সাম্রাজ্যবাদ
প্রসঙ্গ ভারতবর্ষ : সাম্রাজ্যবাদী শােষণের কলাকৌশল ।
(প্রবন্ধটি সেপ্টেম্বর, ২০০৮ সংখ্যা থেকে জানুয়ারি, ২০০৯ সংখ্যায় 'রিপাবলিকান বার্তা' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়)
সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক । বিশেষ করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক!---এই শ্লোগান আমাদের দেশে অতি পরিচিত শ্লোগান । আসলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক! এই শ্লোগানের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে সাম্রাজ্যবাদ বিরােধি সংগ্রামের সূচনা । এখন ব্রিটিশের বদলে আক্রমণের মূল লক্ষ্য মার্কিন বা আমেরিকা। ব্রিটিশরা আমাদের দেশ দখল করে রেখেছিল। তাই , বিদেশি দখলদারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ , প্রতিরােধ ও স্বাধীনতার সংগ্রাম — এসব বুঝতে সাধারণ মানুষের অসুবিধা হয় নি । কিন্তু সাত - সমুদ্র তের নদীর পার মার্কিনের বিরুদ্ধে জেহাদের কথা শুনতে শুনতে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে গেছেন ঠিকই ; কিন্তু শােষণের কৌশলটা সব মানুষের বােধগম্য নয় । তা মানুষের কাছে বেশি দুর্বোধ্য এই কারণে যে , যারা শতাব্দীকাল ধরে এই শ্লোগান দিয়ে গলা ফাটিয়ে আসছেন , তাদের মধ্যকার সিংহভাগের শ্লোগান ও কাজের মধ্যে দুস্তর ব্যবধান ।
রাজা-বাদশারা একে অপরের সাথে লড়াই করতেন বা এক দেশ অন্যদেশকে আক্রমণ করতো, কেবলই দখল করার জন্য নয়। তারা লড়াই করতেন শুধুমাত্র নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্যও নয় । কর্তৃত্ব বা দখলদারিটা প্রয়ােজন ছিল আয়ের জন্য, আয় বাড়াবার জন্য , শোষণ করার অধিকার অর্জনের জন্য । আধুনিক যুগেও ইউরােপে নিরন্তর যুদ্ধ বিগ্রহ লেগে থাকতো। এমনকি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনাও হয়েছিল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দখলদারি টিকিয়ে রাখা এবং দখল ও পুনর্দখলের তাগিদ থেকে ।
কলিঙ্গ যুদ্ধের বীভৎসতা সম্রাট অশােকের হৃদয় পরিবর্তন করে । তাঁর মধ্যে সৌভ্রাতৃত্ব , শান্তি ও করুণার জন্ম দেয় । আর, দুটি বিশ্বযুদ্ধে জয় এবং পরাজয় যেখানে যে পক্ষেরই হােক না কেন , সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উভয় পক্ষ অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে সাময়িকভাবে অনেকটাই শক্তিহীন হয়ে পড়ে । আর পরাধীন জাতিগুলির মনে জন্ম হয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা । দেশে দেশে শুরু হয় জাতীয় মুক্তি আন্দোলন--- যা দখলদার দেশগুলির পক্ষে সামাল দেওয়া সুকঠিন কাজ ছিল । সরাসরি দেশগুলিকে দখলে রেখে শাসন ও শােষণ আর সম্ভব ছিল না । এই অবস্থায় পৃথিবীর নানা প্রান্তে জাতীয় মুক্তি আন্দোলন জয়ী হয় ।
তবে তাতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মন বদলায় না , তারা শুধুমাত্র শােষণের কৌশল পাল্টায় । ১৯০০ সালের শুরুর সময়কাল থেকে সাম্রাজ্যবাদ শব্দটির ব্যবহার প্রচলিত হয় । ইংরেজ অর্থনীতিবিদ হবসনের "সাম্রাজ্যবাদ ” নাম দিয়ে লেখা বইখানি প্রকাশিত হয় ১৯০২ সালে । শােষণ-নির্যাতন এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ ও দখলদারির ক্রিয়াকাণ্ডের সাথে সাম্রাজ্যবাদ শব্দটি সমার্থক — সে দখলদারি প্রত্যক্ষ হতে পারে , আবার পরােক্ষ দখলদারিও হতে পারে । অর্থনীতিবিদদের কথায় পুঁজিবাদের একটি বিশেষ পর্যায়স্বরূপ সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব । সাম্রাজ্যবাদ হলো পুঁজিবাদের একচেটিয়া পর্যায় । অবাধ প্রতিযােগিতার অখণ্ড প্রতিপত্তির যুগে পণ্য রপ্তানি ছিল পুরনাে পুঁজিবাদের বৈশিষ্ট্য। আর সাম্রাজ্যবাদের দুনিয়ার বৈশিষ্ট্য হলাে পুঁজি রপ্তানি।
পৃথিবীর অর্থনৈতিক ইতিহাসে অবাধ প্রতিযােগিতা যুগের সর্বোচ্চ অধ্যায়কাল হলাে ১৮৬০-৭০ সাল । এই সময়কালে ১৮৭৩ সালে সৃষ্টি হয় বিশ্ববাজারে আর্থিক সংকট, মন্দা!
ইউরােপে শিল্প বিপ্লবের সূচনায় প্রতিযােগিতার বাজারে ছিল ছােট খাট উদ্যোগ । কারিগরি উন্নতি ও অন্যান্য কারণে দ্রুত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও পুঁজির সঞ্চয় বাড়তে থাকে। ১৮৬০ সাল নাগাদ পুঁজির বৃদ্ধি তুঙ্গে ওঠে এবং পুজিপতিরা একে অপরকে টেক্কা দিয়ে এগিয়ে যাবার প্রতিযােগিতায় নামে । ছােট ও দুর্বল উদ্যোগগুলি এই প্রতিযােগিতায় টিকতে পারে নি এবং এমনকি অনেক বড় উদ্যোগও মুখ থুবড়ে পড়ে, যা হলো ১৮৭৩-এর সংকট।
একদিকে বড় কোম্পানী ছােটগুলিকে গিলে খেয়ে নিল ; কিনে নিল । আবার অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন উদ্যোগ মিলিত হয়ে তৈরি করলাে কার্টেল , সিণ্ডিকেট , ট্রাস্ট প্রভৃতি । কার্টেলগুলি পণ্য বিক্রয়ের শর্ত , মূল্য পরিশােধের মেয়াদ , প্রভৃতি বিষয়ে নিজেদের মধ্যে চুক্তিবদ্ধ হয়। তারা বাজার ভাগাভাগি করে নেয় । কী পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করবে , তা ঠিক করে নেয় । পণ্যের দাম নিজেদের মধ্যে ঠিক করে নেয়। এমনকি বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে মুনাফার বাটোয়ারা করে । ব্যবসায় নিশ্চিত মুনাফার স্বার্থে তারা এসব ব্যবস্থা করে নেয় ।
পূজিপতি বা উদ্যোগপতিদের মধ্যে এই বােঝাপড়া শুরু হয় ১৮৭৩ - এর মন্দার সময় থেকে এবং এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে সময় লেগে যায় ১৮৯০ সাল পর্যন্ত । কার্টেলগুলি নিজেদের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার জন্য কার্টেল বহির্ভূত উদ্যোগগুলিকে শেষ করে দেবার জন্য যে সমস্ত পদ্ধতি গ্রহণ করে , তাহলাে —১ ) কাঁচামালের জোগান বন্ধ করে দেওয়া । ( ২ ) জোট গঠনের দ্বারা মজুরের জোগান বন্ধ করে দেওয়া ; অর্থাৎ পুঁজিপতি ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলির সাথে চুক্তি করা , যাতে তাদের কোন সদস্য কার্টেল বহির্ভূত কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে না পারেন । ( ৩ ) মাল পরিবহন বন্ধ করে দেওয়া ( ৪ ) বাজারে মাল ছাড়ার পথ বন্ধ করা । ( ৫ ) ক্রেতাদের সাথে চুক্তি — যাতে ক্রেতারা শুধুমাত্র কার্টেলভুক্ত কোম্পানীর সাথে কারবার করেন । ( ৬ ) পরিকল্পনা করে মালের দর কমিয়ে দেওয়া, যাতে ছােট উদ্যোগ লােকসানের বােঝা বইতে না পেরে কারবার বন্ধ করে দেয় । উৎপাদন খরচের চেয়েও দাম কমানাে---এমন বহু নজির আছে । ঐ সময়ে পেট্রল শিল্পে দাম ৪০ মার্ক থেকে ২২ মার্কে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল । ( ৭ ) ধারের পথ বন্ধ করে দেওয়া । ( ৮ ) বয়কট ঘােষণা ইত্যাদি ।
কার্টেল - এর মাধ্যমে গােটা কারবারের একচেটিয়াকরণ হয় ও দাম বেশি রেখে অস্বাভাবিক লাভের পথ খুলে যায় । মুষ্টিমেয়র একচেটিয়া কারবারিতে এই রূপান্তরটা হলাে---পুঁজিবাদের পুঁজিবাদ থেকে সাম্রাজ্যবাদে পরিণতি লাভের মৌলিক প্রক্রিয়াগুলির একটা।
ব্যাংক ব্যবসার ক্ষেত্রেও একই জিনিস দেখা যায় । ছােট ব্যাংকগুলোকে হটিয়ে দেয় বড় বড় ব্যাংক । বড় ব্যাংক , ছােট ব্যাংক কিনে নেয় । ব্যাংকগুলি পরস্পরের সাথে মিশে আরও বড় বড় ব্যাংক তৈরি করে । আমরা আগে দেখেছি উৎপাদনের কেন্দ্রিভবন ও ব্যবসার
একচেটিয়াকরণ । এবার যুক্ত হয় শিল্পের সাথে ব্যাংকগুলাের মিলন বা অঙ্গীভবন । এই সময়কাল ১৯০০ সাল । ব্যাংকের পুঁজি শিল্পের কাজে শিল্পপতিদের দ্বারা ব্যবহার শুরু হয়, যাকে ফিন্যান্স পূজি হিসাবে বলা হয়ে থাকে । পরস্পরের স্বার্থ এবং নজরদারির জন্য শিল্প বাণিজ্যের উদ্যোগগুলির পরিচালকমণ্ডলীতে ব্যাংকের পরিচালক এবং ব্যাংক পরিচালক মণ্ডলীতে শিল্প বাণিজ্যের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রথা দেখা যায় । এই প্রক্রিয়াতে দেখা যায় — মাত্র ১৯১০ সাল নাগাদ পুরনাে পুঁজিবাদী দেশ ইংল্যাণ্ড ও ফ্রান্স এবং উদীয়মান নতুন পুঁজিবাদী দেশ জার্মান ও আমেরিকা দুনিয়ার মােট ফিনান্স পুঁজির ৮০ শতাংশের মালিক হয়ে যায় ।
অন্যসব দেশের আগে ইংলণ্ড প্রথমে পুঁজিবাদী দেশ হয়ে ওঠে । উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ অবাধ বাণিজ্য প্রবর্তন করে সমস্ত দেশে শিল্পজাত পণ্য সরবরাহকারি হিসাবে এগিয়ে আসে ইংল্যাণ্ড — পরিবর্তে ঐসব দেশগুলিকে তাকে কাঁচামাল যােগান দিতে হতাে । ইংল্যাণ্ডের এই বিকাশের পিছনে সব থেকে বড় শক্তি ছিল উপনিবেশ ভারতবর্ষ । বিশাল ভারতবর্ষের সম্পদ লুণ্ঠন করে তারা এগিয়ে যেতে সুবিধা পায় । কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর শেষলগ্নেই ইংল্যাণ্ডের এই একচেটিয়া ব্যবসার কাল শেষ হয় । সংরক্ষণ শুল্কের আড়ালে আশ্রয় নিয়ে অন্যান্য কয়েকটি দেশও স্বাধীন পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে উঠেছিল । পুঁজিপতিদের একচেটিয়া সংঘ ও একচেটিয়া কারবারের সুবাদে এইসব অতি অগ্রসর দেশগুলােতে দেখা দিল বিপুল পরিমানে উদ্বৃত্ত পুজি ।
জলের ধর্ম যেমন নীচের দিকে গড়ানো, তেমনি পুঁজির ধর্ম মুনাফা সৃষ্টি । যেখানে মুনাফা নেই বা মুনাফা কম , পুঁজি সেখানে আটকে থাকে না । পুঁজি সব সময় বেশি মুনাফার খোঁজে ব্যস্ত থাকে ।
এই সমস্ত দেশের উদ্বৃত্ত পুঁজি যদি তাদের নিজ নিজ দেশের কৃষিতে বিনিয়ােগ হতাে , তাহলে সে দেশের ব্যাপক সংখ্যক মানুষের জীবন ধারণের মান উন্নত হতে পারতাে । তাতে দেশের মধ্যে চাহিদা বৃদ্ধি হতাে । ফলে , সে দেশেই আরও পুজি শিল্পে বিনিয়োগ করা সম্ভব হতো। অবশ্য সেক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত পুঁজি আর পুঁজি থাকতাে না । কারণ সাধারনত কৃষিতে মুনাফা কম , তাসত্ত্বেও পুঁজি সেখানে বিনিয়ােগ হলে পূজিতাে আর পুঁজি থাকেনা , সেক্ষেত্রে পুঁজির চরিত্র বদলে যায়! তাই , এই বিপুল পরিমাণ খুঁজে বেড়ায় বিনিয়ােগের অন্যক্ষেত্র।
পুঁজিপতিরা তাদের উদ্বৃত্ত পূজি বাইরের অনুন্নত দেশগুলিতে রফতানি করার পরিকল্পনা করে । অনুন্নত দেশে সাধারণত মুনাফা বেশি হয় । কারণ, সেসব দেশে পুঁজি দুর্লভ , জমির দাম কম , মজুরি কম এবং কাঁচামাল সস্তা।
বৃটিশ পুঁজির বিনিয়োেগ হয় সাধারণত তার উপনিবেশগুলিতে । ফ্রাঞ্চের ক্ষেত্রে পরিস্থিতিটা অবশ্য অন্যরকম ছিল। তাদের পুঁজি রফতানি হয় সাধারণত রাশিয়া ও ইউরোপের অন্যান্য দেশে। তা ছিল সাধারণত রাষ্ট্রীয় ঋণ বা কর্জ পুঁজি। জার্মানির উপনিবেশ বেশি ছিল না। তাদের দেশের পুঁজি আমেরিকা ও ইউরোপে প্রায় সমান সমান বিনিয়োগ হয়।
পুঁজি রফতানি দেশগুলি প্রায় সব সময় কিছু বাড়তি সুবিধা পায়। চুক্তির শর্তে কখনো থাকে---একটা কয়লা স্টেশন বা বন্দর নির্মাণের ঠিকাদারি পাবার কথা, কখনো বা কামানের ফরমাস। ঋণদানের শর্তে থাকে---ঋণের একটা অংশ খরচা করতে হবে উত্তমর্ন দেশের মাল কেনায় — বিশেষ করে অস্ত্রশস্ত্র কেনায় , জাহাজ কেনায় ইত্যাদি । এই অবস্থাকে বলা যায়, বিদেশে পুঁজি রফতানিটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বিদেশে মালের রফতানি বাড়ানাের একটা উপায় । এসব কথা লেখা হচ্ছে ১৯০০ সালের প্রথম দশকের পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে ।
আগ্রাসী দেশগুলি মিলেমিশে শোষণের প্রয়োেজনে নিজেদের মধ্যে বােঝাপড়ার চেষ্টা চালিয়ে যায় । ১৯০৭ সালে আমেরিকা ও জার্মান একটা চুক্তি করে বাজার দখলের গণ্ডগােল মিটিয়ে নেয় । আমেরিকান ইলেকট্রিক কোম্পানী ভাগে পেল যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা । জার্মান জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানী ব্যবসা করার সুবিধা পেল জার্মানী , অষ্ট্রিয়া , রাশিয়া , হল্যাণ্ড , ডেনমার্ক , সুইজারল্যাণ্ড , তুরস্ক ও বলকান রাষ্ট্রগুলােতে। তেল বাজারের একচেটিয়া দখল ছিল আমেরিকান অয়েল ট্রাস্ট ' এবং 'রথশিল্ড ও নােবেলের' মধ্যে । তাদের মধ্যে ভাল বােঝা পড়া ছিল। জার্মান জাহাজী প্রতিষ্ঠান এবং মার্কিন-বৃটিশ জাহাজ ট্রাস্টের মধ্যেও সমঝােতা হয় । রেল কারখানাগুলিও একটা সমঝােতা করে নেয় । ইস্পাত শিল্পগুলিও বােঝাপড়ায় আসতে সমর্থ হয় । চলতে থাকে এভাবে ।
বােঝাপড়ার এই পর্যায়কালে , মােটামুটি ১৮৮৪ সাল থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে বাজারের প্রয়ােজনে বৃটেন দখল করে ৫ কোটি ৭০ লক্ষ জনসংখ্যা সমেত ৩৭ লক্ষ বর্গমাইল এলাকা । জার্মানি ১ কোটি ৪৭ লক্ষ মানুষের দেশ, যা ১০ লক্ষ বর্গমাইল এলাকা । বেলজিয়াম ৩ কোটি জনসংখ্যা সমেত ৯ লক্ষ বর্গমাইল এলাকা । পর্তুগাল ৯০ লক্ষ জনসংখ্যা সমেত ৮ লক্ষ বর্গমাইল এলাকা দখল করে নেয় । ১৮৭৬ সালের পর ৬ টি বড় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উপনিবেশ সম্পত্তি বেড়ে যায় বিপুল আকারে , দেড় গুণেরও বেশি বেড়ে যায় । ৪০০ লক্ষ বর্গ কিলােমিটার থেকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫০ লক্ষ বর্গ কিলােমিটার । ১৮৭৬ সালে তিনটি শক্তি অর্থাৎ আমেরিকা , জার্মান , জাপান - এর আদৌ কোন উপনিবেশ ছিল না । ফ্রান্সেরও না থাকার মত । ১৯১৪ সালের মধ্যে এই ৪ টি দেশ করায়ত্ত করে নেয় ১০ কোটি জনসংখ্যা সমেত ১ কোটি ৪১ লক্ষ বর্গ কিলােমিটার আয়তনের উপনিবেশ — যা আয়তনে ইউরােপ মহাদেশের থেকে দেড়গুণ বড় ।
সাধারণভাবে বাজার , কাঁচামাল ইত্যাদির প্রয়ােজনীয়তা তাে বটেই ; এমনকি খনি ও কাঁচামালের অন্যান্য সম্ভাব্য উৎসগুলির কথা ভেবে অবণ্টিত ভূভাগের শেষ টুকরােটি অথবা বণ্টিত টুকরােগুলির আবার পুনর্বণ্টনের জন্য পুঁজিবাদী দেশগুলি উন্মাদের মত সংগ্রামে লিপ্ত হয় ।
বিভিন্ন দেশ ও বড় বড় শিল্প বাণিজ্যিক সংস্থাগুলি যতই নিজেদের মধ্যে সমঝােতা করে চলার চেষ্টা করুক না কেন , তা স্থায়ী হয় নি । সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির মধ্যে মৈত্রী প্রকৃতপক্ষে ছিল দুই যুদ্ধের অন্তর্বর্তী একটা অবকাশ মাত্র । শান্তিপূর্ণ জোট আসলে আগামী যুদ্ধের প্রস্তুতি চালায় । বিশ্ব অর্থনীতির বিভিন্ন অংশের বিকাশের হারে যে বৈষম্য , তা ফিনান্স পুঁজি এবং সিণ্ডিকেট , ট্রাস্ট ও কার্টেল গঠনের ফলে হ্রাস পায় নি ; বরং বৃদ্ধি পায় । ১৮৯২ সালে জার্মানী উৎপাদন করে ৪৯ লক্ষ টন লােহা ; যেখানে গ্রেট বৃটেন উৎপাদন করে ৬৮ লক্ষ টন । আবার ১৯১২ সালে জার্মানীর উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৭৬ লক্ষ টন , যেখানে বৃটেনের উৎপাদন ৯০ লক্ষ টন । একদিকে উৎপাদন শক্তির অসম বিকাশ ও পুজির সঞ্চয় এবং অন্যদিকে ফিনান্স পুঁজির জন্য উপনিবেশ ও প্রভাবাধীন এলাকার বাটোয়ারা — এই দুইয়ের মধ্যে যে বৈষম্য , যুদ্ধ ছাড়া এই সমস্যা সমাধানের অন্যকোন পথ ভােলা থাকেনা । এ অবস্থায় পুঁজির আধিপত্য বজায় থাকতে পারে কেবল ক্রমাগত সামরিক শক্তি বাড়িয়ে । এই আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা ও পরিণতিতে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং আরো কিছুকাল পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ।
পৃথিবীর দেশে দেশে জাতীয় মুক্তি আন্দোলন জয়ী হয়। উপনিবেশবাদ যুগের অবসান হয় । ফলে , পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির, পৃথিবীর নানা দেশের উপর আগের মত আর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ থাকে না । অথচ সে সব দেশে তাদের পুজি খাটছে এবং সেসব দেশে নতুন করে তারা আরও অধিক পুঁজি চালান করে বেশি মুনাফা করতে চায় । সেজন্য তাদের বিনিয়ােগ করা পুঁজির নিরাপত্তা ও মুনাফার গ্যারান্টির জন্য নানা ধরনের কলাকৌশল ও সংগঠন গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয় ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৪ সালে পৃথিবীর ৪৪ টি দেশ একত্রে আমেরিকার নিউ হাম্পশায়ারে একটা সম্মেলন করে । এর আগের তিনটি দশক যুদ্ধ - বিগ্রহ , বিশ্ব মন্দা ও অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার জন্য চিহিত ছিল । এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য ছিল, যাতে অতীতের ন্যায় খারাপ অবস্থা আর সৃষ্টি না হয় তারজন্য প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিনিয়ােগ ও ব্যবসার জন্য নতুন রাস্তার উদ্ভাবন । এই লক্ষ্যে ঐ সম্মেলনে দু’টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয় ---১১একটি হলাে আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার ( International Monetary Fund বা IMF) এবং অন্যটি বিশ্ব ব্যাংক ( World Bank বা WB ) । এই সম্মেলনে আমেরিকা মূল ভূমিকা পালন করে এবং এখান থেকেই বৃটেনের বিশ্ব আধিপত্যের জায়গাটি আমেরিকার দখল করার প্রক্রিয়া শুরু হয় । প্রতিষ্ঠান দুটি গঠনের লক্ষ্য হলাে — পুঁজিবাদকে রক্ষা করা এবং বিকশিত হতে সাহায্য করা । আই এম এফ - এর সদস্য দেশগুলি এই সংস্থা থেকে সহজে ঋণ পেতে পারে এবং নিজ দেশের লেনদেন হিসাবের ঘাটতি মিটিয়ে দেশের অর্থনৈতিক মন্দা দূর করতে পারে । এই সংস্থার প্রতিটি সদস্যদেশকে এই তহবিলে নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ জমা দিতে হয় । কোটার পরিমান স্থির হয় দেশটির জাতীয় আয় , বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়ের উপর নির্ভর করে । এভাবে যে পরিমান অর্থ ধার্য হয় তার এক চতুর্থাংশ জমা করতে হয় সােনায় এবং বাকীটা দেশীয় মুদ্রায় । এই সংস্থা থেকে ঋণ পাওয়া কোন সমস্যা নয় । কিন্তু আদতে এই সংস্থার সৃষ্টি হয়েছে বিকাশমান দেশগুলির উপর কর্তৃত্ব করার একটা উপায় হিসাবে । ঋণী দেশগুলির সরকার প্রাইভেট ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক প্রাইভেট ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হলে আইএমএফ এর অনুমােদন নিতে হবে । এটাই নিয়ম করা হয়েছে । আই এম এফ - এর অনুমােদন পেতে হলে তাদের শর্ত মানতে হবে । শর্তগুলি কী ? —শর্তগুলি হলাে ( ১ ) আমদানি নিয়ন্ত্রণ ( ২ ) বিদেশি মুদ্রা , ( ৩ ) ব্যাঙ্কঋণ নিয়ন্ত্রণ ( ৪ ) বিদেশী বিনিয়ােগ নীতি , ( ৫ ) উন্নয়নমূলক ব্যয়— ইত্যাদি সব বিষয়ে আই এম এফ যে সব শর্ত ও সুপারিশ করবে , তা মানলে তবেই ঋণ পাওয়া যাবে ; অন্যথায় নয় । আই এম এফ সাধারণতঃ যা বলে , তাহলাে — জনগণের কঠোর কৃচ্ছসাধন , সরকারি বাজেট ও সমস্ত কল্যাণমূলক কাজ কাটছাঁট , অনুদান বন্ধ করা , রাষ্ট্রীয় উদ্যোগকে খর্ব করা , মুক্তদ্বার নীতি — এসব কড়া দাওয়াই । আসলে এসব শর্তের মাধ্যমে তারা দেনাদার দেশগুলির আভ্যন্তরীণ আর্থ সামাজিক নীতিতে হস্তক্ষেপ করে । দেখা যাচ্ছে--- গরিব ও বিকাশমান দেশগুলি আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের ঋণ গ্রহণ করে থাকে । ধনী দেশগুলি এই তহবিল থেকে সাধারণত কোন ঋণ নেয় না । অবশ্য ঠিক এই মুহূর্তে আই এম এফ - এর গুরুত্ব অনেকটাই কমে গেছে । তবে বর্তমান মন্দা সামলাতে হয়তো এখন অনেক দেশ এই সংস্থার দ্বারস্থ হতে বাধ্য হবে ।
নির্দিষ্ট কিছু কাজের জন্য বিশ্ব ব্যাংকের ঋণ পাওয়া যায় । পরিকাঠামােগত সংস্কার ইত্যাদি কাজের প্রয়ােজনে বিশ্ব ব্যাংকের ঋণ মেলে । সে সবের বিস্তারিত আলােচনায় যাচ্ছি না। তবে একটা বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ — যা বােঝা দরকার । ধরুন - কোন দেশ বিশ্বব্যাংকের ঋণ নিল, ডলারে । কিন্তু তা পরিশােধ করতে হবে কোন মুদ্রায় তা ঠিক করবে বিশ্বব্যাংক । কার্যত ধনী দেশ ; বিশেষ করে আমেরিকা নিজের কোটার জোরে এবং ভেটোর জোরে বিশ্বব্যাংক এবং আই এম এফ কে নিয়ন্ত্রণ করে । ফলে , মুদ্রার বিনিময় হার পুনর্বিন্যাসের সময় আমেরিকা ও অন্যান্য ধনী দেশের সুবিধামত বিশ্বব্যাংক তা নির্ধারণ করে থাকে , তাতে খাতক দেশের প্রচণ্ড ক্ষতি হয়।
দু'একটা উদাহরণ দেখে নেওয়া যেতে পারে । ১৯৮৫ সালে ভারতের বৈদেশিক ঋণ ছিল ৩৬ হাজার কোটি টাকা । আরও প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয় ভারত । তাহলে ঋণের পরিমান দাঁড়ায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা । এই সময়ে ভারত ঋণ পরিশােধ করে কমবেশি ৪ হাজার কোটি টাকা । তাহলে মােট ঋণের পরিমাণ হবার কথা ৪১ হাজার কোটি টাকা । কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঋণ দাঁড়ায় ৫০.৫ হাজার কোটি টাকা । এটা হয়েছিল টাকার বিনিময় হার পুনর্বিন্যাসের জন্য অর্থাৎ টাকার দাম কমিয়ে ধরার জন্য । এরফলে ৯ হাজার কোটি টাকা ভারতকে অতিরিক্ত গুণতে হয় ।
১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে ভারত আইএমএফ থেকে কোন ঋণ নেয়নি বরং পরিশােধ করে ৭০০ কোটি টাকা । তাতে কিন্তু ঋণ কমে না ; বরং আরও বেড়ে যায় । মুদ্রার বিনিময় হার পুনর্বিন্যাসের কারণে এটা হয় । অবশ্য কোন কোন সময় সরকার নিজের দেশের টাকার দাম কমিয়ে দিতে বাধ্য হয় বৈদেশিক বাণিজ্যের স্বার্থে । মুদ্রার বিনিময় হার যে কী সাংঘাতিক শর্ত , তার আর একটি মাত্র উদাহরণ দেখুন।--- ভারত ১৯৮৫ সালে জার্মানীর কাছ থেকে ঋণ নেয় ৪৭৩ কোটি ডি.এম। সে সময়ে ১ ডি.এম-এর বিনিময় মূল্য ছিল ৪ টাকার সামান্য বেশি । ১৯৮৭ সালে বিনিময় হার হয়ে যায় ৭ টাকা । অর্থাৎ সুদ বাদেই মাত্র ২ বছরের মধ্যেই ঋণের পরিমান প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।
আগে একটা শব্দ শােনা যেত — গ্যাট । গ্যাট হলাে বিভিন্ন দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তি---জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন্ ট্যারিফস এ্যাণ্ড ট্রেড । ১৯৪৭ সালে এর সৃষ্টি । অবশ্য এর আগেই হাভানায় ৫০ টি দেশ মিলে একটা চুক্তি করে । তার নাম হাভানা চার্টার । কিন্তু হাভানা চার্টারের কিছু শর্ত আমেরিকা ও কিছু দেশ শেষ পর্যন্ত মানতে রাজি হয় না । তাই সৃষ্টি হয় গ্যাট । এই চুক্তি একটা ব্যবসায়িক চুক্তি । সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ঠিক হয় — কোন দেশ কী দিতে চায় এবং কী কী শর্তে দিতে পারে । এ সবের একটা তালিকা হয় । আবার অন্য একটি তালিকা হয় কোন কোন দেশ কী কী জিনিষ পেতে চায় । এ সবের সাথে থাকে কোন পণ্যে কতটা ছাড় দিতে দেশটি প্রস্তুত এবং গ্রহীতা দেশ কোন পণ্যে কতটা ছাড় আশা করে ইত্যাদি । বর্তমানে গ্যাট বলে আর কিছু নেই। ১৯৯৪ সালে গ্যাটের বদলে আসে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ( WTO ) । এখন আই এম এফ , বিশ্ব ব্যাংক এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা — এই তিনটি সংস্থা হলো সাম্রাজ্যবাদের প্রধান হাতিয়ার । এই সংস্থাগুলির মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদীরা বিভিন্ন দেশে গ্লোবাল পূক্তির অনুকুল কর কাঠামাে এবং শুল্ক ব্যবস্থা চালু করছে , আর্থিক নিয়ম কাঠামোয় পরিবর্তন আনছে , বিভিন্ন দেশের মধ্যে পুঁজির অনুকূল পরিকাঠামাে তৈরি করছে এবং নতুন শ্রম আইন তৈরি করার জন্য চাপ দিচ্ছে --- যাতে শ্রমশক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় । ১৯৯৯ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার উরুগুয়ে রাউণ্ডের আলােচনায়, প্রথম কৃষিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় । এর পূর্বে কৃষি এবং কৃষিজাত পণ্যের ব্যবসা , বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা হুয়ের নিয়ন্ত্রণে ছিল না । বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা শর্ত দেয় যে , (১) কোন দেশ তাদের নিজ নিজ দেশের কৃষকদের স্বার্থে সার , বীজ , কীটনাশক , বিদ্যুৎ , সেচ প্রভৃতি কিছুতেই কোন সরকারি ভর্তুকি দিতে পারবে না বা ভুর্তুকি কমাতে হবে — যাতে বিদেশি কৃষিপণ্য খাতক/দুর্বল দেশের বাজারে লাভজনক ব্যবসা করতে পারে । ( ২ ) রফতানির ক্ষেত্রে সরকারি ভর্তুকি কমাতে হবে — যাতে কৃষি পণ্য বিদেশে রফতানি করে ব্যবসায়িরা বেশি লাভ করতে না পারে । এর ফলে রফতানি করার উৎসাহ কমবে— ফলে রফতানির পরিমানও কমবে , বিদেশী মুদ্রা কম আয় হবে । ফল হলাে — উন্নত দেশগুলি বিশ্বের ঐ সব বাজারের দখল নিতে পারবে, উন্নত দেশগুলোর রফতানি ও মুনাফা বাড়বে।
এ ছাড়াও কৃষিপণ্যের এমন গুণমান ধার্য করেছে উন্নত দেশগুলি , যেখানে কার্যত অনুন্নত দেশের কৃষিপণ্য ঢুকতে পারছে না । কৃষিপণ্যের আভ্যন্তরীণ চাহিদার কমপক্ষে ৫ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতেই হবে — তা আমদানির প্রয়ােজন সেদেশের হােক বা নাই হােক ইত্যাদি । এছাড়াও আছে পেটেন্ট আইনের নানা বাহানা । ওযুধ , বীজ , কীটনাশক---এ সবের উপর এমন এক ধরণের নিয়ন্ত্রণ , যা আমাদের দেশের কৃষক ও সাধারণ মানুষকে নানাভাবে কব্জা করে ফেলার কৌশল । গােটা দেশকে বিদেশ নির্ভর করার ষড়যন্ত্র । নতুন পেটেন্ট আইনের মূল কথা হলাে--- উন্নত দেশের যা আছে , তা তাদের থাকবে । অনুন্নত দেশের যা আছে, তা উন্নত দেশের সাথে ভাগ করে নিতে বাধ্য করা।
এসব শর্তের বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে--- নিজের দেশের ক্ষতি করে , উন্নত সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির ব্যবসায় সুবিধা পাইয়ে দেওয়া ছাড়া এসব নিয়মের আর অন্য কোন অর্থ নেই । বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যমন্ত্রিদের নিয়েই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সভা বসে। বিভিন্ন সময়ে দেখা যাচ্ছে যে, মতপার্থক্যের জন্য এইসব মিটিংগুলি বার বার ভেস্তে যাচ্ছে ।
এতক্ষণ যে আলােচনা করা হলাে , তা দিয়ে সাম্রাজ্যবাদের শোষণ ও নিয়ন্ত্রণের কলাকৌশলের ছক অনেকটাই ধারণায় আনা গেল ; কিন্তু এটাই সব নয় । দেশে দেশে রাষ্ট্রের ক্ষমতায় সাম্রাজ্যবাদীদের বশংবদদের বসানাের জন্য তারা অসংখ্য জঘন্য উপায় অবলম্বন করে থাকে । টাকার জোগান , গুপ্ত খুন থেকে শুরু করে বহু কিছু ।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মিটিং ও অন্যান্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ে এতসব কলাকৌশল করেও সব সময় মতৈক্য হচ্ছে, এমন নয় । সােভিয়েত রাশিয়ার পতনের পর পৃথিবীতে কী সামরিক অথবা আর্থিক - বাণিজ্য — সব বিষয়ে আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম হয়েছে ঠিকই ; কিন্তু সবাইকে এবং সব কিছুকে ছক বাধা পথে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে , এমনও নয় । যার ফলে প্রয়ােজন পড়ছে সামরিক অভিযানের — যুদ্ধবিগ্রহ , বর্বরতা ও মৃত্যু ! সাম্প্রতিককালে লেবানন , আফগানিস্তান ও ইরাকে সামরিক আগ্রাসন হয়েছে এবং ইরান ও উত্তর কোরিয়াকে যুদ্ধের হমকি দেওয়া হচ্ছে। পৃথিবীর ১০০ টির বেশি দেশে রয়েছে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি । গােটা ইউরােপের সামরিক শক্তি থেকে আমেরিকার সামরিক শক্তি বেশি । সামরিক খাতে আমেরিকা যা খরচ করে , গােটা ইউরােপ তার অর্ধেকও খরচ করে না। স্বভাবতই এই বিপুল সামরিক ব্যয়ের বােঝা সে চোখ রাঙিয়ে অসম চুক্তির মধ্যদিয়ে অন্যদের ঘাড়ে চাপাতে চায় এবং চাপাচ্ছে ।
ইউরােপ হয়তাে আজ নিরুপায় , তাই মেনে নিচ্ছে । যদিও ইউরােপিয়ান ইউনিয়ন তৈরি করে একটা প্রতিরােধ সে গড়তে চেয়েছে । জাপানও বাণিজ্যে আমেরিকার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি । আমেরিকা ও গ্রেটবৃটেন বাদ দিলে , শক্তিশালি রাষ্ট্রের মধ্যে ইউরােপের দেশগুলি ও জাপান । চীন এবং ভারতও দ্রুতগতিতে এক ধরনের উন্নতি করে চলেছে । বিশ্বায়নের যুগেও এই দেশগুলির, বিশেষ করে ফ্রান্স ও জার্মানীর রয়েছে জাতীয় আকাংখা । মার্কিনের বিকল্প হয়ে ওঠার অদম্য ইচ্ছা, পাল্টা শক্তিকেন্দ্র তৈরি করা । ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের শক্ত ভিত আছে তাদের ।
আমেরিকা আপাততঃ আলােচিত তিন সংস্থা এবং ন্যাটো , জাতিসংঘ ও সিকিউরিটি কাউন্সিলকে ব্যবহার করে হয়তাে সামলে নিতে পারবে ; কিন্তু কতদিন এই একমেরু বিশ্বের স্থায়িত্ব , সেটাই দেখার ।
সাম্রাজ্যবাদী শক্তির শােষণ ও নিয়ন্ত্রণ করার কিছু কলাকৌশল নিয়ে এতক্ষণ আমরা আলােচনা করেছি । এবার আমরা বােঝার চেষ্টা করবাে এই বিশ্ব ব্যবস্থায় ভারতের অবস্থান ও অবস্থাটা কী ?---স্বাধীনতার পর ৪০ বছর ধরে সরকারি বিনিয়ােগ ঘটিয়ে এবং অর্থনীতির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সরকারের নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করে , আমদানি করার পথে না হেঁটে , প্রযুক্তির বিকাশ ঘটিয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটানাের পথ ভারত সরকার গ্রহণ করেছিল । ১৯৫১ সালে ভারতবর্ষে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা শুরু হয় । মােটামুটি ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা শেষ হওয়া পর্যন্ত এই কাজ চলে । ১৯৯১ সালে নরসীমা রাওয়ের প্রধানমন্ত্রিত্বের আমল থেকে নতুন শিল্প,বাণিজ্য ও অর্থনীতি ঘােষিত হয় — যখন অর্থমন্ত্রি ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রি ড .মনমােহন সিং । নেহেরু আমল থেকে শুরু করে ইন্দিরা গান্ধীর আমলের কিছুকাল অবধি দেশে ভূমিসংস্কার করে কৃ্যকের মানােন্নয়নের মাধ্যমে দেশীয় বাজারের চাহিদা বৃদ্ধির একটা প্রয়াস লক্ষ্য করা যায় । দেশের মধ্যে চাহিদা বৃদ্ধি না করতে পারলে যে শিল্পায়ন এগােবে না , তা তাঁরা বুঝেছিলেন । ১৯৫৪ সালের ৫ ই আগষ্ট নেহেরু সমস্ত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রিদের এই মর্মে একটি চিঠি লিখে নির্দেশ দিয়েছিলেন ।
অপারেশন বর্গা ইত্যাদি নিয়ে সি পি এম যে বাগাড়ম্বর করে, তা একটি প্রস্তাব আকারে গৃহীত হয় ১৯৬৭ সালে মুখ্যমন্ত্রিদের এক সম্মেলনে — যে সম্মেলন ডেকেছিলেন প্রধানমন্ত্রি ইন্দিরা গান্ধী । বর্গাদার এবং মালিকের ফসলের ভাগের অনুপাত সি পি এম ঠিক করেছে ৭৫ : ২৫ ভাগ । কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীর প্রস্তাব ছিল ঐ অনুপাত হােক ৮০ : ২০ ভাগ । নেহেরু বা ইন্দিরা গান্ধী এ ব্যাপারে খুব বেশি সফল হয়েছিলেন তা নয় ; রাজ্যে রাজ্যে ভূস্বামী লবির বিরোধিতায় মুখ্যমন্ত্রিরা একাজ বেশিদূর এগিয়ে নিতে পারেননি। তবুও পশ্চিমবঙ্গে সিদ্ধার্থশংকর রায়ের সময়ে বর্গা আইন তৈরি করা হয় ও বর্গাদারদের নাম নথিভুক্ত করা শুরু হয়। বামফ্রন্ট আমলের গোটা পর্যায়কাল জুড়ে যত বর্গাদারের নাম নথিভুক্ত হয়, সিদ্ধার্থ রায়ের আমলে স্বল্প সময়ে তার থেকে বেশি বর্গাদারের নাম নথিভুক্ত হয়।
বর্তমানে এমনকি বামফ্রন্ট সরকারও ১০০ দিনের কাজ প্রকল্প ঠিকমত কার্যকরি করছে না ছােট ও মাঝারি কৃষকের চাপে এবং স্বার্থে । কারণ ঐ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কৃষি মজুরি বেড়ে যাবে । তাতে ক্ষেতমজুররা উপকৃত হবেন ঠিকই ; কিন্তু চাষিরা ক্ষেপে যাবেন । তাই, ১০০ দিনের কাজ প্রকল্পের ৬৫০ কোটি টাকা ফেরত গেল ; কিন্তু কাজ করানাে হলাে না ।
ভূমি সংস্কারের কাজ সম্পন্ন না করেও ইন্দিরা গান্ধী ডাক দেন সবুজ বিপ্লরের । উচ্চফলনশীল বীজ , রাসায়নিক সার , কীটনাশক ইত্যাদি ব্যবহার করে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানাের চেষ্টা হয় । এই ধরনের চাষে পুঁজি বেশি লাগে । ধনীরা তা পেরেছেন ; কিন্তু গরিব চাষীরা বিশেষ উপকৃত হন নি । তবে দেশে খাদ্য উৎপাদন যে বিপুল পরিমাণ বাড়ে, তাতে কোন সন্দেহ নেই । কিন্তু এর সাথে কৃষিতে বিদেশ নির্ভরতার যুগেরও সুচনা হয় ।
নতুন আর্থিক ও শিল্পনীতির নিয়ম মেনে বিদেশি পূজিকে আমন্ত্রণ জানানাে হলাে । বাজারের প্রয়ােজনে নতুন প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি আনতে লাইসেন্স ব্যবস্থা শিথিল করা হলাে । কিন্তু এসব কিছু রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য নয়, আসলে নতুন কাঠামােয় শিল্পকে সাজাতে প্রয়ােজন হলাে উদার আমদানি নীতির । এই আমদানি নীতির ফলে যে সব পণ্যের উৎপাদন বাড়ছে , যেসব কলকারখানা তৈরি হচ্ছে , তার সাথে ব্যাপক জনগণের প্রয়ােজনের কোনও সম্পর্ক নেই । ভারতের মধ্যবিত্তশ্রেণীর বিশাল বাজারটাকে ঘিরে সব কিছুই আবর্তিত হচ্ছে ।
ধীরে ধীরে দেখা যাচ্ছে বাণিজ্য ঘাটতি , বৈদেশিক লেনদেনে সংকট , বিপুল বিদেশি ঋণ , বাজেট ঘাটতি--- হাজারাে ধরনের অর্থনৈতিক ব্যাধি । বলা হয়েছিল, রফতানি বাড়িয়ে বিদেশি মুদ্রা আয়ের মধ্যদিয়ে সব কিছু সামলে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া যাবে । কিন্তু তা হলাে না । অনুন্নত দেশগুলি তাদের বাজার উন্মুক্ত করে দিলেও, সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি নিজেদের দেশের বাজার খুলে দিল না । সংরক্ষণমূলক নানা নীতি ও নিয়মের বেড়া দিয়ে নিজেদের দেশের বাজারকে তারা আড়াল করে রাখলাে । এমনটি যে ঘটবে, তা অনেকেই আগে থেকে বলেছিলেন এবং সতর্ক করেছিলেন । অভিযােগ উঠেছিল যে , ১৯৯১ সালে ভারতীয় সংসদে যে নতুন আর্থিক এবং শিল্প বিল পেশ ও পাশ করা হয়েছিল , তা আসলে ১৯৮৮ সালে রচিত এবং তা বিশ্বব্যাংকের তত্ত্বাবধানে বিশ্বব্যাংকের দুজন অর্থনীতিবিদের দ্বারা ওয়াশিংটনে বসেই রচিত হয় । ফলে যা হবার ছিল , তাই হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও খারাপ হবে বলে মনে করার বহু যুক্তি আছে । আনুষ্ঠানিকভাবে নরসীমা রাওয়ের আমলে নয়া আর্থিক ও শিল্পনীতি ঘােষিত হলেও, আই এম এফ ও বিশ্বব্যাংকের খপ্পরে কমবেশি ভারত চলে যায় আরও আগে । সম্ভবত , ১৯৮১ সালে ইন্দিরা গান্ধীর আমলে প্রথম আই এম এফ থেকে ভারত ঋণ নেয় । ১৯৮১ সালে ৫০০০ কোটি টাকা ঋণ নেবে বলে সরকার চুক্তি করে , কিন্তু ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত মােট ৩৯০০ কোটি টাকা ঋণ নেবার পর, সরকার ঘােষণা করে যে , বাকি ১১০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হবে না ; কারণ আর টাকার প্রয়ােজন নেই । এই ঋণ নেবার সময়েই শর্ত অনুযায়ি ভারতের আমদানি নীতি শিথিল করতে হয় । ফলে ঐ বছরেই বাণিজ্য ঘাটতি ; অর্থাৎ রফতানির চেয়ে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায় ৩০০০ কোটি টাকা । এইসব আমদানি করা দ্রব্যসামগ্রী হলাে নানা ধরনের আজে বাজে বিলাস দ্রব্য এবং সামরিক অস্ত্র ও তার যন্ত্রাংশ । সরকার বলেছিল যে, বেশি বেশি আমদানি করা হবে যন্ত্রপাতি ও কারিগরি বিদ্যা--- যা দেশের রফতানিমুখি অর্থনীতি তৈরি করতে ভিত স্থাপন করবে ; কিন্তু তা হয়নি । এই হলো শুরু!
১৯৭০-৭১ সালে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৪২৬ কোটি টাকা । অর্থাৎ রফতানি আয় থেকে আমদানি ব্যয় বেশি । ১৯৮০ সালে বাণিজ্য ঘাটতি ৩৭২৪ কোটি টাকা। রাজীব গান্ধীর আমলে ১৯৮৬-৮৭ সালে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ৯১৪৯ কোটি টাকা । ১৯৮৯-৯০ সালে ঘাটতি ১২৯৪৭ কোটি টাকা । ১৯৮৯-৯০ সালে আমদানির পরিমান ছিল ৩৫৪১২ কোটি টাকা । পাঁচ বছরে আমদানি দ্বিগুণ বেড়েছে । ১০ বছর পর ২০০১-০২ সালে ভারতের বাণিজ্যঘাটতি ৩৬১৮২ কোটি টাকা । ২০০২-০৩ সালে বাণিজ্য ঘাটতি ৪২০৬৯ কোটি টাকা, ২০০৩-০৪ সালে ৬৫৭৪১ কোটি টাকা । ২০০৪ ০৫ সালে ঘাটতি ১২৫৭২৫ কোটি টাকা । ২০০৫-০৬ সালে ২০৪০৮৫ কোটি টাকা । ২০০৬-০৭ সালে ২০৭৯৮২ কোটি টাকা । ২০০৭-০৮ সালে বাণিজ্য ঘাটতি ২৭১৫১২ কোটি টাকা এবং ২০০৮ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত ঘাটতির পরিমাণ হলাে ৪৬২৫৮ কোটি টাকা । আর ২০০৭-০৮ সালে মােট আমদানির পরিমাণ ছিল ৪২১৫৪১ কোটি টাকা ।
তবে এই সময় বিদেশী মুদ্রার ভাণ্ডার দেশের পক্ষে যথেষ্ট ভাল ছিল । ১৯৯০ সালে দেশে বিদেশী মুদ্রা ভাণ্ডারের অবস্থা সবচেয়ে শােচনীয় জায়গায় চলে যায়। সঞ্চয় ছিল মাত্র ২১৫২ কোটি টাকা । পরের দশকের শুরুতে ২০০২-০৩ সালে ভারতের বিদেশি মুদ্রা সঞ্চয়ভাণ্ডার দাঁড়ায় ৯২৩২৭ কোটি টাকায় । ২০০৭-০৮ সাল পর্যন্ত , এই সঞ্চয় ভাণ্ডার ধারাবাহিকভাবে বাড়তে বাড়তে দাঁড়ায় ৩৫৫৩২৫ কোটি টাকায় । অর্থাৎ বিদেশি মুদ্রা যে পরিমাণ সঞ্চয় আছে , তা দিয়ে বাণিজ্য ঘাটতি মেটানাে যাচ্ছে বটে ; কিন্তু দেশের পক্ষে এ এক বিরাট ঝুঁকি। আমদানি কমাতে পারলে বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার দেশের কল্যাণে ব্যয় করা সম্ভব হতাে ।
উল্লিখিত পরিসংখ্যানে দেশের অর্থনীতির গতি - প্রকৃতি বা ঝোঁক কিছুটা বোঝা গেলেও , সবটা বলার মত সময় আসে নি । প্রয়ােজনীয় সব পরিসংখ্যান যেমন হাতে নেই , তাছাড়া দেশের শিল্পনীতি ও অর্থনীতির পরিবর্তনের সুফল আদৌ যদি কিছু আসে , তাতে হয়তাে সময়েরও একটা বড় ভূমিকা থাকে ।
তবে সরকারি হিসাব — সাধারণতঃ যা ( আংশিক হলেও) পাওয়া যায় , তাতে কিছু কথা একেবারেই অনুচ্চারিত থাকে ।---যেমন দেশের মােট সম্পদ ও আয়ের বিলিবণ্টন সম্পর্কীয় হিসাব থাকে না । দেশের বর্তমান ব্যবস্থায় সম্পদ ও আয়ের কেন্দ্রিভবন ঘটছে মুষ্টিমেয়র হাতে । গরিব মানুষেরা দেশের উন্নয়নের সুফল তেমন পাচ্ছেন না । ফলে সাধারণ মানুষের আয় ও দেশের আর্থিক অবস্থায় আকাশ পাতাল প্রভেদ সৃষ্টি হচ্ছে । রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড কাটছাঁট হবার ফলে গরিব ও পিছিয়ে পড়া বৰ্ণ সম্প্রদায় এবং মুসলমান মানুষেরা ব্যাপকহারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন । তাদের সামনে চলার পথটাও সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে ।
ভারতের এই আর্থিক দুরবস্থা যখন চলছে , তখন রাজীব গান্ধীর অঘােষিতভাবে অনুসৃত সর্বনাশা নীতিকে, নরসীমা রাও প্রকাশ্যে ঘােষণা করেই বাস্তবায়িত করার পথ ধরলেন। রাও সরকার ১৯৯১ সালে কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনে ' আই এম এফ থেকে ৫০ কোটি ডলার ( ৫০০ মিলিয়ন ডলার ) ঋণ নেয় । ১ ডলার সমান ৪০ টাকা ধরলে টাকার অংকে ২০০০ কোটি টাকা । আগের শর্তগুলি ছিল---(১) শিল্পনীতির আরও উদারিকরণ ও বে সরকারিকরণ করতে হবে এবং ভারতে বেশি বেশি বিদেশি বিনিয়োগ করার সুযোগ করে দিতে হবে । ( ২ ) আমদানি - রফতানি নীতি আরও উদার করে আমদানি বাড়াতে হবে । ( ৩ ) ডলারের হারে টাকার দাম কমাতে হবে । (৪) আই এম এফ এবং বিশ্বব্যাংক থেকে আরও ঋণ নিয়ে দেশের অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন ঘটাতে হবে । ( ৫ ) রুগ্ন শিল্প বন্ধ করে অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকে বিদায় জানাতে হবে ( ৬ ) ভর্তুকি কমাতে হবে এবং ধীরে ধীরে তা বন্ধ করে দিতে হবে ইত্যাদি ।
ধার নিয়ে উন্নয়ণ করা যায় না , একথা বলা হচ্ছে না । কিন্তু শর্তগুলির দিকে লক্ষ্য করলে বােঝা যায় যে, শর্তগুলি গ্রহীতা দেশের কল্যাণে নয় ; পুরােপুরি ঋণ দাতা দেশের অনুকূলে । দেশের কল্যাণমূলক ভূমিকাকে শিকেয় তুলে , শুধুমাত্র ব্যবসায়িক ও মুনাফামুখী প্রকল্প। এসব নীতির ফলে কৃষকের কাছে কৃষি অলাভজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে , সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা ও শিক্ষার সুযােগ কমেছে । দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে , বেকারি বেড়েছে , বন্ধ শিল্প-কারখানা সংখ্যা ভারি করেছে , বৈদেশিক লেনদেন বা বাণিজ্য ঘাটতি — যা মেটাতে সঞ্চিত বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার ব্যাপক হারে খরচ হচ্ছে ।
১৯৮৭ সালে ভারতের বৈদেশিক ঋণ ছিল ৫০.৫ হাজার কোটি টাকা — যা ১৯৯০ সালে এসে দাঁড়ায় ১ লক্ষ কোটি টাকা । সুদ এবং আসল মেটাবার জন্য বছরে প্রয়ােজন ১৪ হাজার কোটি টাকা । ঐ সালে দেশ যে পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা আয় করে , তার চারভাগের ১ ভাগ চলে যায় ঋণের কিস্তি মেটাতে । যে শিশু ভারতে জন্মগ্রহণ করছে , সে ১৯৯০ সালে ১০০০ টাকা মাথায় ঋণ নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে । এখন তা বেড়েছে বিপুল অংকে । বর্তমানে প্রত্যেকজন ভারতীয় নাগরিকের মাথা পিছু বৈদেশিক ঋণ কমবেশি ৫০,০০০ টাকা । মােট বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬০ লক্ষ কোটি টাকা ।
নানা ধরণের প্রচার মাধ্যম দেশের মানুষকে বােঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, সরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত সেক্টর হলাে সাদা হাতি পোষার সমান । ফলে , আই এম এফ ও বিশ্বব্যাংকের পছন্দের নীতির পক্ষে এক ধরনের জনমত দেখা যায় । কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রায়ত্ত সেক্টরগুলিকে যড়যন্ত্র করে শেষ করে দেওয়া হয়েছে । এরজন্য মূলত সরকারি নীতি , পরিকল্পনা ও দুর্নীতি দায়ি । ব্যাঙ্ক , বীমা , ইস্পাতশিল্প, মােটর পরিবহন--- সবক্ষেত্রেই একথা ঠিক ।
বর্তমানে ব্যাংক - বীমা মুনাফা বাড়িয়েছে । কর্তাভজা বড় ঋণ ( যার অধিকাংশই অনাদায়ি ) ও ঋণ মেলাগুলি চলতে থাকলে এটা সম্ভব হতাে না । রেল বিপুল পরিমান মুনাফা করছে , অথচ ভাড়া বৃদ্ধির প্রয়ােজন পড়ছে না। দুর্নীতি কিছুমাত্রায় আটকানােতেই এটা সম্ভব হয়েছে । এসব কাজের জন্য বিদেশের পরামর্শ যেমন দরকার পড়ে না , ঋণ না নিয়েও এসব সংস্কার সম্ভব ছিল ।
ইস্পাত শিল্পের কথাই ধরা যাক — রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্পাত কারখানাগুলিতে এমন সব ধরনের ইস্পাত তৈরি করতে সরকার বাধ্য করতো , যা থেকে ভাল দাম পাওয়া সম্ভব নয়। দেশের সাধারণ মানুষের প্রয়োজন হয় না, এমন সব ইস্পাত ও লোহার খন্ড ও মন্ড তৈরি করতে বাধ্য করা হতো। এইসব ইস্পাতের দাম বেঁধে রাখা হতাে উৎপাদন মূল্যের নীচে । বিদেশে কোথায় চালান যাবে এবং কী তার দাম হবে — তা বিভিন্ন অসম ও প্রতিকূল চুক্তির দ্বারা ঠিক হয়ে যেত। এরফলে বেসরকারি ইস্পাত উৎপাদকেরা লাভবান হয়েছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্পাত শিল্পের ইস্পাতের দাম কম রাখার জন্য, বেসরকারি ইস্পাত উৎপাদনকারীরা ওই ইস্পাত কিনে নিয়ে, গালিয়ে, দেশের সাধারণ মানুষের প্রয়োজন মিটিয়েছে এবং প্রচুর পরিমান মুনাফা লুটেছে। ইস্পাতের কম দামের সুবিধা উসুল করেছে ইস্পাতের বেসরকারি মালিকরা ; আর তাতে বেসরকারিরণের যুক্তি জোর পেয়েছে ।
১৯৯০ সালে ভারতের বৈদেশিক ঋণ ১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি ছিল এবং তা প্রতিবছর ক্রমবর্ধমান । তখন ১৯৯৪ সালের আগেই ভারতীয় মুদ্রার দু'দফা অবমূল্যায়ন ঘটাতে হয় বা মুদ্রার দাম কমাতে হয় । দু'দফায় টাকার মূল্য কমে ৩৬ শতাংশ ; অর্থাৎ বিদেশি মুদ্রার তুলনায় টাকার দাম ৩ ভাগের একভাগেরও বেশি কমে যায় । এই অবমূল্যায়ন হিসাব করে বিদেশি ঋণের পরিমাণ বেড়ে কোথায় দাঁড়ালাে, তা সহজেই অনুমেয় । অর্থাৎ আর অতিরিক্ত ঋণ না নিয়েও ঋণের বােঝা বিপুল হারে বেড়েই চলে । যে হারে ভারত বিদেশি ঋণ নেওয়া শুরু করে , তার থেকে বেশি হারে ভারতে সামরিক সম্ভার কেনা চলতে থাকে । প্রয়ােজনের জন্যই কেনা হয়েছে , সব সময় তা হয় নি । ঋণের শর্তের মধ্যেই থাকে ঋণের টাকায় কোন দ্রব্য কিনতে হবে, তার তালিকা । সাম্রাজ্যবাদী দেশের অস্ত্র কারখানাগুলি বাঁচিয়ে রাখতে অস্ত্রের খরিদ্দার প্রয়ােজন । তাই , ঋণের শর্তে অস্ত্রকেনার কথা সব সময়ই থাকে ।
ভারতের ক্ষেত্রে — পাকিস্তানের সাথে ঝগড়া জিইয়ে রাখা সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্তের অংশ । কারণ এই ঝগড়া যতদিন থাকবে , ভারত এবং পাকিস্তান দু’টি দেশেই তাদের সমরাস্ত্রের বিপুল চাহিদা থাকবে । সেজন্য দেখা যায় ১৯৮১ থেকে ১৯৯১ সালের মধ্যে ভারত ৭ বিলিয়ন ডলার বা ৭০০ কোটি ডলার মূল্যের অস্ত্র আমদানি করে— যা টাকার মূল্যে ২৮০০০ কোটি টাকা ( ১ ডলার = ৪০ টাকা ধরে ) । ঐ সময়ে গােটা বিশ্বের প্রধান ১০ টি অস্ত্র আমদানিকারক দেশের অন্যতম হলাে ভারত । ভারতের সমরাস্ত্র আমদানির জন্য ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের আগ্রহের অন্য আরেক কারণ হলাে ক্যাশ কমিশন — যে সব কেলেংকারি দেশবাসী শুনে থাকেন ।
সাধারণভাবে বলা হলাে — অনুন্নত ও উন্নত, কোন দেশ কৃষিতে ভর্তুকি দিতে পারবে না । কিন্তু উন্নত দেশ নিজেদের সুবিধার জন্য ভর্তুকি ব্যাপারটাকে দুই ভাগে ভাগ করলাে । বলা হলাে — সার , বীজ , কীটনাশক , সেচ , বিদ্যুৎ---এসবে ভুর্তুকি দেওয়াটা ক্ষতিকর ভর্তুকি, এই ভর্তুকি দেওয়া যাবে না । অর্থাৎ ভারত ও অন্যান্য অনুন্নত বা বিকাশমান দেশ যে ভর্তুকি দিয়ে থাকে , তা বন্ধ করতে হবে । আমেরিকা , ইউরােপ — এসব দেশ সরাসরি কৃ্যকদের টাকা দিয়ে সাহায্য করে অর্থাৎ সরাসরি ভর্তুকি দেয় । তারা বলছে এটা ক্ষতিকর নয় । তাই , এই ভর্তুকি তারা চালিয়ে যাবে ।
আমেরিকা , ইউরােপ প্রভৃতি এইসব দেশে , ভর্তুকির পােষাকী নাম 'গ্রিন বক্স ভর্তুকি' এবং 'ব্লু বক্স ভর্তুকি'। এভাবে ভর্তুকি কমানাের চুক্তি হচ্ছে । কিন্তু পরিসংখ্যানে পরিষ্কার আমেরিকা এবং ইউরােপ তাদের দেশের কৃষকদের ভর্তুকি বাড়িয়ে চলেছে বিপুল হারে । ভারত সরকার এসব মেনে নিল । নিজেদের দুষ্কর্মের সাফাই গাইতে বলা হলাে— ভর্তুকি তুলে দিলে কৃষকরা সার , বীজ , কীটনাশক ইত্যাদির সুষ্ঠ ব্যবহারে মনােযােগী হবেন। কৃষকদের মধ্যে প্রতিযােগিতার মানসিকতা তৈরি হবে । দেশীয় কৃষকেরা বিদেশের বাজারে বিভিন্ন কৃষিপণ্য রফতানির সুযােগ পাবেন । তথাকথিত সাম্রাজ্যবাদ বিরােধি বামফ্রন্ট সরকারও একথা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে । এই সরকার ধানের বদলে রফতানিযােগ্য ফসল — যেমন , আনারস , লিচু , ফুল , আম , টমেটো , আলু , পটল , অর্কিড , চিংড়ি মাছ-– এসব চাষ করার জন্য পরিকল্পনা করেছে । রাজ্যের মােট যে ধান চাষের জমি , তার ৫ ভাগের একভাগ বা ২০% জমিতে এইসব চাষ করবে বলে সরকার পরিকল্পনা করেছে । এর ফলে ধানের বদলে নীল চাষের জন্য এক সময়ে বাংলার যা দুরবস্থা হয়েছিল , সেই দুর্ভিক্ষের সমস্যা আবার হবে কিনা তাও ভাবার আছে ।
উন্নত দেশগুলিতে কৃষিপণ্য রপ্তানি করে প্রচুর আয়ের স্বপ্ন দেখা যত সহজ , বাস্তব ততটাই কঠিন । উন্নত দেশগুলি কৃষিপণ্য আমদানির উপর শুল্ক অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে । জাপান চাল আমদানির উপর ২০ গুণ বেশি শুল্ক বসিয়েছে । অর্থাৎ সেদেশে ১ টাকার চাল আমদানি করলে তার উপর শুল্ক দিতে হবে ২০ টাকা । ভাবুনতাে ব্যাপারটা! জাপান বাদাম আমদানির উপর শুল্ক বসিয়েছে ১৩২ শতাংশ ইত্যাদি। এমন সব কাণ্ড !
ভারতীয় সব্জী সাধারণত বিদেশে চলে না। বিষ বেশি মাত্রায় মেশানাে , এই অজুহাতে । ভারতের মাংসের গুণমান ভাল নয় বলে অভিযােগ । ২০০৪ সাল পর্যন্ত সারা পৃথিবীর মাত্র ১৫ টি দেশ ইউরােপীয় ইউনিয়নে মাংস রপ্তানির অনুমতি পেয়েছে । ৫ টি দেশ অনুমতি পেয়েছে আমেরিকায় মাংস রফতানির জন্য । আর মাত্র ১ টা দেশ কানাডায় মাংস রফতানি করার যােগ্য বিবেচিত হয়ে অনুমতি পেয়েছে ।
আমদানির ক্ষেত্রে আগে ভারত একটা পরিকল্পনা করতাে । কোন পণ্য কতটা আমদানি করা হবে, তা নির্দিষ্ট করা হতাে । যাকে বলা হয় QR ( Quantitative Restriction ) । ১৯৯০ সালের আগে পর্যন্ত ৮ হাজার রকমের পণ্য এই QR এর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল । ১৯৯৭ সালে QR এর অধীন পণ্যের সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ২০০০ টি । অর্থাৎ বাকি সব পণ্যের ক্ষেত্রে যত খুশী আমদানির ছাড় দিতে হয় ; কিন্তু তাতেও আমেরিকা খুশী হয়নি । তারা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় নালিশ জানায় ভারতের বিরুদ্ধে । ফলে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নির্দেশে ২০০৩ সালের ৩১ শে মার্চ থেকে সমস্ত কৃষিপণ্যের উপর থেকে ভারত QR তুলে নিতে বাধ্য হয় । ভারতের বাজার বিদেশিদের কৃষিপণ্যের জন্য পুরােপুরি উন্মুক্ত হয়ে যায়।
ভারত ১৯৯৯ সালে চাল আমদানি করে ৫.৪১ কোটি টাকার । ২০০০ সালে তা বেড়ে দাড়ায় ২০.৪৭ কোটি টাকা । দানাশস্য ১৯৯৯ সালে আমদানি করা হয় ২১ লক্ষ টাকার । ২০০০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০০.৯৮ কোটি টাকা । পাট ১৯৯৯ সালে আমদানি হয় ৬৩.৩০ কোটি টাকার । ২০০০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩২.৫১ কোটি টাকা । উদ্ভিদ ও প্রাণীজ সম্পদ আমদানি ১৯৯৯ তে হয় ৬.৫৫ কোটি টাকার । ২০০০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪.৯৮ কোটি টাকা । এরকম সব কিছুর আমদানি প্রতিবছর অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলেছে । মানুষ হয়তো ভালমানের টি ভি , ওয়াশিং মেশিন , ফ্রিজ, আলু ভাজা , সফট ড্রিংকস প্রভৃতি পাচ্ছেন , কিন্তু কাণ্ডটা কী ঘটে চলেছে , তার হাঁড়ির খবর অনেকেই রাখছেন না ।
ভারতে ফুল চাষের পরিকাঠামোগত উন্নতির জন্য ১৩৭০ কোটি টাকার সমমূল্যের বিদেশি মুদ্রা খরচ হয়েছে । ঐ বিনিয়ােগের ফলে ৩ কোটি টাকা মূল্যের বিদেশি মুদ্রা এসেছে । ধীরে ধীরে তা বাড়ার সম্ভবনা কোন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে ।
ভারতবর্ষে প্রায় ৯০০০ অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ প্রজাতি আছে । তারমধ্যে--(চলবে)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন