরা ইহাও বিশ্বাস করি যে, অনিবার্য ত্রুটি-বিচ্যুতি, বৈদেশিক অত্যাচার, সর্বোপরি ব্রাহ্মণ নামের অযোগ্য কিছু সংখ্যক ব্রাহ্মণের পর্বতপ্রমাণ অজ্ঞতা ও দম্ভের দ্বারা বর্ণাশ্রম ধর্মের স্বাভাবিক সুফললাভ ব্যাহত হইলেও, এই বর্ণাশ্রম ধর্ম ভারতে আশ্চর্য কীর্তি স্থাপন করিয়াছে এবং ভবিষ্যতেও ভারতবাসীকে পরম লক্ষ্যের অভিমুখে পরিচালিত করিবে” (বাণী ও রচনা, খণ্ড-৫, পৃ:২৯৬)।
স্বামী বিবেকানন্দের এই কথায় পরিষ্কার যে, জাত-বর্ণ ব্যবস্থা ঈশ্বরের দান। এখন সিদ্ধান্ত নেবার যে, সামাজিক বিধানগুলি ঈশ্বরের দান অথবা হিন্দুধর্মের বেদ, স্মৃতি ও সদাচার ইত্যাদি শাস্ত্র এবং শাস্ত্রবচন ঈশ্বরের দান ও নির্দেশ? এভাবে বিচার বিশ্লেষণ করলে নিশ্চিত বোঝা যায় যে, হিন্দুধর্মের জাত-বর্ণ ব্যবস্থা শাস্ত্র নির্দেশিত কারণ দাবি করা হয় — শাস্ত্র হলো ঈশ্বরের বাণী। অর্থাৎ তা সামাজিক বিধান কোনভাবেই নয়। গীতায় শ্রীকৃষ্ণও দাবি করেছেন যে, বর্ণাশ্রম প্রথা তার-ই সৃষ্টি।
বর্তমানকালের জাত-বর্ণ ব্যবস্থা সম্পর্কে এমনকি নিম্নবর্ণের একদল লোকও দাবি করেন যে, হিন্দু ধর্মশাস্ত্র জাত-বর্ণের কথা বলেছে ঠিকই; কিন্তু তা গুণকর্ম ভিত্তিক, বংশানুক্রমিক নয়।
আমরা জানি যে, ১৯০০ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ধর্ম ইতিহাস সম্মেলন নিশ্চিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, ‘গীতা এবং মহাভারত সমসাময়িক নয়' (বাণী ও রচনা, খণ্ড-৬, পৃঃ ৪১-৪২)। এই সম্মেলনে স্বামী বিবেকানন্দ এবং জগদীশচন্দ্র বসু অংশগ্রহণ করেছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনাতে (খণ্ড-৫, পৃষ্ঠা ১৯২) বলা হয়েছে —বিশেষজ্ঞদের এক বড় অংশ মনে করেন যে, গীতা রচনা করেন শঙ্করাচার্য। তা যদি সত্য হয় তাহলে, গীতার রচনাকাল ৮০০ সালের সামান্য আগে-পরে।
বৈদিক যুগ থেকেই এদেশে বর্ণাশ্রম প্রথার সৃষ্টি। বৈদিক যুগে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের মধ্যে দ্বন্দ্বের বহু প্রমাণ আছে। বর্ণ সৃষ্টি না হলে এই দ্বন্দ্ব কোথা থেকে আসে? তাই শ্রীকৃষ্ণের সময়কালের অনেক আগে থেকেই বর্ণাশ্রম প্রথা ছিল এবং তা ছিল বংশানুক্রমিক। তবে একথা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, পুষ্যমিত্র শুঙ্গের সময়ে মনুসংহিতা নামক শাস্ত্রের সৃষ্টির পর খ্রিস্টের জন্মের সময় থেকে জাত-বৰ্ণ ব্যবস্থার কঠোরতা শুরু হতে থাকে। মনুসংহিতা যেহেতু হিন্দুধর্মের এক প্রধানতম শাস্ত্র, তাই তার নির্দেশিত জাত-বর্ণ ব্যবস্থা হিন্দুধর্মের অঙ্গ। গীতা এবং শঙ্করাচার্যের যুগে এসে বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়।
গীতার মাহাত্ম্য এই যে, এই শাস্ত্রগ্রন্থ চলমান বর্ণাশ্রম প্রথার প্রচার ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সফল হয়েছে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন