কুলটিয়া বালিকা বিদ্যালয়

কুলটিয়া বালিকা বিদ্যালয়
 বিদ্যালয়ের সূচনা ও ক্রমবিকাশ

(একটা বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার, তাহলো--- এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ যখন শুরু হয়, তখন নমো অধ্যুষিত এই বিস্তীর্ন এলাকার মানুষের মধ্যে কোন স্বাক্ষর ব্যক্তি ছিলেন না বললেই চলে। হয়তো লক্ষাধিক মানুষের মধ্যে ১০/২০ জন মানুষ ছিলেন, যারা শুধু নিজের নামটাই লিখতে পারেন। আর এই এলাকার মানুষের মধ্যে আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিও ছিলেন না, যিনি প্রতিষ্ঠালগ্নে প্রয়োজনে কিছুটা আর্থিক ভার বহন করতে পারেন। অজপাড়াগাঁয়ের এইসব মানুষেরা সমবেতভাবে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন)


 ১৯১৮ সালে মশিয়াহাটী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর , অঞ্চলের শিশু - কিশাের ছাত্ররা বিদ্যালয়ে যাওয়া শুরু করে । সকালবেলায় চান করে , মাথায় চিরুনি দিয়ে , পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন জামা - প্যান্ট পরে দল বেঁধে স্কুলের দিকে যাত্রা--- এলাকায় এই এক নতুন দৃশ্যের সূচনা হয় ১৯১৮ সাল থেকে । এই নতুন সূর্যের আলােকরশ্মি , গােটা সমাজকে রঞ্জিত করে । বাড়ির শিশু - কিশাের মেয়েরাও এই সুন্দর জীবনের আহ্বান শুনতে পায় এবং বিদ্যাশিক্ষার জন্য বিদ্যালয়ের টান অনুভব করে । তারাও স্কুলে যেতে চায় । 

সময়কাল ১৯২০ সাল । মশিয়াহাটী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হয়ে এসেছেন বিরাটচন্দ্র মণ্ডল (এই ব্যক্তি পরে কৃষক প্রজা পার্টির প্রথম সারির নেতা হয়েছিলেন ও ফজলুল হকের ঘনিষ্ঠ ছিলেন) । একদিন তিনি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে নারীশিক্ষার প্রয়ােজনীয়তার কথা তুললেন । স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যকার কেউ কেউ নিশ্চয়ই নিজের মতাে করে মেয়েদের শিক্ষার কথা ভেবেছিলেন । তাই , এই প্রস্তাবে কোনাে দ্বিমত হয় না । বিদ্যালয়ে মেয়েদের শিক্ষা দেবার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

সেই সময়কালে ছেলে এবং মেয়েদের একই ক্লাসে , একসঙ্গে বসে পড়াশুনাে করা ও বিদ্যাশিক্ষার কথা কেউ ভাবতে পারতেন না । এ ব্যাপারে তৎকালীন গ্রাম্যসমাজ ব্যবস্থা এমনই রক্ষণশীল ছিল।       

তাই মেয়েদের শিক্ষার জন্য আলাদা ঘর বা ক্লাসরুমের ব্যবস্থা করে ছেলেদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রেখে মেয়েদের বিদ্যাশিক্ষার ব্যবস্থা করা হল । ১৯২১ সালে মশিয়াহাটী বালক বিদ্যালয়ের ভিতরে , ঐ বিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে ও পরিচালনায় মশিয়াহাটী বালিকা বিদ্যালয়ের সূচনা করা হয় । সেজন্য এই ১৯২১ সালের মে মাসই হলাে বর্তমান কুলটিয়া উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা বছর । 

বালিকা বিদ্যালয়ের সূচনাকাল থেকে সুদীর্ঘকাল এই বিদ্যালয় পরিচালিত হয়েছে মশিয়াহাটী বালক বিদ্যালয় গৃহে এবং বিদ্যালয়ের নাম ছিল মশিয়াহাটী বালিকা বিদ্যালয় । নানা কারণে এবং বিশেষ প্রয়ােজনে ১৯৩৮ সালের শেষ লগ্নে ঐ বালিকা বিদ্যালয় স্থানান্তরিত হয় কুলটিয়া গ্রাম ও মশিয়াহাটী গ্রামের সংযােগস্থলে , কুলটিয়া গ্রামের উত্তরপ্রান্তে এবং ঐসময় থেকে বিদ্যালয়ের পরিবর্তিত নাম হয় কুলটিয়া বালিকা বিদ্যালয় । 

খুব স্বাভাবিকভাবেই বালিকা বিদ্যালয়ের কাজ শুরু হয় প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসাবে । অর্থাৎ প্রথমে ১ম শ্রেণি ও ২য় শ্রেণি খােলা হয় । ঐ সময়কালে বিদ্যালয়ের প্রথম ধাপ ছিল নিম্ন প্রাথমিক ( LP ) বিদ্যালয় । দ্বিতীয় ধাপের নাম ছিল উচ্চ প্রাইমারি ( UP ) বিদ্যালয় অর্থাৎ চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত । তৃতীয় ধাপ মধ্য ইংরেজী ( ME ) বিদ্যালয় অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত এবং তারপর উচ্চ ইংরেজী (HE ) বিদ্যালয় । পরে পাকিস্তান আমলে আগের সিস্টেম পাল্টে জুনিয়র হাইস্কুল প্রথা চালু হয় (৮ ম শ্রেণি ) । 

মশিয়াহাটী বালক বিদ্যালয়ের কোনাে এক গৃহে এই বালিকা বিদ্যালয়ের কাজ শুরু হলেও , প্রথম থেকে এই বিদ্যালয়কে একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বিদ্যালয় হিসাবে গড়ে তােলার সচেতন প্রয়াস ও পরিকল্পনা ছিল কর্তৃপক্ষের। সেজন্য এই বিদ্যালয়ের জন্য একজন নতুন শিক্ষক নিয়ােগ করা হয়। তার নাম ছিল পঞ্চানন বিশ্বাস । পঞ্চানন বিশ্বাস মশিয়াহাটী বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন না । 

এই অঞ্চলের বিশিষ্ট ব্যক্তি উপেন্দ্রনাথ মল্লিক মহাশয় 'কুলটিয়া বালিকা বিদ্যালয় : ইতিকথা ’ নামে একটি বই লিখেছেন । তিনি তাতে লিখেছেন যে , “ বালিকা বিদ্যালয়টি পরিচালনা করবার জন্য মশিয়াহাটী উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দয়া করিয়া উক্ত বিদ্যালয়ের কেরানী শ্ৰী শ্ৰীমন্ত বিশ্বাস মহাশয়কে মশিয়াহাটী নিম্নপ্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিযুক্ত করেন"।   

আমার মনে হয় উপেন্দ্রনাথ মল্লিক মহাশয়ের এই উক্তি শ্রীমন্তকুমার বিশ্বাস মহাশয়ের জন্য যথাযথ মর্যাদাপূর্ণ নয়।  প্রথমত শ্ৰীমন্তকুমার বিশ্বাস ১৯২১ সালের শুরুতে বা ১৯২০ সালে মশিয়াহাটি বিদ্যালয়ের কাজে যােগদান করেন , তখন তিনি বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসাবে কাজে যােগদান করেন । তিনি ম্যাট্রিক পর্যন্ত পড়াশুনা করেন । ঐ সময় মশিয়াহাটী বিদ্যালয়ে আরও দু’জন শিক্ষক ছিলেন যারা মাত্র ৭ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনাে করেছিলেন ; কিন্তু তাঁরাও সম্মানিত শিক্ষক ছিলেন । মশিয়াহাটী বিদ্যালয়ের নথিতে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে , শিক্ষকতার জন্য শ্ৰীমন্তবাবুর বেতন ছিল মাসিক ১২ টাকা এবং স্কুলের ক্লার্কের কাজগুলি করে দেবার জন্য তাঁর জন্য অতিরিক্ত আরও ৩ টাকা বেতন ধার্য করা হয়। 

মশিয়াহাটি অঞ্চলের পুরোনো মানুষদের মধ্যকার সবাই জানেন যে , এই ক্লার্কের কাজটিও তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন সুদীর্ঘকাল ধরে । মশিয়াহাটী বালক বিদ্যালয় এবং কুলটিয়া বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিজন পরিদর্শক সুষ্ঠভাবে খাতাপত্র লেখা ও হিসাব লেখার জন্য বহুবার তাঁর প্রশংসা করেছেন, পরিদর্শন খাতায় প্রশংসা করে নোট লিখেছেন। বাস্তবতঃ বিদ্যালয়ের উপর্যুপরি উচ্চতর ক্লাসগুলাে খােলার জন্য অনুমােদন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে তাঁর এই কৃতিত্ব যথেষ্ঠ সহায়ক হয় । 

দ্বিতীয়ত : মশিয়াহাটী বালক বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ দয়া করে শ্রীমন্তবাবুকে মশিয়াহাটী বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিযুক্ত করেননি ; বরং বলা যায় – বাধ্য হয়ে তাঁর উপর বালিকা বিদ্যালয়ের দায়িত্ব অর্পণ করা হয় । 'বাধ্য হয়ে' কথাটি প্রযােজ্য এই কারণে যে , বালিকা বিদ্যালয়টিকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা এবং প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন মশিয়াহাটী বালক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতাগণ এবং পরিচালন কর্তৃপক্ষ । 

বালিকা বিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষক পঞ্চানন বিশ্বাস অসুস্থ হয়ে বাড়ি চলে যাবার পর আর ফিরে আসেন নি। তখন সুবিধামত অন্যকোন শিক্ষক পাওয়া যায়নি । এই অবস্থায় শ্রীমন্তবাবুকে বালিকা বিদ্যালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তিনি সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং নিষ্ঠা ও যোগ্যতার সাথে পালন করেন। তাই , এখানে ‘দয়ার' কোন প্রশ্ন ওঠে না । 

শ্রীমন্তবাবু গোপালগঞ্জের মানুষ ছিলেন। পরিবার পরিজন, নিজের গ্রাম ও এলাকা ছেড়ে সারাজীবন, অন্তত ৫৫ বছর তিনি মশিয়াহাটিতে কাটান। দুটি বিদ্যালয়ের সেবায় জীবন উৎসর্গ করেন--- যে উদাহরণ ইতিহাসে বিরল, সচরাচর দেখা যায় না।

প্রসঙ্গত কয়েকটি কথা এখানে বলে রাখা দরকার। কারণ এটা হলো এক ঐতিহাসিক লড়াইয়ের শতবর্ষ উদযাপন, পিছনে ফিরে দেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।--- আজ কুলটিয়া উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের অফিসঘরে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে কিছু নাম টাইপ করে ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখা হয়েছে, যা একেবারেই যথাযথ নয়। তাহলো ইতিহাসের বিকৃতি, এমনটি হওয়া অনুচিত। তবে যেকোন নামই ফ্রেমে বাঁধাই করে টাঙানাে হােক না কেন, মশিয়াহাটী বালক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতাগণই যে , কুলটিয়া বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা , এই তথ্যে কোনাে ভুল নেই । ওইসব প্রতিষ্ঠাতাগণ বালিকা বিদ্যালয়টিকেও প্রতিষ্ঠিত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন । 

এইভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতিষ্ঠাতা এবং দাতা (ডােনার) নিয়ে আমার একটা নিজস্ব মতামত আছে। তা নিয়েও এখানে দুচার কথা বলে রাখতে চাই।  --- সাধারণভাবে এইসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা এবং দাতাদের দুইভাগে ভাগ করার রীতি আছে , তাতে অবশ্য কোন সমস্যা বা আপত্তি থাকার কথা নয় । একজন দাতা একইসাথে প্রতিষ্ঠাতাও হতে পারেন এবং প্রতিষ্ঠাতা  তালিকায় এমন নাম আমি সম্ভবত মশিয়াহাটীরই অন্যকোন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দেখেছি । এক্ষেত্রে আপত্তি করার কিছু নেই । কিন্তু কোনাে কোনাে ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে,  দাতা বা ডােনারের নাম প্রতিষ্ঠাতা তালিকায় নেই---এমন তালিকাও দেখেছি । এ ক্ষেত্রে আমার প্রশ্ন হলাে---কেউ দাতা ; কিন্তু প্রতিষ্ঠাতা নন , এই ধারণা , ব্যবস্থা এবং সিদ্ধান্ত সঠিক কিনা? 

দাতা অবশ্য দুই ধরনের হতে পারেন । একদল দাতা দান করেন প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাকালীন পর্যায়ে ; আর কেউ কেউ প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ জীবনের কোন না কোনাে সময়ে দান করতে পারেন । আমি মনে করি — - প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাকালীন পর্যায়ে যাঁরা দান করেন , বিশেষ করে জমি বা অর্থও হতে পারে – যা , প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠার জন্য অবশ্য প্রয়ােজনীয় ছিল , তাঁরা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা এবং একইসাথে দাতাও । 

আর পরবর্তীকালে যেকোনাে সময়ে প্রতিষ্ঠানের উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধির জন্য যারা দান করেন , তাঁরা শুধুই প্রতিষ্ঠানের দাতা । অনেক সময় দেখা যায় – এমন কিছু দান পাওয়া যায় , যারা দান করেন বিনিময়ে কিছু পাওয়ার জন্য । এটাকে ঠিক দান বলা যায় না - তবুও দান সংগ্রহের সুবিধা বা উৎসাহ ( incentive ) দেওয়ার জন্য তাদের দাতাভােটার ইত্যাদি করার চল দেখা যায়। এসব ব্যবস্থা অনেকটা অনৈতিক হলেও,  অসমর্থনীয় এমন কথা অবশ্য আমি বলছি না, তা চলছে, চলুক। আর কোন প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা এবং দাতা--- এই শিরােপা ও সম্মানের ক্ষেত্রে কোনাে উত্তরাধিকার প্রথা মেনে নেওয়া একেবারেই ঠিক নয় । 

অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে –সাধারণত প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে তাঁরাই দান করেন , যারা প্রতিষ্ঠা ক্রিয়াকাণ্ডের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকেন । ব্যতিক্রম হতেই পারেন , কিন্তু ব্যতিক্ৰমতাে ব্যতিক্রমই । সেদিক দিয়ে আমার মনে হয় কুলটিয়া বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১৭ বছর পর ১৯৩৮ সালে বিদ্যালয় স্থানান্তরণের সময় যারা বিদ্যালয়ের জন্য জমিদান করেন তাঁরা এই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতাদের তালিকার অন্তর্ভুক্ত হবার যােগ্য । একথা লেখার উদ্দেশ্য কাউকে কোনাে সুবিধাদান বা পাইয়ে দেবার জন্য নয়। কারণ এইসব মহামানবেরা সবাই বহু বছর আগেই প্রয়াত হয়েছেন। আমার মতে এই স্বীকৃতি তাদের প্রাপ্য। 

অর্থাৎ মশিয়াহাটী গ্রামের গােলদার পরিবারের সেই সময়কার কোনাে উৎসাহী ব্যক্তিত্ব , কুঞ্জবিহারী সরকার ও অঘোরচন্দ্র বিশ্বাস – এরা এই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও দাতা । আমি সঠিকভাবে জানিনা---পূর্বে তাদের এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে কি না, যদি সেই স্বীকৃতি তাঁরা না পেয়ে থাকেন,  আজ বিদ্যালয়ের শতবর্ষে তা স্বীকার করে ঘােষণা করা দরকার বলে এই লেখক মনে করেন। মশিয়াহাটী উচ্চ বিদ্যালয় তিন বছর আগে শতবর্ষ অতিক্রম করেছে এবং মশিয়াহাটী মহাবিদ্যালয়ের ৫০ বছর পূর্ন হচ্ছে এবছরই। এই দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও আমার এই প্রস্তাব সমানভাবে বিবেচনায়  রাখা যেতে পারে। 

বালিকা বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হবার পর ডেপুটি ডি আই অফ স্কুলস্ – আর.সি. ব্যানার্জী ৪ মার্চ ১৯২২ তারিখে বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে আসেন । এটাই এই বিদ্যালয়ের কোনাে সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তির প্রথম পরিদর্শন । এই পরিদর্শন রিপাের্ট থেকে জানা যায় – বিদ্যালয়ে প্রথম বছর ছাত্রী সংখ্যা ছিল ৩৭ , যারমধ্যে পরিদর্শনের দিন ৩০ জন হাজির ছিলেন । আর স্কুলের মােট আয়ের সংস্থান ছিল মাসিক ২ টাকা । – যা হলাে কলকাতার ব্রাহ্ম সমাজের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত "বঙ্গ ও অসম প্রদেশের হিত্কারিণী সমিতির" (Society for the Improvement of Backward Classes of Bengal and Assam) অনুদান।

অবশ্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি । বিদ্যালয়ের তৃতীয় পরিদর্শন রিপাের্ট থেকে জানা যায় যে, বিদ্যালয়টি জেলাবাের্ডের নিকট থেকে অনুদান আদায়ে সমর্থ হয় । এই অনুদানের পরিমান ছিল ৩.৫০ টাকা । এই তৃতীয় পরিদর্শন রিপাের্টের তারিখ হলাে ১০ মার্চ , ১৯২৩ । 

৫ বছর পর বিদ্যালয়ের ২০ তম পরিদর্শন রিপাের্ট থেকে জানা যায় (৬/২/২৮) ইতিমধ্যে জেলাবাের্ড মাসিক অনুদান কিছু বৃদ্ধি করে মাসিক ৭ টাকা অনুদান মঞ্জুর করে এবং ব্রাহ্ম সমাজের "অনুন্নত হিতকারিণী সমিতি"ও সাহায্যের পরিমাণ বাড়িয়ে মাসিক ৪ টাকা করে । ফলে বিদ্যালয়ের মােট মাসিক আয় দাঁড়ায় ১১ টাকা । তবে স্কুল প্রতিষ্ঠার পর ৭ বছরে ছাত্রীসংখ্যা বাড়েনি বললেই চলে । ১৯২৮ সালে বিদ্যালয়ের মােট ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৩১ জন । এই কয়েক বছরে সর্বোচ্চ ছাত্রী সংখ্যা হয়েছিল ৪২ জন । 

এই অবস্থায় স্কুলে তৃতীয়শ্রেণি খােলা হয় ১৯২৫ সালে এবং তৃতীয়শ্রেণির ক্লাস চলতে থাকে । কিন্তু ১৯২৫ সালে বিদ্যালয়ে তৃতীয়শ্রেণী খোলার দিন থেকে  ১০ বছরের মধ্যে বিদ্যালয়ে চতুর্থশ্রেণি খােলা সম্ভব হয় না। এই দুর্দশা হয় মূলত উচ্চতর ক্লাসে ছাত্রীর অভাবে । এই ১০ বছর সময়কাল জুড়ে দেখা যায়--- কোনো বছর দ্বিতীয়শ্রেণিতে ছাত্রী আছে ; কিন্তু তৃতীয়শ্রেণিতে কোনাে ছাত্রী নেই অথবা তৃতীয়শ্রেণিতে ছাত্রী থাকলেও দেখা যায়  দ্বিতীয়শ্রেণিতে কোনাে ছাত্রী নেই । এই দুরবস্থা হয় মূলত বাল্যবিবাহের কারণে । বিয়ের পর ছাত্রী শ্বশুরবাড়ি চলে যাওয়ায় কখনাে কখনাে ক্লাস ছাত্রীশূন্য হয়ে গেছে । ওই  সময়ে দেখা যেত , দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থশ্রেণীর ছাত্রীদের মধ্যে অধিকাংশই বিবাহিতা ছাত্রী। 

এই সমস্যার মধ্যেও শেষপর্যন্ত বিদ্যালয়ে চতুর্থশ্রেণি খােলা হয় ১৯৩৫ সালে এবং উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ( UP ) জন্য অনুমােদন চেয়ে চিঠি লেখা হয় । ঐ সালেই অনুমােদন পাওয়া যায় ; কিন্তু দেখা যায় তৃতীয়শ্রেণিতে কোন ছাত্রী নেই । ১৯৩৫ সালের ১৬ আগস্ট সাব - ইন্সপেক্টর অফ স্কুলস , মােঃ দেলওয়ার হােসেন বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন । তিনি লেখেন , “শ্রীমন্তকুমার বিশ্বাস (এন্ট্রান্স ফেল) প্রাচীন শিক্ষক । বহুদিন যাবত এই বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকের কাজ করিতেছেন । তাঁহারই প্রচেষ্টায় স্কুলটি এই বৎসর উচ্চ প্রাথমিক স্তরে পরিবর্তিত হইয়াছে"। 

শ্রীমতি সরলাবালা রায় বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হিসাবে কাজে যােগদান করেন ১৯৩২ সালে । কিন্তু তিনি মাত্র ৯ মাস বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পর ঐ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে অনুপস্থিত থাকেন কোন ব্যক্তিগত বা শারীরিক কারণে । সম্ভবতঃ ১৯৩৪ সালে তিনি আবার কাজে যােগদান করেন ; কিন্তু ১৯৩৫ সালের মার্চ মাসে তিনি আবারও চাকরি ছেড়ে দিয়ে জুনিয়র ট্রেনিং নিতে চলে যান। সেই সময়ে উলুবেড়িয়া স্টেশনের কাছে বাণীবন গ্রামে ব্রাহ্মসমাজ মেয়েদের শিক্ষার সুবিধার জন্য এই প্রতিষ্ঠান গড়েছিলেন। সাধারণ বিদ্যালয়ের সাথে সেখানে ট্রেনিং স্কুলও ছিল। শ্রীমতি সরলা দেবী সেখানে ট্রেনিং পাশ করার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন। তখন সম্ভবত বিদ্যালয়ে তার অনুপস্থিতিতে তার পরিবর্তে হেমন্তকুমার মণ্ডল নামে একজন শিক্ষককে নিয়ােগ করা হয় ; কিন্তু তিনি মাত্র দুমাস কাজ করে জুন মাসে (১৯৩৫ ) চাকরি ছেড়ে দেন । 

এ অবস্থায় পরিদর্শক মােঃ দেলওয়ার হােসেন লিখিত নির্দেশ দেন যে , একজন মাত্র শিক্ষকের সাহায্যে উচ্চ প্রাইমারি বিদ্যালয় চলতে পারে না ; তাই ১৫ দিনের মধ্যে অন্ততঃ আর একজন শিক্ষক বা শিক্ষিকা বিদ্যালয়ে নিয়ােগ করতেই হবে । কিন্তু ঐ সময়ে যােগ্য ও শিক্ষিত শিক্ষক / শিক্ষিকা পাওয়া সহজ ছিল না । যাঁরা যােগ্য ছিলেন , তাঁরা ঐ অতি অল্প টাকায় শিক্ষকতা করতে রাজি ছিলেন না । অবশেষে কুলটিয়া গ্রামের বিজয়কৃষ্ণ ধর মহাশয়ের স্ত্রী শ্রীমতি সুশীলাবালা ধরকে বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হিসাবে নিয়ােগ করা হয় ১৯৩৫ সালের ১ লা সেপ্টেম্বর তারিখে। তিনি উচ্চ প্রাথমিক পাশ বা চতুর্থশ্রেণী উত্তীর্ণ ছিলেন বলে জানা যায়। ১৯৪২ সাল অবধি তিনি এই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। অতীব দুঃখের যে, বলা যায়---এই মহিয়সী নারীর অবদান ওই অঞ্চলের মানুষ একেবারেই কিছু জানেন না!

এই বালিকা বিদ্যালয় থেকে ১৯৩৫ সালে সর্বপ্রথম শ্রীমতি মানদা মণ্ডল এবং শ্রীমতি ইন্দুবালা বিশ্বাস উচ্চপ্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা (ফাইনাল পরীক্ষা) দেন । 

এই সময়ে মশিয়াহাটীর বালক বিদ্যালয়ের যে গৃহে বালিকাদের ক্লাস হতাে তার অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ে । ঘরখানি মেরামত করার যেমন প্রয়ােজন ছিল ; আর একইসাথে ঐটুকু জায়গায় আর ছাত্রীদের স্থান সংকুলান হচ্ছিল না । এসব কিছু বিদ্যালয় পরিদর্শকবৃন্দ বার বার তাঁদের রিপাের্টে উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া পরিদর্শকবৃন্দ বালক বিদ্যালয় থেকে বালিকা বিদ্যালয়টিকে একটু দূরে অন্যত্র স্থানান্তরিত করার প্রয়ােজনীয়তার কথাও উল্লেখ করতে থাকেন । 

স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করেন ; কিন্তু স্কুল স্থানান্তরণের জন্য প্রয়ােজনীয় জমি , টাকা ইত্যাদির সমস্যা প্রকট ছিল । ঐ সময়কালের পরিদর্শন রিপোের্ট থেকে দেখা যায়---একটি ব্লাকবাের্ড , দুটি ম্যাপ প্রভৃতি অতি সাধারণ প্রয়ােজনীয় জিনিষপত্রগুলিও তখন স্কুল কর্তৃপক্ষের খরিদ করার সামর্থ ছিল না । 

এইসব সমস্যার মধ্যে জেলা স্কুল বাের্ড ১৯৩৬ সালে তাদের মাসিক বরাদ্দকৃত ৩.৫০ টাকা থেকে ১ টাকা কমিয়ে মাসিক বরাদ্দ ২.৫০ টাকা করে দেয় ; যদিও একইসময়ে  সরকার বিদ্যালয়টিকে ইমপেরিয়াল গ্রান্ট বরাদ্দ করে মাসে ১ টাকা হারে । একইসাথে দেখা যায় ঐ বছরে অনুন্নতশ্রেণির হিতকারিনী সমিতি থেকেও কোন সাহায্য আসে না । ফলে , বিদ্যালয় যথেষ্ট আর্থিক সংকট ও সমস্যায় পড়ে । পরের বছর যদিও জেলাবাের্ড আবার ৩.৫০ টাকা বরাদ্দ করে ; কিন্তু তখন আবার অন্যকোনাে সাহায্য বিদ্যালয়ে আসে না । এই অবস্থায়, স্থানীয় মানুষের নিকট হতে সংগ্রহ , মুষ্টি চাল সংগ্রহ ইত্যাদির উপর জোর দেবার জন্য পরিদর্শকেরা উপদেশ দেন । এইসব উপদেশাবলীর কথা বিদ্যালয় পরিদর্শন রেজিস্টার থেকে জানা যায়। 

বিদ্যালয়ের এই অতি কঠিন সময় ৩/৪ বছর ধরে চলে । এই কঠিন সময়ের মধ্যে ১৯৩৭ সালে প্রেসিডেন্সি ও বর্ধমান বিভাগের মহিলা পরিদর্শক 'হার এক্সসেলেন্সিস গ্রান্ট' থেকে বিদ্যালয়ের চেয়ার, টেবিল, ব্লাকবোর্ড, বেঞ্চ প্রভৃতি তৈরি করার জন্য ২.৪ পাউন্ড সাহায্য বরাদ্দ করেন – যার ভারতীয় মুদ্রায় মূল্য ছিল ২৫ টাকা । ঐ টাকা দিয়ে প্রয়ােজনীয় সরঞ্জাম তৈরি করা হয় । কিন্তু এর মধ্যে আরও বড় বিপদ এসে হাজির হয় । ১৯৩৮ সালের বর্ষাকালে বালিকা বিদ্যালয়গৃহ ভেঙে পড়ে । এসময়ে কিছুদিন বালক বিদ্যালয়ের হােস্টেল গৃহে অস্থায়ীভাবে বালিকা বিদ্যালয় চলতে থাকে । 

বিদ্যালয়ের স্থানান্তরণ 

এই সময়ে ১৯৩৮ সালে মশিয়াহাটী গ্রামের গােলদার পরিবার এবং স্কুলের পশ্চিমপ্রান্তে বসবাসকারী কুলটিয়া গ্রামের কুঞ্জবিহারী সরকার মহাশয় বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়ােজনীয় জমি দান করার কথা ঘােষণা করেন । মূলত স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে , যেখানে আজ বিদ্যালয়ের উত্তরপোঁতার তিনতলা দালানবাড়ি, সেখানে খড়ের ছাউনী দিয়ে বড় বিদ্যালয় গৃহ তৈরি করা হয় এবং ১৯৩৮ সালের শেষপ্রান্তে বালিকা বিদ্যালয়টি  মশিয়াহাটি থেকে ঐ গৃহে স্থানান্তরিত হয় । কুলটিয়া গ্রামের বিরাটচন্দ্র বিশ্বাস ও রামপদ বিশ্বাসদের বাবা অঘােরচন্দ্র বিশ্বাস বালিকা বিদ্যালয়ের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ জমি দান করেন । হতে পারে স্কুলের বর্তমান ক্যাম্পাসের মধ্যে আরও কারুর দানকৃত জমি আছে , তাঁরা সবাই এই মহতী কাজের জন্য স্মরণযােগ্য । 

স্কুলবাড়ি স্থানান্তরণের সাথে সাথে মশিয়াহাটী বালিকা বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে কুলটিয়া বালিকা বিদ্যালয় করা হয় । স্কুলবাড়ি স্থানান্তরণ ও বিদ্যালয়ের নামের এই রূপান্তর হয় ১৯৩৮ সালের নভেম্বর - ডিসেম্বর অথবা ১৯৩৯ সালের জানুয়ারি মাসের কোনাে একসময়ে । সেই হতে আজও বিদ্যালয়টি কুলটিয়া বালিকা বিদ্যালয় নামে পরিচিত এবং ঐ জায়গাতেই অবস্থিত । 

প্রথম দিককার শিক্ষক - শিক্ষিকা ও তাঁদের কৃতিত্ব

 সরলাবালা রায় জুনিয়র ট্রেনিং শেষে ১৯৩৮ সালের দ্বিতীয় অর্ধে আবার বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা হিসাবে যােগদান করেন । তিনি জুনিয়র ট্রেনিং পড়েছিলেন ঠিকই ; কিন্তু কোন কারণে পাশ করতে পারেননি বা ট্রেনিং শেষ করতে পারেন নি। বিদ্যালয় স্থানাস্তরণের সময়কালে ১৯৩৯ সালের জানুয়ারি মাসে আরও দু জন শিক্ষক ও শিক্ষিকাকে বিদ্যালয়ে নিয়ােগ করা হয় । তাঁরা হলেন কুলটিয়া গ্রামের মনীন্দ্রনাথ বিশ্বাস , ম্যাট্রিক, জি.টি এবং পদ্মাবতী বিশ্বাস , এম.ই পাশ অর্থাৎ ৬ ষ্ঠ শ্রেণি পাশ---এরা দুজন হলেন এই লেখকের বাবা ও মা। কিন্তু একইসময়ে শ্ৰীমন্তকুমার বিশ্বাস  কুলটিয়া বালিকা বিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে মশিয়াহাটী বিদ্যালয়ে ফিরে যান । অর্থাৎ এই সময়ে বালিকা বিদ্যালয়ে কর্মরত থাকেন মােট ৪ জন শিক্ষক ও শিক্ষিকা ; ৩ জন শিক্ষিকা ও ১ জন শিক্ষক । তাঁরা হলেন : শ্রীমতি সরলাবালা রায় , এম.ই , জুনিয়র ট্রেনিং (জেটি অসমাপ্ত) , তিনি প্রধান শিক্ষিকা । মণীন্দ্রনাথ বিশ্বাস , ম্যাট্রিক , জিটি (আইএসসি অসমাপ্ত) , ২ য় শিক্ষক । শ্রীমতি সুশীলাবালা ধর , ৪ র্থ শ্রেণি পাশ এবং শ্রীমতি পদ্মাবতী বিশ্বাস , এম ই পাশ । 

এক্ষেত্রে একটি বিষয় পরিষ্কার বােঝা যায় না , তাহলাে , ম্যাট্রিক ফেল প্রধানশিক্ষক (শ্রীমন্তবাবু) চলে যাবার পর ম্যাট্রিক পাশ (ISc পড়া) ও ট্রেনিং প্রাপ্ত (হতে পারে তাঁর ট্রেনিংপাশ পরে) মণীন্দ্রনাথ বিশ্বাসকে প্রধান শিক্ষক না করে কেন ৬ষ্ঠ শ্রেণি ( এম.ই ) পাশ ও জুনিয়র ট্রেনিং অসমাপ্ত একজন শিক্ষিকাকে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা করা হলাে!  স্কুলের নথিপত্র দেখে বােঝা যায় যে , পাশ করতে না পারলেও উর্ধতর কোনাে ক্লাসে পড়াশুনা করলে সেই সময়ে তা এক ধরনের যােগ্যতা হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে । যেমন লেখা হয়েছে বি এ পড়া , আই . এ পড়া , ম্যাট্রিক পড়া ইত্যাদি । সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখলে মণীন্দ্রনাথ বিশ্বাস আইএসসি পড়া একজন শিক্ষক । তিনি দৌলতপুর বি.এল কলেজে যখন আইএসসি পড়তেন , তখন কলেরা মহামারীর আকার ধারণ করে এবং তাঁর বাবা রসিকলাল বিশ্বাসসহ তাঁর ২/৩ জন বােন মহামারীতে মারা যায় । তিনি বাড়ির বাইরে দৌলতপুর কলেজের অদূরে রংপুর গ্রামে লজিং - এ থাকায় এবং ছােটভাই কান্তিলাল বিশ্বাস মায়ের দুগ্ধপােষ্য হওয়ায় পরিবারের মাত্র এই তিনজন প্রাণী বেঁচে থাকেন । এই মহামারিতে ওই অঞ্চলের অনেক পরিবারের অধিকাংশ লােক মারা যান। এ হলো ১৯৩২/৩৩ সালের ঘটনা। এই ঘটনার আঘাতে মনীন্দ্রনাথের পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যায় । 

এখানে শ্ৰীমন্তকুমার বিশ্বাস সম্পর্কে আরো কিছু কথা বলা প্রয়ােজন । তিনি মূলতঃ ফরিদপুর (গোপালগঞ্জ) জেলার মানুষ ; কিন্তু সারাজীবন মশিয়াহাটীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সেবা করে জীবন কাটিয়েছেন । তিনি একেবারে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত এই সমস্ত কাজ দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করেছেন । তিনি ৫৪/৫৫ বছরেরও বেশি সময়কাল মশিয়াহাটির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন । ১৯২১ সাল থেকে ১৯৩৮ সালের শেষপ্রান্ত পর্যন্ত , অর্থাৎ যে সময়কাল ধরে বালিকা বিদ্যালয় মশিয়াহাটীতে ছিল, এই দীর্ঘ পর্যায়কাল জুড়ে তিনি ছিলেন বালিকা বিদ্যালয়ের একইসাথে প্রধান শিক্ষক , শিক্ষক ও ক্লার্ক । তিনি ছিলেন একটা গােটা প্রতিষ্ঠান । তাঁর যােগ্যতা , অধ্যবসায় ও আন্তরিকতা নিয়ে এই লেখকের কোন কথা লেখার প্রয়ােজন পড়ে না ; কারণ ৪৬ জন বিদ্যালয় পরিদর্শক তাঁর সম্পর্কে প্রশংসাসূচক   মন্তব্য লিপিবদ্ধ করেছেন স্কুলের নথিতে । আমি শুধু বলতে পারি – মশিয়াহাটী উচ্চ বিদ্যালয়ের মহাত্মা প্রতিষ্ঠাতাগণের সাথে কুলটিয়া উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে যদি আর একটিমাত্র নাম সংযােজন করতে হয় , তাহলে সেই নামটি শ্ৰীমন্তকুমার বিশ্বাস । 'যদি নয়' , শ্ৰীমন্তকুমার বিশ্বাস কুলটিয়া উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের নিঃসন্দেহে একজন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। শতবর্ষে তাঁর এই কৃতিত্ব সোচ্চারে প্রচার করা দরকার।

 তাঁকে কত বছর ধরে মশিয়াহাটীর ছাত্রহােস্টেলে নিরন্তর দেখেছি ; কিন্তু তাঁকে তখন মূল্যায়ণের ক্ষমতা এই লেখকের ছিল না । এই বই লেখায় ব্রতী হয়ে নথিপত্র ঘাটাঘাটি না করলে , সে জ্ঞান ও তাগিদ নিশ্চয়ই কোনদিনও হতাে না । আগে শ্ৰীমন্তবাবুকে দেখেছি ঠিকই ; কিন্তু আজ তাঁকে জানলাম ও বুঝলাম । তার একজন নাতি ঠাকুরনগর থাকেন । অত্যন্ত সজ্জন ও শিক্ষিত মানুষ । তাঁর পরিবারও আশানুরূপ শিক্ষিত হয়েছে । আমাদের সবার, গোটা দলিত সমাজের এই মহাত্মার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে এবং তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হবে । 

এখানে আলােচ্য বিষয় হলাে – একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাহিনী এবং এই অঞ্চলে শত শত বছর পর বালিকাদের বিদ্যাশিক্ষার সূচনা । এ কাজে প্রয়ােজন চারিত্রিক গুণের অধিকারি শিক্ষক। বিশেষ করে নারীশিক্ষার সূচনাকালে তা ছিল আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই বিদ্যালয়ের কোন না কোন শিক্ষকের বিরুদ্ধে কখনাে কখনাে অনাকাঙ্খিত অভিযােগ ওঠেনি এমন নয় এবং তার জন্য বিদ্যালয়ের ক্ষতিও হয়েছে । কিন্তু এক্ষেত্রে শ্রীমন্তবাবু এবং মণীন্দ্রনাথ বিশ্বাস ছিলেন আদর্শস্থানীয়। তাদের প্রতি অভিভাবকদের আস্থা ও বিশ্বাস এই বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে খুবই সহায়ক হয় । 

কুলটিয়া বালিকা বিদ্যালয় স্থানান্তরিত হবার পর ১৯৪১ সাল থেকে বিদ্যালয়ে ছাত্রী সংখ্যা বাড়তে থাকে । চল্লিশের কোটা পার হয়ে ওই বছর ছাত্রীসংখ্যা দাঁড়ায় ৭৪ জন। ১৯৪৫ সালে ছাত্রী সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৩ জন। ১৯৪৬ সালে ১১৫ জন এবং ১৯৪৭ সালে দেশের স্বাধীনতার প্রাক্কালে বিদ্যালয়ের ছাত্রী সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪৮ জন । 

বিদ্যালয়ের আয় বৃদ্ধিও ঘটে খানিকটা । ১৯৪২ সালে সরকারি গ্রান্ট পাওয়া যায় ৩০ টাকা । এই বছর স্বনামধন্য এমএলএ রসিকলাল বিশ্বাস কুলটিয়া বালিকা বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন এবং সরকারি অনুদান অন্ততঃ আরও কুড়ি টাকা বাড়াবার জন্য সুপারিশ করেন । রসিকলাল বিশ্বাসের বাড়ি ছিল যশাের জেলার ঝিনাইদহ মহকুমায় । তিনি ছিলেন জেলার নমোদের মধ্যে ১ম গ্রাজুয়েট , অত্যন্ত বলিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতা ও স্বজাতি দরদী । তাঁর সুপারিশের জন্য পরের বছর বিদ্যালয় ৪০ টাকা সরকারি গ্রান্ট পায়। 

এর আড়াই বছর পর রসিকলাল বিশ্বাস (এম.এল.এ) এবং কেএনসিনহা (এম.এল.এ) এই দুই এমএলএকে সঙ্গে নিয়ে বালিকা বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন অভিভক্ত বাংলার মন্ত্রী মহাপ্রাণ যােগেন্দ্রনাথ মণ্ডল । তিনি স্কুলের জন্য বিল্ডিং গ্রান্ট ও ১০০ টাকা মাসিক গ্রান্ট দেবার সুপারিশ করেন। 

পরের বছর অর্থাৎ ১৯৪৬ সাল থেকে এই বালিকা বিদ্যালয় মাসিক ৯০ টাকা হারে গ্রান্ট পায়।  মহাপ্রাণ যােগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে আজ অবধি নমো  সমাজের মধ্যে শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতা হিসাবে বিবেচনা করা হয় । তিনি যুক্তবাংলার মন্ত্রি ছিলেন এবং অবিভক্ত ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রি হন । দেশবিভাগের পর তিনি নিজের স্বজন স্বজাতিকে ফেলে ভারতে চলে যেতে চান নি । তাদের মধ্যে থেকে অসহায় এই জনগােষ্ঠীকে নেতৃত্ব করতে মনস্থ করেন । তিনি ছিলেন পাকিস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্ট (অস্থায়ী)। তাঁর চেয়ারম্যানশিপে করাচিতে পাকিস্তানের প্রথম পার্লামেন্ট অধিবেশন বসে এবং আলােচনার মাধ্যমে মােহম্মদ আলি জিন্নাহ পাকিস্তানের স্থায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন । তিনি পাকিস্তানের একজন কেন্দ্রিয় ক্যাবিনেট মন্ত্রিও (আইনমন্ত্রী) ছিলেন। 

কুলটিয়া উচ্চ প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয় ১৯৪৫ সালে ৫ম ও ৬ষ্ঠ শ্রেণির ক্লাস শুরু করে এবং ঐ বছর থেকেই এম ই (Middle English) অর্থাৎ মধ্য ইংরেজী বালিকা বিদ্যালয় হিসাবে স্বীকৃতি পায় । এখানে উল্লেখ করা প্রয়ােজন যে , এই বিদ্যালয়  ছিল সম্পূর্ণ অবৈতনিক এবং কোনাে ছাত্রীকে বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করার জন্য কোনাে বেতন দিতে হতো না । 

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে , এই বালিকা বিদ্যালয় ১৯৩৫ সালে উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসাবে স্বীকৃতি পায় এবং ঐ বছর দু’জন ছাত্রী উচ্চ প্রাথমিক ফাইনাল পরীক্ষা দেন । ওই সময়ে প্রাথমিকের ফাইনাল পরীক্ষা শিক্ষা দপ্তরের উর্ধতন কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করতেন । ১৯৩৫ সালে প্রথম যে দুজন ছাত্রী পরীক্ষা দেন এই লেখায় আগে তাদের নামােল্লেখ করা হয়েছে । কিন্তু এরপর থেকে ১৯৪৫ সাল অবধি কোন কোন বছরে ঠিক কতজন এবং কারা এই স্কুল থেকে উচ্চ প্রাথমিক ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছেন, তার বিস্তারিত তথ্য জানা যায় নি, সে সম্পর্কে কোন রেকর্ড খুঁজে পাওয়া যায় নি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময়কালেই হয়তো ওইসব কাগজপত্র খোঁয়া গেছে। 

তবে ১৯৪৫ সালের একটি পরিদর্শন রিপাের্ট থেকে জানা যায় – ১৯৩৫ সাল থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত ; অর্থাৎ যে দশ বছর বিদ্যালয়টি উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল , তার প্রতি বছর ছাত্রীরা উচ্চ প্রাথমিক ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছেন এবং কৃতকার্য হয়েছেন । ১৯৪৪ সালে ৩ জন ছাত্রী প্রাথমিক ফাইনাল পরীক্ষা দেন এবং ৩ জনই কৃতকার্য হন। 

বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনা 

কুলটিয়া বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা হয় ১৯২১ সালের মে মাসে । বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর তা কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে স্বমহিমায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় । প্রথমত : বিদ্যালয়টি শুরু হয় মশিয়াহাটীতে এবং মশিয়াহাটী বালক বিদ্যালয়ের গৃহে । পরে বিদ্যালয়টি ১৯৩৯ সালে স্থানান্তরিত হয় কুলটিয়া গ্রামে বিদ্যালয়ের  নিজস্ব গৃহে। দ্বিতীয়ত : বিদ্যালয়টি ১৯২১ সালে শুরু হয় নিম্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসাবে । ১৯২৩ সালে তৃতীয়শ্রেণি খুললেও , শেষ পর্যন্ত ১৯৩৫ সালে বিদ্যালয়টি উন্নীত হয় উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং ১৯৪৫ সালে উন্নীত হয় মধ্য ইংরেজী বিদ্যালয়ে (এমই)। অর্থাৎ বলা যায় – ইতিমধ্যে বিদ্যালয়টি মােটামুটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে । এরপর বিদ্যালয়টির আর মাত্র একটি ধাপ অতিক্রম করা বাকি ; তাহলাে---উচ্চ ইংরেজী বালিকা বিদ্যালয়ে উন্নীতকরণ । পরে অবশ্য পাকিস্তান আমলে নতুন ব্যবস্থায় কুলটিয়া বালিকা বিদ্যালয় ১৯৫১ সালে জুনিয়র হাই স্কুলের মর্যাদা পায় এবং ১৯৬৯ সালে বিদ্যালয়টি উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয় বা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে উন্নীত হয়। বিদ্যালয়ের নথিপত্র পর্যবেক্ষণ করে জানা যায় এবং আরও খানিকটা বােঝা যায়------

(আমি এইসব বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে দেখেছি 'দলিত মুক্তি আন্দোলনের' অংশ হিসাবে। তাই মশিয়াহাটি উচ্চ বিদ্যালয়ের শতবর্ষে (২০১৮ সালে) সেই বিদ্যালয়, কুলটিয়া বালিকা বিদ্যালয় এবং মশিয়াহাটি মহাবিদ্যালয় নিয়েও কিছু কথা লিখেছিলাম এবং বই আকারে প্রকাশ করি (৬৮৭ পৃষ্টার বই)। এই লেখা তারই অংশ। ইচ্ছা ছিল বালিকা বিদ্যালয়ের শতবর্ষে এবং মহাবিদ্যালয়ের ৫০ বর্ষ পূর্তিতে এইসব প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আরো বিস্তারিত লিখবো। কিন্তু করোনা মহামারিতে সব পন্ড হলো। তাই এখন দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর জন্য এই প্রচেষ্টা। এই লেখা চলবে, বন্ধুরা আগ্রহ দেখালে এখানে প্রকাশ করবো)

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

তৃণমূল নেত্রী ফের সংসদে

যদা যদা হি ধর্মস্য... গীতার এই শ্লোকে ঠিক কী বলা হয়েছে?

ভাতে কেরোসিন যাত্রাপুরে, অভিযোগ বাংলাদেশী