প্রসঙ্গ:গুজরাট দাঙ্গা
বিবেক তুমি জাগাে !
(গুজরাট দাঙ্গা নিয়ে লেখা তৈরি করার জন্য খোঁজখবর নিতে আমি দুবার সেখানে যাই এবং ওই রাজ্যের মোট ৮/৯ টি জেলায় ঘুরেছিলাম। ওখানকার আমার ব্যাংক কর্মচারী সংগঠনের বন্ধুরা সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর 'গোধরা হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে' এবং 'গুজরাট গণহত্যা' নামে দুটি লেখা তৈরি করি। সেই প্রতিবেদন দুটির সাথে এই চিঠিখানিও অনুবাদ করে প্রকাশ করেছিলাম)
( বিভূতিনারায়ণ রাই , ডি আই জি , উত্তরপ্রদেশ –একজন সিনিয়র আইপিএস অফিসার । তিনি ২০০২ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি একটা চিঠি আইপিএস অফিসারদের উদ্দেশ্যে লেখেন এবং তা বিতরণ করেন । তার বক্তব্যকে সমর্থন করে অনেক অফিসার তাঁকে চিঠি লেখেন । পুলিশবাহিনীর শুভবুদ্ধির পক্ষে কাজ করবে ভেবে তিনি এই চিঠি সংবাদপত্রের কাছেও পেশ করেন )।
সহকর্মীবৃন্দ ,
আমি একজন আইপিএস অফিসার একরাশ মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে খুবই খারাপ সময়ে আপনাদের এই চিঠি লিখছি । গুজরাটে সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেশের পক্ষে গভীর উদ্বেগের বিষয় এবং এই ঘটনায় আইপিএস অফিসারদের গভীরভাবে আত্মসমীক্ষার প্রয়ােজন । সমস্ত রাজ্য জুড়ে যে ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হতে পারে , গােধরার নৃশংস হত্যাকাণ্ড তার পূর্বাভাস দেয় এবং একটা পেশাদারি পুলিশ বাহিনীর কাছে এটা আশা করা যায় যে , তারা যেকোন মূল্যে পাল্টা সন্ত্রাস এবং প্রতিহিংসার সমস্ত চেষ্টাকে প্রতিহত করবে । কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি । গােধরা ঘটনার পরের কয়েকদিনের হিংসাকে পুলিশ শুধুমাত্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি তা নয় ; বরং মনে হয়েছে , বহু ক্ষেত্রে পুলিশকর্মীরা দাঙ্গাকারিদের উৎসাহিত করেছে । এই ব্যর্থতাকে পুলিশের নীচুতলার অপদার্থতা হিসাবে দেখলে চলবে না । এ হলো পুলিশ বাহিনীর নেতৃত্বকারি আইপিএস অফিসারদের ব্যর্থতা ।
গােধরার নারকীয় ঘটনার পর রাজ্য জুড়ে যে বর্বরতা চলেছে , তাতে আমি অবাক হইনি , কারণ আমি শুধুমাত্র একজন পুলিশ অফিসারই নই , একইসাথে আমি সমাজবিজ্ঞানের একজন ছাত্রও বটে । রাজধানী দিল্লী থেকে শুরু করে , আমেদাবাদ হয়ে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এই একই পুরনাে ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে বার বার । ১৯৬০ সাল থেকে যতণ্ডলি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে , তার প্রতিটি দাঙ্গার রূপ এবং রং প্রায় একই---পুলিশের উপস্থিতিতে অসহায় সংখ্যালঘু মানুষকে ধর্ষণ, হত্যা এবং তাদের সম্পত্তি লুঠ ও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে ; আর পুলিশ সচেতনভাবে নির্বিকার থেকেছে । বহুক্ষেত্রে তারা জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার ঘটনার নির্বাক সাক্ষী ।
দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে এই ঘটনায় আমার যাই উদ্বেগ থাকুক কেন , একজন পুলিশ অফিসার হিসাবে পুলিশ বাহিনীর নৈতিক চরিত্র রক্ষার বিষয়ে আমি ভীষণভাবে চিন্তিত ও বিচলিত । একজন উন্মাদ মুখ্যমন্ত্রী তার অপদার্থ পুলিশ বাহিনীর পীঠ চাপড়াতে পারেন বা সিনিয়র পুলিশ অফিসাররা নিজেদের দুর্বলতাকে আড়াল করার জন্য প্রচার মাধ্যম বা জাতিয়তা বিরােধি সংখ্যালঘুদের দিকে আঙুল তুলতে পারেন ; কিন্তু এটাই সত্য যে , প্রতিটি দাঙ্গার পর দেখা যায় , পুলিশ বাহিনী সমালােচিত হয়েছে । কারণ তারা সংখ্যালঘুদের জীবন , সম্মান ও সম্পত্তির কোন নিরাপত্তা দিতে পারেনি ; পরন্তু তারা হিন্দু দাঙ্গাকারিদের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং তাদের দুষ্কর্মে উৎসাহ দিয়েছে । সাম্প্রতিক দাঙ্গার পরেও গুজরাট পুলিশের বিরুদ্ধে একই অভিযােগ উঠেছে ।
গুজরাটে যা কিছু ঘটেছে তা মােটেই নতুন নয় । এখন নেতৃত্বকারী সিনিয়র পুলিশ অফিসারদের শুধু ভাবতে হবে , কেন প্রতিটি দাঙ্গার পর পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে অপদার্থতা , নিষ্ক্রিয়তা এবং অপরাধমূলক কর্তব্য অবহেলার অভিযােগ ওঠে ! যতক্ষণ আমরা ( পুলিশ বাহিনী ) নিজেদের দোষ স্বীকার করে তা সংশােধনের চেষ্টা করছি , ততক্ষণ ভাল কিছু হবার সম্ভাবনা নেই ।
শুরুতেই পুলিশ বাহিনীকে সাম্প্রদায়িক হিংসার বিরুদ্ধে তার সহজাত বিরােধিতা শুরু করতে হবে । তারজন্য হিংসা ছড়িয়ে পড়ার আগেই তাকে গােপন খবরাখবর সংগ্রহ করতে হবে । যাতে উত্তেজনা ছড়িয়ে না পড়ে , সেজন্য প্রতিরােধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে , হিংসা দমন করতে পুলিশ বাহিনীকে কঠোর হাতে ব্যবস্থা গ্রহণের দিকে মনােযােগ দিতে হবে । সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মােকাবিলার জন্য আরও কিছু ব্যবস্থার সাথে এগুলি পুলিশ বাহিনীর অবশ্য কর্তব্য । কিন্তু আমরা নিজেরা ; অর্থাৎ পুলিশ বাহিনীর নেতৃত্ব যদি সাম্প্রদায়িক দোষদুষ্ট হয়ে পড়ি , তাহলে এর কোন ব্যবস্থাই আর ঠিকমত কার্যকরি করা সম্ভব হয় না ।
সাম্প্রদায়িক মুসলমান সংগঠনের ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে গােপন খবরাখবর সংগ্রহের কাজ সাধারণ পুলিশকর্মীর পক্ষে সহজ নয় । হিন্দু সাম্প্রদায়িক সংগঠনের ক্রিয়াকাণ্ডও যে জাতিয়তা বিরােধি এবং দেশের পক্ষে ক্ষতিকর , ফলে , তাদের কাজকর্মের উপরও যে কড়া নজর রাখা প্রয়ােজন , এটা বােঝাও সাধারণ পুলিশ কর্মীর পক্ষে সহজ নয় । এটা ঘটনা যে , সাম্প্রদায়িক হিন্দু সংগঠনগুলির ক্রিয়াকাণ্ডের বিষয়ে খুব সামান্য পরিমাণ রিপাের্ট থানাগুলিতে নথিভূক্ত থাকে ।
একইভাবে দেখা যায় , সম্ভাব্য দাঙ্গার সময়ে যে প্রতিরােধমূলক গ্রেফতার অভিযান পুলিশ চালায় , তাতে সাধারণত সংখ্যালঘুশ্রেণীর মানুষ ও সমাজবিরােধিদের গ্রেফতার করা হয় । ফলে তাতে সংখ্যালঘুদেরই ভােগান্তি বাড়ে । এছাড়াও , যেখানে মুসলমানরা আক্রান্ত হয় , দেখা যায় সেখানেও পুলিশের গুলির লক্ষ্যবস্তু হয়েছে মুসলমানরাই । ঘর - বাড়ি তল্লাশী এবং গ্রেফতারের ক্ষেত্রেও একই পক্ষপাতিত্ব দেখা যায়।
উপরে যেসব কথা বলা হলো , গুজরাটে তারই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে । তবে বর্বরতার প্রশ্নে এবারের ঘটনা অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন এবং এবারের দাঙ্গা হয়েছে একতরফা – যেখানে মুসলমানরা মার খেয়েছেন । পূর্বের সব ঘটনার সাথে এবারের ঘটনার আরেকটি পার্থক্য হলো – টেলিভিশনের পর্দায় দেশ ও বিদেশের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে পুলিশ বাহিনীর পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা । খবরের কাগজের তথাকথিত অপপ্রচার বলে আমরা (পুলিশ বাহিনী) গা বাঁচাবার যে চেষ্টা করে থাকি, এখন আমাদের সামনে সে দরজাও বন্ধ হয়ে গেছে ।
প্রসঙ্গক্রমে এখানে একথাও উল্লেখ করা প্রয়ােজন — যথেষ্ট সংখ্যক পুলিশ অফিসার , যাদের নৈতিকমান উন্নত এবং যারা পক্ষপাতদুষ্ট নন , তারা বহু ক্ষেত্রে দৃঢ়তার সাথে নিরপেক্ষভাবে পুলিশ বাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং সমাজের সব অংশের আস্থা অর্জন করতে সমর্থ হয়েছেন । যারফলে তাদের গৌরবও বেড়েছে ।
প্রবাদ চালু আছে – সামরিক বাহিনীর নয় , ব্যর্থতার দায় অধিনায়কের । কিন্তু এখন প্রায়ই দেখা যাচ্ছে – দাঙ্গা দমনে ব্যর্থতার দায় অফিসাররা বাহিনীর নিচুতলার কর্মীদের ঘাড়ে চাপাবার চেষ্টা করছেন । কিন্তু গুজরাটের এই সাম্প্রতিক দাঙ্গার সময়ে শত ব্যর্থতার মাঝেও আমরা দেখেছি কিছু সৎ , সাহসী ও নিষ্ঠাবান আইপিএস অফিসাররা বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে তাদের পরিচালনা করেছেন এবং তাদের নিজ নিজ দায়িত্বের এলাকায় মানুষের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা দিতে সমর্থ হয়েছেন ।
এটা খুব দুঃখের বিষয় যে , যে সমস্ত অফিসার যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের কথা না হয় ছেড়েই দেওয়া হলাে , কিন্তু যারা দাঙ্গাকারিদের সহযােগিতা করেছেন , এমন অফিসারদের একটিমাত্র ক্ষেত্রেও শাস্তি হলাে না ।
রাজধানী দিল্লী দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পুলিশঘেরা শহর । ১৯৮৪ সালে সেখানেও শিখ বিরােধি দাঙ্গা হয় এবং হাজার হাজার শিখকে হত্যা করা হয় – যা পুলিশের সক্রিয় প্রশ্রয়ে ছাড়া সম্ভব নয় । শুধু সংবাদ মাধ্যমের দ্বারা অভিযুক্ত তাই নয় , এমনকি কয়েকটি তদন্ত কমিশনও যাদের দোষী সাব্যস্ত করে – যার মধ্যে শ্রী পদ্ম রােসার মতাে বিশিষ্ট আইপিএস অফিসারদের নামও উল্লেখ করা হয় । তাদের কারুর কোন শাস্তি হয় না , বা তাদের চাকরি জীবনও তেমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না । মদন কমিশন এবং শ্রীকৃষ্ণ কমিশনের সুপারিশেরও ঐ একই হাল হয়েছে ।
এটা খুবই পরিষ্কার যে , বাইরের কোন সংস্থা বা শক্তি আমাদের পুলিশ বাহিনীর সংস্কার করতে পারবে না । ঐ কাজ আমাদের নিজেদেরই করতে হবে । যে পুলিশ বাহিনীর একটা উজ্জ্বল অতীত ছিল এবং যারা দেশে উচ্চসম্মানে ভূষিত হয়েছে , তার একজন কর্মী হিসাবে আমাদের যদি সামান্যতম অনুভূতিও অবশিষ্ট থেকে থাকে, তাহলে আলােচ্য কর্তব্য বিশেষ গুরুত্ব সহকারে এখনই আমাদের শুরু করতে হবে । আমাদের অবশ্যই কেন্দ্রীয় আইপিএস অফিসার সংগঠনের সাধারণ সভা ডাকতে হবে এবং দাবি করতে হবে গুজরাটে যে সমস্ত অফিসার কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হয়েছে , সরকার যেন তাদের বিরুদ্ধে যথােপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে । ১৯৮৪ সালের দাঙ্গার ব্যাপারেও আমাদের সেই একই দাবি করতে হবে ।
আইপিএস সংগঠনকে একটা ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন হিসাবে দেখে শুধুমাত্র উন্নত বেতন ও চাকুরির শর্ত দাবি করলে চলবে না , বরং অফিসাররা যাতে দেশ ও জনগণের জন্য আরও ভাল কাজ করেন , তারজন্য সংগঠনকে দায়িত্ব নিতে হবে । যদি সরকার দোষী অফিসারদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ নাও করে , ন্যূনতম শাস্তি হিসাবে আমরা যেন দোষী অফিসারদের সংগঠনের সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করি। আপনাদের অনেকের কাছ থেকে এ ব্যাপারে মতামত আশাকরে শেষ করছি ।
বিভূতিনারায়ণ রাই , আইপিএস (ইউ পি , আর .আর ২৯৭৫। ইংরাজিতে লেখা চিঠিটি বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে। অনুবাদক: এই বইয়ের লেখক )
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন