রাইচরণ ও গুরুচাঁদ
সমকালের দুই দলিত মহামনীষী
রাইচরণ এবং গুরুচাঁদ
আমি গুরুচাঁদ ঠাকুরের অনুরাগী ও তাঁর মতাদর্শের প্রচারক। আজ থেকে ২২ বছর আগে 'গ্রামবাংলার রিনেন্সার জনক গুরুচাঁদ ঠাকুর' শিরোনামে আমি একটি প্রবন্ধ লিখি। ধর্মের গন্ডি থেকে, বলা ভাল মতুয়াধর্মের গন্ডি থেকে তাঁর মহাকীর্তিসমূহকে টেনে বের করে বৃহত্তর পরিসরে পরিচিত করার ক্ষেত্রে এই প্রবন্ধ বিশেষ সহায়ক হয় বলে অনেকে মনে করেন। এরমধ্যে প্রকাশিত হয় আমার বই "মতুয়াধর্ম এক ধর্ম বিপ্লব"। মতুয়া এবং নমোসমাজের বাইরের বহু মানুষ এই প্রবন্ধ এবং বইটির মাধ্যমে গুরুচাঁদের সমাজ সংস্কার আন্দোলন, রাজনৈতিক ও শিক্ষা আন্দোলন প্রভৃতি সম্পর্কে তাঁর মহান কীর্তিসমূহের সাথে পরিচিত হন। প্রকৃতপক্ষে এই সময়কাল থেকেই মতুয়াদর্শনের বিচার - বিশ্লেশনের ক্ষেত্রে এক নুতন বস্তুবাদী ধারা গড়ে ওঠে। মোটামুটি একই সময়ে বা সামান্য আগে পরে আরো ১/২ জন গুরুচাঁদের আন্দোলন ও মতাদৰ্শ নিয়ে লেখেন। দলিতদের বাস্তব জীবনে প্রগতির জন্য গুরুচাঁদের ভূমিকা নিয়ে বিচার বিশ্লেশন শুরু হয়। পাঠকদের সুবিধার্থে ২২ বছর আগে লেখা সেই প্রবন্ধটি আবারও এই পুস্তিকায় ছেপে দেওয়া হলো।
আমার জন্ম পূর্ববাংলায় এক নমো পরিবারে ; আমি ছিলাম যশোর এবং খুলনা জেলার সন্নিহিত গ্রামাঞ্চলের মানুষ। এই অঞ্চল মতুয়া আন্দোলনের পীঠস্থান ফরিদপুর থেকে অনেক দূরের পথ এবং এই দুই অঞ্চল ছিল পরস্পরের সাথে স্বাভাবিক বিচ্ছিন্ন অঞ্চল। আত্মীয়তা, রেল সড়ক জলপথ যোগাযোগ, চলাচলের পথ, ব্যবসা বাণিজ্য—কোন ক্ষেত্রেই এই দুই অঞ্চলের মধ্যে কোন যোগসুত্র ছিল না। দুই অঞ্চলের মধ্যে একমাত্র মিল ছিল এবং আছে, তাহলো — দুটি অঞ্চলই নমো অধ্যুষিত এলাকা। হয়তো যশোর খুলনার এই ৯৬ এলাকায় আজও বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নমো বা সংখ্যালঘু মানুষেরা বসবাস করেন। এই সংখ্যাধিক্যের এক বড় কারণ হলো—অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এইসব অঞ্চলের মানুষ কম সংখ্যায় দেশত্যাগ করেছেন।
ষাটের দশকে (১৯৬০) আমরা যখন স্কুলে পড়ি তখন আমাদের অঞ্চলে কৃষ্ণমতের মানুষের প্রাধ্যান্য ছিল। আজও তাই আছে, তবে মতুয়াদের সংখ্যা এখন কিছুটা বেড়েছে। ঐ সময়কালে আমাদের বিশাল বিস্তৃত অঞ্চলে একজনমাত্র মতুয়া গোঁসাই ছিলেন। তাঁর নাম ছিল ভ্যাবল গোসাঁই এবং হয়তো মেরেকেটে ১০/২০ টি মতুয়ামতের পরিবার ছিলেন। এই ভ্যাবল গোসাঁই হলেন পরবর্তীকালে বাগদা, হেলেঞ্চা, বিষ্ণুপুর এলাকার বিখ্যাত সুধাংশু গোঁসাই। তিনি ৯৬ এলাকায় ভ্যাবল গোঁসাই বলেই পরিচিত ছিলেন। রাইচরণের নেতৃত্বে আন্দোলনের ৫০/৬০ বছর পরের সময়কালেও মতুয়া প্রভাব ও প্রচার ৯৬ এলাকা তথা মশিয়াহাটি অঞ্চলে বিশেষ কিছু ছিল না।
এই পুস্তিকাটির পরিকল্পনা করা হয়েছে মূলত দলিতশ্রেণীর একজন মহামনীষী রাইচরণ মহালদারের (মজুমদার) কীর্তিসমূহ পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য। তিনি ছিলেন যশোর এবং খুলনা জেলার সন্নিহিত ৯৬ অঞ্চলের মানুষ এবং সেটাই ছিল তাঁর কর্মক্ষেত্র। যদিও তার আন্দোলনের ফলে খুলনা এবং যশোর জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রায় সব নমো উপকৃত হয়েছেন এবং এমনকি বরিশাল, ফরিদপুর এবং কুষ্টিয়া জেলারও অনেক নমো তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে শিক্ষিত হয়েছেন এবং তাদের নিজ নিজ এলাকায় পরবর্তীকালে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। এভাবে নমোদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য রাইচরণ অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন।
রাইচরণ মহাশয়কে নিয়ে আমিই প্রথম লিখছি, তেমন নয়। পূর্ব পাকিস্তানের এক সময়ের মন্ত্রী শরৎচন্দ্র মজুমদার মহাশয় রাইচরণের পূর্ণ জীবনীগ্রন্থ লিখেছেন বহুবছর আগে ; কিন্তু নানা কারণে তা সেভাবে প্রচারের আলো পায় নি। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের কাছে রাইচরণ ও তাঁর মহাকীর্তিসমূহ অজ্ঞাত থেকে গেছে। দলিত মানুয়ের কীর্তি এমনিতেই কম প্রচার পায়। তার উপর দেশভাগের জন্য এইসব দলিতবর্গের মনীষীদের কর্মকেন্দ্র চলে গেছে আন্তর্জাতিক সীমানার বাইরে, ওপারে বাংলাদেশে। ফলে সেইসব অসাধারণ লড়াইয়ের কথা এই বঙ্গের মানুষের কাছে আজও অজানা থেকে গেছে।
তবুও মতুয়াধর্ম, গুরুচাঁদ ঠাকুর এবং তাঁর সামাজিক, শিক্ষা ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডের কথা এপার বাংলায় এবং ভারতের কোন কোন পকেটে কিছুটা প্রচার পেয়েছে। সেটা হয়তো সম্ভব হয়েছে তাঁরসাথে ধর্মের ছোঁয়া লেগে থাকার জন্য, মতুয়া ভক্তরা ভারতের নানাপ্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার জন্য। আর এপার বাংলায় ঠাকুরণগরের মত একটি ধর্মীয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার জন্য এবং তাঁর কোন কোন উত্তর পুরুষ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা পাবার জন্য গুরুচাঁদের মহাকীর্তিসমূহের কথা কিছু মানুষের কাছে পৌঁছতে পেরেছে।
গুরুচাঁদ ছিলেন এক অসাধারণ প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর কৃতিত্বসমূহ অবিস্মরণীয় তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাছাড়াও গুরুচাঁদ পিতার সূত্রে পেয়েছিলেন এক বিশ্বাসযোগ্য কর্মীবাহিনী এবং একখন্ড কর্ষিত জমি। হরিচাঁদের এইসব অভিজ্ঞ ভক্ত ও কর্মীবাহিনী গ্রামান্তরে হরি-গুরুচাঁদের মতাদর্শ এবং আন্দোলনের কথা ছড়িয়ে দিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। এভাবে এপার এবং ওপার—দুই বাঙলাতেই মতুয়া আন্দোলনের নেতা হিসেবে গুরুচাঁদ কিছুটা অনুকূল পরিবেশ পেয়েছেন তাতে কোন সন্দেহ নেই।
আর ৯৬ বা মশিয়াহাটি অঞ্চলের দেশত্যাগ করা মানুষেরা তুলনামূলকভাবে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় কম থাকার জন্য এবং অন্যান্য কারণে, এখানে, এই কলকাতা ও কলকাতা সন্নিহিত অঞ্চলের মানুষ রাইচরণ সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানতে পারেন নি। এমনকি ৯৬ বা মশিয়াহাটি অঞ্চলেও তাঁকে নিয়ে বিশেষ কিছু কাজ হয়েছে বা তার কীর্তিসমূহের প্রচার হয়েছে, এমন নয়। বলা যায় নিজের এলাকার নুতন প্রজন্মের কাছেও তিনি প্রায় বিস্মৃত হয়ে আছেন। অথচ রাইচরণ শুধু ৯৬ অঞ্চলের সম্পদ নন, তিনি ও তাঁর কীর্তিসমূহ হলো দলিত আন্দোলনের অমূল্য সম্পদ!
রাইচরণ সামনে দাঁড়িয়ে ঝুঁকি নিয়ে কৃষক আন্দোলন করেছেন, ত্যাগ স্বীকার করেছেন, কয়েদ হয়েছেন, জেল খেটেছেন এবং দীর্ঘ আন্দোলনে জয়লাভ করেছেন। এভাবে বিশাল অঞ্চলের বহু দুস্থ কৃষক পরিবার তাঁর নেতৃত্বে আন্দোলনের ফলে উপকৃত হয়েছেন ; আর তাঁর পরিবার কিন্তু জমিদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করার ফলে প্রায় নিঃস্ব হয়ে যায়। কৃষক আন্দোলনের প্রশ্নে তিনি শুধু দলিতদের মধ্যে সেরা একজন নন, গোটা বাংলার কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর জুড়ি কোথায়! এই বইয়ের গুটিকয়েক পাতা উল্টালেই পাঠক নিশ্চিত হবেন যে, কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে রাইচরণ একজন অগ্রপথিক!
বাংলায় সামাজিক আন্দোলনে নেতৃত্ব করেছেন দলিত সমাজের অন্যান্য আরও কিছু মহান মনীষী। কিন্তু রাইচরণের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট ছিল, যা তাঁর আগে অন্যকারুর ছিল না। রাইচরণ সমস্যাদি নিয়ে ভেবেছেন, ব্যাখ্যা করেছেন এবং সমস্যা দুরীকরণের জন্য পরিকল্পনা রচনা করেছেন। আর সেইসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার জন্য নিজে ময়দানে নেমে, সামনে দাঁড়িয়ে লড়াই চালিয়েছেন— কিছু নির্দেশ ও উপদেশ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন নি। যে সমস্ত সামাজিক ব্যাধিসমূহকে তিনি নির্দিষ্ট/ সনাক্ত করেছিলেন এবং লড়াই করে উৎখাত করেছিলেন, তা জানলে চমৎকৃত হতে হয়।
তাঁর শিক্ষা আন্দোলন, আন্দোলনের বিস্তৃতি এবং সাফল্যের কিছু নমুনা এই পুস্তিকায় লেখা হয়েছে। পাঠকরা সেটা পড়লেই জানতে পারবেন যে, তাঁর এই কৃতিত্ব তুলনাহীন। পাঠকদের জন্য শুধু বলার যে, নমোরা সামগ্রিকভাবে দুস্থ ছিলেন ঠিকই ; তারমধ্যে এই ৯৬ অঞ্চলের নমোদের সার্বিক অবস্থা ছিল বেশি শোচনীয়, রাইচরণ কাজ করেছিলেন এই তুলনামূলক কঠিন পরিস্থিতিতে।
অনেকে মনে করেন, আমিও মনে করতাম এবং হয়তো কোথাও লিখেছি যে, ৯৬ এ রাইচরণের আন্দোলন বুঝি গুরুচাঁদের আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফল! চার বছর আগে যখন রাইচরণ প্রতিষ্ঠিত মশিয়াহাটি বিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠান হয়, তখন আমি কিছু খোঁজখবর করি, পড়াশুনা করি এবং সেই সবকিছু নিয়ে বিস্তারিত লিখেছিলাম।। কিন্তু গুরুচাঁদ এবং রাইচরণের আন্দোলনের মধ্যে কোনরকম যোগাযোগ আমি খুঁজে পাইনি। রাইচরণ ছিলেন গুরুচাঁদের থেকে ৫/৬ বছরের ছোট এবং প্রায় একই সময়ে দুটি বিচ্ছিন্ন এলাকায় দুটি স্বতন্ত্র স্বাধীন আন্দোলন হয় দুই মহামনীষীর নেতৃত্বে। দলিতদের আরেক মনীষী বরিশালের ভেগাই হালদার ছিলেন এই দুইজনের থেকে সামান্য বয়:কনিষ্ঠ।
আগে এই পুস্তিকার নাম ভেবেছিলাম "নমো সমাজের একই উচ্চতার দুই মহামনীষী : রাইচরণ এবং গুরুচাঁদ"। এই কথা জানতে পেরে আমার এক শ্রদ্ধেয় দাদা আপত্তি করেন। বলেন, 'একই উচ্চতার দুই মনীষী' লিখলে নাকি রাইচরণ (বেঁচে থাকলে) লজ্জা পেতেন! তিনি যথেষ্ট পড়াশুনা করা মানুষ, খোঁজখবর রাখেন। তিনি আমাদের সমাজের শ্রদ্ধেয়, তবুও আমি আমার এই দাদার মূল্যায়নের সাথে একমত নই। বরং আমি মনে করি —- গুরুচাঁদ যদি নিজের জীবদ্দশায় ৯৬ এলাকার এই কর্ম মহাযজ্ঞ সম্পর্কে জানতে পারতেন, তাহলে খুবই খুশি হতেন।
তবে দাদার আপত্তি আমি গুরুত্ব দিয়ে ভেবেছি এবং পূর্ব পরিকল্পিত নাম পরিবর্তন করে এই নুতন নাম ঠিক করেছি। মনে হয় এটাই সঠিক নাম হয়েছে। মনীষীদের মহাকীর্তিসমূহের মূল্যায়ন করার দায়িত্ব পাঠকরাই নিন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন