অতি সাধারণ একখানা চিঠি
অতি সাধারণ একখানা চিঠি
(নীল আকাশ পত্রিকায় ১৬ মার্চ , ২০১৩ সংখ্যায় প্রকাশিত চিঠি। সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস কলম পত্রিকায় চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন । সম্পাদকের সাথে কথাও বলেছিলেন ; কিন্তু চিঠিটি তারা ছাপেননি । তাই , এখানে তা ছেপে দেওয়া হলাে)
মাননীয় সম্পাদক , কলম পত্রিকা,
মহাশয়,
বাংলাদেশের শাহাবাগ আন্দোলন , তাদের দাবি ও পাল্টা দাবি নিয়ে বেশ কিছু লেখা আপনার পত্রিকায় এবং অন্যান্য পত্রিকায় আমি যেমন পড়েছি , নিশ্চয়ই আরও বহু মানুষ পড়েছেন । আপনার পত্রিকার লেখা এবং অন্যান্য পত্র-পত্রিকার লেখাগুলি বিপরীতমুখী । ফলে , পাঠকবৃন্দ নিশ্চয়ই বিভ্রান্ত । আপনার পত্রিকায় প্রকাশিত একজন পাঠকের চিঠিতে বলা হয়েছে – এপার বাংলার মুসলিম সমাজ কলম পত্রিকা পড়ে হতাশ । কিন্তু আমি দেখছি , এ জাতীয় খবর পড়ে — গােটা পাঠক সমাজ হতাশ।
আমার মনে হচ্ছে – অন্যান্য পত্র-পত্রকাগুলির মতাে কলম পত্রিকাও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ । শাহাবাগের আন্দোলনের সার্বিক বিরােধিতা এবং জামায়াতে ইসলামির আন্দোলনের সর্বাঙ্গীন সমর্থন করা যাদের অবস্থান , তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তােলার জন্য বহু যুক্তি উপস্থাপন করা যায় । সঞ্জীব চৌধুরির লেখা ছাপা হয়েছে । 'তাঁর লেখায় যুক্তি আছে' --- এই কথা না বলে, আমি বলবাে – তাঁর লেখায় তর্ক করার উপাদান আছে । 'বাংলাদেশে আওয়ামি লীগ সংখ্যালঘুদের আক্রমণ করছে'--- মনে হয় তাঁর এই বক্তব্য সঠিক নয় । বাংলাদেশের হিন্দুদের আক্রমণ করার অভিপ্রায় বা কৌশল ও নির্দেশ দল হিসাবে জামায়াতে ইসলামি , আওয়ামি লীগ বা বি এন পি দিয়েছে বা দিতে পারে , এমন আমার মনে হয় না । দলের নীচু স্তরে , স্থানীয়ভাবে বা স্রেফ দুস্কৃতিরা কিছু ঘটনা ঘটিয়েছে , তার সাথে কোন দলের নীতি - কৌশলের প্রশ্ন জড়িত নয় । তবে একথা ঠিক যে , সেদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুরা ভীষণভাবে আতংকিত । তারা ভাবছেন যে, সেদেশে তারা হয়তো আর ভালোভাবে বসবাস করতে পারবেন কি-না । এই রকম দুশ্চিন্তা করার যথাযথ কারণ বা যুক্তি যাই থাক বা না থাক , অথবা আপাতগ্রাহ্য কোন যুক্তি না থাকলেও , তারা কিন্তু ভয় পাচ্ছেন সেদেশের জামাতে ইসলামিকে।
বলা হয়েছে আপনারা ও.পি.শাহ-এর বক্তব্য বিভিন্ন মানুষকে টেলিফোন করে যাচাই করেছেন। একইভাবে আমার বক্তব্য যাচাই করেও দু’কলম লিখতে পারেন কলম ' কাগজে ।
হযরত মােহাম্মদের কুৎসা ও ইসলাম অবমাননাকে শাহাবাগের জমায়েত অথবা সেদেশের কোন হিন্দু - মুসলমান সমর্থন করেছেন বলে আমার জানা নেই । এদেশে সভা করে বাংলাদেশের ইসলাম অবমাননাকারীদের বিচারের দাবি যারা তুলছেন , তারা যদি রাজীব হায়দারের হত্যাকারিদের বিচারের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান , তাহলে তা মানায় না ।
অপরাধীদের শাস্তির দাবি ঠিক আছে , কিন্তু শাহবাগ আন্দোলন যেভাবে যুদ্ধাপরাধীদের "ফাঁসির" দাবি করছেন, সেই দাবি যেমন অসঙ্গত দাবি ; তেমনি যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি প্রত্যাহারের দাবিও বেঠিক দাবি । অপরাধীদের যেমন সুবিচার পাওয়ার অধিকার আছে ; তেমনি অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করাও অবশ্য করণীয় কাজ । কলকাতায় আন্দোলনকারীদের এসব বিষয় খেয়াল রাখতে হবে ।
কাদের মােল্লা ও সাঈদীর অপরাধ এবং বিচার নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে । যেমন এদেশে মকবুল বাট , আফজাল গুরুর বিচার ও শাস্তি নিয়ে প্রশ্ন আছে । কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থার ভাল-মন্দ মেনে নিয়েই তাে আমরা চলছি । আর যুদ্ধাপরাধ শব্দটি যেন আমাদের মাথা ও কলম থেকে হারিয়ে না যায় ।
আমার জন্ম যশাের জেলার ছিয়ানব্বই অঞ্চলে । পাশাপাশি ছিয়ানব্বইটি গ্রাম সম্পূর্ণ হিন্দু নমশূদ্র অধ্যুষিত । বাংলাদেশের মধ্যে হিন্দুস্থান বলে পরিচিত । সেখানে আজও আমাদের বাড়ি আছে--- মা , মেঝদা ও তার পরিবার বসবাস করেন । আক্রমণের আশংকায় সেখানে রাত জেগে দলবদ্ধ পাহারা চলছে । আশপাশ অঞ্চলের ১০/১৫ জন মুসলমান – যারা নানাসময়ে হিন্দুদের পাশে দাঁড়ান , তারা তাদের নিজ নিজগ্রামের ধর্মীয় কট্টরপন্থিদের ভয়ে আশ্রয় নিয়েছেন এই হিন্দু অঞ্চলের বিভিন্ন বাড়িতে । নিজের গ্রামে থাকতে তারা ভয় পাচ্ছেন । এ হলাে এক পরিবেশ।
২৬ শে মার্চ , ২০১৩ , কলকাতার শহীদ মিনার ময়দানে প্রতিবাদ সভা ডেকেছেন মুসলিম নেতৃবৃন্দ – যারা প্রায় প্রত্যেকেই আমার পরিচিত , বন্ধুস্থানীয় । তারা যুদ্ধাপরাধী বলে প্রমাণিত সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রত্যাহারের দাবি করছেন । অন্যান্য অপরাধের সাথে তাঁর বিরুদ্ধে ১০০/১৫০ মানুষকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করার অভিযােগও রয়েছে । তবুও শাস্তি লঘু করার দাবি কেউ করতেই পারেন। তবে কলকাতায় এসব আন্দোলনের ফলে আমার বন্ধুদের পরিচিতি , প্রচার ও অন্যান্য উদ্দেশ্য সাধিত হলেও , এরফলে কী বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে , তাও ভাবতে হবে ।
আমি ও আমার মত যারা বর্ন-ধৰ্ম নির্বিশেষে ন্যায়ের পক্ষে ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাই , তারা খুব সমস্যায় আছি । সব পক্ষকেই যুক্তিসঙ্গত ও নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়া উচিত এবং যথাযথ দাবি উত্থাপন করা দরকার । সাঈদী খুব বড় মাপের কোরান বিশেষজ্ঞ ও জনপ্রিয় ধর্মীয় নেতা হতে পারেন ; কিন্তু এক্ষেত্রে বিচার্য হলাে---তিনি অপরাধ করেছেন কিনা । বুঝতে হবে যে , ৪২ বছর আগের সাঈদীর বিচার হচ্ছে।
ভারতবর্ষের রাষ্ট্র চরিত্র 'হিন্দু' হলে অর্থাৎ ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র করার চেষ্টা হলে আমি তাকে সমর্থন করবাে না, বিরোধিতা করবো। আর সে জন্যই বাংলাদেশের রাষ্ট্রচরিত্র 'ইসলাম’ হােক – এটাকে আমি মেনে নিতে পারি না। আমার কিছু মুসলমান বন্ধু ভারতের ক্ষেত্রে আমার অবস্থান সমর্থন করলেও , বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমার সিদ্ধান্ত হয়তো খুশিমনে মেনে নিতে পারছেন না!
বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাহেবের যুক্তি ও বক্তব্য প্রচার করা হয়েছে কলম পত্রিকায় । তাঁর ঐসব যুক্তিতে অনেক ফাঁক-ফোকর আছে । যুদ্ধাপরাধীদের সাথে জামাতে ইসলামী দল নিজেদের যুক্ত করে অযাচিত সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছে । কলম পত্রিকা এবং ১২ টি মুসলিম সংগঠনের জোট , যারা কলকাতায় সমাবেশ ঘােষণা করেছে , তারা শেষ পর্যন্ত কোন পথে চলে , তা নিয়ে অনেকের মত আমারও আগ্রহ এবং আশঙ্কা আছে ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন