ভদ্রলোকশ্রেণী.....২

                     তৃতীয় অধ্যায় 
       বাঙলায় মুসলিম রাজনীতির সূচনা



 মুসলিম লীগের জন্ম হয় ১৯০৬ সালে । পূর্ববঙ্গের ঢাকায় মুসলিম লীগ ভূমিষ্ঠ হয় । ভারতের অন্যকোন প্রান্তে বা প্রদেশে মুসলিম লীগের জন্ম না হয়ে , বাঙলায় কেন তা জন্মলাভ করলাে –এ প্রশ্ন মানুষের মনে উঁকি মারতে পারে । নিশ্চিতভাবে এ ঘটনার একটি কারণ হলাে , এই অঞ্চলে মুসলমান মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা--- যা দলের সাফল্যের জন্য খুবই প্রয়ােজনীয় । কিন্তু এই কারণটি মূল কারণ ছিল না । মূল কারণ হলাে – মুসলমানদের প্রতি বাঙলার উচ্চবর্ণহিন্দুর তীব্র ঘৃণা , বিমাতৃসুলভ ব্যবহার , বঞ্চনা , শােষণ ও অত্যাচার । মুসলমানদের প্রতি উচ্চবর্ণহিন্দুর ঘৃণা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এত প্রকট ছিল না । তারা দেখেন, বাঙলার জমিদারশ্রেণী ও ভদ্রলােকশ্রেণীর এই অনাচার ও অত্যাচারকে কংগ্রেস দলটি সংগঠিতভাবে সমর্থন ও নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসছে । ১৮৮৫ সাল থেকে মুসলমানরা কংগ্রেসের এই ভূমিকা লক্ষ্য করেন এবং বিতৃষ্ণায় তাদের মন তিক্ত হয়ে ওঠে । বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলন ও স্বদেশী আন্দোলনে কংগ্রেস দলের ভূমিকায় মুসলমানদের মােহমুক্তি ঘটে এবং কংগ্রেস দল ত্যাগ করে মুসলিম লীগ গঠন করেন । একটা কথা মনে রাখা প্রয়ােজন যে , এই সময়কালে কংগ্রেস দল পরিচালনা করতেন মূলত : বাঙালি নেতৃবৃন্দ এবং দেশের রাজধানী ছিল কলকাতা । 

বাঙলার শিক্ষিত ভদ্রলােকশ্রেণীর মানসিক গঠন সম্পর্কেও একটা ধারণা থাকা দরকার । যেমন ধরা যাক অরবিন্দ ঘােষ । তিনি ৭ বছর বয়সে ইংল্যান্ডে পাড়ি দেন এবং লন্ডন ও কেমব্রিজে পড়াশুনা করেন । দেশে ফিরে তিনি যে 'রাজনৈতিক বেদান্ত দর্শন ’ প্রচার করেন, তাতে জাতীয় পরিচিতির সাথে দেবী কালিমাতাকে যুক্ত করেন । ব্রাহ্ম সমাজের দুই স্তম্ভ বিপিনচন্দ্র পাল ও সরলাদেবী জাতীয় কর্মসূচীতে কালীপূজা ও শিবাজী উৎসব অন্তর্ভূক্ত করেন । চিত্তরঞ্জন দাশ বৈষ্ণব মতে প্রভাবিত ছিলেন । সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন রামকৃষ্ণ - বিবেকানন্দের একান্ত 
                               (88)


ভক্ত । এইসব শিক্ষিতশ্রেণী একইসাথে ছিলেন আধুনিক এবং ধর্মীয় গোঁড়ামীর ককটেল । তাদের বাহ্যিক আচার - আচরণ , কথাবার্তা ও বেশভূষার সাথে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন এবং নীতিবােধের প্রায় কোন মিলই ছিল না । এই মিশ্র অনুভূতি তাদের রাজনৈতিক দর্শনের ক্ষেত্রেও দেখা যায় । সেখানে ইউরােপের কারিগরি দক্ষতা ও রাজনৈতিক সাফল্যকে গ্রহণ করা হলেও ; 'হিন্দু আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের মহত্ত্বের' নামে যাবতীয় কুসংস্কার মেনে নেওয়া হয় । সেজন্য আশ্চর্য হবার কিছু নেই , যখন ১৮৩০ সালে উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকরা , প্রথম যে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তােলেন তার নাম দেন ‘ ধর্মসভা' । শিক্ষিতশ্রেণীর এই সংগঠনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল 'সতীদাহ' অধিকারকে রক্ষা করা । তাদের সৃষ্ট দ্বিতীয় রাজনৈতিক পার্টির নাম দেওয়া হয় 'ল্যান্ডহােল্ডার্স সােসাইটি ’ প্রভৃতি । পরবর্তীকালের স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট্র সৃষ্টির প্রয়াস আধুনিক মনে হলেও এই প্রয়াসের ভিত্তি হলাে , ভারতের সাথে হিন্দুত্বকে একাকার করে ফেলার দর্শন। দীর্ঘকালব্যাপী স্থবির হিন্দু জাতির পূণজাগরণ ও নতুন করে তাকে সবল করার প্রয়াস! এই কাজে অত্যন্ত সাবধানতার সাথে ভাষার ব্যবহার শুরু হয় এবং বাস্তবতঃ এই পর্যায়কালে ব্রিটিশ বিরােধিতা থেকে সরে গিয়ে মননে এবং মেজাজে মুসলিম বিরােধিতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয় । আজকের রাজনীতি দেখে এসবই একজন সাধারণ মানুষও বুঝতে পারেন । 

পক্ষান্তরে , মােহম্মদ আলি জিন্নাহ রাজনীতিতে যােগদান করেন ১৯০৭ সালে । তিনি মুসলিম লীগে যােগদান না করে কংগ্রেসে যােগ দেন । তিনি মুসলিম লীগে যােগদান করেন ১৯১৪ সালে ; কিন্তু একইসাথে কংগ্রেসের সদস্য পদও বহাল রাখেন । মিঃ জিন্নাহ নেতা ছিলেন মুসলিম লীগের ; কিন্তু নামাজ পড়তেন না । শুকরের মাংসও খেতেন – যা ইসলামে নিষিদ্ধ । অমুসলিম মহিলাকে বিয়ে করেন । 

অন্য এক প্রভাবশালী মুসলিম নেতা ছিলেন হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দি সাহেব । তিনিও নামাজ পড়তেন না। মদ ও শুকরের মাংস খেতেন । রাশিয়ান মহিলাকে বিয়ে করেন ।

 অর্থাৎ ব্যক্তি জীবনে তাদের কোন ধর্মীয় গোঁড়ামী ছিল না । সােহরাওয়ার্দি বাংলার সবচেয়ে শিক্ষিত পরিবারগুলির একটিতে জন্মগ্রহণ করেন । তার মামা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম উপাচার্য । আরেক মামা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং তার বাবা এবং দাদা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন । নিজেও লন্ডনের কেম্ব্রিজে পড়া উচ্চ শিক্ষিত মানুষ ছিলেন । 

বাঙলায় মুসলিম লীগের জন্ম হলেও , কংগ্রেসের মতই ধীরে ধীরে মুসলিম লীগের নেতৃত্ব চলে যায় পশ্চিমে – আদমজী , বাওয়ানী , ইস্পাহানী প্রভৃতি শিল্পপতি 
                                    (৪৫)

বুর্জোয়া - ব্যবসায়িদের পছন্দের প্রতিনিধিদের হাতে । কংগ্রেসের নেতৃত্বও জমিদার ভদ্রলােকশ্রেণীর হাত থেকে গােয়েঙ্কা , বিড়লা , টাটা প্রভৃতি হিন্দু - পারসী প্রভৃতি শিল্পপতি ব্যবসায়িদের কব্জায় চলে যায় এবং নবাব , রাজা , মহারাজা , জমিদারদের সাথে তারা ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নেয় । 

বাঙালী মুসলমানদের রাজনীতিতে দু’টি ধারার সৃষ্টি , বিকাশ ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলে । একটা মুসলমান জমিদারশ্রেণীর স্বার্থ ও সুবিধার জন্য সংগঠন মুসলিম লীগ – যা তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল । অন্য অংশ জোতদার ও ধনী কৃষক এবং মুসলমান শিক্ষিতশ্রেণীর স্বার্থরক্ষাকারি সংগঠন কৃষক প্রজা পাটি । যারসঙ্গে বাঙলার প্রজা কৃষক , হিন্দু ও মুসলমান--- উভয় অংশের সাধারণ কৃষকরাও যুক্ত হন । যে দলের নেতৃত্ব দেন এ কে ফজলুল হক । 

ফজলুল হক সাহেব পূর্ব বাঙলার বরিশাল জেলার মানুষ । খাঁটি বাঙাল । আইন পাশ করার পর জেলা শহরে তিনি ওকালতি শুরু করেন । এই সময়ে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর বাবা স্যার আশুতােষ মুখার্জীর সাথে তার পরিচয় হয় । মনেহয় পরবর্তীকালে শ্যামা - হক মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে তার এই পূর্ব পরিচয় কাজ দেয় । ওকালতি করার সময়েই রাজনীতির সাথে যােগাযােগ হয় । তরুণ বয়সে ১৯০৬ সালে যখন মুসলিম লীগ গঠিত হয় , সেই সভায় তিনি অংশগ্রহণ করেন । এর আগে তিনি মুসলিম এডুকেশনাল কনফারেন্স ( রাজনৈতিক সংগঠন ) -এর সাথেও যুক্ত ছিলেন । পরে তিনি সরকারি চাকরিতে যােগ দেন ; কিন্তু ১৯১২ সালে চাকরি ছেড়ে পুরােপুরি রাজনীতিতে মনােনিবেশ করেন । এই সময়ে মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসাবে ঢাকা থেকে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন । এই কেন্দ্র ছিল উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণীর একটি শক্ত ঘাঁটী এবং এখান থেকে তিনি প্রথমবারের মত একজন মুসলমান প্রতিনিধি নির্বাচিত হন । 

১৯১৬ সালে লক্ষ্মেী চুক্তিতে তিনি স্বাক্ষর করেন এবং ১৯১৭ সালে কংগ্রেস ও সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের যৌথ অধিবেশনে তিনি সভাপতিত্ব করেন । বাঙলার মুসলমান সমাজের জনপ্রিয় যুবনেতা হিসাবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন ।

 ১৯২৮ সালে ' বেঙ্গল টিনান্সি এ্যাক্ট' পাশ হবার পর জোতদার , প্রজাকৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে ‘কৃষক প্রজা পার্টি' তৈরি হয় । বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের কয়েকজন সদস্য মিলিতভাবে এই পাটি তৈরি করেন । এই কাজে বিশেষ ভূমিকা নেন ফজলুল হক । তিনি পাটির তরফে লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের নেতা নির্বাচিত হন । তমিজউদ্দিন খান পার্টির সচিব হন । এই পার্টিকে এবং লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের প্রতিনিধিদের বাইরে থেকে                                      (৪৬)

সমর্থন ও শক্তি জোগাবার জন্য ১৯২৯ সালে নিখিলবঙ্গ প্রজা সমিতি গঠন করা হয়।

মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত মওলানা আকরম খাঁ ছিলেন বাঙলার বিশেষ পণ্ডিত ব্যক্তি । উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুর অঞ্চলের মানুষ ছিলেন তিনি । সমসাময়িক রাজনীতিতে তার বিশেষ ভূমিকা ছিল । তিনি জনপ্রিয় মােহাম্মদী পত্রিকা , আজাদ পত্রিকাসহ অন্যান্য পত্রিকা প্রকাশ করেন । ইংরেজদের বিরােধিতা করার জন্য ১৯২২ সালে তাকে জেলে আটক রাখা হয়।

'প্রগ্রেসিভ বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল মহমেডান এ্যাসােশিয়েশন' গঠিত হয় ১৯০৫ সালে । আকরম খাঁ এই উদ্যোগে সামিল ছিলেন । কৃষক প্রজা পার্টিকে বাইরে থেকে সমর্থন ও সহযােগিতা করার জন্য যে “নিখিলবঙ্গ প্রজা সমিতি" তৈরি হয় , তার প্রথম সচিব নির্বাচিত হন আকরম খাঁ এবং কয়েকজন সহ - সভাপতির একজন সহ-সভাপতি হন ফজলুল হক । ত্রিশের দশকে কৃষি সম্পর্কিত বিষয়াদি নিয়ে কৃষকদের পক্ষে এই সমিতি উল্লেখযােগ্য ভূমিকা রাখতে সমর্থ হয়। পূর্ববঙ্গের নানা প্রান্তে কৃষকদের প্রায় সব সমিতিগুলিকে এই প্রজা সমিতি ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয় । প্রায় সর্বদলীয় প্রতিষ্ঠান ছিল এই প্রজা সমিতি ।
কংগ্রেস , অকংগ্রেসী , সরকার ঘেষা ও সরকার বিরােধী সব দলের মুসলমান নেতা-কর্মিদের সমাবেশ ছিল এই প্রজা সমিতি।

 ১৯৩২ সালে সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ ’ ঘােষণা করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ম্যাকডােনাল্ড । যাতে নির্বাচন পদ্ধতি , আসন সংখ্যা ও সংরক্ষণ , পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা ইত্যাদি ঘােষিত হয় । পরে ঐ বছরেই পুনাচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় । এরপর ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইন পাশ হয় । এ সবের ফলে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে যায় এবং সমস্ত মুসলমান নেতৃবৃন্দের আকর্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয় এই 'নিখিলবঙ্গ প্রজা সমিতি ' ।

 ১৯৩৫ সালেই সমিতির প্রেসিডেন্টের পদটি খালি হয় । সব গ্রুপের নেতারাই ঐ পদটি দখল করার জন্য সক্রিয় হয়ে ওঠেন । মওলানা আকরম খাঁর গ্রুপকে সহায়তা করেন কলকাতার প্রভাবশালী নেতা হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দি ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ । ফজলুল হকের গ্রুপে ছিলেন তুলনামূলক প্রগতিশীল ও শিক্ষিত যুবক নেতৃবৃন্দ — যার এক বড় অংশ ছিলেন কংগ্রেস সমর্থক। এই দ্বন্দ্বের ফলে সমিতি দু'ভাগ হয়ে যায় । ফজলুল হক নিজের গ্রুপের নামকরণ করলেন 'কৃষক প্রজা পাটি' এবং 'নিখিলবঙ্গ প্রজা সমিতির' নেতৃত্ব দিলেন মওলানা আকরম খাঁ । কিন্তু মওলানা সাহেব আর এই সমিতিকে ধরে রাখতে সক্ষম হলেন না । ১৯৩৬ সালে                                      (৪৭)

এই সমিতি ইউনাইটেড মুসলিম পার্টিতে যােগদান করে বিলীন হয়ে যায়।

 ‘কৃষক প্রজা পাটি’ ক্ষতিপূরণ ছাড়াই জমিদারিপ্রথা বিলােপ করার দাবি তােলে । খাজনা মাফ ও ঋণ রােহিত করার দাবি জানায় । জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে  জমিদারদের অগ্রাধিকারের নীতির বিরােধিতা করে, আবওয়াব ও নজরসালামিসহ অন্যান্য স্থানীয় করের বিলােপ এবং ঋণ সালিশী বাের্ড গঠনের দাবি জানায় । প্রজাস্বত্ব আইন , মালিকানা স্বত্ব , সুদের হার ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মত বিষয়গুলির বিরুদ্ধে আইনসভায় কৃষক প্রজা পার্টি ও অন্যান্য দলের মুসলমান কাউন্সিল সদস্যরা একযােগে সংঘবদ্ধ আক্রমণ চালাতে থাকেন । কৃষক প্রজা পার্টি  'চাষী' নাম দিয়ে একটি সাময়িক পত্রিকা প্রকাশ করে । এই পত্রিকা নেতৃবৃন্দের কাজ ও প্রয়াসের খবর গ্রাম বাঙলার কোণে কোণে পৌঁছে দেয় । 

অবস্থাপন্ন কৃষক ও জোতদার , মধ্যবিত্ত মুসলমান , ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী , কেরানী ও সামান্য জমির মালিক এবং হিন্দু-মুসলমান সাধারণ প্রজা কৃষকদের এক বড় অংশ , জমিদার ও সুদখােরদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এই আক্রমণ ও আন্দোলনের ফলে ঐক্যবদ্ধ হন । এই পরিস্থিতিতে জমিদারি পদ্ধতির সুবিধাভােগীরা ; যারা প্রধানতঃ ছিলেন উচ্চবর্ণহিন্দু — তারাও পাল্টা জোটবদ্ধ হতে বাধ্য হন । তারা কৃষকদের সাধারণ দাবি-দাওয়ার আন্দোলনকে সাম্প্রদায়িক রঙে রাঙিয়ে প্রচারের মাধ্যমে আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে থাকেন । 

কিন্তু এই আন্দোলনে নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদের মধ্যকার প্রজা কৃষক , অবস্থাপন্ন কৃষক ও জোতদাররা যােগদান করেন । কৃষক প্রজা পার্টিও মুসলমান জমিদারদের বিরুদ্ধে একইরকম সরব ছিলেন । ফলে ভদ্রলােকশ্রেণীর অপপ্রচার খুব কার্যকরী হয় না ।

 ফজলুল হক সাহেব ঢাকার নবাব খাজা নাজিমুদ্দিন এবং জমিদার মহিউদ্দিন ফারুকির বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচারণায় সরকারি অর্থ ব্যয় এবং গরিবদের স্বার্থ উপেক্ষা করার অভিযােগ এনে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন । 

ঢাকার নবাব , মহিউদ্দিন ফারুকি ও অন্যান্য কিছু মুসলমান জমিদারদেরও বড় বড় জমিদারি বিভিন্ন জেলায় বিস্তৃত ছিল । কৃষক প্রজা পাটি তাদের বিরুদ্ধেও তীব্র ভাষায় আক্রমণ করতাে । এই পার্টির কর্মসূচি ও কাজের পদ্ধতি ধর্মভিত্তিক ছিল না । কিন্তু হিন্দু জমিদারশ্রেণী মুসলমানদের নেতৃত্বে এই আন্দোলনকে সাম্প্রদায়িক ক্রিয়াকলাপ বলে প্রচার করতাে । এই সময়ে ১৯২৮ সালে যশাের জেলার নড়াইলে এক বড় হিন্দু জমিদারের বিরুদ্ধে মুসলমান এবং নমঃশূদ্র বর্গাদাররা তেভাগার দাবিতে আন্দোলন শুরু করলে বাঙলার কংগ্রেস
                                    (৪৮)


ঘটনাটিকে নেহাতই সাম্প্রদায়িক ঘটনা বলে প্রচার করে। জমিদার হিন্দু এবং প্রজা মুসলমান হলে জমিদার ও প্রজাদের যে কোন বিরােধকে সাম্প্রদায়িক রঙে রঞ্জিত করা হতে থাকে । এ ধরনের বহু ঘটনা ঘটে । ঐ সময়ে মুসলমান স্বেচ্ছাসেবকেরা একটি ছাপানাে ঘােষণাপত্র বিলি করেন – যার মূল বক্তব্য হলাে , কৃষকেরা দেশ ও দেশের সম্পদের মালিক না হওয়া পর্যন্ত শান্তি আসবে না । ' – এরফলে স্থানীয় উচ্চবর্ণ হিন্দু ও ভদ্রলােকেরা যারপর নাই উত্তেজিত হন । 

কৃষক প্রজা পার্টির উত্থানে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অবস্থা সঙ্গীন হয়ে পড়ে । এ অবস্থায় তরুণ যুবক হাসান ইস্পাহানী ও অন্যান্যদের উদ্যোগে ১৯৩২ সালে কলকাতায় ‘ নিউ মুসলিম মজলিশ ’ নামে এক পার্টি তৈরি হয় । ইস্পাহানীরা ধনী ব্যবসায়ী । হাসান ইস্পাহানী কেমব্রিজে পড়া উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন এবং কলকাতা কর্পোরেশনের সদস্যও নির্বাচিত হন ।

 এই রাজনৈতিক টানাপােড়েনের মধ্যে ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইন প্রবর্তিত হবার পর প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘােষণা হয় । ঢাকার নবাব হবিবুল্লাহর উদ্যোগে ১৯৩৬ সালে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচীর ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য একটি নতুন মুসলমান পার্টি গঠন করার সিদ্ধান্ত হয় । প্রাদেশিক মুসলিম লীগের বিকল্প হিসাবে এই দল গঠন করার সিদ্ধান্ত হয় । নবাবের কলকাতার বাড়িতে অনুষ্ঠিত সভায় ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি গঠিত হয় । দলের প্রেসিডেন্ট হন নবাব সাহেব নিজে । ভাইস প্রেসিডেন্ট হন জলপাইগুড়ি জেলার অন্য নবাব মােশাররফ হােসেন । সেক্রেটারি করা হয় হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দিকে এবং কোষাধ্যক্ষ হন হাসান ইস্পাহানী। প্রকৃতপক্ষে এই দলের মাধ্যমে বাঙলার অধিকাংশ ক্ষমতাশালী ও বিখ্যাত মুসলমান পরিবারগুলির মধ্যে এক ঐক্য গড়ে তােলা হয় । 

 উচ্চশিক্ষিত হােসেন সােহরাওয়ার্দি খেলাফত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে আসেন । হাসান ইস্পাহানীও তাই । খেলাফত আন্দোলনে মহাত্মা গান্ধীরও সমর্থন ও অংশগ্রহণ ছিল । ১৯২৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে বাংলা চুক্তি হয় । এই চুক্তি সম্পাদনের পর সােহরাওয়ার্দি দেশবন্ধুর স্বরাজ্য পাটিতে যােগদান করেন এবং কলকাতা কর্পোরেশনের ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হন । ১৯২৫ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পর এবং ১৯২৬ সালে কলকাতা দাঙ্গার পর তিনি স্বরাজ্য পার্টির সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেন । তিনি কলকাতায় শ্রমিকদের সংগঠিত করেন এবং অনেকগুলি ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন গড়ে তােলেন । 

ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি ’ মূলতঃ শহরবাসী বড়লােক ও জমিদারদের সৃষ্টি করা পার্টি । এই সময়ে মওলানা আকরম খাঁ তার নিখিলবঙ্গ প্রজা সমিতি 
                                (৪৯)


নিয়ে এই পার্টিতে যােগদান করেন । ফলে গ্রামেও ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির ভিত্তি সম্প্রসারিত হবার সুযােগ সৃষ্টি হয় । 

১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রাক্কালে ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির তরফে ফজলুল হক সাহেবের কাছে প্রস্তাব পাঠানাে হয় । প্রস্তাবে বলা হয় – সবাই মিলে যেন ইউনাইটেড পার্টির টিকিটে নির্বাচনী লড়াই করা হয়। এই পার্টির হয়ে নির্বাচনে লড়াই করার জন্য টাকার সমস্যা ছিল না । কিন্তু ফজলুল হক তাতে রাজি হননি । নিজের শক্তিতে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি এবং নবাবদের প্রভাবিত জেলাগুলিতে প্রচারে জোর দেন । এই নির্বাচনী লড়াইকে তিনি জমিদারদের সাথে কৃষকদের সর্বাত্বক সংগ্রাম হিসাবে আখ্যায়িত করেন ।

 ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি ’ বিপাকে পড়ে ইস্পাহানীর মাধ্যমে মােহম্মদ আলি জিন্নাহর সাথে যােগাযােগ করেন। ১৯৩৬ সালের আগস্ট মাসে জিন্নাহ বাঙলায় আসেন । বাঙলায় মুসলিম লীগের নেতৃত্ব সম্পদশালী ও পরিচিত মুসলিম পরিবারগুলির হাতে থাকবে , এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ইউনাইটেড মুসলিম পার্টিকে মুসলিম লীগের সাথে মিশিয়ে দেবার পরামর্শ দেন । এভাবে বাঙলায় জিন্নাহ মুসলিম লীগকে ফের পুনর্গঠিত করেন ।

 কংগ্রেস দলটি ছিল চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে সুবিধাপ্রাপ্ত জমি মালিক এবং ঐ বন্দোবস্তের জন্য সুবিধাপ্রাপ্ত লােকজনের সমষ্টিকে নিয়ে । স্কুলশিক্ষক , কর্মচারী , উকিল এবং ছাত্ররা কংগ্রেস দলের সাথে ছিলেন । — যারা জমিদার , নায়েব , গােমস্তা ও তাদের আত্মীয়স্বজন পরিবারগুলি থেকে এসেছিলেন । বাঙলায় কংগ্রেস দলটি ছিল মূলতঃ এইসব ভদ্রলােকদের পার্টি । চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পর বেঙ্গল কংগ্রেসে দলাদলি বেড়ে যায় এবং ত্রিশের দশকের শুরু থেকে দলটি শহর ভিত্তিক দলে পরিণত হয় । গ্রাম - বাংলায় কৃষক প্রজা পার্টির দাপটও কংগ্রেসকে কোণঠাসা করে দেয় । তবে ভূমি সম্পর্কিত স্বার্থের সাথে এই দলের সম্পর্ক বর্তমান ছিল । দলের অধিকাংশ নেতা-কর্মীরা ছিলেন অনুপস্থিত ছােট-বড় জমিদার । মফঃস্বল এলাকায় তাদের অনেক এস্টেট ছিল এবং সেখান থেকে খাজনা আদায়ের স্বার্থ ছিল তাদের – যদিও তারা বসবাস করতেন শহরাঞ্চলে । কংগ্রেস দলটি চলতাে এইসব জমির মালিক ও সুদখাের ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপােষকতায় । কংগ্রেস দলটির এই নির্ভরশীলতার জন্য দলটি রক্ষণশীলতা ও প্রতিক্রিয়াশীল ধ্যানধারণার বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেনি । 

বৃটিশ শাসনের শেষ অর্ধশত বছর বাঙলার রাজনীতিতে সাধারণভাবে মুসলমানদের দাবি ও ভূমিকা ছিল ন্যায্য এবং গণতান্ত্রিক । প্রজা কৃষক হিসাবে 
                                 (৫০)


সমস্বার্থে দলিত হিন্দুদের একাংশ সে কারণেই মুসলমানদের সাথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে সামিল হন ।

 বাঙলার মুসলমানদের মধ্যে যেমন কৃষক প্রজা পার্টির তুলনামূলক প্রগতিশীল ভূমিকার সাথে মুসলিম লীগের দ্বন্দ্ব সংঘাত চলতে থাকে । তেমনি অন্যদিকে হিন্দুদের মধ্যেও দুই রাজনৈতিক শক্তির টানাপােড়েন বিদ্যমান ছিল । একটি কংগ্রেসের নেতৃত্বে রক্ষণশীল-প্রতিক্রিয়াশীল ধারা এবং অন্যটি তুলনায় আরও বেশি কট্টর সাম্প্রদায়িক-প্রতিক্রিয়াশীল পাটি হিন্দু মহাসভা । হিন্দু ভােটারদের মন জয় করার প্রতিযােগিতায় কংগ্রেস ক্রমেই বেশি হিন্দুত্ববাদী অবস্থান গ্রহণ করে এবং বেশি বেশি সাম্প্রদায়িকতার পাঁকে ডুবতে থাকে । তাদের অধঃপতনের ইতিহাস নিয়ে এই প্রবন্ধে আমরা পরে আলােচনা করবাে । 

দলিত বা তফসিলীশ্রেণীর মধ্যে অপর একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ধারা কাজ শুরু করে গুরুচাঁদ ঠাকুরের সময়কাল থেকে । বিশেষ করে ১৯২৩ সালকে চিহ্নিত করা যায় , যখন গুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে খুলনায় নমঃশূদ্রদের এক বিশাল রাজনৈতিক সম্মেলন হয় । এই সম্মেলনের ফসল মহাপ্রাণ যােগেন্দ্রনাথ মণ্ডল , মুকুন্দবিহারি মল্লিক , নিরােদবিহারি মল্লিক , ভীষ্মদেব দাস , রসিকলাল বিশ্বাস , প্রমথরঞ্জন ঠাকুর প্রমুখ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উত্থান । বাংলার রাজনীতিতে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন ঠিকই ; তবে নানা বাস্তব প্রতিবন্ধকতার জন্য এই ধারা খুব শক্তিশালী রাজনৈতিক ছাপ ফেলতে পারেনি ।
                                 (৫১)

                        চতুর্থ অধ্যায়
        অস্পৃশ্য ও আদিবাসীদের হিন্দুকরণ


 ভারতবর্ষে প্রথম জনগণনার কাজ শুরু হয় ১৮৯১ সালে । জনগণনায় অস্পৃশ্যশ্ৰেণীকে হিন্দু হিসাবে গণনা না করে অস্পৃশ্য হিসাবে আলাদা গণনা করা হতে থাকে। কিন্তু অস্পৃশ্যদের দাবি ছিল যে , তারা সম্মানীয় হিন্দু , বিশেষ করে চণ্ডালরা ( নমঃশূদ্র ) এই দাবি করেন। কিন্তু তাঁদের সে দাবি স্বীকার করা হয় না মূলতঃ উচ্চবর্ণহিন্দুদের আপত্তির কারণে । 

এই জনগণনা শুরু হবার ২১ বছর আগের একটি ঘটনার কথা বহুল প্রচারিত । ১৮৭০ সালে পূর্ববঙ্গের একজন চণ্ডাল মাতব্বরের বাড়িতে উচ্চবর্ণহিন্দুরা খাওয়ার নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন । তাদের দাবি – হিন্দু শাস্ত্রীয় নির্দেশ অনুসারে একজন চণ্ডাল এ আশা করতে পারে না । অর্থাৎ উচ্চবর্ণহিন্দুরা একজন চণ্ডালের বাড়িতে নিমন্ত্রণরক্ষা করবেন , এ আশা কোন চণ্ডাল করতে পারে না । উচ্চবর্ণহিন্দুদের এই সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক ও অন্যায় ঘােষণা করে চণ্ডালরা তাদের সাথে সবরকম সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা ঘােষণা করেন।

চণ্ডালরা ব্রাহ্মণ মর্যাদার দাবিতে দীর্ঘ সংগ্রাম করেন । পৈতাপরা শুরু করেন । সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করেন । উচ্চবর্ণহিন্দুদের মাঠে কাজ করা , চাষ করা , ঘর ছাওয়া--- সব কিছুই বয়কট করেন । চণ্ডাল মহিলাদের হাটবাজারে যাওয়া বন্ধ করেন । ১৮৭৩ সাল পর্যন্ত এই আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয় ।

 ফরিদপুরের পুলিশ সুপার ১৮৭৩ সালের ১৮ ই মার্চ লেখেন , “ চণ্ডালদের প্রচেষ্টা হিন্দুদের মধ্যে সামাজিক মাপে নিজেদের উন্নীত করা "।  ঐ বছরের ৮ এপ্রিল ফরিদপুরের জেলাশাসক ঢাকা বিভাগের কমিশনারকে লেখেন , “মাঠগুলি অনাবাদী পড়ে আছে , ঘরগুলি ছাওয়া হয়নি । আর কোন চণ্ডালদের দেখা যায় না হিন্দু বা মুসলমানদের কাজে অথবা বাজারে কোন চণ্ডাল নারীকে দেখা যায় না "। 

যশাের জেলার মনিরামপুর , অভয়নগর , কেশবপুর থানা এবং খুলনা জেলার
                                (৫২)


ডুমুরিয়া , ফুলতলা থানার অন্তর্গত বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মধ্যকার ৯৬ টি গ্রামের সমষ্টি হলো ছিয়ানব্বই গ্রাম । একচেটিয়া নমঃশূদ্রদের বাস । কেন্দ্রস্থল হলাে মশিয়াহাটী । এই অঞ্চলের প্রখ্যাত মাতব্বর রাইচরণ মহালদার ১৯০৫-০৭ সময়কালে নির্দেশ দেন :

১)ব্রাহ্মণ ভিন্ন অন্য কোনাে হিন্দুর গৃহে চণ্ডালরা রান্না করা খাদ্য গ্রহণ করিবে না । 

২) ব্রাহ্মণ ভিন্ন অন্য কোনাে লােক চণ্ডাল গৃহে অতিথি হইলে তাহাকে চণ্ডালদের কর্তৃক রান্না করা খাদ্য গ্রহণ করিতে হইবে ; অন্যথায় অনাহারে থাকিতে হইবে ।
 
৩) বর্ণহিন্দুর গৃহে অনুষ্ঠিত পূজা পার্বণে চণ্ডালরা যােগ দিতে পারিবে না। 
 
৪) বর্ণহিন্দু কর্তৃক প্রস্তুত মিষ্টান্ন চণ্ডালরা গ্রহণ করিবে না । 

৫) শহরের হােটেলে অসম্মানের মধ্যে তাহারা আহার করিবে না ।
 
৬) প্রয়ােজন হইলে সামাজিক সম্মান আদায়ের জন্য উচ্চবর্ণহিন্দু সমাজের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অসহযােগিতার নীতি অবলম্বন করিতে হইবে ।।
 
৭) উচ্চবর্ণহিন্দুর গৃহে কেহ ভৃত্যের কাজ করিবে না ।
 
৮)  সন্তানকে বাধ্যতামূলকভাবে স্কুলে পাঠাইতে হইবে । 

পশ্চিমবঙ্গের সমৃদ্ধ কৃষক সম্প্রদায় চাষি কৈবর্তরা মাহিষ্য নাম ও মর্যাদা দাবি করেন । প্রায় একই সময়ে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলির জমির মালিক রাজবংশী সম্প্রদায় ব্রাত্য কায়স্থ মর্যাদা দাবি করেন এবং পৈতা ধারণ শুরু করেন । নাথ সম্প্রদায়ও অধিক মর্যাদার দাবি করেন এবং পৈতা ধারণ করেন । 

উচ্চবর্ণহিন্দুরা নিম্নশ্রেণীর মানুষের এই সামাজিক মর্যাদার দাবি মানতে কোনভাবেই রাজি হননি ; বরং এর ফলে উচ্চবর্ণের মানুষ ক্রুদ্ধ হন । পরবর্তীকালে চণ্ডালরা কায়স্থ মর্যাদা দাবি করলে কায়স্থরা দৃঢ়তার সাথে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন । ফলে , চণ্ডালরা কায়স্থদের বয়কট করেন । এই সময়ে সম্ভ্রান্ত হিন্দুরা মুসলমানদের কাছ থেকে দুধ কিনতে পছন্দ করতেন ; কারণ গােয়ালাদের বৈশ্য মর্যাদার দাবি তাদের পক্ষে হজম করা কঠিন হয় । 

বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে এইসব আন্দোলনকে উচ্চবর্ণীয় হিন্দুদের কাছে অসহ্য বলে মনে হয় । স্বামী বিবেকানন্দ কিন্তু এই সময়ে বর্ণপ্রথার পক্ষে সওয়াল করেন । 

কিন্তু ধীরে ধীরে বাঙলার রাজনীতিতে মুসলমানদের উত্থানের ফলে ১৯২০ এর দশকের মাঝামাঝি থেকে কয়েকজন উচ্চবর্ণ হিন্দুনেতা হিন্দু রাজনৈতিক
                            (৫৩)


সম্প্রদায় সৃষ্টির প্রয়ােজনীয়তার গুরুত্ব অনুভব করেন । এখানে মনে রাখতে হবে যে, মহাত্মা গান্ধী ১৯১৯ সালে সক্রিয়ভাবে কংগ্রেস রাজনীতিতে যােগদান করেন ও হরিজনদের নিয়ে রাজনীতি শুরু করেন । এই হিন্দু ঐক্যের অনুভূতি উচ্চবর্গীয়দের সংসদীয় রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সংখ্যালঘিষ্ঠতার দরুণ অসহায়তা ও আশু প্রয়ােজনবােধের বহিঃপ্রকাশ । মুসলমানদের দিক থেকে আসা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মােকাবিলায় সংখ্যাভারী অস্পৃশ্য ও নীচুজাতের অন্যান্য হিন্দুদের ব্যবহার করার কৌশল । মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির আলােকে উদ্ভাসিত হয়ে তারা এই কুপ্রথা ডিঙোতে চাননি । বর্ণাশ্রমপ্রথা তারা কখনওই বিলােপ করতে চাননি । আজকে যারা হিন্দু ঐক্যের ডাক দিচ্ছেন , তারাও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার জন্যই এই ঐক্যের ডাক দিচ্ছেন । নিম্নবর্ণীয়দের ব্যবহার করাই তাদের লক্ষ্য । লক্ষ্য করার বিষয় – আজও যারা হিন্দুঐক্যের ডাক দিচ্ছেন , তারা বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে একটি কথাও বলছেন না ।

 সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে মহাত্মা গান্ধী ১৯১৯ সালে কংগ্রেসে যােগদান করে অস্পৃশ্যদের ধোঁকা দিয়ে কংগ্রেসের দিকে টেনে নেবার কৌশল নেন । ড .আম্বেদকরের অসাধারণ নেতৃত্বের ফলে তার সে প্রচেষ্টা বার বার ধাক্কা খেতে থাকে । বাংলায় অস্পৃশ্যদের সমর্থনলাভের আশায় ‘হিন্দুসভা আন্দোলন' নামে একটি সংগঠন গড়ে তােলা হয় । ১৯৩০-৩১ সালে এই আন্দোলন গড়ে ওঠে । এই সময়কালে ১৯২৫ সালে মালদার একজন কংগ্রেস নেতা কাশীশ্বর চক্রবর্তী  'সত্যম শিবম দল' গঠন করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল সাঁওতালদের হিন্দুধর্মের অন্তর্ভুক্ত করা । মালদায় যথেষ্ট সংখ্যক সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন বহু বছর ধরে । তাই , চক্রবর্তী মহাশয় তাদের হিন্দু বলে দলে টেনে সংখ্যাভারী করার চেষ্টা করেন । নমঃশূদ্রদের দলে টানার জন্য মুন্সিগঞ্জে একটি কালীমন্দিরে নমঃশূদ্রদের প্রবেশাধিকারের দাবি নিয়ে স্থানীয় কংগ্রেস স্বেচ্ছাসেবীরা সত্যাগ্রহ করেন ১৯২৯ সালে । —এসব চলতে থাকে । এই সময়কালে পূর্ববঙ্গে গুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে এবং দেশের পশ্চিমাঞ্চলে ড .আম্বেদকরের নেতৃত্বে অস্পৃশ্যদের মধ্যে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতায় অংশীদারির ভাবনা ও আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে – যা উচ্চবর্ণ হিন্দুদের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে ওঠে । পাঞ্জাব , মাদ্রাজ এবং যুক্ত প্রদেশেও এই আন্দোলন গড়ে ওঠে । 

ব্রিটিশ সরকারও এই সময়ে নিম্নশ্রেণীর দাবি ও আন্দোলনকে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের জন্য সংরক্ষিত এলাকা ও পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার কথা ভাবতে থাকে । আর মুসলমান রাজনীতিক ও ইসলাম ধর্ম প্রচারকেরাও সুযােগের সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা করেন । তারা হিন্দুধর্মের বর্ণাশ্রম প্রথা ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে নিম্নশ্রেণীর 
                              (৫৪)


হিন্দুদের উচ্চবর্ণহিন্দু রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি আনুগত্য পরিত্যাগ করতে প্ররােচিত করতে থাকে এবং ইসলামে ধর্মান্তরিত হবার জন্য তাদের কাছে আহ্বান জানাতে থাকেন । এসব চ্যালেঞ্জের মােকাবিলা করার জন্য লােকগণনায় যে বর্ণহিন্দুরা এতকাল নিম্নশ্রেণীর হিন্দুদের থেকে নিজেদের পৃথকভাবে গণনার জন্য বিশেষভাবে উৎসাহী ছিলেন , তারা ১৯৩১ সালের লােকগণনায় অস্পৃশ্যদের , হিন্দুদের মধ্যে গণনা করার জন্য উঠেপড়ে লেগে যান । 

১৯৩২ সালে সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ ঘােষণার ঠিক আগে এবং পরে বাঙলার নিম্নশ্রেণীর হিন্দুদের সংঘবদ্ধ করার জন্য আরও বিস্তৃত কর্মসূচী নেওয়া হয় । গােলটেবিল বৈঠকে যেভাবে হিন্দু , মুসলমান , শিখ , খৃষ্টান , এ্যাংলাে ইন্ডিয়ান , ইউরােপীয় এবং ড . আম্বেদকরের নেতৃত্বে অস্পৃশ্যদের জন্য সংখ্যানুপাতিক অধিকার এবং প্রতিনিধিত্বের দাবি ওঠে ; তাতে উচ্চবর্ণহিন্দুরা প্রমাদ গুণতে শুরু করেন । তাই , প্রধানতঃ ‘ হিন্দুসভা ’ এবং 'হিন্দু মহাসভা'  অস্পৃশ্য ও আদিবাসীদের হিন্দু বানানাের জন্য উঠেপড়ে লেগে যায়। উচ্চবর্ণহিন্দুরা যেসব ভাল নাম গ্রহণ করেন , ১৯৩১ সালে হিন্দু মহাসভা আদিবাসীদেরও ঐসব নাম ব্যবহারের জন্য অনুমতি দানের কথা ঘােষণা করে । বাঙলা , আসাম এবং বিহার অঞ্চলের বিভিন্ন আদিবাসী গােষ্ঠীর নাম ১৯২১ সালের লােকগণনায় হিন্দু হিসাবে উল্লেখ না করায় , হিন্দু মহাসভা প্রচারপত্রের মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ প্রচার করে এবং এই কাজকে অন্যায় হিসাবে অভিহিত করে । প্রচারপত্রে বলা হয় , “ সরল ও ধার্মিক ভ্রাতা-ভগ্নিদের প্রতি অন্যায় করা হয়েছে  এবং আশা করা হয় – ১৯৩১ সালের লােকগণনায় এই ভুল (!) সংশােধন করা হবে । তারা প্রস্তাব করে যে , ১৯৩১ সালের লােকগণনায় আদিবাসীদের ধর্ম হিন্দু এবং জাতিতে ‘ক্ষত্রিয়' হিসাবে লেখা হােক ; আর পদবী ঠিক হােক  'সিংহ' ।

 আদিবাসীদের বিভ্রান্ত করে ফাঁদে ফেলতে এইসব প্রচার কাজ দেয় । সাভারকার ৫ জন সাঁওতাল ছেলেকে মালা পরিয়ে হিন্দুধর্মে বরণ করে নেন । অমৃতবাজার পত্রিকা উৎসাহের সাথে এসব খবর প্রকাশ করতে থাকে। এযেন এক উলট পুরাণকাহিনী ।

 ১৯৪১ সালের লােক গণনার সময় আদিবাসী এবং অস্পৃশ্যদের নিয়ে দড়ি টানাটানি আরও বৃদ্ধি পায় । বাঁকুড়া জেলায় হিন্দু মহাসভা যখন সাঁওতালদের ও অন্যান্য আদিবাসীদের হিন্দুদের মধ্যে নাম লেখাতে আপ্রাণ পরিশ্রম করতে থাকে ; তখন মুসলিম লীগ তাদের আদিবাসী হিসাবে নাম রেকর্ড করাতে উৎসাহিত করে । বাঁকুড়ায় সাঁওতাল ও অন্যান্যদের হিন্দু হিসাবে নাম রেকর্ডের জন্য উৎসাহিত 
                             (৫৫)


করতে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে দিয়ে কয়েকটি জনসভায় বক্তৃতা করানাে হয় । যদিও বিশ্বযুদ্ধের কারণে শেষ পর্যন্ত এই জনগণনা হয় না।

 সাঁওতালদের ১৯৩০-৩১ সালে (ST-র বদলে) ক্ষত্রিয় বানানাে সম্ভব হলে , তাদের যে আজ আরও করুণ দশা হতাে – তা সহজেই অনুমান করা যায় । আসামের সাঁওতাল ও অন্যান্য আদিবাসীরা এখন ওবিসি তালিকাভুক্ত হয়ে খুবই অসুবিধায় পড়েছেন।

 মালদা জেলায় মুসলমান জোতদারের সংখ্যা ভালই ছিল । হিন্দুমহাসভার কর্মীরা সাঁওতাল , তুরী ও রাজবংশীদের মুসলমানদের অধীনে ও জমিতে কাজ না করার জন্য প্ররােচিত করে এবং বিরত রাখে।

 রাজশাহীতে সরস্বতী পূজা উপলক্ষে হিন্দু - মুসলমানের মধ্যে উত্তেজনা হয় — প্রায় দু’হাজার সাঁওতালকে টাঙ্গি , বল্লম , তীর - ধনুক নিয়ে উত্তেজনার মিছিলে সামিল করা হয়।

 যশাের জেলায় একজন নমঃশূদ্র সময়মত খাজনা দিতে না পারায় উচ্চবর্ণ হিন্দুজমিদার তার জমি কেড়ে নেন । কিন্তু সেই জমি অন্য কোন নমঃশূদ্র প্রজাকে বন্দোবস্ত না দিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণােদিতভাবে একজন মুসলমান প্রজাকে বন্দোবস্ত দেওয়া হয় এবং এই ঘটনা নিয়ে নমঃশূদ্র এবং মুসলমানের মধ্যে দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেওয়া হয় । ২ জন মানুষ ঐ দাঙ্গা-কাজিয়ায় মারা যান। 
বর্ধমানের কুলটিতে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হয় । পুলিশের গুলিতে ৪ জন তফসিলীশ্রেণীর হিন্দু মারা যান । ঢাকা শহরে হিন্দু দাঙ্গাকারীরা ছিলেন মূলতঃ গােয়ালারা ।

 খুলনায় নমঃশূদ্র এবং মুসলমানদের মধ্যে ভয়ংকর দাঙ্গা হয় । অনেক লােক হতাহত হন । উভয় সম্প্রদায়ের একটি করে মােট দুটি বড় গ্রাম সম্পূর্ণ ভস্মিভূত হয় ।

নােয়াখালির ভয়াবহ দাঙ্গায় নমঃশূদ্রদেরও জড়িয়ে নেওয়া হয় । ঐ জেলার রায়গঞ্জ থানার চণ্ডীপুরের ১০১ টি দরিদ্র নমঃশূদ্র পরিবার সাংঘাতিক ক্ষতিগ্রস্ত হন । – এসব চলতে থাকে ।

 হিন্দু ধর্মযােদ্ধাদের অগ্রবর্তী দল হিসাবে নিম্নশ্রেণীর হিন্দু এবং আদিবাসীদের ব্যবহার করা হয় । প্রতিটি গণ্ডগােল এবং দাঙ্গায় কলকাতার ভদ্রলােকশ্রেণীর লােকেরা নিম্নশ্রেণীর লােকজনকে উত্তেজিত করেন  এবং সাহস জোগান । মাড়ােয়ারিরা ভদ্রলােকশ্রেণীকে প্রয়ােজনীয় অর্থের জোগান দেন ।

 এভাবে মুসলমানদের সাথে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করে হিন্দুধর্মে নতুন প্রবেশাধিকার পাওয়া নমঃশূদ্র , আদিবাসী ও অন্যান্য নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরা , হিন্দুধর্মের প্রতি তাদের আনুগত্য , বশ্যতা এবং কৃতজ্ঞতার প্রমাণ দিতে থাকেন। উত্তেজনার এই আবহাওয়ায় নীচুজাতের হিন্দুরা আবেদন জানাতে থাকেন – যাতে উচ্চবর্ণহিন্দুরা তাদের অস্পৃশ্য হিসাবে গণ্য না করেন এবং তাদের কাছ থেকে খাবার খেতে রাজি হন ! কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ ও জাতিভেদ প্রথার আমূল পরিবর্তনের
                                (৫৬)


কোন ইচ্ছা, কর্মসূচী ও আদর্শ , উচ্চবর্ণহিন্দুদের ছিল না এবং আজও নেই । যে কারণে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসের এক সমীক্ষায় দেখা যায় – বাঙলার অধিকাংশ ব্রাহ্মণ পরিবার অন্দরে (খাবার ঘর ও মন্দিরে) আজও অস্পৃশ্যতা অনুশীলন করেন । 

অস্পৃশ্য ও অন্যান্য নিম্নশ্রেণীর এই দাসসুলভ মনােবৃত্তির আবহে ব্যতিক্রম ঘটনাও ছিল – কিন্তু সে নিতান্তই ব্যতিক্রম । যশাের জেলার রাণাঘাটের (এখন নদিয়া) নগেন দাস নামে এক তফসিলীশ্রেণীর উকিল নিজের সম্প্রদায়ের এই দাস মনােভাবে ক্রুদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ হিসাবে গরুর মাংসের দোকান খােলার জন্য পৌরসভায় আবেদন করেন ।

 'সত্যম শিবম' দলের প্রচারে প্রভাবিত হয়ে মালদায় যেসব সাঁওতালরা হিন্দু হতে বিশেষ উৎসাহ দেখান , তাদের নেতা ছিলেন জিতু সাঁওতাল । তিনি সাঁওতালদের অপবিত্র শুকর ও মুরগীর মাংস খাওয়া ত্যাগ কোরে শুদ্ধি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পবিত্র হয়ে হিন্দু হবার জন্য প্রচার চালান । এমনকি তাদের পােষা শুকর ও মুরগী মেরে ফেলার জন্যও সাঁওতালদের উৎসাহিত করেন । তার দলবল অস্পৃশ্যদের সম্পর্কে অবজ্ঞাসূচক ভাষাও ব্যবহার করতে থাকেন । ক্রমে এই আন্দোলনকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘুরিয়ে দেওয়া হয় । ১৯৩২ সালে জিতু সাঁওতাল ও তার সমর্থকরা আদিনা মসজিদে আক্রমণ চালান এবং সেখানে কালী উপাসনার চেষ্টা করেন । এই সময়ে পুলিশের গুলিতে তার মৃত্যু হয় ।

'হিন্দু সভার' প্রচার আন্দোলনে শিক্ষিত, বিজ্ঞজন এবং রাজবংশীদের পথিকৃৎ নেতা পঞ্চানন বর্মণের মত লােকজনও বিভ্রান্ত হন । হিন্দু ঐক্যের শ্লোগানে প্রভাবিত হয়ে তিনি ১৯৩৩ সালে কাউন্সিলে উত্থাপিত  আনটাচাবিলিটি এ্যাবােলিশন বিলের ( অস্পৃশ্যতা বিলােপ বিল ) বিরােধিতা করেন ( এই বিল নিয়ে লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে বিতর্ক , হােম পলিটিক্যাল ফাইল নং ৫০/৭/৩৩ ) । তিনি যুক্তি দেখান যে , বিলের উদ্দেশ্য নিয়ে তার যথেষ্ট সহানুভূতি থাকলেও , তিনি মনে করেন - কোন ব্যক্তি বা কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অধিকার নিয়ে বিরােধ বন্ধ করতে হবে । ... এ ধরনের ব্যবস্থা হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভক্তি ও অসন্তোষ তৈরি করবে । সম্প্রদায়ের অখণ্ডতা নিশ্চিত করার জন্য এই বিল পরিহার করা উচিত ।

 প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করা প্রয়ােজন ১৯৩৩ সালে কেন্দ্রিয় আইনসভায় একজন অস্পৃশ্য মানুষ এম.সি. রাজা এই ‘অস্পৃশ্যতা বিলােপ বিল' উত্থাপন করেন । সেজন্য এই বিল সম্পর্কে মতামতের জন্য বাঙলা লেজিসলেটিভ কাউন্সিলেও আলােচনা হয় – যেখানে পঞ্চানন বর্মন ঐ মতামত ব্যক্ত করেন । 

১৯০০ সালের কাছাকাছি সময়ে পঞ্চানন বর্মন 'ক্ষত্রিয় সভা' প্রতিষ্ঠিত 
                             (৫৭)


করেন এবং রাজবংশীদের মধ্যে ব্রাহ্মণ্যবাদী আচার , আচরণ ও মূল্যবােধ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন । পৈতা ব্যবহার করার আন্দোলন করেন । তার নেতৃত্বে বহু মানুষ দীক্ষাগ্রহণ করেন । দীক্ষার পূর্বে নাপিত দিয়ে চুল কামিয়ে নেন এবং প্রত্যেকে ব্রাহ্মণকে আড়াইটাকা প্রণামী দিয়ে মন্ত্রপাঠ করে পৈতা ধারণ করেন । একই সাথে শুকর ও মুরগীর মাংস খাওয়া এবং পালকি টানা বন্ধ করে দেন । 

পূর্বের ন্যায় এই বর্তমান পর্যায়েও হিন্দুভদ্রলােকদের সারিতে জায়গা পাবার আশায় নমঃশূদ্ররাও ভদ্র হবার দৌড় শুরু করেন । যশাের জেলার নমঃশূদ্র অধ্যুষিত ছিয়ানব্বই অঞ্চলের প্রখ্যাত মাতব্বর রাইচরণ মহালদারের নেতৃত্বে শিক্ষা আন্দোলন ও স্কুল প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে শুকর ও মুরগীর মাংস না খাওয়া এবং না পােষার আন্দোলনও হয়।

 ১৮৯১ সাল থেকে পৌন্ড্র সমাজে বেণীমাধব হালদার , শ্ৰীমন্তবাবু , মহাত্মা রাইচরণ সরদার , মহেন্দ্রনাথ করণ , রায়বাহাদুর অনুকূল চন্দ্র দাস প্রমুখের নেতৃত্বে ক্ষত্রিয় মর্যাদা লাভের আন্দোলন ও শিক্ষা আন্দোলন পরিচালিত হয় । 

ভুইমালী সম্প্রদায়ের সমাজ সেবক দামােদর দাস অন্ত্যজ মানুষের প্রগতির জন্য অসাধারণ ভূমিকা রাখেন । মহেন্দ্রনাথ দাস , গগণচন্দ্র বিশ্বাস প্রমুখ নেতৃবৃন্দ কৈবর্ত্যদের নাম পরিবর্তন করে মাহিষ্য নাম গ্রহণ করার জন্য সংগ্রাম করেন । 

জাতে ওঠার এই আন্দোলনের সাথে সমাজে শিক্ষা - সংস্কৃতি ও প্রগতির জন্যও তারা লড়াই করেন – যার কিছু উল্লেখ আগেই করা হয়েছে । 

এই "অস্পৃশ্যতা বিলােপ বিল" উত্থাপিত হলে কেন্দ্রিয় আইন সভায় বাঙলার প্রত্যেকজন হিন্দু সদস্য ঐ বিলের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন । পণ্ডিত সত্যেন্দ্রনাথ সেন মনে করেন যে , “ .... বৈবাহিক বিধানের গুরুতর লংঘণই হলাে অস্পৃশ্যদের উৎপত্তির মূল বৈশিষ্ট্য ... ( এবং ) তাদের পেশা , তাদের আচার - আচরণ ও তাদের সংস্কৃতির জন্য তারা কখনও বর্ণ হিন্দুদের সমপর্যায়ে আসতে পারেন না"।  সাংসদ অমরনাথ দত্ত ঘােষণা করেন , “এই লােকগুলি আগে অধিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হােক , অধিক পবিত্র হােক এবং জীবনের উত্তম আদর্শ লালন করুক ... তখন আমি তাদের সাথে মেলামেশা করবাে" ।  বাঙলার প্রতিনিধিত্বকারি ’ ল’মেম্বার বি.এল.মিত্র যুক্তি উপস্থাপন করেন যে , "যেহেতু , কোন সার্বভৌম রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ বর্ণপ্রথা প্রতিষ্ঠিত করেনি ... সেহেতু আইনগত হস্তক্ষেপের অনুমতি দেওয়া উচিত নয়" ।  সাংসদ বি.পি.সিংহরায় বিলকে প্রত্যাখ্যান করেন , কারণ তা “হিন্দুদের ধর্মীয় অধিকারের উপর সরাসরি অনধিকার প্রবেশ এবং হিন্দু সমাজের ভিত্তিকে অবমূল্যায়ন করার প্রয়াস"। – বিলের বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রতিক্রিয়ায় এম.সি.রাজা
                               (৫৮)


শ্লেষপূর্ণ মন্তব্য করেন – “এটা বিস্ময়কর ... বিলের বিরােধি মতের অধিকাংশ সদস্য বাঙলা প্রদেশের এবং তারা সচরাচর বলেন যে , বাঙলায় কোন অস্পৃশ্যতা নেই "।

জনমত যাচাইয়ের জন্য পরে ঐ বিল প্রদেশের বিভিন্ন সংগঠনের কাছে পাঠানাে হয় । বাঙলার গর্ভনর ঐ বিষয়ে সব বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা জজ , ৬ জন বিচারক , বিভিন্ন মতবাদের প্রতিনিধিত্বকারি বাঙলার সুপরিচিত ও খ্যাতনামা ৫৬ জন ব্যক্তিত্ব , ১৩ টি বার লাইব্রেরী এবং ২৬ টি স্বীকৃত সমিতি ও ধর্মীয় সংগঠনের লােকেদের সাথে আলােচনা করেন । আলোচনার পর তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে , "বাঙলায় ঐ বিলের বিরুদ্ধে জনমত বিস্ময়করভাবে অধিক প্রবল" (অপিনিয়নস্ অন দি আনটাচাবিলিটি এ্যাবােলিশন বিল নং -১ , ফাইল নং ৫০/৭/৩৩ , উল্লেখ বাঙলা ভাগ হল , জয়া চ্যাটার্জী )।

 উচ্চবর্ণহিন্দুরা লাগাতার প্রচার চালিয়ে যান যে , অস্পৃশ্যতা হিন্দুধর্মের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার – এখানে আইনের কোন হস্তক্ষেপ উচিত নয় এবং এর সাথে রাজনীতির কোনরূপ সম্পর্ক জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা ঠিক নয় । কংগ্রেসী নেতারা বলতেন – "উকিলরা কেন ডাক্তারি করছেন না , এ প্রশ্ন কেউ তুলতেই পারেন--- তাতে উকিল নিশ্চয়ই ডাক্তারি করতে ছুটবেন না। কংগ্রেস রাজনৈতিক দল , তার কাজ সমাজসংস্কার করা নয় "। – এভাবে কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা নিন্মবর্ণীয় হিন্দুদের সামাজিক মর্যাদার আকাঙ্খাকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যান ; কিন্তু তাদের ধূর্ত প্রচারে অস্পৃশ্য ও অন্যান্য নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদের একাংশ বিভ্রান্ত হন এবং তাতে ভদ্রলােকদের রাজনৈতিক সমর্থনলাভের অভিসন্ধি অনেকাংশে সফল হয় । 
                                 (৫৯)


                     পঞ্চম অধ্যায় 
                 সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ
 
জাতীয় কংগ্রেস , হিন্দু মহাসভা , মুসলিম লীগ প্রভৃতি রাজনৈতিক দলগুলি আইনপরিষদ ও শাসন ব্যবস্থার সংস্কার চায় । তারা আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন এবং ভারতীয়দের বেশি বেশি অধিকার ও গুরুত্ব দাবি করতে থাকে । একইসাথে একের পর এক কৃষক বিদ্রোহ ও আন্দোলন এবং নিম্নশ্রেণীর হিন্দুদের আশা-আকাঙ্খার দাবি – এসবের ফলশ্রুতিতে ব্রিটিশ সরকার ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইন আরেকবার সংস্কার করে । প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থাকে আরও একটু প্রসারিত করে ভারতবাসীর ক্ষোভ প্রশমন এবং তাদের সহযােগিতা পাবার চেষ্টা করে । এই লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকার সাইমন কমিশন , লােথিয়ান কমিটি প্রভৃতি কয়েকটি কমিশন ও কমিটি গঠন করে । তারা ভারতীয় জনগণের বিভিন্ন অংশের মানুষের মতামত ও ইচ্ছা জানার চেষ্টা করেন । তাদের স্মারকলিপি নেন ও সাক্ষ্য গ্রহণ করেন । দেশের বিভিন্ন অংশ , স্তর ও বর্ণের মানুষের প্রতিনিধিদের নিয়ে ১৯৩০ , ১৯৩১ ও ১৯৩২ সালে লণ্ডনে গােলটেবিল বৈঠকের ব্যবস্থা করেন । তারপর ১৯৩২ সালে সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ ঘােষিত হয়, পূণা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ভারত শাসন আইন , ১৯৩৫ ' প্রণীত হয় । 

গােলটেবিল বৈঠকে সাধারণভাবে হিন্দুদের প্রতিনিধি হিসাবে কংগ্রেস , মুসলমান সমাজের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে মুসলিম লীগ , শিখ প্রতিনিধি , খৃষ্টান প্রতিনিধি , এ্যাংলাে ইন্ডিয়ান প্রতিনিধি , নবাব ও রাজা - মহারাজাদের প্রতিনিধি , অস্পৃশ্যদের প্রতিনিধি এবং ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধিবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। মােট ৮৯ জন প্রতিনিধি গােলটেবিল বৈঠক অংশগ্রহণ করেন, যার মধ্যে ব্রিটেনের ৩ টি রাজনৈতিক দলের ১৬ জন প্রতিনিধি ছিলেন ।

 ৩ বছর জুড়ে সুদীর্ঘ সময় নিয়ে আলােচনা হয় এবং বহু প্রশ্নে ঐকমত্য হয় । কিন্তু ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন সংখ্যালঘু ও দুর্বলতর অংশের প্রতিনিধিত্ব ও স্বার্থ 
                                   (৬০)


সম্পর্কিত কিছু বিষয়ে কোনমতেই ঐকমত্য সম্ভব হয় না। এ ব্যাপারে সংখ্যালঘু সাবকমিটি গঠিত হয়েছিল । কয়েকদিন ধরে ঐ কমিটি বার বার বৈঠক করেও ব্যর্থ হয় – বিশেষ করে পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা এবং সংরক্ষণ প্রশ্নে আলােচনায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় । মূলতঃ কংগ্রেস প্রতিনিধিদের সাথে অস্পৃশ্য ও অন্যান্য বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধিবৃন্দের মতপার্থক্য এই বিরােধের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায় । 

সংখ্যালঘু সাবকমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রি ম্যাকডােনাল্ড । ড . আম্বেদকরও এই কমিটির সদস্য ছিলেন । ম্যাকডােনাল্ড কয়েকদিন ধরে সব সদস্যের দাবি , মতামত এবং যুক্তিগুলি শােনেন । শেষ পর্যন্ত অমিমাংসিত বিষয়গুলি সম্পর্কে ইতিমধ্যে হওয়া আলােচনার আলােকে তিনি সিদ্ধান্ত ঘােষণা করবেন বলে কমিটিকে জানিয়ে দেন এবং আলােচনার সমাপ্তি ঘােষণা করেন । 

সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ হলাে ভারতের বিভিন্ন শ্রেণী এবং সম্প্রদায়ের অধিকার , স্বার্থ ও অংশীদারি সম্পর্কে সংখ্যালঘু সাবকমিটির চেয়ারম্যান ম্যাকডােনাল্ড - এর ঘােষণা । ১৯৩২ সালের ১৪ ই আগষ্ট এই রােয়েদাদ ঘােষিত হয় । 

এই ঘােষণায় হিন্দু , মুসলমান , শিখ , এ্যাংলাে ইণ্ডিয়ান , ইউরােপীয় , জমিদার , শ্রমিক , মহিলা , সম্মানিত ব্যক্তি এবং অস্পৃশ্যদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার কথা ঘােষণা করা হয় । অর্থাৎ শুধুমাত্র ঐসব সম্প্রদায় ও শ্রেণীর মানুষের ভােটে তাদের নিজ নিজ প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন । প্রত্যেক সম্প্রদায় এবং শ্রেণীর জন্য আসন সংখ্যা ঘােষিত হয় ও আসন সংরক্ষিত করে দেওয়া হয় । এই রােয়েদাদে ড . আম্বেদকরের দাবি মেনে অস্পৃশ্যদের , হিন্দুদের থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র জনগােষ্ঠী হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং তাদের জন্য আলাদা প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করা হয়।

১৯৩১ সালের লােকগণনা অনুযায়ী বাঙলার মােট জনসংখ্যা ৫ কোটি ১০ লক্ষ । তার মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা ২ কোটি ৭৮ লক্ষ এবং অস্পৃশ্যসহ হিন্দুর সংখ্যা ২ কোটি ২২ লক্ষ । অন্যান্যরা ছিলেন ১০ লক্ষ মানুষ । কিন্তু ১৯৩১ সালের সেন্সাস কমিশন দেখিয়েছেন যে , বাঙলায় অস্পৃশ্যের সংখ্যা মাত্র ৬০ লক্ষ । অথচ ড . আম্বেদকর পরিসংখ্যান পেশ করে দেখিয়েছেন যে , ১৯১১ সালের লােকগণনাতেই বাঙলায় অস্পৃশ্যের সংখ্যা ছিল ৯০ লক্ষ । সে হিসাবে ১৯৩১ সালে তাদের সংখ্যা নিশ্চিতভাবে ১ কোটি ছাড়িয়ে যাবার কথা । কারণ তাদের মধ্যে তুলনায় জন্মহার বেশি । ড , আম্বেদকর রচনাবলি , খণ্ড ২ , পৃ . ৭১৩ - তে আমরা একটা নিশ্চিত তথ্য পাই । তাতে দেখা যাচ্ছে – লােথিয়ান কমিটির ( ১৯৩১-৩২ ) রিপাের্টের ভ্যলুম -২ , পৃ , ২৬৩ - তে বাঙলার অস্পৃশ্যশ্রেণীর সংখ্যা
                                 (৬১)


উল্লেখ করা হয়েছে ১ কোটি ৩ লক্ষ । যদিও পূণা চুক্তিতে তাদের সংখ্যা মাত্র ৭৫ লক্ষ ধরে নিয়ে বা হিসেব করে অস্পৃশ্যদের ভাগ্য নির্ধারণ করা হয় । এখানে উল্লেখ করা প্রয়ােজন যে , লােথিয়ান কমিটি ভােটাধিকার নিয়ে হিসাব ও অনুসন্ধানের কাজ করে । এই বিতর্কে বাঙলার বর্ণহিন্দু নেতৃবৃন্দ ও বিদ্বজনরা দাবি করেন যে , "বাঙলায় অস্পৃশ্যের সংখ্যা বড়জোর ৪ লক্ষ এবং তাদের জন্য ৪ টির বেশি আসন সংরক্ষণ করা যায় না"!

 বাঙলার উচ্চবর্ণ হিন্দুরা প্রদেশে হিন্দুর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানাের জন্য অস্পৃশ্য এবং আদিবাসীদের লােক গণনায় হিন্দু হিসাবে নাম লেখানাের যে প্রচার আন্দোলন করেন , তাতে তারা লাভবান হন । অন্ততঃ সেন্সাস কমিশনারের রিপাের্ট দেখে তাই মনে হয় । ভদ্রলােকশ্রেণীর ইংরেজ প্রশাসনেও কিছু প্রভাব ছিল , তারজন্য কিছু কারচুপিও তারা করে থাকতে পারেন ।

 দেখা যাচ্ছে ১৯৩১ সালের লােকগণনা অনুযায়ী শতকরা হারের হিসাবে বাঙলার জনসংখ্যার শতকরা ৫৪ ভাগ মুসলমান এবং অস্পৃশ্য সমেত হিন্দু ৪৪ শতাংশ । আবার হিন্দুদের মধ্যে জনগণনা অনুযায়ী শতকরা ৭৩ ভাগ সাধারণ হিন্দু এবং শতকরা ২৭ ভাগ অস্পৃশ্য হিন্দু । ড . আম্বেদকরের দেওয়া তথ্য ধরলে বাঙলার মােট হিন্দুর শতকরা ৪০ ভাগ অস্পৃশ্য হিন্দু । বর্তমানে ২০১১ সালের লােকগণনায় হিন্দু অধ্যুষিত পশ্চিমবঙ্গের মােট হিন্দুর ৪৪ শতাংশ মানুষ তফসিলীশ্রেণীর হিন্দু ( তফসিলীরাই পূর্বের অস্পৃশ্য ) । তাই , কোন সন্দেহ থাকে না যে , ১৯৩১ সালে ড . আম্বেদকরের পেশ করা সংখ্যা ঠিক ছিল বা তাঁর হিসাব থেকেও অস্পৃশ্যদের প্রকৃত সংখ্যা সামান্য বেশি ছিল । 

সম্প্রদায়গত রােয়েদাদের ঘােষণায় বাঙলার আইন সভার মােট ২৫০ টি আসনের মধ্যে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত করা হয় ১১৭ টি আসন এবং মুসলমান মহিলাদের জন্য ২ টি আসন অর্থাৎ মুসলমানদের জন্য মােট ১১৯ টি আসন বরাদ্দ করা হয় । হিন্দুদের জন্য সংরক্ষিত করা হয় ৮০ টি আসন ; আরও ২ টি হিন্দু মহিলাদের জন্য অর্থাৎ হিন্দুদের জন্য মােট ৮২ টি আসন বরাদ্দ হয় – যার মধ্যে ১০ টি আসন অস্পৃশ্যদের জন্য সংরক্ষিত বলে ঘােষণা করা হয় । ইউরােপীয়দের জন্য ১১ টি আসন, ইউরােপীয় ব্যবসায়ীদের জন্য ১৪ টি আসন , ভারতীয় ব্যবসায়িদের জন্য ৫ টি আসন, জমিদারদের জন্য ৫ টি আসন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ২ টি আসন, শ্রমিকদের জন্য ৮ টি আসন , এ্যাংলাে ইণ্ডিয়ানদের জন্য ৩ টি আসন এবং এ্যাংলাে ইণ্ডিয়ান মহিলাদের জন্য ১ টি আসন বরাদ্দ করা হয় ।

 শতকরা হিসাবে বাঙলার ৫৪ ভাগ মুসলমান বাঙলা প্রাদেশিক আইন সভার ৪৭.৬০ ভাগ আসন পান ।বাঙলার ২৬.৪০ শতাংশ সাধারণ হিন্দুরা পান বাঙলার প্রাদেশিক আইন 
                               (৬২)


সভার ২৮ শতাংশ আসন  এবং ১৭.৬০ শতাংশ অস্পৃশ্যরা বাঙলার প্রাদেশিক আইনসভার মােট আসনের মাত্র ৪ শতাংশ অর্থাৎ ১০ টি আসন পেয়েছিলেন । 

সম্প্রদায়গত রােয়েদাদে ঘােষিত ও বন্টিত আসন সংখ্যা সম্পর্কে বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সংখ্যার অনুপাতে সবচেয়ে বেশি আসন পান সাধারণ হিন্দুরা – যদিও বাঙলাপ্রদেশের ক্ষমতা দখলের জন্য ঐ সংখ্যা ছিল নিতান্ত নগণ্য । বরং বলা যেতে পারে – এই রােয়েদাদের ফলে বাঙলার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল তাদের পক্ষে কার্যতঃ অসম্ভব হয়ে পড়ে ।

 মুসলমানরা সংখ্যার অনুপাতে কিছু কম আসন পেলেও, মােট আসন সংখ্যা ভালই ছিল । বাঙলার ক্ষমতা দখল করার জন্য প্রয়ােজন ছিল ১২৬ টি আসন। ঐ ম্যাজিকসংখ্যা থেকে তাদের জন্য মাত্র ৭ টি আসন কম সংরক্ষিত করা হয় । জমিদার , ব্যবসায়ী এবং শ্রমিকদের কোটা থেকে ৭ টি আসনের ঘাটতি পূরণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল ।

 আর সবচেয়ে বঞ্চিত করা হয় বাঙলার অস্পৃশ্য সমাজকে । প্রায় ১৮ ভাগ মানুষের জন্য মাত্র ৪ ভাগ আসন । অথচ অন্যায় ও অগণতান্ত্রিকভাবে ইউরােপীয় ও ইউরােপীয় ব্যবসায়ী এবং ভারতীয় জমিদার ও ব্যবসায়ীদের অনেক বেশি আসন বরাদ্দ করা হয় । জাতিয়তাবাদী বলে দাবিদার কংগ্রেস এই অন্যায় ও অযাচিত তােষামােদের বিরুদ্ধে একটি শব্দ উচ্চারণ না করে বাঙালি অস্পৃশ্য ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐ দল যুদ্ধ ঘােষণা করে । তারা দাবি করেন যে , নিতান্ত যদি বরাদ্দ করতেই হয় , তাহলে অস্পৃশ্যদের ৪ টির বেশী আসন কোনমতেই বরাদ্দ করা যাবে না।

সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ বাঙলার উচ্চবর্ণ হিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণীর কাছে একটা বড় ধাক্কা---সেকথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই । কারণ ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইন অনুসারে বাঙলার আইন পরিষদের দ্বৈতশাসনে ১৩৯ সদস্য বিশিষ্ট সভায় হিন্দুরা পান ৪৬ টি আসন ; আর মুসলমানরা পান ৩৯ টি আসন। তাদের এই অন্যায় ও অসঙ্গত প্রাধান্যের ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তারা আশা করেছিলেন । কিন্তু সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ তাদের আশার মূলে কুঠারাঘাত করে । আশাহত এই সম্প্রদায় এরপর তাদের লুকানাে সমস্ত দাঁতনখ নিয়ে বাঙলার রাজনৈতিক ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েন – যে ইতিহাস আমরা পরে আলােচনা করবো।

                         ষষ্ঠ অধ্যায় 
সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ : হিন্দুমন ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া  

সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ ঘােষণার কয়েক বছর আগেকার দু'তিনটি ঘটনার কথা আমরা এখানে আলােচনা ও উল্লেখ করে নিতে চাই । তাতে অস্পৃশ্য ও মুসলমানদের প্রতি বাঙলার ভদ্রলােকশ্রেণীর দৃষ্টিভংগীর পরিচয় আরও খানিকটা স্পষ্ট হবে – যা রােয়েদাদ পরবর্তী তাদের প্রতিক্রিয়া উপলদ্ধি করতে সহায়ক হতে পারে । 

আজ বাঙলার বহু মানুষের অজানা নয় যে , গুরুচাঁদ ঠাকুর গ্রামবাংলার অন্ত্যজ মানুষের জন্য শিক্ষা আন্দোলন করেন এবং সর্বপ্রথম চণ্ডালদের নেতৃত্বে ওড়াকান্দিতে একটি উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয় । এই উদ্যোগের কথা জানতে পেরে পাশ্ববর্তী ঘৃতকান্দি গ্রামের গিরীশচন্দ্র বসু নামক একজন উদারচিত্ত কায়স্থ ব্যবসায়ি গুরুচাঁদ ঠাকুরের নিকট চিকিৎসালয়ের পরিবর্তে ঐ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য কিছু অর্থ সাহায্যের অঙ্গীকার করেন । গুরুচাঁদ চরিতে বিষয়টি এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে---

“ এই দেশে চিকিৎসার বন্দোবস্ত নাই ।
 দাতব্য চিকিৎসালয় করে দিতে চাই ।।
প্রভু (গুরুচাদ) বলে মহাশয় বড় ভাল কথা । 
ব্যাধি দূর করা বটে অতি উদারতা ।। 
অজ্ঞান ব্যাধিতে ভরা আছে এই দেশ । 
জ্ঞানের আলােকে ব্যাধি তুমি কর শেষ ।। 
উচ্চবিদ্যালয় এই দেশে কোথা নাই । 
উচ্চবিদ্যালয় কর এই ভিক্ষা চাই।। 
                                       (৬৪)


এ তব আজ্ঞা শিরােধার্য আমি করিলাম ।
 করিব ইংরাজী স্কুল কথা যে দিলাম ।। ” 

কলকাতা শহরে বড় কাঠের ব্যবসা গিরীশচন্দ্র বসুর । বহু টাকাকড়ির মালিক এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি । তার এই প্রতিশ্রুতির কথা ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য উচ্চবর্ণহিন্দুদের কানে যায় এবং তিনি যাতে কোনক্রমে গুরুচাঁদকে অর্থ সাহায্য না করেন । তারজন্য তৎপর হয়ে ওঠেন---

"হিংসুক ব্রাহ্মণ যত ভাবে মনে মন । 
উচ্চশিক্ষা পায় যদি নমঃশূদ্রগণ ।।
 কিছুতেই নিস্তার মােরা নাহি পাব আর ।
নমঃশূদ্র করিবেক সব অধিকার ।। 
কেন সে করিবে স্কুল নমঃর ভিতরে ।
শিক্ষা পেলে নমঃ আর নাহি মানে কারে ।। 
চিকিৎসালয় দিবে দাও নাহি করি মানা । 
স্কুল দিবে কোন মর্মে তাহাতাে বুঝি না ।। 
নমঃ জাতি চিন তুমি বিদ্যাশিক্ষা নাই ।
বিদ্যাহীন বলে মােরা তাদেরে চরাই ।। 
স্কুল যদি পায় তারা বিদ্বান হইবে । 
আমাদের মান বাপু কভু না রহিবে ।।

 গিরীশচন্দ্র বসুকে ভদ্রলােকশ্রেণী নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করেন , যাতে , তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুচাঁদ ঠাকুরকে কোনভাবেই অর্থ সাহায্য না করেন । শেষ পর্যন্ত তাকে সামাজিক বয়কটের হুমকি দেওয়া হয় । ফলে , গিরীশবাবুর পক্ষে অর্থ সাহায্য করা সম্ভব হয় না। গুরুচাঁদের ইচ্ছাশক্তির জোরে এবং নিজ সমাজের  মানুষের সার্বিক সহযােগিতায় শেষ পর্যন্ত ১৮৯৮ সালে উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তিনি সক্ষম হন – যা পূর্ববঙ্গে চণ্ডালদের প্রথম ইংরেজী উচ্চ বিদ্যালয় । 
                                (৬৫)


আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে , ইংরেজদের প্রণীত ১৮১৫ সালের শিক্ষানীতি ৪০ বছর পরে পূনর্বিবেচনা করা হয় এবং অস্পৃশ্য ও মুসলমানদেরও ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য জোর দেওয়ার কথা ঘােষণা করা হয় এই ঘােষণায় । বিরক্ত ও অসন্তুষ্ট হয়ে বাঙলার উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােক বুদ্ধিজীবী-বিদ্বজনেরা কলকাতার টাউন হলে এক সভা ডাকেন । ঐ সভার সিদ্ধান্তের উল্লেখ করে ১৮৫৯ সালে সর্বজন শ্রদ্ধেয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় তৎকালীন বাঙলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার পিটার গ্রান্টকে একটি স্মারকলিপি দেন । ঐ স্মারকলিপিতে অস্পৃশ্য এবং মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করার সরকারি নীতি ও উদ্যোগের বিরােধিতা করে বলা হয় “ ইংল্যাণ্ড ও ভারতে এরূপ একটা বদ্ধমূল ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যে – উচ্চবর্ণের লেখাপড়া শেখার জন্য যথেষ্ট কাজ হয়েছে এবং এখন প্রধানতঃ সাধারণ জনগণের শিক্ষার প্রতি নজর দিতে হবে । আমার সাধারণ বুদ্ধিতে মনে হয় – শিক্ষা বিস্তারের সবচেয়ে ভাল উপায় হলাে , কেবলমাত্র উচ্চবর্ণের মধ্যে ব্যাপকভাবে শিক্ষার প্রসার ঘটানাে । ” – এভাবে তারা দেশের চলমান মাথাভারি শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তির বিস্তার ও প্রসার ঘটানাের প্রয়াসের বিরােধিতা করেন তীব্রভাবে । কারণ নিম্নবর্গের লােকেদের জন্য শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত হলে তাদের একচেটিয়া অধিকার ও ক্ষমতা হ্রাস পেত । ওড়াকান্দির ঘটনা এই সংকীর্ণ মানসিকতারই ধারাবাহিকতা।

 ইংরেজি শিক্ষাগ্রহণের জন্য প্রথম সরকারি সুযােগলাভ এবং ১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবিধা থাকার ফলে বাঙলার ভদ্রলােকশ্রেণীর একাংশ উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হন এবং বিশ্ববিদ্যালয়টিকেও নিজেদের কব্জায় নিয়ে নেন ।

'পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ’ গঠিত হওয়ায় এই সময়ে ঢাকাতে অপর একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ও আন্দোলন জোরদার হয় । সরকার শেষ পর্যন্ত নীতিগতভাবে রাজি হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘােষণা করে । কোন সন্দেহ নেই – এই বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববঙ্গের মানুষের জন্য অত্যন্ত প্রয়ােজনীয় ছিল এবং বিশেষ করে মুসলমানরা খুবই উপকৃত হবেন । কিন্তু দেখা গেল , বাঙলার ভদ্রলােকশ্রেণী তাদের মনের সংকীর্ণতার পরিচয় ঘােষণা করতে আরও একবার উচ্চকণ্ঠ হলেন । ১৯১২ সালের ২৮ শে মার্চ তারা কলকাতার গড়ের মাঠে জনসভা করে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরােধিতা করেন । অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হলেও এটা সত্য যে , গড়ের মাঠের ঐ সভায় সভাপতিত্ব (সভাপতিত্ব করা নিয়ে বিতর্ক আছে) করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ঐ সভায় প্রস্তাব পাশ
                                (৬৬)


করে তা ইংরেজ সরকারকে পাঠানাে হয় । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর বাঙলার বাঘ ( ! ) স্যার আশুতােষ মুখার্জী , ডাঃ রাসবিহারি ঘােষ , গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় , গিরীশচন্দ্র ব্যানার্জী প্রমুখের নেতৃত্বে বাঙলার ভদ্রলােকশ্রেণী ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে মােট ১৮ বার ইংরেজ সরকারের কাছে স্মারকলিপি দেন । তাদের যুক্তি –পূর্ব বাঙলার মুসলমানরা অধিকাংশই কৃষক , তাই ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কোন অর্থ হয় না ! অবশ্য ১৯২১ সালে শেষ পর্যন্ত ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয় ।

 ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার তার জীবনের স্মৃতিকথায় লিখেছেন , “ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়ায় মুসলমানরা খুশী হলেন ঠিকই ; কিন্তু হিন্দুদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয় । সাধারণত : যারা রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে দূরে থাকতেন , তারাও ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলনে যােগ দিলেন "। – ড . রমেশচন্দ্র মজুমদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর রূপে বহুবছর কাজ করেন । 

১৯০০ সাল থেকে হিসাব নিলে দেখা যায় — সামগ্রিকভাবে বাঙলায় মুসলমানরা ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ। পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলিতে তাদের সংখ্যা ছিল স্পষ্টভাবে আরও অধিক । যেমন বগুড়া জেলার মােট জনসংখ্যার প্রায় ৯৫ ভাগ ছিলেন মুসলমান।  রংপুর , ময়মনসিং , রাজশাহী , পাবনা , কুমিল্লা , নােয়াখালী , চট্টগ্রাম ও বরিশাল জেলার মােট জনসংখ্যার ৭১ থেকে ৮০ ভাগ মানুষ ছিলেন মুসলমান। নদিয়া , যশাের , ফরিদপুর ও ঢাকা জেলার ৬১ থেকে ৭০ ভাগ মানুষ ছিলেন মুসলমান । দিনাজপুর , মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলার মােট জনসংখ্যার ৫১ থেকে ৬০ ভাগ মানুষ ছিলেন মুসলমান । খুলনা জেলার মােট জনসংখ্যার ৪৯.৫০ ভাগ মানুষ ছিলেন মুসলমান । কিন্তু বাঙালি সমাজে আধিপত্য ছিল উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণীর এবং ব্রিটিশের অধীনে ভারতীয়রা যে সব ক্ষেত্রে ক্ষমতা প্রয়ােগ করার অধিকারি ছিলেন , তার প্রতিটি ক্ষেত্রে ভদ্রলােকশ্রেণীর আধিপত্য ছিল । কিন্তু সম্প্রদায়গত রােয়েদাদের ফলে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিশেষ করে প্রাদেশিক আইন সভায় তারা সংখ্যালঘিষ্ঠ দলে পরিণত হন । 

বাঙলা যখন প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন লাভ করে , তখন ভদ্রলােকশ্রেণীর মনে সত্যিকার যে রাজনৈতিক ক্ষমতার আশা ছিল , তা ঐ রােয়েদাদ নিভিয়ে দেয় এবং মুসলমানদের কাছে তাদের চিরস্থায়ীভাবে অধীন হবার সম্ভাব্য ভবিষ্যতের ছবি ফুটে ওঠে । ঐ রােয়েদাদের পরপরই ঘােষিত হয় পুনাচুক্তি । এই চুক্তিতে তফসিলী শ্রেণীর হিন্দুদের জন্য রােয়েদাদের দ্বারা সংরক্ষিত ১০ টি আসনকে বাড়িয়ে ৩০ টি 
                                 (৬৭)


করা হয় । ফলে , হাউসে উচ্চবর্ণ হিন্দুরা আরও সংখ্যালঘুতে পরিণত হয় । অথচ এই হাউসে তারা সবসময় কর্তৃত্ব বজায় রাখার স্বপ্ন দেখে আসছিলেন । সম্পূর্ণ নতুনভাবে প্রবর্তিত সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যে পূর্বের ব্যবস্থাদির থেকে অনেকটাই আলাদা এবং এই ব্যবস্থায় জনসংখ্যা যে এক মৌলিক ভিত্তি, এ সত্য তারা মেনে নিতে পারেননি । 

 ১৮৮৫ সালে নতুন আইন প্রণয়নের ফলে জমিদারদের ক্ষমতা অনেকটাই সীমিত হয়ে যায় । এই আইনে আদায়কারিদের ক্ষমতা কমে যায় , ফলে আদায় কম হয় এবং জমিদারদের আয় কমে যায় । বাঙালি সমাজে ভদ্রলােকদের আয়ের মূল উৎস জমির খাজনার পরিমাণ কমে গেলে , পাশ্চাত্য শিক্ষাকে তাদের প্রাচীন আধিপত্য টিকিয়ে রাখার উপায় হিসাবে গণ্য করা হয় । তাদের নতুন আত্মপরিচয় গড়ে তােলা হয় পাশ্চাত্য শিক্ষাকে ভিত্তি করে । এভাবে সম্পদের আধিপত্য পরিবর্তিত করার চেষ্টা হয় সংস্কৃতির আভিজাত্যে । গত শতাব্দীর শুরু থেকে ভদ্রলােকশ্রেণী সমাজে এমন এক ধারণা গড়ে তােলেন যে , তারা সংস্কৃতিবান ও আলােকিতশ্রেণী , বেঙ্গল রেনেসাঁর উত্তরসূরি এবং অগ্রগতি ও আধুনিকতার পতাকাবাহী । কংগ্রেস দলের ভদ্রলােক রাজনীতিতে এরা প্রভাব বিস্তার করেন এবং জাতিয়তাবাদী হিসাবে প্রতিনিধিত্ব করেন । 

বাঙলা তথা সারাদেশে এই সময়ে চরম অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয় । এই মন্দা না হলে , রাজনৈতিক ধারা পরিবর্তনের ফলে ভদ্রলােকশ্রেণীর অত বেশি ক্ষতি হতাে না । মন্দার ফলে কৃষিজাত পণ্যের মূল্য এবং গ্রামীণ ঋণ পাওয়ার পথ একেবারে সংকুচিত হয়ে যায় । ফলে , খাজনা আদায় প্রায় বন্ধ হয়ে যায় । খাজনা আদায়কারিদের ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় পরিস্থিতি সম্পদশালী বায়ত বা জোতদারদের অনুকূলে চলে যায়। এই বিশৃঙ্খল অবস্থায় উৎসাহিত হয়ে জোতদাররা ক্রমবর্ধমান হারে জমিদারদের কর্তৃত্ব অস্বীকার করতে থাকেন এবং গ্রামবাঙলায় তারা নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করেন। কৃষক প্রজা পার্টি তাদের সাহস জোগায় এবং সহযােগিতা করে । বাঙলার এইসব জোতদারদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলমান । 

এই সময়ে ১৯৩৫ সালে নতুন ভারত শাসন আইন প্রবর্তিত হয় । এই আইনে যারা একটা স্তর পর্যন্ত লেখাপড়া জানেন এবং নির্দিষ্ট পরিমান রাজস্ব ও খাজনা দেন , তাদের ভােটের অধিকার দেওয়া হয় । ফলে , মুসলমান জোতদাররা এই প্রথম আইন সভার পরিমণ্ডলে ভূমিকা রাখার অধিকারী হন । 

ব্রিটিশের নতুন শিক্ষানীতির ফলে মুসলমানদের মধ্যে ইতিমধ্যে একটি শিক্ষিতশ্রেণী গড়ে ওঠে এবং একটি চাকুরীজীবীশ্রেণীরও উদ্ভব হয় । বাঙালী 
                                    (৬৮)


ভদ্রলােকশ্রেণীর বিরুদ্ধে তাদের বহু অভিযােগ ছিল । তারা এই ধনী কৃষকদের অবিরাম সমর্থন দেন । নতুন আইনসভায় উভয় গ্রুপের প্রতিনিধিবৃন্দ বিভিন্ন ইস্যুতে অত্যন্ত সরব ছিলেন এবং বাঙালি রাজনীতির মূল স্রোতধারায় তারা খাজনা গ্রহণকারি এবং সুদখাের ভদ্রলােকদের স্বার্থের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় ।

 ভদ্রলােক সমাজের মধ্যে অনেক পার্থক্য , বিভেদ , বৈষম্য এবং দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছিল । যেমন নগরভিত্তিক পেশাজীবীর সাথে গ্রামীণ মধ্যবিত্তশ্রেণীর পার্থক্য , বড় জমিদারের সাথে ক্ষুদ্র তালুকদারের , ভূস্বামী অভিজাতদের সাথে সামান্য কেরাণীশ্রেণীর এবং আধুনিকতাবাদীদের সাথে প্রাচীন ঐতিহ্যবাদীশ্রেণীর লােকের অনেক পার্থক্য ছিল । তাছাড়া ভদ্রলােক রাজনীতিতে নরমপন্থি , মধ্যপন্থি , চরমপন্থি , সন্ত্রাসবাদী সমিতি — দল ও উপদল এবং অনুগত ও জাতীয়তাবাদী প্রভৃতি বিভেদ ও স্বতন্ত্রতা ছিল – যা সাম্প্রদায়গত রােয়েদাদ ও নতুন ভােটার তালিকার ধাক্কায় মুছে দিয়ে ভদ্রলোেকদের ঐক্যবদ্ধ করে দেয় । 

এই সময়ে ভদ্রলােকরা ব্রিটিশ শাসনকে অত্যন্ত অনুকূল দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রহণ করে এবং সম্ভাব্য মুসলিম শাসনকে গণ্য করা হয় হিন্দু সমাজের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসাবে । এ কারণে ভদ্রলােকরা তাদের অতীতকে নতুন করে উপস্থাপন করেন – যেখানে ব্রিটিশকে অভিহিত করা হয় ত্রাণকর্তা হিসাবে । কারণ হিসাবে বলা হয় , মুসলমানদের স্বেচ্ছাচার থেকে তারা হিন্দু বাঙলাকে মুক্ত করেছে । বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলনে ব্রিটিশ বিরােধিতার পর , আবার ব্রিটিশের প্রতি আনুগত্য বাঙালি ভদ্রলােকদের কাছে মর্যাদার প্রতীক হিসাবে গণ্য হয় । তাদের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার দাবি জোরদার করার জন্য ব্রিটিশ শাসনে ভদ্রলােকদের সহযােগিতার অগৌরবের ইতিহাসকে এই সময়ে গৌরবের সাথে স্মরণ করা হতে থাকে । এই সময় থেকে তারা বাঙলার মুসলমানদের চেয়ে সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠ মনে করার অনুভূতির প্রসার ঘটাতে থাকে । ভােটাধিকার ও সংখ্যাগরিষ্ঠদের শাসনের যুগে , এই সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে ভদ্রলােক সংখ্যালঘিষ্ঠদের রাজনৈতিক ক্ষমতা পাওয়ার যুক্তি হিসাবে তুলে ধরা হয় । 

ভারতীয় জাতীয়তাবাদ পুষ্ট হয় গণতান্ত্রিক নীতি ও আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে । তাই , এই ধরনের যুক্তি শুধু গণতান্ত্রিক নীতিকেই প্রত্যাখ্যান করে না ; এর সাথে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বৈধতা প্রমাণের মিল আছে । কারণ ব্রিটিশদের যুক্তি ছিল যেহেতু ভারতীয়দের থেকে ব্রিটিশদের জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত , তাই , ভারত শাসন করার অধিকার তাদেরই । এভাবে ক্রমেই ভারতীয় জাতীয়তাবাদের নেতা হওয়া থেকে বাঙালি ভদ্রলােকরা ছিটকে পড়লেন এবং সাম্প্রদায়িক ভূমিকা গ্রহণ করলেন।
                             (৬৯)

বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে ব্রিটিশ বিরােধিতা থেকে সরে গিয়ে মননে এবং মেজাজে তারা মুসলিম বিরােধিতাকে প্রাধান্য দেন – যে ইতিহাস আমরা পরে তুলে আনবো ।

 ১৯০৫ সাল থেকে শুরু করে উচ্চবর্ণ হিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণী বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলন ১৯১১-১২ সাল অবধি জারি রাখেন , অথচ তারাই মাত্র ৩০/৩২ বছরের ব্যবধানে এবার বাঙলা ভাগ করার জন্য মরীয়া আন্দোলন শুরু করেন – যে আন্দোলন আসলে ‘ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ও প্রদেশভাগ করার সূচনা । ধর্মের ভিত্তিতে বাঙলাভাগ দিয়ে ভদ্রলােকশ্রেণী যে অধ্যায়ের শুরু করেন , ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ - এর দ্বারা তার সমাপ্তি হয় । জাতীয়তাবাদের নামে বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলন করেন তারা । ৩০ বছরের ব্যবধানে বাঙালি ভদ্রলােকরা সরাসরি সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক ও প্রাদেশিক বিষয়ে নিজেদের গুটিয়ে নেন এবং অত্যন্ত নীচুস্তরের রাজনৈতিক চক্রান্ত শুরু করেন । 

এ প্রসঙ্গে উদহারণ হিসাবে একটি চিঠির উল্লেখ করা যায় । চিঠিটি লেখেন হিন্দু মহাসভার নেতা ড . শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী , তার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বি কংগ্রেস নেতা সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল মহাশয়কে । বিভিন্ন পুস্তকে উল্লেখ করা হয়েছে যে , দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংকলিত শ্যামাপ্রসাদ করেসপণ্ডেন্স নামক পুস্তকে চিঠিটি সংরক্ষিত করা হয়েছে । জয়া চ্যাটার্জী লিখিত ‘ বেঙ্গল ডিভাইডেড ’ বইয়ের ( বাঙলা অনুবাদ ) ২৬৯ পৃষ্ঠা এবং ৩০২ পৃষ্ঠায়ও তার স্পষ্ট উল্লেখ আছে । চিঠিটার একাংশের বাঙলা অনুবাদ করা হয়েছে এভাবে – ইহারা ( মুসলমানরা ) হইতেছে হিন্দু সমাজের তলানীর নােংরা হইতে ধর্মান্তরিত একদল মানুষ - যাহারা সবদিক দিয়া হীনতর । তাই , বাঙলায় মুসলমান শাসন ও প্রাধান্য বজায় থাকিবার অর্থ সুপ্রাচীন হিন্দু সংস্কৃতিকে বিসর্জন দেওয়া – যা আমরা মানিয়া লইতে পারি না । তাই , ভারতভাগ হউক বা না হউক , বাঙলা ভাগের যে দাবি আমরা তুলিয়াছি , আপনি দেখুন , তাহা যেন ব্যর্থ হইয়া না যায় । ” –এই চিঠিতে মুসলমান সমাজের প্রতি তাে বটেই ; নিম্নবর্ণের হিন্দুদের প্রতি হিন্দুমহাসভা এবং তার নেতা ড , শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর ঘৃণা যে কত প্রবল ও গভীর , তার নিদর্শন ফুটে উঠেছে । 

আসলে বাঙলার উচ্চবর্ণ হিন্দু ভদ্রলােকদের ক্রমক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতা , ধনসম্পদ ও মর্যাদা হুমকির সম্মুখীন হওয়ায় , তারা সামাজিক অবস্থান অক্ষুন্ন রাখার জন্য কূটকৌশল অবলম্বন করে এবং নিজেদের কাজের যৌক্তিকতা প্রমাণ করার জন্য , বিভিন্ন ভাবাদর্শকে ব্যবহার করে । সত্যিকার অর্থে ঐ সব কূটকৌশলকে একমাত্র বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা হিসাবে আখ্যায়িত করা যায় । 
                                 (৭০)


দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মারা যান ১৯২৫ সালে । তার মৃত্যুর পরে দুই প্রিয় শিষ্য যতীন্দ্রমােহন সেনগুপ্ত এবং সুভাষচন্দ্র বসুর মধ্যে ক্ষমতার দখল নিয়ে প্রতিযােগিতা শুরু হয় । বিশেষ করে কলকাতার ‘তিন বিখ্যাত মুকুট ’ অর্থাৎ প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির পদ , বেঙ্গল লেজিসলেটিড কাউন্সিলে প্রাধান্য এবং কলকাতার মেয়র পদ দিয়ে অশােভন দড়িটানাটানি শুরু হয় । বেঙ্গল প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায় এবং সংগঠন বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে । মাহাত্মা গান্ধীর আবেদন এবং তার আইন অমান্য আন্দোলনের আহ্বানও তাদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারে না । গান্ধী যা পারেননি , সম্প্রদায়গত রােয়েদাদের ঘােষণা তা পারলাে। এই রােয়েদাদকে ভদ্রলােকেরা গণ্য করেন তাদের মর্যাদার উপর সরাসরি আক্রমণ হিসাবে এবং তারা ঐক্যবদ্ধভাবে এই রােয়েদাদকে প্রত্যাহার করার সংগ্রামে সামিল হন । 

ঐ সময়ে সেনগুপ্ত গ্রুপের কাগজ ছিল এ্যাডভ্যানস্ । রােয়েদাদকে নিন্দা করে ঐ পত্রিকা লেখে , “ এটা হলাে সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের কাছে লজ্জাহীন আত্মসমর্পণ। রােয়েদাদে হিন্দুদের দাবি ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে । হিন্দুরা এধরনের আমূল বা প্রায় বিপ্লবী পরিবর্তনের কাছে আত্মসমর্পণ করবে না"।

সুভাষচন্দ্র বসু গ্রুপের কাগজ ‘লিবার্টি ’ রােয়েদাদকে নিন্দা করে লিখলাে , "ভারতীয় জাতির কাছে এই রােয়েদাদ একটি কলঙ্ক । রােয়েদাদ শব্দটির বৈশিষ্ট্য 'অন্যায়' শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা যাবে না । ঐ রােয়েদাদ অপমানকর এবং নিশ্চিতভাবে ক্ষতিকর । রাজনৈতিকভাবে হিন্দুদের দুর্বল করা হয়েছে এবং প্রদেশের সাংস্কৃতিক , অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক জীবনে এর ফল হবে অমঙ্গলজনক”। আনন্দবাজার দূরদৃষ্টিহীন বলে ঐ রােয়েদাদের নিন্দা করে । দৈনিক বসুমতী যুক্তি দেখায় যে , “ঐ রােয়েদাদ বাঙালিদের উপর বাধ্যতামূলক নয় । কারণ সম্প্রদায়গুলির সত্যিকারের প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রিকে এই রােয়েদাদ ঘােষণার জন্য জানাননি" । দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা একটি উপকথার গল্প ছেপে বলে যে , "রােয়েদাদ হলাে এক নির্বোধ গ্রাম্য মাতব্বরের বােকামী"।

আগে স্থানীয় ও জেলা বাের্ড এবং স্কুলবাের্ডগুলিতে ভদ্রলােকশ্রেণীর একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল । এই সময়কালে এইসব স্থানীয় পর্যায়েও তাদের কর্তৃত্ব ক্রমেই শিথিল হতে থাকে । পশ্চিমবাঙলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলিতেও মুসলমানরা ১৯২৫-২৬ সাল থেকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলিতে ভাল অবস্থায় চলে আসে। ফলে , ভদ্রলোেকশ্রেণী হতাশাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন।

 এইসব আঘাতের কারণে প্রতিক্রিয়া যে চরম হবে , তা সহজেই বােঝা যায় । 
                                     (৭১)


কিন্তু বিস্ময়কর হলাে । ব্রিটিশনীতির বিরুদ্ধে ভদ্রলােকশ্রেণী বাঞ্জনীয় জাতিয়তাবাদী সমালােচনা করেনি । সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় , আবেদন , স্মারকলিপি এবং বক্তৃতায় পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থানীতি ও ব্রিটিশের ভাগ করে শাসন করার বিভেদনীতির বিরুদ্ধে খুব কম কথা শােনা যায় । আইন সভায় ইউরােপীয়দের বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বিরােধিতা বা প্রধানমন্ত্রির বিবেচনা ক্ষমতা নিয়ে বিক্ষোভ করতেও দেখা যায়নি । সরকারি শ্বেতপত্রে প্রকাশিত স্বায়ত্তশাসনকে প্রতারণা বলে জাতিয়তাবাদী ভারত প্রত্যাখান করলেও , বাঙালি ভদ্রলােকশ্রেণী (কংগ্রেস অকংগ্রেসী সবাই) শুধুমাত্র তাদের প্রাদেশিক রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খার প্রতি উপেক্ষা নিয়েই উদ্বিগ্ন ছিলেন । ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সমালােচনায় তারা বিস্ময়করভাবে নীরব ছিলেন ।

 ভদ্রলােকদের ধারণায় বাঙলার মুসলমানরা অনেক বেশি সুবিধা পেয়েছেন । তাই , তাদের বিরুদ্ধে বাঙালি ভদ্রলােকরা ক্রোধ প্রকাশ করতে থাকেন । রােয়েদাদ ঘােষণার দু'দিন পর অমৃতবাজার পত্রিকা একটি রিপাের্ট প্রকাশ করে । তাতে বলা হয় , “ হিন্দুদের দুঃখকষ্ট দেখে উল্লসিত মুসলমান রাজনীতিকরা একটা বড়পার্টির আয়ােজন কোরে বিজয় উৎসব পালন করে"।– এভাবে প্রচার যন্ত্রগুলি সাধারণ হিন্দুদের, মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতে থাকে ।

 রােয়েদাদের বিরােধিতায় কলকাতার টাউন হলে একটি সভার আয়ােজন করা হয় । সেখানে বাঙলার বহু বিশিষ্ট ভদ্রলোেকরা অংশগ্রহণ করেন । সভাপতিত্ব করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । প্রকৃতপক্ষে সেই সভাতেই একজন বক্তা মােহম্মদ আলি জিন্নাহর অনেক আগেই দ্বিজাতিতত্ত্বের পক্ষে যুক্তিগুলি উপস্থাপন করেন । তিনি বলেন , “হিন্দু ও মুসলমানের পৃথক সাংস্কৃতিক সংশ্লিষ্টতা । তাদের শিক্ষা , ব্যক্তিগত আইন এবং অনুরূপ বিষয়ের প্রেক্ষিতে তাদেরকে পৃথক জাতি হিসাবে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে । অতপর তারা অল বেঙ্গল ফেডারেশন এ্যাসেমব্লিতে একসাথে সমতা , ন্যায়পরতা এবং ভ্রাতৃত্বের শর্তে যােগ দিতে পারেন । এ ধরনের যুক্তরাষ্ট্রীয় ধারণাই বাঙলার জন্য উপযােগী হতে পারে"।

হিন্দু মহাসভার প্রখ্যাত বাঙালি নেতা ছিলেন বি.সি. চট্টোপাধ্যায় । রােয়েদাদ সম্পর্কে তিনি বলেন , “ ব্রিটিশ শাসনে বাঙালি হিন্দু সভ্যতার বিকাশ সম্ভব হয়েছে । কিন্তু এই রােয়েদাদ বাঙালি হিন্দুদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার সামিল । বাঙালি হিন্দু প্রতিভার বিকাশ এবং বাঙলায় নতুন সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিনির্মাণ হল ব্রিটিশ ভারতের এক বিস্ময়কর ঘটনা । এখন মুসলমানদের গদিতে বসানাের অর্থ হলাে – বাঙলাকে পলাশীযুদ্ধপুর্ব অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া । মুসলমানদের
                                    (৭২)


গদিতে বসানাে হলে ১৭৫৭ সাল থেকে বাঙলায় ব্রিটিশরা যা করেছে , তাকে অস্বীকার করা হবে এবং ব্রিটেন ও বাঙলার বিশ্বাসঘাতকতা শিরােনামে বাঙলার ইতিহাসে একটা নতুন অধ্যায় সংযােজন করতে হবে" । 

এতকাল জাতিয়তাবাদী ইতিহাস রচনায় পলাশী যুদ্ধের উপর এই প্রতীকী বৈশিষ্ট্য দান করা হয়েছিল যে , ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিস্তারে এটা ছিল প্রথম কলঙ্কিত অধ্যায় , আর এখন ঐ ধারণার উল্টো অবস্থানে চলে যাওয়া হলাে । এখন পরিবর্তিত ধারণায় পলাশী যুদ্ধের পরাজয়কে বলা হলাে , স্বাধীনতার মুহূর্ত হিসাবে ; অর্থাৎ পলাশী যুদ্ধের মাধ্যমেই মুসলমানদের অত্যাচার ও স্বেচ্ছাচার থেকে বাঙালি ভদ্রলােকদের ইংরেজরা উদ্ধার করে!

 সম্প্রদায়গত রােয়েদাদের বিরুদ্ধে বাঙালি ভদ্রলােকদের ক্রোধ শুধু কংগ্রেসের আভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দল ভুলিয়ে দেয়নি ; একইসাথে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি আমৃত্যু অনুগত থাকতে এবং হিন্দু মহাসভার মত উগ্র সাম্প্রদায়িক নেতৃবৃন্দের সাথে কংগ্রেসকে হাত মেলাতে উৎসাহিত করে । সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ এবং আসন্ন শাসনসংস্কারের প্রেক্ষাপটে বাঙলার উচ্চবর্ণ হিন্দুদের প্রয়ােজন ও দাবি সম্পর্কে আলােচনার জন্য কলকাতার আলবার্ট হলে হিন্দু নাগরিকদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয় । ঐ সভায় কংগ্রেসের শরৎচন্দ্র বসু , নলিনাক্ষ স্যান্যাল , তুলসীচরণ গােস্বামী , দেবেন্দ্রলাল খান ও জে এল বন্দ্যোপাধ্যায় উপস্থিত ছিলেন । ব্রিটিশের প্রতি একান্ত অনুগত ভারতীয় বেসামরিক লােকদের মধ্যকার সর্বোচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি বিজয়প্রসাদ সিংহরায় , হিন্দু মহাসভার ড . রাধাকুমুদ মুখােপাধ্যায় ও বি.সি. চট্টোপাধ্যায় , নসিপুরের রাজা বাহাদুর এবং এ ছাড়াও ছিলেন অনেক অনুগত মহারাজাবৃন্দ । — সমস্ত মনীষীবৃন্দের স্বাক্ষরিত একটি স্মারকলিপি পাঠিয়ে সম্প্রদায়গত রােয়েদাদের বিরােধিতা করা হয় । স্মারকলিপির মূল সুর হলাে , “মহান বাঙালি ভদ্রলােকশ্রেণীকে রােয়েদাদ সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকে বাঙলার অনুন্নত ও ঘৃণাযােগ্য মুসলমানদের অধীনে স্থায়ীভাবে দাসে পরিণত করবে"।

 সংস্কৃতি নিয়ে শূন্যগর্ভ দাবি অবশ্য ভদ্রলােকদের বরাবরের সংস্কৃতি । এইসব তথাকথিত ভদ্রলােকদের সংস্কৃতির সাথে সাধারণ বাঙালি হিন্দু ও অস্পৃশ্যদের কোন সম্পর্ক ছিল না । অথচ বাঙলার নমঃশূদ্র , সাঁওতাল , রাজবংশী , বাউরি , বাগদি , মাহিষ্য , সাহা , সদগােপ প্রভৃতি সম্প্রদায়গুলি হলাে মােট হিন্দু বাঙালি সমাজের বৃহত্তর অংশ । বরং এদের সঙ্গে বাঙলার মুসলমানদের সংস্কৃতির মিল ছিল অনেক বেশি । তাই , হিন্দু বাঙলাকে সমরূপে দেখানাের চেষ্টা হলাে – এইসব নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদের সম্পূর্ণ আলাদা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ঢেকে রাখার অপচেষ্টা । তাদের নিজস্ব দাবি,                                   (৭৩)


চিন্তা , চেতনা ও আশা আকাঙ্খকে অবদমিত করা ।

 নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা এবং ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তারা এই ধারণাটিকে ব্যবহার করে । ব্যাপকভাবে প্রচারিত একটি স্মারকলিপির কথা এখানে উল্লেখ করা হলাে । ৪ ঠা জুন ১৯৩৬ সালে এই স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় , এশিয়াটিক সােসাইটির প্রেসিডেন্ট দার্শনিক ব্রজেন্দ্রনাথ শীল , রসায়নবিদ ড . পি.সি. রায় এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড . শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীসহ অন্যান্য খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গ । স্মারকলিপির একাংশে লেখা হলাে , “ অতিশয় অগ্রণীঅংশ (বাঙলার হিন্দুরা) ... ব্রিটিশের অধীন প্রদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক , সাংস্কৃতিক , রাজনৈতিক , পেশাগত ও অর্থনৈতিক জীবনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে ... সংখ্যার দিক থেকে কম হওয়া সত্ত্বেও বাঙলার হিন্দুরা সাংস্কৃতিক দিক থেকে স্পষ্টভাবে শ্রেষ্ঠ ... শিক্ষিত জনগণের মধ্যে তারা শতকরা ৬৪ ভাগ ... স্বাধীন পেশার ক্ষেত্রেও তাদের সার্বিক প্রাধান্য সমভাবে দৃশ্যমান" । 

এই স্মারকলিপির ৪/৫ বছর আগে ‘হিন্দু নেতৃবৃন্দের ঘােষণাপত্র’ নামে আরেকটি স্মারকলিপি লর্ড জেটল্যান্ডের কাছে পাঠানাে হয় । যাকে 'হিন্দু নেতৃবৃন্দের মেনিফেস্টো’ নাম নিয়ে ১৯৩২ সালে হিন্দুসভা প্রচার করে । ঐ স্মারকলিপিতে লেখা হয় , “শিক্ষাগত যােগ্যতা ও রাজনৈতিক উপযুক্ততায় হিন্দু সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠত্ব , নাগরিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির উন্নয়নে তাদের অবদান এবং রাজ্যের প্রশাসনের প্রতিটি শাখায় অতীতে তাদের সেবার খতিয়ান এত সুবিদিত যে , তা পুনরুক্তি করার প্রয়ােজন নেই । শিল্প , সাহিত্য ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সমগ্র ভারতে হিন্দু বাঙালিদের সাফল্য সবার চেয়ে বেশি । অথচ বাঙলার মুসলমান সম্প্রদায় এমনকোন ব্যক্তিকে সৃষ্টি করতে পারেনি , যে ঐসব ক্ষেত্রে সর্বভারতীয় প্রসিদ্ধি  অর্জন করেছে" । 

বাঙলার মহামণীষীদের এসব বিভিন্ন দাবির সারমর্ম হলাে – বাংলায় হিন্দুরা সংখ্যায় কম হলেও , যেহেতু তারা শিক্ষা , সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বলীয়ান , তাই , মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ভবিষ্যত আইন পরিষদে , স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলিতে ও অন্যান্য সবক্ষেত্রে উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণীকে বেশি গুরুত্ব , মর্যাদা , প্রতিনিধিত্ব ও অধিকার দিতে হবে । 

আরও কয়েক বছর আগে পর পর দুটি ঘটনা ঘটে , যাতে মুসলমানদের কংগ্রেসের প্রতি মােহমুক্তি ঘটে এবং হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দেয় :                                  (৭৪)


প্রথমটি হলাে ১৯২৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে 'বাঙলা চুক্তি ' । চিত্তরঞ্জন এবং বাঙলার মুসলমান নেতৃবৃন্দ আলােচনার মাধ্যমে তিনটি বিষয়ে ঐকমত্যে আসেন ---

 ( ১ ) স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় তুলনামূলক অনগ্রসর বাঙালি মুসলমানদের জন্য মােট আসনের ৬০ শতাংশ আসন সংরক্ষিত থাকবে ।

 ( ২ ) বাঙলার নির্বাচিত আইনসভায় ( বিধানসভায় ) মুসলমানরা তাদের জনসংখ্যার সমান অর্থাৎ মােট আসনের ৫৫ শতাংশ আসন পাবেন ।

 ( ৩ ) সরকারি চাকরিতেও মুসলমানদের জন্য ৫৫ শতাংশ পদ সংরক্ষিত থাকবে । 

ঐ বছরেই অন্ধ্রের কোকনাদ শহরে কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এই ঐক্য প্রস্তাব অনুমােদনের জন্য উত্থাপন করেন ; কিন্তু প্রস্তাবটি ৪৫৮-৬৭৮ ভােটে পরাজিত হয় । 

দুটি কারণে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ এই বাঙলা চুক্তি বাতিল করে দেয় :

 ক ) মুসলমানদের সংরক্ষিত নির্বাচনক্ষেত্র দেওয়া চলে না ; কারণ তাতে গণতন্ত্রের ইজ্জত চলে যায় । 

খ ) সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণ দেওয়া যায় না , তাতে প্রশাসনের দক্ষতার মান নেমে যায় । 

ঐ সময়ে সার্বজনীন ভােটাধিকার ছিল না ; কিন্তু গণতন্ত্রের ধ্বজাধারিদের তা নিয়ে কোন মাথাব্যথা ছিল না ; বরং সার্বজনীন ভােটাধিকারের তারা বিরােধিতা করেন । অন্য দিকে , দেখা যাচ্ছে — কংগ্রেস দলটি ব্রিটিশ প্রশাসনের গুণগত মান নিয়েও খুব উদ্বিগ্ন ছিল!

দ্বিতীয় ঘটনাটি হলাে – বাঙলার এসেমব্লিতে ১৯২৮ সালে পেশ হওয়া বেঙ্গল প্রজাস্বত্ব (সংশােধনী) বিল । ঐ বিলটিতে জমিদারদের বিরুদ্ধে প্রজাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয় । ঐ বিলের উপর আলােচনার সময় কংগ্রেস ও স্বরাজ্য পার্টির প্রায় সব শাখা ও সদস্যরা ঐক্যবদ্ধভাবে এই আইন প্রণয়নের বিরােধিতা করেন (৪০ জন কাউন্সিল সদস্যের মধ্যে -৩৯ জন)। 

১৯৩০ সালে তারা আবার একটা বিলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হন । সেই বিলে প্রস্তাব করা হয় যে , প্রাথমিক শিক্ষার খরচপত্র এলাকার জমিদারি এস্টেটের উপর ন্যস্ত করা হবে । এসব কিছুতে বােঝা যায় – তারা জমিদারদের স্বার্থরক্ষায় বদ্ধপরিকর ছিলেন। 
                                   (৭৫)


এই দুটি ঘটনায় মুসলমান জাতিয়তাবাদীরা ; অর্থাৎ যে সব বাঙালি মুসলমান তখনও কংগ্রেসের সাথে ছিলেন , তারা মনে আঘাত পান এবং বুঝতে পারেন যে , মুসলমানদের স্বার্থরক্ষায় বেঙ্গল কংগ্রেসকে আর বিশ্বাস করা যায় না । তারা দেখতে পান – কেবলমাত্র ধনী , জমিদার , মধ্যবিত্তশ্রেণী ও সংখ্যালঘিষ্ঠ শিক্ষিত ভদ্রলােকশ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করতে কংগ্রেস আগ্রহী । তারা কৃষক - শ্রমিকের স্বার্থরক্ষায় অপারগ । তাই , এক সময় কংগ্রেসের ব্যাপারে মুসলমানদের যে উষ্ণ উৎসাহ ছিল , তার বদলে তাদের ক্রমবর্ধমান অনুভূতি জাগে যে, "কংগ্রেস একটা হিন্দু সংগঠন ছাড়া আর কিছু নয় । এর কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে , এটা হলাে মুসলমানদের ধ্বংস করার হিন্দু মনােবৃত্তির অন্য এক অভিব্যক্তি .. সারা ভারতে হিন্দু কংগ্রেসবাদী , স্বরাজ্যবাদী ও পুণরুজ্জীবনবাদীরা ভারত থেকে মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ষড়যন্ত্রের যে জাল বিস্তার করেছে , তা চরম বিপজ্জনক ... সুতরাং মুসলমানরা যদি তাদের ধর্ম ও সম্প্রদায়ের জন্য ন্যায্য লড়াই না করে ... কেউ তাদের রক্ষা করতে সমর্থ হবে না ” – ( রক্ষণশীল মুসলিম পত্রিকা শরীয়তে ইসলাম-এর সম্পাদকীয় , ফাল্গুন ১৩৩৬ বাঙলা সাল)। 

এই সময়ে ; অর্থাৎ ১৯৩২ সাল নাগাদ বাঙালি মুসলমানদের পক্ষে কথা বলার জন্য কোন একক মুসলমান নেতার কর্তৃত্ব বা সামাজিক প্রতিষ্ঠাও ছিল না। ফলে , বাঙালি মুসলমান রাজনীতিকদের কাছ থেকে রােয়েদাদ সম্পর্কে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আসে । 

প্রত্যেকে লক্ষ্য করেন যে , মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য রােয়েদাদে সুস্পষ্ট সুবিধা রয়েছে । তবুও কিছু মুসলমান নেতা , সম্প্রদায়ের উপর গুরুত্ব আরােপ করায় দুঃখ প্রকাশ করেন । কারণ তারা লক্ষ্য করেন যে , মুসলমানদের স্বার্থরক্ষা হলেও , হিন্দু - মুসলমান ঐক্যের সম্ভাবনাকে এই রােয়েদাদ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে । অনেকে কংগ্রেস ত্যাগ করা সত্ত্বেও জাতিয়তাবাদী রাজনীতি সম্পর্কে তাদের আনুগত্য অক্ষুন্ন রাখেন – তারা সম্প্রদায় ভিত্তিতে আইন সভাকে বিভক্ত করায় রােয়েদাদের সমালােচনা করেন । অন্যমতের মুসলমানরা রােয়েদাদে যা দেওয়া হয়েছে , তার চেয়ে অনেক বেশি সুবিধা দাবি করেন । 

রােয়েদাদ ঘােষণার ঠিক ৩ দিন পর ১৭ ই আগষ্ট , ১৯৩২ তারিখে কৃষক প্রজা পার্টির নেতা এ . কে ফজলুল হক রােয়েদাদের নিন্দা করেন প্রকাশ্যে এবং এক বিবৃতিতে জানান , “অতি প্রচারিত সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ দেশের জন্য অপ্রত্যাশিত চমক .. আমাদের ভাগ্যে এ ধরনের অসঙ্গত দলিল দীর্ঘকাল আসেনি ... ঐ দলিলে যা প্রকাশ পেয়েছে , তাতে জাতিয়তাবাদীদের অত্যন্ত মন্দ ধারণাই নিশ্চিত
                                 (৭৬)


হয়েছে ... ভারতের নতুন শাসনতন্ত্রে যদি ঐ সম্প্রদায়গত বন্দোবস্ত সংযুক্ত করা হয় ... ম্যাকডােনাল্ড তাহলে নিশ্চিত থাকতে পারেন যে , সেটি দেশে যা ভালাে ও সত্য আছে , তা তাকে স্পর্শ করতে পারবে না" (অমৃতবাজার পত্রিকা ১৭ ই আগষ্ট , ১৯৩২)।

কিন্তু উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকরা যেভাবে এবং যে ভাষায় রােয়েদাদকে আক্রমণ করতে থাকেন , তা বিস্ময়কর । তারা একে ' মুসলিম শাসনের অশরীরী মূর্তি হিসাবে বর্ণনা করেন । এসব আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় ধীরে ধীরে মুসলমান সমাজের মধ্যে রােয়েদাদের পক্ষে ঐকমত্য তৈরি হতে থাকে । অনেকেই মত পাল্টান । 

অতীতে জাতিয়তাবাদী সংগঠন কংগ্রেস , স্বরাজ্য পার্টি প্রভৃতি সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকা কয়েকজন মুসলমান যুবক একটি ঘােষণাপত্র বিলি করেন । তাতে প্রাক্তন স্বরাজী ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের প্রিয়পাত্র কলকাতার প্রাক্তন ডেপুটি মেয়র হােসেন সােহরাওয়ার্দি,   এ কে ফজলুল হক , আবুল কাশেম , আজিজুল হক , তমিজউদ্দিন খান ও মােশারফ হােসেন প্রমুখ মুসলমান সমাজের বিভিন্ন গােষ্ঠী ও শিবিরের নেতৃবৃন্দ স্বাক্ষর করেন । ঐ ঘােষণাপত্রে লেখা হয় , “মিশ্র অনুভূতি নিয়ে আমরা ঐ রােয়েদাদ পড়েছি । বর্তমান অবস্থায় এটা একটা অগ্রগতি বলে আমরা এর প্রশংসা করি । তবে প্রাদেশিক আইনসভায় বাংলার মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নাতীত দাবির কথা ঐ রােয়েদাদে স্বীকার করা হয়নি , এটা হতাশাব্যঞ্জক। ৬ টি প্রদেশে মুসলমানদের স্থায়ি সংখ্যালঘিষ্ঠের মর্যাদা এবং বাস্তবে কেন্দ্রিয় আইনসভায় তাদের গুরুত্বহীন রাজনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে বাঙলার মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধিত্বের দাবি শুধু ন্যায্য নয় , যথার্থও বটে । ঐ দাবিকে উপেক্ষা করা উচিত হয়নি । আমরা অবশ্য পরিস্থিতিজনিত সমস্যাকে স্বীকার করি ”।

 টাঙ্গাইলের একজন সম্পদশালী জমিদার ছিলেন এ.কে, গজনবী । তিনি বাঙলার মন্ত্রিসভায় দু’বার মন্ত্রি ছিলেন এবং সাইমন কমিশনেরও সদস্য ছিলেন । তিনি স্পষ্ট ভাষায় তার হতাশার কথা ব্যক্ত করেন । আশা করেছিলাম , “রােয়েদাদে বাঙলার আইন সভায় মুসলমানদের পরিষ্কারভাবে বিধিবদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেওয়া হবে । কিন্তু বাস্তবতঃ ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করার মতই , এই রােয়েদাদ আমাদের ব্রিটিশ সম্রাটের সরকারের বিশ্বাসঘাতকতার তিক্ত স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় "। 

সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ ঘােষিত হয় ১৪ ই আগষ্ট , ১৯৩২ তাঁতিক্ষে। এই আগষ্ট মাসের একেবারে শুরুতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বি.পি সিংহরায় বেঙ্গল কাউন্সিলে যৌথ নির্বাচনের প্রস্তাবসহ পৌরসভার নির্বাচন সংক্রান্ত একটি বিল আনেন ।
                               (৭৭)


ওই প্রস্তাবে পৌরসভায় আসন সংরক্ষণের কথা ছিল না। কিন্তু বেশ কয়েকজন মুসলমান কাউন্সিল সদস্য ঐ বিলকে সমর্থন করেন । ফজলুল হক সহ একাধিক কাউন্সিল সদস্য ঐ বিলকে অভিনন্দন জানান । ৮ জন মুসলমান সদস্য বিলের পক্ষে এবং ২০ জন মুসলমান সদস্য বিলের বিপক্ষে ভােট দেন । জনাব সামাদ বলেন – কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে অধিকাংশ মুসলমান ঐ বিলের পক্ষে ভােট দিতে প্রস্তুত ছিলেন । যার মধ্যে অন্যতম শর্ত হলাে সার্বজনীন ভােটাধিকার ।

পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা সম্পর্কে অস্পৃশ্যদের (তফসিলী শ্রেণী) সর্বভারতীয় আন্দোলনের ক্ষেত্রেও মতপার্থক্য ছিল । এম . সি . রাজা এবং ড . আম্বেদকর এ প্রশ্নে ভিন্নমত পােষণ করেন । ড . আম্বেদকরও অন্ততঃ একবার সার্বজনীন ভােটাধিকারের শর্তে পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার দাবি ছাড়ার কথা ঘােষণা করেছিলেন । 

কিন্তু বাঙলার ক্ষেত্রে রােয়েদাদের বিরুদ্ধে ভদ্রলােকদের বিরােধিতার প্রচণ্ডতার প্রতিক্রিয়ায় মুসলমানরা পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হন । সময় যত যেতে থাকে ভদ্রলােকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সুর চড়াতে থাকেন । এ অবস্থায় এক সময় উত্তেজিত ফজলুল হক ঘােষণা করতে বাধ্য হন , “আমি যদি কোন বিচারককে সন্তুষ্টির জন্য একথা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হই যে , বাঙলার হিন্দুরা গভীর স্বার্থপরতার ওপর ভিত্তিশীল সাম্প্রদায়িকতার প্রতিরূপ , তাহলে আমি ফাঁসিতে ঝুলতে প্রস্তুত আছি ” (স্টেটসম্যান পত্রিকা , ১২ অক্টোবর ১৯৩৩) । এভাবে রােয়েদাদকে গড়ে তােলা হয় বিভক্তি ও বিবাদের কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে । হিন্দু ও মুসলমান রাজনীতিকরা পৃথক হয়ে যান । বাঙলার রাজনীতি ক্রমবর্ধমানভাবে দুই পৃথক সম্প্রদায়গত গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যায় । 

মহাত্মা গান্ধী স্বয়ং ১৯৩১ সালে দ্বিতীয় গােলটেবিল বৈঠকে যােগ দিয়েছিলেন । সেখানে তিনি মুসলমান , শিখ ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা মেনে নিলেও অস্পৃশ্যশ্রেণীর জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা মানতে রাজি হননি । তিনি হুমকি দিয়ে বলেন , “আমার যতটা আধিপত্য আছে , ততটা গুরুত্ব দিয়ে বলছি যে , আমার সঙ্গে যদি আর কেউ নাও থাকেন , তাহলেও আমি আমার জীবন দিয়ে অস্পৃশ্যদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিরােধ করবাে ”।
        ৭৮


                           সপ্তম অধ্যায়
 সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ , পুনাচুক্তি ও বাঙলা কংগ্রেস


ইংরেজ সরকারের প্রতি  মহাত্মা গান্ধীর হুমকির পরেও বিভিন্ন সূত্রে খবর বেরিয়ে আসে যে , ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ম্যাকডােনাল্ড ড.আম্বেদকরের দাবি মেনে অস্পৃশ্যদের পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার পক্ষে ঘােষণা করতে চলেছেন । তখন মহাত্মা গান্ধী আবারও চিঠি লিখে ইংরেজ সরকারকে আমরণ অনশনের হুমকি দেন । ১৯৩২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এই চিঠির জবাবে লেখেন , “আপনার অনশনের কারণ হলাে , নির্যাতিতশ্রেণীর মানুষ যেন তাদের পক্ষে কথা বলার জন্য নিজেদের কোন প্রতিনিধি নির্বাচিত না করতে পারেন"। – ব্রিটিশরা মহাত্মা গান্ধীর দাবি মানেন না । তাই , ১৯৩২ সালের ২০ শে সেপ্টেম্বর পূণার যারবেদা জেলে আটক অবস্থায় তিনি আমরণ অনশন আন্দোলন শুরু করেন । তাঁর দাবি ছিল , সম্প্রদায়গত রােয়েদাদের যে অংশে অস্পৃশ্যদের পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে , শুধুমাত্র তা প্রত্যাহার করা । অনশনের চতুর্থদিনে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় , যা পূণাচুক্তি নামে খ্যাত বা অখ্যাত । এই চুক্তির ফলে অস্পৃশ্যদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার সুযােগ হাতছাড়া হয়ে যায় ; কিন্তু একইসাথে সম্প্রদায়গত রােয়েদাদে যেখানে সারাভারতের প্রাদেশিক আইন সভায় তফসিলীদের জন্য মাত্র ৭১ টি আসন সংরক্ষিত করা হয়েছিল , এই চুক্তির ফলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪৮ ; অর্থাৎ দ্বিগুণেরও ৬ টি আসন বেশি । কিন্তু বাঙলার ক্ষেত্রে তফসিলীদের সংরক্ষিত আসন হয়ে যায় ৩ গুণ ; অর্থাৎ বাঙলার প্রাদেশিক আইনসভায় অস্পৃশ্য বা তফসিলীদের জন্য ৩০ টি আসন সংরক্ষণ করা হয় । বাঙলার প্রাদেশিক আইনসভায় ভদ্রলােকশ্রেণীর আসন সংখ্যা ৭০ থেকে কমে দাঁড়ায় ৫০,  যা মােট আসনের মাত্র ২০ শতাংশ । আর ১৭.৬০ শতাংশ অস্পৃশ্যরা পান ১২ শতাংশ আসন । রােয়েদাদের বিরুদ্ধে গান্ধীর অনশন আন্দোলনকে বাঙলার ভদ্রলােকশ্রেণী জোরালো সমর্থন দেন । হয়তাে তারা আশা করেছিলেন যে, এই অনশনের জন্য গোটা সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ বাতিল বলে ঘােষিত হতে পারে। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু
                                (৭৯)

এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যৌথ আহ্বানে কলকাতার ভারতসভা হলে ভদ্রলােকশ্রেণীর সভা হয়। গান্ধীর আন্দোলনের সমর্থনে প্রস্তাব পাশ হয় । সেই বার্তা নিয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পূণার উদ্দেশ্যে রওনা হন গান্ধীকে শক্তি ও সাহস জোগাতে । পুনাচুক্তি সম্পাদন হওয়ায় গান্ধী অনশন ভঙ্গ করেন । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পূণাচুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বা সমর্থন করেন। কিন্তু যখন বাঙলার ভদ্রলােকশ্রেণী দেখলেন ও জানলেন যে , ঐ চুক্তিতে তাদের আশা ও আকাঙ্খা মেটেনি ; বরং তাদের জন্য তা আরও অসুবিধাজনক হয়েছে , তখন তারা ক্ষিপ্ত হন । স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে এক অর্থে অপদস্থ করা হয় ঐ চুক্তিতে স্বাক্ষর বা সমর্থন করার জন্য । তাকে বাধ্য করা হয় বড়লাটকে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে স্বাক্ষর ও সমর্থন প্রত্যাহার করার জন্য । টেলিগ্রামে রবীন্দ্রনাথ লিখতে বাধ্য হন, “আমি রাজনীতির লােক নই । তাই , ভাল-মন্দ না বুঝে আমি ঐ দলিলে স্বাক্ষর করেছি – তা এখন প্রত্যাহার করে নিচ্ছি” (পুরো বিষয়বস্তু এই বইয়ে আগে বিশদে বলা হয়েছে)। সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ এবং পূণাচুক্তির ফলে কংগ্রেস হাইকমান্ড ও স্বয়ং গান্ধীর সাথে বাঙালি কংগ্রেস নেতাকর্মীদের সম্পর্কে চিড় ধরে । তারা এই চুক্তিকে বাঙলার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা বলে অভিহিত করেন । মিঃ জে , এল ব্যানার্জী বাঙলার কাউন্সিলে এক জ্বালাময়ী ভাষণে ঘােষণা করেন , “পরিস্থিতির একটা সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি হল যে , জাতীয়তাবাদের সংস্কারক নেতা (গান্ধী) নিজেকে বাঙলার জাতীয়তাবাদের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসাবে প্রমাণ করেছেন” । যাই হােক না কেন , কংগ্রেস দল তার সর্বভারতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের শান্ত করার প্রয়ােজন ছিল এবং হাইকমান্ড বাঙলার ভদ্রলােকশ্রেণীর দাবিকে উপেক্ষা করে । এই অবস্থায় বাঙলার কংগ্রেস দলের দায়িত্ব তারা এমন লােকের হাতে দিয়ে রাখতে চায় , যারা , কেন্দ্রের কথা মতাে চলবে । সুভাষচন্দ্র বসু ও তার সমর্থকরা কেন্দ্রের এই মানসিকতার বিরােধিতা শুরু করেন । কেন্দ্রের কর্তৃত্ব অস্বীকার করে নিজেদের পথে চলতে থাকেন । সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ এবং পুনাচুক্তির জোরদার বিরােধিতা করায় সুভাষচন্দ্র বসু বহুলােকের সমর্থন পান । এই সমর্থনের পাল্লা এতবেশি ভারি ছিল যে , তাকে আর উপদল বলা চলে না । এই সময়ে ১৯৩৪ সালের ১৮ ই আগস্ট বসু ভ্রাতৃদ্বয় (সুভাষচন্দ্র এবং শরৎচন্দ্র বসু) ন্যাশনালিস্ট পার্টির বেঙ্গল কমিটি গঠন করেন । আইনসভার ভেতরে এবং বাইরে সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ ও পূণা চুক্তির বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করেন। রােয়েদাদের প্রতিক্রিয়ায় বেঙ্গল কংগ্রেসে যে ঐক্য স্থাপিত হয়েছিল , এখন আবার তা সরাসরি দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায় । 
                               (৮০)


১৯২৭ সালে গান্ধী বেঙ্গল কংগ্রেসের সভাপতি নিযুক্ত করেছিলেন যতীন্দ্রমােহন সেনগুপ্তকে । ১৯৩৩ সালে তিনি মারা যাবার পর বাঙলা কংগ্রেসের দায়িত্ব অর্পিত হয় ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের উপর । ডাঃ রায় মহাশয় কিরণশংকর রায় এবং নলিনীরঞ্জন সরকারের সমর্থন পেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠেন । সুভাষচন্দ্র বসু এবং শরৎচন্দ্র বসু - --এই দুই ভাই পরিচালিত গ্রুপ অত্যন্ত কঠোরভাবে রােয়েদাদ এবং পুনাচুক্তির বিরােধিতা চালিয়ে যান । ১৯৩৪ সালের দিকে ডাঃ রায় খবর পেতে থাকেন যে , জনমত ন্যাশনালিস্ট পার্টি  অর্থাৎ বসু ভ্রাতৃদ্বয়ের পক্ষে । শরৎচন্দ্র বসু বেঙ্গল প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটিতে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন । তাহলাে , “সম্প্রদায়গত সিদ্ধান্তের ব্যাপারে বলা যায় , সমস্যা সর্বভারতীয় হলেও বাঙলাপ্রদেশের জন্য তা অত্যন্ত গভীর ও অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ... সম্প্রদায়গত ঐ সিদ্ধান্তকে প্রত্যাহার করার জন্য আইনসভার অভ্যন্তরে ও বাইরে আন্দোলন পরিচালনা করা প্রাদেশিক কংগ্রেস সংগঠনের একটা কর্তব্য" । – এই প্রস্তাব অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয় । এই প্রস্তাব কংগ্রেসের কেন্দ্রিয় ওয়ার্কিং কমিটিতে নিজের মতামত লিখে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় পাঠিয়ে দেন । তিনি লেখেন , “এর মাধ্যমে রােয়েদাদ সম্পর্কে ন্যাশনালিস্ট পার্টি ও কংগ্রেসের মধ্যে যে মতপার্থক্য আছে , তার নিরসন হবে"। কিন্তু কোনভাবেই কেন্দ্রিয় নেতৃত্ব এই প্রস্তাবে সায় দিল না ; বরং ডাঃ রায়কে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তিরস্কার করলেন ঐ মতামত লিখে পাঠাবার জন্য । কেন্দ্রীয় কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ আশা করেছিলেন যে , ডাঃ রায় বাঙলার কংগ্রেসে বসু পরিবারের কর্তৃত্ব খর্ব করতে পারবেন । কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় কোন অর্থেই শরৎচন্দ্র বসুর সমকক্ষ ছিলেন না । ফলে , কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সে আশা ব্যর্থ হয় । শ্রীবসু কংগ্রেস হাইকমান্ড ও গান্ধীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত হন । সেই সময়ে শরৎচন্দ্র বসু বাঙলাপ্রদেশ কংগ্রেসের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি । ফলে , পণ্ডিত নেহেরু একটু নরম হন ; কিন্তু অবস্থান বদল করতে রাজি হন না । ডাঃ রায় বেগতিক দেখে হাইকমান্ডের সাথে চলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করেন । কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ন্যাশনালিস্টরা ১৯৩৭ সালের আইনসভার নির্বাচনে প্রার্থী দাঁড় করিয়ে রােয়েদাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা লিখে ঘােষণাপত্র বিলি করেন । এই সময়ে বল্লভভাই প্যাটেল শক্ত হাতে হাল ধরেন । কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টারি বাের্ডের সভাপতি হিসাবে তিনি ঘোষণা করেন যে , এই জাতীয় বিশৃঙ্খলা বরদাস্ত করা হবে না। এই হুমকিতে বাঙলার রয়েল বেঙ্গল টাইগাররা পিছু হটেন । ন্যাশনালিস্ট নিয়ন্ত্রিত বেঙ্গল প্রদেশকংগ্রেস কমিটি ৮ ই নভেম্বর , ১৯৩৬ তারিখের ঘােষণাপত্র পরিবর্তন করে রােয়েদাদের প্রতিটি বক্তব্যই গ্রহণ করে ।                               (৮১)


                          অষ্টম অধ্যায়
              ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন


 ১৯৩৭ সালের গােড়াতে প্রাদেশিক আইন সভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় । নির্বাচনে ৪ টি প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল । কংগ্রেস , মুসলিম লীগ , কৃষক প্রজা পার্টি এবং স্বতন্ত্রপন্থিরা (নির্দল)।

 কৃষক প্রজা পাটি জমিদার ও জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে এবং জোতদার ও প্রজা কৃষকদের স্বার্থের পক্ষে নির্বাচনী প্রচার শুরু করে । পার্টি গঠনের সময়ে ফজলুল হক যে সমস্ত কর্মসূচী ঘােষণা করেছিলেন , তা এই লেখায় পূর্বে আলােচনা করা হয়েছে । ঐসব কর্মসূচীর সাথে রাজবন্দিদের মুক্তির বিষয়টিও তিনি যুক্ত করেন । এককথায় বলতে গেলে এই নির্বাচনে একমাত্র কৃষক প্রজা পার্টি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক শক্তি । 

এই পার্টিতে অনেক হিন্দু ও তফসিলী সম্প্রদায়ের নেতা , কর্মী ও সমর্থক ছিলেন । তাদের মধ্যে অনেকে ছিলেন জোতদার । কিন্তু এই পার্টি কোন হিন্দু বা তফসিলী সংরক্ষিত আসনে প্রার্থী দেয়নি । সম্ভবতঃ কংগ্রেস দলের সাথে এক অলিখিত সমঝােতার জন্যই ঐসব আসনে প্রার্থী দেওয়া হয়নি । একইকারণে কংগ্রেসও গ্রামাঞ্চলে কোন মুসলমান সংরক্ষিত আসনে প্রার্থী দেয় না । কিন্তু নির্বাচন প্রক্রিয়ায় এই যে সমঝােতার পরিবেশ ছিল , নির্বাচনের পর তার পরিবর্তন হয় । শেষ পর্যন্ত কৃষক প্রজা পার্টির সাথে মুসলিম লীগের কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয় – যে আলােচনা আমরা পরে করবাে । 

নির্বাচনের প্রাক্কালে ফজলুল হক মুসলিম লীগের নেতা ঢাকার নবাব খাজা নাজিমুদ্দিনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন , “নবাব নিজের পছন্দমতাে কেন্দ্র বেছে নিন , আপনি যেখানে দাঁড়াবেন , সেই কেন্দ্রে আপনাকে পরাস্ত করবাে” । নবাব তার নিজের এস্টেটের অংশ পটুয়াখালী (উত্তর) কেন্দ্রে দাঁড়াবার সিদ্ধান্ত নেন । এই এলাকায় ১৯২৭ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় । মুসলিম লীগ এখানে বাড়তি
                                   (৮২)


সুবিধা পাবে বলে দল অনুমান করেছিল । তাই , নিশ্চিত কেন্দ্র মনে করে এই কেন্দ্রে পার্টির নেতা নাজিমুদ্দিনকে দল মনােনয়ন দেয় । 

এই নির্বাচনে ঢাকার আহসান মনজিলের সব ক্ষমতা এবং প্রতিপত্তিকে কাজে লাগানাে হয় । ইসলামের প্রতি আহ্বান জানিয়ে পল্লি এলাকার ভােটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা হয় । এমনকি স্যার জন আন্ডারসন ঐ সময়ে পটুয়াখালী সফর করে খাজা নাজিমুদ্দিন সাহেবকে ভােট দেবার আহ্বান জানিয়ে এক বেনজির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন । 

ফজলুল হক বলেন , “এ হলাে জমিদার এবং কৃষকদের মধ্যকার সর্বাত্বক সংগ্রাম । নির্বাচনে জিততে পারলে আমি আল্লাহর রহমতে সম্ভাব্য সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে জমিদারি প্রথা বাতিল করবাে ।... কৃষকদের দাবি পূরণে হক সরকার ব্যর্থ হলে , আমি রাইটার্স বিল্ডিং - কে লালদীঘিতে নিক্ষেপ করবাে”।  নির্বাচনে নাজিমুদ্দিন শােচনীয়ভাবে পরাজিত হন । তিনি হক সাহেবের প্রাপ্ত ভােটের অর্ধেকেরও কম, মাত্র ৬৩০৮ টি ভােট পান । হােসেন সােহরাওয়ার্দি কলকাতার দুটো আসনে দাঁড়িয়ে দু’টিতেই জয়যুক্ত হন । একটি ছেড়ে দেন এবং উপনির্বাচনে নাজিমুদ্দিন সাহেব বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন । 

মুসলিম লীগের সর্বভারতীয় নেতা মােহাম্মদ আলি জিন্নাহ এবং বাঙলার মুসলিম লীগের অন্যতম প্রধান নেতা হােসেন সােহরাওয়ার্দি প্রমুখ ব্যক্তি , সাম্প্রদায়িক ও ধর্মভীরু ছিলেন না । কিন্তু মুসলিম লীগের নির্বাচনী প্রচারণায় শুধুমাত্র মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যের ডাক এবং সামগ্রিকভাবে মুসলমান সম্প্রদায়ের কল্যাণের আহ্বান জানানাে হয় । লীগ দাবি করে যে , তাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলাে প্রজাকৃষক ও শ্রমিকদের ভাগ্যের উন্নতি করা । এই নির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি ছিল কৃষক প্রজা পার্টি । ফলে , হিন্দুদের বিরুদ্ধে লড়াই যতটা নয় , মুসলমান সম্প্রদায়ের নিজেদের মধ্যে এই লড়াই প্রায় গৃহযুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করে । ফজলুল হকের মােকাবিলা করতে মুসলিম লীগকে অনেক লােকপ্রিয় কর্মসূচী ঘােষণা করতে হয়।

 মুসলিম লীগের থেকেও কংগ্রেসের অবস্থা ছিল বেশি সমস্যার । মােট ২৫০ টি আসনের মধ্যে ১৭৮ টি আসনের সদস্য নির্বাচিত হবে পল্লী এলাকার ভােটারদের দ্বারা । সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ অনুযায়ী কংগ্রেস যদি শুধু হিন্দুদের জন্য বরাদ্দকৃত আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে , তাহলে তাদেরকে মােট ৮০ টি আসনের মধ্যে ৬৬ টি পল্লী এলাকার আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে । এসব এলাকার ভূমিসংক্রান্ত বিরােধকে শুধুমাত্র সাম্প্রদায়িক বিরােধ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না । এ অবস্থায়
                                (৮৩)


প্রদেশ কংগ্রেস পল্লী এলাকার ভােটের সন্ধানে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পুণর্বিবেচনা করতে বাধ্য হয় । 

নতুন ভােটারদের নিয়ে অংকের হিসাব এবং অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব বেঙ্গল কংগ্রেসের সামনে বড় সমস্যা হিসাবে দেখা দেয় । তাদের সমর্থক জমিদার ও মধ্যবর্তী রায়তস্বত্বের অধিকারীরা ছিলেন ভীষণ সংকটের মধ্যে । কংগ্রেস জমিদার ও সুদ ব্যবসায়িদের স্বার্থ পাশ কাটিয়ে সাধারণতঃ বৃটিশ বিরােধী কর্মসূচী নিয়ে আন্দোলন করতাে । জমিদারি প্রথা বিলােপ , সুদ ও খাজনা বন্ধের মত দাবিগুলি তারা কখনও সমর্থন করতাে না । 

প্রকৃতপক্ষে কংগ্রেস দলের বেশিরভাগ নেতা ছিলেন অনুপস্থিত  জমিদার, মফঃস্বল এলাকায় তাদের অনেকের এস্টেট ছিল এবং যেকোনভাবেই হােক তাদের খাজনা আদায় সংক্রান্ত স্বার্থ ছিল । যেমন : ঢাকায় কিরণশংকর রায়ের বিরাট জমিদারি ছিল । তুলসীচরণ গােস্বামী ছিলেন সম্পদশালী ভূস্বামী । তারকনাথ মুখার্জীর উত্তরপাড়ায় জমিদারি ছিল । যুগান্তর গ্রুপের নেতা , পরে বাঙলা কংগ্রেসের সভাপতি সুরেন্দ্রমােহন ঘােষ ছিলেন ময়মনসিংহের জমিদার । বিজয় রায়চৌধুরী ছিলেন তুলসীঘাটার জমিদার । এভাবে দেখা যায় অধিকাংশ কংগ্রেস নেতার পল্লী এলাকায় অনেক ভূসম্পত্তি ছিল । প্রায় সব নেতা কর্মীদের , শরিকানায় ও মধ্যস্বত্বের অধিকারে খাজনা আদায়ের স্বার্থ ছিল । এই দল চলতাে মফঃস্বল এলাকার জমির মালিক ও সুদ ব্যবসায়িদের পৃষ্টপােষকতায় । গান্ধীবাদী আশ্রমগুলি চলতাে জমিদারদের টাকায় । জমিদার ইন্দুভূষণ গুপ্ত , জমিদার কালীপ্রসন্ন গুহচৌধুরী , গঙ্গাজলঘাটার স্থানীয় জমিদার , সােনামুখী , শিমলিপলের রাজপরিবার , গৌরীপুরের জমিদার বিজেন্দ্র কিশাের প্রভৃতি জমিদার ও রাজপরিবারের সদস্যরা টাকা দিতেন । ফলে কংগ্রেসের পক্ষে জমিদারদের স্বার্থ উপেক্ষা করা কঠিন ছিল ।

 সাধারণতঃ জেলার ভদ্রলােকদের মধ্যথেকে এই দলের সদস্য নেওয়া হতাে । দলের সদস্যদের মধ্যে ছিল স্কুলশিক্ষক , উকিল , বেতনভােগী কর্মচারী এবং নিশ্চিতভাবে ছাত্ররা । ত্রিশের দশকের প্রথমদিক থেকে বেঙ্গল কংগ্রেস হয়ে পড়ে পুরােপুরি শহরভিত্তিক – যদিও ভূমি সম্পর্কিত স্বার্থের সাথে এই দলের সম্পর্ক তখনও পর্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল । 

এরকম এক পরিস্থিতিতে বেঙ্গল কংগ্রেস নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলে অবাক হবার কিছু ছিল না । কিন্তু হাইকমান্ড যেহেতু নির্বাচনে লড়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে , তাই , তাদের পিছু হটার জায়গা ছিল না । 

এই অবস্থায় আশার জায়গা এটুকু ছিল যে , পার্টির একটা ক্ষুদ্র অংশ কৃষকদের
                                      (৮৪)


স্বার্থে লড়াই করতে ইচ্ছুক ছিলেন । তাদের পল্লী অঞ্চলে কিছু ভিত্তি ও গ্রহণযােগ্যতাও ছিল । সন্ত্রাসী গ্রুপগুলাের কিছু নেতা জেলে ছিলেন , ইতিমধ্যে তারা ছাড়া পান । তাদের মধ্যে অনেকেই মার্কসবাদে দীক্ষিত হয়েছিলেন । এই নির্বাচনে তারা কংগ্রেসের পাশে দাঁড়ান । কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইণ্ডিয়া কৌশল হিসাবে ১৯৩৫ সালে কংগ্রেসের সাথে কাজ করার লক্ষ্যে ইউনাইটেড ফ্রন্ট গঠন করে ।

 এ প্রসঙ্গে ছােট্ট একটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৯৩৩ সাল নাগাদ শরৎচন্দ্র বসু এবং প্রফুল্ল ঘােষ মেদিনীপুরে একটি সভা করতে যান । ঐ সময় মেদিনীপুর ছিল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি । সেই সভাতে খুব অল্প লােক হাজির হন । তাদের বক্তৃতা চলাকালে শ্রোতারা বার বার বাধা দেন । সভা শেষ হলে , একজন স্থানীয় সাধারণ লােক উঠে দাঁড়িয়ে স্পষ্টভাবে বলেন , “কংগ্রেস তাদের কাছে শুধু ভােট চাওয়ার জন্য এসেছেন ... কিন্তু যখন তারা দুর্দশার মধ্যে ছিলেন , তখন কংগ্রেসকে দেখা যায়নি"।

যাহােক , এই দুরবস্থার মধ্যেও বামপন্থী ও প্রাক্তন সন্ত্রাসীদের সহায়তায় কংগ্রেস নির্বাচনী লড়াই করে এবং মােটামুটি সাফল্য লাভ করে । আসলে যে সাম্প্রদায়িক বাতাবরণ বাঙলায় সৃষ্টি করা হয় , সেই অবস্থায় হিন্দুদের কংগ্রেসকে ভােট দেওয়া ছাড়া কোন বিকল্প ছিল না । কারণ তখন ছিল পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা। 

এই নির্বাচনে কংগ্রেস ৫২ টি আসন লাভ করে নতুন আইন সভায় একক বৃহত্তম দল হয় ; কিন্তু তার অবস্থান হয় প্রধান বিরােধী দল হিসাবে । হিন্দুদের মধ্যকার বাকি আসনে স্বতন্ত্রপ্রার্থীরা জয়লাভ করেন । 

মােট ভােটের শতকরা ৩১.৫০ ভাগ ভােট পেয়ে কৃষক প্রজা পার্টি সর্বমােট ৩৬ টি আসন পায় । তারমধ্যে পল্লী এলাকায় ৩৩ টি এবং বাকি ৩ টি আসন পায় মফঃস্বল এলাকায় । 

মুসলিম লীগ পায় মােট ভােটের – ২৭.১০ ভাগ । কিন্তু তারা মােট আসন পায় ৩৯ টি । তারমধ্যে পল্লী এলাকায় ২৭ টি , শহর এলাকায় পায় ৬ টি এবং মফস্বল এলাকায় ৬ টি আসন পায় মুসলিম লীগ । বাকি ৪২ টি মুসলিম সংরক্ষিত আসন পায় স্বতন্ত্রপ্রার্থীরা – যার অধিকাংশ ছিলেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি , যাদের প্রত্যেকের নিজ নিজ এলাকার ভােটারদের উপর কর্তৃত্ব ছিল । এই সব আসনের মধ্যে টিপেরা (কুমিল্লা) কৃষক সমিতি নামে একটি সংগঠন ঐ জেলার ৭ টি আসনের মধ্যে ৫ টি আসন দখল করে । কৃষকনেতা ওয়াসিমুদ্দিন আহমদ টিপেরা (কুমিল্লা) কেন্দ্রিয় নির্বাচনী এলাকা থেকে তখনকার মন্ত্রী , জমিদার ও নবাব স্যার কে জি  এম ফারুকিকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন । 
                            (৮৫)


দু’জন অত্যন্ত প্রভাবশালী মুসলমান রাজনীতিকের সম্প্রদায়ভিত্তিক আহ্বান গ্রামের সাধারণ মুসলমান ভােটাররা কীভাবে প্রতিহত করে তার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় নবাব ফারুকী এবং ঢাকার নবাব খাজা নাজিমুদ্দিনের শােচনীয় পরাজয়ের মাধ্যমে । তাই , মুসলিম লীগকে ভােট দেওয়া মানে বাঙলার কৃষকদের মুসলিম লীগকে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন বা পছন্দের ভােট , একথা নিদ্বিধায় বলা যাবে না । বাঙলার কৃষক সম্প্রদায়ের ঐক্যের অনুভূতি নিছক ধর্মভিত্তিক ছিল না । ( চলবে)

                           (৮৬)






মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

তৃণমূল নেত্রী ফের সংসদে

যদা যদা হি ধর্মস্য... গীতার এই শ্লোকে ঠিক কী বলা হয়েছে?

ভাতে কেরোসিন যাত্রাপুরে, অভিযোগ বাংলাদেশী