ভারতবর্ষে শিক্ষায় সংরক্ষণের গোড়ার কথা

ভারতবর্ষে শিক্ষায় সংরক্ষণের গড়ার কথা

ব্রিটিশ ভারতের ইংরেজ সরকার সর্বপ্রথম ১৮১৩ সালে ভারতীয়দের শিক্ষিত করার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ওই বছর ব্রিটিশ পার্লামেন্ট একটি আইন তৈরি করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজ সরকারকে নির্দেশ দেয়, " ভারতের উদ্বৃত্ত আয়ের মধ্য থেকে প্রতি বছর ন্যূনতম এক লক্ষ টাকা আলাদা করে রাখতে হবে এবং সেই টাকা ভারতের মধ্যকার দক্ষ নেটিভদের মধ্যে উৎসাহ সৃষ্টি ও শিক্ষার উন্নতি এবং তাঁদের মধ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার সূচনা ও প্রসার ঘটাতে ব্যয় করতে হবে " (আম্বেদকর রচনাবলী, ইংরেজি, খন্ড ২, পৃষ্টা ৪০৯, মহারাষ্ট্র সরকার)। 

তখন অবিভক্ত বিশাল ভারতবর্ষ, লোকসংখ্যা অসংখ্য। এই বিপুল সংখ্যক মানুষদের মধ্যকার বেশিরভাগ অংশকে যে বরাদ্দকৃত এক লক্ষ টাকায় শিক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়, তা সাধারণ বুদ্ধিতে বোঝা যায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকারও তা বুঝতে পারে। তাই কম খরচে বেশি ফললাভের জন্য কোন  ব্যবস্থা খুঁজে বের করার চেষ্টা শুরু হয়। নানা ধরণের খোঁজ খবর নেওয়া হয়, অভিজ্ঞতার বিনিময় ও সমীক্ষার কাজ চলে এবং  পদক্ষেপ গৃহীত হয়। কিন্তু  ড.আম্বেদকরের মতে নেটিভ ভারতীয়দের শিক্ষিত করার জন্য এই যে আইন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট তৈরি করে, তার প্রয়োগ-পদ্ধতি ও অনুশীলন ১৮১৩ সাল থেকেই দীর্ঘ সময়কাল পর্যন্ত কোন সুসংঘটিত ও দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয় নি।

তৈরি করা এই আইন কার্যকরী করার উপায় বাতলে দিয়ে ব্রিটিশ সরকারের 'কোর্ট অফ ডিরেকটরস'  ৩রা জুন, ১৮১৪ তারিখে ভারতের গভর্নর জেনারেলকে এক নির্দেশ জারি করে জানায় " হিন্দুদের মধ্যে সংস্কৃত শেখা মানুষগুলোকে শিক্ষিত করেই এই আইন প্রণয়নের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণ হতে পারে" (তথ্য সূত্র-- আম্বেদকর রচনাবলী, ইংরেজী, খন্ড ২, পৃষ্টা ৪০৯)। বিনয় ঘোষ তাঁর 'বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ' গ্রন্থে (পৃষ্টা ১৯৫) অবশ্য সংস্কৃত শব্দের সাথে আরবি  শব্দের উল্লেখ করেছেন, যা সঠিক বলে মনে হয় না। সংস্কৃত এবং আরবি শেখানোর কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয় ঠিকই এবং সেজন্য ১৭৮০ সালে ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে কলকাতা মাদ্রাসা তৈরি হয় ; তবে তা সরকারের এই ১৮১৩ সালে আইন প্রণয়নের আগের কথা। ১৮১৩ সালে ইংরেজ সরকার শুধুমাত্র সংস্কৃত জানা মানুষদের অর্থাৎ হিন্দু পন্ডিতদের শিক্ষাদান করার নির্দেশ দেয়।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারত বিজয়ের অর্ধ শতকেরও বেশি সময় পর ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও  ব্রিটিশ সরকার এই আইন ও নীতি প্রণয়ন করে। কিন্তু কেন?  নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, পরাধীন ভারতের নেটিভদের কল্যাণ সাধন করা তাঁদের একমাত্র উদ্দেশ্য নয় ; বরং মূল উদ্দেশ্য দখলকারীদের উপনিবেশিক স্বার্থ! 

বিশাল ভারতের অগণিত মানুষকে সুদীর্ঘকাল ব্যাপী  শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় ইংরেজদের পেশিশক্তির সাহায্যে শাসন-শোষণ করা যায় না---এই সত্য ইংরেজরা জানতেন। সেজন্য তাঁরা শত্রু-মিত্র চিহ্নিতকরণ ও ভারতীয়দের মধ্যেই মিত্রশক্তি সৃষ্টির জন্য নানা ধরণের পদক্ষেপ ও কৌশল অবলম্বন করতে থাকে। 

এ ব্যাপারে ভারতবর্ষে নব্য জমিদারশ্রেণীর সৃষ্টি, বিশেষ করে বাংলায় ও দেশের অন্যান্য কয়েকটি অঞ্চলে ১৭৯৩ সালে চালু হওয়া চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কথা স্মরণ করতে পারি। বদরুদ্দীন উমর তাঁর 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাংলাদেশের কৃষক' গ্রন্থে লর্ড কর্নওয়ালিস সাহেবের বক্তব্য উল্লেখ করে লিখেছেন, " ইংরেজদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই এদেশের ভূস্বামীগনকে সহযোগী করিয়া লইতে হইবে। যে ভূস্বামী একটি লাভজনক ভূসম্পত্তি নিশ্চিন্ত মনে ও সুখে শান্তিতে ভোগ করিতে পারে, তাঁহার মনে কোনরূপ পরিবর্তনের ইচ্ছা জাগিতেই পারে না"। 

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রায় চার দশক পর ১৮২৯ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলাফল নিয়ে উইলিয়াম বেন্টিং ঘোষণা করেন, " আমি এটা বলতে বাধ্য যে, ব্যাপক গণবিক্ষোভ বা গণবিপ্লব থেকে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা হিসাবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিশেষভাবে ফলপ্রুসু হয়েছে। অন্যান্য অনেক দিক দিয়ে, এমনকি সব থেকে গুরুত্বপূর্ন মৌলিক বিষয়ে (আর্থিক বিষয়) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যর্থ হলেও, এরফলে এমন এক বিপুল সংখ্যক ধনী ভূস্বামিশ্রেণী সৃষ্টি হয়েছে, যাঁরা ব্রিটিশ শাসনকে টিকিয়ে রাখতে বিশেষভাবে আগ্রহশীল এবং জনগণের উপর তাঁদের অখন্ড প্রভুত্ব বজায় আছে"।

ওই বছরেই, অর্থাৎ ১৮২৯ সালে গভর্নর জেনারেল মেটকাফ সাহেব ইংলন্ডে চিঠি লিখে জানান, " আমার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হইয়াছে যে, আমাদের একান্ত অনুগত একটি প্রভাবশালী শ্রেণী যদি ভারতীয় জনসাধারণের মধ্যে শিকড় বিস্তার না করিতে পারে, তাহলে আমাদের ভারত সাম্রাজ্য সকল সময়েই বিপদজনক অবস্থায় থাকিবে। তাই আমি মনে করি, ইংরেজদের ভারতে বসবাসে সাহায্য করিতে পারে এরূপ প্রত্যেকটি পন্থা আমাদের সাম্রাজ্যের বনিয়াদ দৃঢ় করিবে"।

ভারতে নির্ভরযোগ্য একটি নব্য জমিদারশ্রেণী সৃষ্টির পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যখন ইংরেজ প্রশাসনের  শাখা-প্রশাখার বিপুল বিস্তার শুরু হয়, ইংরেজদের দ্বিতীয় প্রধান পদক্ষেপ হলো ভারতীয়দের মধ্যে ইংরেজ বশংবদ এক শিক্ষিতশ্রেণী সৃষ্টি করা। যাঁরা ইংরেজ প্রশাসনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে অর্থ, মর্যাদা, ক্ষমতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাদি ভোগ করবেন, নিশ্চিন্ত মনে ও সুখে শান্তিতে থাকবেন এবং ভারতে ইংরেজ শাসনের দীর্ঘায়ুর জন্য প্রাণপাত করবেন। অবশ্যই এ ব্যাপারে বহুকথিত ইংরেজদের আর্থিক স্বার্থের প্রশ্নও জড়িত ছিল। বহুবিস্তৃত ইংরেজ প্রসাশনের কর্মী-অফিসারের বিপুল পরিমাণ চাহিদা পূরণ ইংল্যান্ড থেকে সাহেব আমদানি করে সম্ভব হচ্ছিল না এবং সাহেব আমদানি ও তাঁদের বেতন দেওয়া ছিল অনেক বেশি ব্যয় সাপেক্ষ।

'কোর্ট অফ ডিরেক্টরস' ১৮১৪ সালে নির্দেশ দিয়ে বলেছিল যে, সংস্কৃত জানা মানুষগুলোকে যেন  ইংরেজ কোম্পানির সরকার শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করে। সেমত কাজ শুরু হয় ও চলতে থাকে। কলকাতায় ১৮১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ' কমিটি ফর পাবলিক ইন্সট্রাকশন', একই বছরে বম্বেতে তৈরি হয় ' এডুকেশন সোসাইটি' এবং ১/২ বছরের মধ্যে মাদ্রাজেও অনুরূপ দপ্তর তৈরি হয় ( বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ :বিনয় ঘোষ, পৃষ্টা ১৯২)।   কাজ শুরু হয় তবুও বিতর্ক কিন্তু পিছু ছাড়ে না। এই অবস্থায় আবারও ১৮৩০ সালে 'কোর্ট অফ ডিরেক্টরস' মাদ্রাজ সরকারকে এক নির্দেশ দিয়ে জানিয়ে দেয়, "ভারতের যে সমস্ত উচ্চশ্রেণীর মানুষ, যাঁদের অবসর আছে (কায়িক শ্রম করে জীবিকা অর্জন করতে হয় না) এবং যাঁদের স্বদেশবাসীর মনের উপর স্বাভাবিক প্রভাব আছে, তাঁদের শিক্ষিত করলে অনেক বেশি সুফল অর্জন সম্ভব---যা দেশের আপামর সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত করে আশা করা যায় না। তাছাড়া আমাদের বিশেষ আগ্রহ হলো--- ভারতীয় নেটিভদের মধ্যে একটা শিক্ষিত শ্রেণী তৈরি করা, যাঁরা সিভিল সার্ভিসে উচ্চপদের উপযুক্ত হয়ে উঠবেন এবং ইংরেজ প্রশাসনের এক বড় অংশীদার হয়ে উঠবেন” (আম্বেদকর রচনাবলী, ইংরেজি ,  খন্ড ২,  পৃষ্টা ৪০২)। মাদ্রাজ সরকারকে দেওয়া ইংরেজদের এই নির্দেশের স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়, যার উল্লেখ করা হলো। আর অনুমান করা যায় যে, অনুরূপ নির্দেশ সারা ব্রিটিশ-ভারতের জন্যই দেওয়া হয়েছিল।

সেই সময়ে ভারতীয় নেটিভদের মধ্যে উচ্চশ্রেণীর লোক কাঁদের বলা হতো?---সাধারণত যাঁরা প্রভাবশালী এবং উচ্চবর্ণের মানুষ। ইংরেজদের মতে তাঁরা হলেন চারভাগে বিভক্ত জনগোষ্ঠী---১) জমিদার এবং জায়গীরদার, প্রাক্তন সামন্ত প্রভুদের প্রতিনিধি, স্থানীয় নানা প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যক্তি এবং যাঁরা সামরিক গোষ্ঠী বলে পরিচিত  ২) যাঁরা ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে সম্পদের মালিক হয়েছেন---ব্যবসায়ী শ্রেণী  ৩) উচ্চশ্রেনীর রাজ কর্মচারী  ৪) ব্রাহ্মণ এবং তাঁদের সাথে যুক্ত কায়স্থ (বাংলার ক্ষেত্রে), পারভূজ ও সেনভিস (বোম্বের ক্ষেত্রে) ইত্যাদি যাঁরা দীর্ঘকাল কলম চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাঁরা কোন না কোনভাবে শিক্ষিত মানুষ।

এই চারটি শ্রেণী সম্পর্কে ইংরেজ সরকারের সুচিন্তিত মতামত হলো--- পুরোনো বা ইংরেজ আমলের আগেকার জমিদার-জায়গীরদার ( বাংলার ক্ষেত্রে যেমন মুর্শিদকুলি খাঁ ১৭৭২ সালে সমগ্র বাংলাকে ১৩ টি চাকলায় বিভক্ত করে সেগুলিকে ২৫ টি জমিদারি ও ১৩টি জায়গীরে বন্দোবস্ত করেন---বাংলার নবজাগৃতি : বিনয় ঘোষ, পৃষ্টা ৪৪) ও যোদ্ধাশ্রেণীর অবস্থা ইংরেজ রাজত্বকালে ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। তাঁদের পুরোনো পেশা ও আয়ের উৎস আর নেই এবং তাঁদের নূতন কিছু করার আগ্রহ ও ক্ষমতা নেই। ব্যবসায়ী শ্রেণী উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহী নন। তাঁরা তাঁদের ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষাটুকু অর্জন করেই সন্তুষ্ট থাকতে চান। আর পুরোনো শিক্ষিত ও চাকরিজীবীশ্রেণীর  মানুষের (কায়স্থ ইত্যাদি) জনগণের সেইসব অংশের উপর কিছু প্রভাব ও যোগাযোগ ছিল/আছে, যাঁরা সাধারণত: অফিসে যাতায়াত করতেন ; আর যাঁদের অফিস-আদালতের প্রয়োজন ছিল না---সেই বিপুল সংখ্যক মানুষের উপর তাঁদের কোন প্রভাব বা তাঁদের যোগাযোগ ও কোন সংযোগ কোনকালেই ছিল না ; বরং নানা কারণে তাঁরা সাধারণ মানুষের বিরাগভাজন হয়েছেন---দেশের নানা অঞ্চলে যাঁদের বহুক্ষেত্রে অমার্জিত, অভদ্র বলে বিবেচনা করা হয় (সূত্র আম্বেদকর রচনাবলী, ইংরেজি, খন্ড ২, পৃষ্টা ৪০৪)।

এইসব আলোচনা ও পর্যালোচনায় বোঝা যায় যে, সরকার যাঁদের শিক্ষিত করতে চায় এবং বাস্তবত শিক্ষিত করে গড়ে তোলে, তাঁরা হলেন ভারতের ব্রাহ্মণ এবং তাঁদের পর্যায়ভুক্ত ও তাঁদের খুব কাছাকাছি যাঁরা। একই সাথে ইংরেজদের পর্যবেক্ষণ হলো--- "সেই সময়ে ব্রাহ্মণ এবং তাঁদের সমগোত্রীয় উচ্চবর্ণের মানুষেরা দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে ছিলেন হতদরিদ্র ; আর অনেক অন্চলে ব্রাহ্মণ এবং ভিক্ষুক শব্দ দুটি সমার্থক ছিল" (সূত্র : আম্বেদকর রচনাবলী, ইংরেজি, খন্ড ২, পৃষ্টা ৪৯৪)। এইসব রিপোর্ট ও নীতি নির্দেশ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, ভারতে উপনিবেশিক শোষণ, শাসন ও নিয়ন্ত্রণের কাজে সহযোগী হিসাবে ভারতের ব্রাহ্মণরাই ইংরেজদের প্রথম পছন্দ ছিল।

এই অবস্থায় বোম্বে প্রেসিডেন্সির কথা জানা যায় যে, সেখানকার কর্তৃপক্ষ কোন কোন সময়ে সম্পত্তিবানদেরও, বিশেষ করে যাঁরা উচ্চ শিক্ষার জন্য ব্যয় করতে পারেন, তাঁদের উচ্চতর শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রস্তাব সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু উচ্চতর কর্তৃপক্ষের একই জবাব---"সম্পত্তিবান শ্রেণী উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে একেবারেই উদাসীন আর গরিবদের মধ্যে প্রতিভা খুঁজে পাবার কোন উপায় নেই, যতক্ষন না তাঁরা স্কুলে পৌঁছাতে পারছেন। তবে সন্দেহ নেই ধনীদের মধ্যকার এক ক্ষুদ্র অংশ উচ্চ শিক্ষার জন্য নিজেদের যোগ্য প্রমান করেছেন, যাঁরা উচ্চ শিক্ষার সুবিধা উপলব্ধি করতে পেরেছেন---এটা বাঙলাতেই বেশি দেখা যাচ্ছে" (তথ্য সূত্র : আম্বেদকর রচনাবলী, ইংরেজী, খন্ড ২, পৃষ্টা ৪০৫)।

সরকারী নির্দেশে এইসব প্রাচীন ধনী ও ক্ষমতাবানদের বা অন্যান্যদের শিক্ষাদান না করার কারণ যাই বলা হোক না কেন, প্রকৃতপক্ষে এই সিদ্ধান্তের পিছনে একমাত্র না হলেও এক এক বড় কারণ ছিল---পুরোনো ধনী ও ক্ষমতাবানদের অবস্থা ইংরেজ শাসনে ক্রমেই অবনতি হওয়ায় তাঁরা ইংরেজদের প্রতি বিরূপ ছিলেন এবং গরিব কৃষকশ্রেণী--- দলিত ও মুসলমানদের ইংরেজরা বিশ্বাস করতে পারেন নি ; কারণ তাঁরা দীর্ঘ সময়কাল জুড়ে ইংরেজ বিরোধী সংগ্রামে লিপ্ত ছিল ( ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম : সুপ্রকাশ রায়)।

কলকাতা কিছুটা ব্যতিক্রম (ইংরেজদের উল্লেখ) হবার কারণ হতে পারে এই যে, তখন কলকাতা ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ার রাজধানী ছিল এবং কিছু ইংরেজ ও ইংরেজ পাদ্রী নিজেদের উদ্যোগে  বাংলায়  কয়েকটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন করেছিলেন। ---যেমন শেরবোর্ন ও ড্রামন্ড নামে দুই জন ফিরিঙ্গি  কয়েকটি ইংরেজি বিদ্যালয় গড়ে তোলেন কলকাতায়। তাতে বেশ সংখ্যক পুরোনো অভিজাত বাঙালি ইংরেজি শিক্ষার সুযোগ পান। দ্বারকানাথ ঠাকুর ও প্রসন্ন ঠাকুর শেরবোর্ণের স্কুলে পড়েছিলেন। শিয়ালদহের বৈঠকখানায় ছিল হ্যাটম্যান সাহেবের স্কুল। ইংরেজি শিক্ষাদানের জন্য রামমোহন রায় নিজে ১৮১৬ সালে কলকাতার সুরিপাড়ায় স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। রামমোহন রায় নিজে ডিগবী সাহেবের কাছে ইংরেজি শিখেছিলেন।
এ ছাড়াও ড্যানিশ মিশনারি ১৮১৬ সালে ইংরেজি শিক্ষা দেবার জন্য স্কুল খোলেন। ক্যারি, মার্সম্যান, ও ওয়ার্ড নামে তিনজন মিশনারি শ্রীরামপুরে ইংরেজি শিক্ষার স্কুল খোলেন। শিক্ষাদানের সাথে তাঁদের উদেশ্য ছিল খ্রিস্টান ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটানো (Modern India : V D  Mahajan, page 505).
এছাড়াও কলকাতায় সেন্ট টমাস বয়েজ স্কুল  প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭৮৯ সালের ১০ ডিসেম্বর,  সেন্ট টমাস গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭৮৯ সালে, কাদিহাটি কালিনাথ মুখার্জি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮১০ সালের ১৫ জানুয়ারি, সেন্ট বার্নাবাস হাইস্কুল ১৮১৬ সালে, আরপুলি পাঠশালা (হেয়ার স্কুল) ১৮১৮ সালের ১ লা সেপ্টেম্বর, আর্মেনিয়ান কলেজ ১৮২১ সালের ২ এপ্রিল,  সেন্ট পল স্কুল ১৮২২ সালের ২৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় (শতবর্ষ প্রাচীন বিদ্যালয় : সুনীলকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়)। এইসব স্কুলগুলিও কলকাতার বাঙালি ভদ্রলোকশ্রেণীকে সাধারণ শিক্ষা ও  ইংরেজি শিক্ষা গ্রহনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে ও উৎসাহিত করে। 

১৭৭৪ সালে ভারতে সুপ্রিমকোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। সুপ্রিমকোর্ট ছিল কলকাতায়। সুপ্রিমকোর্টের এটর্নি কেরি সাহেবের মুহুরী ছিলেন রামরাম মিশ্র, তিনি খানিকটা ইংরেজি জানতেন। তিনি এই ইংরেজি  ভাষা জ্ঞানের জন্য প্রচুর আয়ের সুযোগ পান (বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ : বিনয় ঘোষ, পৃষ্টা ৪৫)। ইংরেজি জানার জন্য রাজা রামমোহন মহাশয়ও প্রচুর উপার্জনের সুযোগ পেয়েছিলেন। চাকরি, ব্যবসা ইত্যাদি,  এভাবে আয়ের বিশেষ সুযোগ ও মর্যাদা বৃদ্ধির কথা ভেবে অনেকের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার জন্য আগ্রহ সৃষ্টি হয়, অভিজাত হিন্দুরা সামাজিক চাপ উপেক্ষা করে অনেকেই ইংরেজি শিখতে থাকেন। অনেক অভিজাত হিন্দুর ইংরেজদের সাথে যোগাযোগ ছিল, সম্পর্ক তৈরি হয়। বাংলার অভিজাত হিন্দুদের মধ্যে এভাবে যে আগ্রহের সৃষ্টি হয়, এই অবস্থা ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আলাদা ছিল। হিন্দু কলেজ ও সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হবার ফলে তাঁরা এই সুযোগের পূর্ন সদ্ব্যবহার করেন। 

মিশনারিদের উদ্যোগে কলকাতায় নারী শিক্ষারও সূচনা হয়। 'ফিমেল জুভেনাইল সোসাইটি' তৈরি হয় ১৮১৯ সালে। ১৮২১ সালে মিস কুক নামে এক মহিলা ইংল্যান্ড থেকে কলকাতায় এসে নারী শিক্ষার কাজ শুরু করেন এবং এক বছরের মধ্যে ৮ টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮২২ সালের মধ্যে ওইসব স্কুলের ছাত্রী সংখ্যা দাঁড়ায় ২১৭ জন, যার মধ্যে ২০০ জন নিয়মিত স্কুলে আসতেন। তিনি রেভারেন্ড উইলসনকে বিয়ে করে মিসেস উইলসন নামে পরিচিত হন (বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ: বিনয় ঘোষ, পৃষ্টা ২১৩)।

১৮১৩ সালে আইন প্রণয়ন হবার পর ১৮১৪ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল এ সম্পৰ্কীয় নির্দেশ পান। সেই অনুযায়ী ভারতে তিন ধরনের স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১) ইংরেজি স্কুল ২) স্বদেশীয় বা মাতৃভাষা মাধ্যমের স্কুল এবং ৩) সংস্কৃত স্কুল ।  শিক্ষার মাধ্যম নিয়েও ওই সময়কালে অনেক বিতর্ক হয়। এইসব বিতর্কের সময়ে ১৯৩৫ সালের ৭ মার্চ লর্ড বেন্টিং এক নির্দেশের মাধ্যমে শুধুমাত্র ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা দানের কথা বলেন এবং সেই সময় থেকে ব্রিটিশ-ভারতে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষাদান চলতে থাকে (বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ: বিনয় ঘোষ, পৃষ্টা ১৯২)। কিছুটা আগে থেকে ব্যক্তি উদ্যোগ বা মিশনারিদের উদ্যোগে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা হলেও একথা নিশ্চিত করে বলা যায়--- সরকারি সহযোগিতায় বাংলা প্রদেশে প্রথম স্কুল প্রতিষ্ঠা হয় কলকাতায়--- হিন্দু স্কুল/কলেজ ১৮১৭ সালে এবং সংস্কৃত স্কুল/কলেজ ১৮২৪ সালে। বোম্বে প্রদেশে সরকারি উদ্যোগে ও সহযোগিতায় প্রথম স্কুল প্রতিষ্ঠা হয় থানে এবং সুরাটে, ১৮২০ সালে।

এইসব স্কুলে শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ ছাত্ররাই পড়াশুনার অধিকার পান। ধনঞ্জয় কীর লিখিত ' ড.আম্বেদকর: লাইফ এন্ড মিশন' বইটি থেকে জানা যায়---১৮২১ সালে সরকারী সহযোগিতায় পুনায় একটি সংস্কৃত স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং ব্রাহ্মণদের সাথে অন্যান্য উচ্চবর্ন হিন্দুদেরও ওই স্কুলে পড়াশুনা করার সুযোগ দান করার কথা ঘোষণা করা হয়। তাতে পুনার গোটা ব্রাহ্মণ সমাজ অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠেন। এমনকি ব্রাহ্মণ শিক্ষকরাও এই সিদ্ধান্তের প্রবল প্রতিবাদ করেন এবং অধিকাংশ শিক্ষক, শিক্ষকের পদ ছেড়ে দেন। এই যেখানে অন্যান্য উচ্চবর্ন হিন্দুদের অবস্থা সেখানে অস্পৃশ্যদের দুর্দশা কী পর্যায়ে ছিল, তা সহজেই অনুমান করা যায়। তাঁরা শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে কোন হিসাব বা আলোচনাতেই ছিলেন না। এই সময়ে সরকার নিন্মবর্ণের মানুষকে শিক্ষার অধিকার দিতে গিয়ে কোনভাবে ব্রাহ্মণদের বিরাগভাজন হতে চায় নি। সেই সময়কালে শিক্ষক, ইন্সপেক্টর, অফিসার---সবাই ছিলেন ব্রাহ্মণ--- তাঁদের সাধারণ মানুষকে শিক্ষাদানের কথা ধারণাতেই ছিল না! এ সম্পর্কে আমরা কিছু পরে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের লেখা চিঠিপত্র থেকে দুচার লাইন দেখে নেব।

১৮১৩/১৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজ সরকার যে শিক্ষানীতি ঘোষণা করে তা অপরিবর্তিত থাকে ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত। এই দীর্ঘ সময়কালে ইংরেজদের এই শিক্ষা নীতি নিয়ে ইংরেজদের মধ্যেও কিছু বিতর্ক, সন্দেহ, উচিত-অনুচিত নিয়ে আলোচনা হয়। উচ্চবর্ণের গরিব মানুষ, যাঁদের শিক্ষাগ্রহনের ক্ষমতা ছিল না এবং অন্যান্য মানুষদের শিক্ষাদান নিয়ে কথা হয়,  বিশেষ করে অস্পৃশ্যদের শিক্ষাদানের বিষয় নিয়ে কিছু উদারমনা ইংরেজরা নানা প্রশ্ন তোলেন।

এইসব বিষয়ে যেসব কমিটি/কমিশন গঠিত হয় তার লম্বা রিপোর্টের তিনটি প্যারাগ্রাফ (ভাবানুবাদ) পড়লে তৎকালীন অবস্থা অনেকটাই বোঝা যাবে---(১)" কয়েক দশক জুড়ে শিক্ষাদান কর্মসূচির অভিজ্ঞতা সারসংক্ষেপ করে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, উচ্চবর্ণের মধ্যকার গরিব মানুষেরা আমাদের (ইংরেজদের) হাতে শিক্ষা গ্রহন করতে ইচ্ছুক। তাই উচ্চবর্ণের গরিব ঘরের ছাত্রদের জন্য শিক্ষার দরজা আরো প্রসারিত করা প্রয়োজন। কিন্তু সেক্ষেত্রে এক খুব অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। তাহলো---সরকারি স্কুলে উচ্চবর্ণের গরিবদের যদি সহজে/বিনা বেতনে/কম খরচে ভর্তির সুযোগ করে দেওয়া হয়, তাহলে মাহার প্রভৃতি অস্পৃশ্যদের নয় কেন?
(২) কোন সন্দেহ নেই এই মাহার প্রভৃতি অস্পৃশ্যদের যদি শিক্ষা দেওয়া হয়, তাহলে তারা শিক্ষিত হবেন এবং সেক্ষেত্রে তাঁদের সরকারি উচ্চপদে চাকরি না দেবার কোন কারণ থাকে না। অনেক উদারমনা ইংরেজ মনে করেন ব্রিটিশ সরকারের দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে, রক্ষণশীল হিন্দুদের ক্ষোভ ও বিরক্তিকে পাত্তা না দিয়ে অস্পৃশ্যদের জন্য চাকরির দরজা খোলা দরকার এবং  ইংরেজদের উচিত এভাবে বর্ণ বিভেদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ করা।

এই প্রশ্নে তথাকথিত উদারমনা বলে প্রচারিত ইংরেজ আমলা মি: এলফিনস্টন সাহেবের সুচিন্তিত মতামত হলো--- (৩) যদিও খ্রিস্টান মিশনারীরা মনে করেন যে, ভারতের নিন্মবর্ণের মানুষেরা হলেন দেশের সেরা মানুষ। তবুও তাঁদের শিক্ষাদানের ব্যাপারে মনে রাখতে হবে যে, সমাজে তাঁরা শুধু ঘৃণিত নন, তাঁরা সংখ্যায় নিতান্ত নগন্য। তাই ভয়ের কারণ হলো, যদি প্রথমে তাঁদের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার হয়, তাহলে শিক্ষা আর অন্য বর্ণের মধ্যে বিস্তারলাভ করবে না। সেক্ষেত্রে সমাজে ঘৃণিত এইসব বর্ণের মানুষদের এক শিক্ষিত শ্রেণী সৃষ্টি হবে, যাঁদের উপর আমাদের (ইংরেজ প্রশাসনের) সব সময় নির্ভর করতে হবে। এই অবস্থা মেনে নেওয়া যায়, যদি আমরা আর্মির উপর নির্ভর করে দেশ শাসন করতে চাই অথবা ব্রিটিশ-ভারতের একটা ছোট অংশের মানুষের উপর ভিত্তি করে দেশ চালাতে চাই। কিন্তু এই অবস্থা অসঙ্গত। শিক্ষা ও শাসনের জন্য ব্যাপক-বিস্তৃত মানুষের উপর  ভিত্তি স্থাপনের উপায় খুঁজে বের করা দরকার" (আম্বেদকর রচনাবলী, ইংরেজি, খন্ড ২ , পৃষ্টা ৪১৪-৪১৫)। 
এসব ছাড়াও শিক্ষাদান প্রশ্নে অস্পৃশ্যদের বঞ্চিত করার জন্য ‘উপরে জল ঢাললে নীচে নামে কিন্তু নিচের দিকে জল ঢাললে তা কখনো উপরে যায় না’---ইত্যাদি যুক্তির অবতারণা অনেককেই করতে দেখা যায়।

এই আলোচনায় বোঝা যায় যে, সরকার ঘোষিতভাবেই এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত অস্পৃশ্যদের জন্য শিক্ষার দরজা বন্ধ রেখেছিল। তাঁরা শুধু  ব্রাহ্মণদের জন্য শিক্ষার অধিকার সংরক্ষিত করে রাখে। সঙ্গে কিছু অন্যান্য বর্নহিন্দুরাও খানিকটা উপকৃত হন। সেই সুবিধার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ায় ব্রাহ্মণরা শিক্ষায় সবার থেকে এগিয়ে যান এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের অঙ্গ হয়ে ধীরে ধীরে তাঁরা ইংরেজ প্রশাসন অনেকটাই কব্জা করে ফেলেন।

সরকার বদলের জন্য, এমনকি অফিসার-আমলা পরিবর্তনের জন্যও অনেক ক্ষেত্রে সরকারি নীতি নিয়মের কিছু পরিবর্তন হয়। ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ার ১৮১৩/১৪ সালে ঘোষিত শিক্ষানীতিতেও ৪০ বছর পর ১৮৫৪ সালে কিছু পরিবর্তনের কথা ঘোষণা করা হয়। ১৮৫৪ সালের ১৯ জুলাই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির 'কোর্ট অফ ডাইরেক্টরস' এক নির্দেশে জানায়, " আমরা স্বীকার করতে বাধ্য যে, ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ার ব্যাপক জনসাধারণকে শিক্ষা দেবার কাজ আমরা অবহেলা করেছি, বিশেষ করে সেইসব মানুষকে আমরা বঞ্চিত করেছি, যাঁরা নিজেদের চেষ্টায় কোনভাবেই শিক্ষা অর্জন করতে সমর্থ নন। সেজন্য আমরা দেখতে চাই সরকার যেন এইসব সাধারণ মানুষকে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়। এই কাজের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে" (আম্বেদকর রচনাবলী, ইংরেজী, খন্ড ২' পৃষ্টা ৪১৫)। সরকারের এই ঘোষণাকে ভারতের ইতিহাসে ' জনশিক্ষার ভিত' স্থাপন করা হলো বলে বলা হয়।
 
ইংরেজ সরকার জনশিক্ষা প্রসারের কথা ঘোষণা করে ও ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধি করে ঠিকই ; কিন্তু তাতে অস্পৃশ্যদের কোন সুবিধা এনে দিতে পারে নি। এক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে উচ্চবর্ণ হিন্দুরা, তাঁরা কোনভাবেই অস্পৃশ্যদের শিক্ষা গ্রহন বরদাস্ত করতে রাজি ছিলেন না। আর ইংরেজদের দুর্বলতা হলো, তাঁরা কোনভাবেই ব্রাহ্মণদের চটাতে আগ্রহী ছিলেন না। ভারতীয় ধর্ম ও সমাজ কাঠামোর উপর হস্তক্ষেপ করতে ইংরেজরা রাজি ছিলেন না। তারফলে দেখা যায়---ভারতের মধ্যে বাংলায় সর্বপ্রথম শিক্ষাগ্রহণ ও শিক্ষাদান প্রক্রিয়া শুরু হলেও, বাংলার অস্পৃশ্যরা শিক্ষার সুযোগ পান ভারতের অন্যান্য বহু অঞ্চল থেকে অনেকটা দেরিতে। বাংলার উচ্চবর্নিয় মানুষের গোড়ামির তীব্রতার কারণেই এই সংকট বলে অনুমান করা যায়।

অস্পৃশ্যদের দুর্দশার ব্যাপারে আমরা একটি ঘটনার কথা সরকারি রিপোর্টে খুঁজে পাই। ঘটনাটি মহারাষ্ট্রের। ১৮৫৫ সালে আমেদনগরের অধিবাসী অস্পৃশ্যরা নিজেদের উদ্যোগে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। সরকারের নীতি মেনে তাঁরা স্কুল বাড়ি তৈরি করেন, ৩০ জন ছাত্র জোগাড় করেন এবং শিক্ষকের বেতনের অর্ধেক (এটাই নীতি ঘোষিত হয়) দেবার প্রতিশ্রুতির কথা জানিয়ে স্কুলের অনুমোদনের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেন। অঞ্চলের উচ্চবর্ণের হিন্দুরা এই উদ্যোগের  প্রচন্ড বিরোধিতা শুরু করেন, তাঁরা কোনভাবেই এই স্কুলের অনুমোদন সহ্য করতে রাজি নন। উচ্চবর্ণের কেউ ওই স্কুলে স্বাভাবিক বেতনে  শিক্ষকতা করতে রাজি হলেন না। কিন্তু যেহেতু অনুমোদনের জন্য সব শর্ত পূরণ করা হয়েছে, তাই শেষ পর্যন্ত সরকার অনুমোদন দেয় এবং ঐ বছরের নভেম্বর মাসে স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সম্ভবত এটাই ভারতে নিজেদের উদ্যোগে অস্পৃশ্যদের প্রথম স্কুল (আম্বেদকর রচনাবলী, খন্ড ২, ইংরেজি, পৃষ্টা ‌৪০৮)।
 বাংলার ক্ষেত্রে অস্পৃশ্যদের অবস্থা ছিল আরো করুন! বাংলায় অস্পৃশ্যরা নিজেদের উদ্যোগে নিজেদের স্কুল তৈরি করতে সক্ষম হন এই ঘটনার প্রায়  ৫০ বছর পর! সম্ভবত ধলগাঁও গ্রামের জাতীয় বিদ্যালয়টি সরকারি সাহায্য প্রাপ্ত ছিল। ১৯০৫/০৬ সালে বাংলার উচ্চবর্ন হিন্দুদের হুমকি দিতে দেখা যায় এই বলে যে, স্বদেশী আন্দোলনে যোগদান না করলে ওই স্কুলের অনুমোদন বাতিল করা হবে ও সরকারি সাহায্য প্রত্যাহার করা হবে ইত্যাদি ; অর্থাৎ তাঁদের  ব্ল্যাকমেইল করতে দেখা যায়।

আলাদা করে সরকার শুধুমাত্র অস্পৃশ্যদের শিক্ষার জন্য কোন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেনি এবং ইংরেজরা নীতিগত কারণ দেখিয়ে এমন প্রস্তাব খারিজ করে দেয়। অন্যদিকে সরকার কোন সাধারণ স্কুলে অস্পৃশ্যদের ভর্তির জন্য কোন বিশেষ উদ্যোগ নেয় না বা তার সুযোগ করে দেয় না। ফলে সরকার নীতি পরিবর্তন করলেও অস্পৃশ্যদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না। এই সময়ে একটি ঘটনা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৮৫৬ সালের জুন মাসে একজন মাহার ছাত্র সরকারি স্কুলে ভর্তির জন্য আবেদন করেন। স্কুলের বেতন ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করার ঘোষণা করেন; কিন্তু তাঁকে ওই স্কুলে ভর্তি নেওয়া হয়না।
এই বিষয়টি সামনে রেখে ২১ জুলাই, ১৮৫৬ তারিখে বোম্বে সরকার কিছু সাধারণ সিদ্ধান্ত নেয়। তাতে অস্পৃশ্যদের ভর্তির ক্ষেত্রে অবিচারের কথা স্বীকার করেও বাস্তব সমস্যার উল্লেখ করা হয়। বলা হয় যে, মাহার ছেলেটির সুবিচার পাবার অধিকার আছে এবং ভর্তির ক্ষেত্রে বাধাগুলি দ্রুত দূর করার চেষ্টা করা হবে। বিষয়টি ভারত সরকারের নজরে আসে। গভর্নর জেনারেলের অফিস থেকে ২৩ জানুয়ারি ১৮৫৭ তারিখে এ ব্যাপারে একটি চিঠি লেখা হয়। তাতে বলা হয়--- বোম্বে সরকার বিষয়টিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু আমার বলার যে, ছাত্র ভর্তির ক্ষেত্রে এই রকম ঘটনা যেন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির কোন সরকারি স্কুলে না ঘটে। এর পরেই কোর্ট অফ ডিরেকটরস ২৮ এপ্রিল, ১৮৫৮ তারিখে নির্দেশ দেয়---- সরকারি স্কুল সব অংশের মানুষের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি সিদ্ধান্ত মানতেই হবে। সরকারি নীতি কার্যকরী করার জন্য অথবা সরকারি নীতি কার্যকরী করলে যাঁদের সমস্যা হবে, তাঁদের সরকারি স্কুল পরিত্যাগ করে নিজেদের মত স্কুল তৈরি করার স্বাধীনতা আছে।---এইসব তথ্য আম্বেদকর রচনাবলী, ইংরেজী, ২য় খণ্ডের ৪১৭ থেকে ৪১৯ পাতার মধ্যে পাওয়া যায়।
সরকার এইসব নীতি ও নির্দেশ কাগজের উপর লিখেছেন ঠিকই ; কিন্তু বাস্তবত ভারতে ইংরেজদের ভূমিকা, বিশেষ করে অস্পৃশ্যদের স্বার্থের সম্পুর্ন পরিপন্থী ছিল বা ইংরেজরা অস্পৃশ্যদের উন্নতির প্রশ্নে উদাসীন ছিলেন। তার জ্বলন্ত প্রমান হলো---১৮৯২ সালে ইংরেজ সরকার তাঁদের সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীতে অস্পৃশ্যদের নিয়োগ নিষিদ্ধ করে নির্দেশ জারি করে এবং তাঁদের চাকরি পাবার সংকীর্ণ পথটুকুও বন্ধ করে দেয়। উল্লেখ করা দরকার--- শুরুতে বাংলা, বোম্বে ও মাদ্রাজের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাহিনী তৈরি হয়েছিল অস্পৃশ্যদের নিয়ে, যথাক্রমে দুঃসাদ, মাহার ও পরিহাদের নিয়ে। কোম্পানির বাহিনীর সিপাই ও তাঁদের পরিবারের জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শিক্ষাগ্রহণ বাধ্যতামূলক করেছিল। তার সুবিধা অস্পৃশ্যরাও পান। তারফলে ড. আম্বেদকরের ঠাকুরদা, বাবা এবং ড. আম্বেদকরের স্ত্রীর ৬ কাকা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সুবেদার মেজর পদে উন্নীত হতে পেরেছিলেন। (Dr. Ambedkar: Life & Mission by Dhananjoy Kir, page 12). শিক্ষা বিস্তারের এই পর্বে ইংরেজরা অস্পৃশ্যদের চাকরির পথ বন্ধ করে উচ্চবর্ন হিন্দুর চাপে, তাঁদের খুশি রাখার জন্য। উচ্চবর্ন হিন্দুরা, অস্পৃশ্যদের সাথে এক পংক্তিতে বসে শিক্ষা গ্রহন করতে ও চাকরি করতে রাজি ছিলেন না।
গভর্নর জেনারেলের আলোচিত চিঠির ফলে, বিশেষ করে বাংলার অবস্থা কী, সে কথার উল্লেখ থাকায়, সরকার অনুসন্ধান করে এবং দেখা যায় যে, অস্পৃশ্যদের সরকারি স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হয়েছে বাংলায়। সরকারি নীতি লঙ্ঘন করে বাংলায় অস্পৃশ্যদের সরকারি স্কুলে ভর্তি করা বা না করার সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার তুলে দেওয়া হয়েছিল নিচু স্তরের কমিটির হাতে। তারফলে অস্পৃশ্যরা বেশি বেশি অবিচারের শিকার হয়েছেন এবং তাঁরা যে তিমিরে ছিলেন, সেখানেই পড়ে থাকেন ( আম্বেদকর রচনাবলী, ইংরেজী, খন্ড ২, পৃষ্টা ৪১৯)।

জাত-বর্ণ ব্যবস্থা সৃষ্টি করে দীর্ঘকাল ধরে ব্রাহ্মণরা হিন্দু সমাজে যে সন্মান ও ঘৃণার জঞ্জালস্তুপ সৃষ্টি করেছিলেন, তা বজায় রাখতে তাঁরা মরীয়া ছিলেন। ইংরেজদের বিকৃত শিক্ষা নীতির কৃপায় ব্রাহ্মণরা লেখা ও পড়ার ক্ষমতা অর্জন করলেও, শিক্ষিত হতে পারেন না। একজন নিরক্ষর এবং একজন লেখাপড়া জানা ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য উচ্চবর্ন হিন্দুর মধ্যে বর্ন প্রশ্নে প্রায় কোন ব্যবধান দেখা যায় না। সেজন্য দেখা যায়--- বরোদার মহারাজা সায়াজি রাও গায়কোয়াড ১৮৮৩ সালে অস্পৃশ্যদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করলে কোন ব্রাহ্মণ সেই স্কুলে শিক্ষকতা করতে রাজি হন না। তাঁকে মুসলমান শিক্ষকের উপর নির্ভর করে স্কুল চালিয়ে যেতে হয়। ব্রাহ্মণদের সামাজিক প্রতিপত্তি এমন প্রবল ছিল যে, ব্রাহ্মণদের কোপে পড়ার ভয়ে সাতারার মহারাজাকে রাতের বেলায় বিদ্যাশিক্ষা করতে হত ( Dr. Ambedkar : Life and Mission by Dhanonjoy Kir, page 4 & 5).

১৮৫৪ সালে ঘোষিত এই যে জনশিক্ষা কর্মসূচি, ১৮৮২ সালে তার ফলাফল খতিয়ে দেখে ইংরেজ সরকার দ্বারা গঠিত হান্টার কমিশন। তাতে দেখা যায়---১৮৮১-৮২ সালে সারাদেশে প্রাইমারি স্কুলে ব্রাহ্মণ ছাত্র সংখ্যা ৬৩০৭১ জন, অন্যান্য হিন্দু ছাত্র সংখ্যা ২০২৩৪৫ জন, মুসলমান ৩৯২৩১, অস্পৃশ্য ২৮৬২, আদিবাসী ২৭১৩, খ্রিস্টান ১৫২১, পার্সি ৩৫১৭, জৈন এবং অন্যান্য ৩৭৩ জন।

মিডিল স্কুলে (৭ম শ্রেণী পর্যন্ত) ছাত্র সংখ্যা
ব্রাহ্মণ ছাত্র ৩৬৩৯ জন, অন্যান্য হিন্দু ৪৪৪৭, মুসলমান ৬৮৭, অস্পৃশ্য ১৭, আদিবাসী ৬, খ্রিস্টান ১৪২৯, পার্সি ১৫২৬, অন্যান্য ১০৩ জন।

হাইস্কুলে ছাত্রসংখ্যা
ব্রাহ্মণ ছাত্র ১৯৭৮, অন্যান্য হিন্দু ১৭১৩, মুসলমান ১০০, অস্পৃশ্য ০, আদিবাসী ০, খ্রিস্টান ১১১, পার্সি ৯৬৫, অন্যান্য ৯২।

কলেজ ছাত্রসংখ্যা
ব্রাহ্মণ ২৪১ জন, অন্যান্য হিন্দু ১০৮, মুসলমান ৭, অস্পৃশ্য ০, আদিবাসী ০,  খ্রিস্টান ১৪, পার্সি ১০৮, অন্যান্য ২ জন।

এইসব তথ্য উল্লেখ করেছেন ড.আম্বেদকর। যা আম্বেদকর রচনাবলীর ইংরেজি ২য় খণ্ডের ৪১৬ পৃষ্ঠায় দেখতে পাই। এই কমিশনের কিছু তথ্যের উল্লেখ আছে বিনয় ঘোষ লিখিত বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ গ্রন্থে। কিন্তু ওই গ্রন্থে হিন্দুদের মধ্যে ব্রাহ্মণ এবং দলিতদের অবস্থান আলাদা করে উল্লেখ করা হয় নি।

১৮৮২ সালে গঠিত এই হান্টার কমিশন মুসলমানদের শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নতির জন্য ১৭ টি সুপারিশ করে, যা ইংরেজ সরকার গ্রহণ করে এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ফলে, এই সময় থেকে মুসলমানদের শিক্ষাক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি হয়। অনুরূপ সুপারিশ ও ব্যবস্থা গ্রহণ অস্পৃশ্যদের জন্য আরো বেশি প্রয়োজন ছিল, কিন্তু সরকার তেমন কোন উদ্যোগ গ্রহণ করে নি। 

এরপর ১৯২১ সালে শিক্ষাক্ষেত্রে আবার এক সংস্কার কার্যকরী হয়। শিক্ষার দায়িত্ব মিনিস্টারের হাতে অর্পণ করা হয়, কিন্তু তাতেও অস্পৃশ্যদের কোন সুবিধা আসে না।

আমরা আগেই ১৮৫৭ সালে এবং ১৮৫৮ সালে গভর্নর জেনারেল এবং কোর্ট অফ ডাইরেক্টরস-এর দুটি নির্দেশের উল্লেখ করেছি। যেখানে স্পষ্ট করে সরকারি স্কুল/কলেজের দরজা সব বর্ন-ধর্মের মানুষের জন্য খুলে দেবার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই সময়কালে---একটু আগে ও পরে বিদ্যাসাগর মহাশয় দুটি চিঠি লেখেন। কোন সন্দেহ বা বিতর্ক নেই যে, বিদ্যাসাগর মহাশয় সমকালে বাংলার শ্রেষ্ঠ মানুষগুলির মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানুষ ছিলেন। আর নিশ্চিতভাবে ব্রাহ্মণদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তাঁর চিঠি দুটি পড়লে অনুমান করা যায় ব্রাহ্মণ সমাজ তখনও কতটা গোড়া ছিলেন।

একটি চিঠি বিদ্যাসাগর মহাশয় লেখেন কাউন্সিল অফ এডুকেশনের সেক্রেটারিকে, ২৮ মার্চ, ১৮৫১ তারিখে। সংস্কৃত কলেজে ব্রাহ্মণ ছাত্র ছাড়া অন্যান্য বর্ণের হিন্দুদের ভর্তি করা হচ্ছে কিনা, সরকার তা জানতে চায়। উত্তরে বিদ্যাসাগর মহাশয় লেখেন---" এখন কায়স্থদের ভর্তি করা যেতে পারে। কারণ তাঁরা  শূদ্র হলেও হিন্দু সমাজের একটা সম্মানীয় অংশ।.....এটা ঠিক স্বর্ণ বণিকদের মধ্যকার কিছু পরিবার জনপ্রিয় ঠিকই, কিন্তু বর্ণ ব্যবস্থায় তাঁদের অবস্থান অনেক নীচে। তাঁদের এই কলেজে ভর্তি করলে প্রতিষ্ঠানের গোড়া হিন্দু পন্ডিতরা শুধু আহত হবেন তাই নয়, তা কলেজের সম্মান ও জনপ্রিয়তা নস্ট করবে" (বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ : বিনয় ঘোষ, পৃষ্টা ৫৪৫)। উনি তখন ওই কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন।

অন্য চিঠিটি বিদ্যাসাগর মহাশয় লেখেন বাংলার ছোটলাটকে, ১৮৫৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর তারিখে। তিনি লেখেন, " ইংলন্ড এবং ভারতে এমন একটা ধারণা বদ্ধমূল হচ্ছে যে, উচ্চশ্রেণীকে শিক্ষাদানের জন্য যথেষ্ট কাজ করা হয়েছে। এখন দেশের সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত করার দিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার। কিন্তু অনুসন্ধান করলে ঠিক উল্টো অবস্থা দেখা যাবে। যদি একমাত্র উপায় নাও হয়, আমার মতে বাংলায় শিক্ষা বিস্তারের বাস্তবসম্মত উপায় হলো উচ্চশ্রেণীর মধ্যে শিক্ষাদান সীমাবদ্ধ করে রাখা" (বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ : বিনয় ঘোষ, পৃষ্টা ৪৪৩)।---মনে রাখতে হবে নীতি পরিবর্তন করে ইংরেজ সরকার যখন অন্যান্যদের সাথে অস্পৃশ্যদেরও শিক্ষাদানের চেষ্টা চালাচ্ছে, তখন বিদ্যাসাগর মহাশয়ের এই চিঠি ! অনেকে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের এই মত ও সুপারিশের  পক্ষে যুক্তি দেন যে, সরকারের সীমিত ব্যয় বরাদ্দের প্রেক্ষিতে তাঁর বক্তব্য সঠিক। কিন্তু আমরা দেখেছি যে, জনশিক্ষার জন্য ঘোষণার সাথে সরকার ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধির কথাও বলেছে। আর শিক্ষায় ব্যয় বরাদ্দ তো আজও যথেষ্ট নয়! (শেষ)

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

তৃণমূল নেত্রী ফের সংসদে

যদা যদা হি ধর্মস্য... গীতার এই শ্লোকে ঠিক কী বলা হয়েছে?

ভাতে কেরোসিন যাত্রাপুরে, অভিযোগ বাংলাদেশী