পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা

                 পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা 
(১৫ জানুয়ারি , ২০০৯ তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদন) 


একদিন কথা বলছিলাম উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগর ব্লকের নিত্যানন্দকাঠি গ্রামের একজন বিশিষ্ট ভদ্রলােকের সাথে । তিনি মুসলমান এবং সিপিএম দলের স্থানীয় নেতা । আগে দুবার অঞ্চল পঞ্চায়েতের প্রধান ছিলেন । গত দুই টার্ম তার দল অঞ্চল দখল করতে পারেনি । কংগ্রেসিরা দখল নিয়েছেন । শিক্ষা , কৃষি , শিল্প , আইনশৃঙ্খলা প্রভৃতি সবক্ষেত্রে বামফ্রন্ট সরকারের ব্যর্থতার সাথে যখন বললাম – স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ দেশের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ , তখন তিনি মৃদু প্রতিবাদ করলেন । বললেন , না না , সবথেকে খারাপ কেন হবে!---এটা আপনি বাড়িয়ে বলছেন । বললাম , যােজনা কমিশন সব রাজ্যের হিসাব পর্যালােচনা করে সেমতই বলছে । 

রাজ্যে মাথাপিছু হাসপাতালে বেড - এর সংখ্যা , মাথাপিছু ডাক্তার ও নার্স । নার্স এবং ডাক্তারদের পরিষেবা দেবার মানসিকতা , হাসপাতালে প্রয়ােজনীয় যন্ত্রপাতির সংখ্যা ও মান , যন্ত্র কতদিন বিকল থাকে বা সচল থাকে , বাজেট বরাদ্দ , শিশুমৃত্যু ও অপুটি — এমন সব তথ্যের উপর ভিত্তি করে যােজনা কমিশন পরিষেবা যাচাই করে বলে তাঁকে জানালাম । কথা বাড়াননি ভদ্রলােক ; কিন্তু মুখ দেখে বােঝা গেল যে , আমার কথা তাঁর বিশ্বাস হয়নি । আমার মনে হয় ভদ্রলােক যদি আজকের আনন্দবাজার (৭ ই জানুয়ারি’০৯ , বুধবার) পত্রিকাটি পড়েন , তাহলে হয়তাে এবার আমার কথা বিশ্বাস করলেও করতে পারেন । 

আনন্দবাজারে প্রকাশিত খবরের তথ্য হলাে--- পশ্চিমবঙ্গের ২২ শতাংশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিদ্যুৎ সংযােগ নেই । পাথর প্রতিমার গদামাথুরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মত কেন্দ্রগুলিতে মাসে ৩৫ টি থেকে ৪৫ টি শিশু জন্মগ্রহণ করে । প্রসবের সময় প্রসূতির বাড়ির লােকজন থাকলে নার্স - আয়ারা তাদের হ্যারিকেন এগিয়ে ধরতে বলেন , বাড়ির লোকজনকে পাওয়া না গেলে, মুখে চলাইট কামড়ে ধরে নার্সরা মায়েদের প্রসব করান।

সরকারি হিসাব বলছে--- জাতীয় গ্রামীণ স্বাস্থ্য মিশনের ৪১৯ কোটি টাকা খরচ করেনি পশ্চিমবঙ্গের সরকার। এই টাকা হলো---এই প্রকল্পে বরাদ্দ মোট টাকার ৮৬ শতাংশ । অর্থাৎ সরকার খরচ করেছে মাত্র ১৪ শতাংশ টাকা। 

পৃথিবীর অন্যান্য অধিকাংশ দেশ স্বাস্থ্য খাতে তাদের দেশের মােট জাতীয় উৎপাদনের ৪ থেকে ৫ শতাংশ খরচ করে । ভারত অর্থাৎ কেন্দ্রিয় সরকার স্বাস্থ্য খাতে খরচ করে মাত্র ১.১ শতাংশ । অমর্ত্য সেন জানাচ্ছেন--- স্বাস্থ্যখাতে কম বরাদ্দের ব্যাপার নিয়ে তিনি যােজনা কমিশনের সাথে কথা বলেছেন । যােজনা কমিশন জানাচ্ছে যে, বেশি টাকা বরাদ্দ করলেও বেশি কাজ হবে বলে তারা ভাবছেন না । তাই , বরাদ্দ বাড়াচ্ছেন না। কম বরাদ্দ , তাতেই বরাদ্দ করা টাকার মাত্র ১৪ শতাংশ খরচ হচ্ছে । ফলে , ঠিকই তাে , বেশি বরাদ্দ করে লাভ কি !

অমর্ত্য সেন বলছেন প্রাথমিক শিক্ষা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্য, বামপন্থিদের কাছে যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না । তিনি হীরেন মুখােপাধ্যায় স্মারক বক্তব্যে ভারতের পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছেন – মনে হয় না ভারত-মার্কিন পারমাণবিক চুক্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল । বামপন্থিরা সাম্রাজ্যবাদের সাথে লড়াইয়ের উপর জোর দেয় ; কিন্তু অপুষ্টি , নিরক্ষরতা , চিকিৎসার অভাব প্রভৃতি যা কিছু দরিদ্রদের জীবন নরক করে তুলেছে , সে বিষয়ে মনােযােগ দেয় না । তার প্রশ্ন হলাে – সাম্রাজ্যবাদ স্বাস্থ্য খাতে বেশি বরাদ্দ করতে বাধা দেয় না বা বেশি নার্স নিয়ােগ করতে আটকায় না , তাহলে এ হাল কেন ? 

বামপন্থিরা বলবেন – একটি রাজ্যের ক্ষমতা নিয়ে এমন কী আর করা যায়, সব ক্ষমতাইতাে কেন্দ্রের হাতে । বাস্তবতঃ এসব কথাই গত ৩২ বছর তারা বলে আসছেন। অমর্ত্য সেন পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন , অন্যরা তা পারলাে কী করে ? তিনি তামিলনাড়ু রাজ্যের উদাহরণ দিয়েছেন । সেখানে বরাবর অকংগ্রেসী ও অবিজেপি সরকার । তিনি বলছেন , তামিলনাড়ুতে একটিও প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই, যেখানে টেলিফোন নেই । পক্ষান্তরে পশ্চিমবঙ্গে বােধহয় এমন একটাও প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই , যেখানে টেলিফোন আছে । পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলির যা কিছু পরিকাঠামাে অর্থাৎ রাস্তা , জল , বিদ্যুৎ , প্রতিটিতেই বড়সড় গলদ আছে । অথচ গ্রামীণ স্বাস্থ্য মিশনের সমীক্ষায় এসব ব্যাপারে তামিলনাড়ু ফুল মার্ক পেয়েছে ।

 অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলির জন্য তামিলনাড়ু সরকার খরচ করে ১২১০ কোটি টাকা, যেখানে পশ্চিমবঙ্গ সরকার খরচ করেছে ৩৬৪ কোটি টাকা । যদিও তামিলনাড়ু থেকে পশ্চিমবঙ্গের লােকসংখ্যা ২ কোটি বেশি । 

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এইসব অবহেলার কারণ কী ? অমর্ত্য সেন তা নিয়ে দুটো মাত্র কথা বলেছেন । কিন্তু কী বলতে চেয়েছেন, তা আমরা পড়ে বুঝতে পারলাম না । উনি অন্য সবকিছু পরিষ্কারভাবে আমাদের বােঝাতে পারলেও, এ ব্যাপারটা বােঝাতে পারেননি বা আমাদের বােঝাতে চাননি । আমার মতে এই বিষয়টি আলোচনার ক্ষেত্রে অমর্ত্য সেন ফুল মার্ক কেন , পাশ মার্কও পাবার মত উত্তর দেননি । তিনি বলেছেন  "অসাম্য ও অন্যায়ের মূলে রয়েছে ব্যাপক ও অবিচ্ছিন্ন বঞ্চনা"। – কী বােঝা যায় বলুন ? 

অমর্ত্য সেন প্রকৃত কারণগুলি জানেন এবং সেসব কথা  পরিষ্কারভাবে বােঝাতেও পারেন । কিন্তু তিনি যদি তা বলেন , তাহলে , আশংকা করার যথেষ্ট কারণ আছে যে,  যতই তিনি নােবেল পুরস্কার পান না কেন , বিশ্ব তাঁকে নিয়ে যতই মাতামাতি করুক কেন , ভারতের পার্লামেন্টে বক্তৃতা করার সুযােগ তাঁকে দেওয়া হতো না। কলকাতার বড় বড় সেমিনার ও আলােচনা সভায় তাঁকে ডাকা হবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। টিভি ও খবরের কাগজ তাঁকে ব্লাক আউট করবেই । 

তবে যেভাবেই হােক ভারতের সুপ্রীমকোর্টের ফুল বেঞ্চ একবার সেই অপ্রিয় সত্য বলে ফেলেছে । মণ্ডল কমিশন মামলার উপর সওয়াল জবাবের যে মােটা বই বেরিয়েছে , তাতে লেখা হয়েছে অর্থাৎ সুপ্রীমকোর্টের ফুলবেঞ্চ বা সব বিচারক একমত হয়ে বলেছেন – "স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরেও (১৯৯২ সালের রায়) ভারতের তফসিলী সম্প্রদায়ের উন্নতি না হবার কারণ হলাে – তাদের উন্নয়নের জন্য ঘােষিত প্রকল্পগুলি বাস্তবায়নের দায়িত্বে যারা থাকেন , তারা তফসিলীদের উন্নতি চান না" ।  সুপ্রীমকোর্ট ভারতের বর্ণবৈষম্যবাদী মানসিকতাকে উন্নয়ন প্রকল্পগুলি বাস্তবায়ন না করার মূল কারণ হিসাবে উল্লেখ করেছে--- যে কথা অমর্ত্য সেন বলতে ভয় পেয়েছেন । 

তামিলনাড়ুতে ব্রাহ্মণ বা উচ্চ বর্ণহিন্দুরা স্বাধীনতার পর থেকেই ক্ষমতার বাইরে । তাই , সেখানে স্বাস্থ্য ও অন্যান্য ব্যাপারে কিছু কাজ ও উন্নতি হয়েছে বলে মনে করার  কারণ আছে । আর পশ্চিমবঙ্গে ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প থেকে শুরু করে বিচার করলে দেখা যাবে – যেসব প্রকল্পে তফসিলী , ওবিসি ও মুসলমানরা উপকৃত হবার সম্ভাবনা সেইসব প্রকল্পগুলি বেশি অবহেলিত ।

 বুদ্ধদেববাবু বলছেন – কলকাতায় আরও ১০০ টি হাসপাতাল করবেন । কেন ? গ্রামে নয় কেন ? বুদ্ধবাবুরা মানবিক কারণে জাহাজ বােঝাই করে কিউবায় খাদ্য - বস্ত্র পাঠান, এটা ভাল । কিন্তু রাজ্যের বঞ্চিতদের প্রতি এত রুষ্ট কেন ? রাজ্যের ১ কোটি ২৫ লক্ষ উদ্বাস্তুর দেশবিহীন হবার মুখে। আর বামেরাও উদ্বাস্তু বিরােধি এই চক্রান্তের শরিক । তাদের প্রতি এত নির্দয় কেন ? কারণ তাঁরা অধিকাংশই নিন্মবর্গীয় । তাই , কারণটা বর্ণবৈষম্যবাদ ছাড়া আর কি হতে পারে। সেজন্য রাজ্যের স্বাস্থ্যের বেহাল দশার পরিবর্তনের জন্য, মন্ত্রীসভার  পরিবর্তন করে কোন কাজ হবে না । দরকার আরও বেশি কিছুর পরিবর্তন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

তৃণমূল নেত্রী ফের সংসদে

যদা যদা হি ধর্মস্য... গীতার এই শ্লোকে ঠিক কী বলা হয়েছে?

ভাতে কেরোসিন যাত্রাপুরে, অভিযোগ বাংলাদেশী