জাতবর্ণের হিন্দুধর্ম

জাতবর্ণের হিন্দুধর্ম 

সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস 

(ড. আম্বেদকরের লেখা ১০ টি প্রবন্ধ – ১) প্রাচীন ভারতের ইতিহাস প্রসঙ্গে  ২) প্রাচীন শাসনতন্ত্র : আর্য সমাজের সামাজিক স্থিতি  ৩) নিমজ্জমান পুরােহিত সম্প্রদায় ৪) সংস্কারক ও তাদের নিয়তি  ৫) ব্রাহ্মণ্যবাদী সাহিত্য  ৬) ব্রাহ্মণ্যবাদের বিজয়ােৎসব : রাজহত্যা না প্রতিবিপ্লবের জন্ম  ৭) গৃহস্থের পালনীয় নীতিসমূহ : মনুস্মৃতি বা প্রতিবিপ্লবের বাণী  ৮) ভাগবদ্ গীতা বিষয়ে প্রতিবিপ্লবের দার্শনিক প্রতিপাদন ( শ্রীকৃষ্ণ ও তার গীতা)  ৯) ভারতে বর্ণ ব্যবস্থা – গঠন , উৎপত্তি এবং বিকাশ  ১০) বর্ণ ব্যবস্থার নিলয় এবং দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ঋত - এই প্রবন্ধগুলির উপর ভিত্তি করে আমি এই লেখাটি তৈরি করেছি । ড. আম্বেদকরের এই প্রবন্ধগুলি ভারত সরকারের কল্যাণমন্ত্রক দ্বারা প্রকাশিত আম্বেদকর রচনাবলীতে ছাপা হয়েছে)

কয়েকটি কথা 

কয়েকমাস আগে ফেসবুকে আমি একটা পোস্ট লিখেছিলাম । হেডিংটা ছিল মােটামুটি এইরকম – ‘ "হিন্দুধর্ম একটি নিকৃষ্ট ধর্ম , কারণ তা জাত - বর্ণের উপর প্রতিষ্ঠিত" । স্বাভাবিকভাবেই অনেক বন্ধু আমার এই কথা ও মতের বিরােধিতা করেন , তর্ক - বিতর্ক হয় ; আর কয়েকজন আমাকে মা - বাপ তুলে গালি দেন । যাঁদের সাথে আমার তিক্ত বিতর্ক হয় , তার মধ্যে কয়েকজন আমার জন্মস্থান পূর্ববঙ্গের সেইগ্রাম এলাকার মানুষ , বয়ঃকনিষ্ঠ এবং তাদের আমি একান্ত নিজের মানুষ বলে ভাবি । তাদের মতে হিন্দুধর্মে জাত - বর্ণ নাকি গুণ যােগ্যতার ভিত্তিতে শ্রমবিভাজন । তারা মনে করেন যে, এই প্রশ্নে হিন্দুধর্মের বর্তমান অনাচার নিতান্তই প্রক্ষিপ্ত , সেজন্য তারা হিন্দুধর্মের ব্যাধিমুক্তির আশা করেন । তারা সবাই আদতে চণ্ডাল সম্প্রদায়ের মানুষ , যাঁরা আজ নমঃশূদ্র বলে পরিচিত। তাদেরও পূর্ব পুরুষেরা এই সম্প্রদায়ের অন্যান্যদের মতাে বর্ণঘৃণার শিকার , তাই , তাদের এই মানসিক গঠন সম্পর্কীয় আবিষ্কার আমাকে একটা বড় ধাক্কা দেয় । বাংলাদেশের নমোদের জাতঘৃণা ও অবিচার সম্পর্কে ভারতের নমোদের মতাে অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই নেই ; কিন্তু তাঁদের সংলাপ পর্যবেক্ষণ করে আমার মনে হয় যে , হিন্দুধর্ম সম্পর্কে তাদের ধারণায় বিভ্রান্তি আছে। 

তাছাড়াও দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিষয়াবলীতে যেভাবে হিন্দু ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং গােটা দলিতবর্গের হিন্দুরা বিভ্রান্ত হয়ে ভুল পথে পা বাড়াচ্ছেন, তাতে আমার মনে হল যে , মিথ্যার পর্দা ঠেলে সরিয়ে
                                (৪)
 
হিন্দুধর্মের প্রকৃত রূপ সামনে আনা দরকার । কিন্তু কাজটা করতে গিয়ে বুঝলাম আমি এই কাজের জন্য যথেষ্ট যােগ্য ও দক্ষ নই । সৌভাগ্যবশতঃ ড . আম্বেদকর এই বিষয় নিয়ে যথেষ্ট কাজ করেছেন , তাই , তার গবেষণামূলক কয়েকটি প্রবন্ধের নানা অংশ জুড়ে আমি এই পুস্তিকা তৈরি করেছি , তাতে নিজের বলতে প্রায় কিছুই নেই ।

এদেশে মূলনিবাসী এবং বহিরাগত হিসাবে ভাগ করে ও তার উপর নির্ভর করে একটা রাজনৈতিক আন্দোলন খাড়া করার চেষ্টা চলছে । এই পথের পথিকরা ড . আম্বেদকরের নামে জয়ধ্বনি দেন । বহিরাগত বলতে তারা বােঝেন আর্যদের এবং আরও নির্দিষ্ট করে বললে বলতে হয় ব্রাহ্মণদের তারা বহিরাগত বলে চিহ্নিত করেন । এই পুস্তিকার আলােচনায় প্রাসঙ্গিকভাবে মূলনিবাসী - বহিরাগত বিষয়টিও এসে গেছে । এ - সম্পর্কে ড . আম্বেদকরের মতামতও খানিকটা জানা যাবে । 

সাধারণ হিন্দুরা তাদের ধর্ম বলতে দুর্গাপূজা , কালীপূজা, লক্ষ্মী - সরস্বতী পূজাকেই বােঝেন । শাস্ত্র বলতে রামায়ণ , মহাভারতকে জানেন , বড়জোর বেদ ও গীতার নাম শুনেছেন ; কিন্তু তার বিষয়বস্তু যে কী , সে সম্পর্কে সঠিক কোনাে ধারণা নেই ; কিন্তু তারা অনুশাসন মেনে চলতে অঙ্গীকারবদ্ধ । এই পুস্তিকা হিন্দু ধর্মগ্রন্থ ও সংগঠন সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা দিতে পারে কিনা তাই দেখার । – লেখক

জাত-বর্ণের হিন্দুধর্ম 

হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ কোনটি ? - বিশেষ কোন ব্যক্তি এই প্রশ্নের যাই উত্তর দিক কেন , তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয় । বাস্তবতঃ হিন্দু জনসাধারণ বেশ কয়েকটি গ্রন্থকে তাদের ধর্মীয়গ্রন্থ হিসাবে মনে করে ও ঐসব গ্রন্থের নীতি - নির্দেশ মেনে চলার কথা বলে । আমার মতে হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলিকে দুইভাগে ভাগ করা যায় । প্রথম ভাগকে বলা যায় বৈদিক সাহিত্য – যার মধ্যে পড়ে বেদ , ব্রাহ্মণ এবং আরণ্যক উপনিষদ । বদরায়ন রচনা করেছেন বেদের জ্ঞানকাণ্ড । বদরায়নের সূত্রকে বেদান্তসূত্র বলা হয় ; অর্থাৎ বেদের শেষ অধ্যায়সমূহে আলােচিত তত্ত্বসমূহ। এগুলি নিয়েই উপনিষদ । উপনিষদে বেদের অন্তিম লক্ষ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে । আর দ্বিতীয়ভাগ হলাে – ব্রাহ্মণ্যবাদী সাহিত্য । যার মধ্যে ধরা হয় মনুস্মৃতি , ভাগবদ্গীতা , বেদান্ত , মহাভারত , রামায়ণ ও পূরাণসমূহ । 

এইসব গ্রন্থগুলি আমাদের আজকের সময়ের মত দু’চারদিন বা দু'চার মাস অথবা এমনকি দু'চার বছরে লিখে শেষ করা হয়নি । দীর্ঘসময়কাল ধরে সেসব রচনা করা হয়েছে । আবার এইসব গ্রন্থগুলিকে আমরা আজ যে রূপ ও কলেবরে দেখি , তা মূলগ্রন্থ নয় । গ্রন্থগুলি ক্রমেই বড় হয়েছে । তাছাড়া মূল সংস্কৃত ভাষায় লেখা গ্রন্থের সাথে বাংলা ও অন্যান্য স্থানীয় ভাষায় লেখা গ্রন্থের অনেক অমিল । মূলগ্রন্থের সাথে বহু কথা ও অধ্যায় যােগ করা হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া চলেছে এমনকি কয়েকশত বছর ধরে । যারফলে এইসব গ্রন্থের রচয়িতা বা লেখকও একজন নয় , একাধিক ব্যক্তির রচনা ও লেখা এইসব গ্রন্থ ও শাস্ত্রসমূহ । 

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তােলা যায় – কেন এই পরিবর্তন এবং সংযােজন ও বিয়ােজন করা হয়েছে ? এই প্রসঙ্গে রামানুজন লিখিত 'তিনশত রামায়ণ ' প্রবন্ধটির উল্লেখ করা যায় , তার মতে তামিল রামায়ণ , দক্ষিণ ভারতের রামায়ণ , দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার রামায়ণ প্রভৃতির গল্প ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির । অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের ক্ষেত্রেও এমন সব ভিন্নতা , বিশেষ করে সময়ের সাথে ও প্রয়ােজনে নানা পরিবর্তন আনা হয়েছে । 

শাস্ত্রগ্রন্থগুলির মধ্যে বেদই সবচেয়ে প্রাচীন বলে ধরা হয়। গৌতম বুদ্ধের জন্ম হয় খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে , ৫৬৩ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে । আর বেদ রচিত হয় গৌতম বুদ্ধের জন্মের আগে । তাই বেদের রচনাকাল মােটামুটি ৫০০-৬০০ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দ বা তার আগে । তবে মূল পুরাণ রচিত হয় বেদ রচনারও আগে বা বেদ রচনার সময়ে । এই পুরাণকে আর্য পুরাণ বলা যায় । অথর্ববেদে এই পুরাণের উল্লেখ আছে । – এটা একটি লোককাহিনী । বর্তমানে পুরাণের সংখ্যা ১৮ টি।

কেউ কেউ গীতা সম্পর্কেও বলেন যে , গীতা দুইটি । শ্রী তেলাঙ্গ বলেছেন , মূল গীতা খ্রীষ্টপূর্ব ২য় শতাব্দী বা তার আগে রচিত । অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা মােটামুটি একমত যে, ভাগবদগীতার রচনাকাল ২০০ থেকে ৪০০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে কোন একসময়ে । কেউ কেউ বলছেন ভাগবদগীতার রচনাকাল ৪৭০ খ্রীষ্টাব্দ বা তার সামান্য আগে - পরে । বর্তমান গীতার মধ্যকার ১৪৬ টি শ্লোক নতুন ; অর্থাৎ মূল গীতার মধ্যে ১৪৬ টি শ্লোক পরে ঢােকানাে হয় । 

এই লেখার শুরুতে আমরা হিন্দু শাস্ত্রগ্রন্থগুলিকে দুইভাগে ভাগ করার কথা বলেছি । - বৈদিক সাহিত্য এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী সাহিত্য । অনেকেই বৈদিক সাহিত্য এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী সাহিত্য বা ধর্মশাস্ত্রগুলির নির্দেশের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য খুঁজে বের করার চেষ্টা করে বা মৌলিক পার্থক্য আছে বলে দাবি করে থাকে । আজকাল কেউ কেউ এই বৈদিক কাল বা বৈদিক সাহিত্য যুগকে সনাতন ধর্মের যুগ বলে প্রচার করার চেষ্টা করে থাকে । কিন্তু আমি এখানে এই দুইভাগে ভাগ করেছি সম্পূর্ণ অন্য কারণে । আমার মতে বৈদিক যুগ ও তার শাস্ত্রসমূহ এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী যুগের শাস্ত্রসমূহ একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে রচিত ও মূলগতভাবে তা একই ; পার্থক্য শুধু সময়ের । বৈদিক যুগের অবসান হয় ৬৪২ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দে । আর ব্রাহ্মণ্যবাদী যুগের সূচনা হয় ১৮৫ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দে । অর্থাৎ বৈদিক যুগের সমাপ্তি আর ব্রাহ্মণ্যবাদী যুগের সূচনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান সামান্য কমবেশি ৪৬৭ বছর । 

এই ৪৬৭ বছরের সময়কাল ছিল ভারতের ইতিহাসে অনার্য ও বৌদ্ধদের শাসনকাল । এই সময়ের পরেও বৌদ্ধ শাসন ছিল । বৈদিকযুগে সামাজিক প্রভাব ও প্রাধান্য ছিল ব্রাহ্মণদের । সেই সময়ে ছােট - বড় গােষ্ঠীপতির অস্তিত্ব থাকলেও রাষ্ট্র বা রাজত্বের অস্তিত্ব ভারত ও বৃহত্তর ভারতে ছিল না । ভারতের ( বৃহত্তর ভারতবর্ষ ) রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রথম সূচনা হলাে , বিহারে মগধ রাজত্বের উদ্ভবের মধ্য দিয়ে । অনার্য নাগা জাতিভূক্ত শিশুনাগ এই সাম্রাজ্যের পত্তন করে ৬৪২ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দে । নাগবংশের পর নন্দবংশ এবং তারপর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মৌর্য রাজবংশ এবং সম্রাট অশােকের বৌদ্ধ সাম্রাজ্য । ব্রাহ্মণ পুষ্যমিত্র শুঙ্গ ১৮৫ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে মৌর্য সম্রাটকে হত্যা করে ব্রাহ্মণ রাজত্ব কায়েম করে । এই ব্রাহ্মণ রাজত্বকালে যে সব শাস্ত্রগ্রন্থ রচিত হয় বা সাহিত্য রচিত হয় তা ব্রাহ্মণ্যবাদী সাহিত্য এবং যে ধর্ম সংগঠনের জন্ম হয় তাই হলাে ব্রাহ্মণ্যধর্ম যা পরবর্তীকালে মুসলমান রাজত্বকালে হিন্দুধর্ম হিসাবে পরিচিতি লাভ করে । হিন্দু নামকরণ মুসলমান শাসকবর্গের কীর্তি । 

বৈদিকযুগ সম্পর্কে ভারতের হিন্দুদের মনে অনেক ভাল ও উচ্চ ধারণা আছে ; কিন্তু এই ধারণা সত্য নয় । বরং বৈদিকযুগ ছিল অত্যন্ত খারাপ এবং লজ্জাজনক । সময় ও সভ্যতার বিচারে সেটাই স্বাভাবিক । মুনি ও ঋষিদের সম্পর্কেও মানুষের উচ্চ ধারণা । মানুষ তাদের অতিমানব বলে ভাবে এবং অনুকরণীয় বলে মনে করে। কিন্তু সত্য ও তথ্য এই ধারণার সম্পূর্ণ উল্টো । মূনি ও ঋষিদের সম্পর্কে হিন্দুশাস্ত্রগ্রন্থে যা উল্লেখ আছে , তার অনেক কিছু লজ্জাজনক । 

এসব কিছু নিয়ে বৈদিক যুগের সাধারণ ও সংক্ষিপ্ত আলােচনায় যাবার আগে আমরা খুবই পরিচিত কিছু শব্দ নিয়ে দু'চার কথা আলােচনা করবাে । যেমন ‘দেব' শব্দটি । আমরা সাধারণতঃ ‘দেব’ শব্দ দ্বারা অতিমানব ও মহান কিছু একটা বুঝি । কিন্তু আসলে তা নয় । 'দেব' শব্দের অর্থ বিশেষ জন বা বিশিষ্ট মানুষ - শৌর্য - বীর্যের অধিকারী মানুষ । 

এই ‘দেব’ শব্দটির পাশে ভিড় করে থাকে যক্ষ , গণ , গন্ধর্ব , কিন্নর প্রভৃতি শব্দ । – এরা প্রত্যেকেই মানব পরিবারভূক্ত । তারা ছিলাে ‘দেব'দের সেবায় নিয়ােজিত । যক্ষরা প্রাসাদ পাহারা দিত । গণরা ছিল ‘দেবদের’ রক্ষক বা দেহরক্ষী । দেব বা দেবতাদের চিত্ত বিনােদন করতাে গন্ধর্বরা । কিন্নররা ‘দেব'দের সেবা করতাে – কিন্নরদের বংশধরেরা আজও হিমাচল প্রদেশে বসবাস করে । 

অসুর বলতে একটা ধারণা হয় যে , তারা যেন দৈত্য । কিন্তু বাস্তবত তারাও মানুষ । শতপথ ব্রাহ্মণের বর্ণনা হলাে – অসুররা হলাে সৃষ্টির দেবতা প্রজাপতির বংশধর । লিপিবদ্ধ ঘটনা হলাে – অসুররা পৃথিবীর অধিকার নিয়ে ‘দেবদের' বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলাে ; কিন্তু পরাজিত হয়েছিলাে । আমরা দু'জন অসুরকে শাস্ত্রগ্রন্থে খুঁজে পাই । আজও পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় বহু অসুর নামের মানুষের বসবাস দেখতে পাওয়া যায় । 

বৌদ্ধ সাহিত্যে উল্লেখ আছে ‘দেব’রা মানুষ ; গৌতম বুদ্ধের কাছে এমন অনেক ‘দেব'☺️ এসেছিলাে পরামর্শ নিতে । নাগ শব্দের দ্বৈত অর্থ – নাগ বলতে সাপ হতে পারে ; কিন্তু নাগ একটি মানব সম্প্রদায়ও । প্রাচীনকালে নাগ সম্প্রদায় যে বিক্রমশালী সম্প্রদায় ছিল , তা নিয়ে আমরা এই প্রবন্ধে পরে আলােচনা করবাে । 

বৈদিকযুগে আর্য সমাজে জুয়ার প্রচলন ছিল ব্যাপক আকারে । ঋগ্বেদের বর্ণনায় জুয়ায় নিঃস্ব হয়ে যাওয়া অনেক আর্যদের করুণ কাহিনীর বর্ণনা আছে । জুয়া নামের এই সামাজিক ব্যাধি বৈদিক যুগে শুরু হয়ে বহু দীর্ঘ সময়কাল পর্যন্ত সমাজকে কলুষিত করে , আজও করছে । মহাভারতের যুগে ; অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্যযুগেও এই জুয়াখেলার বাড়বাড়ন্ত দেখা যায় । সে যুগে প্রতিটি রাজগৃহ সংলগ্ন প্রশস্ত ঘর নির্দিষ্ট থাকতে জুয়াখেলার জন্য । এমনকি বেতনভূক জুয়াড়ী মজুত রাখা হতাে । বিরাট রাজার বেতনভূক জুয়াড়ী ছিল কঙ্ক । বিনােদনের জন্য জুয়া খেলা হতাে , এমন নয় , বিশাল ঝুঁকি নিয়ে তারা এই খেলায় মেতে যেতাে । রাজত্ব , পরিজন , দাস , এমনকি স্ত্রীদের জুয়া খেলায় বাজি ধরা হতাে । রাজা নল সর্বস্বান্ত হয়েছিল পুষ্করের সাথে জুয়া খেলে । কুরু - পাণ্ডবের কাহিনীতে দ্রৌপদীকে বাজি ধরার কাহিনী সবাই জানে । কৌটিল্যের সময়ে রাজ অনুমােদিত জুয়ার আড্ডা বসতো এবং তা থেকে ভাল পরিমাণ আয় হতাে রাজার । 

ছিল মদ্যপানের আধিক্য । মদ ছিল দু'ধরনের---একটি সােম , অন্যটি সুরা । শুরুতে সােম পান করার অধিকার ছিল ব্রাহ্মণ , ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যদের , পরে এই তালিকা থেকে বৈশ্যদের বাদ দেওয়া হয় । সুরা সবাই পান করতে পারতাে । মহাভারতের ঘটনায় কৃষ্ণ ও অর্জুনকেও মদ্যপ অবস্থায় দেখা গেছে । সােম পান করায় বাধা পেয়ে ইন্দ্র তার পিতাকে হত্যা করে । আর্য মহিলারা মদ্যপানে অভ্যস্ত ছিল । ব্রাহ্মণ মহিলারাও কোনাে ব্যতিক্রম ছিল না । বিভিন্ন শাস্ত্রগ্রন্থে এর প্রমাণ নিহিত আছে । খ্রীষ্টপূর্ব ৮ ম -৭ ম শতাব্দীতে , অর্থাৎ বৈদিক যুগে ব্রাহ্মণ মহিলারা যে মাদকাসক্ত ছিলাে তার প্রমাণ পাওয়া যায় কুমারিল ভট্টের 'তন্ত্রবর্তিকা' গ্রন্থে । 

বৈদিক যুগে যৌন অনৈতিকতা এমন পর্যায়ে ছিল যে , তা বর্তমান প্রজন্মকে লজ্জা দেবে । যৌন সম্পর্ক ও বিবাহ সম্পর্ক গড়ে তােলার ক্ষেত্রে বৈদিকযুগে কোন বাধা নিষেধ ছিল না । আমরা জানি আর্য পুরাণের মতে ব্রহ্মাই বিশ্বের স্রষ্টা । এহেন ব্রহ্মার তিন পুত্র ও এক কন্যা ছিল । ব্রহ্মার এক পুত্র ছিলাে দক্ষ । সে নিজের বােনকে বিয়ে করে । ভাই ও বােনের প্রণয়ে যে সব কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল , তাদের কয়েকজন ব্রহ্মার পৌত্র এবং মরিচির পুত্র কাশ্যপের সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিল । অন্য কয়েকজন ব্রহ্মার তৃতীয় পুত্র ধর্মকে বিবাহ করেছিল । 

ঋগ্বেদে যম এবং যমী নামে দুই ভাই - বােনের উপাখ্যান আছে । সেখানে দেখা যায় – যমী তাঁর ভাই যমকে সহবাসে আহ্বান করেছিল , যম তাতে রাজি না হওয়ায় যমী ক্রুদ্ধ হয় । 

পিতা কন্যাকে বিবাহ করতাে । বশিষ্ট তার কন্যা শতরূপাকে বিবাহ করেছিল । মনু তার কন্যা ইলাকে বিবাহ করে । জাহ্নবীকে বিবাহ করে তার পিতা জহ্ন । কন্যা উষাকে বিবাহ করে সূর্য । একাধিক আত্মীয় একজন আত্মীয়ার সঙ্গে সহবাস করতাে ইত্যাদি বর্ণনা লেখা আছে হিন্দুশাস্ত্র গ্রন্থে । – আর যাই হােক বৈদিক যুগের এসব প্রথা প্রশংসনীয় নয় এবং তা অনুকরণীয় হতে পারে না। তাই বেদবাক্য অবশ্যই পালনীয়---একথা বলা যায় না । 

দক্ষ তার নিজের কন্যাকে পিতা ব্রহ্মার সাথে বিবাহ দেয় । সেই সূত্রেই বহুখ্যাত নারদের জন্ম হয় । দৌহিত্র তার ২৭ টি কন্যাকে সহবাস ও প্রজননের জন্য পিতা সােমের হাতে তুলে দেয় । 

ঐ যুগে প্রকাশ্যে ও লােকচক্ষুর সামনে সহবাস করা আর্যদের কাছে অস্বাভাবিক কিছু ছিল না । ঋষিরা বামদেবব্রত নামে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান করতাে । যজ্ঞভূমিতে এই অনুষ্ঠান পালন করা হতাে । কোন রমণী সেখানে গিয়ে যৌনমিলনের আহবান করতাে এবং ঋষি তৎক্ষণাৎ প্রকাশ্য যজ্ঞভূমিতে সহবাসে মিলিত হতাে । উদাহরণ হিসাবে বলা যায় – ঋষি পরাশর যজ্ঞভূমিতে সত্যবতী ও দীর্ঘতপার সঙ্গে রতিক্রিয়ায় মিলিত হয়েছিল । 

নিজেদের ঘরের রমণীকে ভাড়া খাটানাের প্রথা ছিল বৈদিক আর্যদের মধ্যে । রাজা যযাতি তার কন্যা মাধবীকে গুরু গালবের হাতে তুলে দেয় । গালব একইসময়ে মাধবীকে তিন রাজার কাছে রেখে দেয় । এরপর গালব বিশ্বামিত্রের সঙ্গে মাধবীর বিবাহ দেয় । একটি পুত্রসন্তান জন্ম দেবার পর গালব আবার কন্যাটিকে তার পিতা যযাতির কাছে ফেরত দেয় । – এইসব চরিত্রগুলি আমরা রামায়ণ - মহাভারতে দেখতে পাই । তাই, তা হল খ্রীষ্টের জন্মের কয়েকশত বছর পরের ঘটনা । অনুমান করা যায় তখন আরবে হযরত মােহাম্মদের জন্ম হয়েছে । হযরত মােহম্মদের জন্ম ৫৭০ খ্রীষ্টাব্দে । অনেকে হযরত মােহম্মদকে নিয়ে অনেক অনৈতিকতার অভিযােগ তােলে ; কিন্তু এই অভিযােগ যে অসঙ্গত , এই সময়কালের সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে অন্যান্য এতসব ঘটনাসমূহের বিবরণ থেকে তা বােঝা যায় । আলােচনা ও ব্যাখ্যার প্রতিটি ক্ষেত্রে সভ্যতার বিকাশের সময়কাল বা স্তর সম্পর্কে ধারণা রাখা দরকার । অতীতকে আঁকড়ে ধরে না থেকে সামনে এগােতে হবে , সেটাই হল প্রগতি । 

আর্যদের মধ্যে শৌর্য - বীর্যে উন্নত মানুষগুলিকে ‘দেব' বলা হতাে । ভাল বংশবৃদ্ধির জন্য ঘরের রমণীদের ‘দেব’দের সাথে যৌনমিলনের অনুমতি দেওয়া হতাে । এই কুপ্রথা ধীরে ধীরে এত প্রবল হয় যে , আর্য রমণীকে প্রথমে ভােগ করার অধিকার কায়েম হয় এইসব ‘দেব’দের বা দেবতাদের । আজও হিন্দু বিবাহে সপ্তপদীর আয়ােজন করা হয় । এই অনুষ্ঠান আসলে বধূর উপর দেব বা দেবতাদের সেই প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা অধিকার মুক্তির ব্যবস্থা । দেবতারা সাত পা হাঁটার আগে বধূর উপর তার চলে আসা অধিকার দাবি করতে পারে । যদি সাত পা হাঁটার আগে দেবতারা এই অধিকার দাবি না করে , খই - বাতাসা পেয়ে খুশী হয় , তাহলে বধূ মুক্ত হয় এবং স্বামী - স্ত্রী হিসাবে বাসবাস করতে পারে । 

পশুর সাথে যৌনক্রিয়া করার ঘটনাও আর্যদের মধ্যে ছিল । হরিণীর সাথে ঋষি দমের যৌনক্রিয়ার কাহিনী বহুবিদিত। ঘােটকীর সাথে সূর্যের সহবাস আরেকটি উদাহরণ । সবচেয়ে জঘণ্য হলাে অশ্বমেধ যজ্ঞের সময়ে ঘােড়ার সঙ্গে রমণীর যৌন মিলন ! – এসব অসভ্যতা , অসভ্য যুগের প্রথা---বৈদিকযুগ থেকে শুরু হয়ে বহুকাল পর্যন্ত এই বর্বরতা চলেছে! বর্তমানকালে সেই আদিম স্তরের মানুষের কাজ এবং ভাবনাচিন্তা অনুসরণ ও অনুকরণীয় নয় , কেউ তা করেন না । তবুও ঐ বৈদিক যুগকে কিছু লােক মহিমান্বিত করার চেষ্টা করেন , তাদের সুস্থ বা স্বাভাবিক মানুষ বলা যায় না । 

বৈদিক যুগে এবং পরবর্তী সময়ে ব্রাহ্মণরা নৈতিক অধঃপতনের চূড়ায় পৌঁছায় , বুজরুকি , ফাঁকিবাজী , প্রতারণা — এ সবকিছুই তারা করতাে । হাত দেখে ভাগ্য গণনা , যুদ্ধে কে জিতবে বা হারবে – এসব ভবিষ্যৎবাণী করার নামে তাঁরা রােজগার করতাে । লভ্যাংশ বৃদ্ধির জন্য ব্রাহ্মনরা সবকিছুই করতাে । সমাজকে নেতৃত্ব করার কোন যােগ্যতাই তাদের ছিল না । প্রকৃত বিচারে তাদের অনেকেই ছিলাে আজকের দিনের রাম-রহিমের পূর্ব পুরুষ । 

সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে ভারতীয়রা আর্য , দ্রাবিড় , মঙ্গোলীয় ও সিদিয়ানদের সংমিশ্রণের ফল । এইসব গােষ্ঠীর মানুষেরা বিভিন্ন দিক দিয়ে বহু শত বছর আগে খেপে খেপে (সবাই একসঙ্গে নয়) ভারতে প্রবেশ করে । সেই সময়ে তারা আদিম স্তরভুক্ত ছিলাে এবং তাদের সংস্কৃতি ছিল ভিন্ন ভিন্ন । আগে যাঁরা এসেছিল , লড়াই করে তাদের পরাজিত করে পর্যায়ক্রমে নতুনরা পথ করে নেয় এবং কিছুকাল এই লড়াই ঝগড়া ও  সংঘর্ষ চলার পর শান্তিপূর্ণ প্রতিবেশী হিসাবে বসবাস শুরু করে । নিরন্তর সংশ্রব এবং পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যদিয়ে তারা ধীরে ধীরে একটি সাধারণ সংস্কৃতি গড়ে তােলে । এভাবে প্রত্যেকে এবং প্রতিটি গােষ্ঠী নিজ নিজ সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য অতিক্রম করে যায় । আজকের ভারতীয়রা অভিন্ন মূলত : এই সাংস্কৃতিক ঐক্যের জন্য । এই সম সংস্কৃতির কারণেই জাত - বর্ণ সমস্যা ব্যাখ্যা করা ও বােঝা কঠিন কাজ । প্রকৃতপক্ষে জাত - বর্ণ হলাে একটি অভিন্ন অবয়বের কৃত্রিমভাবে খণ্ডীকরণ , উদ্দেশ্যমূলক বিভাজন । 

বিশাল ভারতবর্ষের নির্দিষ্ট আঞ্চলিক পরিধিতে বাসবাসকারি বিভিন্ন জনগােষ্ঠী কমবেশি পরস্পর মিশে গেছে এবং অভিন্ন জনগণের একমাত্র নির্ণায়ক সাংস্কৃতিক ঐক্যের অধিকারি । এখানে বর্ণের অর্থ হলাে জনগণকে নির্দিষ্ট সূচিহ্নিত ভাগে কৃত্রিম উপায়ে বিভক্ত করা এবং স্বজাতের মধ্যে বিবাহ প্রথা অর্থাৎ সবর্ণ বিবাহ প্রথার প্রচলন — যাতে এক গােষ্ঠী অন্য গােষ্ঠীর সাথে মিশে যেতে না পারে । তাই , জাতপ্রথা উদ্ভবের বিশেষ তাৎপর্য হলাে অসবর্ণ বিবাহের পরিবর্তে , সবর্ণ বিবাহ প্রথার আরােপ । এই সবর্ণ বিবাহ প্রথার অনায়াস প্রবর্তন সম্ভব হয় নি ; বরং তা ছিল এক কঠিন প্রয়াস । সতীদাহ প্রথা , বাধ্যতামূলক বৈধব্য এবং মেয়েদের বাল্যবিবাহ প্রথার প্রচলন এই প্রয়ােজনে করা হয় । – এইসব প্রথা প্রচলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল জাত ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত পুরুষ ও নারীর সমস্যা সমাধান করে ভারসাম্য বজায় রাখা – যাতে সবর্ণ বিবাহ প্রথা বজায় রাখা যায় । এইসব প্রথা ছাড়া কঠোরভাবে সবর্ণ বিবাহ টিকিয়ে রাখা তখন সম্ভব ছিল না । আর সবর্ণ বিবাহ প্রথা ছাড়া জাত ব্যবস্থার কঠোরতা রক্ষা সমস্যার কাজ । সবর্ণ বিবাহের বিধান ভাঙার সাহস যে দেখিয়েছে , তাকে শাস্তিভােগ করতে হয়েছে এবং মূলতঃ সেই শাস্তি ছিল সমাজ থেকে বহিষ্কার । আর এই বহিষ্কারের পরিণামে নতুন নতুন জাত সৃষ্টি হয়েছে । এসব পৃথিবীর কোন সভ্য সমাজ ভারতীয় হিন্দুদের অপেক্ষা আদিম যুগের অবশেষ বেশি বহন করে না । এদেশে সভ্যতা ও সংস্কৃতির অগ্রগতি সত্ত্বেও আদিম বিধানগুলি বর্তমানকাল পর্যন্ত নবীন শক্তিতে ক্রিয়াশীল । বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে , জাতের অনুশীলন ও তার নীতি-নিয়ম ব্রাহ্মণরাই কঠোরভাবে পালন করেছে । অব্রাহ্মণ জাতগুলাে ব্রাহ্মণদের আচার - আচরণ কখনওই কঠোরভাবে বা পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করেনি । এর থেকে বােঝা যায় , সমাজের শীর্ষে অবস্থানকারী ব্রাহ্মণরাই জাত-বর্ণ সৃষ্টি করে তা কোন এক ঈশ্বরের সৃষ্টি নয় । ব্রাহ্মণরা নিজেদের জাতের গণ্ডির মধ্যে অবরুদ্ধ করে কার্যত অন্যান্যদেরও জাতের গণ্ডিতে অবরুদ্ধ করে দেয় । অর্থাৎ কেউ নিজকে আলাদা করে নেবার অর্থই হলাে অন্যদের আলাদা করে দেওয়া । প্রথম গােষ্ঠী যখন সবর্ণ বিবাহ স্বেচ্ছায় চালু করে , তখন অবস্থার চাপে দ্বিতীয় গােষ্ঠীকে তাই - ই করতে হয় । তাছাড়া অনুকরণের প্রবৃত্তি মানুষের মনের গভীরে নিহিত । রুদ্ধদ্বার ব্যবস্থা হিন্দু সমাজে ফ্যাশানে পরিণত হয় । অনুকরণের ছোঁয়াচ লেগে অব্রাহ্মণরাও ধীরে ধীরে ব্রাহ্মণদের অনুকরণ করতে থাকে । 

কুলের পবিত্রতা এবং রক্তের পবিত্রতা নিরাপদে রাখার কথাও জাত - বর্ণ ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য । কিন্তু বিজ্ঞানীদের মত হলাে – পবিত্র জাতিকুলের মানুষ কোন জায়গায় নেই ; পৃথিবীর সর্বাংশে জাতিকুলের সংমিশ্রণ ঘটেছে । মিঃ ভি . আর , ভাণ্ডারকার বলেছেন , “ ভারতবর্ষে এমন কোন শ্রেণী বা জাত নেই , যাঁদের মধ্যে বিদেশি বংশধারা নেই । ভিনদেশী রক্তের মিশ্রণ শুধু রাজপুত ও মারাঠী যােদ্ধাশ্রেণীর মধ্যেই নয় , এর মিশ্রণ ঘটেছে ব্রাহ্মণদের রক্তেও। ব্রাহ্মণরা ভ্রান্ত ধারণায় সুখানুভব করে যে , তাদের মধ্যে বিদেশি প্রবাহ নেই বা তাদের রক্ত পবিত্র । জাতি কুলের রক্তের পবিত্রতা রক্ষার উদ্দেশ্য ও উপায় ভাবা হয়েছে জাতভেদপ্রথার মধ্যে ; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন অংশের মানুষের রক্ত ও সংস্কৃতির পারস্পরিক মিশ্রনের অনেক পরে জাতভেদপ্রথার উদ্ভব হয়েছে । 

এ ছাড়াও জাতকে কুল হিসাবে মনে করা বেঠিক । ধরা যাক পাঞ্জাবের ব্রাহ্মণ এবং চেন্নাইয়ের ব্রাহ্মণ । তাদের জাত এক , তারা ব্রাহ্মণ । কিন্তু তাদের কুল এক নয় , আলাদা । আবার পাঞ্জাবের চামার এবং চেন্নাইয়ের চামার ও পারিয়া । তাদের জাত এক কিন্তু কুল আলাদা। অন্যদিকে পাঞ্জাবের ব্রাহ্মণ এবং পাঞ্জাবের চামার তাদের জাত আলাদা ; কিন্তু কুল একই , তারা আর্য বংশােদ্ভূত । অন্যদিকে চেন্নাইয়ের ব্রাহ্মণ এবং চেন্নাইয়ের চামার ও পারিয়া – তাদের জাত আলাদা , কিন্তু তারা সবাই একই কুলজাত , দ্রাবিড় বংশােদ্ভুত । 

অনেকেই জাত - বর্ণ ব্যবস্থার সাথে সুপ্রজননের প্রশ্ন জুড়ে দেন । কিন্তু এই ধারণাও বেঠিক এবং অবৈজ্ঞানিক । জাত - বর্ণ ঘােষিতভাবে শুধু হিন্দুদের মধ্যে আছে ; কিন্তু শারীরিক দিক দিয়ে হিন্দুরা তৃতীয়শ্রেণীর , তাদের মধ্যকার ১০ ভাগের ৯ ভাগ মানুষ সামরিক বৃত্তির উপযুক্ত নয় । 

এসব বিচার বিবেচনা করলে এবং বিশ্লেষণ করলে বােঝা যায় – প্রতিটি হিন্দুর রয়েছে জাত চেতনা ; কিন্তু তাদের মধ্যে বস্তুচেতনা নেই বা কম আছে । একজন হিন্দুকে আদর্শ হিন্দু হতে হলে ইদুরের মত গর্তে বাস করতে হয় । আসলে হিন্দুরা ও ভারতীয়রা একটা সুসংবদ্ধ জাতি নয়, তারা হলাে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট আকারহীন জনপুঞ্জমাত্র। তাঁদের মধ্যে সাদৃশ্য আছে শুধু অভ্যাসে , আচারে , আচরণে , প্রথা ও বিশ্বাসে ; কিন্তু তাই বলে গােটা হিন্দুরা একটামাত্র সমাজের সদস্য নয় । সমাজ হতে গেলে সাধারণ ক্রিয়াকলাপে অংশগ্রহণ করতে হয় – যাতে একই অনুভূতি জেগে ওঠে এবং অন্যের মধ্যেও তা জীবন্ত হয় । যৌথ ক্রিয়াকলাপে ব্যক্তিকে অন্তর্ভূক্ত করা বা সঙ্গী করা , যাতে সকলের সাফল্য ও পরাজয়কে নিজের বলে অনুভব করে , যা মানুষকে একাত্মবন্ধনে আবদ্ধ করে - এটাই হলাে সমাজ । 

বৈদিক যুগেও বর্ণ বিভাগ ছিল । ব্রাহ্মণ , ক্ষত্রিয় , বৈশ্য ও শূদ্ররা ছিলাে । এই চারবর্ণের নীচে আরও কয়েকটি শ্রেণী ছিল তারা হলাে চণ্ডাল ও স্বপাক । এরা তখন অচ্যুৎ ছিল না । – কিন্তু তাদের কোন মর্যাদা দেওয়া হতাে না । সমাজ ও আইনের সীমানার বাইরে ছিল তাদের স্থান । সমাজে তারা ছিল বাতিলের তালিকায় । সমাজে উপবিভাগ স্বাভাবিক । কিন্তু অস্বাভাবিক যা , তা হলাে , এই বিভাগ মুক্তদ্বার চরিত্র হারিয়ে আবদ্ধ এককে পরিণত হওয়া । বলা হয় জাত ব্যবস্থার অন্য নাম শ্রমের বিভাগ ; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জাত হলাে অবরুদ্ধশ্রেণী । বেদভূমি পবিত্র বলে কি সেখানেই এই জাতগঠন । পৃথিবীর অন্য কোথাও কিন্তু এই বর্ণব্যাধির অস্তিত্ব নেই , যদিও শ্রেণী ও শ্রম বিভাজন আছে । 

শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্ন নিয়ে ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়দের মধ্যে নিরন্তর লড়াই চলতাে ; কিন্তু একইসময়ে বৈশ্য ও শূদ্রদের দমন করার জন্য তারা ঐক্যবদ্ধ হতাে । ব্রাহ্মণদের সাথে যেসব ক্ষত্রিয় সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল তাঁদের মধ্যে বেণ , পুরুরবা , নহুষ , সুদাস , সুমুখ ও নিমির নাম উল্লেখযােগ্য । বেণ ও ব্রাহ্মণদের লড়াইয়ের কারণ ছিল---রাজা কোনাে ব্রাহ্মণকে আদেশ করতে পারে কি - না , রাজাকে পুজা করতে ব্রাহ্মণের প্রয়ােজন কি - না এবং দেবতার পরিবর্তে সবকিছুই রাজার কাছে উৎসর্গ করা হবে কি - না , এইসব প্রশ্নের মিমাংসা নিয়ে। পুরুরবার সাথে ব্রাহ্মণদের ঝামেলা বাধে ক্ষত্রিয় রাজা ব্রাহ্মণের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারে কিনা , এই নিয়ে । নহুষের সাথে ব্রাহ্মণদের সংঘর্ষ হয় কোন ব্রাহ্মণকে ক্ষত্রিয় রাজা ক্রীতদাসের মত কাজ করার আদেশ করতে পারে কি - না , তা নিয়ে । নিমির সাথে ব্রাহ্মণদের সংঘর্ষ বাঁধে বলিদান উৎসবে রাজা পারিবারিক পুরােহিত নিয়ােগ করতে বাধ্য কি - না , এই প্রশ্ন ঘিরে । সুদাসের সাথে ব্রাহ্মণের লড়াইয়ের কারন ছিল – রাজা শুধুমাত্র ব্রাহ্মণকেই পুরােহিত হিসাবে নিয়ােগ করতে বাধ্য কিনা , এই প্রশ্ন নিয়ে । 

এসব সংঘর্ষ ছিল সামাজিক প্রশ্নকে ঘিরে । সমাজে শ্রেষ্ঠত্ব , সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্খা ও সমাজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য এসব লড়াই চলেছিল । ব্রাহ্মণরা বহুবার ও দীর্ঘ সময়কাল জুড়ে বার বার পরাজিত হলেও , শেষ পর্যন্ত তারা জয়ী হয় । শাস্ত্রে এ রকম বলা হয় যে , ব্রাহ্মণ পরশুরাম ২১ বার ক্ষত্রিয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল এবং ক্ষত্রিয়দের হত্যা করেছিল । 

যজ্ঞে উৎসর্গ করা বৈদিক আর্যধর্মের অঙ্গ । দেবদের স্বর্গে পৌঁছানাের উপায় হচ্ছে এই যজ্ঞানুষ্ঠান । – এভাবেই ব্রাহ্মণরা প্রচার করে এবং এই মত তারা প্রতিষ্ঠিত করে । ভবিষ্যতে কিছু পাওয়ার জন্য যজ্ঞ করা হতাে । ঈশ্বরের কাছে নৈবেদ্য দেবার সময় যা মন্ত্র আকারে বলা হতাে তার অর্থ হলাে – “ তুমি আমাকে দাও , আমিও তােমাকে দেব । তুমি আমাকে আশ্রয় দাও , আমিও তােমাকে আশ্রয় দেব" । এই যজ্ঞানুষ্ঠান ছিল খাটি প্রতারণা । পুরােহিতরা যজ্ঞানুষ্ঠান করতাে শুধুমাত্র দক্ষিণার জন্য । দামি পােষাক , ঘােড়া , গাভী , স্বর্ণ – এসব মূল্যবাণ দ্রব্যসামগ্রী দক্ষিণা হিসাবে ধার্য করা হতাে । 

এ ব্যাপারে পুরােহিতরা জটিল রীতি গড়ে তুলেছিল । গােটা ব্যাপারটি বিপুল ব্যয় সাপেক্ষ হয়ে ওঠে । একটি যজ্ঞে দক্ষিণা হিসাবে হাজারটি গাভী দাবি করা হতাে । তারা প্রকাশ্যে ঘােষণা করতাে যে , এক হাজার গাভী দক্ষিণা হিসাবে যে দান করবে , সে স্বর্গের সমস্ত সুখ লাভ করবে । যজ্ঞের শ্রেষ্ঠ সামগ্রী ছিল প্রাণী। উৎসর্গযোেগ্য কয়েকটি প্রাণীর নাম আর্যধর্মে উল্লেখ আছে । মানুষকে বলিযােগ্য প্রাণীর তালিকায় ফেলা হয়। তবে ব্রাহ্মণ এবং শূদ্র বলির অযােগ্য ছিল । বলিযােগ্য মানুষ হলাে ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যরা । নিজেদের স্বার্থে ব্রাহ্মণরা এই নীতি প্রণয়ন করে । ব্রাহ্মণকে বলি না দেবার কারণ বােঝা যায় ; আর শূদ্রদের বােধহয় বাদ দেওয়া হয় , যেহেতু তারা মূল্যহীন । বলি প্রদত্ত মানুষের সেই সময়ে ক্রয়মূল্য ছিল মােটামুটি এক হাজার গাভী ক্রয়মূল্যের সমান । নরবলি যেমন ছিল ব্যয়সাপেক্ষ এবং তা বর্বরােচিত । তাছাড়া যিনি উৎসর্গ করতেন , তাকে নরহত্যার জন্য দায়ভাগী হতে হতাে এবং উৎসর্গীকৃত প্রাণীর মাংস খেতে হত ; অর্থাৎ মানুষের মাংস খেতে হত । তাই কার্যত নরবলী তেমন হত না , যদিও নীতিগতভাবে নরবলি প্রথা ব্রাহ্মণরা তুলে দেয় না । ঘােড়াও খুব প্রয়ােজনীয় প্রাণী ছিল । তাই , আর্যরা এই প্রাণীটিকে বলি দিতে চাইতাে না । তাছাড়া ঘােড়া উৎসর্গ করলে উৎসর্গকারির স্ত্রীর সঙ্গে ঘােড়াকে মৈথুন করতে হতাে । তাই , বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গবাদি পশু বলি দেওয়া হতাে – যার মধ্যে প্রধানতঃ গাভী উৎসর্গ করা হতাে । বৈদিক যুগে আর্যদের প্রিয় খাদ্য ছিল গাভী ও ষাঁড় । 

যজ্ঞগুলি ব্যয়বহুল ছিল , তাই এই প্রথা বন্ধ হয়ে যাবার কথা ছিল ; কিন্তু তা হয়নি । কারণ যজ্ঞানুষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে পুরােহিত অর্থাৎ ব্রাহ্মণের প্রাপ্তিতে টান পড়তাে । সেজন্য তারা নানা কৌশলে যজ্ঞ প্রথা চালু রাখে । তারা মানুষের বদলে কুশপুতুল , বড় গবাদি পশুর পরিবর্তে ছােট গবাদি পশু , ঘােড়ার বদলে অন্যান্য পশু – এইসব বিকল্পের শাস্ত্রানুমােদন প্রচার করে এবং এভাবে যজ্ঞানুষ্ঠান চালু রাখার ব্যবস্থা করে । পুরােহিত ব্রাহ্মণরা ঠিক করে – যদি যজ্ঞকারি দরিদ্র হয় , তবে তার নৈবেদ্য চাল । যদি মাঝারি বিত্তের হয় , তবে তার নৈবেদ্য ছাগ । যে যদি ধনী হয় , তবে তার জন্য নৈবেদ্য মানুষ (বিকল্প মূল্যের জন্য) , ঘােড়া , গাভী অথবা ষাঁড় ইত্যাদি । উদ্দেশ্য হলাে যজ্ঞকে সর্বস্তরের মানুষের আয়ত্তের মধ্যে নিয়ে আসা যাতে ব্রাহ্মণরা সর্বস্তরের মানুষের কাছ থেকে আরও বেশি ভােগ্যসামগ্রী , মান্যতা , শ্রদ্ধা ও নিয়ন্ত্রণ পেতে পারে । এসবের ফলে হাজার হাজার প্রাণী উৎসর্গ অব্যাহত ছিল । ব্রাহ্মণরা নৃশংসভাবে প্রাণীহত্যা চালাতে থাকে । বৌদ্ধ সাহিত্য সুনিপাতে একটি যজ্ঞের বিবরণ আছে । কোশলের রাজা পসেনদি এই যজ্ঞের আয়ােজন করেছিল । যজ্ঞে বলি দেওয়ার জন্য পাঁচশত ষাঁড় , পাঁচশত গাভী , পাঁচশত ছাগ এবং পাঁচশত ভেড়া শক্ত খুটির সাথে বেঁধে রাখা হয়েছিল । রাজার যেসব ভৃত্য ব্রাহ্মণ পুরােহিতের পৌরােহিত্যে নির্দেশ পালন করেছিল, তারা চোখের জলে সিক্ত হয়েই তা করেছিল । 
বৈদিক আর্যধর্ম ছিল নিছক ব্রতপালনের পরম্পরা – তারমধ্যে কোনাে ন্যায়পরায়নতা ছিল না । ছিল না লােভ - লালসা থেকে দূরে থাকার প্রার্থনা । যা কিছু অশুভ , তা থেকে মুক্তি পাবার কোনাে আকুলতা ছিল না । ছিল না খারাপ বা পাপ কাজের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা । ঋগ্বেদের বেশিরভাগ স্তোত্র হলাে ইন্দ্রের প্রশস্তি – কারণ ইন্দ্র আর্যদের অনেক শত্রুকে বিনাশ করেছিল । সে কৃষ্ণ নামে এক অসুরের সবকয়জন গর্ভবতী স্ত্রীকে হত্যা করেছিল । সে অসুরদের শত শত গ্রাম ধ্বংস করেছিল , তাই ইন্দ্রের প্রশস্তি গাওয়া হয়েছে । আর্যরা আরও বেশি বেশি অনার্যকে হত্যা করার জন্য প্রার্থনা জানিয়েছে । ঋগ্বেদের স্তোত্রগুলি অসৎ চিন্তা ও অন্যায় উদ্দেশ্যে পরিপূর্ণ , সেখানে ন্যায়নিষ্ঠ জীবন গঠন নিয়ে মাথা ঘামানো হয় নি। 

জাত ও ধর্ম নিয়ে আলােচনা করা হয়েছে বেদ এবং স্মৃতিতে । বর্ণের বৈদিক সারমর্ম হল – কোনও ব্যক্তি সেই পেশাই অবলম্বন করবে , যা তার স্বাভাবিক যােগ্যতার উপযােগী । কিন্তু কার্যত তা হয়নি । হয়নি তার কারণ এই প্রথা মােটেই বাস্তবসম্মত নয় । বাস্তবত যা হয়েছে – তা হল , চার বর্ণের পরিবর্তে হিন্দু সমাজ সাড়ে ছ'হাজার জন্মভিত্তিক জাতে বিভক্ত হয়েছে । আজও যাঁরা বর্ণ ব্যবস্থাকে সমর্থন করার জন্য তাকে শ্রমবিভাগ ও পেশা যােগ্যতাভিত্তির দোহাই দেয় , তারা বাস্তববােধ বিবর্জিত কথা বলে থাকেন । 

শুধুমাত্র আবেগনির্ভর হয়ে প্রাচীন বৈদিক চাতুর্বর্ণ প্রথার পক্ষে কথা বলা ঠিক নয় । সামাজিক সংগঠনের একটি ব্যবস্থা হিসাবে চাতুর্বর্ণ ব্যবস্থা পালন করার অযােগ্য বা কার্যকরি করা যায় না এবং দুঃখজনকভাবে এই প্রথা অসফল । 

যােগ্যতার ভিত্তিতে উচ্চমর্যাদার অধিকারি কোন ব্যক্তির সন্তান কি তার জন্মভিত্তিক উচ্চমর্যাদা ত্যাগ করতে চাইবেন ? অর্থাৎ যদি দেখা যায় – মর্যাদাসম্পন্ন পরিবারে অর্থাৎ ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় পরিবারে কোন যােগ্যতাহীন বা কম যােগ্যতাসম্পন্ন সন্তান জন্মগ্রহণ করে , তাহলে সে এবং তার পরিবার কি সেই উচ্চমর্যাদা ছেড়ে দিয়ে নীচুমর্যাদা বা শূদ্রের অমর্যাদা গ্রহণ করতে রাজি হবে ? শূদ্র হিসাবে উচ্চতর তিন বর্ণের মানুষের সেবার কাজ গ্রহণ করতে সম্মত হবে ?--- মানুষের প্রবৃত্তি , পিতা - পুত্র ও পারিবারিক সম্পর্কের কথা বিবেচনায় রেখে বলা যায় যে , এটা বাস্তবসম্মত নয় । 

আবার উল্টো দিকটা নিয়েও ভাবা যেতে পারে । — যে উচ্চযােগ্যতা ও গুণসম্পন্ন ব্যক্তি নীচু মর্যদাপূর্ণ অর্থাৎ শূদ্র বা চণ্ডাল পরিবারে জন্মগ্রহণ করবে , তাকে ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয়বর্ণ নিজ সমাজের একজন হিসাবে গ্রহণ করবে কি - না বা স্বীকৃতি দেবে কি - না । এমনকি বর্তমান আধুনিক যুগের অভিজ্ঞতাতেও বলা যায় , এই স্বীকৃতি প্রায় অসম্ভব । তাছাড়া প্রাচীনযুগে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের মধ্যে যে সম্পর্ক বা বিভিন্ন বর্ণের মানুষের মধ্যে যে অহিনকুল সম্পর্ক ছিল , নিরন্তর যুদ্ধ - সংঘর্ষ তা বিবেচনা করে বলা যায় , গুণ যােগ্যতাভিত্তিক বর্ণ নির্ধারণ অসম্ভব ছিল , তা ছিল এক মস্ত ধাপ্পা । 

এ ছাড়াও নারীদের বর্ণ নির্ধারণের প্রশ্ন এবং বিয়ের পর তার বর্ণগত অবস্থান নির্ধারণের সমস্যা। যােগ্যতার ভিত্তিতে নির্বাচিত নারী - পুরুষের সংখ্যার ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্ন । এসব কিছু বিচার বিশ্লেষণ করলে যােগ্যতাভিত্তিক বর্ণ নির্ধারণ প্রথার ত্রুটি বােঝা যায় । তাই ত্রুটিযুক্ত একটি প্রথার যে স্বাভাবিক পরিণতি হবার ছিল , তাই হয়েছে । চারবর্ণের প্রস্তাব কার্যত আজ দেশে জাত - বর্ণের জটিল সমস্যা সৃষ্টি করেছে । যে কেউ স্বীকার করবেন যে, বর্তমানকালের জন্মভিত্তিক সাড়ে ছ'হাজার জাত গুড়িয়ে দিয়ে গুণ ও যােগ্যতাভিত্তিক চারটি বর্ণে পরিচিতি দান অসম্ভব । 

যদি ধরে নেওয়া যায় যে , গুণ ও যােগ্যতাভিত্তিক বর্ণব্যবস্থা কার্যকরি করা গেল, তাহলে তা চালু রাখা যাবে কীভাবে ? কার্যকরি করা ও চালু রাখার জন্য  দরকার দণ্ড ব্যবস্থার প্রচলন । নিয়মনীতি ভঙ্গকারির শাস্তির বিধান না থাকলে মানুষ তা পালন করবে না । ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়বে মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তির কারণে । কিন্তু বৈদিক যুগে তেমন কোন শাস্তির ব্যবস্থা ছিল বলে জানা যায় না। আর তাই, গুণ ও যােগ্যতাভিত্তিক বর্ণব্যবস্থা কখনও সেভাবে কার্যকরি হয়নি । 

রামচন্দ্র হত্যা করেছিলাে শম্বুককে , কারণ সে শূদ্র হয়ে শ্রেণী বা বর্ণের গণ্ডি টপকে ব্রাহ্মণ হতে চেয়েছিল বা ব্রাহ্মণের পেশা রপ্ত করতে চেয়েছিল। এটা রামায়ণের কাহিনী , মনুস্মৃতি রচনার অনেক পরের কাহিনী---যখন জাত - বর্ণকে জন্মাধীন করে শাস্ত্র রচিত হয়েছে । মনুস্মৃতির নির্দেশ অনুযায়ী এই কাজ ছিল শম্বুকের অপরাধ । মনুস্মৃতি নির্দেশিত শাস্তি রামচন্দ্র দিয়েছিল শম্বুককে । এ কাহিনী মানুষকে সন্ত্রস্ত ও ভীত করে , আর কর্মের বেড়া ডিঙানাে থেকে মানুষকে বিরত রাখে , জন্মভিত্তিক বর্ণব্যবস্থা টিকে থাকে , স্থায়ীরূপ পায় । 

এসব বিবেচনা করে বলা যায় – কল্পিত চাতুর্বর্ণ প্রথার সফল প্রয়ােগ অসম্ভব অর্থাৎ গুণ ও যােগ্যতা অনুযায়ী বর্ণ নির্ধারণ প্রথা বাস্তবত কার্যকরি করা যায় না এবং সে জন্যই তা কখনও কার্যকরি হয়নি । যারা এই কুপ্রথা উচ্ছেদ করতে চায় , তাদের বুঝতে হবে যে , জাতব্যবস্থার ঐশ্বরিক ভিত্তিভূমি রয়েছে । শাস্ত্র হল — ঈশ্বরের নির্দেশ , তাই তা অভ্রান্ত , অপরিবর্তনীয় । হিন্দু শাস্ত্রকে অস্বীকার না করে জাত - বর্ণকে অস্বীকার করা যায় না । হিন্দু শাস্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে জাত - বর্ণ ব্যবস্থার বিরােধিতা ও উচ্ছেদের কথা বলা চলে না । জাতবর্ণ ব্যবস্থার উচ্ছেদের জন্য প্রয়ােজন শাস্ত্র ও বেদের কর্তৃত্ব ধ্বংস করা । 

এরপর আমরা ব্রাহ্মণদের রাজত্বাধীন , নেতৃত্বাধীন , কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণাধীন দ্বিতীয় যুগ বা পর্বের আলােচনায় যাবার আগে মধ্যবর্তী সময়ের সাড়ে চারশ ’ বছরকালব্যাপী অনার্য ও বৌদ্ধ শাসনকাল নিয়ে অতি সংক্ষেপে দু'চার কথা লিখবাে । 

ভারতের ইতিহাস শুরু আর্যদের আক্রমণ থেকে । অনার্যদের থেকে আর্যদের শ্রেষ্ঠত্বের দাবি সত্ত্বেও , আর্যদের রাজনৈতিক কৃতিত্ব প্রাচীন ইতিহাসে কোনও প্রভাব রাখতে পারেনি । ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের শুরু নাগা নামক একদল অনার্য মানুষের উত্থানে , এঁরা খুবই শক্তিশালী ছিলেন । আর্যরা এঁদের জয় করতে না পেরে , তাদের সমান মর্যাদা স্বীকার করতে বাধ্য হয় । এই নাগ রাজত্বের সময়কালে ৫৬৩ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে গৌতম বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেন । নাগদের পর নন্দবংশ , তারপর মৌর্যবংশ । মৌর্যবংশের সম্রাট অশােক বৌদ্ধধর্মকে রাজধর্ম বলে ঘােষণা করেন । ব্রাহ্মণদের পক্ষে এটা একটা বিরাট ধাক্কা । ব্রাহ্মণরা এরফলে সব ধরণের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপােষকতা থেকে বঞ্চিত হয় এবং তারা তাদের পূর্ব অবস্থানের তুলনায় অবহেলিত হয় । সম্রাট অশােক সব ধরনের পশুবলি নিষিদ্ধ করে , তারফলে ব্রাহ্মণরা পেশাও হারায় । কারণ যজ্ঞানুষ্ঠান ও বলিদান অনুষ্ঠান থেকে তারা জীবন ধারণের রসদ সংগ্রহ করতাে । ব্রাহ্মণরা মৌর্যদের ১৪০ বছরের শাসনকালে খুবই সমস্যার মধ্যে কাল কাটায় । 

ব্রাহ্মণ পুষ্যমিত্র শুঙ্গ মৌর্য সম্রাটকে হত্যা করে এবং বৌদ্ধধর্মের জায়গায় ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রতিষ্ঠা করে মনুস্মৃতিকে আইনের বিধি হিসাবে ঘােষণা করে । এসব ১৮২/১৮৫ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের ঘটনা । অর্থাৎ যীশু খ্রীষ্টের জন্মের ১৮২/১৮৫ বছর আগের সময়কালের ঘটনা । 

ব্রাহ্মণরা বেদ রচনা করেছিল এবং তার নির্দেশাবলীকে হাতিয়ার করে বৈদিক ব্রাহ্মণরা নিজেদের সম্মান , প্রভাব এবং পেশা সুরক্ষিত করেছিল । কিন্তু বৌদ্ধদের রাজত্বকালে সে সবকিছু তছনছ হয়ে যায় । পুষ্যমিত্র রাজা হবার পর গােটা বিষয়টি পর্যালােচনা ও পুনর্মূল্যায়ণ করে ব্রাহ্মণরা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও কর্তৃত্ব পুণপ্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং তা স্থায়ি করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করে । এই লক্ষ্যে মনুস্মৃতি রচনা করা হয়। মনুস্মৃতির নির্দেশ সর্ব সাধারণের কাছে গ্রহণযােগ্য করে তােলার জন্য ঘােষণা ও প্রচার করা হয় যে , দৈববাণী হলাে মনুস্মৃতির উৎস , তাই তা অলংঘনীয় এবং অবশ্য পালনীয় । কিন্তু একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে , এই দাবি ছিল এক বিরাট ধাপ্পা ও মিথ্যা । 

বিশেষজ্ঞদের মতে মনুস্মৃতি রচিত হয় ১৭০ থেকে ১৫০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে কোন এক সময়ে । পুষ্যমিত্র সিংহাসন দখল করে ১৮৫ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে । তাই , মনে করা যায় যে , রাজা পুষ্যমিত্রের নির্দেশে মনুস্মৃতি রচনা করা হয়েছিল । 

মনুস্মৃতির রচয়িতা সুমতি ভার্গব নামে ভৃগু পরিবারের এক ব্রাহ্মণ ব্যক্তি ; কিন্তু গ্রন্থের নামকরণ করা হয় মনুর নামে । ভারতের প্রাচীন ইতিহাসে ( আর্য পুরাণে ) মনুর নাম বিশেষ মর্যাদা বহন করতাে । তাই তার নামে শাস্ত্র গ্রন্থটির নামকরণ করা হয় – যাতে তা বেশি বেশি গ্রহণযােগ্য হয়ে ওঠে । মনুর নামে নামকরণের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে , তাহলো , মনুস্মৃতিকে বৈদিক শাস্ত্রগুলির সময়কালের শাস্ত্র হিসাবে প্রমাণ করা এবং তার নির্দেশকে হাতিয়ার করে কার্যসিদ্ধি করা।  মনু যেহেতু অতি প্রাচীনকালের চরিত্র , তাই তাঁর রচনাও প্রাচীন বলে চালানাে সহজ । অর্থাৎ ব্যাকডেট দিয়ে চালানাের চেষ্টা ।

পুষ্যমিত্র মনুস্মৃতিকে আইনবিধি বলে ঘােষণা করে , মনুস্মৃতিতে প্রাচীন বৈদিক আইনের বিপরীতে অনেক নতুন আইন তৈরি করা হয় । বিশেষ প্রয়ােজনেই তা করা হয় । 

বৈদিক আর্য আইন অনুযায়ী ( ১ ) রাজত্বের অধিকার একমাত্র ক্ষত্রিয়ের , ব্রাহ্মণ কখনও রাজা হতে পারে না। (২ ) কোনও ব্রাহ্মণ অস্ত্রধারণের পেশা গ্রহণ করবে না । ( ৩ ) রাজার কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা পাপ ইত্যাদি।  – পুষ্যমিত্র এইসব নির্দেশ লংঘন করে । সেজন্য সাধারণ মানুষ বা প্রজারা পুষ্যমিত্রর এই বে - আইনী ক্ষমতা দখল মেনে নিতে পারেনি । সেজন্য নতুন আইন তৈরি করে ব্রাহ্মণরা পুষ্যমিত্রর অপরাধকে বৈধ করে তােলার প্রয়াস নেয় । 

মনুস্মৃতির নতুন আইনে বলা হয় - ব্রাহ্মণ সেনাপতি হতে পারে , রাজত্ব জয় করতে পারে ; আর শাসক ও সম্রাট হতে পারে । রাজার নির্দেশের কোন প্রয়ােজন নেই , নিজের ক্ষতির কারণে ব্রাহ্মণ যে কাউকে শাস্তি দিতে পারে , কারণ সে বেদ জানে তাই জ্ঞানী , সর্বজ্ঞ । ব্রাহ্মণ নিজের ক্ষমতা ও পদ রক্ষার জন্য গণহত্যাও করতে পারে , সে ক্ষেত্রে ঋক , যজু ; ও সামবেদ উপনিষদের সাথে তিনবার পাঠ করলে সব পাপমুক্ত হবে । ব্রাহ্মণ বিদ্রোহ ও রাজহত্যা করতে পারবে । ব্রাহ্মণের কর্তৃত্ব অস্বীকার করলে , এমন যেকোন প্রজাকে সে হত্যা করার অধিকারি । – আইনের এসব পরিবর্তন করে নতুন আইন মনুস্মৃতি রচনার ফলে পুষ্যমিত্র কর্তৃক মৌর্য সম্রাটকে হত্যাজনিত পরিস্থিতি বৈধ বলে স্বীকৃত হয় । 

এসব কিছু ছাড়াও মনুস্মৃতিতে বলা হয় – - পৃথিবীতে যা কিছু আছে , তা ব্রাহ্মণের সম্পত্তি । ব্রাহ্মণ এই জগতের অধীশ্বর । জ্ঞানী হােক বা মূখ হােক, একজন ব্রাহ্মণ দেব স্বরূপ । ব্রাহ্মণ দেবতা , তাই আইনের উর্ধে , রাজার উর্ধে । কোনও ব্রাহ্মণ যদি ব্যভিচারী হয় , তবে তার শাস্তি হবে মস্তক মুণ্ডন , আর অন্যবর্ণের ক্ষেত্রে মস্তক ছেদন , কারণ ব্রাহ্মণ অবধ্য । বিচারপতিকে ব্রাহ্মণ হতেই হবে । শাস্ত্র অনুসারে তিনবর্ণের জন্য ব্রাহ্মণই গুরু ইত্যাদি। এরূপ আরও অনেক নির্দেশ , যার প্রত্যেকটি ব্রাহ্মণের পক্ষে পক্ষপাতিত্ব । এইসব নির্দেশনামাই হলাে হিন্দুদের ধর্মীয় শাস্ত্রগ্রন্থ ! এইসব কারণেই হরিচাঁদ ঠাকুর ঘােষণা করেন , “ ব্রাহ্মণ রচিত যত অভিনব গ্রন্থ , ব্রাহ্মণ প্রধান মার্কা বিজ্ঞাপন যন্ত্র ... ব্রাহ্মণ বর্ণের শ্রেষ্ঠ এই নীতি বলে , শূদ্র বলি ক্ষুদ্র করে অপর সকলে । কথা উপকথা কত সৃজন করিল , ঘাটে মাঠে গাছে পথে দেবতা গড়িল ।... কুকুরের উচ্ছিষ্ট প্রসাদ পেলে খাই , বেদবিধি সদাচার নাহি মানি তাই"। 

আমরা ইতিপূর্বে বর্ণ এবং জাত নিয়ে কিছু কথা বলেছি। জাতের উদ্ভব বৈদিক যুগেই শুরু হয় । বর্তমান সমাজে জাতপ্রথা ঠিক যেভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে , বেদের যুগে তেমন ছিল না । ভিন্নজাতের মানুষের একসঙ্গে খাওয়া ও অসবর্ণ বিবাহে বিধিনিষেধ তখন চালু হয়নি । জাত প্রথাকে ঘিরে বর্তমানের মত গোঁড়ামি তখনও প্রতিষ্ঠা পায়নি , কিন্তু জাতপ্রথার মূলভিত্তি যে অসাম্য , তার প্রতিষ্ঠা বেশ ভালভাবেই হয়েছিল । এ আসলে বেদের ঋত - এর যুগ বা বরুণের যুগ অর্থাৎ অসুরের যুগ থেকে ধীরে ধীরে ইন্দ্ররাজের যুগে প্রবেশ । ভারতীয় সাহিত্যে বরুণের ইতিহাস হলাে নিয়মানুবর্তিতা ও নৈতিক গরিমার কাল , আদিম যৌথ সমাজের সময়কাল । বেদের এই প্রাচীন ঋত যুগ , কালক্রমে কয়েকশত বছর পর ঋগ্বেদের রচনাকালেই বৈদিক কবিদের চেতনা থেকে লুপ্ত হয় । এ আসলে পশুপালনমূলক অর্থনীতির ক্রমবিকাশের ফল । বৈদিক চিন্তা বিবর্তনের পরিণাম হিসাবে নীতি ও ন্যায়ের প্রতীক প্রাচীন বরুণ দেবতার জায়গায় পিতা মাতার হত্যাকারী, যুদ্ধ ও লুণ্ঠনের দেবতা ইন্দ্রের গরিমা প্রবল হয়ে ওঠা এবং শ্ৰেণীবিভক্ত সমাজের আবির্ভাবের বার্তা ঘােষণা । 

তবুও বলা যায় যে, তা ছিল অনেকটাই ঢিলেঢালা ও অবিন্যস্ত । বৈদিক যুগে গুণ ও যোগ্যতাভিত্তিক বর্ণাশ্রম প্রথা অকার্যকরি হয়ে জাতপ্রথায় অধঃপতিত হয় । বৈদিক যুগকে নানা প্রশ্নে আদর্শ ও উদাহরণ হিসাবে খাড়া করা হয় ঠিকই ; কিন্তু সত্য এই যে, বৈদিক আর্য সমাজে শূদ্ররা , গুণ ও যােগ্যতার ভিত্তিতে কখনই ব্রাহ্মণ হতে পারতাে না । কিন্তু অব্যবহিত পরবর্তী বৌদ্ধ জমানায় শূদ্রদের ভিক্ষুর মর্যাদা পেতে কোন সমস্যা ছিল না এবং কার্যত অনেক শূদ্র ভিক্ষু হয়েছিলেন । আর মনুস্মৃতির জমানায় অর্থাৎ ব্রাহ্মণ জমানায় জাত সৃষ্টি করা হয় পরিকল্পিত পন্থায় । মর্যাদা ও পেশাকে বংশভিত্তিক করে ফেলাই হলাে বর্ণকে জাতে রূপান্তরিত করা , প্রকৃতপক্ষে সুদূর বৈদিকযুগ থেকে আজ পর্যন্ত বর্ণ ও জাতে সেই অর্থে কোন পার্থক্য ছিল না এবং নেই বললে ভুল হয় না । জাত ও বর্ণকে এক অর্থে ব্যবহার করা যায় । পার্থক্য যা , তাহলাে , কতকগুলি জন্মভিত্তিক জাতের সমাহার হলাে এক একটি বর্ণ । 

মনুস্মৃতির নির্দেশ ও ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় বর্ণ থেকে জাতে রূপান্তর হয়েছে মােটামুটি তিনটি পর্বে । প্রথম পর্বে ব্যক্তির মর্যাদা ও পেশা অর্থাৎ বর্ণ নির্দিষ্ট করা হতাে একটা সীমিত সময়ের জন্য । দ্বিতীয় পর্বে কোন মানুষের মর্যাদা ও পেশা অর্থাৎ বর্ণ নির্ধারণ করা হতাে তার জীবনকাল পর্যন্ত । আর তৃতীয় পর্বে মর্যাদা ও পেশা অর্থাৎ বর্ণ নির্ধারিত হয় উত্তরাধিকার ভিত্তিক বা জন্মসূত্রে । অর্থাৎ বর্ণ রূপান্তরিত হলাে জাতে , গুণ ও যােগ্যতাভিত্তিক বর্ণের আর কোন অস্তিত্ব রইলাে না । এভাবে যখন জাতব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলাে , তখন হিন্দুধর্ম আর প্রচারমূলক ধর্ম থাকতে পারে না । কারণ জাতভেদপ্রথা ধর্মান্তরকরণের সাথে খাপ খায় না। সেখানে সমস্যা হলাে । হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত ব্যক্তিকে কোন জাত - বর্ণের অন্তর্ভূক্ত করা হবে তা নিয়ে । 

কোন কোন গবেষক বলেছেন - কোনও ব্যক্তির বর্ণ নির্ধারণ করতাে মনু এবং সপ্তর্ষি নামে একদল কর্মকর্তা । সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে মনু ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য হবার যােগ্যদের নির্বাচন করতাে ; আর সপ্তর্ষিরা নির্বাচন করতাে ব্রাহ্মণ হবার জন্য যােগ্যদের । বাকিদের শূদ্র বলে ঘােষণা করা হতাে । এইভাবে বর্ণ নির্বাচনের মেয়াদকাল হত চার বছর , যাকে এক যুগ বলা হতাে । প্রতি চার বছর অন্তর এই নির্বাচনের পুনর্মূল্যায়ন হতাে এবং বর্ণ ব্যবস্থায় মানুষের উত্থান - পতন হতাে । অর্থাৎ কোন শূদ্র উচ্চতর তিনবর্ণের যেকোন বর্ণে উন্নীত হতে পারতাে বা সুযােগ ছিল । ব্রাহ্মণের নেমে যাবার সম্ভাবনা থাকতাে নিন্মতর যেকোন বর্ণে । অর্থাৎ ক্ষত্রিয়, বৈশ্য বা শূদ্রের স্তরে নেমে যাবার । এভাবে চারবর্ণের মধ্যে যেকোন স্তরে উঠানামার সুযােগ ছিল । 

এই ব্যবস্থায় প্রাপ্ত বয়স্কদের বর্ণ নির্ধারণ করা হতাে । এতে পূর্ব প্রশিক্ষণের কোন ব্যবস্থা ছিল না । মনু ও সপ্তর্ষিরা ছিলেন অনেকটা ইন্টারভিউ বাের্ডের মত । এসব চলতাে অনেকটা এলােমেলােভাবে । 

এই ব্যবস্থা মূলতুবি হয়ে যায় । এরপর গড়ে তােলা হয় গুরুকুল ব্যবস্থা । গুরুকুল হলাে গুরুর পরিচালিত শিক্ষালয় । শিক্ষকদের আচার্য বলা হতাে । সবশিশু গুরুকুলে যেত এবং ১২ বছর বয়স অবধি শিক্ষাদান চলতাে । ছাত্রদের বলা হতাে ব্রহ্মচারী । আচার্য ছাত্রদের উপনয়ন করতেন এবং বর্ণ নির্ধারণ করে দায়িত্ব কর্তব্য পালনের জন্য বৃহত্তর জগতে তাদের পাঠানাে হত । – এটা পুরনাে পদ্ধতির তুলনায় ভাল ছিল । এই ব্যবস্থায় কারুর বর্ণ নির্ধারণ করা হতাে তার সারা জীবনের জন্য ; কিন্তু তা উত্তরাধিকার ভিত্তিক ছিল না । 

ব্রাহ্মণরা এই ব্যবস্থায় খুশী হয়নি । কারণ এই ব্যবস্থায় কোন ব্রাহ্মণ সন্তানের শূদ্র বা নিম্নতর কোন বর্ণে নেমে যাবার আশংকা ছিল । তাই তারা এই পরিণতি এড়াবার জন্য উদগ্রীব ছিলাে । তারা দাবি করে যে , বর্ণ হােক জন্মভিত্তিক অর্থাৎ বংশভিত্তিক । 

ব্রাহ্মণদের দাবি মেনে তাদের খুশী করার ব্যবস্থা করা হয় । তাই আবারও বর্ণ নির্ধারণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয় । ইতিপূর্বে আচার্য উপনয়নের ব্যবস্থা করতাে ও বর্ণ নির্ধারণ করতো শিক্ষা সমাপ্ত হবার পর গুণ ও যোগ্যতা বিবেচনা করে । এবার ঠিক হলাে সন্তানের উপনয়নের ব্যবস্থা হবে বাড়িতে পিতা কর্তৃক এবং তারপর গুরুকুলে আচার্য তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করবে । এভাবে বর্ণপ্রথা কিছুকালের মধ্যে রূপান্তরিত করা হয় জাত ব্যবস্থায় - যা আজও চলছে । কার্যত বৈদিক যুগ থেকে বংশানুক্রমিক জাত - বর্ণ প্রথাই চলছে ; আর গুণ ও যােগ্যতার কোন মাপকাঠিতে যাচাই ছাড়াই ব্রাহ্মণরা উচ্চমর্যাদা ও বিশেষ সুযােগ - সুবিধা ও অধিকার ভােগ করে চলেছে । 

জাত - বর্ণ ব্যবস্থা এখন যা আছে , অতীতে কেমন ছিল এবং কী হওয়া উচিত – এসব নিয়ে আজকাল অনেক যুক্তিতর্ক হয় । কিন্তু ধর্মশাস্ত্রের নির্দেশ নিয়ে আলােচনা এবং তা যুক্তিযুক্ত অথবা অযৌক্তিক – এসব প্রশ্ন কি তােলা যায়? অনেকেই এই প্রশ্নে ইসলাম ধর্ম বা কোরাণকে ব্যঙ্গ করে বলেন যে , তা মৌলবাদী দর্শন, কেননা তার কোন শব্দ , কোন অবস্থায় নড়চড় হয় না । এই প্রশ্নে ব্রাহ্মণ্যধর্ম বা হিন্দুধর্মের নীতি নির্দেশ কী?--- এবার তা নিয়ে আমরা দু'চার কথা বলবাে । 

সবাই স্বীকার করেন যে , জাত - বর্ণপ্রথা যুক্তির পরিপন্থি ; কিন্তু হিন্দুদের যুক্তিবাদী হবার আবেদন জানিয়ে জাতপ্রথা বর্জন করার কথা বলা যাবে কি ? তা কি গ্রাহ্য হবে ? — হবে না । কারণ বাড়তি সুযােগ - সুবিধা ও মর্যাদার কথা ছাড়াও জাত ব্যবস্থা হলাে কয়েকটি ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাভাবিক পরিণতি । এর পিছনে রয়েছে শাস্ত্রীয় সমর্থন। আর এই শাস্ত্র হলাে ঐশ্বরিকতায় প্রাণিত মুণিঋষির নির্দেশ । বলা হয়েছে এই মুণিঋষিদের ছিল অতিপ্রাকৃতিক জ্ঞান ও শক্তি । সেইজন্য তাদের নির্দেশ অমান্য করলে পাপ হয় । হিন্দুদের এসব হল তাদের বিশ্বাসের ফল , যা শাস্ত্র তাদের মনে জন্ম দিয়েছে । ধার্মিক হিন্দুরা তাদের চরিত্র পাল্টাবে না , যতক্ষণ তাদের শাস্ত্রের শুদ্ধতায় আস্থা থাকবে । এটা বােঝা দরকার যে , হিন্দুরা জাত ব্যবস্থা মানে অমানবিকতা ও ভুল মেধার কারণে নয় , তারা জাত মানে যেহেতু তারা গভীরভাবে ধর্মপরায়ণ । তাই , জাতবর্ণ মানার মধ্যে কোন ভুল নেই , ভুল রয়েছে ধর্মশাস্ত্রে – যে শাস্ত্র জাত - বর্ণ সম্পর্কে এই ধারণার প্রচলন করেছে । সেজন্য এই পাক ও পাপ থেকে মুক্তি পেতে হলে শুধু শাস্ত্র বর্জন করলে চলবে না , শাস্ত্রের কর্তৃত্ব অস্বীকার করার সাহস দেখাতে হবে । 

আরও প্রশ্ন হলাে – একজন হিন্দু কি যুক্তি অনুসরণ করার ক্ষেত্রে স্বাধীন ? মনু তিনটি বিধি নির্দিষ্ট করে দিয়েছে । – বেদ , স্মৃতি এবং সদাচার ।এক্ষেত্রে যুক্তি এবং উচিত - অনুচিতের কোন ভূমিকা নেই । বেদ ও স্মৃতির ব্যাখ্যায়--- যুক্তিবাদের অনুশাসন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ও দূষণীয় । 

ধরা যাক , কোন ক্ষেত্রে , কোন বিষয়ে বেদ - এর সুনির্দিষ্ট নির্দেশ আছে ; আর ঐ একই বিষয়ে ও একই ক্ষেত্রে স্মৃতিরও সুনির্দিষ্ট নির্দেশ আছে ; কিন্তু এই দুই নির্দেশ ভিন্ন এবং পরস্পর বিরােধি। সে ক্ষেত্রে স্পষ্ট শাস্ত্রীয় নির্দেশ যে , এই সমস্যার সমাধানে যুক্তি ও বুদ্ধি ব্যবহার করা যাবে না । এক্ষেত্রে বেদ - এর ( শ্রুতি ) নির্দেশ শিরােধার্য করতে হবে । আবার যখন দু’টি স্মৃতির নির্দেশ নিয়ে এমন সমস্যা সৃষ্টি হবে , তখন মনুস্মৃতির নির্দেশ গ্রাহ্য হবে। কোন অবস্থায় খুঁজে দেখা যাবে না যে , কোন নির্দেশের পিছনে যুক্তি আছে বা নেই বা কমবেশি আছে । তাই , এটা পরিষ্কার যে , কোনও বিষয়ে বেদ ( শ্রুতি ) বা স্মৃতি নিশ্চিত নির্দেশ দিলে একজন হিন্দু তার যুক্তিগুণ ব্যবহার করার ক্ষেত্রে স্বাধীন নয় । জাত এবং বর্ণ আলােচিত হয়েছে বেদ এবং স্মৃতিতে , তাই কেউ যুক্তিসিদ্ধ পথে জাত ও বর্ণের বিশ্বাসের ভিত্তিভূমি পরীক্ষা করতে পারে না । মানবতার কর্তব্যবােধ একজন হিন্দুকে শেখানাে যাবে না এমন নয় ; কিন্তু সমস্যা হলাে – কোন কর্তব্যবােধই একজন হিন্দুর জাতরক্ষার কর্তব্যবােধকে অতিক্রম করতে পারে না । 

হিন্দুরা প্রায়ই জাতের বেড়া ভাঙেন , বিশেষ করে রেলভ্রমণ , বিদেশ পর্যটন এসব ক্ষেত্রে । তাছাড়াও আজকের দিনে জুতাে বিক্রেতা ব্রাহ্মণের সংখ্যা যাজক কর্মে নিয়ােজিত ব্রাহ্মণের থেকে সংখ্যায় অনেক বেশি । ব্যবসার জন্য ব্রাহ্মণরা তাদের পেশা যাজকবৃত্তিকে শুধু পরিত্যাগই করেনি , অধিকন্তু তারা এমন ব্যবসা ও পেশার সাথে যুক্ত হয়েছে যেগুলি শাস্ত্রে নিষিদ্ধ । এক পর্যায়ে হিন্দুরা জাত ভাঙছে , পরবর্তী পর্যায়ে তা রাখছে কোনও প্রশ্ন না তুলে । এই অদ্ভুত আচরণের কারণও নিহিত আছে শাস্ত্রের মধ্যে । শাস্ত্রের নির্দেশ জাতপ্রথা যতটা সম্ভব রক্ষা করাে , যখন তা পারবে না প্রায়শ্চিত্ত করাে । শাস্ত্রে সমঝােতার এই দর্শন জাতপাতকে শাশ্বত জীবনদান করেছে । 

মনু , বেদ ( শ্রুতি ) ও স্মৃতির সাথে সদাচারকে অন্যতম বিধান হিসাবে অনুসরণের জন্য হিন্দুদের নির্দেশ দিয়েছে । প্রকৃতপক্ষে সদাচারকে শাস্ত্রের উপরে স্থান দেওয়া হয়েছে । সদাচার এমন এক বিধান যা শাস্ত্রের বিপরীতে ধর্ম অথবা অধর্ম , ন্যায় অথবা অন্যায় যাই হােক না কেন , তা অবশ্য পালনীয় । অনেকেই ভাবতে পারেন যে , সদাচার মানে মঙ্গল কর্ম , সজ্জন ও ন্যায়শীল মানুষের কাজ ; কিন্তু আসলে তা নয় । সদাচার বলতে সৎকর্ম বা সজ্জন মানুষের কাজ ও চিন্তাকে বােঝায় না – সদাচারের অর্থ হলাে , ভাল হােক বা মন্দ হােক প্রাচীনপ্রথা । পাছে মানুষ সজ্জনকে বা সজ্জন মানুষের কর্মকে অনুসরণ করে , সেই আশংকায় স্মৃতি সন্দেহাতীতভাবে হিন্দুদের আদেশ দিয়েছে যে , ঈশ্বরের সৎকর্মও অনুসরণযােগ্য নয় , যদি তা শ্রুতি  (বেদ ) , স্মৃতি ও সদাচারের ( প্রাচীন প্রথা ) বিরােধি হয়। 

আধুনিক বিশ্বে যুক্তি ও নৈতিকতা হলাে শক্তিশালী অস্ত্র। বেদ ( শ্রুতি ) , স্মৃতি ও সদাচার এই যুক্তি ও নৈতিকতার শক্তিশালী অস্ত্রের বিরুদ্ধে দুর্ভেদ্যপ্রাচীর রচনা করেছে । এই প্রাচীর তৈরীর জন্য যে মালমশলা ব্যবহার করা হয়েছে তাতে যুক্তি ও নৈতিকতার দাহ্য মশলা একেবারেই নেই । উপরন্তু এই দুর্ভেদ্য প্রাচীরের মধ্যে মােতায়েন করা হয়েছে ব্রাহ্মণ সৈন্যদল । এই সৈন্যদল ভাড়াটে সৈন্য নয় , কারণ এই জাতবর্ণ ব্যবস্থায় ব্রাহ্মণরা সুবিধাভােগী । সেজন্য তারা চায়না এই জাতবর্ণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ুক , কারণ তাতে তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে । তাই তারা এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে মরীয়া । নিম্নতর জাতবর্ণগুলিও চায় না যে , এই ব্যবস্থা ভেঙে পড়ুক , কারণ তারা জানে ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়লে তাদের মধ্যে কেউ কেউ ক্ষমতা ও সম্মান আপেক্ষিকভাবে বেশি হারাবে, তাই তারাও এই ব্যবস্থা টিকে থাকার পক্ষে । 

প্রকৃতপক্ষে হিন্দুরা যাকে ধর্ম বলে , তা কতকগুলি আদেশনামা ও বিধিনিষেধের সম্মিলন । একজন হিন্দুর কাছে ধর্ম যে কিছু আদেশ ও নিষেধ , তা পরিষ্কার বােঝা যায় বেদ ও স্মৃতিতে । বেদে ধর্ম শব্দটি যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে তাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা কতকগুলি অধ্যাদেশ ও আচার অনুষ্ঠান বােঝায় । মােটামুটিভাবে বলা যায় হিন্দুধর্ম বা এইসব আদেশনামা আশংকিত ও দাসসুলভ বশ্যতায় নিয়ে গিয়ে জনগণকে খর্ব করে । এখানে কোন আদর্শের প্রতি আনুগত্য নয় , তা শুধু কিছু হুকুমের নিকট বশ্যতা স্বীকার করা । আর এতে সবচেয়ে বড় সর্বনাশ হলাে , এই সমস্ত হুকুমের মধ্যে যে আইন , তা অপরিবর্তনীয়--- গতকাল , আজ এবং চিরকালের জন্য একই । এগুলি সবই অবিচারপূর্ণ , কারণ তা একটি শ্রেণী বা বর্ণের সুবিধার জন্য , পুরোপুরি ব্রাহ্মণের জন্য। 

এবার আমরা ভাগবদগীতা , মহাভারত , রামায়ণ ও পুরাণ নিয়ে দু - চার কথা লিখে এই প্রবন্ধে ইতি টানবাে। গীতার রচনাকাল নিয়ে এই প্রবন্ধের শুরুতে দু'চার কথা আলােচনা করা হয়েছে । মহাকাব্য মহাভারতের ভীষ্মপর্বের অংশ হচ্ছে ভাগবদগীতা । সেজন্য মহাভারত রচনাকালের সাথে সামঞ্জস্য রেখে গীতার রচনাকাল ভাবা যেতে পারে । যুদ্ধে নিজের ভাই , আত্মীয় - স্বজন ও শ্রদ্ধেয় গুরুজন - শিক্ষকদের হত্যা করতে হবে , এসব দেখে ও ভেবে অর্জুন হতাশ ও বিষন্ন হয়ে পড়ে । সে অস্ত্র ত্যাগ করে যুদ্ধ করতে অস্বীকার করে । কৃষ্ণ তাকে বােঝাতে থাকে এবং যুদ্ধে প্রবৃত্ত করার চেষ্টা চালাতে থাকে । এখানে মূল বিতর্ক ছিল যুদ্ধ করা বা না করা – এছাড়া অন্যকোন বিষয় ছিল না । গীতায় কৃষ্ণ সাধারণ মানুষের জন্য নৈতিক উপদেশ বা কোন মতবাদের নিহিত শিক্ষা দিতে চায়নি , তবুও গীতা তাই হয়ে উঠেছে। 

প্রথমে কৃষ্ণ ছিল সাধারণ মানুষ , পেশায় দক্ষ সৈনিক । তারপর মানব থেকে অতিমানব , ঈশ্বরসম এবং একনায়ক । তার সবযুক্তি যখন অর্জুনকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করতে ব্যর্থ হয় , তখন সে সরাসরি অর্জুনকে যুদ্ধ করতে হুকুম দেয় । ভীত অর্জুন তার হুকুম মেনে নেয় । এভাবে কৃষ্ণ ঈশ্বরসম অবস্থান থেকে নিজকে ঈশ্বর বলে ঘােষণা করে । 

বাসুদেব কৃষ্ণ বলছে – সে পাণ্ডবদের মধ্যে ধনঞ্জয় , মুণিদের মধ্যে ব্যাস , ঋষিদের মধ্যে উষাণ । সে সর্বশক্তিমান ব্রাহ্মণ , সর্ব অধীশ্বর , সর্বোচ্চ পবিত্ৰকারি। সে দাবি করছে যে, আদিত্যদের মধ্যে সে বিষ্ণু , জ্যোতিষ্কদের মধ্যে সূর্য , বায়ুর মধ্যে মরিচি , তারকাদের মধ্যে সে চন্দ্র ইত্যাদি । শংকরের অবতার কৃষ্ণ বলছে – সে শংকর , যক্ষ - রাক্ষসদের সে সম্পদরাজ , বসুদের মধ্যে পাবক , পর্বতের মধ্যে সে মরু ইত্যাদি । ব্রাহ্মণ কৃষ্ণ বলছে সে সর্বজ্ঞানী ও বেদান্তের রচয়িতা , সে অক্ষয় । কিন্তু ভাগবদ্ নিশ্চিতভাবে বলে যে, কৃষ্ণ অবতারের রূপ গ্রহণ করে ক্ষত্রিয়দের বিলােপ করার জন্য । 

গীতায় বর্ণিত হয়েছে কর্মমার্গ , ভক্তি মার্গ ও জ্ঞানমার্গ – মুক্তির পথ নির্দেশ । গীতায় কোথাও জ্ঞানীকে শেষ্ঠ বলা হয়েছে ; আবার কোন জায়গায় বলা হয়েছে ভক্ত শ্রেষ্ঠ । প্রতিবিপ্লবের মতবাদগুলিকে গীতায় দার্শনিক তত্ত্ব দ্বারা সমর্থন করা হয়েছে । যুদ্ধ অর্থাৎ মানুষ হত্যায় প্ররােচনা দেওয়া হয়েছে । চাতুর্বর্ণকে বলা হয়েছে ঈশ্বর সৃষ্ট । — যে কথা ঠিক নয় । জন্মভিত্তিক বর্ণপ্রথা চালু হয়েছে ভাগবদ্ গীতা রচনার অনেক আগে থেকে । অন্ধবিশ্বাসী ছাড়া ভাগবদগীতার পক্ষে কেউ সমর্থন করবে না এবং তা নিয়ে আলােচনার বিশেষ কিছু নেই । 

গীতার বহু সংস্করণ এবং ব্রাহ্মণের প্রয়ােজন মত তাতে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা হয়েছে । রাজারাম শাস্ত্রী ভাগবত - এর মতে প্রথমে গীতায় মাত্র ৬০ টি শ্লোক ছিল । হামবােল্ট মনে করে আদিতে গীতা ১১ টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত ছিল , পরে ৭ টি অধ্যায় সংযােজন করা হয়েছে , হপকিনস — এর মতে প্রথম ১৪ টি অধ্যায় এই কাব্যের মূল । অধ্যাপক রাজওয়াড় মনে করে ১০ এবং ১১ - এই দুই অধ্যায় হলাে প্রক্ষিপ্ত । আর অধ্যাপক গার্কে বলেছে ১৪৬ টি শ্লোক পরে ঢােকানাে হয়েছে । এসব আলােচনায় বােঝা যায় , এই গ্রন্থের সাথে ঐশ্বরিকতার কোন সম্পর্ক নেই , বিভিন্ন লেখক নিজের নিজের জ্ঞান , বুদ্ধি ও বিবেচনা মতাে এই গ্রন্থে সংযােজন করে ভাগবদগীতার বর্তমানকালের রূপ দিয়েছেন । 

এই গ্রন্থের মূল লেখক খুঁজে পাওয়া যায় না । তবে যেহেতু ব্যাস সঞ্জয়কে অর্জুন কৃষ্ণের কথপােকথন শােনাতে বলে , তাই বলা যায় ব্যাস হলাে গীতার লেখক বা রচয়িতা । প্রকৃতঅর্থে মহাভারত যেহেতু মহাকাব্য , কল্পিত কাহিনীর যাত্রানুষ্ঠান , সেখানে ভাগবদ্গীতা বিবেকগীত ছাড়া আর কি হতে পারে ! হবকিন - এর মতে গীতায় যুক্তি আছে , তেমনি আছে তার অভাবও । এটা একটি অবিন্যস্তভাবে বিভক্ত একগুচ্ছ সেকেলে দার্শনিক মতবাদ । সুর ও ধ্বনি থাকা সত্ত্বেও বর্তমান অবস্থায় এই স্বর্গীয় সঙ্গীত , কাব্য হিসাবে সন্তোষজনক নয়। একই কথার পুণরাবৃত্তি ঘটেছে বহুবার , অর্থ ও কাব্যবিন্যাসে বিরুদ্ধ কথন এসেছে । 

মহাভারতের তিনটি সংস্করণ । প্রত্যেক সংস্করণে এই গ্রন্থের নাম ও বিষয় পরিবর্তিত হয়েছে । প্রথমে এই গ্রন্থ ‘ জয় ’ নামে পরিচিত ছিল । এই মূল সংস্করণ ব্যাস লেখেন । দ্বিতীয় সংস্করণে গ্রন্থের নামকরণ করা হয় ভারত । লেখক বৈশম্পায়ণ ছাড়াও ব্যাসের ছাত্র সুমন্ত , জৈমিনি , পায়লা ও শুক, নিজের নিজের সংকলন বের করেন । অর্থাৎ বলা যায় 'ভারত' গ্রন্থের ৪ / ৫ টি সংস্করণ । 'ভারত' গ্রন্থটিকে শৌতি পুনর্বিন্যাস করে মহাভারত লেখেন । এরফলে এই গ্রন্থের আয়তন ও বিষয়বস্তু দুই-ই বাড়ে । জয় ছােট ছিল , শ্লোক সংখ্যা ছিল ৮৮০০ । ভারতে শ্লোকসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪০০০ | আর এখন মহাভারতের শ্লোক সংখ্যা ৯৬৮৩৬--- মূল গ্রন্থের আর কী রইলাে ! আনুমানিক ২০০-৩০০ খ্রীষ্টাব্দ থেকে শুরু করে মহাভারত লিখে শেষ করার প্রক্রিয়া চলে ১২০০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত ; অর্থাৎ ১০০০ বছর ধরে এইসব সংযােজন ও রূপান্তর করা হয়েছে ব্রাহ্মণদের প্রয়ােজনের তাগিদ মেটাতে ! তবে বাংলায় এই গ্রন্থগুলি লেখা হয় ১৮০০ সালের মাঝামাঝি সময়ে । 

বেদান্ত নিয়ে আলােচনা ও ব্যাখ্যা দান করেছেন পাঁচজন বিদ্বান বা আচার্য । তারা হলেন শংকরাচার্য ( ৭৮৮-৮২০ খ্রীষ্টাব্দ ) , রামানুজ  (১০১৭-১১৩৭ খ্রীষ্টাব্দ ) , নিম্বাকাচার্য – ( জন্ম জানা যায় না , মৃত্যু ১১৬২ খ্রীষ্টাব্দ ) , মাধবাচার্য ( ১১৯৭ – ১২৭৬ খ্রীষ্টাব্দ ) এবং বল্লভাচার্য ( জন্ম ১৪১৭ খ্রীষ্টাব্দ) । তার অর্থ বেদান্ত নিয়ে নানা ব্যাখ্যা , বিচার - বিশ্লেষণ এবং নীতি - নিয়ম - নির্দেশ জারি হয়েছে ৭০০ বছর ধরে । স্বাভাবিকভাবেই প্রয়ােজনের দাবি মেনে ও ব্রাহ্মণের সুবিধার কথা ভেবে বেদান্তের ব্যাখ্যা করা হয়েছে । বৌদ্ধ দর্শন ও ইসলামিক দর্শনেরও মােকাবিলার কথা তাদের ভাবতে হয়েছে । ব্রাহ্মণ রাজত্বে শুধু দর্শনের ক্ষেত্রে বৌদ্ধধর্মের বিরােধিতা করা হয়নি । বৌদ্ধ ভিক্ষুদের পাইকারি হারে খুনও করা হয় । বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের খুন করার জন্য মাথাপিছু ১০০ স্বর্ণ খণ্ড পুরস্কারও ঘােষণা করা হয় । এইসব আচার্যবৃন্দ এইসব ব্যাখ্যায় আলােচনা করেছে আত্মা , ঈশ্বর ইত্যাদি সব অদৃশ্য ও অস্তিত্বহীন বিষয়াদি নিয়ে এবং কঠিন বাস্তবের জগৎকে উল্লেখ করেছেন ‘মায়া ' বলে । বেদান্তসূত্রের বহু সংকলন , তাই , নির্দিষ্ট করে কবে তার রচনাকাল তা বলা সম্ভব হয়নি । তবে মােটামুটিভাবে বলা হয়েছে যে , ২০০ থেকে ৪৫০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে এই গ্রন্থ রচিত । 

মহাভারতে রামায়ণ সম্পর্কে উল্লেখ আছে । তাতে বােঝা যায় রামায়ণের মূল অংশ রচিত হয় মহাভারতের আগে অথবা সমসাময়িককালে , পরে নয়। মহাভারতে বাল্মীকি রামায়ণের উল্লেখ থাকায় বলা যায় যে , বাল্মিকী রামায়ণ আদি রামায়ণ । রামায়ণেরও তিনটি সংস্করণ হয়েছে । মূল রামায়ণে ছিল রামের স্ত্রী সীতাকে অপরহরণ সূত্রে রাম - রাবণের যুদ্ধ কাহিনী । দ্বিতীয় সংস্করণে নানা ধর্মোপদেশ , অর্থাৎ ঐতিহাসিক কাহিনী হয়ে যায় নৈতিক , ধর্মীয় ও সামাজিক আচারের নির্দেশিকা । তৃতীয় সংস্করণে রামায়ণ পূর্ণ হয় জ্ঞান , দর্শন , কলা প্রভৃতি নানা উপাখ্যানের ভাণ্ডার দিয়ে । রামায়ণে শম্বুক কাণ্ড , মহাভারতে একলব্যের মত উপাখ্যানগুলি আসলে সাধারণ মানুষকে সন্ত্রস্ত করা , অর্থাৎ ভয় দিয়ে বশ্যতা স্বীকার করানাের কৌশল । ধর্মের নামে শত শত বছর ধরে নিজেদের স্বার্থে ব্রাহ্মণরা এইসব নব নব নীতি - নির্দেশ উদ্ভাবনের মাধ্যমে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম রেখেছে । 

সন্দেহ করার কোন অবকাশ নেই যে , পুরাণ ছিল মাত্র একটি এবং তা বেদের থেকেও পুরনাে । সেই পুরাণ এখন ১৮ টি । পুরাণ হলাে লােককাহিনী , ইতিহাস নয় , কিন্তু তাতে আছে ইতিহাসের রসদ । প্রাচীনযুগে শিক্ষিত মানুষের মধ্যে দু'টি শ্রেণী ছিল – একদল ব্রাহ্মণ , অন্যরা অব্রাহ্মণ বা সূত বলে পরিচিত ছিল । উভয়ে পৃথক সাহিত্য শাখার কর্তা ছিল । তাদের মধ্যে সমঝােতা অনুযায়ী পুরাণ রচনা বা পুরাণ আবৃত্তি করা ব্রাহ্মণদের কাজ ছিল না , সে অধিকার ছিল সূতদের । প্রাচীন পুরাণ সূতদের রচিত । 

শুরুতে পুরাণের বিষয়বস্তু ছিল - বিশ্বের সৃষ্টি ও ধ্বংস সংক্রান্ত আলােচনা ও বিষয়াবলী , এখানে মনুর উল্লেখ আছে । তাছাড়া বংশ , মন্বন্তর , ও রাজবংশের কুল – এসব এই গ্রন্থের মধ্যে স্থান পায় । পরবর্তীকালে ব্রাহ্মণরা সূতদের অধিকারচ্যুত করে নিজেদের মতাে করে পুরাণ রচনা করে । রচনার অধিকার ব্রাহ্মণরা করায়ত্ত করার পর পুরাণের আমূল পুণর্বিন্যাস ও সংশােধন করা হয় এবং নতুন বিষয়াদি তাতে অন্তর্ভূক্ত করা হয় । পুরাণে নতুন যা কিছু ঢােকানাে হয়েছে , তাহলাে — জাতিধর্ম বিষয় অর্থাৎ বর্ণাশ্রম , আচার , আহ্নিক , ভাষাভাষ্য , বিবাহ , অশৌচ , শ্রাদ্ধ , দ্রব্যশুদ্ধি , পাতক , প্রায়শ্চিত্ত , নরক , কর্মবিপাক, যুগধর্ম ইত্যাদি বিষয় । এছাড়াও ব্রতধর্ম , অর্থাৎ পবিত্র শপথ , পূণ্যদিন পালন ইত্যাদি । ক্ষেত্রধর্ম অর্থাৎ তীর্থ যাত্রা, দানধর্ম – এসব বিষয়াদি । 

আরও দু'টি বিষয়ের উপর পুরাণগুলি জোর দিয়েছে , তাহলো উপাসনা । পুরাণগুলি বিশেষ বিশেষ দেবতার ধারক বাহক এবং বিশেষ গােষ্ঠী দেবতার প্রচার করেছে । পাঁচটি পুরাণে আছে বিষ্ণুর উপাসনা , আটটি পুরাণে শিবের উপাসনা , একটি পুরাণে ব্রহ্মা উপাসনা , একটি পুরাণে সূর্য উপাসনা , দুইটিতে দেবীর উপাসনা এবং একটিতে জ্ঞানের উপাসনার কথা বলা হয়েছে । আর আছে ঈশ্বরের অবতারদের ইতিহাস ইত্যাদি । ২০০ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১৫০০ খ্রীষ্টাব্দ ; অর্থাৎ ১৩০০ বছর ধরে এইসব পুরাণগুলি লেখা হয় । 

হিন্দু ধর্মশাস্ত্র এবং জাত - ধর্ম সম্পর্কে যতটুকু ও যাকিছু আমার বােধগম্য হয়েছে , তা এখানে লিখেছি ; কিন্তু যা একেবারে আমার বােধের অতীত , তাহলাে , আজ এই ধর্ম রক্ষার জন্য চণ্ডালদেরও জীবন পণ লড়াই , এই ধর্মের জন্য শুভ কামনা ! 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

তৃণমূল নেত্রী ফের সংসদে

যদা যদা হি ধর্মস্য... গীতার এই শ্লোকে ঠিক কী বলা হয়েছে?

ভাতে কেরোসিন যাত্রাপুরে, অভিযোগ বাংলাদেশী