বঙ্গপ্রদেশের ভদ্রলোকশ্রেণী ও সাম্প্রদায়িকতা
দলিত মুক্তি আন্দোলন ( ষষ্ঠ খণ্ড )
বঙ্গপ্রদেশের ভদ্রলােকশ্রেণী ও সাম্প্রদায়িকতা সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস
ছিয়ানব্বই প্রকাশনী, মছলন্দপুর
Bangaprodesher Bhadrolok Shreni o Samprodayikata By Sukriti Ranjan Biswas
প্রথম প্রকাশ : মার্চ , ২০১৫
দ্বিতীয় প্রকাশ: নভেম্বর, ২০১৯
গ্রন্থস্বত্ত্ব :শ্রীমতি বিশাখা বিশ্বাস ।
প্রচ্ছদ: সুকান্ত বিশ্বাস ।
কম্পোজ: সুভাষ ঘােষ , রূপালি কম্পিউটার, স্টেশন রােড , বারাসাত , উত্তর ২৪ পরগনা
প্রাপ্তিস্থান : বাকচর্চা , ৫০ সীতারাম ঘােষ স্ট্রিট (কলেজ স্ট্রিট ) , কলকাতা ০৯, মােবাইল : ৯৮৩৬৯৬১৩৪১
মূল্যঃ ৬০ টাকা মাত্র
উৎসর্গ
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামায় যে সব অসংখ্য অসহায় মানুষ মারা গেছেন, তাঁদের স্মরণে
সূচিপত্র
প্রথম অধ্যায় : কিছু প্রাসঙ্গিক কথা ১৫
দ্বিতীয় অধ্যায় : স্বদেশী আন্দোলন ও বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন ২৩
তৃতীয় অধ্যায় : বাংলায় মুসলিম রাজনীতির সূচনা ৪৪
চতুর্থ অধ্যায় : অস্পৃশ্য ও আদিবাসীদের হিন্দুকরণ ৫২
পঞ্চম অধ্যায় : সম্প্রদায়গত রোয়েদাদ ৬০
ষষ্ঠ অধ্যায় : হিন্দু মন ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ৬৪
সপ্তম অধ্যায় : সম্প্রদায়গত রোয়েদাদ, পুনাচুক্তি ও বাংলা কংগ্রেস ৭৯
অষ্টম অধ্যায় : ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন ৮২
নবম অধ্যায় : বাংলার প্রথম মুসলিম মন্ত্রিসভা ৮৭
দশম অধ্যায় : কংগ্রেস রাজনীতিতে টানাপোড়েন ৯১
একাদশ অধ্যায় : হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেস ৯৬
দ্বাদশ অধ্যায় : কুখ্যাত কলকাতা হত্যাযজ্ঞ ১০৫
ত্রয়ােদশ অধ্যায়: ক্যাবিনেট প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, ভদ্রলোকদের বিভক্তির পায়তারা ১১৪ চতুর্দশ অধ্যায় : যুক্ত ও সার্বভৌম বাংলার প্রস্তাব ১১৯
কয়েকটি কথা
আমি মনে করি না যে , আমি লেখক । কথা উঠলে সে কথা সবসময় বলেও থাকি । পরিচিত লােকজনও কেউ আমাকে লেখক বলে মনে করেন না । কিন্তু একইসাথে এ কথা বেঠিক নয় যে , ইতিমধ্যে ছােট ও মাঝারি মাপের ১৩/১৪ খানা বই প্রকাশিত হয়েছে , যেখানে লেখক হিসাবে আমার নাম লেখা আছে । একটা অনিয়মিত মাসিক পত্রিকা ' নীল আকাশ ’ আমি সম্পাদনা করে থাকি । আসলে সম্পাদনা করি না — মােটামুটি সবটাই আমি লিখি , আমি সম্পাদনা করি , আমি প্রকাশ করি এবং বিলিবন্টন করে থাকি । পত্রিকাটি এবার ২০ বছরে পা দিলাে । এ ছাড়াও অতীতে ঐক্য, সাঁকো, রিপাবলিকান বার্তা---এ রকম কিছু ছোট পত্রিকা কয়েকবছর ধরে অনিয়মিতভাবে প্রকাশ করেছি। এরকম একজন ‘ ক্যাজুয়াল রাইটারের' লেখা কোনাে কোনাে বইয়ের দ্বিতীয়, তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে এবং সেসব বই আবারও শেষ – এ তথ্য প্রকাশ করার লােভ সম্বরণ করা কঠিন । অথচ এসব বইয়ের কার্যতঃ কলকাতা এবং কলকাতার কলেজ স্ট্রীটের (বইপাড়া) কোনাে ঠিকানা নেই ।
‘বঙ্গপ্রদেশের ভদ্রলোেকশ্রেণী ও সাম্প্রদায়িকতা ' এই তথ্যভাণ্ডারটিও আমার আগে তৈরি করা বইগুলির মতােই আর একটি পুস্তিকা । বিভিন্ন বইপত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তৈরি করেছি । তবে তথ্য পেয়েছি আর নিয়েছি – এমনটা নয়। নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি , যুক্তি ও জানা-বােঝা এবং সমসাময়িক নানা ঘটনাবলির আলােকে যেসব বিষয়কে আমার বিশ্বাসযােগ্য বলে মনে হয়েছে – শুধুমাত্র সেইসব তথ্যের উপর আমি ভরসা করেছি । পাঠকদেরও আমি আশ্বস্ত করতে পারি যে , এই পুস্তিকা থেকে যতটুকু জানবেন , তা সত্য।
আমি মূলতঃ উদ্বাস্তু , মতুয়া , দলিত ও মুসলিমদের স্বার্থে আন্দোলনের একজন কর্মী । কোনাে গােষ্ঠীভাবনা থেকে আমি এই আন্দোলনে আসিনি । অন্যায় , অত্যাচার , অবিচার ও ঘৃণার বিরােধিতা ও তার নিরসনের জন্য আমি এই আন্দোলনে এসেছি । শুধুমাত্র এদেশের নিম্নবর্গীয় হিন্দু এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুশ্রেণীর মানুষরাই ঘৃণা ও অবিচারের শিকার – সত্যটা এমন নয়। বহুনিন্দিত উচ্চবর্ণ হিন্দুদের মধ্যকার একাংশও বঞ্চিত , ভালাে নেই । ন্যায় ও সুবিচার যখন আমার ভাবনা ও কাজের কেন্দ্রিয় বিষয় - তাঁরা কেন বাদ যাবেন ।
আমাদের দেশের মানুষের নানা গােষ্ঠী , ধর্ম , বর্ণ ও ভাষা আছে । তাদের আছে স্বতন্ত্র সামাজিক পরিচয় । ভিন্ন ভিন্ন সমাজের মানুষের সমাজ-মানসিকতা আলাদা। চেতনা ও শিক্ষা অসম । তাঁদের সমস্যাও ভিন্ন ভিন্ন ।
ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে । শিক্ষা , চেতনা ও মানসিকতা – সব ক্ষেত্রেই কিছু ব্যতিক্রমী মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে। হয়তাে ক্রমে ক্রমে আজ এমন ব্যতিক্রমের সংখ্যা বেড়েছে । প্রায় সবক্ষেত্রেই বেড়েছে । কিন্তু সমাজ মানসিকতা পাল্টায়নি । হতে পারে এই সমাজ যতদিন আছে , সমাজ মানসিকতা পাল্টাবে না । – যদি না সমাজটাকেই পাল্টে ফেলা হয়।
এমন সব এলােমেলাে ভাবনা আমার মতাে অনেকেরই। দেখার চোখ আলাদা , ভাবনার বিষয় ও ভিত্তি বিভিন্ন ; আর সমাধানের পথ অচেনা , হতে পারে অজানাও । এসব কথা ভাবতে ভাবতে কলম নিয়ে বসা । পথ খুঁজতে গিয়ে বই লেখা ।
আমি , আমার বন্ধু-বান্ধব এবং চেনাজানা লােকজনের মধ্যকার অধিকাংশই ড . আম্বেদকর এবং হরি - গুরুচাঁদের অনুরাগী ও পথহারা অনুসারী । তাঁদের চিন্তা - চেতনায় মিল নেই , চলার পথ বিভিন্ন রকমের । এসব ছন্নছাড়া এলােমেলাে পথ চলায় ছন্দ দরকার । এসব ভেবে লিখি । আমার কথার কী দাম ! ভাবি , বিখ্যাত লােকজনের কথা যদি কেউ কানে তােলেন , তাতে যদি কাজ হয় । তাই বিখ্যাতজনের কথাগুলি সাজিয়েগুছিয়ে দেবার চেষ্টা করি । বােঝার জন্য সহজ করে সাজাবার চেষ্টা করি । এই বইটাও তাই।
এই বইয়ে আলােচিত বিষয়াবলী ও ঘটনাবলীর কেন্দ্রবিন্দু রাজনীতি । রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলে আনার ও দখলে রাখার চিন্তা এবং চেষ্টা । সমসাময়িককালে এবং ভবিষ্যতের জন্য । যতটা না সেই সময়ের জন্য , মূলত ভবিষ্যতের জন্য । সেদিনকার সেই ভবিষ্যৎ , আজ বর্তমান । সেজন্য প্রাসঙ্গিক , শতবর্ষ পূর্বের জুলন্ত প্রতিচ্ছবি ।
১৯০০ সালের শুরু থেকে , বিশেষ করে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ঘােষণার দিন থেকে বাঙলার রাজনীতি আবর্তিত হয় উচ্চবর্ণ হিন্দুদের কায়েমী স্বার্থের সংরক্ষণ অথবা উচ্ছেদ – এই প্রশ্ন ঘিরে । সমসাময়িক নানা ঘাত - প্রতিঘাতে স্পষ্ট হয়ে যায় – উচ্চবর্ণ হিন্দু সমাজ , যাকে এই পুস্তিকায় ভদ্রলােকশ্রেণী হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে ; অর্থাৎ বাঙলার হিন্দু জমিদার , নায়েব , গােমস্তা , সুদখাের, মহাজন , দালাল , ঠিকেদার , উকিল, চাকুরিজীবীশ্রেণী ও তাঁদের আত্মীয়স্বজন। – তাঁদের চিরাচরিত স্বার্থরক্ষা করতে এবং ভবিষ্যতে তা আরও সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে মরিয়া চেষ্টা চালান । দেশের ঐ সময়কালের একমাত্র রাজনৈতিক সংগঠন কংগ্রেস সেই কাজে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসে ।
বঙ্গভঙ্গের সময়ে উচ্চবর্ণ হিন্দুরা নিজেদের স্বার্থের লড়াই করেছিলেন অত্যন্ত খােলাখুলিভাবে । বাঙলার মুসলমান এবং অস্পৃশ্যরা , বিশেষ করে নমঃশূদ্ররাও খােলাখুলিভাবে নিজেদের স্বার্থে উচ্চবর্ণ হিন্দুদের আন্দোলনের বিরােধিতা করেছিলেন ।
এই লড়াইয়ে সেদিন কোনাে গােপনীয়তা বা পর্দার আড়ালের ব্যাপার ছিল না । প্রয়ােজনও ছিল না । কারণ ভদ্রলােকেরা তখন মুসলমান এবং অস্পৃশ্যদের প্রতিপক্ষ বলে ধর্তব্যের মধ্যেই আনেননি । ভেবেছিলেন , ইংরেজদের উপর চাপ সৃষ্টি করেই তারা কাজ হাসিল করবেন । কিন্তু মুসলমান এবং অস্পৃশ্যরা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে দাঁড়ানােয় সব হিসাব গােলমাল হয়ে যায় । লড়াই ও পাল্টা লড়াইয়ে উচ্চবর্ণ হিন্দুদের চরিত্র উন্মােচিত হয়ে যায় ।
আধুনিক সংসদীয় রাজনীতিতে সংখ্যা হলাে এক মৌলিক ভিত্তি । ১৯২৭ সালে সাইমন কমিশনের সময় থেকে যে প্রক্রিয়া শুরু হয় , তাতে উচ্চবর্ণ হিন্দুরা নিশ্চিত হন যে, নতুন কিছু হতে চলেছে । গােলটেবিল বৈঠক , সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ , এসবের ধারাবাহিকতায় ইংরেজ সরকারের ১৯৩৫ সালের 'ভারত শাসন আইন, ঘােষণা।
যােগ্যতা , উপযুক্ততা , শিক্ষা ও সংস্কৃতির বড়াই করে নানা হাঁকডাকের পর ভদ্রলােকরা বােঝেন যে , এইসব কাহানী তামাদি হয়ে গেছে। আগামীদিনের সংসদীয় গণতন্ত্রে সংখ্যা হলো এক প্রধান ফ্যাক্টর। তখন থেকে তারা অন্যপথের সন্ধানে নেমে পড়েন ।
এই অন্যপথ হলাে হিংস্রতা , সাম্প্রদায়িকতা , নীতিহীনতা , অপপ্রচার এবং ভাওতা দেবার পথ গ্রহণ । পর্দা ও মুখােশের ব্যবহার । বর্ণবাদতাে আগে থেকেই ছিল এবং আজও তা আছে । ওরা এইসব পথ ব্যবহার শুরু করেন নিজেদের স্বার্থে এবং আজও সেই চক্রান্ত করে চলেছেন!
নতুন দিনের প্রয়ােজন অনুযায়ী অতীত ঘটনা সমূহের মূল্যায়ন , পুনঃনির্মাণ, নুতন ব্যাখ্যা ও পুনাচুক্তি বিরোধী প্রচার শুরু হলাে , নতুন নতুন কৌশল এলাে । কিন্তু লক্ষ্যের কোনাে রদবদল হলাে না । ঠিকইতাে , লক্ষ্য বা নীতি রূপায়নের জন্য কৌশল বদল হতেই পারে! আজও ভারতীয় রাজনীতির লক্ষ্য হলাে--- উচ্চবর্ণ হিন্দুর কায়েমী স্বার্থ রক্ষা করা ও অসংগত একাধিপত্য বজায় রাখা । হাজির করা হলাে , বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলন ও রােয়েদাদের বিরােধিতার নতুন নতুন যুক্তি, লেখা হলাে নতুন ইতিহাস ।
একসময় ভদ্রলােকশ্রেণীর যখন মনে হয় – মুসলমানদের উপর একাধিপত্য কায়েম করা প্রায় অসম্ভব , তখন তারা দেশের পূর্ব ও পশ্চিমের মুসলমান প্রধান এলাকা ছেঁটে বাদ দেবার সিদ্ধান্ত নেয় । আর ধোঁকা দিতে ভদ্রলােকরা অস্পৃশ্যদের পায়ে আশ্রয় দেন তাঁদের জুতাে হিসাবে ব্যবহার করার জন্য - যে জুতােয় আজও একটু পালিশ ঘষারও চেষ্টা করেননি তাঁরা।
মুসলিম লীগের সাফল্য ও মুসলমানদের ঐক্য এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী হিন্দু মহাসভার উত্থান কংগ্রেস দলটিকে অসহায় অবস্থায় ঠেলে দেয় । সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ ও পূণাচুক্তিতে এই দলের বাঙলার নেতৃবৃন্দ যে বর্ণবাদী অবস্থান গ্রহণ করেন , তারফলে , কংগ্রেস ভরসা করতে পারেনি যে , অস্পৃশ্যরা তাদের সমর্থন করতে পারেন । কিন্তু তাদের সে ধারণা ঠিক ছিল না । অস্পৃশ্যরা যে কতটা মুখ তখনও তারা তা বােঝেননি !
এ অবস্থায় তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্ব ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ আঁকড়ে ধরে বৃহত্তর ও দূর লক্ষ্য অর্জনের জন্য অটল থাকতে ব্যর্থ হন । বাঙলায় তারা হিন্দু মহাসভার সাথে পাল্লা দিয়ে হিন্দুত্ববাদী পথ গ্রহণ করেন এবং পদক্ষেপ নেন । বাঙলা ভাগ করার দাবি করেন ও দেশভাগ মেনে নেন।
পরিবেশ ও পরিস্থিতি এক জায়গায় থেমে থাকে না । সময়ের সাথে সবকিছু না হলেও অনেককিছুরই বদল হয় । দেশভাগের পর ভারতীয় মুসলমানদের অগ্রাধিকার হলাে ধর্মনিরপেক্ষতা নীতির সঠিক বাস্তবায়ন হােক । আর কংগ্রেসের প্রয়ােজন মুসলমানদের সমর্থন । হিন্দু মহাসভা অনেক পারমুটেশন-কম্বিনেশন - এর পর ভারতীয় জনতা পার্টি নামে কেন্দ্রের ক্ষমতায় আসীন হয়েছে । কিন্তু যাত্রা শুরু করার এক’শ বছর পরও তারা আজও মধ্যযুগের গণ্ডী পার হতে পারেননি । মনে হয় , তাদের সে ইচ্ছাও নেই ।
দেশে সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে কংগ্রেসও তার দায় এড়াতে পারে না । ৬৮ বছরের স্বাধীন ভারতে কংগ্রেস দল শাসন করে ৫৬-৫৭ বছর । এই সময়কালে ভারতের মুসলমানদের শিক্ষা - সংস্কৃতি , চাকরি ও আর্থিক অবস্থা – এক কথায় সার্বিক অবস্থার অবনতি হয়েছে । দেশে সাম্প্রদায়িক মানসিকতার বাড়বাড়ন্ত হয়েছে । সৌভ্রাতৃত্বের পরিবেশ গড়ে ওঠেনি । নিচু বর্ণগুলির মানুষের যথোচিত অগ্রগতি হয় নি।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার প্রশ্নে বলা যায় যে , অসমের নেলী - র গণহত্যা , মীরাট , ভাগলপুর , মুম্বাই , জামশেদপুর প্রভৃতি দাঙ্গা ও গণহত্যাগুলি হয়েছে কংগ্রেস আমলেই । তবে তার সাথে গুজরাট দাঙ্গার পার্থক্য আছে । গুজরাট দাঙ্গা ক্ষমতাসীন
সরকার উদ্দেশ্যপ্রণােদিতভাবে সৃষ্টি করেছে ও ইন্ধন দিয়েছে । আর কংগ্রেসী সরকার দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে । মনে রাখতে হবে যে , কংগ্রেস এবং বিজেপি দল ও সরকার আলাদা হলেও মানুষগুলি মূলতঃ একই। কংগ্রেসী হিন্দু জনতা , বিজেপি হিন্দু জনতা , সিপিএম হিন্দু জনতা – এরা সবাই মূলতঃ হিন্দু । কংগ্রেস এবং সিপিএম হয়তাে কিছু নেতা-কর্মীর ধর্মনিরপেক্ষ মন ও মানসিকতা তৈরি করতে পেরেছে ; কিন্তু আমজনতাকে শিক্ষিত করতে পারেনি । এই কঠিন কাজে কেউ হাত লাগাতেও চাননি । পার্টিগুলি — নেতা-কর্মী ও জনতাকে রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত করতে চাননি ; বরং জনতার ভুল মানসিকতার লেজুড়বৃত্তি করার সহজ পথ বেছে নিয়েছেন ।
নেতৃত্ব বদলের সাথে পার্টির নীতি - কর্মসূচিতে কিছু পরিবর্তন আসে । সব পার্টির ক্ষেত্রে কমবেশি তা হয় । প্রয়ােজনের তাগিদেও কিছু পরিবর্তন হয় ।
সাম্প্রতিককালে দেশজুড়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদী শক্তি বিজেপি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে – যাকে চাইলে আটকাতে পারে একমাত্র কংগ্রেস দল । ঐ দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব হিন্দুত্ববাদে প্রভাবিত নন । দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘু ও দলিতদের সংগঠিত করে প্রয়ােজনীয় শক্তি অর্জনের সুযােগ আছে তার । এখন দেখার কংগ্রেস দল ১৯৩০ - এর দশকে গৃহীত পথ ধরে (হিন্দুত্বের প্রতিযোগিতা) উগ্র হিন্দুত্বের মােকাবিলা করে , না গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার আধুনিক মতাদর্শ আঁকড়ে ধরে দৃঢ়তার সাথে ঐ চ্যালেঞ্জের মােকাবিলা করে ।
দেশের বর্তমান কঠিন সময়ের সাথে এই পুস্তিকায় উল্লেখিত অতীতের সময়কাল , ঘটনা এবং সমস্যাবলীর মিল আছে । প্রকৃতপক্ষে বর্তমান সংকটে স্বাধীনতা পূর্ব ঘটনাবলী ও ঘাত-প্রতিঘাতের ইতিহাস দেশবাসীকে স্মরণ করে দেবার জন্য এই পুস্তিকা প্রকাশ এই জন্য যে, তা যদি কোনাে কাজে আসে ।
সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস তারিখ : ২৩,০২.২০১৫
প্রথম অধ্যায়
কিছু প্রাসঙ্গিক কথা
বাঙলায় মুসলমান শাসনের অবসান হয় ১৭৫৭ সালে । বিদেশী সুলতান এবং মােগলদের ৫৫৫ বছরের রাজত্বকালের পর ইংরেজ শাসন শুরু হয় । চলে এক নাগাড়ে ১৯০ বছর । ইংরেজ শাসনের প্রথম ১০১ বছর ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী নামক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের শাসন ; শেষার্ধ বৃটিশ সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ।
বাঙলার হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণ , কায়স্থ ও বৈদ্যরা উচ্চবর্ণ হিন্দু বলে স্বীকৃত ; যদিও ধর্মীয় বর্ণ কাঠামােয় কায়স্থ ও বৈদ্যরা শূদ্র - –তারা ক্ষত্রিয় বা বৈশ্য বর্ণভূক্ত নন । গােটা মুসলমান শাসন পর্যায়কালে সম্প্রদায়গতভাবে এইসব বর্ণহিন্দুদের অবস্থা অন্যান্য হিন্দু ও মুসলমান সমাজের সাধারণ মানুষের মতই ছিল। যদিও কিছু কিছু মুসলমান পরিবারের মত উচ্চবর্ণ হিন্দুদের মধ্যকার কিছু পরিবারও সুলতান , মােগল সম্রাট এবং নবাবদের কাছাকাছি থাকার কারণে কিছুটা আলােক প্রাপ্ত হন । কিছু ক্ষেত্রে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করায় কিছু উচ্চবর্ণ হিন্দু, মুসলমান শাসকদের রাজকার্যে সহযােগিতার জন্য নিম্নপদে নিযুক্ত হন । ফলে , এইসব পরিবার আর্থিকভাবে উপকৃত হয় এবং রাজকার্য সম্পর্কে কিছু জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযােগ পান । তবে , দেশের নানা প্রান্তে বেশিরভাগ ব্রাহ্মণের অবস্থা ছিল ভিক্ষুকের ন্যায় শােচনীয় ।
ইংরেজ শাসন বাংলার উচ্চবর্ণ হিন্দুদের কাছে আশীর্বাদ নিয়ে আসে । ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্ণওয়ালিশ জমির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা চালু করেন । সারাভারতের জন্য এই জমিনীতি গ্রহণ করা হয় না । মূলতঃ বাঙলা , বিহার , উড়িষ্যা , বেনারস এবং মাদ্রাজের কিছু এলাকায় জমির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থা চালু করা হয় ।
মােগল যুগে জমির উপর ব্যক্তি মালিকানা অধিকার ছিল না । জমি গ্রামসমাজকে বন্দোবস্ত দেওয়া হতাে এবং গ্রামের কাছ থেকে রাজস্ব বা খাজনা আদায় করা হতাে । তাছাড়া মুদ্রায় খাজনা আদায় প্রথাও তখন চালু ছিল না । ইংরেজরা
(১৫)
এই নীতি পরিবর্তন করে ভুমিস্বত্ত্ব দান করে ব্যক্তি মালিকদের । বাৎসরিক হারে নির্দিষ্ট পরিমান মুদ্রার বিনিময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ জমি চিরকালের জন্য বন্দোবস্ত দেওয়া হয় । নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ধার্য অর্থ ইংরেজ কোষাগারে জমা করতে অপারগ হলে ঐ জমি অন্য কাউকে বন্দোবস্ত দেবার অধিকার ছিল ইংরেজ কোম্পানীর । কিন্তু চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে নির্দিষ্ট করে দেওয়া অর্থবৃদ্ধির কোন অধিকার ইংরেজদের ছিল না ।
সাধারণতঃ মােগল আমলের অধঃস্তন আদায়কারি ও কর্মচারিদের কাছে এবং অন্যান্য কিছু নতুন লােকজনের কাছে জমির চিরস্থায়ি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। এরফলে মােগল যুগের অভিজাতশ্রেণী বিপর্যস্ত হয় এবং বাঙলায় এক নতুন জমিদারশ্রেণীর আত্মপ্রকাশ ঘটে । এই নতুন জমিদারশ্রেণীর অধিকাংশই হিন্দু । উচ্চবর্ণ হিন্দু ব্রাহ্মণ , কায়স্থ ও বৈদ্য এবং তাদের কাছাকাছি লােকজন , আত্মীয় পরিজন । বাংলার ক্ষেত্রে এই নব্য জমিদাররা ছিলেন ইংরেজদের সহযােগী ও দালালগােষ্ঠী , দুর্বৃত্ত ও টাউট প্রকৃতির লােকজন ।
চিরস্থায়ি বন্দোবস্তের উদ্দেশ্য সম্পর্কে এক চিঠিতে লর্ড কর্ণওয়ালিশ তার লন্ডনের মনিবদের জানান যে , "ইংল্যাণ্ডের ভুস্বামীগােষ্ঠীর অনুকরণে ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের স্তম্ভরূপে একটি নতুন ভূস্বামীশ্রেণীর সৃষ্টি করাই হােল চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মূল উদ্দেশ্য ...। যে শ্রেণী ভূমি সম্পদের একাংশ ( মূল পরিকল্পনা অনুযায়ি এক দশমাংশ ) ভােগ করিয়া ইংরেজ শাসনের সহিত সমস্বার্থ সম্পন্ন হইবে এবং এই শাসনকে চিরকাল রক্ষা করিবে ... আমাদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই (এদেশের) ভূস্বামীগণকে আমাদের সহযােগী করিয়া লইতে হইবে । — যে ভূস্বামী একটি লাভজনক ভূসম্পত্তি নিশ্চিন্ত মনে এবং সুখেশান্তিতে ভােগ করিতে পারে , তাহার মনে উহার কোনরূপ পরিবর্তনের ইচ্ছা জাগিতেই পারে না" ।
পরে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলাফল নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করে লর্ড বেন্টিঙ্ক ঘােষণা করেছিলেন যে , “আমি ইহা বলিতে বাধ্য যে , ব্যাপক গণ বিক্ষোভ বা গণবিপ্লব হইতে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা হিসাবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিশেষ কার্যকর হইয়াছে । অন্যান্য বহুদিকে , এমনকি সর্বাপেক্ষা মৌলিক বিষয়ে ( অর্থনৈতিক স্বার্থ ) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যর্থ হইলেও , ইহার ফলে এরূপ একটি বিপুল সংখ্যক ধনী ভূস্বামীশ্রেণী তৈরি হইয়াছে , যাহারা ব্রিটিশ শাসন অব্যাহত রাখিতে বিশেষভাবে আগ্রহান্বিত এবং জনগণের উপর যাহাদের অখণ্ড প্রভুত্ব রহিয়াছে ” । - পরবর্তীকালে ইংরেজ বিরােধী মহাবিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ , সাঁওতাল বিদ্রোহ , চোয়াড় বিদ্রোহ প্রভৃতি অসংখ্য কৃষক বিদ্রোহ এবং তা দমনকালে ইংরেজরা এইসব জমিদারদের পূর্ণ সহযােগিতা পান , তাতে তাদের গৃহীত নীতির যথার্থতা প্রমাণিত হয়।
( ১৬ )
পলাশীর যুদ্ধে বিদেশী ইংরেজদের হাতে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ে বাঙালি হিন্দুদের একাংশ খুশী হয়েছিলেন । বস্তুতপক্ষে তারা নবাবের পরাজয় কামনা করেছিলেন এবং ইংরেজদের নানাভাবে সহযােগিতা করেছিলেন । বিশেষ করে যারা ব্যবসায়িক ও আর্থিক স্বার্থের জন্য ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর শাসনকে অনুকূল বলে মনে করেছিলেন । উদাহরণ হিসাবে দু'টি বিশেষ পরিবার ও ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা যেতে পারে । একজন কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ; আর অন্যজন কলকাতার নবকৃষ্ণ ।
ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ইংরেজদের সাথে সিরাজউদ্দৌলার পলাশীর যুদ্ধকে বর্ণনা করেছেন ‘দেবাসুর সংগ্রাম ’ নামে । রাধারমন রায় কলকাতার দুর্গোৎসব ’ নামক প্রবন্ধে লিখেছেন--- 'দুর্গাপূজা পলাশী যুদ্ধের বিজয়ােৎসব ’ । জানা যায় – এই বিজয়ােৎসব হিসাবেই ১৭৫৭ সালে প্রথম শারদীয়া দুর্গাপূজা হয় নদীয়া এবং কলকাতায় । নদীয়ায় এই পূজার উদ্যোগ নেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এবং কলকাতায় উদ্যোগ নেন নবকৃষ্ণ মহাশয় । লর্ড ক্লাইভ কলকাতার দুর্গাপূজায় নবকৃষ্ণের বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন । এই দুই পরিবার মুর্শিদাবাদের নবাবের কোষাগার লুণ্ঠন ও ক্লাইভের বদান্যতায় বিশেষভাবে লাভবান হয়েছিলেন ।
গবেষক বিনয় ঘােষ তার লিখিত ‘ টাউন কলকাতার কচড়া ’ বইতে আরও ৩০ টি পরিবারের নাম উল্লেখ করেছেন – যারা ক্লাইভ এবং ইংরেজদের তােষামােদ করে রাতারাতি রাজা , মহারাজা , লাটবাহাদুর ইত্যাদি বনে গিয়েছিলেন । এইসব পরিবারের কেউ ছিলেন ইংরেজ সহযােগী বেতনভূক কর্মচারি , কেউ ঠিকাদার , কেউ দালাল - মােটকথা সবাই সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইংরেজ কোম্পানীর শাসনের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন । কলকাতার বিখ্যাত মহারাজা রামকৃষ্ণ বাহাদুর , রাজা রামচন্দ্র রায় ( ধর ) , মল্লিক পরিবার , খিদিরপুরের ঘােষাল পরিবার , জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার , শেঠ পরিবার , জোড়াসাঁকোর সিংহ পরিবার , ব্যানার্জী পরিবার , শ্যামবাজারের বসু পরিবার , শীল পরিবার , ঠনঠনিয়ার ঘােষ পরিবার , রাম বাগানের দত্ত পরিবার , কুমারটুলির সরকার পরিবার , বাগবাজারের মুখার্জী পরিবার , নিমতলার মিত্র পরিবার , লাহা পরিবার প্রভৃতি এরা সবাই উচ্চবর্ণ হিন্দু পরিবার । এইসব পরিবারগুলির মতই ইংরেজ কর্মচারি ও চাটুকারশ্রেণী কলকাতার বাইরের বিভিন্ন জেলা শহর এবং মফঃস্বলেও তৈরি হয়। তাদের হাতেও কিছু অর্থ জমা হয় ।
অর্থের মাধ্যমে খাজনা বা রাজস্ব পরিশােধের নীতি চালু হওয়ায় গ্রামে সুদখাের মহাজনশ্রেণীর সৃষ্টি হয় । খরা - বন্যায় বিপর্যস্ত কৃষকেরা সময় মত খাজনা
( ১৭ )
দেবার তাগিদে ও চাষের খরচের প্রয়ােজনে এইসব সুদখোর মহাজনদের কাছে হাত পাততে থাকেন । এভাবে সুদখোর মহাজনদের হাতেও অর্থ জমতে থাকে।
ফলে , ১৭৯৩ সাল থেকে বাঙলায় যখন জমির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হতে থাকে , তখন এইসব দেশদ্রোহী , টাউট , নীতিজ্ঞানহীন সুদখাের মহাজনরা জমি বন্দোবস্ত নিয়ে জমিদার হয়ে যান । পরবর্তীকালে বাঙলায় যে ভদ্রলােকশ্রেণীর উদ্ভব হয় তাদের আদি পুরুষেরা হলেন এইসব জমিদার , সুদখাের ও তাদের আত্মীয় স্বজন এবং নায়েব - গােমস্তারাই ।
বাঙলায় মুসলমান জমিদারের সংখ্যা ছিল নগণ্য । ঢাকার নবাবরাই ছিলেন তার মধ্যে প্রধানতম । এই নবাব পরিবার মূলতঃ কাশ্মীরের লােক । তারও আগে তারা পারস্য থেকে এসেছিলেন বলে দাবি করা হয় । তারা ছিলেন চামড়ার ব্যবসায়ী । ১৭০০ সাল বা তার কিছু পরে তারা ঢাকায় আসেন । চিরস্থায়ি বন্দোবস্ত নীতি চালু হওয়ায় , তারাও জমি ব্যবসায়ে টাকা বিনিয়ােগ করেন । বাঙলার ৭ টি জেলায় তাদের জমিদারি ছিল । জমির পরিমাণ ছিল প্রায় দুই লক্ষ একর । ১৯৩৪ সাল নাগাদ তাদের খাজনা আদায় হতাে ১ লক্ষ ২০ হাজার পাউন্ড । ১৮৫৭ সালে মহাবিদ্রোহের সময় এই পরিবার ইংরেজদের প্রতি অনুগত থাকায় নবাব উপাধি পান । ১৯১২ সালে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত রদ না হওয়া পর্যন্ত তারা ইংরেজদের প্রতি অনুগত ছিলেন । এই পরিবার মুসলিম লীগ দলের প্রতিষ্ঠাতা । এই পরিবারের সদস্য খাজা নাজিমুদ্দিন ১৯২০ সাল থেকে বাঙলা ও ভারতের রাজনীতিতে বিশেষ ভূমিকা নেন । তিনি যুক্ত বাঙলার প্রিমিয়ারও (প্রধানমন্ত্রী) নির্বাচিত হন।
ইংরেজদের সাথে কথাবার্তা বলা , মেলামেশা , ইংরেজদের ব্যক্তিগত ফার্ম ও ব্যবসায়ে চাকরি করার জন্য , দালালী ও ঠিকাদারি করতে , নিজের ব্যবসা ও জমিদারি পরিচালনা এবং ইংরেজ প্রশাসনে চাকরির জন্য ইংরেজী ভাষাজ্ঞান প্রয়ােজনীয় হয়ে পড়ে । সর্বোপরি রাষ্ট্র ক্ষমতার অধিকারীদের ভাষা ইংরেজি, তা জানা আবশ্যক । কিন্তু ইংরেজ শাসনের প্রথম ৫০/৬০ বছর ইংরেজরা সরকারিভাবে এদেশে কোন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তােলে না । সেজন্য সাধারণের জন্য ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণের কোন সুযােগ ছিল না । যারফলে জমিদার ও বিত্তবান এবং ইংরেজদের একান্ত অনুগত ও আস্থাভাজন কিছু পরিবারের সন্তানরা ব্যয়বহুল ব্যক্তিগত বা বেসরকারি মিশনারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং লণ্ডনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি শিক্ষালাভের সীমিত সুযােগ পান । তবে এইসব বিত্তবান পরিবারগুলির মধ্যে রক্ষণশীল পরিবারগুলি শুরুতে ইংরেজি শিক্ষা ও আধুনিক আদব কায়দা গ্রহণ করতে চাননি । উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় / তৃতীয় দশক থেকে অবশ্য তাদেরও
(১৮)
মন ও মানসিকতায় পরিবর্তন আসে এবং তারা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণে এগিয়ে আসেন ।
১৮১৫ সালে ইংরেজ সরকার শিক্ষাখাতে সারা ভারতের জন্য ন্যূনতম বাৎসরিক একলক্ষ টাকা বরাদ্দ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে । এতবড় দেশের জন্য এই সামান্য টাকা দিয়ে ব্যাপক সংখ্যক মানুষের শিক্ষার ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়--- এই অজুহাতে ইংরেজ প্রশাসন শুধুমাত্র উচ্চবর্ণ হিন্দুদের ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করার সিদ্ধান্ত ঘােষণা করে । ইংরেজরা মনে করেন উচ্চবর্ণ হিন্দুরা ইংরেজদের দ্বারা উপকৃত , তাই তাদের প্রতি অনুগত এবং তাদের ঔপনিবেশিক স্বার্থ ও প্রশাসনের জন্য তারা ভারতের উচ্চবর্ণের হিন্দুদের অনুকূল শক্তি বলে মনে করে । এভাবে ইংরেজ শাসনে প্রণীত শিক্ষা ব্যবস্থার শুরু থেকে কার্যতঃ উচ্চবর্ণ হিন্দুরা শিক্ষায় সংরক্ষণের সুবিধা পেয়ে যান । এরপর ১৮৫৭ সালে ভারতের তৎকালীন রাজধানী কলকাতায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় । উচ্চবর্ণ হিন্দুরা এইসব সুযােগের সদ্ব্যবহার করে আধুনিক শিক্ষায় অন্যদের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে যান – যে অগ্রগমন তারা আজও ধরে রেখেছেন । ইংরেজ আমলে প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে এবং স্বাধীন ভারতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক – এই উভয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা এই অগ্রবর্তী অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন ।
১৮৫৪-৫৫ সালে ইংরেজ সরকার ১৮১৫ সালে গৃহীত শিক্ষানীতিতে কিছু পরিবর্তনের কথা ঘােষণা করে । অস্পৃশ্যদের শিক্ষা গ্রহণের উপর ১৮১৫ সালে ঘােষিত নিষেধাজ্ঞা এই সময় তুলে নেওয়া হয় এবং অস্পৃশ্য ও মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য তারা বিশেষ পরিকল্পনার কথা ঘােষণা করে । কিন্তু উচ্চবর্ণ হিন্দুদের প্রবল বাধায় সরকারের সে পরিকল্পনা কার্যকরি হয় না । বাঙলায় সরকারি স্কুলে অস্পৃশ্যদের ভর্তি করা হয় না । মুসলমানদের বিরুদ্ধে উচ্চবর্ণ হিন্দুরা অতটা কঠোর না হলেও , মুসলমানদেরও নানাভাবে বঞ্চিত করা হয় । ততদিনে ইংরেজ সরকারের প্রশাসনে উচ্চবর্ণ হিন্দুদের কব্জা অনেকটাই শক্তিশালী হওয়ায় তারা একাজে সফল হন ।
গ্রামবাঙলার রেনেসাঁর জনক গুরুচাদ ঠাকুরের জন্ম এই পর্যায়কালে ১৮৪৬ সালে । সরকারি স্কুল বা বর্ণহিন্দুদের নিয়ন্ত্রিত কোন স্কুলে ভর্তির সুযােগ তিনি নিজেও পাননি । মুসলমানদের দ্বারা পরিচালিত মক্তবে সামান্য লেখাপড়া শেখার সুযােগ হয় তাঁর । ভর্তির ক্ষেত্রে যাতে অস্পৃশ্যৱা পক্ষপাতিত্বের শিকার না হন , তারজন্য সরকারের ঘােষণা ছিল যে , উচ্চতর কর্তৃপক্ষ ভর্তির বিষয়টি দেখবেন । সারাদেশে এই নীতি মেনে চলা হয় । কিন্তু সরকারি এই নীতি অমান্য করে বাঙলার সরকারি স্কুলগুলিতে ভর্তি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব ছেড়ে রাখা হয় শিক্ষা সংক্রান্ত তুলনামূলক নীচু কর্তৃপক্ষ জেলা কমিটির উপর – যেখানে উচ্চবর্ন হিন্দুদের প্রাধান্য
(১৯)
ছিল প্রশ্নাতীত । তার ফলে বাংলার সরকারি স্কুলে অস্পৃশ্যরা ভর্তির সুযােগ পাননি ।
পরবর্তীকালে ইংরেজ সরকার হান্টার কমিশন নিয়ােগ করে শিক্ষা সংক্রান্ত ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিয়ে এবং বিচার বিশ্লেষণ করে প্রয়ােজনীয় সুপারিশ করার জন্য । ১৮৮২ সালে হান্টার শিক্ষা কমিশন মুসলমানদের শিক্ষায় প্রগতির জন্য ১৭ দফা সুপারিশ পেশ করে – যা মুসলমান সমাজের প্রভূত উপকারে আসে । সত্য ঘটনা এই যে , এইসব সুপারিশ কার্যকরি করার ফলেই মুসলমানদের মধ্যে ইংরেজী শিক্ষার প্রচলন শুরু হয় । এই সময়ের কাছাকাছি সময় ১৮৭৫ সালে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় । দুটি ঘটনার সমন্বয় সাধিত হয় এবং মুসলমান সমাজে ইংরেজী শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত শ্রেণীর উদ্ভব হয় ।
অস্পৃশ্যদের জন্যেও কিছু সুপারিশ হান্টার কমিশন করে ঠিকই ; কিন্তু তা যথেষ্ট এবং যুক্তিসংগত নয় বলে সমালােচিত । ড . আম্বেদকর পরে এক স্মারকলিপিতে দাবি করেন যে , মুসলমানদের জন্য করা সুপারিশগুলি অস্পৃশ্যদের জন্য আরো বেশি প্রয়ােজন ছিল – কিন্তু হান্টার কমিশন তা করেনি ।
১৭৯৩ - এর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে সৃষ্ট গ্রামাঞ্চলের জমিদারি শাসন এবং দেশে ইংরেজ শাসনের ১০০ বছর সময়ের শেষ পর্যায়কালে বাঙলায় কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয় । বিশেষ করে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পর ব্রিটিশ শাসননীতিতে কিছু বিশেষ পরিবর্তন আসে । তারফলে ভারতে ব্রিটিশের শোষণের তীব্রতা বাড়ে । কৃষিতে সংকট সৃষ্টি হয় ও অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয় । এরফলে জমিদারশ্রেণীর আদায় ও আয় উল্লেখযােগ্য পরিমান কমে যায় । এক বড় মাপের শিক্ষিত বেকারশ্রেণীর সৃষ্টি হয় । দেশীয় শিল্প কারখানা - বিশেষ করে দেশে বস্ত্র কারখানার সংখ্যা বেড়েই চলে । ফলে , দেশে উল্লেখযােগ্য সংখ্যক দেশীয় শিল্প মালিক ও শ্রমিকশ্রেণীর উদ্ভব হয় । ইংরেজ ও এদেশীয় ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের মধ্যে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি হয় – এসব কিছুর ফলে ধীরে ধীরে ব্রিটিশ বিরােধী মনােভাব বাড়তে থাকে এবং এক ধরনের খণ্ডিত জাতিয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ হয় ।
বাংলার জমিদার ও ভদ্রলােকশ্রেণীর এই সংকটকালের মধ্যে ১৮৮৫ সালে ‘বােঝার উপর আর একটা শাকের আঁটি’ চাপিয়ে দেয় ইংরেজ সরকার । এক নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তারা জমিদারদের ক্ষমতা সীমিত করে । ফলে , প্রজাদের কাছ থেকে আদায় ও আয় আরও কমে যায় । জমিদারদের ক্ষমতা ও প্রভাব যত কমতে থাকে , ততই রায়তরা শক্তি অর্জন করতে থাকে। মূলতঃ পূর্ববঙ্গের মুসলমানরাই ছিল ধনী জোতদার - জমিদারদের দুর্বলতার সুযােগ
(২০)
নিয়ে তারা ক্ষমতাধর হয়ে উঠতে থাকে।
এখানে একটি বিষয়ের উল্লেখ করা দরকার যে , আলােচিত এই সময়কাল পর্যন্ত শুধু বাঙলা নয় , সারা ভারতে হিন্দু - মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা - হাঙ্গামার ঘটনা ছিল না বললেই চলে । যতদূর জানা যায় - ১৮০১ সাল থেকে কংগ্রেস দলের - জন্ম ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত সারাভারতে মাত্র দু’টি ছােটমাপের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটে । আর কংগ্রেস পার্টির সৃষ্টির পর থেকে ; অর্থাৎ ভারতে রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার পর থেকে এদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে ।
১৮১২ সালে পূর্ববাঙলার ফরিদপুর জেলায় হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্ম হয় । তিনি হিন্দুধর্মের বর্ণাশ্রম প্রথা এবং ধর্মীয় নানা গোঁড়ামী ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রগতিশীল ও আধুনিক মতাদর্শ প্রচার করেন এবং সংঘ গড়ে তােলেন । তারফলে পূর্ববঙ্গের অন্ত্যজশ্রেণীর মানুষ , বিশেষ করে বিপুল সংখ্যক চন্ডাল ( নমঃশূদ্র ) শ্রেণীর মানুষের মধ্যে মর্যাদা ও আত্মসম্মানবােধের উন্মেষ হয় । তার পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরের সুযােগ্য নেতৃত্বে অন্ত্যজ মানুষের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের কাজ শুরু হয় এবং তারা আলােকপ্রাপ্ত হয়ে বিকশিত হতে থাকেন । এই বিশাল জনগােষ্ঠী মর্যাদা , সম্মান এবং হিন্দু বর্ণকাঠামােয় উচ্চতর আসনের দাবিতে ১৮৭০-৭৩ সালে এক দীর্ঘস্থায়ী সাধারণ ধর্মঘট ও আন্দোলন শুরু করেন । ফরিদপুর , বরিশাল , খুলনা , যশাের ও ঢাকা জেলা জুড়ে এই আন্দোলন শুরু হয় । এই ঘটনাও সমাজে এক নতুন দ্বন্দ্ব সংঘাত সৃষ্টি করে ।
গুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে চণ্ডালরা ওড়াকান্দিতে প্রথম প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সময়কাল ছিল ১৯০৮ সাল। ঐ স্কুল হাইস্কুলে উন্নীত হয় এবং সরকারি অনুমােদন লাভ করে । এটাই চণ্ডালদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত বাঙলার প্রথম হাইস্কুল । ১৯১৮ সালে নমঃশূদ্র অধ্যুষিত যশাের জেলার মশিয়াহাটীতে অপর একটি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় – যে স্কুল প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন রাইচরণ মহালদার । একই সময়ে এক বছর পর বরিশালে ভেগাই হালদার স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন । এভাবে ক্রমে অন্ত্যজশ্রেণীর মধ্যেও এক ক্ষুদ্র শিক্ষিত ও সচেতনশ্রেণী গড়ে ওঠে ।
১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দল প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দল ব্রিটিশ বিরােধী জাতিয়তাবাদী মতাদর্শের কথা ঘােষণা করে ঠিকই ; কিন্তু অতিদ্রুত প্রকাশ হয়ে পড়ে যে , ইংরেজদের সাথে দরকষাকষি করে ভারতের উঠতি শিল্পপতি , ব্যবসায়ী এবং জমিদারদের স্বার্থরক্ষার জন্য এই দল সচেষ্ট এবং সক্রিয় । ব্রিটিশ সরকার ও জমিদার স্বার্থের বিরুদ্ধে ভারতীয় কৃষকদের আন্দোলন ও বিদ্রোহ সামাল দেওয়া ছিল এই দল গঠনের আরেক অন্যতম লক্ষ্য ।
(২১)
মুসলমানদের কাছে কংগ্রেস পার্টি একটি হিন্দুদের পার্টি বলে প্রতিভাত হতে থাকে এবং অস্পৃশ্য ও নীচুজাতের হিন্দুরা বুঝতে পারেন যে , দলটি উচ্চবর্ণ হিন্দুদের দল । কংগ্রেস দলটি অচিরেই প্রজা কৃষকদের কাছে জমিদারদের পাটি এবং শ্রমিকদের কাছে শিল্পপতি - ব্যবসায়িদের পার্টি বলে পরিগণিত হয় ।
কংগ্রেস পাটি যখন গঠিত হয় , তখন হিন্দু-মুসলমান ঐক্যবদ্ধভাবে ঐ পার্টিতে যােগদান করেন । ১৮৮৫ থেকে ১৮৯২ সাল সময়কালে কংগ্রেস অধিবেশনগুলিতে গড়ে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ১৩.৫০ শতাংশ । কিন্তু অতিদ্রুত কংগ্রেস পার্টি সম্পর্কে মুসলমানদের মােহভঙ্গ হতে থাকে । কংগ্রেস দলের তৎকালীন নেতৃত্বের সংকীর্ণ ও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য মুসলমানরা নিজেদের গুটিয়ে নেন । দেখা যায় ----১৮৯৩ সাল থেকে ১৯০৬ সাল , এই সময়কালে কংগ্রেস অধিবেশনগুলিতে মুসলমান প্রতিনিধিদের সংখ্যার হার কমে দাঁড়ায় গড়ে ৭.১০ শতাংশ । - যা আগের বছরগুলির তুলনায় প্রায় অর্ধেক ।
মুসলমান সমাজের শিক্ষিতশ্রেণী , ব্যবসায়ী , জোতদার এবং জমিদারগণ নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য কংগ্রেসের উপর ভরসা করতে পারেননি । মুসলমান সাধারণ মানুষও কংগ্রেস সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়েন । তারজন্য ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় । মুসলিম লীগ গঠিত হলেও শুরুতে কংগ্রেসের সাথে ঐ দলের সুসম্পর্ক ছিল । মুসলিম লীগে যােগদান করে ওই দলের সদস্যপদ গ্রহণ করলেও , একই সাথে কংগ্রেসের সদস্য থাকায় কোন বাধা ছিল না । এমনকি একই দিনে একই প্যান্ডেলে কংগ্রেস অধিবেশন শেষ হবার পর ; অথবা পরদিন মুসলিম লীগের অধিবেশন শুরু হতাে । হিন্দু এবং মুসলমান মানুষের মধ্যেও যথেষ্ট ভাল সম্পর্ক ছিল।
মােহম্মদ আলি জিন্নাহ রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে মুসলিম লীগে যােগদান করতে চাননি । রাজনীতিতে যােগদান করার ৭ বছর পর তিনি মুসলীম লীগে যােগদান করেন । 'মুসলিম লীগ আর মুসলমানদের স্বার্থের প্রতি আনুগত্য , ভারতের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি হবে না ’ – এই প্রতিশ্রুতি পাবার পর তিনি মুসলিম লীগে যােগদান করেন । মুসলিম লীগে যােগদান করলেও তিনি কংগ্রেসের সদস্যপদ ত্যাগ করেন না । বেশ কয়েক বছর তিনি এই দ্বৈত সদস্যপদ বজায় রাখেন । তার ধর্মনিরপেক্ষ ও জাতিয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গী ও ক্রিয়াকাণ্ডের জন্য পরবর্তীকালে ১৯১৬ সালে সরােজিনী নাইডু জিন্নাহকে ‘হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের দূত' বলে আখ্যায়িত করেন।
(২২)
দ্বিতীয় অধ্যায়
বঙ্গভঙ্গ বিরােধী ও স্বদেশী আন্দোলন
বাঙলার আধুনিক রাজনীতিতে প্রথম সবচেয়ে বড় ঘটনা হলাে , ইংরেজ সরকারের বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত ঘােষণা এবং তার প্রতিক্রিয়া । ১৯০৫ সালে গভর্নর জেনারেল জর্জ কার্জন বঙ্গপ্রদেশকে ভেঙে দুটি প্রদেশ গঠন করার কথা ঘােষণা করেন । নতুন যে প্রদেশ সৃষ্টি করা হয় তার নাম দেওয়া হয় পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ ।
প্রদেশ ভাগ করার কারণ ও উদ্দেশ্য নিয়ে জর্জ কার্জন এবং হিন্দু জমিদারশ্রেণী ও কংগ্রেস যেমন পরস্পর বিরােধী যুক্তি খাড়া করে ; তেমনি এই সিদ্ধান্তের পক্ষে এবং বিপক্ষে বঙ্গবাসী জনগণ ভিন্ন ভিন্ন ও পরস্পর বিরােধী অবস্থান গ্রহণ করেন ।
কার্জন যুক্তি দেখান যে , শাসন কার্যের সুবিধার জন্য তার সরকার বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন । আর তাঁর বিরােধিরা বলেন , বাঙলা ও বাঙালি জাতিকে ভেঙে দুর্বল করে জাতিয়তাবাদী শক্তি ও আন্দোলনকে দুর্বল করার চক্রান্ত করছে ইংরেজরা । এ হলাে – ভাগ করে শাসন করার ষড়যন্ত্র , এ বিভাজন বাঙলা মায়ের শবব্যবচ্ছেদ !
হিন্দু জমিদার , হিন্দু শিক্ষিতশ্রেণী ও জাতীয় কংগ্রেস বঙ্গভঙ্গের বিরােধিতা করেন । অপর পক্ষে পূর্ববঙ্গের মুসলমান জমিদারশ্রেণী ও প্রজা হিন্দু - মুসলমান কৃষকশ্রেণী বঙ্গভঙ্গ করে নতুন প্রদেশ গঠনের পক্ষে দাঁড়ান ।
যুক্ত বাংলায় মােট বাঙালির অর্ধেকের কাছাকাছি অংশ ছিল পূর্ববঙ্গের মুসলমান । বাকী অর্ধেক বাঙালির আধাআধি হলাে , পূর্ববঙ্গ ও আসামের অস্পৃশ্য ও তাদের খুব কাছাকাছি বর্ণহিন্দু সম্প্রদায়ের প্রজা কৃষকেরা । অস্পৃশ্যরা যেহেতু বঙ্গভঙ্গের পক্ষে দাঁড়ান , তাই বলা যায় – বাঙালির সংখ্যালঘিষ্ঠ একাংশ বঙ্গভঙ্গের বিরােধিতা করেন ।
ঐ সময়ে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে বা বঙ্গপ্রদেশের মধ্যে উড়িষ্যা , বিহার ও আসাম ছিল । মােট জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৮০ লক্ষ । এরমধ্যে বাঙালি ছিলেন ৪ কোটি ১০ লক্ষ ।
(২৩)
‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ' নামের যে নতুন প্রদেশ গঠন করা হয় তার লােকসংখ্যা ছিল ৩ কোটি ১০ লক্ষ। এরমধ্যে তিনভাগের দুই ভাগই ছিলেন মুসলমান । অবশিষ্ট হিন্দুদের মধ্যে বেশিটাই অস্পৃশ্য ও নিম্নবর্গীয় হিন্দু ।
১৯০৫ সাল বা তার সমসাময়িককালে , বিশেষ করে নদী , খাল ও জল-জঙ্গলপূর্ণ বাংলার যােগাযােগ ব্যবস্থা ভাল ছিল না । তাই , উদ্দেশ্য অন্য আর যা কিছুই থাক না কেন , জর্জ কার্জন বাঙলা ভাগ করার যে যুক্তি ও কারণ উল্লেখ করেছেন , তা একেবারেই অযৌক্তিক ও ফেলনা, একথা বলা যায় না ।
পক্ষান্তরে , যেহেতু বেশির ভাগ বাঙালি (মুসলমান ও অস্পৃশ্য বাঙালি) বঙ্গভঙ্গের বিরােধিতা করেননি ; বরং বঙ্গভঙ্গের পক্ষে দাঁড়ান , তাই , বাঙলামায়ের শবব্যবচ্ছেদের যে যন্ত্রণা ও আবেগ প্রচার করা হয় , তা ধোপে টেকে না । বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দেলনও সমগ্র বাঙালি জাতির জাতীয় আন্দোলন – একথাও বলা যায় না । বিশেষ করে বঙ্গভঙ্গ বিরােধী এই ভদ্রলোেকশ্রেণী যখন ১৯৪৬-৪৭ সালে বাঙলা ভাগের দাবিতে সােচ্চার হন ও বাঙলা ভাগ করে নেন – তখন তাদের সেকালের কপটতা একেবারেই নগ্ন হয়ে যায় । বর্তমানে ১৯০৫ সালের সেই বাঙলা প্রায় ১০ ভাগে বিভক্ত — যা মেনে নেওয়া হয়েছে ।
১৯০৫ সালে একশ্রেণীর সংখ্যালঘিষ্ঠ বাঙালি – নির্দিষ্টভাবে বললে , উচ্চবর্ণহিন্দু বাঙালি বা ভদ্রলােক বাঙালিরা বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত রদ করার জন্য মরিয়া হয়ে আন্দোলন শুরু করেন । কিন্তু কেন ? – এই কেন - এর উত্তর এবং আন্দোলনের কারণ ও ফলাফল খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে এই লেখায় ।
সামাজিক অবস্থান , মর্যাদা ও মানসিকতা , আর্থিক স্বার্থ ও জীবন - জীবিকা – সব ক্ষেত্রেই বাঙালি উচ্চবর্ণ হিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণীর স্বার্থ এবং মুসলমান ও অস্পৃশ্য - নিন্মবর্ণীয় হিন্দু প্রজাকৃষকদের স্বার্থ ছিল পরস্পর বিরােধি । একাংশের যাতে লাভ ও সুবিধা , অন্য অংশের তাতে ক্ষতির সম্ভাবনা । ফলে , বঙ্গভঙ্গের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত , যারফলে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ , আর্থিক ও রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যাবার সম্ভাবনা, তাতে দুই অংশ পরস্পর বিরােধী অবস্থান গ্রহণ করবেন , এটাই স্বাভাবিক ।
বৃটিশ ভারতে উচ্চবর্ণহিন্দুর তুলনামূলক সার্বিক অগ্রগতি ছিল চোখে পড়ার মত । একটা পর্যায়ের পর এই ভদ্রলােকশ্রেণী নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও কর্তৃত্ব ধরে রাখা এবং অগ্রগমন আরও বেশি ত্বরান্বিত করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন । ফলে , নতুন আলােকপ্রাপ্ত মুসলমান সমাজের সাথে তাদের এক ধরনের টানাপােড়েন সৃষ্টি হয় । যদিও ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গপূর্ব সময়কাল পর্যন্ত এই দ্বন্দ্ব - সংঘাতের
(২৪)
তেমন কোন বহিঃপ্রকাশ ধরা পড়ে না । কিন্তু বঙ্গভঙ্গের ঘটনা থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে যে মেরুকরণ শুরু হয় , তারমধ্যে ধর্ম গােষ্ঠীগত ও ধর্মীয় উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করে । উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকেরা এই সময় থেকে নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থ ও একাধিপত্য ধরে রাখার জন্য হিন্দুত্বের তাস ' ব্যবহার করা শুরু করেন ।
বাংলা ভাগ হবার ফলে ঢাকা কেন্দ্রিক ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশে' বাঙালি মুসলমানদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হয় । আর কলকাতা কেন্দ্রিক বাঙলা প্রদেশে অবাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যান । এ অবস্থা বাঙালি ভদ্রলােকশ্রেণীর কাছে অশনি সংকেত হিসাবে মনে হয় । 'পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশে’ বাঙালি পরিচয়ের চেয়ে হিন্দু পরিচয় তাদের কাছে বেশি জরুরি ছিল এবং তা বেশি সম্মান ও মর্যাদার ছিল । আর কলকাতা কেন্দ্রিক বাঙলায় হিন্দু পরিচয়ের চেয়ে বাঙালি পরিচয় বেশি জরুরি ও মর্যাদার ছিল । কিন্তু দুই প্রদেশেই উভয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে ভদ্রলােকেরা সংখ্যালঘু হওয়ায় , তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন । উচ্চবর্ণহিন্দু বাঙালিরা কর্তৃত্ব হারাবার আশঙ্কায় আতঙ্কিত হন । এই অবস্থায় অন্যায় একাধিপত্য ও কর্তৃত্ব ধরে রাখার তাড়নায় তারা নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে ক্রমেই সাম্প্রদায়িকতার পাঁকে ডুবতে থাকেন ।
উচ্চবর্ণ হিন্দুরা স্পষ্ট অনুভব করেন যে , বঙ্গপ্রদেশ যদি ঐক্যবদ্ধ না থাকে ও বঙ্গপ্রদেশের উপর তাদের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ যদি অটুট না থাকে বা নিয়ন্ত্রণ যদি শিথিল হয় – তাহলে মুসলমান , অস্পৃশ্য ও অন্যান্য নিম্নবর্ণীয় সমাজের মানুষের প্রগতি ও উত্থান অনিবার্য হবে । কারণ ইংরেজ সরকার ইতিমধ্যে নীতি পরিবর্তন করে ঐসব অংশের মানুষের শিক্ষা ও প্রগতির জন্য কর্মসূচী গ্রহণ করে । তাই , বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত তাদের কাছে অসহ্য বলে মনে হয় ।
এই ভদ্রলােকশ্রেণীর বসবাস ছিল মূলতঃ কলকাতা কেন্দ্রিক বা তারা ছিলেন রাজধানীবাসী । অথচ তাদের অধিকাংশের জমিদারি ও আয়ের সংস্থান ছিল পূর্ববঙ্গে। পূর্ববঙ্গ থেকে প্রাপ্ত আয়ে তারা কলকাতায় বিলাসবহুল ও উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপন করতেন । বঙ্গভঙ্গের ফলে তাদের জমিদারি এলাকা পড়ে প্রদেশের বাইরে । ফলে , পূর্ববঙ্গের জমিদারির উপর কর্তৃত্ব , নিয়ন্ত্রণ ও আয়ের নিশ্চয়তা নিয়ে তারা সংশয়ে পড়েন এবং ভীত হন ।
এ ছাড়াও ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের শর্ত বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি বা বঙ্গপ্রদেশের ক্ষেত্রে কার্যকরি ছিল। কিন্তু 'পূর্ববঙ্গ ও আসাম '---এই নতুন গঠিত প্রদেশের উপর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের শর্ত কার্যকরি ছিল না ; অথবা এ সম্পর্কে
(২৫)
সরকারি নীতি ঠিক কী হবে – তা নিয়ে ঘাের সংশয়ে পড়ে ভদ্রলােকশ্রেণী চোখে শর্ষে ফুল দেখেন ।
কেন যে জমিদারশ্রেণী , নায়েব , গােমস্তা ও তাদের সুবিধাভােগী আত্মীয় - পরিজন, তথা গােটা ভদ্রলােকশ্রেণী বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তে আতঙ্কিত হন , একটি ছােট্ট পরিসংখ্যান দেখলে তা বােঝা যায় । ১৮৮০ সালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে মােট খাজনার অংশ হিসাবে জমিদারগণ পেয়েছিলেন ২ কোটি পাউন্ড ; আর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের শর্ত অনুযায়ী ব্রিটিশ সরকার জমিদারদের কাছ থেকে পায় মাত্র ৪০ লক্ষ পাউন্ড । সুদীর্ঘকাল ধরে নানা অজুহাতে এবং নানা কারণে জমিদারগণ প্রজাদের উপর খাজনা চাপিয়েছেন বহুগুণ। ফলে , তাদের প্রচুর আয় বেড়েছে ; কিন্তু ১৯০৫ সালেও জমিদারগণ ইংরেজ সরকারের প্রাপ্য খাজনা মেটান ১৭৯৩ সালে নির্দিষ্ট হয়ে যাওয়া হারে । তাই , বঙ্গভঙ্গের ঘােষণায় জমিদারগণ দিশেহারা হয়ে যান । কারণ নতুন প্রদেশ হওয়ায় পূর্ববঙ্গ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের শর্তের বাইরে চলে যাওয়ায় অধিকাংশ হিন্দু জমিদারগণ নিশ্চিত আর্থিক ক্ষতির মুখােমুখি দাঁড়ান ।
জমিদারগণের আক্রোশ এবং আশঙ্কা যে অমূলক ছিল না , মুম্বাই প্রদেশের ভূমি রাজস্ব আদায় সম্পর্কে একটি তথ্য দেখলে তা অনুমান করা যেতে পারে । ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনকালের প্রথম দিকে বােম্বাই প্রদেশের কৃষকদের কাছ থেকে ইংরেজরা মােট খাজনা আদায় করে ৮০ লক্ষ টাকা । আর মহারাণী ভিক্টোরিয়ার রাজত্বকাল ১৮৭২ সালে ঐ খাজনা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২ কোটি ৩ লক্ষ টাকা ” – যে খাজনা সরাসরি ইংরেজ সরকার পায় । কারণ ঐ প্রদেশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নীতি ছিল না । এই হিসাবের মাধ্যমে বােঝা যায় যে , বাঙলার জমিদারগণ কী বিপুল পরিমাণ সুবিধা ভােগ করেছেন । মাদ্রাজের ক্ষেত্রেও দেখা যায় ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর আমল থেকে – রাণীর শাসন বা ইংরেজ সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ আমলে খাজনার পরিমান বিপুল বৃদ্ধি ঘটেছে – যা পেয়েছে ইংরেজ সরকার ।
পূর্ববঙ্গের মুসলমান ও নিম্নবণীয় হিন্দু প্রজা কৃষকেরা বঙ্গভঙ্গ করার জন্য ইংরেজদের কাছে দাবি জানাননি বা তেমন কোন আন্দোলন সংগঠিত করেননি । বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয় একান্তভাবেই ইংরেজ সরকার । নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, এই সিদ্ধান্ত তারা নেয় নিজেদের স্বার্থে । তাদের সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বজায় রাখার স্বার্থে , অর্থনৈতিক লাভের জন্য এবং প্রশাসনিক সুবিধার জন্য । অন্য আরও কোন কারণ ও লক্ষ্য তাদের থাকতে পারে ।
সে যা হােক না কেন , এই ঘােষণার ফলে মুসলমান এবং নীচুবর্ণের প্রজা
(২৬)
কৃষকদের মনে আশা সঞ্চারিত হয় । তারা জমিদার , নায়েব এবং গােমস্তাদের নির্যাতনের হাত থেকে কিছুটা স্বস্তি পাবার আশা করেন । মুসলমান সমাজ শিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে ন্যায্য অংশ পাবার পথ সুগম হলাে বলে ভাবলেন । অস্পৃশ্যরা, ভদ্রলােকশ্রেণীর ঘৃণা ও অসম্মানের হাত থেকে রেহাই পাবার এবং শিক্ষা - চাকরির সুযােগ পাবার স্বপ্ন দেখলেন ।
বঙ্গভঙ্গের ফলে প্রজা কৃষকদের উপর জমিদারদের নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যায় , অত্যাচার , অবিচার ও শােষণ কমবে – একথা গুরুচাঁদ ঠাকুর উপলব্ধি করেন । শিক্ষা এবং চাকরিতেও অস্পৃশ্যদের কিছু সুবিধা হতে পারে বলে ভাবলেন । সেজন্য তিনি উচ্চশিক্ষিত পুত্র শশীভূষণ ঠাকুরকে ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ সাহেবের কাছে পাঠান আলােচনার জন্য যাতে মুসলমান এবং অস্পৃশ্যরা ঐক্যবদ্ধভাবে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়াতে পারেন । আলােচনায় ঐকমত্য হয় এবং উভয়পক্ষ বঙ্গভঙ্গের পক্ষে একজোট হয়ে আন্দোলন করেন । তারা কংগ্রেস ও হিন্দু জমিদারশ্রেণীর নেতৃত্বে বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলন এবং স্বদেশী আন্দোলনের বিরােধিতা করেন ।
বাংলায় হিন্দু - মুসলমান বিভাজন ; বিশেষ করে উচ্চবর্ণ হিন্দু ও অস্পৃশ্য নিম্নবর্ণ বিভাজন সুদীর্ঘকালের। অসঙ্গত আধিপত্য , শােষণ - নির্যাতন - অবিচার ও ঘৃণা বহু প্রাচীনপ্রথা । তা সত্ত্বেও বলা যায় — চলমান হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে টানাপােড়েন , দ্বন্দ্ব - সংঘাত ও পারস্পরিক অবিশ্বাস ইত্যাদি ; বঙ্গভঙ্গ ও তার ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ার ঘটনাবলীতে এক নতুন মাত্রা পায় । অধঃপতিত হিন্দু সম্প্রদায়গুলি এবং মুসলমানদের বিকাশের সম্ভাবনা ভদ্রলােকশ্রেণী কোনভাবেই মানতে চাননি । তাই , বাঙলার মাটি ধীরে ধীরে কাঁপতে শুরু করে ।
বাংলার ভদ্রলােকশ্রেণী , জমিদারশ্রেণী এবং কংগ্রেস পার্টি ইংরেজদের দ্বারা বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তকে বিরােধিতা করার যুক্তি হিসাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলেন এবং বাঙলামায়ের শবব্যবচ্ছেদের স্লোগান তুলে আবেগ সৃষ্টির চেষ্টা করেন । কেউ কেউ এই আন্দোলনকে সাম্রাজ্যবাদ বিরােধি সংগ্রাম হিসাবে অভিহিত করেন । আবার অন্য কেউ কেউ এই আন্দোলনের মধ্যে হিন্দু জাতীয়তার প্রকাশ খুঁজে পান ।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন । তিনি নিজের কবি প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে এক ডজন দেশাত্মবােধক গান রচনা করেছিলেন । যেখানে তিনি বাংলাপ্রদেশকে বাঙালি জাতির মায়ের আসনে বসিয়েছেন । এইসব গান মানুষের মনে নাড়া দেয় এবং মানুষকে বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করে । তার নেতৃত্বে কলকাতায় শােভাযাত্রা হয় এবং রাখীবন্ধন
(২৭)
অনুষ্ঠান পালিত হয় । উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয় - হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ করে ব্রিটিশের বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তের বিরােধিতা করা ।
মাতৃভূমি বঙ্গপ্রদেশ এবং মাতৃভাষার প্রতি রবীন্দ্রনাথের প্রেম , প্রীতি ও ভালবাসা নিয়ে কোন প্রশ্ন না তুলেও বলা যায় , এসব কিছুর সাথে তার জমিদারি স্বার্থের প্রশ্নও প্রাধান্যের ভূমিকায় নিশ্চয়ই ছিল । তার মত আরও বহু মানুষ ও মনীষীর ক্ষেত্রে একথা সমান সঠিক । এক্ষেত্রে বিচার করা দরকার যে , তাদের বাঙলা , বাঙালি এবং বাঙলা ভাষার প্রতি প্রেম কতটুকু ; আর ইংরেজ বিরােধিতা কতটা আন্তরিক ও খাঁটি ছিল । প্রকৃতপক্ষে শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার , আর জমিদারি , প্রশাসনিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থই মূল বিষয় ছিল কি - না ।
ভূস্বামীগােষ্ঠী , নব্য শিল্পপতি-বুর্জোয়াশ্রেণী , ব্যবসায়িগােষ্ঠী , উকিল-ব্যারিষ্টার এবং এইসব অংশের স্বার্থরক্ষাকারি বুদ্ধিজীবীগােষ্ঠী - এক কথায় বাঙালি ভদ্রলােকশ্রেণী করার বঙ্গভঙ্গ বিরােধিতা করেন এবং এই সিদ্ধান্ত রদ করার দাবিতে আন্দোলনে নামেন । ইংরেজ সরকারের উপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তারা বিলাতি দ্রব্য সামগ্রী বর্জন করার পথও বেছে নেন । বাঙলার ভদ্রলােকদের দাবি কংগ্রেস পার্টি মেনে নেয় এবং ঐ দলের ১৯০৬ সালের কলকাতা অধিবেশনে বিলাতি দ্রব্য বর্জন করে স্বদেশী দ্রব্য ব্যবহারের ডাক দেয় কংগ্রেস পার্টি – যাকে স্বদেশী আন্দোলন বলে অভিহিত করা হয় । স্বদেশী আন্দোলনের ডাক দেবার জন্য দেশীয় শিল্পপতি ও মিল মালিকরাও কংগ্রেস পাটির উপর চাপ সৃষ্টি করেছিল ।
আলােচিত শ্রেণী ও গােষ্ঠীগুলির প্রতিনিধি হিসাবে শহুরে মধ্যবিত্ত শিক্ষিতশ্রেণী স্বদেশী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসেন । এই শিক্ষিতশ্রেণী নানা কারণে ইংরেজদের উপর বিরক্ত ছিলেন । ঐ সময়ে বেকার সমস্যা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের সামনে এক বড় সংকট হিসাবে দেখা দেয় । ভাল চাকরির ক্ষেত্রে বাঙালি তথা ভারতীয়দের বিরুদ্ধে বৈষম্য করা হতাে । বেতনের ক্ষেত্রে ইংরেজ কর্মচারি ও বাঙালি বা ভারতীয় কর্মচারিদের মধ্যে অনেক বেশি বৈষম্য ছিল । বাঙালি তথা ভারতীয় সরকারি কর্মচারিদের ইংরেজ কর্মচারিদের তুলনায় অনেক কম বেতন দেওয়া হতাে । অফিস - আদালতে অপমান ও অসম্মানজনক ব্যবহার করা হতাে । এসব বিভিন্ন কারণেও শিক্ষিতশ্রেণীর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয় ।
মতুয়া ধর্মের আকরগ্রন্থ শ্রী শ্রী গুরুচাঁদ চরিতে এই সময়কালের বাঙলার ভদ্রলােকশ্রেণী সম্পর্কে এক সুন্দর ব্যঙ্গাত্মক বর্ণনা দেওয়া হয়েছে :
( ২৮ )
“ একভাই কর্মচারি অপরে উকিল ।
ব্যবসায়ি অন্যজনে মূলে রাখে মিল।।
উকিল ছেড়েছে কর্ম স্বদেশী সাজিয়া ।
কর্মচারী ভাই আছে আসনে বসিয়া ।।
ব্যবসায়ী ভাই রহে দোকান পাতিয়া ।
বহু লাভ করে তিনি খদ্দর বেচিয়া ।।
ঐ সময়ে বাঙালি মধ্যবিত্তশ্রেণীর শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে ইংরেজদের শাসনকার্যে কিঞ্চিত অংশীদারি পাবার আশা সঞ্চারিত হয়েছিল । বঙ্গভঙ্গের ফলে তাদের সে সুযােগ সংকুচিত হবার নিশ্চিত সম্ভাবনা ছিল । পক্ষান্তরে মুসলমানদের সামনে চাকরি ও শাসনকার্যে অংশগ্রহণের সুযােগ বৃদ্ধি পাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়, যা এই ভদ্রলােকশ্রেণীর কাছে অসহ্য বলে মনে হয় ।
এ ঘটনার ঠিক আগের বছর ১৯০৪ সালে ইংরেজরা 'বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯০৪' পাশ করে । এই আইনের দ্বারা স্কুল , কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার জন্য বেতন বৃদ্ধি করা হয় । আইন কলেজগুলির মধ্যকার কিছু কলেজ বন্ধ হয়ে যায় এবং অন্যকিছু আইনকলেজ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় । কার্জন পরগাছা উকিল ও ব্যারিষ্টারশ্রেণীকে সহ্য করতে পারতেন না । শিক্ষকদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ এই আইনের দ্বারা নিষিদ্ধ করা হয় । সামগ্রিকভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয় আইন শিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণীকে বিক্ষুব্ধ করে তােলে ।
এছাড়াও ইতিপূর্বে ১৮৮৩ সালে ইংরেজ সরকার ইলবার্ট বিল ’ প্রনয়ণ করে । এই বিলের মাধ্যমে ইংরেজ ও ভারতীয়দের মধ্যে বিচার সমতা দেবার চেষ্টা করা হয় – আগে যা ছিল না । এই বিলে কালাে বিচারকদের শ্বেতাঙ্গ অপরাধীকে বিচার করে শাস্তি দেবার অধিকার দেওয়া হয় ইত্যাদি। কিন্তু ভারতে অবস্থানকারি ইংরেজদের বাধায় শেষ পর্যন্ত ইংরেজ সরকার এই ইলবার্ট বিল প্রত্যাহার করে নেয় । এই প্রত্যাহারের ঘটনা ভারতীয়দের – বিশেষ করে শিক্ষিতশ্রেণীর মর্যাদায় আঘাত লাগে এবং তারা বিক্ষুব্ধ ।
এই পর্যায়কালে ভারতে ভাল সংখ্যক শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয় । ফলে এক গুচ্ছ দেশীয় শিল্পপতি ও বুর্জোয়া ব্যবসায়ীশ্রেণীরও সৃষ্টি হয় । ভারতে সর্বপ্রথম বস্ত্রশিল্প স্থাপিত হয় মুম্বাই শহরে ১৮৫৩ সালে । তারপর থেকে কারখানার সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে । ১৮৬৬ সালে দেশে বস্ত্র কারখানার সংখ্যা ১৩, ১৮৭৭ সালে ৫১, ১৮৮০ সালে ১৫৬ এবং মােট শ্রমিক সংখ্যা ৪৪ হাজার ।
(২৯)
১৯০০ সালে দেশে মােট বস্ত্র কারখানার সংখ্যা ১৯৩ এবং শ্রমিক সংখ্যা ১ লক্ষ ৬২ হাজার । ১৯০৬ সালে বস্ত্রকারখানার সংখ্যা দাঁড়ায় ২০৪ এবং মােট মূলধনের পরিমান ১৭ কোটি ১৯ লক্ষ টাকা । বস্ত্রশিল্প ছাড়াও দেশে অন্যান্য শিল্প - কলকারখানা স্থাপিত হয় এবং মােট শ্রমিক সংখ্যা উল্লেখযােগ্য সংখ্যায় বৃদ্ধি পায় ।
ভারতীয় শিল্পপতি ও উঠতি বুর্জোয়াশ্রেণীর উৎপন্ন পণ্যদ্রব্যের প্রতিযােগী ছিল বিলাতী দ্রব্যসামগ্রী । বৃটিশনীতির ফলে , ইংল্যান্ডের শিল্পপণ্যের ভারতীয় বাজারে কিছু বিশেষ সুবিধা ছিল । বাঙলায় স্বদেশী আন্দোলন বা বিলাতীপণ্য বর্জন আন্দোলন ভারতীয় কারখানা মালিকদের বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেয় । তাদের পণ্যের বাজার বেড়ে যায় এবং পণ্যদ্রব্য বেশি বিক্রি হতে থাকে । কংগ্রেস পার্টি এই স্বদেশী আন্দোলনকে সমর্থন ও সহযােগিতা করায় বিলাতী দ্রব্য বর্জন আন্দোলন সর্বভারতীয় চরিত্র অর্জন করে । কংগ্রেস পার্টির মাধ্যমে উঠতি শিল্পপতি - ব্যবসায়ী ও বুর্জোয়াশ্রেণী নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ চরিতার্থ করার পথ আবিষ্কার করে । বিলাতীদ্রব্য বয়কট আন্দোলনের ফলে ভারতীয় কারখানা মালিকদের প্রভূত মুনাফার পথ খুলে যায় । পুঁজি সঞ্চয় হয় এবং ভারতে আরও বেশি কারখানা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় । দেশীয় তাঁতশিল্পও সুবিধা পায় । এভাবে বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলনের মাধ্যমে জমিদার , উকিল , মধ্যবিত্তশ্রেণীর সাথে শিল্পপতি ও দেশীয় বুর্জোয়াশ্রেণীর এক দৃঢ় ঐক্য গড়ে ওঠে । তবে এসব যাই ঘটুক না কেন , সবই হলাে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ।
রবীন্দ্রনাথের রাখীবন্ধন অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছিল , - হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য সৃষ্টির কর্মসূচী । কিন্তু বাস্তবতঃ তা হয়নি; বরং বঙ্গভঙ্গ প্রশ্নে আন্দোলন ও পালটা আন্দোলনের ফলাফল হিসাবে বাংলায় হিন্দু - মুসলমানের মধ্যে অনৈক্য ক্রমেই বেড়ে চলে এবং তা গভীরতর হয় । প্রকৃতপক্ষে এই সময় থেকে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার শিকড় গভীরে বিস্তারলাভ করে এবং বাঙলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার সূত্রপাত হয় ।
বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলন ও স্বদেশী আন্দোলন চলাকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কিছু লেখায় এবং এই আন্দোলন নিয়ে পরবর্তীকালে তাঁর লেখা প্রবন্ধে আমরা এই আন্দোলনের এক গভীর প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই । ১৯০৮ সালে রবীন্দ্রনাথ 'সদুপায়' প্রবন্ধের এক জায়গায় লেখেন , “ যদিও আজকাল করকচ লবণ বিলাতি লবণের চেয়ে শস্তা হইয়াছে , তবু আমাদের সংবাদদাতার পরিচিত মুসলমানগণ অধিক দাম দিয়াও বিলাতি লবণ খাইতেছে ।... মুসলমানগণ আজকাল সুবিধা বিচার করিয়া বিলাতি কাপড় বা লবণ ব্যবহার করে না । তাহারা নিতান্তই জেদ করিয়া
(৩০)
করে ।... বঙ্গবিভাগের যে পরিণাম ( বাঙালিদের পৃথকিকরণ ) আশংকা করিয়া পার্টিশনকে আমরা বিভীষিকা বলিয়া জানিয়াছিলাম , সেই পরিণামকেই অগ্রসর হইতে আমরা সহায়তা করিলাম ।... এই উপলক্ষ্যে (স্বদেশী আন্দোলন) আমরা দেশের নিম্নশ্রেণীর প্রজাগণের ইচ্ছা ও সুবিধাকে দলন করিবার আয়ােজন করিয়াছিলাম , সেকথা স্বীকার করিতে আমাদের ভালাে লাগে না ; কিন্তু কথাটাকে মিথ্যা বলিতে পারি না ।... ইংরেজদের শত্রুতা সাধনে কতটুকু কৃতকার্য হইয়াছি বলিতে পারি না , দেশের মধ্যে শত্রুতাকে জাগ্রত করিয়া তুলিয়াছি, তাহাতে সন্দেহমাত্র নাই ।... অল্পদিন হইলাে মফঃস্বল হইতে পত্র পাইয়াছি , সেখানকার কোন একটি বড় বাজারের লােক নােটিশ পাইয়াছে যে , যদি তাহারা বিলাতি জিনিস পরিত্যাগ করিয়া দেশি জিনিসের আমদানী না করে , তবে নির্দিষ্টকালের মেয়াদ উত্তীর্ণ হইলেই বাজারে আগুন লাগিবে । ... এইরূপ নােটিশ দিয়া কোথাও কোথাও আগুন লাগানাে হইয়াছে । ... ক্ৰমে এখন সেই উৎসাহ ঘরে আগুন লাগানাে এবং মানুষ মারাতে গিয়া পৌছিয়াছে । ... দেশের নিম্নশ্রেণীর মুসলমান এবং নমঃশূদ্রদের মধ্যে এইরূপ অসহিষ্ণুতা জাগিয়া উঠিয়াছে । ইহারা জোর করিয়া , এমনকি , ক্ষতি স্বীকার করিয়াও বিলাতি সামগ্রী ব্যবহার করিতেছে ।... বিলাতি দ্রব্য ব্যবহারই দেশের চরম অহিত নহে , গৃহবিচ্ছেদের মত এতবড় অহিত আর কিছুই নাই । ... যদি মানুষের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা থাকে , তবে লােকের ঘরে আগুন লাগানাে এবং মারধর করিয়া গুন্ডামি করিতে আমাদের কদাচই প্রবৃত্তি হইবে না । ”
‘লােকহিত' প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লেখেন , “কিছুকাল পূর্বে স্বদেশী অভিযানের দিনে একজন হিন্দু স্বদেশী প্রচারক এক গ্লাস জল খাইবেন বলিয়া তাহার মুসলমান সহযােগীকে দাওয়া হইতে নামিয়া যাইতে বলিতে কিছুমাত্র সংকোচবােধ করেন নাই ।... আমরা বিদ্যালয়ে ও অফিসে প্রতিযােগিতার ভিড়ে মুসলমানকে জোরের সঙ্গে ঠেলা দিয়াছি ... সেখানকার ঠেলাঠেলিটা গায়ে লাগিতে পারে , হৃদয়ে লাগে না । কিন্তু সমাজের অপমানটা গায়ে লাগে না , হৃদয়ে লাগে ।... (মুসলমানদের উদ্দেশ্যে ) আমাদের ডাকের মধ্যে গরজ ছিল , কিন্তু সত্য ছিল না" ।
রবীন্দ্রনাথ ‘পরিচয়' প্রবন্ধে লেখেন , “ আমরা মুসলমানকে যখন আহ্বান করিয়াছি , তখন তাহাকে কাজ উদ্ধারের সহায় বলিয়া ডাকিয়াছি , আপন বলিয়া ডাকি নাই । যদি কখনাে দেখি তাহাকে কাজের জন্য আর দরকার নাই , তবে তাহাকে অনাবশ্যক বলিয়া পিছনে ঠেলিতে আমাদের বাধিবে না । তাহাদের যথার্থ আমাদের সঙ্গী বলিয়া অনুভব করি নাই , আনুষঙ্গিক বলিয়া মানিয়া লইয়াছি ।
... যে কারণে হিন্দুর হিন্দুত্ব উগ্র হইয়া উঠিল , সেই কারণেই মুসলমানের
(৩১)
মুসলমানী মাথা তুলিয়া উঠিল । এখন সে মুসলমানরূপেই প্রবল হইতে চায় , হিন্দুর সঙ্গে মিশিয়া গিয়া প্রবল হইতে চায় না ” ।... এখন জগৎ জুড়িয়া সমস্যা এ নহে যে , কী করিয়া ভেদ ঘুচাইয়া এক হইব – কিন্তু কী করিয়া ভেদ রক্ষা করিয়াই মিলন হইবে । সে কাজটা কঠিন । কারণ , সেখানে ফাঁকি চলে না , সেখানে পরস্পরকে জায়গা ছাড়িয়া দিতে হয় । সেটা সহজ নহে , কিন্তু , যেটা সহজ সেটা সাধ্য নহে ; পরিণামের দিকে চাহিলে দেখা যায় , যেটা কঠিন সেটাই সহজ "। – রবীন্দ্রনাথের এসব লেখা বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন চলাকালে লেখা। এসব হলো সমসাময়িককালের হিন্দু - মুসলমানের মানসিক চিত্র ও টানাপােড়েন এবং ঘটনাবলীর এক জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এসব অসাধারণ লেখাগুলি মােটামুটি ১৯১২-১৩ ( বাং ১৩১৮-১৯ ) সাল ও তার ৪/৫ বছর আগে থেকে লেখা । তার এইসব লেখাগুলি নিশ্চিতভাবে প্রশংসনীয় । কিন্তু বাস্তব সমস্যার মুখােমুখি দাঁড়িয়ে হিন্দু - মুসলমান এবং উচ্চবর্ণীয় - অস্পৃশ্যদের স্বার্থের টানাপােড়েনের সময় , নানা গুরুত্বপূর্ণ বাক-মোড়ের সন্ধিক্ষণে তিনি বহুক্ষেত্রে একপেশেভাবে এবং কার্যতঃ অন্যায়ভাবে উচ্চবর্ণ হিন্দুদের পক্ষ অবলম্বন করেছেন ।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলনের সূচনায় আমরা রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা দেখেছি । ভদ্রলােকশ্রেণীর স্বার্থে তিনি বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলনের পক্ষ অবলম্বন করেন এবং বিশেষ ভূমিকা পালন করেন ।
মহারাষ্ট্র সরকার কর্তৃক প্রকাশিত ড. আম্বেদকর রচনাবলীর (ইংরেজি) , ৮ম খণ্ডের ২৭৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা রবীন্দ্রনাথের একটি সাক্ষাৎকারের কথা আমরা জানতে পারি । সমসাময়িককালের হিন্দু - মুসলমান সম্পর্কের সংকটকালে ১৯২৪ সালে একটি বাঙলা সংবাদপত্রের সম্পাদক তার একটি সাক্ষাৎকার নেন । সাক্ষাৎকারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন , “ অন্য আরেকটি কারণে হিন্দু - মুসলমানের মধ্যকার ঐক্য প্রায় অসম্ভব । সে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হলাে---এটা মােটামুটিভাবে সত্য যে , মুসলমানদের দেশপ্রেম কোন একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় (ইসলাম বিশ্বপ্রেমিক) । আমি খােলাখুলিভাবে অনেক মুসলমানের কাছে জিজ্ঞেস করেছি – যদি কোনাে মুসলমান দেশ বা শক্তি ভারত আক্রমণ করে তাহলে উভয়ের মাতৃভূমি রক্ষা করার জন্য তারা হিন্দুর সাথে কাধে কাঁধ মিলিয়ে ভারত রক্ষার জন্য লড়াই করবেন কি না । কিন্তু তাদের কাছ থেকে পাওয়া উত্তর আমাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি । আমি নিশ্চিত করে বলছি , এমনকি মিঃ মােহম্মদ আলি ঘােষণা করেছিলেন যে , কোন মুসলমানের , তিনি যে কোন দেশের হােন , এই রকম অবস্থায় (যুদ্ধাবস্থায়) অন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানাের জন্য কোন অনুমতি নেই । ” – কিন্তু আমার মনে হয় , উল্লিখিত এই ধারণা সাধারণ মুসলমানের হােক বা মােহম্মদ আলির হােক বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অথবা ড . আম্বেদকর
(৩২)
– যাঁদের এমন ধারণা থাকুক না কেন , ১৯৬৫ , ১৯৭১ ও কার্গিলযুদ্ধ – প্রভৃতি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে প্রমাণিত হয়ে গেছে যে , এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল । ভারতীয় মুসলমানরা নিজের দেশের জন্যই লড়াই করেন।
এবার আমরা ১৯৩২-৩৩ সালে অস্পৃশ্যশ্রেণীর এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অধিকারের প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা নিয়ে দু'চার কথা আলােচনা করবাে । ঘটনাটি হলাে - সাম্প্রদায়গত রােয়েদাদে অস্পৃশ্যশ্রেণী যাতে নিজেদের প্রতিনিধি নিজেরাই নির্বাচিত করতে পারেন , তারজন্য তাদের পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার অধিকার দেওয়া হয় । এই অধিকার শিখ , মুসলমান , এ্যাংলাে ইন্ডিয়ান , জমিদার , ব্যবসায়ী , শ্রমিক – এ রকম অনেক শ্রেণী ও সম্প্রদায়কেই দেওয়া হয় । মহাত্মা গান্ধী সবার জন্য এই পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা মেনে নেন ; কিন্তু অস্পৃশ্যদের অধিকারটুকু কেড়ে নেবার জন্য তিনি আমৃত্যু অনশন আন্দোলন শুরু করেন । রবীন্দ্রনাথ অস্পৃশ্যদের বিরুদ্ধে ও গান্ধীর পক্ষে দাঁড়ান । শেষ পর্যন্ত গান্ধী অস্পৃশ্যদের অধিকারটুকু বাতিল করে দিতে সমর্থ হন এবং এ ব্যাপারে যে চুক্তি হয় তার নাম পুনাচুক্তি। এই চুক্তিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বাক্ষর করেন, চুক্তিটিকে সমর্থন করেন । কিছু পরে বাঙলার ভদ্রলােকেরা পুনাচুক্তির ভয়ংকর বিরােধিতা শুরু করেন। তাই , বেগতিক বুঝে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কীভাবে পাল্টি খান , তারই দলিল একটা টেলিগ্রাম । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর টেলিগ্রামটি করেন সম্ভবত কংগ্রেস নেতা নলিনীরঞ্জন সরকারকে । যে টেলিগ্রাম মিঃ সরকার ইংরেজ সরকারের কাছে তার নিজের লেখা একটি চিঠি জুড়ে (নোট) পাঠিয়ে দেন ( বইপত্রে অবশ্য এন.আর. সরকার লেখা আছে ) ।
টেলিগ্রামটি এরূপ , প্রতি – এন.আর. সরকার ,
তারিখ – ২৭ শে জুলাই , ১৯৩৩ ।
"আমার মনে আছে যে , আমি প্রধানমন্ত্রিকে একটি টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলাম । ঐ টেলিগ্রামে আমি সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ সম্পর্কে মহাত্মাজি যে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন , তা বিলম্ব না করে প্রধানমন্ত্রিকে (ম্যাকডােনাল্ড ) গ্রহণ করার জন্য অনুরােধ জানিয়েছিলাম । ঐ সময়ে যে অবস্থা তৈরি হয়েছিল তা আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল । যারজন্য আমরা ঠান্ডা মাথায় , শান্তিতে , সময় নিয়ে পুনাচুক্তির সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার অবকাশ পাইনি । আমি পূণায় পৌঁছানাের আগেই সাপ্রু এবং জয়কার সবাইকে নিয়ে পুনা থেকে চলে যান । ফলে , তারমধ্যে বাঙলার একজনও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি ছিলেন না । এই প্রশ্নে দ্রুত সিদ্ধান্তের উপরে মহাত্মাজির জীবনরক্ষার বিষয় নির্ভরশীল ছিল , তাই সংকটকালে এই অসহ্য বিড়ম্বনা আমাকে অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে এমন এক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে । এখন বুঝতে পারছি – যা ভুল হয়েছে । এই ভুল সিদ্ধান্ত দেশের পক্ষে
(৩৩)
স্থায়ী ক্ষতির কারণ হবে । রাজনীতি ক্ষেত্রে কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় ও মহাত্মাজির প্রতি গভীর ভালবাসার কারণে এবং ভারতীয় রাজনীতি সম্পর্কে তার দুরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞা সম্পর্কে গভীর বিশ্বাসের জন্য বাঙলার প্রতি সুবিচার হলাে কী হলাে না , সেদিকে মনােযােগ দেবার কথা আর ভাবিনি । কিন্তু এখন আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে , পুনাচুক্তির দ্বারা যে অবিচার করা হয়েছে , তা রাজ্যের বিভিন্ন অংশের মানুষের মধ্যে ভুল বােঝাবুঝি সৃষ্টি করবে এবং তা সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দেবে । ফলে , বাঙলায় কোন শান্তিপূর্ণ সরকার প্রতিষ্ঠা স্থায়ীভাবে কঠিনতর হবে । ”
পূণাচুক্তিতে যে সামান্য সুযােগ অস্পৃশ্যরা পেয়েছিলেন, বাংলার ভদ্রলােকশ্রেণী সেটুকুও তাদের দিতে রাজি ছিলেন না । রবীন্দ্রনাথও এভাবে অস্পৃশ্যদের বিরােধিতায় সামিল হন ।
ড. আশােক মিত্র এক প্রবন্ধে লিখেছেন , “ বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত বাংলার মুসলিম জনতার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিকে দ্রুততর করবে বলে আশা জাগিয়েছিল । তারা ভেবেছিল , হিন্দু জমিদারদের প্রবল দমন পীড়ন থেকে তারা রেহাই পাবেন । সরকারি ক্ষেত্রে চাকুরির সুযােগ সুবিধায় হিন্দুদের একচ্ছত্র অধিকার ছিল । মুসলমানরা ভেবেছিলেন বঙ্গভঙ্গ এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাবে । তারা আশা করেছিলেন এবার একটা নিজস্ব আশ্রয়স্থল পাবেন । তাদের আর হীনমন্যতায় ভুগতে হবে না। বঙ্গভঙ্গ যেসব সুযােগ সুবিধার দ্বার খুলে দিয়েছিল , তারফলে হয়তাে দু'এক প্রজন্মের মধ্যেই সমৃদ্ধশালী , সংবেদনশীল ও সমাজ সচেতন এক মুসলিম বুদ্ধিজীবীশ্রেণী গড়ে উঠতাে , যারা নির্মোহ বাস্তবকে পূণমূল্যায়ণ করতেন শ্রেণী বিশ্লেষণের মানদণ্ডে , ধর্মীয় বিভক্তির প্রেক্ষাপটে নয় । ঘটনাপ্রবাহ এভাবে মােড় নিলে ফজলুল করিম সর্দার , কিংবা মুনীর চৌধুরির মতাে উচুমানের ও উঁচুমনের ব্যক্তিবর্গ ৫০ - এর দশকের পরিবর্তে ২০ - এর দশকেই তরুণ বাঙালি মুসলমানদের মনকে জয় করতেন – যারফলে হয়তাে মুসলিম লীগ ব্যর্থ হতাে । এমন হতে পারতাে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রােধ না হলে , ১৯৪৭ সালে বাঙলা তথা ভারত বিভাজনই হতাে না । কিন্তু বাস্তবতঃ মুসলমানরা দেখলেন , ব্রিটিশ নয় , হিন্দুরাই তাদের প্রতারিত করলেন । বাংলায় হিন্দু - মুসলমানের মধ্যে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ও সেতুবন্ধনহীন অনতিক্রম্য ফাটল সৃষ্টির এটাই হলাে নেপথ্য কাহিনী" ।
সদ্য প্রয়াত প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী অম্লান দত্ত লিখেছেন , “নেতারা , বিশেষ করে হিন্দু নেতারা সব সময় বলেছেন, আগে আমাদের মধ্যে ভেদ ছিল না। আমরা ভাই ভাই ছিলাম । এই ব্রিটিশ এসে “ ডিভাইড এ্যান্ড রুল করে আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করলাে – এটা ঠিক নয় । বিভেদের একটা ভাব আগে থেকেই ছিল।
(৩৪)
রাজনীতি দিয়ে সেটা সমাধান করা যায় না । মুসলমানরা তবু এটা স্বীকার করেন ; কিন্তু হিন্দুরা বলেন , বিদেশি সরকার এসেই আমাদের আলাদা করে দিল । হিন্দু বলতে আমি অবশ্য উচ্চবর্ণ হিন্দুর কথাই বলছি । যােগেন মণ্ডল যে হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব করতেন, তাদের মনােভাব এরকম ছিল না । তারা জানতাে – হিন্দু সমাজে কতরকম উঁচু - নীচু ভাগ আছে । আজকের দিনে একজন উচ্চবর্ণহিন্দুকে জিজ্ঞেস করে দেখুন , সে যােগেন মণ্ডলের নামই জানে না । কিন্তু নীচের তলার হিন্দুরা তাকে বলে 'মহাপ্রাণ যােগেন্দ্রনাথ'।
আসলে হিন্দু সমাজের মধ্যে শুচিতা - অশুচিতা নিয়ে একটা বিশেষ ধারণা আছে । এটা একেবারে মনের ভিতরে ঢুকে গেছে । উচ্চবর্ণ হিন্দুরা নিম্নবর্ণকে অবজ্ঞা করে , ঘৃণা করে । নিম্নবর্ণের হিন্দুরাই একসময় মুসলমান হয়েছিল । তাই , এই ঘৃণাবােধটা মুসলমানের দিকেও চলে গেছে – ট্রান্সফার হয়ে গেছে ।
স্বাধীনবঙ্গের প্রস্তাবটার পক্ষে আমিও ছিলাম । কিন্তু বাঙালি হিন্দুরা , যারা স্বদেশী আন্দোলন করে বঙ্গভঙ্গ রদ করে দিয়েছিল , তারাই দেশভাগ চাইলাে ; কারণ তাদের ভয় ছিল , স্বাধীন বঙ্গেওতাে মুসলমানরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে । তারা হয়তাে পরে পাকিস্তানের সাথে মিশে যেতে পারে । প্রস্তাবে স্পষ্ট করে বলা ছিল – স্বাধীনবঙ্গ , ভারত বা পাকিস্তানের সাথে জুড়ে যেতে চাইলে দুই তৃতীয়াংশ ভােটে তা স্থির করতে হবে । টু - থার্ড মেজরিটি মুসলমানরা পেত না । কিন্তু হিন্দুদের ভয় হলাে – যদি নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ওদের সাথে হাত মেলায় , তাহলে হয়তাে মুসলমানরা মেজরিটি পেয়ে যাবে । ... আজ মনে হয় , নিজের কাছে নিজে ঠিক করতে হবে – আমার পরিচয়টা কী? হিন্দু না বাঙালি ? বেশিরভাগ লােকই দেখবেন , বাঙালি বলতেই ধরে নেয় হিন্দু । যেন বাঙালি মুসলমান বলে কিছু নেই ” ।
এখন স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ায় প্রমাণ হয়ে গেছে - যারা সেদিন আশঙ্কা করেছিলেন যে , ‘যুক্ত ও সাবভৌম বাঙলা' পরে পাকিস্তানের সাথে মিশে যেতে পারে, তাদের সে চিন্তা ও আশঙ্কা ভুল ছিল ।
সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন , “ মায়ের দেওয়া মােটা কাপড় লােকে মাথায় করে রাখতাে ; কিন্তু পরতাে ক’জন ? – সে বস্ত্ৰতাে শুধু বুননে নয় , দামেও ছিল মােটা । স্বদেশীর নামে দাম বাড়িয়ে মুনাফা লুটছিল একদল ব্যবসায়ি । বিলিতি কাপড়ের লেবেল তুলে ফেলে স্বদেশী মার্কা লাগানাের মতাে জালজোচ্চরিও চলছিল ” ।
পূর্ববঙ্গের মুসলমান এবং অস্পৃশ্য সম্প্রদায় – বিশেষ করে চন্ডালরা এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ না করায় স্বদেশী আন্দোলন প্রয়ােজনীয় গতি পায় না । ঐ
(৩৫)
সময়ে ফরিদপুরের কংগ্রেস সভাপতি অম্বিকাচরণ মজুমদার নানাভাবে নমঃশুদ্রদের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার জন্য প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেন ; কিন্তু গুরুচাঁদ ঠাকুর অনুমতি না দেওয়ায় কোনভাবেই চন্ডালরা আন্দোলনে যােগদান করেননি ।
নিরুপায় হয়ে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ , কিছু দিনের ব্যবধানে দুটি পৃথক চিঠি লেখেন গুরুচাঁদ ঠাকুরকে । তার অনুগামীদের নিয়ে বঙ্গভঙ্গ বিরােধী ও স্বদেশী আন্দোলনে যােগদান করার জন্য আবেদন করেন তারা। জবাবে গুরুচাঁদ ঠাকুর কংগ্রেসী নেতাদের যে চিঠি লেখেন তার সুন্দর বর্ণনা পাওয়া যায় শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ চরিতে :
“ অনুন্নত বলি যত আছে বঙ্গদেশে ।
কোনভাবে দিন কাটে বেহালের বেশে ।।
বিলাসিতা বলি তারা কিছু নাহি জানে ।
কোনক্রমে কায়ক্লেশে বাচিছে পরাণে ।।
বিদ্যাশিক্ষা বেশি তারা শিখে নাই ।
রাজকার্যে অধিকার তাতে নাহি পায় ।।
রাজনীতি ক্ষেত্রে তারা কভু নাহি ছােটে ।
স্বাধীনতা কী পদার্থ বােঝে নাক মােটে ।।
রাজনীতির সাথে যার যােগাযােগ নাই ।
অসহযােগের প্রশ্ন তার কিবা ভাই ।।
সত্যকথা দেশবন্ধু করি নিবেদন ।
এই পথে স্বাধীনতা আসেনা কখন ।।
সমাজের অঙ্গে আছে যত দুর্বলতা ।
আগে তাহা দূর করা আবশ্যক কথা ।।
এই যে দলিত জাতি যত বঙ্গদেশে ।
ইহাদের দুঃখ কেহ দেখে নাকি এসে ।।
কিবা খায় , কোথা পায় , কোন কার্য করে ।
সন্ধান রাখে না কেহ কোনদিন তরে ।।
দিনে দিনে এরা সবে হয়েছে হতাশ ।
উচ্চবর্ণ হিন্দুগণে করে না বিশ্বাস ।।
যদি উচ্চবর্ণ আজি তাহাদের চায় ।
সেই পথে আছে মাত্র একটি উপায় ।।
সরল উদারভাবে ভাই বলে বুকে ।
(৩৬)
টানিতে হইবে মনে , নহে মুখে মুখে ।।
সম্পদে বিপদে সুখ সমভাবে বাটি ।
ভাই হয়ে , ভাই বলে দিতে হবে খাটি ।৷ ”
চিত্তরঞ্জন দাশের প্রস্তাব চণ্ডালরা প্রত্যাখ্যান করায় স্বদেশীরা বিপাকে পড়ে যান । তারা এবার প্রলােভন দেখিয়ে তাদের দলে টানার চেষ্টা করেন । ধলগ্রামে চণ্ডালদের ভাঙাচোরা স্কুলটিকে নতুন করে তৈরি করতে জমিদার টাকা দেন । দুই টাকা মাসিক অনুদানেরও ব্যবস্থা করেন । বিনিময়ে ছাত্রদের স্বদেশী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার শপথ নিতে হয় । উচ্চবর্ণহিন্দুরা স্বদেশ বান্ধব সমিতি গঠন করে চণ্ডালদের আইনী সহযােগিতার আশ্বাস দেন । এমন আরও সব প্রতিশ্রুতি দিতে থাকেন ।
গুরুচাঁদ ঠাকুর বােঝাতে থাকেন "স্বদেশী শ্লোগান ধনী ও শিক্ষিত জমিদারদের , যারা অতীতে চণ্ডালদের স্বার্থ সর্বদাই উপেক্ষা করে এসেছে । এ হলাে ধনীদের আন্দোলন নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্য । এখানে গরিব চাষীদের কোন স্বার্থ নেই । বঙ্গভঙ্গে চণ্ডালদের কোন ক্ষতি নেই" ।
বর্ণহিন্দুরা গুজব ছড়ান — ইংরেজরা সব জমির দখল নিয়ে নেবে । নতুন করে কর বসাবে নারকেল আর তালগাছের উপর । এমনকি সুপারি আর কলাগাছেও কর বসাবে । হিন্দু বিধবাদের বিয়ে দেবে জোর করে । লােকজনকে ধরে ধরে আসামে পাঠাবে চা বাগানে শ্রমিকের কাজ করতে । কিন্তু তাতেও চণ্ডালদের ক্ষিপ্ত করতে না পেরে স্বদেশী সংগীতের মাধ্যমে প্রচার করা হয় যে , ইংরেজরা গরু আর শূয়ােরের চর্বি মেশায় নুনের সাথে । আর চিনিতে মিশিয়ে দেয় গরুর হাড়ের গুঁড়াে । কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না । গুরুচাঁদ ঠাকুরকে কেউ অমান্য করতে রাজি হন না ।
এরপর স্বদেশীরা গুন্ডামী ও অসভ্যতা শুরু করে । ১৯০৭ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকা জেলার শােল্লার গ্রামে একদল তরুণ স্বদেশী একজন গরিব অস্পৃশ্য মহিলার শাড়ী খুলে নিয়ে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে ; কারণ ঐ মহিলার পরণে ছিল কম দামের বিলাতি শাড়ি । চণ্ডালরাও এর জবাব দিতে থাকেন। ১৯০৮ সালের মে মাসে খুলনার তিলক গ্রামে তারা ব্রাহ্মণ ও কায়স্থদের আক্রমণ করে । নিজেরাই হাট বসিয়ে সেখানে বিলাতি পণ্য বেচাকেনা শুরু করে । ধানকাড়ারী প্রথা এবং নগদে খাজনা আদায়ের বিরুদ্ধেও প্রজা কৃষকদের আন্দোলন চলতে থাকে । এই সময়ে চণ্ডালরা জমিদারদের বাজার লুঠ ও ঘরবাড়ি ভাঙতেও পিছপা হতাে না । পুলিশ এসে পড়লে চণ্ডাল লাঠিয়ালরা পুলিশকে আক্রমণ করতাে । ১৯১০ সালে
(৩৭)
সরকারের হােম (পলিটিক্যাল) ডিপার্টমেন্টের একটি রিপাের্ট , “ When the police force arrived to restore peace or conduct searches , it was violently attacked and assulted by the local chandals . By the end of 1909 , such turbulence and lawlessness had become almost general feature of the chandals of South Faridpur " উচ্চবর্ণ হিন্দুরা বেগতিক দেখে চণ্ডালদের নাপিত , ধােপা ও পাল্কী ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে তাদের মন পেতে চেষ্টা করেন। গুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে ইতিমধ্যে ১৯০৬ সালে ২ রা অক্টোবর চণ্ডালরা নিম্নলিখিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে :
১। ব্রাহ্মণ , বৈদ্য ও কায়স্থদের ঘৃণা , বিদ্বেষ ও চক্রান্তের ফলে বিশাল সংখ্যক চণ্ডালরা পিছিয়ে পড়েছেন । কাজেই এখন থেকে তারা মুসলমানদের সঙ্গে একযােগে কাজ করবেন ।
২। সেক্রেটারি অফ স্টেট - কে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয় – যেহেতু তিনি ঘােষণা করেছেন যে , বঙ্গভঙ্গ মিমাংশিত ঘটনা এবং পরিবর্তনযােগ্য নয় ।
৩। ছােটলাট ল্যান্স লট হেয়ারের কাছে চণ্ডালদের জন্য সেইসব অধিকার দাবি করা হবে – যা ইতিমধ্যে মুসলমানদের দেওয়া হয়েছে ।
বঙ্গভঙ্গের কারণে জমিদার , উকিল - ব্যারিস্টার তথা গােটা ভদ্রলােকশ্রেণী যে আশংকা করেছিলেন এবং মুসলমান ও অস্পৃশ্য হিন্দুরা যা আশা করেছিলেন , তা যে একেবারেই অমূলক নয় , অচিরেই তা বােঝা যায় । নবগঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের লেফটেন্যান্ট গভর্নর মনােনীত হন ব্যামফিল্ড ফোলার । তিনি মুসলমানদের উন্নতির জন্য সচেষ্ট হন । কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কার্যকরি করার উদ্যোগ নেন । যার জন্য উচ্চবর্ণহিন্দুরা তাকে একেবারেই সহ্য করতে পারেননি । ফোলারের বিরুদ্ধে তারা ভাইসরয়ের কাছে লাগাতার অভিযােগ জানাতে থাকেন এবং দায়িত্ব থেকে তাকে প্রত্যাহার করে নেবার জন্য চাপ দিতে থাকেন । ইংরেজ প্রশাসনে তখন ভদ্রলােকশ্রেণীর যথেষ্ট প্রভাব । তাই , তাদের দাবি সরকার অগ্রাহ্য না করে ফোলারকে বদলি করে দেওয়া হয় । এবার নিযুক্ত হন ল্যান্সলট হেয়ার । হেয়ার তার পূর্বসূরির ন্যায় সরকারি চাকরিতে মুসলমানদের ন্যায্য অংশ দেবার জন্য সার্কুলার জারি করতে চান ; কিন্তু ভাইসরয় তাকে বাধা দেন । বর্ণহিন্দুদের তিনি আর বেশি চটাতে রাজি ছিলেন না । তাদের শান্ত করার জন্য এই সময় ১৯০৭ সালে ইংরেজ সরকার বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ত্ব আইনে সংশােধন করে জমিদারদের পূর্বের মত ইচ্ছানুসারে কৃষকদের উপর কর বসানাে ও কর আদায়ের ক্ষমতা ও
(৩৮)
অধিকার দান করেন ।
বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত ঘােষিত হয় ১৯০৫ সালের ১৯ শে জুলাই এবং তা কার্যকরি হয় ১৯০৫ সালের অক্টোবর মাস থেকে । বঙ্গভঙ্গ রদ করার ঘোষণা হয় ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর । এই ঘােষণা কার্যকরি করা হয় ১৯১২ সালের ২৫ শে জুন । অর্থাৎ পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের আয়ুষ্কাল ছিল ৭ বছর । ১৯১২ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয় ঠিকই ; কিন্তু একই সময়ে বিহারকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে আলাদা করে দেওয়া হয় । ১৯৩৭ সালে আবার বিহার ভেঙে , উড়িষ্যা প্রদেশ গঠন করা হয় ।
"পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ নামক রাজ্যের ৭ বছরের আয়ুষ্কালের মধ্যে চণ্ডালদের নাম পরিবর্তনের দাবি আংশিক মেনে নিয়ে নমঃশূদ্র নাম ঘােষণা করা হয় ১৯১০ সালে । চণ্ডালদের ‘ নমাে ' নামকরণের দাবি ছিল। উচ্চবর্ণ হিন্দুরা ইংরেজদের প্রভাবিত করে নমাের সাথে শূদ্র শব্দ যােগ করে দেয় । এই ঘােষণা কার্যকরি করতেও ইংরেজ সরকারকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয় । চণ্ডালদের নমঃশূদ্রে রূপান্তর বর্ণহিন্দুরা মেনে নিতে চাননি ।
১৮৯২ সালে উচ্চবর্ণ হিন্দুদের পরামর্শ ও চাপে ইংরেজ সরকার অস্পৃশ্যদের সামরিক বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীতে নিয়ােগ নিষিদ্ধ করে নীতি প্রণয়ন করে । ১৮৯২ সালের আগে পর্যন্ত অস্পৃশ্যরা ঐসব বাহিনীতে সুনামের সাথে যথেষ্ট সংখ্যায় চাকরি করতেন । ড . আম্বেদকরের ঠাকুরদা এবং বাবা ইংরেজ সামরিক বাহিনীতে অফিসার পদে চাকরি করেন । মাহার , দুষাদ , পরিহা প্রভৃতি অস্পৃশ্য সম্প্রদায়গুলির ইংরেজ সামরিক বাহিনীতে যথেষ্ট প্রভাব ছিল । আজও ভারতীয় সামরিক বাহিনীতে ‘মাহার রেজিমেন্ট' বহাল আছে । কিন্তু পরবর্তীতে উচ্চবর্ণ হিন্দুরা কোনভাবেই অস্পৃশ্যদের সাথে একসঙ্গে বসে কাজ করতে রাজি নন বলেই ইংরেজ সরকার ১৮৯২ সালে অস্পৃশ্যদের চাকরিতে নিষিদ্ধ ঘােষণা করে এই নীতি প্রণয়ন করতে বাধ্য হয় ।
‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ' সরকার ১৯০৭ সালে অস্পৃশ্যদের সরকারি চাকরিতে নিয়ােগ নিষিদ্ধ করার আদেশ প্রত্যাহার করে নেয় এবং অস্পৃশ্যরা ঐ বছর থেকেই সরকারি চাকরিতে যােগদানের সুযােগ পান । গুরুচাঁদ ঠাকুরের প্রচেষ্টায় এই আদেশ প্রত্যাহৃত হয় । ঐ আদেশ প্রত্যাহারের ফলে ঐ সালেই শশীভূষণ ঠাকুর সাব রেজিস্টার , মােহনলাল বিশ্বাস দারােগা , রাধানাথ মণ্ডল ও সিদ্ধেশ্বর হালদার কানুনগাে , ডাঃ তারিণী বল সরকারি ডাক্তার এবং কুমুদবিহারি মল্লিক ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট - এর চাকরি পান । বাঙলায় এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেও দেশের
(৩৯)
অন্যান্য অঞ্চলে তা বহাল থাকে । মুম্বাই প্রদেশে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত ড . আম্বেদকরকে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করানাের জন্য লড়াই করতে হয় ।
‘ পরিকথা : বঙ্গভঙ্গের শতবর্ষ ' গ্রন্থখানির ৭৪, ৮৭ এবং ৮৯ পৃষ্ঠায় কিছু তথ্য সংযােজিত হয়েছে । তার থেকে জানা যায় — ১৯০৫-০৬ সালে পূর্ববঙ্গে মাত্র ১২ জন মুসলমান ছাত্র এফ.এ এবং ১ জন মাত্র বি.এ পাশ করার কৃতিত্ব অর্জন করেন । ১৯১২-১৩ সালে ঐ সংখ্যা দাঁড়ায় যথাক্রমে ৭৩ এবং ১৫ জন। ১৯০৪ সালে ইডেন স্কুলে মাত্র ৪ জন মুসলমান ছাত্রী ছিলেন ; ১৯১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ জন। ১৯০১ সালে মুসলমান সরকারি কর্মচারির সংখ্যা ১৪১ জন ; যেখানে ব্রাহ্মণ , কায়স্থ ও বৈদ্য সম্প্রদায়ের কর্মচারীর সংখ্যা ছিল ১১০৪ জন ।---এভাবে দেখা যায় স্বতন্ত্র রাজ্যের এই ৭ বছর সময়কাল থেকেই মুসলমান এবং অস্পৃশ্যদের প্রগতি তরান্বিত হয় ।
বাঙলার প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন বুদ্ধিজীবীশ্রেণীর লেখা , মন্তব্য , পরিসংখ্যান ও তথ্য বিশ্লেষণ করলে বােঝা যায় যে – অস্পৃশ্য , অন্যান্য বিভিন্ন নিম্নবর্ণীয় হিন্দু এবং বাঙলার মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ করে তাদের শােষণ ও পদানত করে রাখার তাগিদটাই ছিল বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলনের মৌলিক প্রেরণা । এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তারা নােংরামী করতে ও হিংস্রতার আশ্রয় নিতেও পিছপা হননি এবং সাম্প্রদায়িক প্রচারণা জোরদার করেন ।
বাঙলায় সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সূচনা হয় ১৯০২ সাল নাগাদ । ব্যারিস্টার প্রমথনাথ মিত্র ছিলেন এই সংগঠনের জনক । তিনি এই সংগঠনের নাম দেন ‘অনুশীলন সমিতি ’ । এই সময়ে অরবিন্দ ঘােষ ( ঋষি অরবিন্দ ) মুম্বাই প্রেসিডেন্সির বরােদা মহারাজের এস্টেটে চাকরি করতেন । একই সময়ে বরােদা মহারাজের দেহরক্ষীর চাকরি করতেন যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় । অরবিন্দের সাথে পরামর্শ করে তিনি চাকরি ছেড়ে বাঙলায় চলে আসেন এবং প্রমথনাথ মিত্রের সঙ্গে অনুশীলন সমিতি গড়ার কাজে যুক্ত হন । অবশ্য সংগঠনের দলাদলিতে বিরক্ত হয়ে যতীন্দ্রনাথ ১৯০৬ সালে অনুশীলন সমিতি ছেড়ে দেন এবং সন্ন্যাস নিয়ে পরে “নিরালম্ব স্বামী" হিসাবে প্রসিদ্ধ হন । ১৯০৩-০৪ সালে যতীন্দ্রনাথ আরও একবার বরােদায় গিয়েছিলেন অনুশীলন সমিতির নির্দেশে । সামরিক শিক্ষালাভের জন্য তাকে পাঠানাে হয় । এক বছর সামরিক শিক্ষা শেষে তিনি আবার বাঙলায় ফিরে আসেন ।
অরবিন্দ ঘােষ বরােদার চাকরি ছেড়ে ফিরে আসেন ১৯০৪ সালে এবং অনুশীলন সমিতিতে যােগদান করেন। পরে তিনি ‘ঋষি অরবিন্দ' হয়ে যান । এই সময়ে বাঙলায় যে সব সন্ত্রাসী সমিতিগুলি গড়ে ওঠে , তারমধ্যে অনুশীলন সমিতি ,
(৪০)
শুভ্রবস্ত্র পরিধান সুহৃদ সমিতি , সাধনা সমিতি , ব্ৰতী সমিতি , অত্মােন্নতি সমিতি , যুগান্তর সমিতি , উত্তরবঙ্গ সমিতি প্রভৃতি ছিল প্রধান ।
এইসব সমিতির সদস্য হতে ‘দীক্ষা' গ্রহণ করতে হতাে । দীক্ষাদানের পদ্ধতি তৈরি করা হয় এবং শপথ বাক্য পাঠ করানাের রীতি ছিল । হবিষন্ন আহার , স্নান , – এসব করতে হতাে দীক্ষা গ্রহণের পূর্বে । দীক্ষাগুরু ধূপ , দীপ , নৈবেদ্য , পুষ্প , চন্দন প্রভৃতি সাজিয়ে বেদ ও উপনিষদের মন্ত্র পাঠ করে যজ্ঞ করতেন । যজ্ঞের পর শিষ্য ‘ প্রত্যালীঢ়াসনে উপবিষ্ট হলে দীক্ষাগুরু শিষ্যের মাথায় গীতা ও তার উপর তরবারি স্থাপন করে দক্ষিণ দিকে দাঁড়াতেন এবং এই অবস্থায় শপথ বাক্য পাঠ করতে হতাে । বন্দেমাতরম্ ছিল তাদের শ্লোগান বা ধ্বনি । প্রচারকার্যের জন্য যুগান্তর , সন্ধ্যা প্রভৃতি পত্রিকা প্রকাশিত হতাে । মূলতঃ এইসব সমিতিগুলির নেতৃবৃন্দ স্বদেশী আন্দোলনে নেতৃত্ব করেন ।
স্বদেশী আন্দোলন সমর্থন করা এবং না করা নিয়ে কংগ্রেসের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল । কংগ্রেস দলের নরমপন্থী অংশ এই আন্দোলনে আগ্রহী ছিলেন না । কিন্তু চরমপন্থী অংশের চাপে কংগ্রেস স্বদেশী আন্দোলনে নামার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে । এই সময়ে কংগ্রেস দলে বালগঙ্গাধর তিলক , লালা লাজপত রায় এবং বাঙলার বিপিনচন্দ্র পাল , অরবিন্দ ঘােষ প্রমুখ চরমপন্থী নেতা হিসাবে পরিচিত ছিলেন । সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এই সময়ে অনেকটাই পিছনের সারিতে চলে যান ।
হিন্দু ভূস্বামী-জমিদার ও শিল্পপতি বুর্জোয়াদের প্রতিনিধিরূপে স্বদেশী আন্দোলন পরিচালনভার গ্রহণ করে শিক্ষিত ভদ্রলােকশ্রেণী । চরমপন্থি স্বদেশীরা এই আন্দোলনের সাথে সনাতন হিন্দুধর্মের মিশ্রণ ঘটিয়ে এই আন্দোলনকে হিন্দু স্বদেশী আন্দোলনে পরিণত করে । আন্দোলনের সাথে কালী , দুর্গা , জাতিভেদ সমর্থন , গোহত্যা ও গােমাংস খাবার বিরােধিতা , বাল্যবিবাহ সমর্থন প্রভৃতি সব কুসংস্কার যুক্ত করে এক প্রতিক্রিয়াশীলতার আসর জমিয়ে ফেলে । মূলতঃ যাকে হিন্দু জাতিয়তাবাদ বললে অত্যুক্তি হয় না । এদেরই নেতৃত্বে কলকাতার বিখ্যাত কালিমন্দিরে এক বিরাট জনসভায় ‘স্বদেশী প্রতিজ্ঞা’ গৃহীত হয় এবং বঙ্গভঙ্গ বিরােধি আন্দোলনে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েন ।
পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ জমিদার ছিলেন হিন্দু এবং বেশিরভাগ প্রজা কৃষকেরা ছিলেন মুসলমান । ফলে , বরাবরই জমিদারদের বিরুদ্ধে যেকোন কৃষক বিদ্রোহ ও আন্দোলনকে জমিদাররা হিন্দুর উপর মুসলমানের আক্রমণ বলে প্রচার করে আত্মরক্ষার চেষ্টা করতেন । আবার উল্টোদিকে অনেক সময় একশ্রেণীর মুসলমান ধর্মীয় নেতারা মুসলমান প্রজা কৃষকদের উপর হিন্দু জমিদারদের অত্যাচারকে
(৪১)
মুসলমানদের উপর হিন্দুদের আক্রমন বলে প্রচার করতেন । এসব কারণে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক মানসিকতা গড়ে ওঠে । ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলন এই সাম্প্রদায়িকতাকে বহুগণ বাড়িয়ে তােলে ।
এ প্রসঙ্গে ময়মনসিং জেলার জামালপুরের একটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে । ১৮৮৩ সালে স্থানীয় গৌরীপুরের জমিদার একটি গরুরহাট প্রতিষ্ঠা করেন । জমিদারদের প্রতিনিধি , উকিল ও প্রশাসনের প্রতিনিধিদের নিয়ে মােট ১৪ জনের একটা কমিটিও গড়া হয় । এরা সবাই হিন্দু । কিন্তু হাটে যারা গরু ক্রয় ও বিক্রয় করতে আসেন , তারা প্রায় সবাই মুসলমান ।
প্রথমে গরু বেচাকেনার জন্য মােট ১ আনা কর দিতে হতাে । ১৯০৭ সালে তা বাড়িয়ে করা হয় ১৪ আনা । এই করবৃদ্ধি নিয়ে কৃষকদের সাথে জমিদারের বিরােধ সৃষ্টি হয় ।
কৃষকের উপর এই জমিদারের নানা উৎপীড়ন আগে থেকেই ছিল । যেমন ভীষণ প্রহার করা , জুতাে দিয়ে মারা , উপবাস করিয়ে রাখা , বলপূর্বক আটক করে রাখা , কাছারিতে খাজনা দিতে গেলে বসতে না দেওয়া বা মাটিতে বসতে বলা , জোর করে সাদা কাগজে সই করিয়ে নেওয়া – এমন অনেক কিছু , যা সচরাচর অধিকাংশ জমিদাররাই করতেন ।
স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আন্দোলন ও পাল্টা আন্দোলনের সংস্কৃতি তৈরি হয় । জামালপুরের কৃষকরা অতটা চড়া কর দিতে অস্বীকার করেন । পুলিশ ও জমিদারের লাঠিয়ালরা কৃষকদের গরু আটক করে । ফলে , সংঘর্ষ বাঁধে এবং সেদিনের মত হাট ভেঙে যায় ।
জমিদার ও হাট কমিটির ভদ্রলােকদের মর্যাদায় আঘাত লাগে । মুসলমান কৃষকদের উচিত শিক্ষা দেবার জন্য তারা তৈরি হন । ঘটনাটিকে হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের আক্রমণ বলে রটিয়ে দেওয়া হয় । হিন্দু জনসাধারণের উপর , এমনকি হিন্দু নারী ও শিশুদের উপর আক্রমণের কথাও চারিদিকে প্রচার করা হয় ।
ফলে ময়মনসিং জেলার যুগান্তর ও বিভিন্ন সন্ত্রাসী দলের সদস্যরা জামালপুরে জমা হন । অরবিন্দ ঘােষ কলকাতা থেকে ইন্দ্রনাথ নন্দী , বিপিনবিহারী গাঙ্গুলী , খুলনার সুধীর সরকারসহ মােট ৬ জন সন্ত্রাসী জঙ্গিকে বােমা , পিস্তল ও ২০০ টাকা দিয়ে জামালপুরে পাঠান হিন্দুদের রক্ষা করার জন্য!
সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে ফের হাট বসলে সন্ত্রাসীরা হাটের মধ্য দিয়ে সামরিক কায়দায় মার্চ করতে থাকেন । তাতে কৃষকরা উত্তেজিত হয়ে বাধা দেন এবং সংঘর্ষ শুরু হয়। সন্ত্রাসীরা পালিয়ে জমিদারের কাছারিতে আশ্রয় নেন । (৪২)
ইন্দ্রনাথ নন্দী পরে এক বিবৃতিতে জানান যে , তারা আত্মরক্ষার্থে ১৮ রাউন্ড গুলি চালান । অস্ত্র রাখা ও গুলি চালনার জন্য ঐ তিন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করে ইংরেজ সরকার ।
বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলন ও স্বদেশী আন্দোলনের সময় মুসলমানরা ভদ্রলােকশ্রেণীর উল্টো পথে হাঁটতে থাকেন । ফলে , চণ্ডালদের কাছে টানার জন্য কংগ্রেসী নেতারা আপ্রাণ চেষ্টা করেন । ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয় ।
আন্দোলন ও পাল্টা আন্দোলনের ফলে বাঙলার কৃষকশ্রেণীর মনােবল এবং আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যায় । প্রজা কৃষকদের মধ্যে ঐক্য জোরদার হয় । বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রজাদের আন্দোলনে সরকারের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ও মিলতে থাকে । এসবের মােট ফলাফল হলাে – জমিদারদের সর্বনাশ ত্বরান্বিত হয় , তারা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন । খাজনা আদায় প্রায় বন্ধ হয়ে যায় এবং বঙ্গভঙ্গ প্রশ্নে ইংরেজদের অনমনীয় মনােভাব জমিদারদের হতাশাগ্রস্ত করে ।
জমিদারদের হতাশা ও মনােভাব আঁচ করে ইংরেজ সরকার স্বদেশী আন্দোলনে ভাঙন ধরাবার কৌশল নেয়। তারা জমিদারদের কাছে টানার জন্য বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব বিল পাশ করে – যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে । জমিদাররা ধীরে ধীরে স্বদেশী আন্দোলন থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নেন । তৎকালীন বৃটিশ আইন সভার সদস্য বার্ট্রাম বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ত্ব আইনকে সরকারের পক্ষ থেকে জমিদারদের উৎকোচ দান বলে বর্ণনা করেন ।
১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলন একেবারেই স্তিমিত হয়ে যায় ; আন্দোলন প্রায় ছিলই না । জমিদার , স্বদেশী , শিল্পপতি ও বুর্জোয়াশ্রেণী পরস্পর বিচ্ছিন্ন । তবুও ইংরেজরা বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত রদ করার কথা ঘােষণা করে ।
১৯১০ সালে ব্রিটিশ সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ড মারা যান । পঞ্চম জর্জ নতুন সম্রাটের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দিল্লীতে এসে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত রদ করে দেন । সম্রাট বদল না হলে , বঙ্গের ভাগ্য অন্যরকম হতে পারতাে ।
কার্জনের সিদ্ধান্ত ও ইচ্ছা ইংরেজ সরকার শেষ পর্যন্ত বাতিল করে দেয় । কার্জন বাঙালি ভদ্রলােকদের শেষ ধাক্কাটি মারার জন্য কলকাতা থেকে রাজধানী দিল্লীতে স্থানান্তরণের সুপারিশ করেন এবং ১৯১১ সালে রাজধানী স্থান বদল করে চলে যায় দিল্লী । বঙ্গভঙ্গ রদ হলাে ঠিকই ; কিন্তু এই আন্দোলন বাঙলার হিন্দু এবং মুসলমানের মধ্যে এক স্থায়ী ফাটল সৃষ্টি করে – যা আজ পর্যন্ত উত্তরােত্তর বেড়েই চলেছে । আর এর সাথে রাজধানী চলে গেল দিল্লীতে ।
(৪৩)
তৃতীয় অধ্যায়
বাঙলায় মুসলিম রাজনীতির সূচনা
মুসলিম লীগের জন্ম হয় ১৯০৬ সালে । পূর্ববঙ্গের ঢাকায় মুসলিম লীগ ভূমিষ্ঠ হয় । ভারতের অন্যকোন প্রান্তে বা প্রদেশে মুসলিম লীগের জন্ম না হয়ে , বাঙলায় কেন তা জন্মলাভ করলাে –এ প্রশ্ন মানুষের মনে উঁকি মারতে পারে । নিশ্চিতভাবে এ ঘটনার একটি কারণ হলাে , এই অঞ্চলে মুসলমান মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা--- যা দলের সাফল্যের জন্য খুবই প্রয়ােজনীয় । কিন্তু এই কারণটি মূল কারণ ছিল না । মূল কারণ হলাে – মুসলমানদের প্রতি বাঙলার উচ্চবর্ণহিন্দুর তীব্র ঘৃণা , বিমাতৃসুলভ ব্যবহার , বঞ্চনা , শােষণ ও অত্যাচার । মুসলমানদের প্রতি উচ্চবর্ণহিন্দুর ঘৃণা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এত প্রকট ছিল না । তারা দেখেন, বাঙলার জমিদারশ্রেণী ও ভদ্রলােকশ্রেণীর এই অনাচার ও অত্যাচারকে কংগ্রেস দলটি সংগঠিতভাবে সমর্থন ও নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসছে । ১৮৮৫ সাল থেকে মুসলমানরা কংগ্রেসের এই ভূমিকা লক্ষ্য করেন এবং বিতৃষ্ণায় তাদের মন তিক্ত হয়ে ওঠে । বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলন ও স্বদেশী আন্দোলনে কংগ্রেস দলের ভূমিকায় মুসলমানদের মােহমুক্তি ঘটে এবং কংগ্রেস দল ত্যাগ করে মুসলিম লীগ গঠন করেন । একটা কথা মনে রাখা প্রয়ােজন যে , এই সময়কালে কংগ্রেস দল পরিচালনা করতেন মূলত : বাঙালি নেতৃবৃন্দ এবং দেশের রাজধানী ছিল কলকাতা ।
বাঙলার শিক্ষিত ভদ্রলােকশ্রেণীর মানসিক গঠন সম্পর্কেও একটা ধারণা থাকা দরকার । যেমন ধরা যাক অরবিন্দ ঘােষ । তিনি ৭ বছর বয়সে ইংল্যান্ডে পাড়ি দেন এবং লন্ডন ও কেমব্রিজে পড়াশুনা করেন । দেশে ফিরে তিনি যে 'রাজনৈতিক বেদান্ত দর্শন ’ প্রচার করেন, তাতে জাতীয় পরিচিতির সাথে দেবী কালিমাতাকে যুক্ত করেন । ব্রাহ্ম সমাজের দুই স্তম্ভ বিপিনচন্দ্র পাল ও সরলাদেবী জাতীয় কর্মসূচীতে কালীপূজা ও শিবাজী উৎসব অন্তর্ভূক্ত করেন । চিত্তরঞ্জন দাশ বৈষ্ণব মতে প্রভাবিত ছিলেন । সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন রামকৃষ্ণ - বিবেকানন্দের একান্ত
(88)
ভক্ত । এইসব শিক্ষিতশ্রেণী একইসাথে ছিলেন আধুনিক এবং ধর্মীয় গোঁড়ামীর ককটেল । তাদের বাহ্যিক আচার - আচরণ , কথাবার্তা ও বেশভূষার সাথে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন এবং নীতিবােধের প্রায় কোন মিলই ছিল না । এই মিশ্র অনুভূতি তাদের রাজনৈতিক দর্শনের ক্ষেত্রেও দেখা যায় । সেখানে ইউরােপের কারিগরি দক্ষতা ও রাজনৈতিক সাফল্যকে গ্রহণ করা হলেও ; 'হিন্দু আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের মহত্ত্বের' নামে যাবতীয় কুসংস্কার মেনে নেওয়া হয় । সেজন্য আশ্চর্য হবার কিছু নেই , যখন ১৮৩০ সালে উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকরা , প্রথম যে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তােলেন তার নাম দেন ‘ ধর্মসভা' । শিক্ষিতশ্রেণীর এই সংগঠনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল 'সতীদাহ' অধিকারকে রক্ষা করা । তাদের সৃষ্ট দ্বিতীয় রাজনৈতিক পার্টির নাম দেওয়া হয় 'ল্যান্ডহােল্ডার্স সােসাইটি ’ প্রভৃতি । পরবর্তীকালের স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট্র সৃষ্টির প্রয়াস আধুনিক মনে হলেও এই প্রয়াসের ভিত্তি হলাে , ভারতের সাথে হিন্দুত্বকে একাকার করে ফেলার দর্শন। দীর্ঘকালব্যাপী স্থবির হিন্দু জাতির পূণজাগরণ ও নতুন করে তাকে সবল করার প্রয়াস! এই কাজে অত্যন্ত সাবধানতার সাথে ভাষার ব্যবহার শুরু হয় এবং বাস্তবতঃ এই পর্যায়কালে ব্রিটিশ বিরােধিতা থেকে সরে গিয়ে মননে এবং মেজাজে মুসলিম বিরােধিতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয় । আজকের রাজনীতি দেখে এসবই একজন সাধারণ মানুষও বুঝতে পারেন ।
পক্ষান্তরে , মােহম্মদ আলি জিন্নাহ রাজনীতিতে যােগদান করেন ১৯০৭ সালে । তিনি মুসলিম লীগে যােগদান না করে কংগ্রেসে যােগ দেন । তিনি মুসলিম লীগে যােগদান করেন ১৯১৪ সালে ; কিন্তু একইসাথে কংগ্রেসের সদস্য পদও বহাল রাখেন । মিঃ জিন্নাহ নেতা ছিলেন মুসলিম লীগের ; কিন্তু নামাজ পড়তেন না । শুকরের মাংসও খেতেন – যা ইসলামে নিষিদ্ধ । অমুসলিম মহিলাকে বিয়ে করেন ।
অন্য এক প্রভাবশালী মুসলিম নেতা ছিলেন হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দি সাহেব । তিনিও নামাজ পড়তেন না। মদ ও শুকরের মাংস খেতেন । রাশিয়ান মহিলাকে বিয়ে করেন ।
অর্থাৎ ব্যক্তি জীবনে তাদের কোন ধর্মীয় গোঁড়ামী ছিল না । সােহরাওয়ার্দি বাংলার সবচেয়ে শিক্ষিত পরিবারগুলির একটিতে জন্মগ্রহণ করেন । তার মামা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম উপাচার্য । আরেক মামা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং তার বাবা এবং দাদা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন । নিজেও লন্ডনের কেম্ব্রিজে পড়া উচ্চ শিক্ষিত মানুষ ছিলেন ।
বাঙলায় মুসলিম লীগের জন্ম হলেও , কংগ্রেসের মতই ধীরে ধীরে মুসলিম লীগের নেতৃত্ব চলে যায় পশ্চিমে – আদমজী , বাওয়ানী , ইস্পাহানী প্রভৃতি শিল্পপতি
(৪৫)
বুর্জোয়া - ব্যবসায়িদের পছন্দের প্রতিনিধিদের হাতে । কংগ্রেসের নেতৃত্বও জমিদার ভদ্রলােকশ্রেণীর হাত থেকে গােয়েঙ্কা , বিড়লা , টাটা প্রভৃতি হিন্দু - পারসী প্রভৃতি শিল্পপতি ব্যবসায়িদের কব্জায় চলে যায় এবং নবাব , রাজা , মহারাজা , জমিদারদের সাথে তারা ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নেয় ।
বাঙালী মুসলমানদের রাজনীতিতে দু’টি ধারার সৃষ্টি , বিকাশ ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলে । একটা মুসলমান জমিদারশ্রেণীর স্বার্থ ও সুবিধার জন্য সংগঠন মুসলিম লীগ – যা তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল । অন্য অংশ জোতদার ও ধনী কৃষক এবং মুসলমান শিক্ষিতশ্রেণীর স্বার্থরক্ষাকারি সংগঠন কৃষক প্রজা পাটি । যারসঙ্গে বাঙলার প্রজা কৃষক , হিন্দু ও মুসলমান--- উভয় অংশের সাধারণ কৃষকরাও যুক্ত হন । যে দলের নেতৃত্ব দেন এ কে ফজলুল হক ।
ফজলুল হক সাহেব পূর্ব বাঙলার বরিশাল জেলার মানুষ । খাঁটি বাঙাল । আইন পাশ করার পর জেলা শহরে তিনি ওকালতি শুরু করেন । এই সময়ে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর বাবা স্যার আশুতােষ মুখার্জীর সাথে তার পরিচয় হয় । মনেহয় পরবর্তীকালে শ্যামা - হক মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে তার এই পূর্ব পরিচয় কাজ দেয় । ওকালতি করার সময়েই রাজনীতির সাথে যােগাযােগ হয় । তরুণ বয়সে ১৯০৬ সালে যখন মুসলিম লীগ গঠিত হয় , সেই সভায় তিনি অংশগ্রহণ করেন । এর আগে তিনি মুসলিম এডুকেশনাল কনফারেন্স ( রাজনৈতিক সংগঠন ) -এর সাথেও যুক্ত ছিলেন । পরে তিনি সরকারি চাকরিতে যােগ দেন ; কিন্তু ১৯১২ সালে চাকরি ছেড়ে পুরােপুরি রাজনীতিতে মনােনিবেশ করেন । এই সময়ে মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসাবে ঢাকা থেকে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন । এই কেন্দ্র ছিল উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণীর একটি শক্ত ঘাঁটী এবং এখান থেকে তিনি প্রথমবারের মত একজন মুসলমান প্রতিনিধি নির্বাচিত হন ।
১৯১৬ সালে লক্ষ্মেী চুক্তিতে তিনি স্বাক্ষর করেন এবং ১৯১৭ সালে কংগ্রেস ও সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের যৌথ অধিবেশনে তিনি সভাপতিত্ব করেন । বাঙলার মুসলমান সমাজের জনপ্রিয় যুবনেতা হিসাবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন ।
১৯২৮ সালে ' বেঙ্গল টিনান্সি এ্যাক্ট' পাশ হবার পর জোতদার , প্রজাকৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে ‘কৃষক প্রজা পার্টি' তৈরি হয় । বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের কয়েকজন সদস্য মিলিতভাবে এই পাটি তৈরি করেন । এই কাজে বিশেষ ভূমিকা নেন ফজলুল হক । তিনি পাটির তরফে লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের নেতা নির্বাচিত হন । তমিজউদ্দিন খান পার্টির সচিব হন । এই পার্টিকে এবং লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের প্রতিনিধিদের বাইরে থেকে (৪৬)
সমর্থন ও শক্তি জোগাবার জন্য ১৯২৯ সালে নিখিলবঙ্গ প্রজা সমিতি গঠন করা হয়।
মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত মওলানা আকরম খাঁ ছিলেন বাঙলার বিশেষ পণ্ডিত ব্যক্তি । উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুর অঞ্চলের মানুষ ছিলেন তিনি । সমসাময়িক রাজনীতিতে তার বিশেষ ভূমিকা ছিল । তিনি জনপ্রিয় মােহাম্মদী পত্রিকা , আজাদ পত্রিকাসহ অন্যান্য পত্রিকা প্রকাশ করেন । ইংরেজদের বিরােধিতা করার জন্য ১৯২২ সালে তাকে জেলে আটক রাখা হয়।
'প্রগ্রেসিভ বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল মহমেডান এ্যাসােশিয়েশন' গঠিত হয় ১৯০৫ সালে । আকরম খাঁ এই উদ্যোগে সামিল ছিলেন । কৃষক প্রজা পার্টিকে বাইরে থেকে সমর্থন ও সহযােগিতা করার জন্য যে “নিখিলবঙ্গ প্রজা সমিতি" তৈরি হয় , তার প্রথম সচিব নির্বাচিত হন আকরম খাঁ এবং কয়েকজন সহ - সভাপতির একজন সহ-সভাপতি হন ফজলুল হক । ত্রিশের দশকে কৃষি সম্পর্কিত বিষয়াদি নিয়ে কৃষকদের পক্ষে এই সমিতি উল্লেখযােগ্য ভূমিকা রাখতে সমর্থ হয়। পূর্ববঙ্গের নানা প্রান্তে কৃষকদের প্রায় সব সমিতিগুলিকে এই প্রজা সমিতি ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয় । প্রায় সর্বদলীয় প্রতিষ্ঠান ছিল এই প্রজা সমিতি ।
কংগ্রেস , অকংগ্রেসী , সরকার ঘেষা ও সরকার বিরােধী সব দলের মুসলমান নেতা-কর্মিদের সমাবেশ ছিল এই প্রজা সমিতি।
১৯৩২ সালে সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ ’ ঘােষণা করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ম্যাকডােনাল্ড । যাতে নির্বাচন পদ্ধতি , আসন সংখ্যা ও সংরক্ষণ , পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা ইত্যাদি ঘােষিত হয় । পরে ঐ বছরেই পুনাচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় । এরপর ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইন পাশ হয় । এ সবের ফলে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে যায় এবং সমস্ত মুসলমান নেতৃবৃন্দের আকর্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয় এই 'নিখিলবঙ্গ প্রজা সমিতি ' ।
১৯৩৫ সালেই সমিতির প্রেসিডেন্টের পদটি খালি হয় । সব গ্রুপের নেতারাই ঐ পদটি দখল করার জন্য সক্রিয় হয়ে ওঠেন । মওলানা আকরম খাঁর গ্রুপকে সহায়তা করেন কলকাতার প্রভাবশালী নেতা হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দি ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ । ফজলুল হকের গ্রুপে ছিলেন তুলনামূলক প্রগতিশীল ও শিক্ষিত যুবক নেতৃবৃন্দ — যার এক বড় অংশ ছিলেন কংগ্রেস সমর্থক। এই দ্বন্দ্বের ফলে সমিতি দু'ভাগ হয়ে যায় । ফজলুল হক নিজের গ্রুপের নামকরণ করলেন 'কৃষক প্রজা পাটি' এবং 'নিখিলবঙ্গ প্রজা সমিতির' নেতৃত্ব দিলেন মওলানা আকরম খাঁ । কিন্তু মওলানা সাহেব আর এই সমিতিকে ধরে রাখতে সক্ষম হলেন না । ১৯৩৬ সালে (৪৭)
এই সমিতি ইউনাইটেড মুসলিম পার্টিতে যােগদান করে বিলীন হয়ে যায়।
‘কৃষক প্রজা পাটি’ ক্ষতিপূরণ ছাড়াই জমিদারিপ্রথা বিলােপ করার দাবি তােলে । খাজনা মাফ ও ঋণ রােহিত করার দাবি জানায় । জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে জমিদারদের অগ্রাধিকারের নীতির বিরােধিতা করে, আবওয়াব ও নজরসালামিসহ অন্যান্য স্থানীয় করের বিলােপ এবং ঋণ সালিশী বাের্ড গঠনের দাবি জানায় । প্রজাস্বত্ব আইন , মালিকানা স্বত্ব , সুদের হার ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মত বিষয়গুলির বিরুদ্ধে আইনসভায় কৃষক প্রজা পার্টি ও অন্যান্য দলের মুসলমান কাউন্সিল সদস্যরা একযােগে সংঘবদ্ধ আক্রমণ চালাতে থাকেন । কৃষক প্রজা পার্টি 'চাষী' নাম দিয়ে একটি সাময়িক পত্রিকা প্রকাশ করে । এই পত্রিকা নেতৃবৃন্দের কাজ ও প্রয়াসের খবর গ্রাম বাঙলার কোণে কোণে পৌঁছে দেয় ।
অবস্থাপন্ন কৃষক ও জোতদার , মধ্যবিত্ত মুসলমান , ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী , কেরানী ও সামান্য জমির মালিক এবং হিন্দু-মুসলমান সাধারণ প্রজা কৃষকদের এক বড় অংশ , জমিদার ও সুদখােরদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এই আক্রমণ ও আন্দোলনের ফলে ঐক্যবদ্ধ হন । এই পরিস্থিতিতে জমিদারি পদ্ধতির সুবিধাভােগীরা ; যারা প্রধানতঃ ছিলেন উচ্চবর্ণহিন্দু — তারাও পাল্টা জোটবদ্ধ হতে বাধ্য হন । তারা কৃষকদের সাধারণ দাবি-দাওয়ার আন্দোলনকে সাম্প্রদায়িক রঙে রাঙিয়ে প্রচারের মাধ্যমে আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে থাকেন ।
কিন্তু এই আন্দোলনে নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদের মধ্যকার প্রজা কৃষক , অবস্থাপন্ন কৃষক ও জোতদাররা যােগদান করেন । কৃষক প্রজা পার্টিও মুসলমান জমিদারদের বিরুদ্ধে একইরকম সরব ছিলেন । ফলে ভদ্রলােকশ্রেণীর অপপ্রচার খুব কার্যকরী হয় না ।
ফজলুল হক সাহেব ঢাকার নবাব খাজা নাজিমুদ্দিন এবং জমিদার মহিউদ্দিন ফারুকির বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচারণায় সরকারি অর্থ ব্যয় এবং গরিবদের স্বার্থ উপেক্ষা করার অভিযােগ এনে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন ।
ঢাকার নবাব , মহিউদ্দিন ফারুকি ও অন্যান্য কিছু মুসলমান জমিদারদেরও বড় বড় জমিদারি বিভিন্ন জেলায় বিস্তৃত ছিল । কৃষক প্রজা পাটি তাদের বিরুদ্ধেও তীব্র ভাষায় আক্রমণ করতাে । এই পার্টির কর্মসূচি ও কাজের পদ্ধতি ধর্মভিত্তিক ছিল না । কিন্তু হিন্দু জমিদারশ্রেণী মুসলমানদের নেতৃত্বে এই আন্দোলনকে সাম্প্রদায়িক ক্রিয়াকলাপ বলে প্রচার করতাে । এই সময়ে ১৯২৮ সালে যশাের জেলার নড়াইলে এক বড় হিন্দু জমিদারের বিরুদ্ধে মুসলমান এবং নমঃশূদ্র বর্গাদাররা তেভাগার দাবিতে আন্দোলন শুরু করলে বাঙলার কংগ্রেস
(৪৮)
ঘটনাটিকে নেহাতই সাম্প্রদায়িক ঘটনা বলে প্রচার করে। জমিদার হিন্দু এবং প্রজা মুসলমান হলে জমিদার ও প্রজাদের যে কোন বিরােধকে সাম্প্রদায়িক রঙে রঞ্জিত করা হতে থাকে । এ ধরনের বহু ঘটনা ঘটে । ঐ সময়ে মুসলমান স্বেচ্ছাসেবকেরা একটি ছাপানাে ঘােষণাপত্র বিলি করেন – যার মূল বক্তব্য হলাে , কৃষকেরা দেশ ও দেশের সম্পদের মালিক না হওয়া পর্যন্ত শান্তি আসবে না । ' – এরফলে স্থানীয় উচ্চবর্ণ হিন্দু ও ভদ্রলােকেরা যারপর নাই উত্তেজিত হন ।
কৃষক প্রজা পার্টির উত্থানে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অবস্থা সঙ্গীন হয়ে পড়ে । এ অবস্থায় তরুণ যুবক হাসান ইস্পাহানী ও অন্যান্যদের উদ্যোগে ১৯৩২ সালে কলকাতায় ‘ নিউ মুসলিম মজলিশ ’ নামে এক পার্টি তৈরি হয় । ইস্পাহানীরা ধনী ব্যবসায়ী । হাসান ইস্পাহানী কেমব্রিজে পড়া উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন এবং কলকাতা কর্পোরেশনের সদস্যও নির্বাচিত হন ।
এই রাজনৈতিক টানাপােড়েনের মধ্যে ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইন প্রবর্তিত হবার পর প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘােষণা হয় । ঢাকার নবাব হবিবুল্লাহর উদ্যোগে ১৯৩৬ সালে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচীর ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য একটি নতুন মুসলমান পার্টি গঠন করার সিদ্ধান্ত হয় । প্রাদেশিক মুসলিম লীগের বিকল্প হিসাবে এই দল গঠন করার সিদ্ধান্ত হয় । নবাবের কলকাতার বাড়িতে অনুষ্ঠিত সভায় ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি গঠিত হয় । দলের প্রেসিডেন্ট হন নবাব সাহেব নিজে । ভাইস প্রেসিডেন্ট হন জলপাইগুড়ি জেলার অন্য নবাব মােশাররফ হােসেন । সেক্রেটারি করা হয় হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দিকে এবং কোষাধ্যক্ষ হন হাসান ইস্পাহানী। প্রকৃতপক্ষে এই দলের মাধ্যমে বাঙলার অধিকাংশ ক্ষমতাশালী ও বিখ্যাত মুসলমান পরিবারগুলির মধ্যে এক ঐক্য গড়ে তােলা হয় ।
উচ্চশিক্ষিত হােসেন সােহরাওয়ার্দি খেলাফত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে আসেন । হাসান ইস্পাহানীও তাই । খেলাফত আন্দোলনে মহাত্মা গান্ধীরও সমর্থন ও অংশগ্রহণ ছিল । ১৯২৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে বাংলা চুক্তি হয় । এই চুক্তি সম্পাদনের পর সােহরাওয়ার্দি দেশবন্ধুর স্বরাজ্য পাটিতে যােগদান করেন এবং কলকাতা কর্পোরেশনের ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হন । ১৯২৫ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পর এবং ১৯২৬ সালে কলকাতা দাঙ্গার পর তিনি স্বরাজ্য পার্টির সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেন । তিনি কলকাতায় শ্রমিকদের সংগঠিত করেন এবং অনেকগুলি ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন গড়ে তােলেন ।
ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি ’ মূলতঃ শহরবাসী বড়লােক ও জমিদারদের সৃষ্টি করা পার্টি । এই সময়ে মওলানা আকরম খাঁ তার নিখিলবঙ্গ প্রজা সমিতি
(৪৯)
নিয়ে এই পার্টিতে যােগদান করেন । ফলে গ্রামেও ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির ভিত্তি সম্প্রসারিত হবার সুযােগ সৃষ্টি হয় ।
১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রাক্কালে ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির তরফে ফজলুল হক সাহেবের কাছে প্রস্তাব পাঠানাে হয় । প্রস্তাবে বলা হয় – সবাই মিলে যেন ইউনাইটেড পার্টির টিকিটে নির্বাচনী লড়াই করা হয়। এই পার্টির হয়ে নির্বাচনে লড়াই করার জন্য টাকার সমস্যা ছিল না । কিন্তু ফজলুল হক তাতে রাজি হননি । নিজের শক্তিতে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি এবং নবাবদের প্রভাবিত জেলাগুলিতে প্রচারে জোর দেন । এই নির্বাচনী লড়াইকে তিনি জমিদারদের সাথে কৃষকদের সর্বাত্বক সংগ্রাম হিসাবে আখ্যায়িত করেন ।
ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি ’ বিপাকে পড়ে ইস্পাহানীর মাধ্যমে মােহম্মদ আলি জিন্নাহর সাথে যােগাযােগ করেন। ১৯৩৬ সালের আগস্ট মাসে জিন্নাহ বাঙলায় আসেন । বাঙলায় মুসলিম লীগের নেতৃত্ব সম্পদশালী ও পরিচিত মুসলিম পরিবারগুলির হাতে থাকবে , এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ইউনাইটেড মুসলিম পার্টিকে মুসলিম লীগের সাথে মিশিয়ে দেবার পরামর্শ দেন । এভাবে বাঙলায় জিন্নাহ মুসলিম লীগকে ফের পুনর্গঠিত করেন ।
কংগ্রেস দলটি ছিল চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে সুবিধাপ্রাপ্ত জমি মালিক এবং ঐ বন্দোবস্তের জন্য সুবিধাপ্রাপ্ত লােকজনের সমষ্টিকে নিয়ে । স্কুলশিক্ষক , কর্মচারী , উকিল এবং ছাত্ররা কংগ্রেস দলের সাথে ছিলেন । — যারা জমিদার , নায়েব , গােমস্তা ও তাদের আত্মীয়স্বজন পরিবারগুলি থেকে এসেছিলেন । বাঙলায় কংগ্রেস দলটি ছিল মূলতঃ এইসব ভদ্রলােকদের পার্টি । চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পর বেঙ্গল কংগ্রেসে দলাদলি বেড়ে যায় এবং ত্রিশের দশকের শুরু থেকে দলটি শহর ভিত্তিক দলে পরিণত হয় । গ্রাম - বাংলায় কৃষক প্রজা পার্টির দাপটও কংগ্রেসকে কোণঠাসা করে দেয় । তবে ভূমি সম্পর্কিত স্বার্থের সাথে এই দলের সম্পর্ক বর্তমান ছিল । দলের অধিকাংশ নেতা-কর্মীরা ছিলেন অনুপস্থিত ছােট-বড় জমিদার । মফঃস্বল এলাকায় তাদের অনেক এস্টেট ছিল এবং সেখান থেকে খাজনা আদায়ের স্বার্থ ছিল তাদের – যদিও তারা বসবাস করতেন শহরাঞ্চলে । কংগ্রেস দলটি চলতাে এইসব জমির মালিক ও সুদখাের ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপােষকতায় । কংগ্রেস দলটির এই নির্ভরশীলতার জন্য দলটি রক্ষণশীলতা ও প্রতিক্রিয়াশীল ধ্যানধারণার বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেনি ।
বৃটিশ শাসনের শেষ অর্ধশত বছর বাঙলার রাজনীতিতে সাধারণভাবে মুসলমানদের দাবি ও ভূমিকা ছিল ন্যায্য এবং গণতান্ত্রিক । প্রজা কৃষক হিসাবে
(৫০)
সমস্বার্থে দলিত হিন্দুদের একাংশ সে কারণেই মুসলমানদের সাথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে সামিল হন ।
বাঙলার মুসলমানদের মধ্যে যেমন কৃষক প্রজা পার্টির তুলনামূলক প্রগতিশীল ভূমিকার সাথে মুসলিম লীগের দ্বন্দ্ব সংঘাত চলতে থাকে । তেমনি অন্যদিকে হিন্দুদের মধ্যেও দুই রাজনৈতিক শক্তির টানাপােড়েন বিদ্যমান ছিল । একটি কংগ্রেসের নেতৃত্বে রক্ষণশীল-প্রতিক্রিয়াশীল ধারা এবং অন্যটি তুলনায় আরও বেশি কট্টর সাম্প্রদায়িক-প্রতিক্রিয়াশীল পাটি হিন্দু মহাসভা । হিন্দু ভােটারদের মন জয় করার প্রতিযােগিতায় কংগ্রেস ক্রমেই বেশি হিন্দুত্ববাদী অবস্থান গ্রহণ করে এবং বেশি বেশি সাম্প্রদায়িকতার পাঁকে ডুবতে থাকে । তাদের অধঃপতনের ইতিহাস নিয়ে এই প্রবন্ধে আমরা পরে আলােচনা করবাে ।
দলিত বা তফসিলীশ্রেণীর মধ্যে অপর একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ধারা কাজ শুরু করে গুরুচাঁদ ঠাকুরের সময়কাল থেকে । বিশেষ করে ১৯২৩ সালকে চিহ্নিত করা যায় , যখন গুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে খুলনায় নমঃশূদ্রদের এক বিশাল রাজনৈতিক সম্মেলন হয় । এই সম্মেলনের ফসল মহাপ্রাণ যােগেন্দ্রনাথ মণ্ডল , মুকুন্দবিহারি মল্লিক , নিরােদবিহারি মল্লিক , ভীষ্মদেব দাস , রসিকলাল বিশ্বাস , প্রমথরঞ্জন ঠাকুর প্রমুখ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উত্থান । বাংলার রাজনীতিতে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন ঠিকই ; তবে নানা বাস্তব প্রতিবন্ধকতার জন্য এই ধারা খুব শক্তিশালী রাজনৈতিক ছাপ ফেলতে পারেনি ।
(৫১)
চতুর্থ অধ্যায়
অস্পৃশ্য ও আদিবাসীদের হিন্দুকরণ
ভারতবর্ষে প্রথম জনগণনার কাজ শুরু হয় ১৮৯১ সালে । জনগণনায় অস্পৃশ্যশ্ৰেণীকে হিন্দু হিসাবে গণনা না করে অস্পৃশ্য হিসাবে আলাদা গণনা করা হতে থাকে। কিন্তু অস্পৃশ্যদের দাবি ছিল যে , তারা সম্মানীয় হিন্দু , বিশেষ করে চণ্ডালরা ( নমঃশূদ্র ) এই দাবি করেন। কিন্তু তাঁদের সে দাবি স্বীকার করা হয় না মূলতঃ উচ্চবর্ণহিন্দুদের আপত্তির কারণে ।
এই জনগণনা শুরু হবার ২১ বছর আগের একটি ঘটনার কথা বহুল প্রচারিত । ১৮৭০ সালে পূর্ববঙ্গের একজন চণ্ডাল মাতব্বরের বাড়িতে উচ্চবর্ণহিন্দুরা খাওয়ার নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন । তাদের দাবি – হিন্দু শাস্ত্রীয় নির্দেশ অনুসারে একজন চণ্ডাল এ আশা করতে পারে না । অর্থাৎ উচ্চবর্ণহিন্দুরা একজন চণ্ডালের বাড়িতে নিমন্ত্রণরক্ষা করবেন , এ আশা কোন চণ্ডাল করতে পারে না । উচ্চবর্ণহিন্দুদের এই সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক ও অন্যায় ঘােষণা করে চণ্ডালরা তাদের সাথে সবরকম সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা ঘােষণা করেন।
চণ্ডালরা ব্রাহ্মণ মর্যাদার দাবিতে দীর্ঘ সংগ্রাম করেন । পৈতাপরা শুরু করেন । সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করেন । উচ্চবর্ণহিন্দুদের মাঠে কাজ করা , চাষ করা , ঘর ছাওয়া--- সব কিছুই বয়কট করেন । চণ্ডাল মহিলাদের হাটবাজারে যাওয়া বন্ধ করেন । ১৮৭৩ সাল পর্যন্ত এই আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয় ।
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার ১৮৭৩ সালের ১৮ ই মার্চ লেখেন , “ চণ্ডালদের প্রচেষ্টা হিন্দুদের মধ্যে সামাজিক মাপে নিজেদের উন্নীত করা "। ঐ বছরের ৮ এপ্রিল ফরিদপুরের জেলাশাসক ঢাকা বিভাগের কমিশনারকে লেখেন , “মাঠগুলি অনাবাদী পড়ে আছে , ঘরগুলি ছাওয়া হয়নি । আর কোন চণ্ডালদের দেখা যায় না হিন্দু বা মুসলমানদের কাজে অথবা বাজারে কোন চণ্ডাল নারীকে দেখা যায় না "।
যশাের জেলার মনিরামপুর , অভয়নগর , কেশবপুর থানা এবং খুলনা জেলার
(৫২)
ডুমুরিয়া , ফুলতলা থানার অন্তর্গত বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মধ্যকার ৯৬ টি গ্রামের সমষ্টি হলো ছিয়ানব্বই গ্রাম । একচেটিয়া নমঃশূদ্রদের বাস । কেন্দ্রস্থল হলাে মশিয়াহাটী । এই অঞ্চলের প্রখ্যাত মাতব্বর রাইচরণ মহালদার ১৯০৫-০৭ সময়কালে নির্দেশ দেন :
১)ব্রাহ্মণ ভিন্ন অন্য কোনাে হিন্দুর গৃহে চণ্ডালরা রান্না করা খাদ্য গ্রহণ করিবে না ।
২) ব্রাহ্মণ ভিন্ন অন্য কোনাে লােক চণ্ডাল গৃহে অতিথি হইলে তাহাকে চণ্ডালদের কর্তৃক রান্না করা খাদ্য গ্রহণ করিতে হইবে ; অন্যথায় অনাহারে থাকিতে হইবে ।
৩) বর্ণহিন্দুর গৃহে অনুষ্ঠিত পূজা পার্বণে চণ্ডালরা যােগ দিতে পারিবে না।
৪) বর্ণহিন্দু কর্তৃক প্রস্তুত মিষ্টান্ন চণ্ডালরা গ্রহণ করিবে না ।
৫) শহরের হােটেলে অসম্মানের মধ্যে তাহারা আহার করিবে না ।
৬) প্রয়ােজন হইলে সামাজিক সম্মান আদায়ের জন্য উচ্চবর্ণহিন্দু সমাজের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অসহযােগিতার নীতি অবলম্বন করিতে হইবে ।।
৭) উচ্চবর্ণহিন্দুর গৃহে কেহ ভৃত্যের কাজ করিবে না ।
৮) সন্তানকে বাধ্যতামূলকভাবে স্কুলে পাঠাইতে হইবে ।
পশ্চিমবঙ্গের সমৃদ্ধ কৃষক সম্প্রদায় চাষি কৈবর্তরা মাহিষ্য নাম ও মর্যাদা দাবি করেন । প্রায় একই সময়ে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলির জমির মালিক রাজবংশী সম্প্রদায় ব্রাত্য কায়স্থ মর্যাদা দাবি করেন এবং পৈতা ধারণ শুরু করেন । নাথ সম্প্রদায়ও অধিক মর্যাদার দাবি করেন এবং পৈতা ধারণ করেন ।
উচ্চবর্ণহিন্দুরা নিম্নশ্রেণীর মানুষের এই সামাজিক মর্যাদার দাবি মানতে কোনভাবেই রাজি হননি ; বরং এর ফলে উচ্চবর্ণের মানুষ ক্রুদ্ধ হন । পরবর্তীকালে চণ্ডালরা কায়স্থ মর্যাদা দাবি করলে কায়স্থরা দৃঢ়তার সাথে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন । ফলে , চণ্ডালরা কায়স্থদের বয়কট করেন । এই সময়ে সম্ভ্রান্ত হিন্দুরা মুসলমানদের কাছ থেকে দুধ কিনতে পছন্দ করতেন ; কারণ গােয়ালাদের বৈশ্য মর্যাদার দাবি তাদের পক্ষে হজম করা কঠিন হয় ।
বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে এইসব আন্দোলনকে উচ্চবর্ণীয় হিন্দুদের কাছে অসহ্য বলে মনে হয় । স্বামী বিবেকানন্দ কিন্তু এই সময়ে বর্ণপ্রথার পক্ষে সওয়াল করেন ।
কিন্তু ধীরে ধীরে বাঙলার রাজনীতিতে মুসলমানদের উত্থানের ফলে ১৯২০ এর দশকের মাঝামাঝি থেকে কয়েকজন উচ্চবর্ণ হিন্দুনেতা হিন্দু রাজনৈতিক
(৫৩)
সম্প্রদায় সৃষ্টির প্রয়ােজনীয়তার গুরুত্ব অনুভব করেন । এখানে মনে রাখতে হবে যে, মহাত্মা গান্ধী ১৯১৯ সালে সক্রিয়ভাবে কংগ্রেস রাজনীতিতে যােগদান করেন ও হরিজনদের নিয়ে রাজনীতি শুরু করেন । এই হিন্দু ঐক্যের অনুভূতি উচ্চবর্গীয়দের সংসদীয় রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সংখ্যালঘিষ্ঠতার দরুণ অসহায়তা ও আশু প্রয়ােজনবােধের বহিঃপ্রকাশ । মুসলমানদের দিক থেকে আসা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মােকাবিলায় সংখ্যাভারী অস্পৃশ্য ও নীচুজাতের অন্যান্য হিন্দুদের ব্যবহার করার কৌশল । মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির আলােকে উদ্ভাসিত হয়ে তারা এই কুপ্রথা ডিঙোতে চাননি । বর্ণাশ্রমপ্রথা তারা কখনওই বিলােপ করতে চাননি । আজকে যারা হিন্দু ঐক্যের ডাক দিচ্ছেন , তারাও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার জন্যই এই ঐক্যের ডাক দিচ্ছেন । নিম্নবর্ণীয়দের ব্যবহার করাই তাদের লক্ষ্য । লক্ষ্য করার বিষয় – আজও যারা হিন্দুঐক্যের ডাক দিচ্ছেন , তারা বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে একটি কথাও বলছেন না ।
সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে মহাত্মা গান্ধী ১৯১৯ সালে কংগ্রেসে যােগদান করে অস্পৃশ্যদের ধোঁকা দিয়ে কংগ্রেসের দিকে টেনে নেবার কৌশল নেন । ড .আম্বেদকরের অসাধারণ নেতৃত্বের ফলে তার সে প্রচেষ্টা বার বার ধাক্কা খেতে থাকে । বাংলায় অস্পৃশ্যদের সমর্থনলাভের আশায় ‘হিন্দুসভা আন্দোলন' নামে একটি সংগঠন গড়ে তােলা হয় । ১৯৩০-৩১ সালে এই আন্দোলন গড়ে ওঠে । এই সময়কালে ১৯২৫ সালে মালদার একজন কংগ্রেস নেতা কাশীশ্বর চক্রবর্তী 'সত্যম শিবম দল' গঠন করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল সাঁওতালদের হিন্দুধর্মের অন্তর্ভুক্ত করা । মালদায় যথেষ্ট সংখ্যক সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন বহু বছর ধরে । তাই , চক্রবর্তী মহাশয় তাদের হিন্দু বলে দলে টেনে সংখ্যাভারী করার চেষ্টা করেন । নমঃশূদ্রদের দলে টানার জন্য মুন্সিগঞ্জে একটি কালীমন্দিরে নমঃশূদ্রদের প্রবেশাধিকারের দাবি নিয়ে স্থানীয় কংগ্রেস স্বেচ্ছাসেবীরা সত্যাগ্রহ করেন ১৯২৯ সালে । —এসব চলতে থাকে । এই সময়কালে পূর্ববঙ্গে গুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে এবং দেশের পশ্চিমাঞ্চলে ড .আম্বেদকরের নেতৃত্বে অস্পৃশ্যদের মধ্যে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতায় অংশীদারির ভাবনা ও আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে – যা উচ্চবর্ণ হিন্দুদের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে ওঠে । পাঞ্জাব , মাদ্রাজ এবং যুক্ত প্রদেশেও এই আন্দোলন গড়ে ওঠে ।
ব্রিটিশ সরকারও এই সময়ে নিম্নশ্রেণীর দাবি ও আন্দোলনকে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের জন্য সংরক্ষিত এলাকা ও পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার কথা ভাবতে থাকে । আর মুসলমান রাজনীতিক ও ইসলাম ধর্ম প্রচারকেরাও সুযােগের সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা করেন । তারা হিন্দুধর্মের বর্ণাশ্রম প্রথা ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে নিম্নশ্রেণীর
(৫৪)
হিন্দুদের উচ্চবর্ণহিন্দু রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি আনুগত্য পরিত্যাগ করতে প্ররােচিত করতে থাকে এবং ইসলামে ধর্মান্তরিত হবার জন্য তাদের কাছে আহ্বান জানাতে থাকেন । এসব চ্যালেঞ্জের মােকাবিলা করার জন্য লােকগণনায় যে বর্ণহিন্দুরা এতকাল নিম্নশ্রেণীর হিন্দুদের থেকে নিজেদের পৃথকভাবে গণনার জন্য বিশেষভাবে উৎসাহী ছিলেন , তারা ১৯৩১ সালের লােকগণনায় অস্পৃশ্যদের , হিন্দুদের মধ্যে গণনা করার জন্য উঠেপড়ে লেগে যান ।
১৯৩২ সালে সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ ঘােষণার ঠিক আগে এবং পরে বাঙলার নিম্নশ্রেণীর হিন্দুদের সংঘবদ্ধ করার জন্য আরও বিস্তৃত কর্মসূচী নেওয়া হয় । গােলটেবিল বৈঠকে যেভাবে হিন্দু , মুসলমান , শিখ , খৃষ্টান , এ্যাংলাে ইন্ডিয়ান , ইউরােপীয় এবং ড . আম্বেদকরের নেতৃত্বে অস্পৃশ্যদের জন্য সংখ্যানুপাতিক অধিকার এবং প্রতিনিধিত্বের দাবি ওঠে ; তাতে উচ্চবর্ণহিন্দুরা প্রমাদ গুণতে শুরু করেন । তাই , প্রধানতঃ ‘ হিন্দুসভা ’ এবং 'হিন্দু মহাসভা' অস্পৃশ্য ও আদিবাসীদের হিন্দু বানানাের জন্য উঠেপড়ে লেগে যায়। উচ্চবর্ণহিন্দুরা যেসব ভাল নাম গ্রহণ করেন , ১৯৩১ সালে হিন্দু মহাসভা আদিবাসীদেরও ঐসব নাম ব্যবহারের জন্য অনুমতি দানের কথা ঘােষণা করে । বাঙলা , আসাম এবং বিহার অঞ্চলের বিভিন্ন আদিবাসী গােষ্ঠীর নাম ১৯২১ সালের লােকগণনায় হিন্দু হিসাবে উল্লেখ না করায় , হিন্দু মহাসভা প্রচারপত্রের মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ প্রচার করে এবং এই কাজকে অন্যায় হিসাবে অভিহিত করে । প্রচারপত্রে বলা হয় , “ সরল ও ধার্মিক ভ্রাতা-ভগ্নিদের প্রতি অন্যায় করা হয়েছে এবং আশা করা হয় – ১৯৩১ সালের লােকগণনায় এই ভুল (!) সংশােধন করা হবে । তারা প্রস্তাব করে যে , ১৯৩১ সালের লােকগণনায় আদিবাসীদের ধর্ম হিন্দু এবং জাতিতে ‘ক্ষত্রিয়' হিসাবে লেখা হােক ; আর পদবী ঠিক হােক 'সিংহ' ।
আদিবাসীদের বিভ্রান্ত করে ফাঁদে ফেলতে এইসব প্রচার কাজ দেয় । সাভারকার ৫ জন সাঁওতাল ছেলেকে মালা পরিয়ে হিন্দুধর্মে বরণ করে নেন । অমৃতবাজার পত্রিকা উৎসাহের সাথে এসব খবর প্রকাশ করতে থাকে। এযেন এক উলট পুরাণকাহিনী ।
১৯৪১ সালের লােক গণনার সময় আদিবাসী এবং অস্পৃশ্যদের নিয়ে দড়ি টানাটানি আরও বৃদ্ধি পায় । বাঁকুড়া জেলায় হিন্দু মহাসভা যখন সাঁওতালদের ও অন্যান্য আদিবাসীদের হিন্দুদের মধ্যে নাম লেখাতে আপ্রাণ পরিশ্রম করতে থাকে ; তখন মুসলিম লীগ তাদের আদিবাসী হিসাবে নাম রেকর্ড করাতে উৎসাহিত করে । বাঁকুড়ায় সাঁওতাল ও অন্যান্যদের হিন্দু হিসাবে নাম রেকর্ডের জন্য উৎসাহিত
(৫৫)
করতে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে দিয়ে কয়েকটি জনসভায় বক্তৃতা করানাে হয় । যদিও বিশ্বযুদ্ধের কারণে শেষ পর্যন্ত এই জনগণনা হয় না।
সাঁওতালদের ১৯৩০-৩১ সালে (ST-র বদলে) ক্ষত্রিয় বানানাে সম্ভব হলে , তাদের যে আজ আরও করুণ দশা হতাে – তা সহজেই অনুমান করা যায় । আসামের সাঁওতাল ও অন্যান্য আদিবাসীরা এখন ওবিসি তালিকাভুক্ত হয়ে খুবই অসুবিধায় পড়েছেন।
মালদা জেলায় মুসলমান জোতদারের সংখ্যা ভালই ছিল । হিন্দুমহাসভার কর্মীরা সাঁওতাল , তুরী ও রাজবংশীদের মুসলমানদের অধীনে ও জমিতে কাজ না করার জন্য প্ররােচিত করে এবং বিরত রাখে।
রাজশাহীতে সরস্বতী পূজা উপলক্ষে হিন্দু - মুসলমানের মধ্যে উত্তেজনা হয় — প্রায় দু’হাজার সাঁওতালকে টাঙ্গি , বল্লম , তীর - ধনুক নিয়ে উত্তেজনার মিছিলে সামিল করা হয়।
যশাের জেলায় একজন নমঃশূদ্র সময়মত খাজনা দিতে না পারায় উচ্চবর্ণ হিন্দুজমিদার তার জমি কেড়ে নেন । কিন্তু সেই জমি অন্য কোন নমঃশূদ্র প্রজাকে বন্দোবস্ত না দিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণােদিতভাবে একজন মুসলমান প্রজাকে বন্দোবস্ত দেওয়া হয় এবং এই ঘটনা নিয়ে নমঃশূদ্র এবং মুসলমানের মধ্যে দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেওয়া হয় । ২ জন মানুষ ঐ দাঙ্গা-কাজিয়ায় মারা যান।
বর্ধমানের কুলটিতে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হয় । পুলিশের গুলিতে ৪ জন তফসিলীশ্রেণীর হিন্দু মারা যান । ঢাকা শহরে হিন্দু দাঙ্গাকারীরা ছিলেন মূলতঃ গােয়ালারা ।
খুলনায় নমঃশূদ্র এবং মুসলমানদের মধ্যে ভয়ংকর দাঙ্গা হয় । অনেক লােক হতাহত হন । উভয় সম্প্রদায়ের একটি করে মােট দুটি বড় গ্রাম সম্পূর্ণ ভস্মিভূত হয় ।
নােয়াখালির ভয়াবহ দাঙ্গায় নমঃশূদ্রদেরও জড়িয়ে নেওয়া হয় । ঐ জেলার রায়গঞ্জ থানার চণ্ডীপুরের ১০১ টি দরিদ্র নমঃশূদ্র পরিবার সাংঘাতিক ক্ষতিগ্রস্ত হন । – এসব চলতে থাকে ।
হিন্দু ধর্মযােদ্ধাদের অগ্রবর্তী দল হিসাবে নিম্নশ্রেণীর হিন্দু এবং আদিবাসীদের ব্যবহার করা হয় । প্রতিটি গণ্ডগােল এবং দাঙ্গায় কলকাতার ভদ্রলােকশ্রেণীর লােকেরা নিম্নশ্রেণীর লােকজনকে উত্তেজিত করেন এবং সাহস জোগান । মাড়ােয়ারিরা ভদ্রলােকশ্রেণীকে প্রয়ােজনীয় অর্থের জোগান দেন ।
এভাবে মুসলমানদের সাথে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করে হিন্দুধর্মে নতুন প্রবেশাধিকার পাওয়া নমঃশূদ্র , আদিবাসী ও অন্যান্য নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরা , হিন্দুধর্মের প্রতি তাদের আনুগত্য , বশ্যতা এবং কৃতজ্ঞতার প্রমাণ দিতে থাকেন। উত্তেজনার এই আবহাওয়ায় নীচুজাতের হিন্দুরা আবেদন জানাতে থাকেন – যাতে উচ্চবর্ণহিন্দুরা তাদের অস্পৃশ্য হিসাবে গণ্য না করেন এবং তাদের কাছ থেকে খাবার খেতে রাজি হন ! কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ ও জাতিভেদ প্রথার আমূল পরিবর্তনের
(৫৬)
কোন ইচ্ছা, কর্মসূচী ও আদর্শ , উচ্চবর্ণহিন্দুদের ছিল না এবং আজও নেই । যে কারণে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসের এক সমীক্ষায় দেখা যায় – বাঙলার অধিকাংশ ব্রাহ্মণ পরিবার অন্দরে (খাবার ঘর ও মন্দিরে) আজও অস্পৃশ্যতা অনুশীলন করেন ।
অস্পৃশ্য ও অন্যান্য নিম্নশ্রেণীর এই দাসসুলভ মনােবৃত্তির আবহে ব্যতিক্রম ঘটনাও ছিল – কিন্তু সে নিতান্তই ব্যতিক্রম । যশাের জেলার রাণাঘাটের (এখন নদিয়া) নগেন দাস নামে এক তফসিলীশ্রেণীর উকিল নিজের সম্প্রদায়ের এই দাস মনােভাবে ক্রুদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ হিসাবে গরুর মাংসের দোকান খােলার জন্য পৌরসভায় আবেদন করেন ।
'সত্যম শিবম' দলের প্রচারে প্রভাবিত হয়ে মালদায় যেসব সাঁওতালরা হিন্দু হতে বিশেষ উৎসাহ দেখান , তাদের নেতা ছিলেন জিতু সাঁওতাল । তিনি সাঁওতালদের অপবিত্র শুকর ও মুরগীর মাংস খাওয়া ত্যাগ কোরে শুদ্ধি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পবিত্র হয়ে হিন্দু হবার জন্য প্রচার চালান । এমনকি তাদের পােষা শুকর ও মুরগী মেরে ফেলার জন্যও সাঁওতালদের উৎসাহিত করেন । তার দলবল অস্পৃশ্যদের সম্পর্কে অবজ্ঞাসূচক ভাষাও ব্যবহার করতে থাকেন । ক্রমে এই আন্দোলনকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘুরিয়ে দেওয়া হয় । ১৯৩২ সালে জিতু সাঁওতাল ও তার সমর্থকরা আদিনা মসজিদে আক্রমণ চালান এবং সেখানে কালী উপাসনার চেষ্টা করেন । এই সময়ে পুলিশের গুলিতে তার মৃত্যু হয় ।
'হিন্দু সভার' প্রচার আন্দোলনে শিক্ষিত, বিজ্ঞজন এবং রাজবংশীদের পথিকৃৎ নেতা পঞ্চানন বর্মণের মত লােকজনও বিভ্রান্ত হন । হিন্দু ঐক্যের শ্লোগানে প্রভাবিত হয়ে তিনি ১৯৩৩ সালে কাউন্সিলে উত্থাপিত আনটাচাবিলিটি এ্যাবােলিশন বিলের ( অস্পৃশ্যতা বিলােপ বিল ) বিরােধিতা করেন ( এই বিল নিয়ে লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে বিতর্ক , হােম পলিটিক্যাল ফাইল নং ৫০/৭/৩৩ ) । তিনি যুক্তি দেখান যে , বিলের উদ্দেশ্য নিয়ে তার যথেষ্ট সহানুভূতি থাকলেও , তিনি মনে করেন - কোন ব্যক্তি বা কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অধিকার নিয়ে বিরােধ বন্ধ করতে হবে । ... এ ধরনের ব্যবস্থা হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভক্তি ও অসন্তোষ তৈরি করবে । সম্প্রদায়ের অখণ্ডতা নিশ্চিত করার জন্য এই বিল পরিহার করা উচিত ।
প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করা প্রয়ােজন ১৯৩৩ সালে কেন্দ্রিয় আইনসভায় একজন অস্পৃশ্য মানুষ এম.সি. রাজা এই ‘অস্পৃশ্যতা বিলােপ বিল' উত্থাপন করেন । সেজন্য এই বিল সম্পর্কে মতামতের জন্য বাঙলা লেজিসলেটিভ কাউন্সিলেও আলােচনা হয় – যেখানে পঞ্চানন বর্মন ঐ মতামত ব্যক্ত করেন ।
১৯০০ সালের কাছাকাছি সময়ে পঞ্চানন বর্মন 'ক্ষত্রিয় সভা' প্রতিষ্ঠিত
(৫৭)
করেন এবং রাজবংশীদের মধ্যে ব্রাহ্মণ্যবাদী আচার , আচরণ ও মূল্যবােধ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন । পৈতা ব্যবহার করার আন্দোলন করেন । তার নেতৃত্বে বহু মানুষ দীক্ষাগ্রহণ করেন । দীক্ষার পূর্বে নাপিত দিয়ে চুল কামিয়ে নেন এবং প্রত্যেকে ব্রাহ্মণকে আড়াইটাকা প্রণামী দিয়ে মন্ত্রপাঠ করে পৈতা ধারণ করেন । একই সাথে শুকর ও মুরগীর মাংস খাওয়া এবং পালকি টানা বন্ধ করে দেন ।
পূর্বের ন্যায় এই বর্তমান পর্যায়েও হিন্দুভদ্রলােকদের সারিতে জায়গা পাবার আশায় নমঃশূদ্ররাও ভদ্র হবার দৌড় শুরু করেন । যশাের জেলার নমঃশূদ্র অধ্যুষিত ছিয়ানব্বই অঞ্চলের প্রখ্যাত মাতব্বর রাইচরণ মহালদারের নেতৃত্বে শিক্ষা আন্দোলন ও স্কুল প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে শুকর ও মুরগীর মাংস না খাওয়া এবং না পােষার আন্দোলনও হয়।
১৮৯১ সাল থেকে পৌন্ড্র সমাজে বেণীমাধব হালদার , শ্ৰীমন্তবাবু , মহাত্মা রাইচরণ সরদার , মহেন্দ্রনাথ করণ , রায়বাহাদুর অনুকূল চন্দ্র দাস প্রমুখের নেতৃত্বে ক্ষত্রিয় মর্যাদা লাভের আন্দোলন ও শিক্ষা আন্দোলন পরিচালিত হয় ।
ভুইমালী সম্প্রদায়ের সমাজ সেবক দামােদর দাস অন্ত্যজ মানুষের প্রগতির জন্য অসাধারণ ভূমিকা রাখেন । মহেন্দ্রনাথ দাস , গগণচন্দ্র বিশ্বাস প্রমুখ নেতৃবৃন্দ কৈবর্ত্যদের নাম পরিবর্তন করে মাহিষ্য নাম গ্রহণ করার জন্য সংগ্রাম করেন ।
জাতে ওঠার এই আন্দোলনের সাথে সমাজে শিক্ষা - সংস্কৃতি ও প্রগতির জন্যও তারা লড়াই করেন – যার কিছু উল্লেখ আগেই করা হয়েছে ।
এই "অস্পৃশ্যতা বিলােপ বিল" উত্থাপিত হলে কেন্দ্রিয় আইন সভায় বাঙলার প্রত্যেকজন হিন্দু সদস্য ঐ বিলের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন । পণ্ডিত সত্যেন্দ্রনাথ সেন মনে করেন যে , “ .... বৈবাহিক বিধানের গুরুতর লংঘণই হলাে অস্পৃশ্যদের উৎপত্তির মূল বৈশিষ্ট্য ... ( এবং ) তাদের পেশা , তাদের আচার - আচরণ ও তাদের সংস্কৃতির জন্য তারা কখনও বর্ণ হিন্দুদের সমপর্যায়ে আসতে পারেন না"। সাংসদ অমরনাথ দত্ত ঘােষণা করেন , “এই লােকগুলি আগে অধিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হােক , অধিক পবিত্র হােক এবং জীবনের উত্তম আদর্শ লালন করুক ... তখন আমি তাদের সাথে মেলামেশা করবাে" । বাঙলার প্রতিনিধিত্বকারি ’ ল’মেম্বার বি.এল.মিত্র যুক্তি উপস্থাপন করেন যে , "যেহেতু , কোন সার্বভৌম রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ বর্ণপ্রথা প্রতিষ্ঠিত করেনি ... সেহেতু আইনগত হস্তক্ষেপের অনুমতি দেওয়া উচিত নয়" । সাংসদ বি.পি.সিংহরায় বিলকে প্রত্যাখ্যান করেন , কারণ তা “হিন্দুদের ধর্মীয় অধিকারের উপর সরাসরি অনধিকার প্রবেশ এবং হিন্দু সমাজের ভিত্তিকে অবমূল্যায়ন করার প্রয়াস"। – বিলের বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রতিক্রিয়ায় এম.সি.রাজা
(৫৮)
শ্লেষপূর্ণ মন্তব্য করেন – “এটা বিস্ময়কর ... বিলের বিরােধি মতের অধিকাংশ সদস্য বাঙলা প্রদেশের এবং তারা সচরাচর বলেন যে , বাঙলায় কোন অস্পৃশ্যতা নেই "।
জনমত যাচাইয়ের জন্য পরে ঐ বিল প্রদেশের বিভিন্ন সংগঠনের কাছে পাঠানাে হয় । বাঙলার গর্ভনর ঐ বিষয়ে সব বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা জজ , ৬ জন বিচারক , বিভিন্ন মতবাদের প্রতিনিধিত্বকারি বাঙলার সুপরিচিত ও খ্যাতনামা ৫৬ জন ব্যক্তিত্ব , ১৩ টি বার লাইব্রেরী এবং ২৬ টি স্বীকৃত সমিতি ও ধর্মীয় সংগঠনের লােকেদের সাথে আলােচনা করেন । আলোচনার পর তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে , "বাঙলায় ঐ বিলের বিরুদ্ধে জনমত বিস্ময়করভাবে অধিক প্রবল" (অপিনিয়নস্ অন দি আনটাচাবিলিটি এ্যাবােলিশন বিল নং -১ , ফাইল নং ৫০/৭/৩৩ , উল্লেখ বাঙলা ভাগ হল , জয়া চ্যাটার্জী )।
উচ্চবর্ণহিন্দুরা লাগাতার প্রচার চালিয়ে যান যে , অস্পৃশ্যতা হিন্দুধর্মের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার – এখানে আইনের কোন হস্তক্ষেপ উচিত নয় এবং এর সাথে রাজনীতির কোনরূপ সম্পর্ক জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা ঠিক নয় । কংগ্রেসী নেতারা বলতেন – "উকিলরা কেন ডাক্তারি করছেন না , এ প্রশ্ন কেউ তুলতেই পারেন--- তাতে উকিল নিশ্চয়ই ডাক্তারি করতে ছুটবেন না। কংগ্রেস রাজনৈতিক দল , তার কাজ সমাজসংস্কার করা নয় "। – এভাবে কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা নিন্মবর্ণীয় হিন্দুদের সামাজিক মর্যাদার আকাঙ্খাকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যান ; কিন্তু তাদের ধূর্ত প্রচারে অস্পৃশ্য ও অন্যান্য নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদের একাংশ বিভ্রান্ত হন এবং তাতে ভদ্রলােকদের রাজনৈতিক সমর্থনলাভের অভিসন্ধি অনেকাংশে সফল হয় ।
(৫৯)
পঞ্চম অধ্যায়
সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ
জাতীয় কংগ্রেস , হিন্দু মহাসভা , মুসলিম লীগ প্রভৃতি রাজনৈতিক দলগুলি আইনপরিষদ ও শাসন ব্যবস্থার সংস্কার চায় । তারা আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন এবং ভারতীয়দের বেশি বেশি অধিকার ও গুরুত্ব দাবি করতে থাকে । একইসাথে একের পর এক কৃষক বিদ্রোহ ও আন্দোলন এবং নিম্নশ্রেণীর হিন্দুদের আশা-আকাঙ্খার দাবি – এসবের ফলশ্রুতিতে ব্রিটিশ সরকার ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইন আরেকবার সংস্কার করে । প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থাকে আরও একটু প্রসারিত করে ভারতবাসীর ক্ষোভ প্রশমন এবং তাদের সহযােগিতা পাবার চেষ্টা করে । এই লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকার সাইমন কমিশন , লােথিয়ান কমিটি প্রভৃতি কয়েকটি কমিশন ও কমিটি গঠন করে । তারা ভারতীয় জনগণের বিভিন্ন অংশের মানুষের মতামত ও ইচ্ছা জানার চেষ্টা করেন । তাদের স্মারকলিপি নেন ও সাক্ষ্য গ্রহণ করেন । দেশের বিভিন্ন অংশ , স্তর ও বর্ণের মানুষের প্রতিনিধিদের নিয়ে ১৯৩০ , ১৯৩১ ও ১৯৩২ সালে লণ্ডনে গােলটেবিল বৈঠকের ব্যবস্থা করেন । তারপর ১৯৩২ সালে সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ ঘােষিত হয়, পূণা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ভারত শাসন আইন , ১৯৩৫ ' প্রণীত হয় ।
গােলটেবিল বৈঠকে সাধারণভাবে হিন্দুদের প্রতিনিধি হিসাবে কংগ্রেস , মুসলমান সমাজের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে মুসলিম লীগ , শিখ প্রতিনিধি , খৃষ্টান প্রতিনিধি , এ্যাংলাে ইন্ডিয়ান প্রতিনিধি , নবাব ও রাজা - মহারাজাদের প্রতিনিধি , অস্পৃশ্যদের প্রতিনিধি এবং ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধিবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। মােট ৮৯ জন প্রতিনিধি গােলটেবিল বৈঠক অংশগ্রহণ করেন, যার মধ্যে ব্রিটেনের ৩ টি রাজনৈতিক দলের ১৬ জন প্রতিনিধি ছিলেন ।
৩ বছর জুড়ে সুদীর্ঘ সময় নিয়ে আলােচনা হয় এবং বহু প্রশ্নে ঐকমত্য হয় । কিন্তু ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন সংখ্যালঘু ও দুর্বলতর অংশের প্রতিনিধিত্ব ও স্বার্থ
(৬০)
সম্পর্কিত কিছু বিষয়ে কোনমতেই ঐকমত্য সম্ভব হয় না। এ ব্যাপারে সংখ্যালঘু সাবকমিটি গঠিত হয়েছিল । কয়েকদিন ধরে ঐ কমিটি বার বার বৈঠক করেও ব্যর্থ হয় – বিশেষ করে পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা এবং সংরক্ষণ প্রশ্নে আলােচনায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় । মূলতঃ কংগ্রেস প্রতিনিধিদের সাথে অস্পৃশ্য ও অন্যান্য বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধিবৃন্দের মতপার্থক্য এই বিরােধের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায় ।
সংখ্যালঘু সাবকমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রি ম্যাকডােনাল্ড । ড . আম্বেদকরও এই কমিটির সদস্য ছিলেন । ম্যাকডােনাল্ড কয়েকদিন ধরে সব সদস্যের দাবি , মতামত এবং যুক্তিগুলি শােনেন । শেষ পর্যন্ত অমিমাংসিত বিষয়গুলি সম্পর্কে ইতিমধ্যে হওয়া আলােচনার আলােকে তিনি সিদ্ধান্ত ঘােষণা করবেন বলে কমিটিকে জানিয়ে দেন এবং আলােচনার সমাপ্তি ঘােষণা করেন ।
সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ হলাে ভারতের বিভিন্ন শ্রেণী এবং সম্প্রদায়ের অধিকার , স্বার্থ ও অংশীদারি সম্পর্কে সংখ্যালঘু সাবকমিটির চেয়ারম্যান ম্যাকডােনাল্ড - এর ঘােষণা । ১৯৩২ সালের ১৪ ই আগষ্ট এই রােয়েদাদ ঘােষিত হয় ।
এই ঘােষণায় হিন্দু , মুসলমান , শিখ , এ্যাংলাে ইণ্ডিয়ান , ইউরােপীয় , জমিদার , শ্রমিক , মহিলা , সম্মানিত ব্যক্তি এবং অস্পৃশ্যদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার কথা ঘােষণা করা হয় । অর্থাৎ শুধুমাত্র ঐসব সম্প্রদায় ও শ্রেণীর মানুষের ভােটে তাদের নিজ নিজ প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন । প্রত্যেক সম্প্রদায় এবং শ্রেণীর জন্য আসন সংখ্যা ঘােষিত হয় ও আসন সংরক্ষিত করে দেওয়া হয় । এই রােয়েদাদে ড . আম্বেদকরের দাবি মেনে অস্পৃশ্যদের , হিন্দুদের থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র জনগােষ্ঠী হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং তাদের জন্য আলাদা প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করা হয়।
১৯৩১ সালের লােকগণনা অনুযায়ী বাঙলার মােট জনসংখ্যা ৫ কোটি ১০ লক্ষ । তার মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা ২ কোটি ৭৮ লক্ষ এবং অস্পৃশ্যসহ হিন্দুর সংখ্যা ২ কোটি ২২ লক্ষ । অন্যান্যরা ছিলেন ১০ লক্ষ মানুষ । কিন্তু ১৯৩১ সালের সেন্সাস কমিশন দেখিয়েছেন যে , বাঙলায় অস্পৃশ্যের সংখ্যা মাত্র ৬০ লক্ষ । অথচ ড . আম্বেদকর পরিসংখ্যান পেশ করে দেখিয়েছেন যে , ১৯১১ সালের লােকগণনাতেই বাঙলায় অস্পৃশ্যের সংখ্যা ছিল ৯০ লক্ষ । সে হিসাবে ১৯৩১ সালে তাদের সংখ্যা নিশ্চিতভাবে ১ কোটি ছাড়িয়ে যাবার কথা । কারণ তাদের মধ্যে তুলনায় জন্মহার বেশি । ড , আম্বেদকর রচনাবলি , খণ্ড ২ , পৃ . ৭১৩ - তে আমরা একটা নিশ্চিত তথ্য পাই । তাতে দেখা যাচ্ছে – লােথিয়ান কমিটির ( ১৯৩১-৩২ ) রিপাের্টের ভ্যলুম -২ , পৃ , ২৬৩ - তে বাঙলার অস্পৃশ্যশ্রেণীর সংখ্যা
(৬১)
উল্লেখ করা হয়েছে ১ কোটি ৩ লক্ষ । যদিও পূণা চুক্তিতে তাদের সংখ্যা মাত্র ৭৫ লক্ষ ধরে নিয়ে বা হিসেব করে অস্পৃশ্যদের ভাগ্য নির্ধারণ করা হয় । এখানে উল্লেখ করা প্রয়ােজন যে , লােথিয়ান কমিটি ভােটাধিকার নিয়ে হিসাব ও অনুসন্ধানের কাজ করে । এই বিতর্কে বাঙলার বর্ণহিন্দু নেতৃবৃন্দ ও বিদ্বজনরা দাবি করেন যে , "বাঙলায় অস্পৃশ্যের সংখ্যা বড়জোর ৪ লক্ষ এবং তাদের জন্য ৪ টির বেশি আসন সংরক্ষণ করা যায় না"!
বাঙলার উচ্চবর্ণ হিন্দুরা প্রদেশে হিন্দুর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানাের জন্য অস্পৃশ্য এবং আদিবাসীদের লােক গণনায় হিন্দু হিসাবে নাম লেখানাের যে প্রচার আন্দোলন করেন , তাতে তারা লাভবান হন । অন্ততঃ সেন্সাস কমিশনারের রিপাের্ট দেখে তাই মনে হয় । ভদ্রলােকশ্রেণীর ইংরেজ প্রশাসনেও কিছু প্রভাব ছিল , তারজন্য কিছু কারচুপিও তারা করে থাকতে পারেন ।
দেখা যাচ্ছে ১৯৩১ সালের লােকগণনা অনুযায়ী শতকরা হারের হিসাবে বাঙলার জনসংখ্যার শতকরা ৫৪ ভাগ মুসলমান এবং অস্পৃশ্য সমেত হিন্দু ৪৪ শতাংশ । আবার হিন্দুদের মধ্যে জনগণনা অনুযায়ী শতকরা ৭৩ ভাগ সাধারণ হিন্দু এবং শতকরা ২৭ ভাগ অস্পৃশ্য হিন্দু । ড . আম্বেদকরের দেওয়া তথ্য ধরলে বাঙলার মােট হিন্দুর শতকরা ৪০ ভাগ অস্পৃশ্য হিন্দু । বর্তমানে ২০১১ সালের লােকগণনায় হিন্দু অধ্যুষিত পশ্চিমবঙ্গের মােট হিন্দুর ৪৪ শতাংশ মানুষ তফসিলীশ্রেণীর হিন্দু ( তফসিলীরাই পূর্বের অস্পৃশ্য ) । তাই , কোন সন্দেহ থাকে না যে , ১৯৩১ সালে ড . আম্বেদকরের পেশ করা সংখ্যা ঠিক ছিল বা তাঁর হিসাব থেকেও অস্পৃশ্যদের প্রকৃত সংখ্যা সামান্য বেশি ছিল ।
সম্প্রদায়গত রােয়েদাদের ঘােষণায় বাঙলার আইন সভার মােট ২৫০ টি আসনের মধ্যে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত করা হয় ১১৭ টি আসন এবং মুসলমান মহিলাদের জন্য ২ টি আসন অর্থাৎ মুসলমানদের জন্য মােট ১১৯ টি আসন বরাদ্দ করা হয় । হিন্দুদের জন্য সংরক্ষিত করা হয় ৮০ টি আসন ; আরও ২ টি হিন্দু মহিলাদের জন্য অর্থাৎ হিন্দুদের জন্য মােট ৮২ টি আসন বরাদ্দ হয় – যার মধ্যে ১০ টি আসন অস্পৃশ্যদের জন্য সংরক্ষিত বলে ঘােষণা করা হয় । ইউরােপীয়দের জন্য ১১ টি আসন, ইউরােপীয় ব্যবসায়ীদের জন্য ১৪ টি আসন , ভারতীয় ব্যবসায়িদের জন্য ৫ টি আসন, জমিদারদের জন্য ৫ টি আসন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ২ টি আসন, শ্রমিকদের জন্য ৮ টি আসন , এ্যাংলাে ইণ্ডিয়ানদের জন্য ৩ টি আসন এবং এ্যাংলাে ইণ্ডিয়ান মহিলাদের জন্য ১ টি আসন বরাদ্দ করা হয় ।
শতকরা হিসাবে বাঙলার ৫৪ ভাগ মুসলমান বাঙলা প্রাদেশিক আইন সভার ৪৭.৬০ ভাগ আসন পান ।বাঙলার ২৬.৪০ শতাংশ সাধারণ হিন্দুরা পান বাঙলার প্রাদেশিক আইন
(৬২)
সভার ২৮ শতাংশ আসন এবং ১৭.৬০ শতাংশ অস্পৃশ্যরা বাঙলার প্রাদেশিক আইনসভার মােট আসনের মাত্র ৪ শতাংশ অর্থাৎ ১০ টি আসন পেয়েছিলেন ।
সম্প্রদায়গত রােয়েদাদে ঘােষিত ও বন্টিত আসন সংখ্যা সম্পর্কে বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সংখ্যার অনুপাতে সবচেয়ে বেশি আসন পান সাধারণ হিন্দুরা – যদিও বাঙলাপ্রদেশের ক্ষমতা দখলের জন্য ঐ সংখ্যা ছিল নিতান্ত নগণ্য । বরং বলা যেতে পারে – এই রােয়েদাদের ফলে বাঙলার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল তাদের পক্ষে কার্যতঃ অসম্ভব হয়ে পড়ে ।
মুসলমানরা সংখ্যার অনুপাতে কিছু কম আসন পেলেও, মােট আসন সংখ্যা ভালই ছিল । বাঙলার ক্ষমতা দখল করার জন্য প্রয়ােজন ছিল ১২৬ টি আসন। ঐ ম্যাজিকসংখ্যা থেকে তাদের জন্য মাত্র ৭ টি আসন কম সংরক্ষিত করা হয় । জমিদার , ব্যবসায়ী এবং শ্রমিকদের কোটা থেকে ৭ টি আসনের ঘাটতি পূরণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল ।
আর সবচেয়ে বঞ্চিত করা হয় বাঙলার অস্পৃশ্য সমাজকে । প্রায় ১৮ ভাগ মানুষের জন্য মাত্র ৪ ভাগ আসন । অথচ অন্যায় ও অগণতান্ত্রিকভাবে ইউরােপীয় ও ইউরােপীয় ব্যবসায়ী এবং ভারতীয় জমিদার ও ব্যবসায়ীদের অনেক বেশি আসন বরাদ্দ করা হয় । জাতিয়তাবাদী বলে দাবিদার কংগ্রেস এই অন্যায় ও অযাচিত তােষামােদের বিরুদ্ধে একটি শব্দ উচ্চারণ না করে বাঙালি অস্পৃশ্য ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐ দল যুদ্ধ ঘােষণা করে । তারা দাবি করেন যে , নিতান্ত যদি বরাদ্দ করতেই হয় , তাহলে অস্পৃশ্যদের ৪ টির বেশী আসন কোনমতেই বরাদ্দ করা যাবে না।
সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ বাঙলার উচ্চবর্ণ হিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণীর কাছে একটা বড় ধাক্কা---সেকথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই । কারণ ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইন অনুসারে বাঙলার আইন পরিষদের দ্বৈতশাসনে ১৩৯ সদস্য বিশিষ্ট সভায় হিন্দুরা পান ৪৬ টি আসন ; আর মুসলমানরা পান ৩৯ টি আসন। তাদের এই অন্যায় ও অসঙ্গত প্রাধান্যের ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তারা আশা করেছিলেন । কিন্তু সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ তাদের আশার মূলে কুঠারাঘাত করে । আশাহত এই সম্প্রদায় এরপর তাদের লুকানাে সমস্ত দাঁতনখ নিয়ে বাঙলার রাজনৈতিক ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েন – যে ইতিহাস আমরা পরে আলােচনা করবো।
ষষ্ঠ অধ্যায়
সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ : হিন্দুমন ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া
সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ ঘােষণার কয়েক বছর আগেকার দু'তিনটি ঘটনার কথা আমরা এখানে আলােচনা ও উল্লেখ করে নিতে চাই । তাতে অস্পৃশ্য ও মুসলমানদের প্রতি বাঙলার ভদ্রলােকশ্রেণীর দৃষ্টিভংগীর পরিচয় আরও খানিকটা স্পষ্ট হবে – যা রােয়েদাদ পরবর্তী তাদের প্রতিক্রিয়া উপলদ্ধি করতে সহায়ক হতে পারে ।
আজ বাঙলার বহু মানুষের অজানা নয় যে , গুরুচাঁদ ঠাকুর গ্রামবাংলার অন্ত্যজ মানুষের জন্য শিক্ষা আন্দোলন করেন এবং সর্বপ্রথম চণ্ডালদের নেতৃত্বে ওড়াকান্দিতে একটি উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয় । এই উদ্যোগের কথা জানতে পেরে পাশ্ববর্তী ঘৃতকান্দি গ্রামের গিরীশচন্দ্র বসু নামক একজন উদারচিত্ত কায়স্থ ব্যবসায়ি গুরুচাঁদ ঠাকুরের নিকট চিকিৎসালয়ের পরিবর্তে ঐ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য কিছু অর্থ সাহায্যের অঙ্গীকার করেন । গুরুচাঁদ চরিতে বিষয়টি এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে---
“ এই দেশে চিকিৎসার বন্দোবস্ত নাই ।
দাতব্য চিকিৎসালয় করে দিতে চাই ।।
প্রভু (গুরুচাদ) বলে মহাশয় বড় ভাল কথা ।
ব্যাধি দূর করা বটে অতি উদারতা ।।
অজ্ঞান ব্যাধিতে ভরা আছে এই দেশ ।
জ্ঞানের আলােকে ব্যাধি তুমি কর শেষ ।।
উচ্চবিদ্যালয় এই দেশে কোথা নাই ।
উচ্চবিদ্যালয় কর এই ভিক্ষা চাই।।
(৬৪)
এ তব আজ্ঞা শিরােধার্য আমি করিলাম ।
করিব ইংরাজী স্কুল কথা যে দিলাম ।। ”
কলকাতা শহরে বড় কাঠের ব্যবসা গিরীশচন্দ্র বসুর । বহু টাকাকড়ির মালিক এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি । তার এই প্রতিশ্রুতির কথা ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য উচ্চবর্ণহিন্দুদের কানে যায় এবং তিনি যাতে কোনক্রমে গুরুচাঁদকে অর্থ সাহায্য না করেন । তারজন্য তৎপর হয়ে ওঠেন---
"হিংসুক ব্রাহ্মণ যত ভাবে মনে মন ।
উচ্চশিক্ষা পায় যদি নমঃশূদ্রগণ ।।
কিছুতেই নিস্তার মােরা নাহি পাব আর ।
নমঃশূদ্র করিবেক সব অধিকার ।।
কেন সে করিবে স্কুল নমঃর ভিতরে ।
শিক্ষা পেলে নমঃ আর নাহি মানে কারে ।।
চিকিৎসালয় দিবে দাও নাহি করি মানা ।
স্কুল দিবে কোন মর্মে তাহাতাে বুঝি না ।।
নমঃ জাতি চিন তুমি বিদ্যাশিক্ষা নাই ।
বিদ্যাহীন বলে মােরা তাদেরে চরাই ।।
স্কুল যদি পায় তারা বিদ্বান হইবে ।
আমাদের মান বাপু কভু না রহিবে ।।
গিরীশচন্দ্র বসুকে ভদ্রলােকশ্রেণী নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করেন , যাতে , তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুচাঁদ ঠাকুরকে কোনভাবেই অর্থ সাহায্য না করেন । শেষ পর্যন্ত তাকে সামাজিক বয়কটের হুমকি দেওয়া হয় । ফলে , গিরীশবাবুর পক্ষে অর্থ সাহায্য করা সম্ভব হয় না। গুরুচাঁদের ইচ্ছাশক্তির জোরে এবং নিজ সমাজের মানুষের সার্বিক সহযােগিতায় শেষ পর্যন্ত ১৮৯৮ সালে উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তিনি সক্ষম হন – যা পূর্ববঙ্গে চণ্ডালদের প্রথম ইংরেজী উচ্চ বিদ্যালয় ।
(৬৫)
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে , ইংরেজদের প্রণীত ১৮১৫ সালের শিক্ষানীতি ৪০ বছর পরে পূনর্বিবেচনা করা হয় এবং অস্পৃশ্য ও মুসলমানদেরও ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য জোর দেওয়ার কথা ঘােষণা করা হয় এই ঘােষণায় । বিরক্ত ও অসন্তুষ্ট হয়ে বাঙলার উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােক বুদ্ধিজীবী-বিদ্বজনেরা কলকাতার টাউন হলে এক সভা ডাকেন । ঐ সভার সিদ্ধান্তের উল্লেখ করে ১৮৫৯ সালে সর্বজন শ্রদ্ধেয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় তৎকালীন বাঙলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার পিটার গ্রান্টকে একটি স্মারকলিপি দেন । ঐ স্মারকলিপিতে অস্পৃশ্য এবং মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করার সরকারি নীতি ও উদ্যোগের বিরােধিতা করে বলা হয় “ ইংল্যাণ্ড ও ভারতে এরূপ একটা বদ্ধমূল ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যে – উচ্চবর্ণের লেখাপড়া শেখার জন্য যথেষ্ট কাজ হয়েছে এবং এখন প্রধানতঃ সাধারণ জনগণের শিক্ষার প্রতি নজর দিতে হবে । আমার সাধারণ বুদ্ধিতে মনে হয় – শিক্ষা বিস্তারের সবচেয়ে ভাল উপায় হলাে , কেবলমাত্র উচ্চবর্ণের মধ্যে ব্যাপকভাবে শিক্ষার প্রসার ঘটানাে । ” – এভাবে তারা দেশের চলমান মাথাভারি শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তির বিস্তার ও প্রসার ঘটানাের প্রয়াসের বিরােধিতা করেন তীব্রভাবে । কারণ নিম্নবর্গের লােকেদের জন্য শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত হলে তাদের একচেটিয়া অধিকার ও ক্ষমতা হ্রাস পেত । ওড়াকান্দির ঘটনা এই সংকীর্ণ মানসিকতারই ধারাবাহিকতা।
ইংরেজি শিক্ষাগ্রহণের জন্য প্রথম সরকারি সুযােগলাভ এবং ১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবিধা থাকার ফলে বাঙলার ভদ্রলােকশ্রেণীর একাংশ উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হন এবং বিশ্ববিদ্যালয়টিকেও নিজেদের কব্জায় নিয়ে নেন ।
'পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ’ গঠিত হওয়ায় এই সময়ে ঢাকাতে অপর একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ও আন্দোলন জোরদার হয় । সরকার শেষ পর্যন্ত নীতিগতভাবে রাজি হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘােষণা করে । কোন সন্দেহ নেই – এই বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববঙ্গের মানুষের জন্য অত্যন্ত প্রয়ােজনীয় ছিল এবং বিশেষ করে মুসলমানরা খুবই উপকৃত হবেন । কিন্তু দেখা গেল , বাঙলার ভদ্রলােকশ্রেণী তাদের মনের সংকীর্ণতার পরিচয় ঘােষণা করতে আরও একবার উচ্চকণ্ঠ হলেন । ১৯১২ সালের ২৮ শে মার্চ তারা কলকাতার গড়ের মাঠে জনসভা করে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরােধিতা করেন । অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হলেও এটা সত্য যে , গড়ের মাঠের ঐ সভায় সভাপতিত্ব (সভাপতিত্ব করা নিয়ে বিতর্ক আছে) করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ঐ সভায় প্রস্তাব পাশ
(৬৬)
করে তা ইংরেজ সরকারকে পাঠানাে হয় । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর বাঙলার বাঘ ( ! ) স্যার আশুতােষ মুখার্জী , ডাঃ রাসবিহারি ঘােষ , গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় , গিরীশচন্দ্র ব্যানার্জী প্রমুখের নেতৃত্বে বাঙলার ভদ্রলােকশ্রেণী ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে মােট ১৮ বার ইংরেজ সরকারের কাছে স্মারকলিপি দেন । তাদের যুক্তি –পূর্ব বাঙলার মুসলমানরা অধিকাংশই কৃষক , তাই ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কোন অর্থ হয় না ! অবশ্য ১৯২১ সালে শেষ পর্যন্ত ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয় ।
ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার তার জীবনের স্মৃতিকথায় লিখেছেন , “ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়ায় মুসলমানরা খুশী হলেন ঠিকই ; কিন্তু হিন্দুদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয় । সাধারণত : যারা রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে দূরে থাকতেন , তারাও ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলনে যােগ দিলেন "। – ড . রমেশচন্দ্র মজুমদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর রূপে বহুবছর কাজ করেন ।
১৯০০ সাল থেকে হিসাব নিলে দেখা যায় — সামগ্রিকভাবে বাঙলায় মুসলমানরা ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ। পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলিতে তাদের সংখ্যা ছিল স্পষ্টভাবে আরও অধিক । যেমন বগুড়া জেলার মােট জনসংখ্যার প্রায় ৯৫ ভাগ ছিলেন মুসলমান। রংপুর , ময়মনসিং , রাজশাহী , পাবনা , কুমিল্লা , নােয়াখালী , চট্টগ্রাম ও বরিশাল জেলার মােট জনসংখ্যার ৭১ থেকে ৮০ ভাগ মানুষ ছিলেন মুসলমান। নদিয়া , যশাের , ফরিদপুর ও ঢাকা জেলার ৬১ থেকে ৭০ ভাগ মানুষ ছিলেন মুসলমান । দিনাজপুর , মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলার মােট জনসংখ্যার ৫১ থেকে ৬০ ভাগ মানুষ ছিলেন মুসলমান । খুলনা জেলার মােট জনসংখ্যার ৪৯.৫০ ভাগ মানুষ ছিলেন মুসলমান । কিন্তু বাঙালি সমাজে আধিপত্য ছিল উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণীর এবং ব্রিটিশের অধীনে ভারতীয়রা যে সব ক্ষেত্রে ক্ষমতা প্রয়ােগ করার অধিকারি ছিলেন , তার প্রতিটি ক্ষেত্রে ভদ্রলােকশ্রেণীর আধিপত্য ছিল । কিন্তু সম্প্রদায়গত রােয়েদাদের ফলে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিশেষ করে প্রাদেশিক আইন সভায় তারা সংখ্যালঘিষ্ঠ দলে পরিণত হন ।
বাঙলা যখন প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন লাভ করে , তখন ভদ্রলােকশ্রেণীর মনে সত্যিকার যে রাজনৈতিক ক্ষমতার আশা ছিল , তা ঐ রােয়েদাদ নিভিয়ে দেয় এবং মুসলমানদের কাছে তাদের চিরস্থায়ীভাবে অধীন হবার সম্ভাব্য ভবিষ্যতের ছবি ফুটে ওঠে । ঐ রােয়েদাদের পরপরই ঘােষিত হয় পুনাচুক্তি । এই চুক্তিতে তফসিলী শ্রেণীর হিন্দুদের জন্য রােয়েদাদের দ্বারা সংরক্ষিত ১০ টি আসনকে বাড়িয়ে ৩০ টি
(৬৭)
করা হয় । ফলে , হাউসে উচ্চবর্ণ হিন্দুরা আরও সংখ্যালঘুতে পরিণত হয় । অথচ এই হাউসে তারা সবসময় কর্তৃত্ব বজায় রাখার স্বপ্ন দেখে আসছিলেন । সম্পূর্ণ নতুনভাবে প্রবর্তিত সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যে পূর্বের ব্যবস্থাদির থেকে অনেকটাই আলাদা এবং এই ব্যবস্থায় জনসংখ্যা যে এক মৌলিক ভিত্তি, এ সত্য তারা মেনে নিতে পারেননি ।
১৮৮৫ সালে নতুন আইন প্রণয়নের ফলে জমিদারদের ক্ষমতা অনেকটাই সীমিত হয়ে যায় । এই আইনে আদায়কারিদের ক্ষমতা কমে যায় , ফলে আদায় কম হয় এবং জমিদারদের আয় কমে যায় । বাঙালি সমাজে ভদ্রলােকদের আয়ের মূল উৎস জমির খাজনার পরিমাণ কমে গেলে , পাশ্চাত্য শিক্ষাকে তাদের প্রাচীন আধিপত্য টিকিয়ে রাখার উপায় হিসাবে গণ্য করা হয় । তাদের নতুন আত্মপরিচয় গড়ে তােলা হয় পাশ্চাত্য শিক্ষাকে ভিত্তি করে । এভাবে সম্পদের আধিপত্য পরিবর্তিত করার চেষ্টা হয় সংস্কৃতির আভিজাত্যে । গত শতাব্দীর শুরু থেকে ভদ্রলােকশ্রেণী সমাজে এমন এক ধারণা গড়ে তােলেন যে , তারা সংস্কৃতিবান ও আলােকিতশ্রেণী , বেঙ্গল রেনেসাঁর উত্তরসূরি এবং অগ্রগতি ও আধুনিকতার পতাকাবাহী । কংগ্রেস দলের ভদ্রলােক রাজনীতিতে এরা প্রভাব বিস্তার করেন এবং জাতিয়তাবাদী হিসাবে প্রতিনিধিত্ব করেন ।
বাঙলা তথা সারাদেশে এই সময়ে চরম অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয় । এই মন্দা না হলে , রাজনৈতিক ধারা পরিবর্তনের ফলে ভদ্রলােকশ্রেণীর অত বেশি ক্ষতি হতাে না । মন্দার ফলে কৃষিজাত পণ্যের মূল্য এবং গ্রামীণ ঋণ পাওয়ার পথ একেবারে সংকুচিত হয়ে যায় । ফলে , খাজনা আদায় প্রায় বন্ধ হয়ে যায় । খাজনা আদায়কারিদের ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় পরিস্থিতি সম্পদশালী বায়ত বা জোতদারদের অনুকূলে চলে যায়। এই বিশৃঙ্খল অবস্থায় উৎসাহিত হয়ে জোতদাররা ক্রমবর্ধমান হারে জমিদারদের কর্তৃত্ব অস্বীকার করতে থাকেন এবং গ্রামবাঙলায় তারা নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করেন। কৃষক প্রজা পার্টি তাদের সাহস জোগায় এবং সহযােগিতা করে । বাঙলার এইসব জোতদারদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলমান ।
এই সময়ে ১৯৩৫ সালে নতুন ভারত শাসন আইন প্রবর্তিত হয় । এই আইনে যারা একটা স্তর পর্যন্ত লেখাপড়া জানেন এবং নির্দিষ্ট পরিমান রাজস্ব ও খাজনা দেন , তাদের ভােটের অধিকার দেওয়া হয় । ফলে , মুসলমান জোতদাররা এই প্রথম আইন সভার পরিমণ্ডলে ভূমিকা রাখার অধিকারী হন ।
ব্রিটিশের নতুন শিক্ষানীতির ফলে মুসলমানদের মধ্যে ইতিমধ্যে একটি শিক্ষিতশ্রেণী গড়ে ওঠে এবং একটি চাকুরীজীবীশ্রেণীরও উদ্ভব হয় । বাঙালী
(৬৮)
ভদ্রলােকশ্রেণীর বিরুদ্ধে তাদের বহু অভিযােগ ছিল । তারা এই ধনী কৃষকদের অবিরাম সমর্থন দেন । নতুন আইনসভায় উভয় গ্রুপের প্রতিনিধিবৃন্দ বিভিন্ন ইস্যুতে অত্যন্ত সরব ছিলেন এবং বাঙালি রাজনীতির মূল স্রোতধারায় তারা খাজনা গ্রহণকারি এবং সুদখাের ভদ্রলােকদের স্বার্থের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় ।
ভদ্রলােক সমাজের মধ্যে অনেক পার্থক্য , বিভেদ , বৈষম্য এবং দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছিল । যেমন নগরভিত্তিক পেশাজীবীর সাথে গ্রামীণ মধ্যবিত্তশ্রেণীর পার্থক্য , বড় জমিদারের সাথে ক্ষুদ্র তালুকদারের , ভূস্বামী অভিজাতদের সাথে সামান্য কেরাণীশ্রেণীর এবং আধুনিকতাবাদীদের সাথে প্রাচীন ঐতিহ্যবাদীশ্রেণীর লােকের অনেক পার্থক্য ছিল । তাছাড়া ভদ্রলােক রাজনীতিতে নরমপন্থি , মধ্যপন্থি , চরমপন্থি , সন্ত্রাসবাদী সমিতি — দল ও উপদল এবং অনুগত ও জাতীয়তাবাদী প্রভৃতি বিভেদ ও স্বতন্ত্রতা ছিল – যা সাম্প্রদায়গত রােয়েদাদ ও নতুন ভােটার তালিকার ধাক্কায় মুছে দিয়ে ভদ্রলোেকদের ঐক্যবদ্ধ করে দেয় ।
এই সময়ে ভদ্রলােকরা ব্রিটিশ শাসনকে অত্যন্ত অনুকূল দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রহণ করে এবং সম্ভাব্য মুসলিম শাসনকে গণ্য করা হয় হিন্দু সমাজের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসাবে । এ কারণে ভদ্রলােকরা তাদের অতীতকে নতুন করে উপস্থাপন করেন – যেখানে ব্রিটিশকে অভিহিত করা হয় ত্রাণকর্তা হিসাবে । কারণ হিসাবে বলা হয় , মুসলমানদের স্বেচ্ছাচার থেকে তারা হিন্দু বাঙলাকে মুক্ত করেছে । বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলনে ব্রিটিশ বিরােধিতার পর , আবার ব্রিটিশের প্রতি আনুগত্য বাঙালি ভদ্রলােকদের কাছে মর্যাদার প্রতীক হিসাবে গণ্য হয় । তাদের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার দাবি জোরদার করার জন্য ব্রিটিশ শাসনে ভদ্রলােকদের সহযােগিতার অগৌরবের ইতিহাসকে এই সময়ে গৌরবের সাথে স্মরণ করা হতে থাকে । এই সময় থেকে তারা বাঙলার মুসলমানদের চেয়ে সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠ মনে করার অনুভূতির প্রসার ঘটাতে থাকে । ভােটাধিকার ও সংখ্যাগরিষ্ঠদের শাসনের যুগে , এই সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে ভদ্রলােক সংখ্যালঘিষ্ঠদের রাজনৈতিক ক্ষমতা পাওয়ার যুক্তি হিসাবে তুলে ধরা হয় ।
ভারতীয় জাতীয়তাবাদ পুষ্ট হয় গণতান্ত্রিক নীতি ও আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে । তাই , এই ধরনের যুক্তি শুধু গণতান্ত্রিক নীতিকেই প্রত্যাখ্যান করে না ; এর সাথে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বৈধতা প্রমাণের মিল আছে । কারণ ব্রিটিশদের যুক্তি ছিল যেহেতু ভারতীয়দের থেকে ব্রিটিশদের জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত , তাই , ভারত শাসন করার অধিকার তাদেরই । এভাবে ক্রমেই ভারতীয় জাতীয়তাবাদের নেতা হওয়া থেকে বাঙালি ভদ্রলােকরা ছিটকে পড়লেন এবং সাম্প্রদায়িক ভূমিকা গ্রহণ করলেন।
(৬৯)
বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে ব্রিটিশ বিরােধিতা থেকে সরে গিয়ে মননে এবং মেজাজে তারা মুসলিম বিরােধিতাকে প্রাধান্য দেন – যে ইতিহাস আমরা পরে তুলে আনবো ।
১৯০৫ সাল থেকে শুরু করে উচ্চবর্ণ হিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণী বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলন ১৯১১-১২ সাল অবধি জারি রাখেন , অথচ তারাই মাত্র ৩০/৩২ বছরের ব্যবধানে এবার বাঙলা ভাগ করার জন্য মরীয়া আন্দোলন শুরু করেন – যে আন্দোলন আসলে ‘ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ও প্রদেশভাগ করার সূচনা । ধর্মের ভিত্তিতে বাঙলাভাগ দিয়ে ভদ্রলােকশ্রেণী যে অধ্যায়ের শুরু করেন , ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ - এর দ্বারা তার সমাপ্তি হয় । জাতীয়তাবাদের নামে বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলন করেন তারা । ৩০ বছরের ব্যবধানে বাঙালি ভদ্রলােকরা সরাসরি সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক ও প্রাদেশিক বিষয়ে নিজেদের গুটিয়ে নেন এবং অত্যন্ত নীচুস্তরের রাজনৈতিক চক্রান্ত শুরু করেন ।
এ প্রসঙ্গে উদহারণ হিসাবে একটি চিঠির উল্লেখ করা যায় । চিঠিটি লেখেন হিন্দু মহাসভার নেতা ড . শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী , তার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বি কংগ্রেস নেতা সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল মহাশয়কে । বিভিন্ন পুস্তকে উল্লেখ করা হয়েছে যে , দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংকলিত শ্যামাপ্রসাদ করেসপণ্ডেন্স নামক পুস্তকে চিঠিটি সংরক্ষিত করা হয়েছে । জয়া চ্যাটার্জী লিখিত ‘ বেঙ্গল ডিভাইডেড ’ বইয়ের ( বাঙলা অনুবাদ ) ২৬৯ পৃষ্ঠা এবং ৩০২ পৃষ্ঠায়ও তার স্পষ্ট উল্লেখ আছে । চিঠিটার একাংশের বাঙলা অনুবাদ করা হয়েছে এভাবে – ইহারা ( মুসলমানরা ) হইতেছে হিন্দু সমাজের তলানীর নােংরা হইতে ধর্মান্তরিত একদল মানুষ - যাহারা সবদিক দিয়া হীনতর । তাই , বাঙলায় মুসলমান শাসন ও প্রাধান্য বজায় থাকিবার অর্থ সুপ্রাচীন হিন্দু সংস্কৃতিকে বিসর্জন দেওয়া – যা আমরা মানিয়া লইতে পারি না । তাই , ভারতভাগ হউক বা না হউক , বাঙলা ভাগের যে দাবি আমরা তুলিয়াছি , আপনি দেখুন , তাহা যেন ব্যর্থ হইয়া না যায় । ” –এই চিঠিতে মুসলমান সমাজের প্রতি তাে বটেই ; নিম্নবর্ণের হিন্দুদের প্রতি হিন্দুমহাসভা এবং তার নেতা ড , শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর ঘৃণা যে কত প্রবল ও গভীর , তার নিদর্শন ফুটে উঠেছে ।
আসলে বাঙলার উচ্চবর্ণ হিন্দু ভদ্রলােকদের ক্রমক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতা , ধনসম্পদ ও মর্যাদা হুমকির সম্মুখীন হওয়ায় , তারা সামাজিক অবস্থান অক্ষুন্ন রাখার জন্য কূটকৌশল অবলম্বন করে এবং নিজেদের কাজের যৌক্তিকতা প্রমাণ করার জন্য , বিভিন্ন ভাবাদর্শকে ব্যবহার করে । সত্যিকার অর্থে ঐ সব কূটকৌশলকে একমাত্র বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা হিসাবে আখ্যায়িত করা যায় ।
(৭০)
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মারা যান ১৯২৫ সালে । তার মৃত্যুর পরে দুই প্রিয় শিষ্য যতীন্দ্রমােহন সেনগুপ্ত এবং সুভাষচন্দ্র বসুর মধ্যে ক্ষমতার দখল নিয়ে প্রতিযােগিতা শুরু হয় । বিশেষ করে কলকাতার ‘তিন বিখ্যাত মুকুট ’ অর্থাৎ প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির পদ , বেঙ্গল লেজিসলেটিড কাউন্সিলে প্রাধান্য এবং কলকাতার মেয়র পদ দিয়ে অশােভন দড়িটানাটানি শুরু হয় । বেঙ্গল প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায় এবং সংগঠন বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে । মাহাত্মা গান্ধীর আবেদন এবং তার আইন অমান্য আন্দোলনের আহ্বানও তাদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারে না । গান্ধী যা পারেননি , সম্প্রদায়গত রােয়েদাদের ঘােষণা তা পারলাে। এই রােয়েদাদকে ভদ্রলােকেরা গণ্য করেন তাদের মর্যাদার উপর সরাসরি আক্রমণ হিসাবে এবং তারা ঐক্যবদ্ধভাবে এই রােয়েদাদকে প্রত্যাহার করার সংগ্রামে সামিল হন ।
ঐ সময়ে সেনগুপ্ত গ্রুপের কাগজ ছিল এ্যাডভ্যানস্ । রােয়েদাদকে নিন্দা করে ঐ পত্রিকা লেখে , “ এটা হলাে সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের কাছে লজ্জাহীন আত্মসমর্পণ। রােয়েদাদে হিন্দুদের দাবি ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে । হিন্দুরা এধরনের আমূল বা প্রায় বিপ্লবী পরিবর্তনের কাছে আত্মসমর্পণ করবে না"।
সুভাষচন্দ্র বসু গ্রুপের কাগজ ‘লিবার্টি ’ রােয়েদাদকে নিন্দা করে লিখলাে , "ভারতীয় জাতির কাছে এই রােয়েদাদ একটি কলঙ্ক । রােয়েদাদ শব্দটির বৈশিষ্ট্য 'অন্যায়' শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা যাবে না । ঐ রােয়েদাদ অপমানকর এবং নিশ্চিতভাবে ক্ষতিকর । রাজনৈতিকভাবে হিন্দুদের দুর্বল করা হয়েছে এবং প্রদেশের সাংস্কৃতিক , অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক জীবনে এর ফল হবে অমঙ্গলজনক”। আনন্দবাজার দূরদৃষ্টিহীন বলে ঐ রােয়েদাদের নিন্দা করে । দৈনিক বসুমতী যুক্তি দেখায় যে , “ঐ রােয়েদাদ বাঙালিদের উপর বাধ্যতামূলক নয় । কারণ সম্প্রদায়গুলির সত্যিকারের প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রিকে এই রােয়েদাদ ঘােষণার জন্য জানাননি" । দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা একটি উপকথার গল্প ছেপে বলে যে , "রােয়েদাদ হলাে এক নির্বোধ গ্রাম্য মাতব্বরের বােকামী"।
আগে স্থানীয় ও জেলা বাের্ড এবং স্কুলবাের্ডগুলিতে ভদ্রলােকশ্রেণীর একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল । এই সময়কালে এইসব স্থানীয় পর্যায়েও তাদের কর্তৃত্ব ক্রমেই শিথিল হতে থাকে । পশ্চিমবাঙলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলিতেও মুসলমানরা ১৯২৫-২৬ সাল থেকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলিতে ভাল অবস্থায় চলে আসে। ফলে , ভদ্রলোেকশ্রেণী হতাশাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন।
এইসব আঘাতের কারণে প্রতিক্রিয়া যে চরম হবে , তা সহজেই বােঝা যায় ।
(৭১)
কিন্তু বিস্ময়কর হলাে । ব্রিটিশনীতির বিরুদ্ধে ভদ্রলােকশ্রেণী বাঞ্জনীয় জাতিয়তাবাদী সমালােচনা করেনি । সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় , আবেদন , স্মারকলিপি এবং বক্তৃতায় পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থানীতি ও ব্রিটিশের ভাগ করে শাসন করার বিভেদনীতির বিরুদ্ধে খুব কম কথা শােনা যায় । আইন সভায় ইউরােপীয়দের বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বিরােধিতা বা প্রধানমন্ত্রির বিবেচনা ক্ষমতা নিয়ে বিক্ষোভ করতেও দেখা যায়নি । সরকারি শ্বেতপত্রে প্রকাশিত স্বায়ত্তশাসনকে প্রতারণা বলে জাতিয়তাবাদী ভারত প্রত্যাখান করলেও , বাঙালি ভদ্রলােকশ্রেণী (কংগ্রেস অকংগ্রেসী সবাই) শুধুমাত্র তাদের প্রাদেশিক রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খার প্রতি উপেক্ষা নিয়েই উদ্বিগ্ন ছিলেন । ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সমালােচনায় তারা বিস্ময়করভাবে নীরব ছিলেন ।
ভদ্রলােকদের ধারণায় বাঙলার মুসলমানরা অনেক বেশি সুবিধা পেয়েছেন । তাই , তাদের বিরুদ্ধে বাঙালি ভদ্রলােকরা ক্রোধ প্রকাশ করতে থাকেন । রােয়েদাদ ঘােষণার দু'দিন পর অমৃতবাজার পত্রিকা একটি রিপাের্ট প্রকাশ করে । তাতে বলা হয় , “ হিন্দুদের দুঃখকষ্ট দেখে উল্লসিত মুসলমান রাজনীতিকরা একটা বড়পার্টির আয়ােজন কোরে বিজয় উৎসব পালন করে"।– এভাবে প্রচার যন্ত্রগুলি সাধারণ হিন্দুদের, মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতে থাকে ।
রােয়েদাদের বিরােধিতায় কলকাতার টাউন হলে একটি সভার আয়ােজন করা হয় । সেখানে বাঙলার বহু বিশিষ্ট ভদ্রলোেকরা অংশগ্রহণ করেন । সভাপতিত্ব করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । প্রকৃতপক্ষে সেই সভাতেই একজন বক্তা মােহম্মদ আলি জিন্নাহর অনেক আগেই দ্বিজাতিতত্ত্বের পক্ষে যুক্তিগুলি উপস্থাপন করেন । তিনি বলেন , “হিন্দু ও মুসলমানের পৃথক সাংস্কৃতিক সংশ্লিষ্টতা । তাদের শিক্ষা , ব্যক্তিগত আইন এবং অনুরূপ বিষয়ের প্রেক্ষিতে তাদেরকে পৃথক জাতি হিসাবে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে । অতপর তারা অল বেঙ্গল ফেডারেশন এ্যাসেমব্লিতে একসাথে সমতা , ন্যায়পরতা এবং ভ্রাতৃত্বের শর্তে যােগ দিতে পারেন । এ ধরনের যুক্তরাষ্ট্রীয় ধারণাই বাঙলার জন্য উপযােগী হতে পারে"।
হিন্দু মহাসভার প্রখ্যাত বাঙালি নেতা ছিলেন বি.সি. চট্টোপাধ্যায় । রােয়েদাদ সম্পর্কে তিনি বলেন , “ ব্রিটিশ শাসনে বাঙালি হিন্দু সভ্যতার বিকাশ সম্ভব হয়েছে । কিন্তু এই রােয়েদাদ বাঙালি হিন্দুদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার সামিল । বাঙালি হিন্দু প্রতিভার বিকাশ এবং বাঙলায় নতুন সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিনির্মাণ হল ব্রিটিশ ভারতের এক বিস্ময়কর ঘটনা । এখন মুসলমানদের গদিতে বসানাের অর্থ হলাে – বাঙলাকে পলাশীযুদ্ধপুর্ব অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া । মুসলমানদের
(৭২)
গদিতে বসানাে হলে ১৭৫৭ সাল থেকে বাঙলায় ব্রিটিশরা যা করেছে , তাকে অস্বীকার করা হবে এবং ব্রিটেন ও বাঙলার বিশ্বাসঘাতকতা শিরােনামে বাঙলার ইতিহাসে একটা নতুন অধ্যায় সংযােজন করতে হবে" ।
এতকাল জাতিয়তাবাদী ইতিহাস রচনায় পলাশী যুদ্ধের উপর এই প্রতীকী বৈশিষ্ট্য দান করা হয়েছিল যে , ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিস্তারে এটা ছিল প্রথম কলঙ্কিত অধ্যায় , আর এখন ঐ ধারণার উল্টো অবস্থানে চলে যাওয়া হলাে । এখন পরিবর্তিত ধারণায় পলাশী যুদ্ধের পরাজয়কে বলা হলাে , স্বাধীনতার মুহূর্ত হিসাবে ; অর্থাৎ পলাশী যুদ্ধের মাধ্যমেই মুসলমানদের অত্যাচার ও স্বেচ্ছাচার থেকে বাঙালি ভদ্রলােকদের ইংরেজরা উদ্ধার করে!
সম্প্রদায়গত রােয়েদাদের বিরুদ্ধে বাঙালি ভদ্রলােকদের ক্রোধ শুধু কংগ্রেসের আভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দল ভুলিয়ে দেয়নি ; একইসাথে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি আমৃত্যু অনুগত থাকতে এবং হিন্দু মহাসভার মত উগ্র সাম্প্রদায়িক নেতৃবৃন্দের সাথে কংগ্রেসকে হাত মেলাতে উৎসাহিত করে । সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ এবং আসন্ন শাসনসংস্কারের প্রেক্ষাপটে বাঙলার উচ্চবর্ণ হিন্দুদের প্রয়ােজন ও দাবি সম্পর্কে আলােচনার জন্য কলকাতার আলবার্ট হলে হিন্দু নাগরিকদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয় । ঐ সভায় কংগ্রেসের শরৎচন্দ্র বসু , নলিনাক্ষ স্যান্যাল , তুলসীচরণ গােস্বামী , দেবেন্দ্রলাল খান ও জে এল বন্দ্যোপাধ্যায় উপস্থিত ছিলেন । ব্রিটিশের প্রতি একান্ত অনুগত ভারতীয় বেসামরিক লােকদের মধ্যকার সর্বোচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি বিজয়প্রসাদ সিংহরায় , হিন্দু মহাসভার ড . রাধাকুমুদ মুখােপাধ্যায় ও বি.সি. চট্টোপাধ্যায় , নসিপুরের রাজা বাহাদুর এবং এ ছাড়াও ছিলেন অনেক অনুগত মহারাজাবৃন্দ । — সমস্ত মনীষীবৃন্দের স্বাক্ষরিত একটি স্মারকলিপি পাঠিয়ে সম্প্রদায়গত রােয়েদাদের বিরােধিতা করা হয় । স্মারকলিপির মূল সুর হলাে , “মহান বাঙালি ভদ্রলােকশ্রেণীকে রােয়েদাদ সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকে বাঙলার অনুন্নত ও ঘৃণাযােগ্য মুসলমানদের অধীনে স্থায়ীভাবে দাসে পরিণত করবে"।
সংস্কৃতি নিয়ে শূন্যগর্ভ দাবি অবশ্য ভদ্রলােকদের বরাবরের সংস্কৃতি । এইসব তথাকথিত ভদ্রলােকদের সংস্কৃতির সাথে সাধারণ বাঙালি হিন্দু ও অস্পৃশ্যদের কোন সম্পর্ক ছিল না । অথচ বাঙলার নমঃশূদ্র , সাঁওতাল , রাজবংশী , বাউরি , বাগদি , মাহিষ্য , সাহা , সদগােপ প্রভৃতি সম্প্রদায়গুলি হলাে মােট হিন্দু বাঙালি সমাজের বৃহত্তর অংশ । বরং এদের সঙ্গে বাঙলার মুসলমানদের সংস্কৃতির মিল ছিল অনেক বেশি । তাই , হিন্দু বাঙলাকে সমরূপে দেখানাের চেষ্টা হলাে – এইসব নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদের সম্পূর্ণ আলাদা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ঢেকে রাখার অপচেষ্টা । তাদের নিজস্ব দাবি, (৭৩)
চিন্তা , চেতনা ও আশা আকাঙ্খকে অবদমিত করা ।
নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা এবং ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তারা এই ধারণাটিকে ব্যবহার করে । ব্যাপকভাবে প্রচারিত একটি স্মারকলিপির কথা এখানে উল্লেখ করা হলাে । ৪ ঠা জুন ১৯৩৬ সালে এই স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় , এশিয়াটিক সােসাইটির প্রেসিডেন্ট দার্শনিক ব্রজেন্দ্রনাথ শীল , রসায়নবিদ ড . পি.সি. রায় এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড . শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীসহ অন্যান্য খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গ । স্মারকলিপির একাংশে লেখা হলাে , “ অতিশয় অগ্রণীঅংশ (বাঙলার হিন্দুরা) ... ব্রিটিশের অধীন প্রদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক , সাংস্কৃতিক , রাজনৈতিক , পেশাগত ও অর্থনৈতিক জীবনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে ... সংখ্যার দিক থেকে কম হওয়া সত্ত্বেও বাঙলার হিন্দুরা সাংস্কৃতিক দিক থেকে স্পষ্টভাবে শ্রেষ্ঠ ... শিক্ষিত জনগণের মধ্যে তারা শতকরা ৬৪ ভাগ ... স্বাধীন পেশার ক্ষেত্রেও তাদের সার্বিক প্রাধান্য সমভাবে দৃশ্যমান" ।
এই স্মারকলিপির ৪/৫ বছর আগে ‘হিন্দু নেতৃবৃন্দের ঘােষণাপত্র’ নামে আরেকটি স্মারকলিপি লর্ড জেটল্যান্ডের কাছে পাঠানাে হয় । যাকে 'হিন্দু নেতৃবৃন্দের মেনিফেস্টো’ নাম নিয়ে ১৯৩২ সালে হিন্দুসভা প্রচার করে । ঐ স্মারকলিপিতে লেখা হয় , “শিক্ষাগত যােগ্যতা ও রাজনৈতিক উপযুক্ততায় হিন্দু সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠত্ব , নাগরিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির উন্নয়নে তাদের অবদান এবং রাজ্যের প্রশাসনের প্রতিটি শাখায় অতীতে তাদের সেবার খতিয়ান এত সুবিদিত যে , তা পুনরুক্তি করার প্রয়ােজন নেই । শিল্প , সাহিত্য ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সমগ্র ভারতে হিন্দু বাঙালিদের সাফল্য সবার চেয়ে বেশি । অথচ বাঙলার মুসলমান সম্প্রদায় এমনকোন ব্যক্তিকে সৃষ্টি করতে পারেনি , যে ঐসব ক্ষেত্রে সর্বভারতীয় প্রসিদ্ধি অর্জন করেছে" ।
বাঙলার মহামণীষীদের এসব বিভিন্ন দাবির সারমর্ম হলাে – বাংলায় হিন্দুরা সংখ্যায় কম হলেও , যেহেতু তারা শিক্ষা , সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বলীয়ান , তাই , মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ভবিষ্যত আইন পরিষদে , স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলিতে ও অন্যান্য সবক্ষেত্রে উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণীকে বেশি গুরুত্ব , মর্যাদা , প্রতিনিধিত্ব ও অধিকার দিতে হবে ।
আরও কয়েক বছর আগে পর পর দুটি ঘটনা ঘটে , যাতে মুসলমানদের কংগ্রেসের প্রতি মােহমুক্তি ঘটে এবং হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দেয় : (৭৪)
প্রথমটি হলাে ১৯২৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে 'বাঙলা চুক্তি ' । চিত্তরঞ্জন এবং বাঙলার মুসলমান নেতৃবৃন্দ আলােচনার মাধ্যমে তিনটি বিষয়ে ঐকমত্যে আসেন ---
( ১ ) স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় তুলনামূলক অনগ্রসর বাঙালি মুসলমানদের জন্য মােট আসনের ৬০ শতাংশ আসন সংরক্ষিত থাকবে ।
( ২ ) বাঙলার নির্বাচিত আইনসভায় ( বিধানসভায় ) মুসলমানরা তাদের জনসংখ্যার সমান অর্থাৎ মােট আসনের ৫৫ শতাংশ আসন পাবেন ।
( ৩ ) সরকারি চাকরিতেও মুসলমানদের জন্য ৫৫ শতাংশ পদ সংরক্ষিত থাকবে ।
ঐ বছরেই অন্ধ্রের কোকনাদ শহরে কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এই ঐক্য প্রস্তাব অনুমােদনের জন্য উত্থাপন করেন ; কিন্তু প্রস্তাবটি ৪৫৮-৬৭৮ ভােটে পরাজিত হয় ।
দুটি কারণে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ এই বাঙলা চুক্তি বাতিল করে দেয় :
ক ) মুসলমানদের সংরক্ষিত নির্বাচনক্ষেত্র দেওয়া চলে না ; কারণ তাতে গণতন্ত্রের ইজ্জত চলে যায় ।
খ ) সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণ দেওয়া যায় না , তাতে প্রশাসনের দক্ষতার মান নেমে যায় ।
ঐ সময়ে সার্বজনীন ভােটাধিকার ছিল না ; কিন্তু গণতন্ত্রের ধ্বজাধারিদের তা নিয়ে কোন মাথাব্যথা ছিল না ; বরং সার্বজনীন ভােটাধিকারের তারা বিরােধিতা করেন । অন্য দিকে , দেখা যাচ্ছে — কংগ্রেস দলটি ব্রিটিশ প্রশাসনের গুণগত মান নিয়েও খুব উদ্বিগ্ন ছিল!
দ্বিতীয় ঘটনাটি হলাে – বাঙলার এসেমব্লিতে ১৯২৮ সালে পেশ হওয়া বেঙ্গল প্রজাস্বত্ব (সংশােধনী) বিল । ঐ বিলটিতে জমিদারদের বিরুদ্ধে প্রজাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয় । ঐ বিলের উপর আলােচনার সময় কংগ্রেস ও স্বরাজ্য পার্টির প্রায় সব শাখা ও সদস্যরা ঐক্যবদ্ধভাবে এই আইন প্রণয়নের বিরােধিতা করেন (৪০ জন কাউন্সিল সদস্যের মধ্যে -৩৯ জন)।
১৯৩০ সালে তারা আবার একটা বিলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হন । সেই বিলে প্রস্তাব করা হয় যে , প্রাথমিক শিক্ষার খরচপত্র এলাকার জমিদারি এস্টেটের উপর ন্যস্ত করা হবে । এসব কিছুতে বােঝা যায় – তারা জমিদারদের স্বার্থরক্ষায় বদ্ধপরিকর ছিলেন।
(৭৫)
এই দুটি ঘটনায় মুসলমান জাতিয়তাবাদীরা ; অর্থাৎ যে সব বাঙালি মুসলমান তখনও কংগ্রেসের সাথে ছিলেন , তারা মনে আঘাত পান এবং বুঝতে পারেন যে , মুসলমানদের স্বার্থরক্ষায় বেঙ্গল কংগ্রেসকে আর বিশ্বাস করা যায় না । তারা দেখতে পান – কেবলমাত্র ধনী , জমিদার , মধ্যবিত্তশ্রেণী ও সংখ্যালঘিষ্ঠ শিক্ষিত ভদ্রলােকশ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করতে কংগ্রেস আগ্রহী । তারা কৃষক - শ্রমিকের স্বার্থরক্ষায় অপারগ । তাই , এক সময় কংগ্রেসের ব্যাপারে মুসলমানদের যে উষ্ণ উৎসাহ ছিল , তার বদলে তাদের ক্রমবর্ধমান অনুভূতি জাগে যে, "কংগ্রেস একটা হিন্দু সংগঠন ছাড়া আর কিছু নয় । এর কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে , এটা হলাে মুসলমানদের ধ্বংস করার হিন্দু মনােবৃত্তির অন্য এক অভিব্যক্তি .. সারা ভারতে হিন্দু কংগ্রেসবাদী , স্বরাজ্যবাদী ও পুণরুজ্জীবনবাদীরা ভারত থেকে মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ষড়যন্ত্রের যে জাল বিস্তার করেছে , তা চরম বিপজ্জনক ... সুতরাং মুসলমানরা যদি তাদের ধর্ম ও সম্প্রদায়ের জন্য ন্যায্য লড়াই না করে ... কেউ তাদের রক্ষা করতে সমর্থ হবে না ” – ( রক্ষণশীল মুসলিম পত্রিকা শরীয়তে ইসলাম-এর সম্পাদকীয় , ফাল্গুন ১৩৩৬ বাঙলা সাল)।
এই সময়ে ; অর্থাৎ ১৯৩২ সাল নাগাদ বাঙালি মুসলমানদের পক্ষে কথা বলার জন্য কোন একক মুসলমান নেতার কর্তৃত্ব বা সামাজিক প্রতিষ্ঠাও ছিল না। ফলে , বাঙালি মুসলমান রাজনীতিকদের কাছ থেকে রােয়েদাদ সম্পর্কে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আসে ।
প্রত্যেকে লক্ষ্য করেন যে , মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য রােয়েদাদে সুস্পষ্ট সুবিধা রয়েছে । তবুও কিছু মুসলমান নেতা , সম্প্রদায়ের উপর গুরুত্ব আরােপ করায় দুঃখ প্রকাশ করেন । কারণ তারা লক্ষ্য করেন যে , মুসলমানদের স্বার্থরক্ষা হলেও , হিন্দু - মুসলমান ঐক্যের সম্ভাবনাকে এই রােয়েদাদ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে । অনেকে কংগ্রেস ত্যাগ করা সত্ত্বেও জাতিয়তাবাদী রাজনীতি সম্পর্কে তাদের আনুগত্য অক্ষুন্ন রাখেন – তারা সম্প্রদায় ভিত্তিতে আইন সভাকে বিভক্ত করায় রােয়েদাদের সমালােচনা করেন । অন্যমতের মুসলমানরা রােয়েদাদে যা দেওয়া হয়েছে , তার চেয়ে অনেক বেশি সুবিধা দাবি করেন ।
রােয়েদাদ ঘােষণার ঠিক ৩ দিন পর ১৭ ই আগষ্ট , ১৯৩২ তারিখে কৃষক প্রজা পার্টির নেতা এ . কে ফজলুল হক রােয়েদাদের নিন্দা করেন প্রকাশ্যে এবং এক বিবৃতিতে জানান , “অতি প্রচারিত সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ দেশের জন্য অপ্রত্যাশিত চমক .. আমাদের ভাগ্যে এ ধরনের অসঙ্গত দলিল দীর্ঘকাল আসেনি ... ঐ দলিলে যা প্রকাশ পেয়েছে , তাতে জাতিয়তাবাদীদের অত্যন্ত মন্দ ধারণাই নিশ্চিত
(৭৬)
হয়েছে ... ভারতের নতুন শাসনতন্ত্রে যদি ঐ সম্প্রদায়গত বন্দোবস্ত সংযুক্ত করা হয় ... ম্যাকডােনাল্ড তাহলে নিশ্চিত থাকতে পারেন যে , সেটি দেশে যা ভালাে ও সত্য আছে , তা তাকে স্পর্শ করতে পারবে না" (অমৃতবাজার পত্রিকা ১৭ ই আগষ্ট , ১৯৩২)।
কিন্তু উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকরা যেভাবে এবং যে ভাষায় রােয়েদাদকে আক্রমণ করতে থাকেন , তা বিস্ময়কর । তারা একে ' মুসলিম শাসনের অশরীরী মূর্তি হিসাবে বর্ণনা করেন । এসব আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় ধীরে ধীরে মুসলমান সমাজের মধ্যে রােয়েদাদের পক্ষে ঐকমত্য তৈরি হতে থাকে । অনেকেই মত পাল্টান ।
অতীতে জাতিয়তাবাদী সংগঠন কংগ্রেস , স্বরাজ্য পার্টি প্রভৃতি সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকা কয়েকজন মুসলমান যুবক একটি ঘােষণাপত্র বিলি করেন । তাতে প্রাক্তন স্বরাজী ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের প্রিয়পাত্র কলকাতার প্রাক্তন ডেপুটি মেয়র হােসেন সােহরাওয়ার্দি, এ কে ফজলুল হক , আবুল কাশেম , আজিজুল হক , তমিজউদ্দিন খান ও মােশারফ হােসেন প্রমুখ মুসলমান সমাজের বিভিন্ন গােষ্ঠী ও শিবিরের নেতৃবৃন্দ স্বাক্ষর করেন । ঐ ঘােষণাপত্রে লেখা হয় , “মিশ্র অনুভূতি নিয়ে আমরা ঐ রােয়েদাদ পড়েছি । বর্তমান অবস্থায় এটা একটা অগ্রগতি বলে আমরা এর প্রশংসা করি । তবে প্রাদেশিক আইনসভায় বাংলার মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নাতীত দাবির কথা ঐ রােয়েদাদে স্বীকার করা হয়নি , এটা হতাশাব্যঞ্জক। ৬ টি প্রদেশে মুসলমানদের স্থায়ি সংখ্যালঘিষ্ঠের মর্যাদা এবং বাস্তবে কেন্দ্রিয় আইনসভায় তাদের গুরুত্বহীন রাজনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে বাঙলার মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধিত্বের দাবি শুধু ন্যায্য নয় , যথার্থও বটে । ঐ দাবিকে উপেক্ষা করা উচিত হয়নি । আমরা অবশ্য পরিস্থিতিজনিত সমস্যাকে স্বীকার করি ”।
টাঙ্গাইলের একজন সম্পদশালী জমিদার ছিলেন এ.কে, গজনবী । তিনি বাঙলার মন্ত্রিসভায় দু’বার মন্ত্রি ছিলেন এবং সাইমন কমিশনেরও সদস্য ছিলেন । তিনি স্পষ্ট ভাষায় তার হতাশার কথা ব্যক্ত করেন । আশা করেছিলাম , “রােয়েদাদে বাঙলার আইন সভায় মুসলমানদের পরিষ্কারভাবে বিধিবদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেওয়া হবে । কিন্তু বাস্তবতঃ ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করার মতই , এই রােয়েদাদ আমাদের ব্রিটিশ সম্রাটের সরকারের বিশ্বাসঘাতকতার তিক্ত স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় "।
সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ ঘােষিত হয় ১৪ ই আগষ্ট , ১৯৩২ তাঁতিক্ষে। এই আগষ্ট মাসের একেবারে শুরুতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বি.পি সিংহরায় বেঙ্গল কাউন্সিলে যৌথ নির্বাচনের প্রস্তাবসহ পৌরসভার নির্বাচন সংক্রান্ত একটি বিল আনেন ।
(৭৭)
ওই প্রস্তাবে পৌরসভায় আসন সংরক্ষণের কথা ছিল না। কিন্তু বেশ কয়েকজন মুসলমান কাউন্সিল সদস্য ঐ বিলকে সমর্থন করেন । ফজলুল হক সহ একাধিক কাউন্সিল সদস্য ঐ বিলকে অভিনন্দন জানান । ৮ জন মুসলমান সদস্য বিলের পক্ষে এবং ২০ জন মুসলমান সদস্য বিলের বিপক্ষে ভােট দেন । জনাব সামাদ বলেন – কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে অধিকাংশ মুসলমান ঐ বিলের পক্ষে ভােট দিতে প্রস্তুত ছিলেন । যার মধ্যে অন্যতম শর্ত হলাে সার্বজনীন ভােটাধিকার ।
পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা সম্পর্কে অস্পৃশ্যদের (তফসিলী শ্রেণী) সর্বভারতীয় আন্দোলনের ক্ষেত্রেও মতপার্থক্য ছিল । এম . সি . রাজা এবং ড . আম্বেদকর এ প্রশ্নে ভিন্নমত পােষণ করেন । ড . আম্বেদকরও অন্ততঃ একবার সার্বজনীন ভােটাধিকারের শর্তে পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার দাবি ছাড়ার কথা ঘােষণা করেছিলেন ।
কিন্তু বাঙলার ক্ষেত্রে রােয়েদাদের বিরুদ্ধে ভদ্রলােকদের বিরােধিতার প্রচণ্ডতার প্রতিক্রিয়ায় মুসলমানরা পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হন । সময় যত যেতে থাকে ভদ্রলােকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সুর চড়াতে থাকেন । এ অবস্থায় এক সময় উত্তেজিত ফজলুল হক ঘােষণা করতে বাধ্য হন , “আমি যদি কোন বিচারককে সন্তুষ্টির জন্য একথা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হই যে , বাঙলার হিন্দুরা গভীর স্বার্থপরতার ওপর ভিত্তিশীল সাম্প্রদায়িকতার প্রতিরূপ , তাহলে আমি ফাঁসিতে ঝুলতে প্রস্তুত আছি ” (স্টেটসম্যান পত্রিকা , ১২ অক্টোবর ১৯৩৩) । এভাবে রােয়েদাদকে গড়ে তােলা হয় বিভক্তি ও বিবাদের কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে । হিন্দু ও মুসলমান রাজনীতিকরা পৃথক হয়ে যান । বাঙলার রাজনীতি ক্রমবর্ধমানভাবে দুই পৃথক সম্প্রদায়গত গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যায় ।
মহাত্মা গান্ধী স্বয়ং ১৯৩১ সালে দ্বিতীয় গােলটেবিল বৈঠকে যােগ দিয়েছিলেন । সেখানে তিনি মুসলমান , শিখ ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা মেনে নিলেও অস্পৃশ্যশ্রেণীর জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা মানতে রাজি হননি । তিনি হুমকি দিয়ে বলেন , “আমার যতটা আধিপত্য আছে , ততটা গুরুত্ব দিয়ে বলছি যে , আমার সঙ্গে যদি আর কেউ নাও থাকেন , তাহলেও আমি আমার জীবন দিয়ে অস্পৃশ্যদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিরােধ করবাে ”।
৭৮
সপ্তম অধ্যায়
সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ , পুনাচুক্তি ও বাঙলা কংগ্রেস
ইংরেজ সরকারের প্রতি মহাত্মা গান্ধীর হুমকির পরেও বিভিন্ন সূত্রে খবর বেরিয়ে আসে যে , ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ম্যাকডােনাল্ড ড.আম্বেদকরের দাবি মেনে অস্পৃশ্যদের পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার পক্ষে ঘােষণা করতে চলেছেন । তখন মহাত্মা গান্ধী আবারও চিঠি লিখে ইংরেজ সরকারকে আমরণ অনশনের হুমকি দেন । ১৯৩২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এই চিঠির জবাবে লেখেন , “আপনার অনশনের কারণ হলাে , নির্যাতিতশ্রেণীর মানুষ যেন তাদের পক্ষে কথা বলার জন্য নিজেদের কোন প্রতিনিধি নির্বাচিত না করতে পারেন"। – ব্রিটিশরা মহাত্মা গান্ধীর দাবি মানেন না । তাই , ১৯৩২ সালের ২০ শে সেপ্টেম্বর পূণার যারবেদা জেলে আটক অবস্থায় তিনি আমরণ অনশন আন্দোলন শুরু করেন । তাঁর দাবি ছিল , সম্প্রদায়গত রােয়েদাদের যে অংশে অস্পৃশ্যদের পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে , শুধুমাত্র তা প্রত্যাহার করা । অনশনের চতুর্থদিনে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় , যা পূণাচুক্তি নামে খ্যাত বা অখ্যাত । এই চুক্তির ফলে অস্পৃশ্যদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার সুযােগ হাতছাড়া হয়ে যায় ; কিন্তু একইসাথে সম্প্রদায়গত রােয়েদাদে যেখানে সারাভারতের প্রাদেশিক আইন সভায় তফসিলীদের জন্য মাত্র ৭১ টি আসন সংরক্ষিত করা হয়েছিল , এই চুক্তির ফলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪৮ ; অর্থাৎ দ্বিগুণেরও ৬ টি আসন বেশি । কিন্তু বাঙলার ক্ষেত্রে তফসিলীদের সংরক্ষিত আসন হয়ে যায় ৩ গুণ ; অর্থাৎ বাঙলার প্রাদেশিক আইনসভায় অস্পৃশ্য বা তফসিলীদের জন্য ৩০ টি আসন সংরক্ষণ করা হয় । বাঙলার প্রাদেশিক আইনসভায় ভদ্রলােকশ্রেণীর আসন সংখ্যা ৭০ থেকে কমে দাঁড়ায় ৫০, যা মােট আসনের মাত্র ২০ শতাংশ । আর ১৭.৬০ শতাংশ অস্পৃশ্যরা পান ১২ শতাংশ আসন । রােয়েদাদের বিরুদ্ধে গান্ধীর অনশন আন্দোলনকে বাঙলার ভদ্রলােকশ্রেণী জোরালো সমর্থন দেন । হয়তাে তারা আশা করেছিলেন যে, এই অনশনের জন্য গোটা সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ বাতিল বলে ঘােষিত হতে পারে। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু
(৭৯)
এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যৌথ আহ্বানে কলকাতার ভারতসভা হলে ভদ্রলােকশ্রেণীর সভা হয়। গান্ধীর আন্দোলনের সমর্থনে প্রস্তাব পাশ হয় । সেই বার্তা নিয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পূণার উদ্দেশ্যে রওনা হন গান্ধীকে শক্তি ও সাহস জোগাতে । পুনাচুক্তি সম্পাদন হওয়ায় গান্ধী অনশন ভঙ্গ করেন । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পূণাচুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বা সমর্থন করেন। কিন্তু যখন বাঙলার ভদ্রলােকশ্রেণী দেখলেন ও জানলেন যে , ঐ চুক্তিতে তাদের আশা ও আকাঙ্খা মেটেনি ; বরং তাদের জন্য তা আরও অসুবিধাজনক হয়েছে , তখন তারা ক্ষিপ্ত হন । স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে এক অর্থে অপদস্থ করা হয় ঐ চুক্তিতে স্বাক্ষর বা সমর্থন করার জন্য । তাকে বাধ্য করা হয় বড়লাটকে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে স্বাক্ষর ও সমর্থন প্রত্যাহার করার জন্য । টেলিগ্রামে রবীন্দ্রনাথ লিখতে বাধ্য হন, “আমি রাজনীতির লােক নই । তাই , ভাল-মন্দ না বুঝে আমি ঐ দলিলে স্বাক্ষর করেছি – তা এখন প্রত্যাহার করে নিচ্ছি” (পুরো বিষয়বস্তু এই বইয়ে আগে বিশদে বলা হয়েছে)। সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ এবং পূণাচুক্তির ফলে কংগ্রেস হাইকমান্ড ও স্বয়ং গান্ধীর সাথে বাঙালি কংগ্রেস নেতাকর্মীদের সম্পর্কে চিড় ধরে । তারা এই চুক্তিকে বাঙলার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা বলে অভিহিত করেন । মিঃ জে , এল ব্যানার্জী বাঙলার কাউন্সিলে এক জ্বালাময়ী ভাষণে ঘােষণা করেন , “পরিস্থিতির একটা সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি হল যে , জাতীয়তাবাদের সংস্কারক নেতা (গান্ধী) নিজেকে বাঙলার জাতীয়তাবাদের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসাবে প্রমাণ করেছেন” । যাই হােক না কেন , কংগ্রেস দল তার সর্বভারতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের শান্ত করার প্রয়ােজন ছিল এবং হাইকমান্ড বাঙলার ভদ্রলােকশ্রেণীর দাবিকে উপেক্ষা করে । এই অবস্থায় বাঙলার কংগ্রেস দলের দায়িত্ব তারা এমন লােকের হাতে দিয়ে রাখতে চায় , যারা , কেন্দ্রের কথা মতাে চলবে । সুভাষচন্দ্র বসু ও তার সমর্থকরা কেন্দ্রের এই মানসিকতার বিরােধিতা শুরু করেন । কেন্দ্রের কর্তৃত্ব অস্বীকার করে নিজেদের পথে চলতে থাকেন । সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ এবং পুনাচুক্তির জোরদার বিরােধিতা করায় সুভাষচন্দ্র বসু বহুলােকের সমর্থন পান । এই সমর্থনের পাল্লা এতবেশি ভারি ছিল যে , তাকে আর উপদল বলা চলে না । এই সময়ে ১৯৩৪ সালের ১৮ ই আগস্ট বসু ভ্রাতৃদ্বয় (সুভাষচন্দ্র এবং শরৎচন্দ্র বসু) ন্যাশনালিস্ট পার্টির বেঙ্গল কমিটি গঠন করেন । আইনসভার ভেতরে এবং বাইরে সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ ও পূণা চুক্তির বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করেন। রােয়েদাদের প্রতিক্রিয়ায় বেঙ্গল কংগ্রেসে যে ঐক্য স্থাপিত হয়েছিল , এখন আবার তা সরাসরি দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায় ।
(৮০)
১৯২৭ সালে গান্ধী বেঙ্গল কংগ্রেসের সভাপতি নিযুক্ত করেছিলেন যতীন্দ্রমােহন সেনগুপ্তকে । ১৯৩৩ সালে তিনি মারা যাবার পর বাঙলা কংগ্রেসের দায়িত্ব অর্পিত হয় ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের উপর । ডাঃ রায় মহাশয় কিরণশংকর রায় এবং নলিনীরঞ্জন সরকারের সমর্থন পেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠেন । সুভাষচন্দ্র বসু এবং শরৎচন্দ্র বসু - --এই দুই ভাই পরিচালিত গ্রুপ অত্যন্ত কঠোরভাবে রােয়েদাদ এবং পুনাচুক্তির বিরােধিতা চালিয়ে যান । ১৯৩৪ সালের দিকে ডাঃ রায় খবর পেতে থাকেন যে , জনমত ন্যাশনালিস্ট পার্টি অর্থাৎ বসু ভ্রাতৃদ্বয়ের পক্ষে । শরৎচন্দ্র বসু বেঙ্গল প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটিতে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন । তাহলাে , “সম্প্রদায়গত সিদ্ধান্তের ব্যাপারে বলা যায় , সমস্যা সর্বভারতীয় হলেও বাঙলাপ্রদেশের জন্য তা অত্যন্ত গভীর ও অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ... সম্প্রদায়গত ঐ সিদ্ধান্তকে প্রত্যাহার করার জন্য আইনসভার অভ্যন্তরে ও বাইরে আন্দোলন পরিচালনা করা প্রাদেশিক কংগ্রেস সংগঠনের একটা কর্তব্য" । – এই প্রস্তাব অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয় । এই প্রস্তাব কংগ্রেসের কেন্দ্রিয় ওয়ার্কিং কমিটিতে নিজের মতামত লিখে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় পাঠিয়ে দেন । তিনি লেখেন , “এর মাধ্যমে রােয়েদাদ সম্পর্কে ন্যাশনালিস্ট পার্টি ও কংগ্রেসের মধ্যে যে মতপার্থক্য আছে , তার নিরসন হবে"। কিন্তু কোনভাবেই কেন্দ্রিয় নেতৃত্ব এই প্রস্তাবে সায় দিল না ; বরং ডাঃ রায়কে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তিরস্কার করলেন ঐ মতামত লিখে পাঠাবার জন্য । কেন্দ্রীয় কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ আশা করেছিলেন যে , ডাঃ রায় বাঙলার কংগ্রেসে বসু পরিবারের কর্তৃত্ব খর্ব করতে পারবেন । কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় কোন অর্থেই শরৎচন্দ্র বসুর সমকক্ষ ছিলেন না । ফলে , কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সে আশা ব্যর্থ হয় । শ্রীবসু কংগ্রেস হাইকমান্ড ও গান্ধীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত হন । সেই সময়ে শরৎচন্দ্র বসু বাঙলাপ্রদেশ কংগ্রেসের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি । ফলে , পণ্ডিত নেহেরু একটু নরম হন ; কিন্তু অবস্থান বদল করতে রাজি হন না । ডাঃ রায় বেগতিক দেখে হাইকমান্ডের সাথে চলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করেন । কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ন্যাশনালিস্টরা ১৯৩৭ সালের আইনসভার নির্বাচনে প্রার্থী দাঁড় করিয়ে রােয়েদাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা লিখে ঘােষণাপত্র বিলি করেন । এই সময়ে বল্লভভাই প্যাটেল শক্ত হাতে হাল ধরেন । কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টারি বাের্ডের সভাপতি হিসাবে তিনি ঘোষণা করেন যে , এই জাতীয় বিশৃঙ্খলা বরদাস্ত করা হবে না। এই হুমকিতে বাঙলার রয়েল বেঙ্গল টাইগাররা পিছু হটেন । ন্যাশনালিস্ট নিয়ন্ত্রিত বেঙ্গল প্রদেশকংগ্রেস কমিটি ৮ ই নভেম্বর , ১৯৩৬ তারিখের ঘােষণাপত্র পরিবর্তন করে রােয়েদাদের প্রতিটি বক্তব্যই গ্রহণ করে । (৮১)
অষ্টম অধ্যায়
১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন
১৯৩৭ সালের গােড়াতে প্রাদেশিক আইন সভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় । নির্বাচনে ৪ টি প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল । কংগ্রেস , মুসলিম লীগ , কৃষক প্রজা পার্টি এবং স্বতন্ত্রপন্থিরা (নির্দল)।
কৃষক প্রজা পাটি জমিদার ও জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে এবং জোতদার ও প্রজা কৃষকদের স্বার্থের পক্ষে নির্বাচনী প্রচার শুরু করে । পার্টি গঠনের সময়ে ফজলুল হক যে সমস্ত কর্মসূচী ঘােষণা করেছিলেন , তা এই লেখায় পূর্বে আলােচনা করা হয়েছে । ঐসব কর্মসূচীর সাথে রাজবন্দিদের মুক্তির বিষয়টিও তিনি যুক্ত করেন । এককথায় বলতে গেলে এই নির্বাচনে একমাত্র কৃষক প্রজা পার্টি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক শক্তি ।
এই পার্টিতে অনেক হিন্দু ও তফসিলী সম্প্রদায়ের নেতা , কর্মী ও সমর্থক ছিলেন । তাদের মধ্যে অনেকে ছিলেন জোতদার । কিন্তু এই পার্টি কোন হিন্দু বা তফসিলী সংরক্ষিত আসনে প্রার্থী দেয়নি । সম্ভবতঃ কংগ্রেস দলের সাথে এক অলিখিত সমঝােতার জন্যই ঐসব আসনে প্রার্থী দেওয়া হয়নি । একইকারণে কংগ্রেসও গ্রামাঞ্চলে কোন মুসলমান সংরক্ষিত আসনে প্রার্থী দেয় না । কিন্তু নির্বাচন প্রক্রিয়ায় এই যে সমঝােতার পরিবেশ ছিল , নির্বাচনের পর তার পরিবর্তন হয় । শেষ পর্যন্ত কৃষক প্রজা পার্টির সাথে মুসলিম লীগের কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয় – যে আলােচনা আমরা পরে করবাে ।
নির্বাচনের প্রাক্কালে ফজলুল হক মুসলিম লীগের নেতা ঢাকার নবাব খাজা নাজিমুদ্দিনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন , “নবাব নিজের পছন্দমতাে কেন্দ্র বেছে নিন , আপনি যেখানে দাঁড়াবেন , সেই কেন্দ্রে আপনাকে পরাস্ত করবাে” । নবাব তার নিজের এস্টেটের অংশ পটুয়াখালী (উত্তর) কেন্দ্রে দাঁড়াবার সিদ্ধান্ত নেন । এই এলাকায় ১৯২৭ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় । মুসলিম লীগ এখানে বাড়তি
(৮২)
সুবিধা পাবে বলে দল অনুমান করেছিল । তাই , নিশ্চিত কেন্দ্র মনে করে এই কেন্দ্রে পার্টির নেতা নাজিমুদ্দিনকে দল মনােনয়ন দেয় ।
এই নির্বাচনে ঢাকার আহসান মনজিলের সব ক্ষমতা এবং প্রতিপত্তিকে কাজে লাগানাে হয় । ইসলামের প্রতি আহ্বান জানিয়ে পল্লি এলাকার ভােটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা হয় । এমনকি স্যার জন আন্ডারসন ঐ সময়ে পটুয়াখালী সফর করে খাজা নাজিমুদ্দিন সাহেবকে ভােট দেবার আহ্বান জানিয়ে এক বেনজির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন ।
ফজলুল হক বলেন , “এ হলাে জমিদার এবং কৃষকদের মধ্যকার সর্বাত্বক সংগ্রাম । নির্বাচনে জিততে পারলে আমি আল্লাহর রহমতে সম্ভাব্য সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে জমিদারি প্রথা বাতিল করবাে ।... কৃষকদের দাবি পূরণে হক সরকার ব্যর্থ হলে , আমি রাইটার্স বিল্ডিং - কে লালদীঘিতে নিক্ষেপ করবাে”। নির্বাচনে নাজিমুদ্দিন শােচনীয়ভাবে পরাজিত হন । তিনি হক সাহেবের প্রাপ্ত ভােটের অর্ধেকেরও কম, মাত্র ৬৩০৮ টি ভােট পান । হােসেন সােহরাওয়ার্দি কলকাতার দুটো আসনে দাঁড়িয়ে দু’টিতেই জয়যুক্ত হন । একটি ছেড়ে দেন এবং উপনির্বাচনে নাজিমুদ্দিন সাহেব বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন ।
মুসলিম লীগের সর্বভারতীয় নেতা মােহাম্মদ আলি জিন্নাহ এবং বাঙলার মুসলিম লীগের অন্যতম প্রধান নেতা হােসেন সােহরাওয়ার্দি প্রমুখ ব্যক্তি , সাম্প্রদায়িক ও ধর্মভীরু ছিলেন না । কিন্তু মুসলিম লীগের নির্বাচনী প্রচারণায় শুধুমাত্র মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যের ডাক এবং সামগ্রিকভাবে মুসলমান সম্প্রদায়ের কল্যাণের আহ্বান জানানাে হয় । লীগ দাবি করে যে , তাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলাে প্রজাকৃষক ও শ্রমিকদের ভাগ্যের উন্নতি করা । এই নির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি ছিল কৃষক প্রজা পার্টি । ফলে , হিন্দুদের বিরুদ্ধে লড়াই যতটা নয় , মুসলমান সম্প্রদায়ের নিজেদের মধ্যে এই লড়াই প্রায় গৃহযুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করে । ফজলুল হকের মােকাবিলা করতে মুসলিম লীগকে অনেক লােকপ্রিয় কর্মসূচী ঘােষণা করতে হয়।
মুসলিম লীগের থেকেও কংগ্রেসের অবস্থা ছিল বেশি সমস্যার । মােট ২৫০ টি আসনের মধ্যে ১৭৮ টি আসনের সদস্য নির্বাচিত হবে পল্লী এলাকার ভােটারদের দ্বারা । সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ অনুযায়ী কংগ্রেস যদি শুধু হিন্দুদের জন্য বরাদ্দকৃত আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে , তাহলে তাদেরকে মােট ৮০ টি আসনের মধ্যে ৬৬ টি পল্লী এলাকার আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে । এসব এলাকার ভূমিসংক্রান্ত বিরােধকে শুধুমাত্র সাম্প্রদায়িক বিরােধ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না । এ অবস্থায়
(৮৩)
প্রদেশ কংগ্রেস পল্লী এলাকার ভােটের সন্ধানে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পুণর্বিবেচনা করতে বাধ্য হয় ।
নতুন ভােটারদের নিয়ে অংকের হিসাব এবং অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব বেঙ্গল কংগ্রেসের সামনে বড় সমস্যা হিসাবে দেখা দেয় । তাদের সমর্থক জমিদার ও মধ্যবর্তী রায়তস্বত্বের অধিকারীরা ছিলেন ভীষণ সংকটের মধ্যে । কংগ্রেস জমিদার ও সুদ ব্যবসায়িদের স্বার্থ পাশ কাটিয়ে সাধারণতঃ বৃটিশ বিরােধী কর্মসূচী নিয়ে আন্দোলন করতাে । জমিদারি প্রথা বিলােপ , সুদ ও খাজনা বন্ধের মত দাবিগুলি তারা কখনও সমর্থন করতাে না ।
প্রকৃতপক্ষে কংগ্রেস দলের বেশিরভাগ নেতা ছিলেন অনুপস্থিত জমিদার, মফঃস্বল এলাকায় তাদের অনেকের এস্টেট ছিল এবং যেকোনভাবেই হােক তাদের খাজনা আদায় সংক্রান্ত স্বার্থ ছিল । যেমন : ঢাকায় কিরণশংকর রায়ের বিরাট জমিদারি ছিল । তুলসীচরণ গােস্বামী ছিলেন সম্পদশালী ভূস্বামী । তারকনাথ মুখার্জীর উত্তরপাড়ায় জমিদারি ছিল । যুগান্তর গ্রুপের নেতা , পরে বাঙলা কংগ্রেসের সভাপতি সুরেন্দ্রমােহন ঘােষ ছিলেন ময়মনসিংহের জমিদার । বিজয় রায়চৌধুরী ছিলেন তুলসীঘাটার জমিদার । এভাবে দেখা যায় অধিকাংশ কংগ্রেস নেতার পল্লী এলাকায় অনেক ভূসম্পত্তি ছিল । প্রায় সব নেতা কর্মীদের , শরিকানায় ও মধ্যস্বত্বের অধিকারে খাজনা আদায়ের স্বার্থ ছিল । এই দল চলতাে মফঃস্বল এলাকার জমির মালিক ও সুদ ব্যবসায়িদের পৃষ্টপােষকতায় । গান্ধীবাদী আশ্রমগুলি চলতাে জমিদারদের টাকায় । জমিদার ইন্দুভূষণ গুপ্ত , জমিদার কালীপ্রসন্ন গুহচৌধুরী , গঙ্গাজলঘাটার স্থানীয় জমিদার , সােনামুখী , শিমলিপলের রাজপরিবার , গৌরীপুরের জমিদার বিজেন্দ্র কিশাের প্রভৃতি জমিদার ও রাজপরিবারের সদস্যরা টাকা দিতেন । ফলে কংগ্রেসের পক্ষে জমিদারদের স্বার্থ উপেক্ষা করা কঠিন ছিল ।
সাধারণতঃ জেলার ভদ্রলােকদের মধ্যথেকে এই দলের সদস্য নেওয়া হতাে । দলের সদস্যদের মধ্যে ছিল স্কুলশিক্ষক , উকিল , বেতনভােগী কর্মচারী এবং নিশ্চিতভাবে ছাত্ররা । ত্রিশের দশকের প্রথমদিক থেকে বেঙ্গল কংগ্রেস হয়ে পড়ে পুরােপুরি শহরভিত্তিক – যদিও ভূমি সম্পর্কিত স্বার্থের সাথে এই দলের সম্পর্ক তখনও পর্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল ।
এরকম এক পরিস্থিতিতে বেঙ্গল কংগ্রেস নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলে অবাক হবার কিছু ছিল না । কিন্তু হাইকমান্ড যেহেতু নির্বাচনে লড়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে , তাই , তাদের পিছু হটার জায়গা ছিল না ।
এই অবস্থায় আশার জায়গা এটুকু ছিল যে , পার্টির একটা ক্ষুদ্র অংশ কৃষকদের
(৮৪)
স্বার্থে লড়াই করতে ইচ্ছুক ছিলেন । তাদের পল্লী অঞ্চলে কিছু ভিত্তি ও গ্রহণযােগ্যতাও ছিল । সন্ত্রাসী গ্রুপগুলাের কিছু নেতা জেলে ছিলেন , ইতিমধ্যে তারা ছাড়া পান । তাদের মধ্যে অনেকেই মার্কসবাদে দীক্ষিত হয়েছিলেন । এই নির্বাচনে তারা কংগ্রেসের পাশে দাঁড়ান । কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইণ্ডিয়া কৌশল হিসাবে ১৯৩৫ সালে কংগ্রেসের সাথে কাজ করার লক্ষ্যে ইউনাইটেড ফ্রন্ট গঠন করে ।
এ প্রসঙ্গে ছােট্ট একটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৯৩৩ সাল নাগাদ শরৎচন্দ্র বসু এবং প্রফুল্ল ঘােষ মেদিনীপুরে একটি সভা করতে যান । ঐ সময় মেদিনীপুর ছিল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি । সেই সভাতে খুব অল্প লােক হাজির হন । তাদের বক্তৃতা চলাকালে শ্রোতারা বার বার বাধা দেন । সভা শেষ হলে , একজন স্থানীয় সাধারণ লােক উঠে দাঁড়িয়ে স্পষ্টভাবে বলেন , “কংগ্রেস তাদের কাছে শুধু ভােট চাওয়ার জন্য এসেছেন ... কিন্তু যখন তারা দুর্দশার মধ্যে ছিলেন , তখন কংগ্রেসকে দেখা যায়নি"।
যাহােক , এই দুরবস্থার মধ্যেও বামপন্থী ও প্রাক্তন সন্ত্রাসীদের সহায়তায় কংগ্রেস নির্বাচনী লড়াই করে এবং মােটামুটি সাফল্য লাভ করে । আসলে যে সাম্প্রদায়িক বাতাবরণ বাঙলায় সৃষ্টি করা হয় , সেই অবস্থায় হিন্দুদের কংগ্রেসকে ভােট দেওয়া ছাড়া কোন বিকল্প ছিল না । কারণ তখন ছিল পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা।
এই নির্বাচনে কংগ্রেস ৫২ টি আসন লাভ করে নতুন আইন সভায় একক বৃহত্তম দল হয় ; কিন্তু তার অবস্থান হয় প্রধান বিরােধী দল হিসাবে । হিন্দুদের মধ্যকার বাকি আসনে স্বতন্ত্রপ্রার্থীরা জয়লাভ করেন ।
মােট ভােটের শতকরা ৩১.৫০ ভাগ ভােট পেয়ে কৃষক প্রজা পার্টি সর্বমােট ৩৬ টি আসন পায় । তারমধ্যে পল্লী এলাকায় ৩৩ টি এবং বাকি ৩ টি আসন পায় মফঃস্বল এলাকায় ।
মুসলিম লীগ পায় মােট ভােটের – ২৭.১০ ভাগ । কিন্তু তারা মােট আসন পায় ৩৯ টি । তারমধ্যে পল্লী এলাকায় ২৭ টি , শহর এলাকায় পায় ৬ টি এবং মফস্বল এলাকায় ৬ টি আসন পায় মুসলিম লীগ । বাকি ৪২ টি মুসলিম সংরক্ষিত আসন পায় স্বতন্ত্রপ্রার্থীরা – যার অধিকাংশ ছিলেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি , যাদের প্রত্যেকের নিজ নিজ এলাকার ভােটারদের উপর কর্তৃত্ব ছিল । এই সব আসনের মধ্যে টিপেরা (কুমিল্লা) কৃষক সমিতি নামে একটি সংগঠন ঐ জেলার ৭ টি আসনের মধ্যে ৫ টি আসন দখল করে । কৃষকনেতা ওয়াসিমুদ্দিন আহমদ টিপেরা (কুমিল্লা) কেন্দ্রিয় নির্বাচনী এলাকা থেকে তখনকার মন্ত্রী , জমিদার ও নবাব স্যার কে জি এম ফারুকিকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন ।
(৮৫)
দু’জন অত্যন্ত প্রভাবশালী মুসলমান রাজনীতিকের সম্প্রদায়ভিত্তিক আহ্বান গ্রামের সাধারণ মুসলমান ভােটাররা কীভাবে প্রতিহত করে তার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় নবাব ফারুকী এবং ঢাকার নবাব খাজা নাজিমুদ্দিনের শােচনীয় পরাজয়ের মাধ্যমে । তাই , মুসলিম লীগকে ভােট দেওয়া মানে বাঙলার কৃষকদের মুসলিম লীগকে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন বা পছন্দের ভােট , একথা নিদ্বিধায় বলা যাবে না । বাঙলার কৃষক সম্প্রদায়ের ঐক্যের অনুভূতি নিছক ধর্মভিত্তিক ছিল না ।
(৮৬)
নবম অধ্যায়
বাঙলার প্রথম মুসলিম মন্ত্রিসভা
১৯৩৭ সালের নির্বাচনের আগে কৃষক প্রজা পার্টি এবং কংগ্রেসের মধ্যে এক ধরনের সমঝােতা হয়েছিল ঠিকই ; কিন্তু বাঙলা প্রাদেশিক সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে কোয়ালিশন সরকার হলাে না । এই কোয়ালিশন না হবার অন্যতম বড় কারণ হলাে — কংগ্রেস জমিদারদের স্বার্থ দেখতে বদ্ধপরিকর এবং উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকদের স্বার্থের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ । অন্যদিকে কৃষক প্রজা পার্টি জোতদার ও প্রজাকৃষক এবং সাধারণভাবে মুসলমানদের চাকরি ও শিক্ষার সুযােগ সৃষ্টির জন্য দায়বদ্ধ ছিল । কোয়ালিশন সরকারের কর্মসূচী নিয়ে আলােচনার সময় কংগ্রেস মুখপত্র শরৎচন্দ্র বসু , ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় ও কিরণশংকর রায় চান যে , রাজবন্দিদের মুক্তির বিষয়টি সরকারের কাছে অগ্রাধিকার পাক এবং প্রয়ােজনে এই ইস্যুতে মন্ত্রীসভাকে পদত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে । কৃষক প্রজা পার্টিরও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে রাজবন্দিদের মুক্তির বিষয়টি ছিল ঠিকই ; কিন্তু তাদের কাছে কৃষকের কল্যাণই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ । তারা মনে করেন — রাজবন্দিদের মুক্তির প্রশ্নে পদত্যাগ করলে কৃষক কল্যাণের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে – তাই তারা তাতে রাজি হননি ।
এই অবস্থায় কৃষক প্রজা পার্টির সাথে মুসলিম লীগের সমঝােতা হয় । এই সমঝােতা ছিল রাজনৈতিক দিক দিয়ে খুবই অস্বাভাবিক । কারণ একই মুসলমান ভােট নিয়ে তাদের মধ্যে ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে আগামীদিনেও । তবুও ঠিক হয় জমিদারদের ক্ষতিপূরণ দেবার শর্তে মুসলিম লীগ জমিদারি বিলােপের জন্য গৃহীত ব্যবস্থাকে সমর্থন করবে ।
ঢাকার নবাবদের মত উচ্চশ্রেণীর মুসলমানদের , তাদের এস্টেটের আর্থিক ক্ষতিপূরণ হিসাবে পুরস্কার স্বরূপ বিভিন্ন সরকারি পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় । কিন্তু ক্ষমতায় না থাকায় এই ধরনের সুবিধা দেবার সুযােগ
(৮৭)
তখন কংগ্রেসের ছিল না । তাই , হিন্দু জমিদাররা আরও বেশি ক্ষতির আশংকা করেন ।
কৃষক প্রজা পার্টি ও মুসলিম লীগের কোয়ালিশন মন্ত্রিসভার প্রধান হিসাবে অর্থাৎ বাঙলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী (প্রিমিয়ার) হিসাবে এ . কে . ফজলুল হক ১৯৩৭ সালের ১ লা এপ্রিল শপথ নেন । ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত বাঙলায় মােট ৪ বার মন্ত্রিসভা ভেঙে যায় এবং নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয় ।
১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত সারাভারতের ৬ টি হিন্দুসংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে কংগ্রেস সরকার পরিচালনা করে । তারপর নভেম্বর মাসে হাইকমাণ্ডের নির্দেশে একযােগে সব মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে । মুসলমানরা কংগ্রেসী শাসনকে দৃঢ়ভাবে বিরােধিতা করেন । তাদের অভিযােগ – ঐসব প্রদেশে কংগ্রেস বাস্তবতঃ হিন্দুরাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে । ড . আম্বেদকর মুসলমানদের এই দাবির সাথে সহমত পােষণ করেন এবং এই পদত্যাগের পর মুসলমানরা যে মুক্তিদিবস পালন করেন তাতে বম্বের ভেনডি বাজারের এক সভায় জিন্নার সাথে ড . আম্বেদকরও অংশগ্রহণ করেন । এই সময়কার কংগ্রেসী শাসনে অস্পৃশ্য , শ্রমিক ও কৃষকরা খুশি ছিলেন না ।
বাঙলার এই সরকার , কোন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সরকার ছিল না ; বরং পরস্পর বিরােধী কর্মসূচী সম্পন্ন দুটি দলের কোয়ালিশন সরকার ছিল । তবুও এই সরকার যেভাবে , সাধারণভাবে হিন্দু ও মুসলমান গরিব প্রজাকৃষক , জোতদার , ধনীকৃষক এবং শিক্ষিত মুসলমান ও তফসিলীশ্রেণীর স্বার্থে বিভিন্ন আইন ও নীতি প্রণয়ন করেছে এবং তার সঠিক বাস্তবায়ন করেছে , তা শিক্ষণীয় ও উল্লেখযােগ্য । সাম্প্রতিককালে ভারতের উত্তর প্রদেশে মায়াবতীর নেতৃত্বে পিছিয়ে পড়া মানুষের হাতে সে সুযােগ এলেও তারা তা কিছুমাত্র কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয় ।
বাঙলায় সর্বপ্রথমে হয়েছিল কৃষক প্রজা পার্টি ও মুসলিম লীগের কোয়ালিশন সরকার এবং একেবারে শেষে হয় মুসলিম লীগ ও তফসিলীদের যৌথ সরকার । মহাপ্রাণ যােগেন্দ্রনাথ মণ্ডল প্রায় দেড় ডজন নির্দল ও অন্যান্য তফসিলী প্রাদেশিক আইনসভা সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ করেন ও মুসলীম লীগকে শর্তযুক্ত সমর্থন দেন সরকার গঠন করার জন্য । এই সময়ে বাঙলার আইন সভায় এমন সব আইন প্রণীত হয় , যাকে , যেকেউ অভিযােগ করতে পারেন – উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণীর স্বার্থের বিনিময়ে মুসলমান স্বার্থকে রক্ষা করার সামিল । কিন্তু বাস্তবতঃ এইসব আইনের ফলে হিন্দু - মুসলমান জোতদার , প্রজা কৃষক ও সাধারণ মানুষই উপকৃত হন ।
এই পর্যায়কালে আইনসভার মুসলমান সদস্যদের প্রস্তাব, সিদ্ধান্ত ও আক্রমণ
(৮৮)
প্রতিহত করার ক্ষেত্রে কংগ্রেস ছিল অসহায় । প্রথমতঃ কংগ্রেস টিকিটে পল্লীএলাকা থেকে যারা জয়যুক্ত হয়ে বাংলার আইনসভার এসেছিলেন , তারা ছিলেন অধিকাংশই নতুন । পল্লী ও মফঃস্বল এলাকায় তারা লালিত পালিত ও বড় হয়েছেন । তাদের অভিজ্ঞতা বলতে ইউনিয়ন , জেলা বাের্ড বা কৃষক সমিতিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা । এই সীমিত অভিজ্ঞতার প্রশ্ন ছাড়াও তারা প্রকৃতপক্ষে কৃষক ও জোতদারের পক্ষে সরব ছিলেন ।--- কারণ তাতেই তাদের স্বার্থ ও লাভ । এদের অনেকেরই এক সময়ের নেতা ছিলেন ফজলুল হক।
বেঙ্গল প্রজাস্বত্ব (সংশােধিত) বিল বাঙলার আইনসভায় উত্থাপন করা হয় ১৯৩৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে । এই আইনের মাধ্যমে জমিদারদের ক্ষমতা অর্ধেক করে দেওয়া হয় , যাতে পক্ষান্তরে জোতদার ও ধনী কৃষকদের হাত শক্ত হয় । প্রজা কৃষকরাও উপকৃত হন । কার্যতঃ এই আইনের ফলে পল্লীএলাকায় হিন্দুকর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখােমুখি দাঁড়ায় । জমিদাররা এই আইনকে সাম্প্রদায়িক বলে আখ্যায়িত করে এবং তা দেশে বিশৃঙ্খলা ডেকে আনবে বলে মন্তব্য করেন ।
এরপর আনা হয় অন্য আরেকটি বিল । এই আইনের ফলে কৃষিপণ্য ও অন্যান্য জিনিসপত্র বিক্রয়ের স্থানীয় বাজার বা জমিদারি হাটের উপর আঘাত আসে । এই হাটগুলি ছিল জমিদারদের অন্যায্য আয়ের একটা প্রধান উৎস । এই আইনের মাধ্যমে সরকারি হাট প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয় এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে হাট বসানাের জন্য লাইসেন্স প্রথা চালু করা হয় । এর মাধ্যমে জমিদারদের হাটগুলাের ক্ষতি করা ও তাদের আয় নষ্ট করার ব্যবস্থা করা হলাে বলে অভিযােগ করে জমিদার ও ভদ্রলােকশ্রেণী । অবশ্য এইসব পদক্ষেপের জন্য সাধারণ হিন্দু মুসলমান মানুষ ও কৃষকরা উপকৃত হন ।
এই মন্ত্রিসভা ১৯৩৫ সালে তৈরি বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ডেটরস্ এ্যাক্ট , ১৯৩৫-এর আশু বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করে । ১৯৩৭ সালে সরকার গঠনের এক বছরের মধ্যে ৩০০০ গ্রামে ঋণ সালিশী বাের্ড গঠন করা হয় । যেখানে সুদ ব্যবসায়ী ও ঋণ গ্রহীতাদের মধ্যে আলােচনার মাধ্যমে এক সমঝোতার ব্যবস্থা করা হতাে ; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে , এরফলে ঋণগ্রহীতারা ঋণ পরিশােধ না করতে উৎসাহ পান । ফলে , সুদখােররা মারাত্মক সংকটে পড়েন ।
এরপর ১৯৪০ সালে বেঙ্গল মানিলেণ্ডার্স এ্যাক্ট তৈরি হয়। এই আইনের দ্বারা সুদখােরদের জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয় এবং সর্বোচ্চ সুদের হার বাৎসরিক শতকরা ৮ টাকা করা হয় । সুদ ব্যবসায়ের কর্তৃত্বে ছিল হিন্দু পেশাগত মহাজন , বেনিয়া , দোকানদার ও ভূমি মালিকরা । দীর্ঘদিন ধরে চক্রবৃদ্ধি হারে ও
(৮৯)
চড়া সুদে ব্যবসা করে তারা ফুলে ফেঁপে ওঠেন । এই আইন তাদের অন্যায্য ব্যবসার মূলে কুঠারাঘাত করে ।
এসব আইনের ফলে মুসলমান জমিদারদের স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে । ঢাকার নবাবদের আত্মীয় পরিজন মিলে মােট ১১ জন জমিদার আইনসভার সদস্য ছিলেন । ছিলেন নাজিমুদ্দিন সাহেবও । তারা চেষ্টা করতে থাকেন আইনে কিছু কিছু সংশােধনী এনে নিজেদের স্বার্থ অক্ষুন্ন রাখতে । এসব কারণে নতুন আইনের ধার অনেক ক্ষেত্রে বেশ কিছুটা ভোঁতা হয়ে যায় ।
এই সরকার শিক্ষিত ও মধ্যবিত্তশ্রেণীর মুসলমানদের সুযােগ সুবিধা সৃষ্টির লক্ষ্যে রাজনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে । মধ্যবিত্ত মুসলমানদের জন্য প্রশাসনিক ও আইনগত সুবিধা দেওয়া হয় , যা পরােক্ষে প্রায় সবক্ষেত্রেই হিন্দু মধ্যবিত্তশ্রেণীর একচেটিয়া আধিপত্য ও স্বার্থকে প্রভাবিত করে । ১৯৩৮ সালে ফজলুল হক মন্ত্রীসভা পুলিশ নিয়ােগের নীতি পরিবর্তন করে । পুলিশ সুপারিনটেনডেন্টকে নিশ্চিত করতে বলা হয় , যেন নিয়ােগকৃত বাঙালি কনস্টেবলের মধ্যে অবশ্যই ৫০ শতাংশ মুসলমান কনস্টেবল হন । ঐ বছরেই সরকার আইন প্রণয়নের মাধ্যমে শতকরা ৬০ ভাগ সরকারি নিয়ােগ মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত করে দেয় । ১৯৩৯ সালে সরকার স্থানীয় সংস্থাগুলােকে সরকারি নীতির সক্রিয় বিরােধী লােকজনের নাম নিয়ােগের জন্য প্রস্তাব করতে নিষেধ করে । ঐসব সংস্থায় বা বাের্ডগুলিতে সরকার মনােনীত সদস্যের সংখ্যা ছিল মােট সদস্যের এক তৃতীয়াংশ । অর্থাৎ এই এক তৃতীয়াংশে সরকারপন্থিরাই বা অন্যকথায় মুসলমানরাই মনােনয়নের সুযােগ পান ।
১৯৩৯ সালে এই সরকারের উদ্যোগে কোলকাতা মিউনিসিপ্যাল (সংশােধনী) আইন পাশ হয় । তাতে বাঙলার ভদ্রলােকদের ক্ষমতার প্রধান ঘাঁটি কোলকাতা কর্পোরেশনে একচেটিয়া হিন্দু কর্তৃত্বের অবসান হয় ।
কিন্তু সবচেয়ে নির্দয় আঘাত আসে ১৯৪০ সালে । এই বছরে সরকার মাধ্যমিকশিক্ষা বিল উত্থাপন করে । এই আইনে প্রদেশের উচ্চশিক্ষার কর্তৃত্ব , কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে অর্পণ করা হয় সেকেন্ডারি এডুকেশন বাের্ডের উপরে । এই বাের্ডে মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রশ্নাতীত । উচ্চশিক্ষা শুধু ভদ্রলােকদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির মূল ভিত্তি ছিল না ; তা ছিল তাদের একচেটিয়া মর্যাদার প্রতীক । এভাবে বাঙলার উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকদের সাংস্কৃতিক প্রাধান্যকে চ্যালেঞ্জ জানানাে হয় – যে সাংস্কৃতিক প্রাধান্য আসলে ভদ্রলােকদের সাম্প্রদায়িক আলােচনার মূল অবলম্বন।
(৯০)
দশম অধ্যায় ।
কংগ্রেস রাজনীতিতে টানাপােড়েন
মুসলিম মন্ত্রিসভার একের পর এক চ্যালেঞ্জের মােকাবিলা করতে না পেরে কংগ্রেসীরা দিশেহারা হয়ে যায় । এই সময়ে কংগ্রেসের দায়িত্বে ছিলেন শরৎচন্দ্র বসু । তিনি বুঝতে পারেন , পুরনাে কালচার ধরে থাকলে বাঙলায় কংগ্রেসের পুনরুজ্জীবন সম্ভব নয় । ভােটের রাজনীতির বর্তমান নতুন যুগে রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে টিকে থাকতে হলে তাকে সমর্থনের ভিত্তিকে প্রসারিত করতে হবে এবং তার মরচে পড়া ধর্মনিরপেক্ষ পরিচিতিকে পুণরায় উজ্জ্বল করার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে । তবে তার সামনে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বাঙলা চুক্তির করুণ পরিণতির অভিজ্ঞতাও ছিল । হাইকমাণ্ড তাকে একান্ত নিজস্ব পথে চলতে দেবে না , তাও তিনি জানতেন । তাছাড়া বাঙলা কংগ্রেসেও তার নিয়ন্ত্রণ একচ্ছত্র ছিল না ; বরং যথেষ্ট দুর্বল ছিল । এ অবস্থায় দলের সােস্যালিস্ট গ্রুপ এবং কমিউনিস্ট গ্রুপকে নিয়ে তিনি কিছু সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের পথ নির্ধারণ করেন । বাম ও ধর্ম নিরপেক্ষ ধারায় চলার চেষ্টা করেন । আইন পরিষদে তার কৌশল ছিল বাম দিক থেকে সরকারের বিরােধিতা করা ; আর বাইরে কংগ্রেসের পক্ষে জনগণের সমর্থন পাবার জন্য আন্দোলন পরিচালনা করা ।
তিনি সংগঠনের ক্ষেত্রে , কৃষকদের প্রতি সহানুভূতিশীল বাঁকুড়া জেলার কমলকৃষ্ণ রায়কে এবং কুমিল্লার কৃষকনেতা আশরাফউদ্দিন আহমেদকে প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সেক্রেটারি নিযুক্ত করেন । তাতে অবস্থার অনেকটা পরিবর্তন হয় ; কিন্তু দলের ভিতর থেকে তাকে কাজে বাধা দেবার প্রক্রিয়া শুরু হয় । মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের সাথে বসু ভ্রাতৃদ্বয় যােগাযোেগ গড়ে তােলার প্রক্রিয়া শুরু করেন । অল বেঙ্গল মুসলিম ছাত্র লীগের সাথে যােগাযােগ গড়ে তােলা হয় । কলকাতা ও অন্যান্য অঞ্চলে অনেক মুসলমান কংগ্রেসে যােগ দিতে থাকেন ।
দলে বামপন্থিদের চাপে বেঙ্গল কংগ্রেসের নীতিগত ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন
(৯১)
হয় এই সময়ে । হতে পারে নীতিগত না হয়ে , তা কৌশলগত পরিবর্তন । ১৯৩৭ সালে দলের ইতিহাসে এই প্রথম শােনা গেল চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাতিলের কথা এবং খাজনা বন্ধের পক্ষ সমর্থনের ঘােষণা । পরবর্তীকালে গণ সংযােগ , কৃষক ও কৃষি সম্পর্কিত কর্মসূচী নির্ধারণের জন্য পার্টি তিনটি সাব কমিটি গঠন করে । ১৯৩৯ সালে কংগ্রেস তার দলীয় কর্মসূচীর অংশ হিসাবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিলােপকে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচী হিসাবে গ্রহণ করে ।
এই বছরের জুন মাসে কৃষক প্রজা পার্টির সাবেক মন্ত্রী নওসের আলি কংগ্রেসে যােগদান করেন । নওসের আলির যােগদানের ফলে মুসলমান কৃষকদের উপর বাঙলার মুসলিম রাজনীতিবিদদের যে প্রভাব ছিল , তা চ্যালেঞ্জের মুখােমুখি হয় । ফলে রাজ্যের নানা প্রান্তে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হতে থাকে ।
গােলাম সরােয়ার হােসেন ছিলেন নােয়াখালীর প্রভাবশালী পীর । একইসাথে নােয়াখালির কৃষক সমিতির জনপ্রিয় নেতা । এই সমিতির মূল দাবি ছিল , “সব খাজনা মাফ করা , জমিদারের বাজার বয়কট করা, ঋণ সালিশি বাের্ড থেকে সুদ ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করা" প্রভৃতি । তিনি কৃষক প্রজা পার্টিতে যােগদান করেননি ; তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে অংশ নেন এবং জয়যুক্ত হন ১২০০০ ভােটেরও বেশি ভােটের ব্যবধানে।
ফজলুল হক মন্ত্রীসভা গঠন করেন , তাতে গোলাম সরোয়ারকে ডাকা হয় না । ক্ষুব্ধ সরােয়ার সাহেব কংগ্রেসে যােগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করেন । গােলাম সরােয়ার ছিলেন তীব্র জমিদার বিরােধী । তার কংগ্রেসে যােগদানের খবরে স্থানীয় ভদ্রলােক কংগ্রেসীরা প্রমাদ গুণতে থাকেন । তারা তাকে পুলিশ দিয়ে হেনস্থা ও গ্রেফতার করানাের চেষ্টা করেন । এ ব্যাপারে তার উত্তেজক বক্তৃতার উল্লেখ করেন । গােলাম সরােয়ার এই ঘটনায় ক্ষিপ্ত হন । সুযােগ বুঝে মুসলিম লীগ তার সাথে যােগাযােগ করে দলে টানার চেষ্টা করে । তখনও কিছু মুসলমান কৃষক কংগ্রেসের সাথে ছিলেন । তাদের জয় করে আনতে সরােয়ার জমিদারদের বিরুদ্ধে বক্তব্যের ঝাঁঝ আরও বাড়িয়ে দেন এবং কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মুসলমান সরকারকে উচ্ছেদ করে তার জায়গায় হিন্দুরাজ কায়েম করার অভিযােগ আরােপ করেন । হিন্দু জমিদারের বিরুদ্ধে মুসলমান কৃষকদের আন্দোলন ধীরে ধীরে ঘুরে যায় সাম্প্রদায়িকতায় এবং তা কুখ্যাত নােয়াখালী দাঙ্গার ভিত্তি তৈরি করে । এভাবে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে মুসলমান কৃষকদের কংগ্রেসের দলে টানার প্রয়াস স্থানীয় মুসলমান নেতাদের ক্রোধকে উসকে দেয় এবং দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক বাতাবরণ তৈরি হতে থাকে । মুসলিম নেতৃবৃন্দের প্রবল প্রতিরােধে বাস্তবতঃ কংগ্রেসের এই গণসংযােগ কর্মসূচী তেমন কোন সুফল আনতে পারেনি ।
(৯২)
কাঁথিতে কংগ্রেসের ঈশ্বরচন্দ্র মাল, সরকারি খাসমহল এস্টেটে খাজনা হ্রাস করার আন্দোলন করেন । দামােদর ক্যানাল ট্যাক্স-এর বিরুদ্ধে দশরথী তা বর্ধমানে আন্দোলন করেন । হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পরিবর্তে কংগ্রেস এভাবে বাস্তবতঃ কৃষক প্রজা পার্টি ও মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ট্যাক্স না দেবার আন্দোলন পরিচালনা করে । আস্তে আস্তে কংগ্রেসের চ্যালেঞ্জ ব্রিটিশ সরকারের পরিবর্তে হয়ে দাঁড়াল মুসলিম নেতৃত্বাধীন বাঙলার সরকারের বিরুদ্ধে।
১৯৩৭ সালে বেঙ্গল প্রজাস্বত্ব (সংশােধনী) বিলের উপর আলােচনার সময়ও শরৎচন্দ্র বসু দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন । কংগ্রেসের জমিদার লবি এবং কৃষক নেতাদের অবস্থান ছিল পরস্পর বিরােধী । তাই , সত্য ঢাকতে তিনি বাক চাতুরির আশ্রয় নেন । তিনি বলেন জমিদার প্রথা অনন্তকাল ধরে চলুক , তা কংগ্রেস অবশ্যই সমর্থন করে না ... তবে জনগণের কোন এক অংশ অন্য অংশকে শােষক বলুক , এটাও কংগ্রেস উৎসাহিত করে না । এভাবে তাকে সভায় দুই সুরে কথা বলতে হতাে । মুসলমানদের সমর্থনের জন্য তাকে একসুরে কথা বলতে হয় , আবার হিন্দুদের কায়েমি স্বার্থরক্ষার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবার সময় তাকে অন্যসুরে কথা বলতে হয় । শেষপর্যন্ত তিনি এই স্ববিরােধিতা ভেঙে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন । তার অনুগামীরাও মনে করেন বাঙলার সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে বাঙালিদের । মুসলিম নেতাদের সাথে ঐক্যের একটা ভিত্তি রচনায় ও দলের সামাজিক ভিত্তি বিস্তৃত করার জন্য বসু ভ্রাতৃদ্বয় গভীরভাবে বিশ্বাস করেন যে , সম্প্রদায়ের সমস্যার সমাধানের চেয়ে সামাজিক সমস্যার সমাধানই ঠিক পথ ; অর্থাৎ সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা দরকার । সব সম্প্রদায়ের মধ্যে সমানাধিকার , সম্মান ও যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়ােজন । ত্রিশের দশকের শেষ প্রান্তে তারা বাঙালি রাজনীতিতে একটা বিকল্প কৌশল তুলে ধরেন। ঐ কৌশলের বৈশিষ্ট্য হলাে – বাঙলার রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের জন্য ধর্মনিরপেক্ষ নীতির প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার ।
সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৮ সালে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি ছিলেন । ১৯৩৯ সালে ত্রিপুরী অধিবেশনে তিনি সভাপতির পদ ত্যাগ করেন বা তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় । নতুন সভাপতি নির্বাচিত হন ড . রাজেন্দ্রপ্রসাদ । এই সময় বসু ভাতৃদ্বয়ের অনুগত বেঙ্গল কংগ্রেসের প্রায় সবাইকে সাসপেন্ড করা হয় এবং হাইকমান্ডের অনুগতদের নিয়ে নতুন প্রদেশ কমিটি গড়া হয় । ১৯৩৯ সালে বসুঅনুগত সবাইকে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কার করা হয় ।
বসুগ্রুপ টিকে থাকলে হয়তাে প্রদেশে গড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির
(৯৩)
বাতাবরণ ভেঙে ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হতে পারতাে ; কিন্তু সমূলে বসুগ্রুপকে বহিষ্কার করার ফলে , কংগ্রেস তার ধর্মনিরপেক্ষ সদস্যদের হারায় । ৪০ এর দশকে নিশ্চিতভাবে এই দল একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সংগঠন এবং তা হাইকমাণ্ডের যথার্থ অনুগত দল । কিন্তু চারিত্রিক দিক দিয়ে এই দল পূর্বের যেকোন সময়ের তুলনায় অধিকতর রক্ষণশীল এবং হিন্দুত্ববাদী দল হিসাবে পরিগণিত হয় । ১৯৪০ সালে সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটি বাঙলা প্রদেশ কংগ্রেসকে এই মর্মে নির্দেশ দেয় যে , তাদের প্রধান কাজ হচ্ছে নিষ্ক্রিয় সত্যাগ্রহী হিসাবে এই খেয়াল রাখা যে , তারা নিজেরা এবং শ্রমিক , কৃষক ও ছাত্ররা ধর্মঘট করছে না ।
সুভাষচন্দ্র বসু এবং শরৎচন্দ্র বসুকে কংগ্রেস দল থেকে বহিষ্কার করার পর দল থেকে তার সমস্ত অনুগামীকে একেবারে ঝেঁটিয়ে বিদায় করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। তাতে দলে ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল শক্তির যেটুকু ছোঁয়া ছিল , তাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং বাংলার মুসলমান জনতাও কংগ্রেসকে একেবারেই বয়কট করেন । দু’একটি উদাহরণ থেকে এই সত্য বােঝা যাবে ।
১৯৪৫ সালে জেল থেকে ছাড়া পাবার পর কুমিল্লার কৃষকনেতা আশরাফউদ্দিনকে কংগ্রেস বহিষ্কার করে । তার অপরাধ তিনি বসু ভ্রাতৃদ্বয়ের ঘনিষ্ঠ ছিলেন । ঐ জেলার প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা ফজলুল করিম চৌধুরীকেও বহিষ্কার করে কংগ্রেস । ঐ সময়ে হাওড়া জেলা কমিটি ছিল বসু নিয়ন্ত্রিত । তারা ১৯৪৫ সালের নির্বাচনের জন্য একজন মুসলমানের নাম সুপারিশ করে পাঠান , কংগ্রেস তার মনােনয়ন বাতিল করে দেয় । এসব কারণে অবশিষ্ট মুসলমানরাও কংগ্রেস পরিত্যাগ করেন ।
এই নির্বাচনে কংগ্রেস মাত্র দু’জন মুসলমানকে মনােনয়ন দেয় । একজন হলেন বিখ্যাত টিএএন নবী এবং অন্যজন আইন সভার স্পিকার সৈয়দ নওসের আলি । প্রথম জন জঙ্গীপুর থেকে মাত্র ১৬১ ভােট পান এবং প্রতিদ্বন্দ্বি মুসলিম লীগ প্রার্থী পান ১৭০০০ ভােট । দ্বিতীয়জন নওসের আলি যশােরসদর কেন্দ্রে পান মাত্র ১৬১৬ ভােট এবং মুসলিম লীগ প্রার্থী পান ৩০০০০ ভােট। তাই , দেখা যায় – কংগ্রেস দল পুরােপুরি একটা হিন্দুদের দলে পরিণত হয় । আমরা এরপর কংগ্রেসের এই রূপান্তরের অন্যান্য কারণগুলি খোঁজার চেষ্টা করবাে ।
বাঙলা প্রাদেশিক আইন সভায় আলােচিত বিভিন্ন আইন তৈরি হওয়ায় উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণীর সবাই সমানভাবে এবং সরাসরিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন , এমনটা নয় । তবে তারা প্রায় সবাই মনে করেন যে , তাদের প্রভাব এবং মর্যাদা দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে এবং গৃহীত নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তাদের জীবন ও
(৯৪)
মূল্যবােধ হুমকির সম্মুখীন । শুরুতে অনেকে কংগ্রেসের সম্ভ্রান্ত রাজনীতিতে নিম্নশ্রেণীর লোকদের অন্তর্ভুক্তিতে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন , পরে তারা প্রমাদ শুনতে শুরু করেন ।
ময়মনসিং জেলার যুগান্তর গ্রুপের সুরেন্দ্রমােহন ঘোষ ২০ - র দশকে সুভাষচন্দ্র বসুর একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত ছিলেন । কিন্তু ১৯৩৭ সালে জেল থেকে মুক্তি পাবার পর তিনি বসুর সঙ্গ এড়িয়ে চলেন । কারণ হিসাবে তিনি উল্লেখ করেন , “আমি মনে করি যে , তিনি ভুল পথে চলেছেন ... সুভাষের বাড়িতে আমি গিয়ে দেখি 'ইতরজন ও রাস্তার লােকে ’ ভর্তি । তারা সেখানে ভিড় করেছিল । আমি শরৎ বসুকে জিজ্ঞাসা করি – এরা কি আপনার অনুসারি ও সমর্থক ? – এরা তাে রাজনৈতিক কর্মী নয় , এরা হলাে ইতরশ্রেণীর লােকজন " (ওটি নং ৩০১ , পু , ২৩৫ , সূত্র : বেঙ্গল ডিভাইডেড)।
অনেকে আবার কংগ্রেসের সদস্যপদ ও কর্মসূচীতে পরিবর্তনের জন্য ভীত হয়ে পড়েন। কলকাতার 'বাঙালি ব্রাহ্মণ সভা'র সদস্যরা মনে করেন , “কংগ্রেস তার পুরনাে ধ্যানধারণা থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং তার চরিত্রের পরিবর্তন হয়েছে । এই দলের রাজনৈতিক নেতারা ও তাদের অনুসারীদের অনেকেই এখন কম শিক্ষিত ও তাদের জানাবােঝা কম । তারা আমদানি করা আধুনিক আইরিশ ইতিহাস , ইতালি ও অস্ট্রিয়ার বিপ্লব , ফরাসি প্রজাতন্ত্রবাদ ও সােভিয়েত শাসন নিয়ে পড়াশুনা করেন । পশ্চিমা সভ্যতার পরীক্ষা - নিরীক্ষা তারা ভারতের উপর প্রয়ােগে আগ্রহী ... এটা করতে গিয়ে তারা ব্রাহ্মণ্যবাদী পুরােহিততন্ত্র ও জমিদারির মতাে ভূস্বামীদের প্রতিষ্ঠানগুলিকে বাতিল করতে চায় ... সামাজিক সংস্কারের নামে তারা হিন্দুত্ববাদের মুলে কুঠারাঘাত করছেন” ( জেটল্যান্ড কালেকশন , বঙ্গীয় ব্রাহ্মণ সভার স্মারকলিপির অংশ)।
পুরনাে এইসব ভুল ধ্যানধারণাকে ভেঙে দেবার জন্য বসু ভ্রাতৃদ্বয় চেষ্টা করেন । ইতর লােকদের প্রভাব বৃদ্ধির বিরােধিতা করা নেতৃবৃন্দকে তারা খুব একটা পাত্তা দেননি । এজন্য অনেকে তাদের ক্ষমা করতে পারেননি ।
পুরনাে ও ভ্রান্ত এইসব দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিফলন ঘটে হিন্দু সংবাদপত্রে । অন্যান্য সংবাদপত্রের সাথে সুর মিলিয়ে অমৃতবাজার পত্রিকা এমন অবস্থান গ্রহণ করে , যা সর্বতোভাবে সাম্প্রদায়িক । হিন্দুস্বার্থকে উপেক্ষা করার জন্য ভদ্রলােকদের সাথে সুর মিলিয়ে ঐ পত্রিকা বসু ভ্রাতৃদ্বয়ের বিরুদ্ধে প্রচারে নেতৃত্ব দিতে থাকে । বসু পরিবারের পুরনাে শত্রু ছিলেন এই পত্রিকার সম্পাদক তুষারকান্তি ঘােষ । বাঙলার রাজনীতিতে সুভাষচন্দ্র ও শরৎচন্দ্র বসুর প্রভাব ক্ষুন্ন করতে এই পত্রিকা প্রয়াস চালিয়ে যায় ।
(৯৫)
একাদশ অধ্যায়
উগ্র হিন্দুত্ব : হিন্দুমন, হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেস
এই প্রেক্ষাপটে বাংলায় 'হিন্দু মহাসভা' পুনর্বার প্রতিষ্ঠিত হয় । ১৯৩৯ সালের ২৭ শে ডিসেম্বর ওয়েলিংটন স্কোয়ারে জাফরান রঙের পতাকা উত্তোলন কোরে বীর সাভারকার কলকাতায় 'হিন্দু মহাসভা'র উদ্বোধন করেন।
ঘটনাক্রমে ঐদিন ভাইসরয় কলকাতায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি ২৩ শে জানুয়ারি ১৯৪০ তারিখে জেটল্যান্ডকে লেখেন , “হিন্দু মহাসভা যথেষ্ট উদ্দিপনা সহকারে আস্তে আস্তে গড়ে উঠছে এবং কতকটা যেন রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে এগােচ্ছে । তারা সবেমাত্র কলকাতায় একটা বড় ধরনের মিটিং করেছে । ঐ মিটিং-এ তারা খুবই সাম্প্রদায়িক ধরনের ও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে নিন্দা করে একাধিক প্রস্তাব গ্রহণ করে । যেভাবে সবকিছু চলছে , তাতে হিন্দু মহাসভা কংগ্রেসের কিছু শক্তি হরণ করতে সমর্থ হলে আমি অবাক হবাে না"।
বাঙলায় হিন্দু মহাসভার নেতৃত্ব দেন ড . শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী । তিনি কংগ্রেসের অভ্যন্তরে একজন স্বরাজী ছিলেন । শরৎচন্দ্র বসু ছিলেন স্বরাজীদের নেতা । ১৯২৯ সালে ড . শ্যামাপ্রসাদ বেঙ্গল কাউন্সিলের সদস্য হন একজন স্বরাজী হিসাবে । — তিনি মনে করেন যে, কংগ্রেস সঠিকভাবে উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করতে ব্যর্থ হচ্ছে । তাই , দু’বছর পর তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করেন।
১৯৩৭ সালে শ্যামাপ্রসাদ স্বতন্ত্র বা নির্দল সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হন । কর্পোরেশনেরও সদস্য নির্বাচিত হন । আইনসভায় হিন্দু স্বার্থ অর্থাৎ উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকদের স্বার্থরক্ষার জন্য তিনি সর্বশক্তি নিয়ােগ করেন । কিন্তু একাজে তিনি নিজেকে অকার্যকর বলে প্রমাণ করেন । ভদ্রলােকদের ক্ষমতা এবং স্বার্থের বিরুদ্ধে বাঙলার আইনসভায় একটার পর একটা বিল আনা হয়; আর প্রায় বিনা প্রতিরােধে তা পাস হয়ে যেতে থাকে । এ অবস্থায় ড , শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী বাঙলায় এমন একটা সংগঠনের প্রয়ােজনীয়তা অনুভব করেন – যা তার প্রচেষ্টাকে শক্তি জোগাবে এবং সহায়তা দেবে ।
(৯৬)
উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকরা যেসব বিষয় নিয়ে চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন ছিলেন , ঠিক সেই বিষয়াদি ও কর্মসূচী হিন্দু মহাসভা গ্রহণ করে – যে কর্মসূচী গ্রহণ করতে বসু ভ্রাতৃদ্বয়ের নেতৃত্বে কংগ্রেস অস্বীকার করে । এ অবস্থায় বিশেষ করে ভদ্রলােকশ্রেণীর উদ্বেগের বিষয়গুলি সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে হিন্দু মহাসভা প্রচার শুরু করে । ১৯৩৯ সালে তারা একটা পুস্তিকা প্রকাশ করে । তার নাম দেওয়া হয় ‘ হিন্দুর সংকটময় পরিস্থিতি : নেতৃত্বের আহবান' । তাতে লেখা হয় , “হিন্দু জনগণকে স্মরণ করে দেবার প্রয়ােজন নেই যে , সম্প্রদায় হিসাবে আমাদের অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে । জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের অধিকার ও স্বার্থ নিষ্ঠুরভাবে পদদলিত হচ্ছে । রাজনীতির ক্ষেত্রে ক্ষতিকর সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ আমাদের অক্ষম করে দিয়েছে । আইন সভায় আমাদের অসহায় অবস্থায় নিক্ষেপ করা হয়েছে । আর প্রদেশের প্রশাসন ও আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া আমাদেরকে দাসে পরিণত করেছে । সরকারি চাকুরিতে নিয়ােগের ক্ষেত্রে মেধা ও যােগ্যতাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে এবং সাম্প্রদায়িক স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে হিন্দুদের জন্য সরকারি পদে নিয়ােগের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে । সামাজিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রেও আমাদের অবস্থা একইরকম কষ্টকর হয়ে পড়েছে । হিন্দু মহিলারা নির্যাতিত হচ্ছে , হিন্দু ছেলেমেয়েদের অপহরণ করা হচ্ছে - . হিন্দু মন্দির অপবিত্র করা হচ্ছে ও হিন্দু প্রতিমা ধ্বংস করা হচ্ছে ... কংগ্রেসের মানসিকতা ও উদারতার ভুল প্রবণতা হিন্দুজীবন ও অগ্রগতির পথে বাধার সৃষ্টি করেছে ... হিন্দুদের নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে । মুসলমানদের অগ্রগতির জন্য একদিকে ব্রিটিশ প্রশাসনের সহযােগিতা এবং অন্যদিকে কংগ্রেসের আপােষমূলক ও বশ্যতার মনােভাব হিন্দু জাতিকে অর্থনৈতিক , রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে শ্বাসরােধ করে হত্যা করছে"।
আস্তে আস্তে বাঙলায় কংগ্রেসের বিকল্প শক্তি হিসাবে হিন্দু মহাসভা জায়গা করে নিতে থাকে । অনেকেই এই ধরনের একটি বিকল্প উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের অপেক্ষায় ছিলেন ।
কংগ্রেসের মধ্যে অনেকে বাঙলার আইনসভায় শরৎচন্দ্র বসুর ব্যর্থতায় এবং দলের মধ্যে প্রগতিশীলদের সাথে তার ঘনিষ্ঠতার কারণে বিরক্ত ছিলেন । হিন্দু মহাসভার এইসব প্রচারের ফলে তাদের অনেকেই ঐ দলে যােগদান করেন । বড় বড় ব্যবসায়িরা শুরুতেই হিন্দু মহাসভার প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করে । কলকাতার টাকাওয়ালা মাড়ােয়ারিরা হিন্দু মহাসভার অর্থভাণ্ডারে হাত খুলে সহযােগিতা করতে শুরু করেন। যে যুগলকিশাের বিড়লা অতীতে সব সময়
(৯৭)
কংগ্রেসকে অর্থ সাহায্য করতেন ; এবার তিনি হিন্দু মহাসভার সম্মেলনগুলির সব খরচের দায়িত্ব নেন । মহাসভাকে অর্থসাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেন শেঠ বংশীধর জালান , বদরিদাশ গায়েঙ্কা , রাধাকিষেণ কানােরিয়া , দেবীপ্রসাদ খৈতান প্রমুখ ধনী ব্যবসায়ীরা । খৈতান আগে সুভাষ বসুকে অর্থ সাহায্য করতেন এবং কংগ্রেস ফান্ডে টাকা জোগাড় করার জন্য বসু ভ্রাতৃদ্বয়কে সহযােগিতা করতেন ।
খৈতান ও তার মাড়ােয়ারি বন্ধু পরিবারগুলি মনে করে হিন্দু মহাসভা শক্তিশালী হলে বাঙলায় তারা তাদের ব্যবসায় অধিকতর বেশি সহযােগিতা ও নিশ্চয়তা পাবেন । নতুন এই হিন্দু পার্টির প্রতি অনেক ধনাঢ্য বাঙলিরাও সমর্থন জানান ও সহযােগিতা করেন । তারা মিলিতভাবে হিন্দু মহাসভার উদ্বোধনী সম্মেলনের জন্য ১০,০০০ টাকা চাঁদা দেন । মফঃস্বল এলাকাতেও অনেক বড় বড় জমিদার বেঙ্গল কংগ্রেসের সাথে তাদের চিরাচরিত সম্পর্ক ছিন্ন করে মহাসভার পক্ষে কাজ শুরু করেন । ময়মনসিংহ জেলার মহারাজা শশীকান্ত আচার্যচৌধুরি , মালদা জেলার জমিদার বাবু ভৈরবেন্দ্রনারায়ণ রায় , ময়মনসিং জেলার অন্য এক জমিদার বাবু হেমন্তচন্দ্র রায়চৌধুরী প্রমুখ হিন্দু পার্টি হিন্দু মহাসভাকে স্বাগত জানান । এরা সবাই ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের পক্ষে কাজ করেছিলেন । এইসব জমিদাররা দলীয় রাজনৈতিক অবস্থান বদল করেন এই কারণে যে , ভূ সম্পর্কিত স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রে বসু পরিচালিত কংগ্রেস থেকে তারা হিন্দু মহাসভাকে বেশি বিশ্বাসযােগ্য বলে মনে করেন ।
১৯২৭-২৮ সাল নাগাদ বাঙলা কংগ্রেসে পাঁচ ক্ষমতাধর ব্যক্তির একজন ছিলেন নলিনীরঞ্জন সরকার । ১৯৩৭ সালে কংগ্রেস হাইকমান্ডের নির্দেশ অমান্য করে তিনি ফজলুল হক মন্ত্রিসভার অর্থমন্ত্রির দায়িত্ব নেন এবং কংগ্রেস থেকে বিতাড়িত হন । বীমা ব্যবসায়ে সরকার মহাশয় প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন । ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে কংগ্রেসী মন্ত্রিসভাগুলি যখন একযােগে পদত্যাগ করে , তখন তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনিও ফজলুল হক মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন । কংগ্রেসে তিনি ছিলেন শরৎচন্দ্র বসুর প্রবল বিরােধী । তাই , শ্রীবসু নেতৃত্বে থাকাকালীন তিনি কংগ্রেসে যােগদান করতে প্রস্তুত ছিলেন না । তিনি যােগাযােগ করেন হিন্দু মহাসভার সাথে । হিন্দু মহাসভাও অনেকদিন ধরে চেষ্টা চালাচ্ছিলেন তাকে দলে পাবার জন্য । নলিনীরঞ্জন হিন্দু মহাসভার সর্বভারতীয় উদ্বোধনী সম্মেলনে যােগদান করেন । মঞ্চে বসেন এবং ভাল অভ্যর্থনাও পান ; কিন্তু তিনি সংগঠনগতভাবে হিন্দু মহাসভার সাথে নিজকে জড়াননি। কারণ হিন্দু মহাসভার ভবিষ্যৎ নিয়ে তার মনে সংশয় ছিল । বাস্তবতঃ ঐ একদিনই মাত্র তিনি
(৯৮)
হিন্দু মহাসভার সভায় যােগদান করেন ।
ত্রিপুরি সম্মেলনের অব্যবহিত পরে গভর্নর উল্লেখ করেন যে , “অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে সাম্প্রদায়িক ধারায় আলােচনা চলছে । .. এ অবস্থায় সার্বিক পরিবর্তন হতে পারে, যদি একটা শক্তিশালী হিন্দু সংগঠনের উদ্ভব হয় — যার উপর আইনসভার হিন্দু সদস্যরা কার্যকর ও অবিচলিতভাবে আস্থা রাখতে পারেন । আমি বিশ্বাস করি – নলিনীরঞ্জন সরকারের মত অনেক হিন্দু আছেন, যারা এমন একটি সংগঠনের প্রয়ােজনীয়তা অনুভব করেন । তবে , শেষ পর্যন্ত, সম্ভবত তারা বেঙ্গল কংগ্রেসের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব পাবার আশা করেন । কারণ তারা বাঙলায় কংগ্রেসকেই একমাত্র যােগ্য হিন্দু সংগঠন বলে মনে করেন |
ক্ৰমে এক সময় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বসু ভ্রাতৃদ্বয় এবং তার অনুসারীদের কংগ্রেস দল থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে । কেউ কেউ এমন দাবি করেন যে , এই কাজ দ্রুততার সাথে হােক এবং অতি ব্যাপকভাবে হােক – যাতে তাদের পক্ষে কথা বলার কেউ না থাকেন । পটুয়াখালী সত্যাগ্রহের নেতা সতীন সেনের মত লােকও ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদকে চিঠি লিখে বসু ভ্রাতৃদ্বয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান ।
সুভাষচন্দ্র বসু , শরৎচন্দ্র বসু ও তার সমর্থক সহযােগীদের কংগ্রেস থেকে বহিষ্কার করায় হিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণী ও জমিদাররা খুশি হন । ক্রমে বেঙ্গলকংগ্রেসের উপর তাদের আস্থা ফিরে আসে । নলিনীরঞ্জন সরকার ও অন্যান্যদের আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসে ফিরিয়ে নেওয়া হয় । আস্তে আস্তে হিন্দু মহাসভার অনুকূলে যারা কংগ্রেসকে পরিত্যাগ করেছিলেন , তারা দলে ফিরে আসতে থাকেন ।
কিন্তু হিন্দু মহাসভা কোনরকম লড়াই ছাড়া মাঠ ছাড়তে প্রস্তুত ছিল না । তারা অতি আক্রমণাত্মক সাম্প্রদায়িক প্রচার কাজ শুরু করে । যারফলে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় । কংগ্রেস মুসলমানদের খুশি করে চলতে চায় বলে হিন্দু মহাসভা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অভিযােগ জানিয়ে জোর প্রচার শুরু করে । তাদের এই উগ্রসাম্প্রদায়িক প্রচারে ফল ফলতে শুরু করে । ১৯৪১ সালে ঢাকায় বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে ।
মুসলমান যুবকরা হিন্দু মহিলাদের সভ্রম নষ্ট করেছে –এই ধরনের অতিরঞ্জিত খবর প্রকাশিত হয় । হােলির দিনে হিন্দু মহিলাকে নাজেহাল করা নিয়ে অমৃতবাজার পত্রিকা যে খবর প্রকাশ করে , পরে দেখা যায় , তা মিথ্যা । এরফলে ঐ জেলার নানা প্রান্তে হিংসাত্মক ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে ।
দাঙ্গার পর দেখা যায় কংগ্রেসের ক্ষতির বিনিময়ে হিন্দু মহাসভা অনেকটাই
(৯৯)
ভিত্তি অর্জন করতে সমর্থ হয়েছে । এই দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ সাহায্যের জন্য কংগ্রেসের ত্রাণ তহবিলে কলকাতার কেউ অর্থ সাহায্য করতে রাজি ছিলেন না । অন্যদিকে হিন্দু মহাসভার ত্রাণ তহবিলে সবাই স্বেচ্ছায় অর্থদান করতে থাকেন । কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অভিযােগ--- তারা হিন্দু এবং মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ সাহায্য দেবে – যা সহ্য করতে হিন্দুরা রাজি নয় ।
মুসলমানদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণে আগ্রহী হিন্দুভদ্রলােকদের সমর্থন ধরে রাখতে বেঙ্গল কংগ্রেসও হিন্দু মহাসভার সাথে সাম্প্রদায়িক মঞ্চে প্রতিযােগিতায় নামে । তারা ঘােষণা করে যে , দাঙ্গার পরের এই ত্রাণ কর্মসূচী শুধুমাত্র হিন্দুদের জন্য । সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, কংগ্রেস ত্রাণ তহবিলে পাওয়া সব অর্থ দাঙ্গার সময় ঢাকা থেকে যারা ত্রিপুরায় আশ্রয় নিয়েছেন , সেইসব হিন্দু উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য ব্যয় করা হবে ।
দাঙ্গা বিষয়ে কংগ্রেস তদন্ত কমিটির সভাপতি ছিলেন প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা কামিনীকুমার দত্ত । তিনি বলেন , “ত্রিপুরার মহারাজা হিন্দু উদ্বাস্তুদের ত্রিপুরা রাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য সবরকম সুযােগসুবিধা দিতে প্রস্তুত আছেন । কিন্তু বাঙলার হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য এর পরিণাম হবে ভয়াবহ । কারণ এ ধরনের উদ্যোগ বাঙলা থেকে হিন্দুদের বিতাড়নের জন্য নির্যাতন প্রচেষ্টাকে আরও উৎসাহিত করবে । কংগ্রেস কর্মীরা উদ্বাস্তুদের ফিরে আসার জন্য রাজি করানাের চেষ্টা করছে । এসব উদ্বাস্তুদের অনেকেরই পুণর্বাসনের জন্য আর্থিক সহায়তার প্রয়ােজন হবে , এটাই হচ্ছে সেই ত্রাণ সাহায্য ” । — ঢাকার কংগ্রেস নেতারা সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে ত্রাণ সাহায্য দেবার যে নীতি গ্রহণ করে , তা কংগ্রেস হাইকম্যাণ্ড অনুমােদন করে ।
কংগ্রেস সভাপতি ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদ এই ব্যবস্থার যুক্তি দেখান এভাবে, “হিন্দু মহাসভার লােকেরা মুসলমানদের সাহায্য করছে না ; আর সেজন্য হিন্দুরা কংগ্রেস কর্মীদের অর্থ সাহায্য দিচ্ছে না এই আশংকায় যে , কংগ্রেস কর্মীরা মুসলমানদেরও সাহায্য করতে পারে । – এই দুঃসময়ে কংগ্রেস যদি জনগণের কোনাে কাজে না আসে , তাহলে কংগ্রেস জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারবে না ” ( ১৬ এপ্রিল , ১৯৪১ সালে গান্ধীর কাছে রাজেন্দ্রপ্রসাদের চিঠি ) ।
দাঙ্গা বিষয়ে কংগ্রেসের তদন্ত কমিটির সভাপতি কামিনীকুমার দত্ত ৮ ই মে ১৯৪১ তারিখে নলিনীরঞ্জন সরকারকে লেখেন , "আমাদের পক্ষে একদিকে কংগ্রেসের আদর্শ অনুসরণ করতে হয় এবং একইসাথে সাধারণ লােকের সামনে কংগ্রেসের নীতিবিরােধী কাজকে জোরালােভাবে সমর্থন করতে হয় । বেঙ্গল প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি লিখিতভাবে এই অঙ্গীকার করতে পারে না যে , এই সাম্প্রদায়িক
(১০০)
দাঙ্গা একপক্ষীয় । আবার একইসাথে আমরা এমন কোন বিবৃতি দিতে পারি না , যাতে , হিন্দু সম্প্রদায়ের বা অন্যকোন হিন্দু সংগঠনের (হিন্দু মহাসভা) অবস্থান বিপন্ন হয়" ।
শেষ পর্যন্ত ঢাকাদাঙ্গা তদন্ত কমিটির সামনে হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা – উভয় দলই একসাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে । কামিনীকুমার দত্ত এবং নলিনীরঞ্জন সরকার কংগ্রেসের জন্য উত্তম পন্থা অবলম্বনের জন্য আরও একবার মত বিনিময় করেন | দত্ত লেখেন , “ঢাকার পল্লীএলাকার দাঙ্গা সম্পর্কে সাক্ষ্যপ্রমাণ পরিচালনায় কংগ্রেস উত্তম অবস্থানে আছে । কিন্তু এজন্য দায়িত্ব নিতে পরামর্শ দেওয়াটা ঠিক হবে না । এটা খুব বড় ধরনের দায়িত্ব এবং এজন্য যথেষ্ট অর্থ ব্যয় হবে । এব্যাপারে কংগ্রেস যৌথভাবে হিন্দু মহাসভার সাথে এই কাজ করতে পারে। হিন্দু মহাসভা এজন্য কংগ্রেসকে অর্থ যােগান দেবে এবং তথ্যপ্রমাণের জন্য আমাদের সাহায্য তাদের খুবই দরকার । কংগ্রেসের সহযােগিতা ছাড়া পল্লীএলাকা থেকে প্রয়ােজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা তাদের জন্য খুবই কষ্টকর । পল্লীএলাকার ঘটনা হিন্দুদের জন্য সবচেয়ে উত্তম । ঢাকা শহরে উভয় সম্প্রদায়ের অপরাধ প্রায় সমান সমান এবং রায়ও প্রায় একই রকম হবে"। এই চিঠিতে এ কথাও উল্লেখ করেন যে , ঢাকার আশপাশের পল্লীএলাকায় হতাহত হিন্দুরা সংখ্যায় বেশি হলেও , ঢাকা শহরে হতাহত মুসলমানের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি । – এই পরিসংখ্যানের আরেক অর্থ হলাে মূলতঃ দলিত এবং মুসলমানরাই ঢাকা দাঙ্গায় নিহত ও আহত হয়েছিলেন ।
ঢাকা দাঙ্গার তদন্ত নিয়ে কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভা একসঙ্গে কাজ করে । এই কাজের মাধ্যমে যে সহযােগিতার সম্পর্ক তৈরি হয় , তা অব্যাহত থাকে । হিন্দুস্বার্থ রক্ষার জন্য পারস্পরিক সহযােগিতার প্রয়ােজনের সময় উভয় দলই একসাথে ঘনিষ্ঠ সহযােগিতার মাধ্যমে কাজ করে । কোথাও হিন্দুস্বার্থ সংকটাপন্ন হলে উভয়দলের রাজনীতি ও আদর্শের মধ্যে প্রায় কোন পার্থক্য থাকতাে না । দেখা যায়--- প্রায় সবক্ষেত্রেই মহাসভা সাম্প্রদায়িক সমস্যা ও বিতর্কের সূত্রপাত করে ; আর কংগ্রেস দল পরিস্থিতির পিছনে ছােটে । অনেকেই ভেবেছিলেন , কাছাকাছি নির্বাচন না থাকায় এ সহযােগিতা সম্ভব হচ্ছে ; কিন্তু নির্বাচনকালে পরিস্থিতি অন্যরকম হবে।
১৯৪২ সালে ব্রিটিশ সরকার কংগ্রেস দলকে নিষিদ্ধ ঘােষণা করে । এই সময় দেখা যায় , এই উভয়দলের সদস্যরা একে অপরের সাথে মিশে যেতে থাকে । অনেক কংগ্রেসনেতা গ্রেফতার এড়াতে হিন্দু মহাসভায় যােগদান করতে
(১০১)
থাকেন । এই সময় দু'টি দলই সাংগঠনিক এবং রাজনৈতিকভাবে একে অপরের কাছাকাছি চলে আসে।
শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর নেতৃত্বে পরের বছর কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভা জোটবদ্ধ হয়ে কলকাতা কর্পোরেশন ইলেকশনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে । ১৬ ই মার্চ ১৯৪৪ সালে দুই পার্টির এক যৌথ নির্বাচনী সভায় হিন্দু মহাসভার নেতা এন.সি. চট্টোপাধ্যায় ঘােষণা করেন যে , তার দল কংগ্রেসের সাথে যােগ দিয়েছে ইউনাইটেড মুসলিম লীগ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরােধিতার জন্য এবং বস্তুত একটা জাতীয় কোয়ালিশন ফ্রন্ট গঠনের আগ্রহ থেকে এটা করা হয়েছে ।
কংগ্রেস দলের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা ইংরেজ সরকার তুলে নেয় । এই নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবার পর যেসব কংগ্রেসী হিন্দু মহাসভায় যােগদান করেন , তারা পুরোনো দলে ফিরে আসতে থাকেন । ফলে , হিন্দু মহাসভার সব স্তরের নেতা কর্মী হ্রাস পায় । কংগ্রেসের লােকজন প্রায় সবাই ফিরে আসেন । অন্য অনেকে হিন্দু মহাসভার সঙ্গে থাকলেও নির্বাচনে কংগ্রেসের হয়েই কাজ করেন ।
কংগ্রেস যখন হিন্দুদের হয়ে বা একেবারেই হিন্দুত্ববাদী কর্মসূচী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে , তখন , কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি ছিলেন মওলানা আবুল কালাম আজাদ । সম্ভবতঃ কৌশলগত কারণেই এইসময়ে কংগ্রেস মওলানা আজাদকে সভাপতি নির্বাচনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে । এই পর্যায়কালে বাঙলার জেলায় জেলায় হিন্দু ঐক্যের নামে জোরদার প্রচার চালায় কংগ্রেস । ভদ্রলােক ও অন্যান্য সব অংশের হিন্দু স্বার্থকে কার্যকরভাবে রক্ষা করতে সক্ষমপার্টি হিসাবে কংগ্রেস দ্রুত প্রতিষ্ঠা পায় ।
পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলিতে বা পূর্ববঙ্গে , যেখানে হিন্দু মহাসভার সংগঠন ছিল সবচেয়ে সূদৃঢ় , সেখানেও কংগ্রেসের পক্ষে হিন্দু সমর্থন দৃঢ় হয় । ময়মনসিংহ জেলায় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির চেয়ারম্যান নিজে হিন্দু ঐক্যকে তুলে ধরে জোরদার প্রচার চালান ।
এরমধ্যে কেন্দ্রিয় আইন সভার নির্বাচন ঘােষিত হয় । এই নির্বাচনে হিন্দু মহাসভাকে কংগ্রেসের বিকল্প হিসাবে তুলে ধরার জন্য সর্বাত্মক লড়াইয়ের পরিকল্পনা করা হয় । তারা যােগ্য প্রার্থীর নামও স্থির করে ফেলেন । কিন্তু দেখা যায় – হিন্দু স্বার্থের শক্তিশালী মুখপত্র শশাঙ্কশেখর রায় কংগ্রেসের টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত ঘােষণা করেন । হিন্দু ঐক্যের জন্য বিপুল উদ্যমে প্রচার চালিয়ে এবং নৈপুণ্যের সাথে প্রার্থী বাছাই করে কংগ্রেস হিন্দুদের জন্য বরাদ্দকৃত কেন্দ্রীয় আইনপরিষদের ৬ টি আসনের সব ক’টি দখল করে নেয় ।
(১০২)
কংগ্রেস এমনভাবে হিন্দু মহাসভার শ্লোগান ও কর্মসূচী ছিনিয়ে নেয় যে , হিন্দু মহাসভার সদস্যরাও মনে করেন যে , পৃথক একটা সংগঠন হিসাবে হিন্দু মহাসভার অস্তিত্বের আর কোন প্রয়ােজন নেই । কোলকাতার হিন্দুদের একটা গ্রুপ ড .শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে এই বলে পরামর্শ দেয় যে , "কংগ্রেস কর্তৃক মুসলিম লীগকে জোরালাে চ্যালেঞ্জ দেবার পর পৃথক একটা রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে হিন্দু মহাসভার অস্তিত্বের আর কোনাে প্রয়ােজন নেই ।... জনগণ আপনাকে আসন্ন বেঙ্গল প্রাদেশিক আইন পরিষদের নির্বাচনে অতি সাম্প্রদায়িক নয় , এমন একটি পার্টি থেকে প্রার্থী হিসাবে দেখতে চান।... মহান লক্ষ্য অর্জনে কংগ্রেসকে নেতৃত্ব দেবার জন্য আপনি হলেন বাঙলার সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি । আমরা আপনাকে কংগ্রেসে যােগদান করার আহ্বান রাখছি ” (হিন্দুদের স্বাক্ষরিতপত্র , শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী পেপার্স , ডিসেম্বর , ১৯৪৫)।
নতুনভাবে পুনর্গঠিত কংগ্রেস কমিটির নেতৃত্বে নলিনীরঞ্জন সরকারের মত ধনাঢ্য ব্যক্তিরা থাকায় মাড়ােয়ারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলি আশ্বস্ত হয় । তারা আবার কংগ্রেসে ফিরে আসে । দেবীপ্রসাদ খৈতান , যিনি হিন্দু মহাসভার অর্থের জোগান দিতেন , তিনি কংগ্রেস টিকিটে জয়যুক্ত হন । সমস্ত জমিদার , রাজা - মহারাজা – যারা ছিলেন হিন্দু মহাসভার স্তম্ভ , সবাই কংগ্রেসে চলে আসেন । জমিদারদের ৫ টি আসনের মধ্যে ৪ টিতে কংগ্রেস জয়লাভ করে । হিন্দু মহাসভা শেষ পর্যন্ত বাঙলা প্রাদেশিক আইন সভার ২৬ টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ; কিন্তু একটা ছাড়া সবক'টিতেই কংগ্রেসের কাছে শােচনীয়ভাবে পরাজিত হয় । শুধুমাত্র কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আসনে ড . শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়যুক্ত হন । কংগ্রেস হয়তাে তাকে এটুকু জায়গা ছেড়ে দেয় ।
আমরা এই অধ্যায়ের আলােচনায় সমাপ্তির প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছি । অন্তিম আলােচনার পূর্বে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখার কিছু অংশের উল্লেখ করবাে । সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র শুধু লেখক ছিলেন না , তিনি রাজনীতিও করতেন । কংগ্রেস দলের সাথে যুক্ত ছিলেন । এখানে তার লেখার যে অংশের উল্লেখ করবাে , তিনি সেই লেখাটি প্রথমে ১৯২৬ সালে ‘হিন্দুসভা ' সম্মেলনে ভাষণ হিসাবে পাঠ করেন । পরে 'বর্তমান হিন্দু - মুসলমান সমস্যা' নামে প্রবন্ধ আকারে প্রকাশ করেন । কথাগুলি এখানে উল্লেখ করা হলাে এই কারণে যে , এটা হলাে ঐ সময়ের ভদ্রলােকশ্রেণীর চিন্তা-চেতনার প্রতিচ্ছবি । তিনি লেখেন , “হিন্দু ও মুসলমান শুধু পৃথক নহে , মৌলিকভাবে তারা অসমান । আর মিলন হয় সমানে সমানে ।... হিন্দু মুসলমানের মধ্যে যে পার্থক্য আছে , তাহা পুনর্মিলনের আযােগ্য ।..
(১০৩)
দুই সম্প্রদায়ের মধ্যকার পার্থক্যের মূল বিষয় হইলাে ‘সংস্কৃতি ' । সংস্কৃতি হইলাে মন ও অন্তরের বৈশিষ্ট্য, যাহা স্বভাবগতভাবে সব হিন্দুর আছে , কিন্তু মুসলমানের তাহা নাই এবং তারা তাহা অর্জন করিবে এমন আশা কম ।.. শিক্ষা মানে যদি লেখাপড়া জানা হয়, তাহা হইলে হিন্দু মুসলমানে বেশি তারতম্য নাই কিন্তু শিক্ষার তাৎপর্য যদি অন্তরের প্রসার ও হৃদয়ের কালচার হয় , তাহা হইলে বলিতেই হইবে উভয় সম্প্রদায়ের তুলনাই হয় না ... শিক্ষা সমান করিয়া লইবার আশা আর যেই করুক , আমি তাে করি না । হাজার বৎসরে কুলায় নাই , আরও হাজার বৎসরে । কুলাইবে না"।
শ্রী চট্টোপাধ্যায় যুক্তি দেখান যে , “মূলতঃ এই সংস্কৃতির অভাবই মুসলমানদের নিষ্ঠুরতা , বর্বরতা ও ধর্মোন্মত্ততার কারণ । এটা হলাে মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রাচীন , সর্বব্যাপী ও অপরিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য এবং তা প্রথম যুগের গজনবী বিজেতাদের মধ্যে স্পষ্টভাবে দেখা যায় । তারা কেবল লুঠ করিয়াই ক্ষান্ত হয় নাই , মন্দির ধ্বংস করিয়াছে , প্রতিমা চূর্ণ করিয়াছে, নারীর সতীত্বহানি করিয়াছে । ঠিক যেন বর্তমানকালের বাঙালি মুসলমানের মত , যারা পাবনার বীভৎস ঘটনার জন্য দায়ি । তাছাড়া , এ প্রেক্ষিতে আদি মুসলমান ও সাম্প্রতিককালের ধর্মান্তরিত মুসলমানদের মধ্যে কাউকে গ্রহণ করার প্রায় কিছু নেই । যারা খ্রীষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয় , তারা তাদের মূল (হিন্দু) সংস্কৃতি অক্ষুন্ন রাখে ; কিন্তু ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার পর তারা তাদের হিন্দু উৎপত্তিকে পরিত্যাগ করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে ও অপরিবর্তনীয়ভাবে মুসলমান হয়ে যায় । ... উচ্চ বা নীচ , সব মুসলমানের কাছ থেকে হিন্দু মহিলাদের সতীত্ব হারানাের হুমকি আছে । হিন্দু নারীহরণ ব্যাপারে সংবাদপত্রওয়ালারা প্রায়ই দেখি প্রশ্ন করেন , মুসলমান নেতারা নীরব কেন ? তাহাদের সম্প্রদায়ের লােকেরা যে পুণঃ পুণঃ এতবড় অপরাধ করিতেছে , তথাপি প্রতিবাদ করিতেছে না কীসের জন্য? মুখ বুজিয়া নিঃশব্দে থাকার অর্থ কি ? – কিন্তু আমার তাে মনে হয় , অর্থ অতিশয় প্রাঞ্জল । তাহারা শুধু অতি বিনয়বশতঃই মুখ ফুটিয়া বলিতে পারেন না , বাপু , আপত্তি করব কী , সময় এবং সুযােগ পেলে ও কাজে আমরাও লেগে যেতে পারি" ।
উচ্চবর্ণহিন্দুরা এমনকি নিজ হিন্দুধর্মের মানুষকে অস্পৃশ্য গণ্য করেন - এটা কী সংস্কৃতি? একি সভ্যতা, না বর্বরতা ? যে সমাজের একজন সুপ্রতিষ্ঠিত লেখক একটা গােটা জনগােষ্ঠী সম্পর্কে এরূপ কুরুচিপূর্ণ শব্দ সমষ্টি লিখতে পারেন , তাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতি নিয়ে কেউ কি আজও কোন প্রশ্ন তুলবেন না!
(১০৪)
দ্বাদশ অধ্যায়
কুখ্যাত কলকাতা হত্যাযজ্ঞ
যুক্ত বাঙলার প্রাদেশিক আইন পরিষদের শেষ নির্বাচন হয় ১৯৪৫ সালে । এই নির্বাচনে প্রচারের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল সাম্প্রদায়িকতা । কোনরকম ঝুঁকি না নিয়ে উচ্চবর্ণ, নিম্নবর্ণ, আদিবাসী প্রভৃতি গােটা হিন্দুসমাজ কংগ্রেসের বাক্সে ভােট দেন । হিন্দুস্বার্থের জন্য কংগ্রেসের উপরেই তারা ভরসা করেন । হিন্দু মহাসভাকে ভােট দিয়ে ভােট ভাগাভাগির পথে যেতে চাননি হিন্দু ভােটাররা ।
পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় গােটা মুসলমান সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয় মুসলিম লীগের পতাকাতলে । কৃষক প্রজা পার্টি গত নির্বাচনে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল , তার বেশিটাই তারা পূরণ করে । ফলে , মুসলমান প্রজা কৃষক ও জোতদারদের কৃষক প্রজা পার্টির কাছে তেমন কিছু আর পাবার ছিল না । তারাও ভােট ভাগাভাগি না করে ঐক্যবদ্ধভাবে মুসলিম লীগকে ভােট দেন ।
এই নির্বাচনে বাংলা প্রাদেশিক আইন পরিষদে কংগ্রেস পায় মােট ৮৬ টি আসন এবং মুসলিম লীগ পায় ১১৩ টি আসন এবং অন্যান্যরা পান ৫১ টি আসন । প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দি । তিনি ১৯৪৬ সালের এপ্রিল মাসে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন । এই নির্বাচনে হিন্দু মহাসভা ২৬ টি কেন্দ্রে লড়াই করে মােট হিন্দু ভােটের ২.৭৩ শতাংশ ভােট পায় ।
১৯৩৭ সালের নির্বাচনে তফসিলী সংরক্ষিত আসনের মধ্যে কংগ্রেস মাত্র ৭ টি আসন পেয়েছিল । ১৯৪৫ সালের এই নির্বাচনে ৩০ টি তফসিলী আসনের ২৪ টি কংগ্রেস দখল করে নেয় । ফলে বােঝা যায় – কংগ্রেস ও হিন্দুমহাসভা নিম্নবর্ণের হিন্দু ও আদিবাসীদের হিন্দু হিসাবে প্রচারের যে কর্মসূচী নিয়েছিল , তা কাজে লেগেছে । এই নির্বাচনে কংগ্রেস মােট হিন্দু ভােটের ৯০% পেতে সমর্থ হয়।
(১০৫)
সােহরাওয়ার্দি ছােট মন্ত্রিসভা গঠন করেন । গতবারের ১৩ জনের পরিবর্তে তিনি ১১ জনের মন্ত্রিসভা গঠন করেন । ফজলুল হকের বিগত মন্ত্রিসভায় হিন্দু ও মুসলমান মন্ত্রির সংখ্যা প্রায় সমান ছিল । বাঙলায় সম্প্রীতির লক্ষ্যেই তা করা হয় । কিন্তু এই নতুন মন্ত্রিসভায় সােহরাওয়ার্দি মাত্র ৩ জন হিন্দুকে মন্ত্রি করেন এবং এই ৩ জনের মধ্যে ২ জন ছিলেন তফসিলী সম্প্রদায়ের । দলিত ও মুসলিমের মধ্যে ঐক্যের প্রবক্তা মহাপ্রাণ যােগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং তাকে মন্ত্রি করা হয় । হিন্দুভােট যেভাবে কংগ্রেসের অনুকূলে ঐক্যবদ্ধ হয় , তাতে প্রধানমন্ত্রির পক্ষে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার হয়তাে বাধ্যবাধকতা ছিল ।
১৯৩২ সালে সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ ঘােষণার পর বাঙলার উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকরা আশংকা করেছিলেন যে , এই প্রদেশে তাদের ক্ষমতা দখলের কোন সম্ভাবনা রইলাে না । পুনাচুক্তিতে যখন তফসিলীদের জন্য ৩০ টি আসন বরাদ্দ হয় , তখন তারা মুষড়ে পড়েন । পরপর দু'টি নির্বাচনে মুসলমানদের প্রাদেশিক ক্ষমতা দখলের পর তাদের সে আশংকা সত্য বলে প্রমাণিত হয় । মন্ত্রিসভায় একজন ভদ্রলােকহিন্দু ; আর ২ জন তফসিলীহিন্দু অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় , তা তাদের আরও পীড়া দেয় । তারা দলিত ও মুসলমানদের মধ্যে 'ঐক্যের ভূত' দেখতে শুরু করেন ।
নানা সত্য ও অসত্য কারণে বাঙলার হিন্দুরা সােহরাওয়ার্দিকে পছন্দ করতেন না । সংবাদপত্রের অর্ধসত্য ও মিথ্যা প্রচারের ফলেই হয়তাে এই ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল । তিনি বাঙলার প্রধানমন্ত্রি হওয়ায় হিন্দুরা আরও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন । সােহরাওয়ার্দিও প্রধানমন্ত্রি হয়ে শুরুতে বিচক্ষণতার পরিচয় দেওয়ার পরিবর্তে দু’একটা এমন ঘােষণা করেন , যাতে , খবরের কাগজগুলির এতদিনকার মিথ্যাপ্রচার সাধারণ বাঙালি হিন্দুদের কাছে বেশি বিশ্বাসযােগ্য হয়ে ওঠে । তিনি শপথ গ্রহণ করার কিছুদিন পর ঘােষণা করেন , “মুসলিম লীগকে কৌশলে পাশ কাটিয়ে কংগ্রেসকে কেন্দ্রের ক্ষমতায় বসানাের সম্ভাব্য পরিণতি হবে বাঙলার পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা ও সমান্তরাল একটা সরকার প্রতিষ্ঠা---এ রকম (মুসলিম লীগের মন্ত্রি ছাড়া) কেন্দ্রীয় সরকার বাঙলা থেকে যাতে কোন রাজস্ব সংগ্রহ করতে না পারে , তা আমরা নিশ্চিত করবাে । আর আমরা নিজেদের পৃথক রাষ্ট্র মনে করবাে , যার সাথে কেন্দ্রের কোন সম্পর্ক নেই" (অমৃতবাজার পত্রিকা, ১৩ আগস্ট , ১৯৪৬)। এর কয়েকদিন পরেই মুসলিম লীগের 'ডাইরেক্ট একশন ডে' ১৬ই আগস্টকে তিনি সরকারি ছুটি হিসাবে ঘােষণা করেন । সােহরাওয়ার্দির এইসব বিবৃতিকে হিন্দু সংবাদপত্রে ব্যাখ্যা করে বলা হয় যে , এ হলাে সমগ্র বাঙলাকে পাকিস্তান বানাবার হুমকি।
(১০৬)
আর হিন্দু বাঙালিদের কাছে পাকিস্তান হলাে চিরকালের জন্য রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব হারানাে ।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়ােজন যে , কয়েক মাস আগে কেন্দ্রিয় আইন পরিষদের নির্বাচন হয় । ঐ নির্বাচনে মুসলিম লীগ ভারতের মােট মুসলমান ভােটের শতকরা ৮৬.৭০ ভাগ ভােট পায় এবং কংগ্রেস পায় মুসলমান ভােটের মাত্র ১.৩০ শতাংশ ।
আর ১৯৪৫ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের ক্ষেত্রে সব প্রদেশের ভােটের হিসাবে মুসলিম লীগ পায় মােট মুসলমান ভােটের ৭৪.৭০ শতাংশ এবং কংগ্রেস পায় মুসলমান ভােটের মাত্র ৪.৬৭ শতাংশ ভােট ।
এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের ক্ষেত্রে মােট আসনের মধ্যে বেশি আসন পাবার যুক্তিতে কংগ্রেস যখন নিজেকে হিন্দু ও মুসলমান সবার প্রতিনিধি হিসাবে দাবি কোরে মুসলিম লীগকে বাদ দিয়ে কেন্দ্রে সরকার গঠন করতে চায়, তার পরিপ্রেক্ষিতে সােহরাওয়ার্দি কিছুআগে আলােচিত বিবৃতি দেন । একথা সত্য ছিল যে , ভারতীয় মুসলমানদের প্রতিনিধি ছিল মুসলিম লীগ , কংগ্রেস নয় । অন্ততঃ ভােটের হিসাবে তা প্রমাণিত । পরে অবশ্য কংগ্রেসের আপত্তি অগ্রাহ্য করে ইংরেজ কেন্দ্রে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মিলিত সরকার করার নির্দেশ দেয় , যে সরকারের অর্থমন্ত্রি ছিলেন মােহম্মদ লিয়াকত আলি খান । মুসলিম লীগের কোটায় তফসিলীদের পক্ষে মহাপ্রাণ যােগেন্দ্রনাথ মণ্ডল আইনমন্ত্রি হিসাবে শপথ নেন । কংগ্রেসের পক্ষ থেকে কেন্দ্রে তফসিলী মন্ত্রি হন বাবু জগজ্জীবন রাম ।
বাঙলায় মন্ত্রিসভা গঠনের প্রথম কয়েক মাসে সােহরাওয়ার্দি মন্ত্রিসভার কিছু অপরিণত আর উদ্ধত কার্যকলাপ ও ঘােষণা এবং হিন্দু সংবাদপত্রগুলির তার অতিরঞ্জিত ও অপব্যাখ্যার ফলে বাঙলার , বিশেষ করে কলকাতার সাম্প্রদায়িক অবস্থা সংকটজনক হয়ে ওঠে। ১৬ ই আগস্ট মুসলিম লীগ ঘোষিত 'ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডে’ কে মুসলমানরা ‘মুক্তি দিবস' হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয় , যার সাথে যুক্ত হয় সাম্প্রতিক নির্বাচনে তাদের সাফল্যের উন্মাদনা । আর ভদ্রলােক হিন্দুরা এটাকে দেখেন , তাদের অস্তিত্বের জন্য আসন্ন হুমকি হিসাবে । ফলে , তারা জীবনপণ করে লড়াই করতে প্রস্তুত ছিলেন । তাদের কাছে এটা ছিল ‘মুসলিম স্বেচ্ছাচারকে প্রতিরােধ করার হিন্দু সংকল্প' ।
এই অবস্থায় ১৯৪৬ সালের ১৬ ই আগস্ট কলকাতায় কুখ্যাত হত্যাযজ্ঞ শুরু হয় । বিভিন্ন বিষয় বিচার বিশ্লেষণ করলে বােঝা যায় , এই কলকাতা হত্যাযজ্ঞ হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোন দুর্ঘটনা নয় । এর পিছনে ছিল পরিকল্পিত চক্রান্ত এবং পূর্ব প্রস্তুতি । মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে , উভয়পক্ষই যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে একে অপরের মুখােমুখি হয় ।
(১০৭)
বাঙলার প্রধানমন্ত্রি হিসাবে শহীদ সােহরাওয়ার্দি ও তার মন্ত্রিসভা এই গণহত্যার জন্য নিশ্চয়ই দায়ি। কিন্তু সাধারণভাবে এটা ব্যক্তি সােহরাওয়ার্দির নিন্দনীয় কাজ হিসাবে এখনও পর্যন্ত তা প্রতিষ্ঠিত কাহিনী হয়ে টিকে আছে । এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে উপন্যাস রচিত হয়েছে ও সােহরাওয়ার্দিকে দায়ি করা হয়েছে ইত্যাদি । কিন্তু এর বিপরীত দিকেও চোখ ফেরানাের অবকাশ ছিল । বিপরীত দিকে চোখ ফেরানোর অনেক ঘটনা ও তথ্য ছিল ; কিন্তু তার বেশিটাই অন্ধকারে থেকে গেছে বা প্রচারের আলাে পায়নি । এখানে সে সব অপ্রচলিত ও অপ্রচারিত কিছু তথ্য ও ঘটনা নিয়ে আমরা আলােচনা করার চেষ্টা করবাে । হিন্দু নেতারাও যে এই হত্যাযজ্ঞের ঘটনার সাথে গভীরভাবে জড়িত ছিলেন , এ সত্যটা তেমন সুবিদিত নয় – আমরা সেদিকে নজর দেবার চেষ্টা করবাে ।
কলকাতা দাঙ্গায় কমপক্ষে ৫০০০ মানুষ নিহত হন । এই নিহতদের বেশিটাই ছিলেন মুসলমান মানুষ । হত্যাযজ্ঞ শুরু হবার ৪ দিন পর স্টেটসম্যান পত্রিকা লেখে , “এটা দাঙ্গা নয় । এ জন্য প্রয়ােজন মধ্যযুগের ইতিহাস থেকে একটা শব্দ খুঁজে আনা – ক্রোধােন্মত্ততা (a fury) ; তবু fury শব্দটির মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততা আছে – এই ক্রোধােন্মত্ততাকে নিজের পথ ঠিক করার জন্য অবশ্যই প্রয়ােজন কিছুটা চিন্তা ও সংগঠন । আট ফুট লম্বা লাঠি নিয়ে পঙ্গপালের মত অসংখ্য লােক ( the horde ) অন্যকে আঘাত করছিল ও খুন করছিল । ঐসব লাঠি তারা আশপাশের স্থান থেকে কুড়িয়ে পেয়েছে বা তাদের নিজের পকেট থেকে বের করেছে , এ কথা বিশ্বাস করা কষ্টকর” (২০ শে আগস্ট , ১৯৪৬)।
অন্য একজন প্রত্যক্ষদর্শী কলকাতা হত্যাযজ্ঞকে দাঙ্গা হিসাবে দেখেননি , দেখেছেন গৃহযুদ্ধ হিসাবে - “উভয় পক্ষ থেকেই ঠাণ্ডা মাথায় মানুষ খুন করা হয়েছে । উভয়পক্ষ থেকেই এ দাঙ্গা ছিল সুসংগঠিত । সােহরাওয়ার্দি নির্মমভাবে এই দাঙ্গা সংগঠিত করেন এটা দেখানাের জন্য যে , ... (মুসলমানরা) কলকাতা দখলে রাখবে । হিন্দু পক্ষে এটা ছিল বাঙলাভাগের জন্য লড়াইয়ের একটা অংশ বিশেষ । এর সংগঠকদের মধ্যে ছিল হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের সদস্য , বিশেষ করে পুরনাে সন্ত্রাসী কংগ্রেস নেতা , যারা কমিউনিস্ট পার্টিতে যােগ দেননি । মাড়ােয়ারিরা প্রচুর সাহায্য করেছিল ; তারা অর্থ দেয় ও দেশবিভাগের আন্দোলনের জন্য তহবিল সংগ্রহ করে । আনুষ্ঠানিকভাবে দেশ বিভাগের আন্দোলন তখন শুরু না হলেও প্রত্যেকে জানতাে যে , এটা এ জন্যেই করা হয়েছে” (নিখিল চক্রবর্তী। সাক্ষাৎকার , ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯ , সাক্ষাৎকার নেন জয়া চ্যাটার্জী)।
বিভিন্ন ঘটনাসমূহের আলােচনার প্রাক্কালে আমরা দেশের একজন জাতীয় নেতা কোলকাতা হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে যে মন্তব্য করেন তা আমরা দেখে নেব ।
(১০৮)
সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল মন্তব্য করেন , “হিন্দুরা এতে তুলনামূলকভাবে বেশি লাভবান হয়েছে” (আর কে সিধওয়াকে লেখা চিঠি । তারিখ ২৭ শে আগষ্ট , ১৯৪৭)। এই মন্তব্য এই কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে , লােকসান পুষিয়ে লাভের জন্যই হয়তাে এই দাঙ্গা ঘটানাে হয় ।
কোলকাতা দাঙ্গায় হিন্দুর চেয়ে অনেক বেশি মুসলমান নিহত হন । অর্থাৎ ‘শান্তিপ্রিয় ও সংস্কৃতিবান’ হিন্দুদের কাছে মুসলমান গুণ্ডারা পরাজিত হয় । এই শক্তি পরীক্ষায় হিন্দুরা এমন এক সময়ে জয়ী হন , যখন বাঙলায় মুসলমান সরকার এবং তার প্রধানমন্ত্রি ও পুলিশমন্ত্রি সােহরাওয়ার্দির মত মানুষ । দাঙ্গা দূর গ্রামাঞ্চলে হয়নি , হয়েছে রাজধানী কোলকাতা শহরে, যেখানে সরকার নিয়ন্ত্রিত পুলিশের পক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ অনেক সুবিধাজনক । ফলে , হিন্দুরা অপ্রস্তুত ছিলেন , এমন নাও হতে পারে । বরং যথেষ্ট প্রস্তুত থাকার জন্য এবং দীর্ঘদিনের প্রস্তুতির ফলেই এমন বিজয় অর্জন সম্ভব হতে পারে ।
সােহরাওয়ার্দিকে যত দোষ দেওয়া হােক না কেন , একথা অস্বীকার করা যাবে না যে , এই দাঙ্গা শুধুমাত্র কোলকাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকে । রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে না দেবার জন্য কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রীর প্রশাসন দাবি করতেই পারে ।
কোলকাতা শহরে মুসলমান জনসংখ্যা ঐ সময়ে মাত্র ৩০/৩২ শতাংশের বেশি ছিল না । কিন্তু এই দাঙ্গা যদি বগুড়া , রংপুর প্রভৃতি ৮০/৯০ শতাংশ মুসলমান অধ্যুষিত জেলাগুলিতে ছড়িয়ে পড়তাে , তাহলে তার পরিণাম কী হতে পারতাে , তা সহজেই অনুমান করা যায় । কিন্তু কেন তেমন কিছু হয়নি? হােসেন সােহরাওয়ার্দিকে মূল্যায়ণ করার সময় , তা খেয়াল রাখা দরকার বলে কারুর মনে হতেই পারে ।
৩০-এর দশকের শেষ এবং ৪০-এর দশকের প্রথম দিক থেকে কোলকাতা ও মফঃস্বল শহরগুলিতে হিন্দু স্বেচ্ছাসেবক গ্রুপের সংগঠন প্রতিষ্ঠার আধিক্য দেখা যায় । ঐসব সংগঠনের ঘােষণা ছিল মূলতঃ হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করা । এইসব সংগঠন ভদ্রলােক যুবকদের দৈহিক যােগ্যতা অর্জন করতে এবং আধা সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে উৎসাহ দিত । এইসব সংগঠনের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে সংগঠিত সংগঠন ছিল ‘ভারত সেবাশ্রম সংঘ' । এটা ছিল হিন্দু মহাসভার স্বেচ্ছাসেবক শাখা । প্রকাশ্যে তা সমাজসেবা করার সংগঠন হলেও , শুরু থেকে এই সংঘ সামরিক কৌশল গ্রহণ করার জন্য আহ্বান জানায় । ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই সংঘের এক সভায় ড . শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী সভাপতিত্ব করেন । এই
(১০৯)
সভায় ২৬০০ লােক যােগদান করেন । সম্প্রদায়গত রােয়েদাদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলা হয় , “এর উদ্দেশ্য বাঙালি হিন্দুদের প্রতিহত করা । সাবেক দণ্ডিত অপরাধি পুলিন দাস ও সতীন সেনের সাহায্য নিয়ে আখড়া তৈরি করতে হবে । দৈহিক গঠনের প্রতি মনােযােগী হতে হবে । এমনভাবে প্রস্তুত হতে হবে , যাতে হিন্দুরা আক্রান্ত হলে এক সাথে হাজার লাঠি উত্তোলিত হয় । বাঙলায় লেখা পােস্টার ছাপানাে হয় । যাতে লেখা হয়---এখনই অহিংসার চেতনা ত্যাগ কর , প্রয়ােজন । হলাে পৌরুষ"।
দু'মাস পর অনুষ্ঠিত সংঘের অন্য এক সভার প্যান্ডেলে প্রদর্শিত প্লাকার্ডে বাঙলায় লেখা হয় , “হিন্দুরা জাগ্রত হও এবং অসুরদের হত্যার শপথ গ্রহণ করাে"।
এর পরের বছর অর্থাৎ ১৯৪০ সালে শিবের ধর্মীয় মূর্তিকে ব্যবহার করে আলােচনা হয় । তার উল্লেখ রয়েছে এভাবে , “৭ তারিখে (১৯৪০) সেবাশ্রম সংঘের উদ্যোগে মহেশ্বর ভবনে একটা হিন্দু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় । মিঃ বিসি চ্যাটার্জী ঐ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। হিন্দুদের সামরিক মানস গড়ে তােলার জন্য সেখানে বক্তৃতা করা হয় । ত্রিশূলসহ শিবের একটা বড় চিত্র প্রদর্শিত হয় । স্বামী বিজনানন্দ বলেন যে , অসুরকে ধ্বংস করার জন্য হিন্দু দেবদেবীরা সবসময় বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত থাকতেন । স্বামী আদিত্যনন্দ মন্তব্য করেন যে , তিনি হিন্দুদের সেবা করার জন্য একটা লাঠি নিয়ে এসেছেন । তিনি বলেন যে , হিন্দুর শত্রুদের মুন্ডচ্ছেদ করতে হবে । ত্রিশূলসহ শিবের চিত্রের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন , তার অনুসারীদের অস্ত্র, কমপক্ষে লাঠি হাতে এগিয়ে আসতে হবে । স্বামী প্রণবানন্দ পাঁচ লাখ লােকের একটা প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে তুলতে চান ।.. তিনি মাড়ােয়ারিদের কাছে অর্থ সাহায্যের আবেদন জানান ।.. হরনাম দাস প্রত্যেক হিন্দুকে সৈনিক হবার আবেদন জানান । পাঁচ লাখ হিন্দুর একটা প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে তােলার জন্য সংঘের প্রস্তাব গৃহীত হয় । এতে সন্তুষ্টির সাথে উল্লেখ করা হয় যে , ইতিমধ্যে বারাে হাজার লােককে সংগ্রহ করা হয়েছে"।
ভারত সেবাশ্রম সংঘ প্রথম থেকেই হিন্দু মহাসভার সাথে যুক্ত ছিল । কিন্তু ৪০-এর দশকে কংগ্রেসীরাও এর সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন । কংগ্রেস নেতা শশাঙ্কশেখর সান্যাল ও অন্যান্যরা সংঘের সাথে যােগাযােগ রেখে চলতে থাকেন । অমৃতবাজারের মৃণালকান্তি ঘােষ , দৈনিক বসুমতীর সম্পাদক হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘােষ, মডার্ন রিভিউ পত্রিকার রামানন্দ চ্যাটার্জী প্রভৃতি কলকাতার ভদ্রলােক বুদ্ধিজীবীরাও ভারত সেবাশ্রম সংঘের এইসব কাজের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন ।
১৯৪৫ সাল নাগাদ কোলকাতার কয়েকটি হিন্দু স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনের
(১১০)
নাম এবং সদস্য সংখ্যা ছিল নিম্নরূপ , “আর এস এস – ১০০ জন , জাতীয় যুব সংঘ – ২০০ জন , বাগবাজার তরুণ ব্যায়াম সমিতি--৩০ জন , দেশবন্ধু ব্যায়াম সমিতি – ৪০ জন , হিন্দুস্থান স্কাউট এ্যাসােশিয়েশন —৩০০০ জন , হিন্দু শক্তি সংঘ – ৫০০ জন , আর্য বীর দল —১৬ জন , বি পি আই এম ভলান্টিয়ার কোর – ২৫০ জন । এইসব বড় বড় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সাহায্য করা হতাে । উদাহরণ হিসাবে বলা যায় – ভারত সেবাশ্রম সংঘকে টাকা দিত মাড়ােয়ারিরা , আরএসএস - কে টাকা দিত বিড়লাগােষ্ঠী এবং সুসঙ্গ রাজপরিবারের বাবু পরিমল সিংহের মত লােকজন । উল্লেখ করা হয়েছে – ঐ সময়ে সারাবাংলায় মােট প্রায় ১ লাখ সদস্য ছিল স্বয়ংসেবক সংঘ বা আর এস এস সংগঠনের ।
আরএসএস তার তালিকাভুক্ত সদস্যদের শারীরিক প্রশিক্ষণ দিত । তারমধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও ছিল । ১৯৩৯ সালে আর এস এস - এর বাঙলা শাখার ভি আর পাঠকী লন্ডনে তার এক বন্ধুকে ‘পার্কার হেল ' নামক এক কোম্পানী থেকে ‘এইমিং রেস্ট' নামক এক যন্ত্র জোগাড় করার জন্য চিঠি লেখেন । এর উপর রেখে বন্দুকের নিশানা ঠিক করা সহজ হয় । নতুনদের জন্য এটা দরকার হয়।
পুলিশ রিপাের্টে দেখা যায় – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অব্যাহতি পাওয়া সৈনিক ও সামরিক কর্মচারিদের হিন্দু সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলি আগ্নেয়াস্ত্র ও গােলাবারুদ সংগ্রহের কাজে লাগায় এবং ক্যাডারদের প্রশিক্ষণ দেবার কাজে ব্যবহার করে । অনুশীলন দলের সদস্যরাও এই কাজের সাথে যুক্ত হন ।
পানাগড়ের প্রাক্তন সামরিক কর্মী সংগঠন-এর সেক্রেটারির নিকট হতে পুলিশ একটি চিঠি আটক করে। ড.শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে লেখা ঐ চিঠির তারিখ ৭ নভেম্বর , ১৯৪৬ সাল । চিঠিতে লেখা হয় , “হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলায় আমাদের বিপজ্জনক শত্রু মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিশােধ গ্রহণের জন্য আমরা বর্ধমান জেলার সৈন্যবাহিনীর সাবেক হিন্দু কর্মকর্তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি ।... আমরা প্রস্তুত আছি , আপনার নির্দেশ আমরা অনুসরণ করবাে ... আমরা শপথ নিয়েছি এবং আমাদের আন্তরিক ইচ্ছা পূরণে আমরা বিরত হব না । আমরা অস্ত্র সজ্জিত এবং যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত ... আমরা মনে করি যে , প্রতিশােধ গ্রহণের এই পদ্ধতিতে প্রদেশের বর্বর মুসলমানদের থামিয়ে দিতে পারবাে এবং এ থেকে তাদের বর্ণশংকর কুখ্যাত নেতা সােহরাওয়ার্দি ও নাজিমুদ্দিন , প্রতিশােধ গ্রহণে হিন্দুদের সাহস সম্পর্কে অনুধাবন করতে পারবে ” ।
(১১১)
১৯৪৫ সালে বিখ্যাত নেতা বি আর মুঞ্জে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছিলেন এভাবে – “হিন্দু মহাসভা স্বাধীনতা চায়। কিন্তু তারা বিশ্বাস করে না যে , অহিংস পথে তা অর্জন করা যাবে । এজন্য আমরা পাশ্চাত্যের অতি আধুনিক বৈজ্ঞানিক ধারায় আক্রমণ পরিচালিত করতে চাই .. গৃহযুদ্ধের জন্য মুসলিম লীগের হুমকির মােকাবিলায় কংগ্রেস যদি হিন্দু মহাসভার ‘অশ্বচালনা ও রাইফেল শুটিং' - এর শ্লোগানে সাড়া দিয়ে যুবকদের শিক্ষা দেয় , তাহলে তা হবে বুদ্ধিমানের কাজ ।
এসব নানা ঘটনা , চিঠি ও তথ্যাদি থেকে বােঝা যায় যে , হিন্দু স্বেচ্ছাসেবীরা কলকাতায় শক্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত ছিলেন । লড়াই যখন শুরু হয়ে যায় , তখন তারা বাঁশের লাঠি , ছােরা ও দেশীয় পিস্তল নিয়ে নেতাদের পরামর্শ মতাে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন । মুসলমানদের মতাে হিন্দুরাও ১৬ আগস্ট যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন । উভয় পক্ষই ছিলেন অস্ত্রসজ্জিত ; সংখ্যায় এবং শক্তিতে হিন্দুরাই এগিয়ে ছিলেন ।
মুসলমান দাঙ্গাকারিদের অধিকাংশই ছিলেন পল্লী এলাকা থেকে শহরে আসা ভাসমানশ্রেণীর মানুষ ; আর অন্যদিকে বহু সংখ্যক হিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণীর লােক দাঙ্গার অভিযােগে গ্রেফতার হন ।
কোলকাতা দাঙ্গায় জড়িত হিন্দু জনতার শ্রেণীচরিত্র নিয়ে আলােচনাকালে সুরঞ্জন দাশ লক্ষ্য করেন , “বাঙালিহিন্দু ছাত্র ও অন্যান্য পেশাজীবী বা মধ্যবিত্তশ্রেণীর লােক সক্রিয় ছিলেন । ধনাঢ্য ব্যবসায়ি , প্রভাবশালী সওদাগর , শিল্পী , দোকানদার---এসব বিভিন্ন শ্রেণীর লােক দাঙ্গার অভিযােগে গ্রেফতার হন । মধ্য কোলকাতায় মুসলমানদের একটি সভা ভেঙে দেবার জন্য অন্যদের সাথে ভদ্রলােকরাও অংশগ্রহণ করেন । ঐ সভায় প্রধানমন্ত্রী নিজে ভাষণ দেন । বিখ্যাত চক্ষু চিকিৎসক ডাঃ জামাল মােহম্মদকে হত্যাকারি জনতার মধ্যে বড় অংশ ছিল শিক্ষিত যুবক । এটা বিস্ময়কর ছিল না যে , তাদের মধ্যে অনেকে পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে ইংরেজীতে কথা বলেন ” ।
হত্যাযজ্ঞের পর অব্যাহতভাবে চলা অসন্তোষের মধ্যে মুসলমান জনতার মাঝে বােমা নিক্ষেপে জন্য হিন্দুদের মধ্য থেকে গ্রেফতার হওয়া একজন হিন্দু ছিলেন বর্ধমানের বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ মহেন্দ্রনাথ সরকার । তিনি স্বীকার করেন যে , তিনি একজন কংগ্রেস নেতা । পূর্বে হিন্দু মহাসভার সদস্য ছিলেন ।
সুরঞ্জন দাশ ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গা পর্যন্ত যে সব বড় বড় দাঙ্গাগুলি হয় , তার উপর গবেষণা করেন এবং এই গবেষণায় দেখা যায় – উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণী এসব দাঙ্গায় ব্যাপকভাবে সরাসরি অংশগ্রহণ
(১১২)
করেছেন – যা সাধারণতঃ শিক্ষিত ভদ্রলােকরা করেন না ।
কিন্তু এসব তথ্য অনেক পরে গবেষকরা খোঁজাখুজি করে আবিষ্কার করেছেন । হিন্দু সংবাদপত্রগুলি – যারা প্রচার জগতকে নিয়ন্ত্রণ করতাে এবং আজও নিয়ন্ত্রণ করে , তারা কখনও এসব কথা লেখেনি বা স্বীকার করেনি । তারা একতরফা দোষারােপ করে সােহরাওয়ার্দি এবং মুসলিম লীগকে । এই হত্যাযজ্ঞকে গণ্য করা হয় ভবিষ্যতে মুসলমান শাসনের অধীনে বাঙালি হিন্দুদের ভাগ্যের ভয়াবহ অশুভ লক্ষণ হিসাবে। এভাবে বাঙলার পশ্চিম অংশ নিয়ে একটা পৃথক হিন্দু রাজ্য গঠনের দাবির পক্ষে হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করার কাজে কোলকাতা দাঙ্গাকে ব্যবহার করা হয় । নােয়াখালী এবং কুমিল্লায় স্থানীয় মুসলমানরা কোলকাতা ও বিহারে নির্বিচারে মুসলমান হত্যার গুজবে একটু বিলম্বে হলেও (মাস তিনেক পর) ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া দেখায় (এই দাঙ্গার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ অন্য কারণও ছিল)। প্রতিশােধ হিসাবে বহু নিম্নবর্ণীয় হিন্দু , মূলত নমঃশূদ্রদের হত্যা করে মুসলমানরা । ভদ্রলোেকরা ঠিক এমনটাই চাইছিলেন । এই সময়ে অমৃতবাজার পত্রিকার সম্পাদকের কাছে জনৈক মৃন্ময়ী দত্তের লেখা একটি চিঠি (তাং ১৯/৪/৪৭) পুলিশ আটক করে । চিঠিতে মৃন্ময়ী লেখেন , “সােহরাওয়ার্দিকে (তার নাম উচ্চারণে আমার ঘৃণা হয়) জানিয়ে দাও যে , হিন্দুরা এখনও মরে যায়নি এবং সে বা তার দুশ্চরিত্র সাঙ্গপাঙ্গরা হিন্দুদের ভয় দেখিয়ে শাসন করতে পারবে না । সােহরাওয়ার্দিকে তার দুষ্কর্মের জন্য খুব শীঘ্রই চরম শাস্তি ভােগ করতে হবে । সেই-ই হিন্দুদের বিদ্রোহী করে তুলেছে । এখন থেকে আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হলাে বিদ্রোহ এবং প্রতিশােধ গ্রহণ । এসাে , আমরা মুসলিম লীগের বর্বরদের সাথে যুদ্ধ করি । বাঙলা ভাগ না হওয়া পর্যন্ত এবং হিন্দুদের স্বদেশভূমি থেকে লীগ কর্মীদের বের করে না দেওয়া পর্যন্ত আমরা যুদ্ধ থেকে বিরত হবাে না ” । এধরনের অনুভূতি অনেক হিন্দু মনে ক্রমবর্ধমান দৃঢ় সংকল্প গ্রহণে উৎসাহিত করে যে , যেকোন মুল্যে , যা কিছুই হােক না কেন , বাঙলাকে অবশ্যই ভাগ করতে হবে । বাঙলার ভদ্রলােকশ্রেণী বােধহয় এতদিনে বুঝতে পারেন যে , ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলন তাদের স্বার্থের পক্ষে শেষ পর্যন্ত ক্ষতি করেছে ; এবার তারা সেই ভুল সংশােধন করতে আদাজল খেয়ে লাগেন ।
(১১৩)
ত্রয়ােদশ অধ্যায়
ক্যাবিনেট মিশনের ঐক্যবদ্ধভারত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, ভদ্রলােকশ্রেণীর বিভক্তির পাঁয়তারা
১৯৪৫ সালের জুলাই মাসে এটলির নেতৃত্বে ব্রিটিশ লেবার পার্টি ব্রিটেনে ক্ষমতাসীন হয় । তারা ১৫ ই মার্চ ব্রিটিশ ভারতের ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় । এটলির গভর্নমেন্ট ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসেই ক্যাবিনেট মিশন ভারতে পাঠায় । ব্রিটিশ ক্ষমতা হস্তান্তর করবে কি করবে না , এটা ক্যাবিনেট মিশনের আলােচনার বিষয়বস্তু ছিল না । বরং কত দ্রুত , কার কাছে এবং কী কী শর্তে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে , এটাই ছিল আলােচনার বিষয় ।
ব্রিটিশের অগ্রাধিকার ছিল ভারতে এমন এক উত্তরাধিকারিকে খুঁজে বের করা , যে আরব - ভারত ভূখণ্ডে ব্রিটিশের সামরিক কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে সক্ষম হবে । স্বাভাবিকভাবেই এজন্য প্রয়ােজন ঐক্যবদ্ধ ভারত - যার একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকবে এবং দেশের থাকবে কেন্দ্রিভূত ক্ষমতা ।
যেহেতু ইংরেজ সরকার দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর চায় , তাই , তারা অতীতের মত ঢিলেঢালা সময়সূচী রাখতে রাজি ছিল না । যেসব বিষয়াদি নিয়ে মতান্তরের সম্ভাবনা , তারা সেগুলি যতদূর সম্ভব এড়িয়ে যেতে চাইলাে । একইসাথে যেসব পক্ষকে আলােচনায় অন্তর্ভূক্ত করলে জটিলতা বাড়বে এবং দ্রুত নিষ্পত্তি হবার সম্ভাবনা কম, সেইসব পক্ষকে আলােচনায় ডাকতে রাজি ছিল না । তারা আলােচনা তিন পক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চায় । হয়তাে দু'পক্ষের মধ্যেই তারা আলােচনা করে সিদ্ধান্তর কথা ভাবতাে , কিন্তু ঐ বছরেই কেন্দ্রিয় আইন পরিষদ এবং প্রাদেশিক আইন সভাগুলিতে মুসলীম লীগ যে অসাধারণ ফলাফল করে , তাকে এড়িয়ে যাওয়া ইংরেজ সরকারের পক্ষে সম্ভব ছিল না । পক্ষান্তরে , কংগ্রেস মুসলমানদের ভােট পেতে ব্যর্থ হয় । তাই , কংগ্রেসের পক্ষে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বের দাবি
(১১৪)
করা সম্ভব ছিল না । ড . আম্বেদকরের তফসিলী ফেডারেশন নির্বাচনে একেবারেই শােচনীয় ফল করে । সারা ভারতে ঐ দল মাত্র একটি আসন লাভে সমর্থ হয়। শুধুমাত্র মহাপ্রাণ যােগেন্দ্রনাথ মন্ডল জয়লাভ করেন । ড . আম্বেদকরও পরাজিত হন । তাই , তাদের দাবিরও জোর ছিল না । এসব কারণে ব্রিটিশের পক্ষে কথা বলার জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি দল---কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ আলােচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে । যতদূর জানা যায় – একজন নবাব ও একজন শিখ প্রতিনিধিকেও আলােচনায় অংশগ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানাে হয়। একজন শিখ প্রতিনিধি বলদেব সিং ওই আলোচনায় ছিলেন। ড . আম্বেদকর এবং মহাপ্রাণ যােগেন্দ্রনাথের কোনাে মতামত নেওয়া হয় না ।
জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ ১৯৪০ সালে লাহাের প্রস্তাবে পাকিস্তানের দাবি করেছিলেন । কিন্তু দেশভাগের কথা উল্লেখ করেননি । পাকিস্তানের অর্থ ভারত ফেডারেশনের মধ্যে পর্যাপ্ত ক্ষমতাসম্পন্ন কোন বিশেষ ব্যবস্থার দাবি কিনা , তা ক্যাবিনেট মিশনের সাথে আলােচনার আগে পরিষ্কার ছিল না । ১৯৪৬ সালের ১৬ ই মার্চ ক্যাবিনেট মিশনের রাষ্ট্রীয় সনদ নামের প্রস্তাবে শিথিল ফেডারেল কাঠামাে এবং সীমিত কেন্দ্রিয় ক্ষমতা সম্পন্ন ঐক্যবদ্ধ ভারতের কথা ছিল । এই প্রস্তাবে জিন্নাহর বিশেষ আগ্রহ দেখে অনেকেরই মনে হয় , এই ধরনেরই একটি ফেডারেশন তিনি চেয়েছিলেন । কংগ্রেস দলের নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীভূত ও এককরাষ্ট্রে , সামান্য অংশীদার হবার কোন ইচ্ছা জিন্নাহ এবং মুসলিম লীগের ছিল না । জিন্নাহ চেয়েছিলেন – একটা শিথিল ফেডারেশন , যেখানে কেন্দ্রের কাছ থেকে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলি প্রয়ােজনীয় স্বায়ত্ত্বশাসনের সুযােগ পাবে । কিছু বিশেষজ্ঞের মতে , জিন্নাহ পাকিস্তানের দাবি করেছিলেন দরকষাকষির অস্ত্র হিসাবে । তিনি ভেবেছিলেন , কংগ্রেস দেশবিভাগ এড়াতে খুবই উদ্বিগ্ন এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল । কিন্তু সত্য ঘটনা ছিল আলাদা ।
একটা সময় ছিল যখন অখণ্ড ভারতীয় জাতীর কোন অংশের বিচ্ছিন্নতার ধারণা সব কংগ্রেস নেতার কাছেই অভিশাপ হিসাবে গণ্য হতাে । মাত্র কিছুকাল কেন্দ্রের অন্তর্বর্তীসরকার পরিচালনার পর বল্লভভাই প্যাটেলের মত কিছু নেতৃবৃন্দ , প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসিত সরকার ও দলের প্রাদেশিক শাখার ক্রমবর্ধমান বিদ্রোহী মনােভাবের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা লাভ করেন যে , একটি শক্তিশালী কেন্দ্র অত্যাবশ্যক । স্বাধীন ভারতে সরকার পদ্ধতির প্রশ্নে কংগ্রেস নেতৃত্ব স্পষ্ট করে বলে যে , একটা শক্তিশালী ও কেন্দ্রীয় একক রাষ্ট্রগঠনে কংগ্রেস অঙ্গীকারবদ্ধ ।
পণ্ডিত নেহেরুর মতাে বাম ঘেষা নেতারাও একই সিদ্ধান্তে উপনীত হন । তার কাছেও অনুভূত হয় যে , সামগ্রিকভাবে সারাদেশের পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক
(১১৫)
অগ্রগতির সমন্বয় সাধনের জন্য কেন্দ্রের হাতে ক্ষমতা থাকা দরকার ।
সেজন্য , এখন তারা দেশের এমন সব অংশ ছেড়ে দিতে আগ্রহী , যেখানে কখনওই তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আশা নেই এবং যা কেন্দ্রে তাদের ক্ষমতার প্রতি হুমকি হিসাবে দেখা দিতে পারে । তারা ভারতের অকিঞ্চিতকর অংশ ছেড়ে দিতে মনস্থির করেন । মােদ্দাকথা , মুসলিম লীগের সাথে পাল্লা দিয়ে কংগ্রেস যেখানে পারবে না বলে মনে করলেন , সেইসব মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা তারা হেঁটে বাদ দিতে চাইলেন ।
জিন্নাহর সাথে বাঙলা প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সম্পর্ক কোনদিনই ভাল ছিল না । বলা ভাল – তাদের মধ্যে তেমন কোন সম্পর্কই ছিল না । কেন্দ্রের আলোচনায় বাংলার মুসলমান নেতাদের কার্যকরভাবে দূরে সরিয়ে রাখা হয় । জিন্নাহ নিজেও বাঙালি মুসলমানদের দাবিগুলি নিয়ে খুব বেশি দরকষাকষি করেননি । এই উদাসীনতা না থাকলে খণ্ডিত বাঙলার ইতিহাস হয়তাে সৃষ্টিই হতাে না ।
বাঙলার ভদ্রলােকশ্রেণীর নেতাদের কংগ্রেস হাইকমাণ্ডের উপর তেমন কোন প্রভাব ছিল না । বরং প্রদেশ কংগ্রেস এবং হাইকমাণ্ডের মধ্যে ছিল দাস এবং প্রভুর সম্পর্ক । তাই , বাঙালি ভদ্রলােকশ্রেণীর আশা আকাঙ্খা পুরণের জন্য তারা দিল্লীর দিকে চেয়ে বসে থাকতে বাধ্য হন । তবে , যেহেতু কেন্দ্রীয় কংগ্রেস নেতাদের কাছে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি বড় ছিল , তার ফলে , ভদ্রলােক বাঙালিরা আশায় ছিলেন যে , পূর্ববঙ্গের মুসলমান প্রধান এলাকাটিকে তারা ছেঁটে দেবেন । আর তারফলে , বাঙলাভাগের জন্য তাদের দাবি সফলতা পাবে ।
১৬ ই মার্চ , ১৯৪৬ তারিখে ঘােষিত ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাবে একটি গণপরিষদ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয় – যারা ভবিষ্যত ভারতের সংবিধান রচনা করবেন এবং একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয় । প্রাদেশিক আইন পরিষদের নির্বাচিত সদস্যদের দ্বারা গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন । গণপরিষদে মােট ২৯৬ জন সদস্য নির্বাচিত হন । ড . আম্বেদকর বাঙলা থেকে গণপরিষদে নির্বাচিত হন । ১৯৪৬ সালের ৯ ই ডিসেম্বর গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে । হাজির থাকেন ২০৭ জন সদস্য । মুসলিম লীগ ঐ সভা বয়কট করে।
২৪ শে আগষ্ট , ১৯৪৬ তারিখে অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভা ঘােষিত হয় । মহাপ্রাণ যােগেন্দ্রনাথ মণ্ডল আইনমন্ত্রি হিসাবে শপথ নেন ২৬ শে অক্টোবর ১৯৪৬ তারিখে । তিনি মুসলিমদের জন্য নির্ধারিত কোটায় মন্ত্রিসভায় স্থান পান – যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।
(১১৬)
ভারতভাগ হওয়া বা না হওয়ার দোলাচলের মধ্যে ১৯৪৭ সালের ২২ শে ফেব্রুয়ারি ড . শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী বাঙলার গভর্নর স্যার ফ্রেডারিক বারােজের সাথে দেখা করে আনুষ্ঠানিকভাবে বাঙলাভাগ করার দাবি জানান । ২৩ শে ফেব্রুয়ারি তিনি সাংবাদিক সম্মেলন করে বাঙলার হিন্দুপ্রধান এলাকাগুলিকে নিয়ে একটি পৃথক প্রদেশ গঠন করার জন্য তার প্রস্তাব পেশ করেন । ৪ ঠা এপ্রিল বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভা এজন্য কার্যকরি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ড . শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে দায়িত্ব দেয় ।
৪ ঠা এপ্রিল , ১৯৪৭ তারিখে তারকেশ্বরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভা সম্মেলনে সভাপতি হিসাবে এন.সি. চ্যাটার্জী যে ভাষণ দেন , তা নিম্নরূপ ; “এখন সময় ঘােষিত হয়েছে । ভগ্নী ও ভাইয়েরা , আমি আপনাদের নমনীয় মনােভাব ত্যাগ করে স্বপ্নরাজ্যের বিহ্বলতার শিখর থেকে বাস্তবের জগতে ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছি । পুরানাে শ্লোগান বারবার আওড়ানাে ও প্রচলিত কথার দাস হওয়া স্বদেশপ্রেম নয় । বিট্রিশ সাম্রাজ্যবাদ আরােপিত বাঙলা ভাগের বিরুদ্ধে ( ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলন ) আন্দোলন হলাে বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় । ঐতিহ্যগতভাবে এবং আবেগের দিক থেকে বাঙলার জনগণ প্রদেশভাগের যেকোন উদ্যোগের বিরুদ্ধে । কিন্তু আমরা যদি অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবন না করে শুধু পুরনাে শ্লোগান উদ্ধৃত করি , তাহলে মাতৃভূমির কাছে আমরা রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হব । স্বদেশী দিনগুলােতে বিভাগবিরােধী আন্দোলন ছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম । ঐ সাম্রাজ্যবাদের উদ্দেশ্য ছিল উভয় প্রদেশে বাঙলার হিন্দুদের সংখ্যালঘিষ্ঠ করে দেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামরত সবচেয়ে বৃহৎ জাতিয়তাবাদীদের শক্তিকে পঙ্গু করে দেওয়া । বিভক্তির জন্য আমাদের আজকের দাবি সেই একই আদর্শ ও লক্ষ্যে অনুপ্রাণিত । অর্থাৎ জাতীয়তাবাদী শক্তির বিচ্ছিন্নতারােধ । বাঙলার সংস্কৃতি রক্ষা এবং বাঙলার হিন্দুদের জন্য একটা স্বদেশ ভূমি অর্জন করা – যা ভারতের অংশ হিসাবে জাতীয় রাষ্ট্রে পরিণত হবে ”।
সভাপতি এন , সি , চ্যাটার্জীর এই বক্তব্যের যুক্তি আজও অনেকের কাছে দুর্বোধ্য । কারণ অবিভক্ত বাঙলাতেই হিন্দুরা সংখ্যালঘিষ্ঠ ছিলেন । বরং বাঙলাভাগের পর (১৯০৫ সালে) এক বাঙলায় অন্ততঃ হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েছিলেন । বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ১৯০৫ সালে যদি ইংরেজরা ভাগ করার চেষ্টা করে থাকে ; তাহলে ১৯৪৬ সাল থেকে ড . শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ও এন , সি চ্যাটার্জীরা বাঙালি জাতিকে ভাগ করার পুরনাে ব্রিটিশ চক্রান্তকে কার্যকরি করার জন্য নতুনভাবে
(১১৭)
লড়াই শুরু করেন । হিন্দু মুসলমানের সম্মিলন বাঙালি জাতি ও তার সংস্কৃতিকে হিন্দু বাঙালির সংজ্ঞায় রূপান্তরণ আসলে জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বেরই প্রতিধ্বনি।
১৯৪৭ সালে মার্চ মাসে কংগ্রেস ঘােষণা করে যে , বাঙলাকে ভাগ করা হবে । এই পরিকল্পনার পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার শুরু হয় ঐ মার্চ মাসেই অমৃতবাজার পত্রিকার এক ঘােষণার মধ্য দিয়ে । ঐ ঘােষণায় বলা হয় যে , বাঙলাভাগের প্রশ্নে জনমতের সঠিক মূল্যায়ন করার জন্য পত্রিকা জনমত যাচাই করবে । কিন্তু বাস্তবতঃ ১৯৪৬ সালের শেষ দিক থেকে ‘বেঙ্গল পার্টিশন লীগ ” নামক সংগঠন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ ধরনের প্রচার ও প্রয়াস ভালভাবে চলছিল । 'পার্টিশন লীগ ’ ১৯৪৬ সাল থেকেই সদস্য সংগ্রহ অভিযান শুরু করে । এইসময় পুলিশ পার্টিশন লীগের ৩ জন সদস্যের কাছ থেকে পূরণ করা ফর্ম আটক করে । তিনজনই ভদ্রলােকশ্রেণীর লােক । তারা হলেন ( ১ ) এন এন ঘােষ -৩৭ , হেয়ার স্কুলের শিক্ষক । ( ২ ) জি এন ঘােষ -২৫ , একজন হিসাব রক্ষক । ( ৩ ) পি ঘােষ -২৯ , জেহাপুর গান ফ্যাক্টরির অডিটর । মূলত , হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলার ভদ্রলােকরাই এই আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসেন ।
মাত্র এক মাসের মধ্যেই ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে অমৃতবাজার পত্রিকা তাদের জনমত যাচাই কর্মসূচীর ফলাফল ঘােষণা করে । তারা প্রচার করে যে , বাঙলাভাগের ক্ষেত্রে হ্যা সূচক ভােট দিয়েছেন ৯৮.৬ শতাংশ মানুষ , বাকি ১.৪ শতাংশ মানুষ বাঙলাভাগের বিরুদ্ধে ভােট দিয়েছেন বলে বলা হয় – যার মধ্যে শরৎচন্দ্র বসু প্রস্তাবিত ‘যুক্ত ও সার্বভৌম বাঙলার' পক্ষে গুটিকয়েক মানুষ ভােট দেন বলে উল্লেখ করা হয় ।
(১১৮)
চতুর্দশ অধ্যায়
যুক্ত ও সার্বভৌম বাঙলার প্রস্তাব--- বাঙলাবিভাগ
এখানে শরৎচন্দ্র বসুর পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছু কথা বলা প্রয়ােজন । শরৎচন্দ্র বসুকে কংগ্রেস দলে ফিরিয়ে নেয় ১৯৪৬ সালের শেষদিকে । তিনি কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য মনােনীত হন । বাঙলার ভাগ্য নির্ধারণ প্রশ্নে মতবিরােধের জন্য শ্রী বসু ১৯৪৭ সালের জানুয়ারি মাসেই আবার পদত্যাগ করেন । বাঙলাভাগের যেকোন পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি । তিনি বলেন , “আমার মনে হয় ধর্মীয় ভিত্তিতে প্রদেশের বিভাগ সাম্প্রদায়িক সমস্যা সমাধানের ভিত্তি হতে পারে না"। তিনি যুক্তি দেন যে , “এই প্রস্তাব ( বাঙলা ভাগ করা ) কংগ্রেসের ঐতিহ্য ও আদর্শ থেকে মারাত্মক বিচ্যুতি । এটা হলাে পরাজিত মানসিকতার ফল"।
এই অবস্থায় তিনি একটি বিকল্প প্রস্তাব পেশ করেন । তার প্রস্তাবের মূল কথা হলাে , ভারত এবং পাকিস্তানের বাইরে একটি নতুন রাষ্ট্র গঠন । যার নাম হবে "যুক্ত এবং সার্বভৌম বাঙলা"। কংগ্রেসের কিরণশংকর রায় এই প্রস্তাবের পক্ষে মত দেন । মুসলিম লীগের আবুল হাশিম ও হােসেন সােহরাওয়ার্দি এই প্রস্তাবে মত দেন । আবুল হাশিম ছিলেন (বর্ধমানের মানুষ) প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং ক্ষমতাবান সাধারণ সম্পাদক । মুসলিম লীগের সাথে এই প্রস্তাবিত রাষ্ট্র গঠনের ব্যাপারে শ্রীবসু একটি চুক্তি করেন । তারমধ্যে ছিল
(১) সমস্ত প্রাপ্তবয়স্কদের সার্বজনীন ভােটাধিকার
( ২ ) যৌথ নির্বাচকমণ্ডলী
( ৩ ) জনসংখ্যা অনুপাতে আসন সংরক্ষণ
( ৪ ) মন্ত্রীসভায় হিন্দু ও মুসলমান সমান সংখ্যক মন্ত্রী থাকবেন
( ৫ ) মুখ্যমন্ত্রী হবেন মুসলমান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হবেন একজন হিন্দু
( ৬ ) সরকারি চাকরিতে হিন্দু এবং মুসলমানের সমান অংশ থাকবে
( ৭ ) আইন সভার দুই তৃতীয়াংশের মতামত ছাড়া এই রাষ্ট্রের ভারত বা পাকিস্তানের সাথে মিশে যাওয়া বা রাষ্ট্রের কোন মৌলিকনীতির পরিবর্তন করা যাবে না।
(৮) স্বাধীন রাষ্ট্র হবে ' সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রী ' ।
(১১৯)
এইসব নেতৃবৃন্দ দাবি করেন যে , সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান আসলে উভয় সম্প্রদায়ের জন্য সমানাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্যে নিহিত রয়েছে ।
এই চুক্তি হয় ১৯৪৭ সালের মে মাসে । কিন্তু আশ্চর্যজনক ঘটনা যে , নতুন রাষ্ট্রের এসব খুঁটিনাটি প্রকাশ হবার একমাস আগে , এপ্রিল মাসেই অমৃতবাজার পত্রিকা জানিয়ে দেয় যে , শরৎচন্দ্র বসু প্রস্তাবিত ‘ যুক্ত ও সার্বভৌম বাঙলার' পক্ষে মানুষের সমর্থন নেই ! বাঙলা প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির প্রায় কেউ শরৎচন্দ্র বসুর প্রস্তাব সমর্থন করেননি । বাঙলা প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে একটি প্রস্তাব পাশ করে , তাতে বাঙলাভাগের প্রস্তাবকে সমর্থন করে বলা হয় , বাঙলার যেসব অংশ ভারতীয় ইউনিয়নের মধ্যে থাকতে আগ্রহী , তাদেরকে সেইভাবে থাকার অনুমতি দেওয়া উচিত । এর মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে বাঙলা থেকে নির্বাচিত গণপরিষদের ১১ জন হিন্দু সদস্য মাউন্টব্যাটেনের সাথে সাক্ষাৎ করে ভারতীয় ইউনিয়নের মধ্যে বাঙলার উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলি ও অঞ্চল নিয়ে একটি পৃথক স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ গঠনের দাবি জানান ।
শরৎচন্দ্র বসুর এই পরিকল্পনায় মহাত্মা গান্ধী শর্ত সাপেক্ষে সমর্থনের কথা ঘােষণা করেন । তবে তাকে এই সমর্থনদানের ঘােষণা প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয় । ২৪ শে মে , ১৯৪৭ তারিখে মহাত্মা গান্ধী একটি চিঠি লেখেন শরৎচন্দ্র বসুকে । ঐ চিঠিতে তিনি লেখেন , “কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিতে আমার (মহাত্মা গান্ধীর) সহকর্মীরা আপনার (শরৎচন্দ্র বসু) উদ্যোগে সমর্থন জানানাের জন্য আমাকে কৈফিয়ৎ তলব করেন"।
শরৎচন্দ্র বসুর যুক্ত ও সার্বভৌম বাঙলার প্রস্তাব নিয়ে জিন্নাহ কোন মতামত ব্যক্ত করেননি । সম্ভবতঃ মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যদের মনােভাবের কারণেই তিনি এই প্রশ্নে মৌন থাকেন । বাঙলাভাগের বিরােধিতা করলে এবং পাকিস্তান সুষ্টির পথে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে ঐ গার্ডের সদস্যরা গুলিভরা পিস্তলের হুমকি দিয়ে যাচ্ছিলেন । এই সময়ে তারা একজন প্রখ্যাত মুসলমান নেতাকে খুন করেন । যাহােক , শরৎচন্দ্র বসু বিশ্বাস করতেন যে , জিন্নাহ তাকে সমর্থন দেবেন এবং এই কারণে তিনি জিন্নাহর সহায়তা কামনা করেন । জিন্নাহ যদিও শরৎচন্দ্রের উদ্যোগের বিরােধিতা করেননি ; কিন্তু তাকে প্রকাশ্যে সমর্থনও করেননি ।
যুক্ত বাঙলার পরিকল্পনায় পূর্ব বাঙলার হিন্দুরাও সেভাবে সমর্থন জানাতে এগিয়ে আসেননি । কিরণশংকর রায় , অখিলচন্দ্র দত্ত , নিশীথনাথ কুণ্ডু এবং আশরাফউদ্দিন – এমন মাত্র কয়েকজন কংগ্রেস নেতা শ্রীবসুর সমর্থনে পাশে দাঁড়ান।
(১২০)
তফসিলীশ্রেণীর নেতা মহাপ্রাণ যােগেন্দ্রনাথ মণ্ডল বাঙলা ভাগের বিরুদ্ধে আপ্রাণ লড়াই চালিয়েছিলেন । কারণ তিনি বুঝেছিলেন বাঙলাভাগ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন পূর্ববঙ্গের তফসিলীশ্রেণীর মানুষেরা । তিনি সাধ্যাতীত চেষ্টা করেছিলেন । জনসভার পর জনসভা করে তিনি বাঙলাভাগের বিপক্ষে জনমত সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন ; কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন । কারণ তার সম্প্রদায়ের মানুষেরা ছিলেন অসচেতন ও গুরুত্বহীন । তারা বাঙলাভাগের বিপদ সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারেননি । যােগেন্দ্রনাথও ভদ্রলােকশ্রেণীর মিথ্যা ও অপপ্রচারের সাথে পাল্লা দিতে পারেননি । ভদ্রলোেকশ্রেণী মহাপ্রাণের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও কুৎসা প্রচার করে তাকে নিজের সম্প্রদায়ের মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়াস নেন এবং তারা অনেকাংশে তাতে সফল হন । এমনকি ভদ্রলােকশ্রেণী তাকে খুন করারও চেষ্টা করেন । এই লক্ষ্যে তারা কলকাতার ভারতসভা হলে বাঙলাভাগ বিরােধী যােগেন্দ্রনাথের সভায় কলকাতায় জেলেপাড়ার গুন্ডাদের ভাড়া করে নিয়ােগ করেন ।
ইতিমধ্যে কংগ্রেস হাইকমাণ্ড একটা শক্তিশালী কেন্দ্র ও একক (unitary) ভারত গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে ফেলে। ভারতের ঐক্য ও সংহতি নিশ্চিত করার উপায় হিসাবে কংগ্রেস মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল কেটে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় । নেহেরু এবং সর্দার প্যাটেলের মধ্যে বহুক্ষেত্রে মতবিরােধ হলেও , এ বিষয়ে তাদের দু'জনের মধ্যে ঐকমত্য ছিল । তারা সিদ্ধান্ত নেন যে , কোন অবস্থাতেই , কোনাে একক প্রদেশকে , বিশেষ করে বাঙলা ও পাঞ্জাবকে ভারতীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাবার অনুমতি দেওয়া হবে না । প্যাটেলের মনােভাব ছিল---নিজে থেকে কংগ্রেস যেটুকু জিন্নাহকে ছেড়ে দিতে মনস্থির করবে , তার বেশি এক ইঞ্চি জমিও দেওয়া হবে না । এই কারণে বাঙালি ভদ্রলােক হিন্দুদের উত্থাপিত বাঙলা ভাগের দাবির প্রতি তিনি দৃঢ় সমর্থন জানান । ২৩ শে মে ১৯৪৭ তারিখে বিনয়কুমার রায়কে সর্দার প্যাটেল এক চিঠিতে জানান (দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত সর্দার প্যাটেল করেস্পণ্ডেন্স) “ভারতীয় ইউনিয়ন থেকে গােটা বাঙলা পৃথক হতে পারে না । 'যুক্ত ও সার্বভৌম বাঙলা' প্রজাতন্ত্রের ধারণা হলাে , বােকার মত মুসলিম লীগের খপ্পরে পড়া । ওটা হলাে তাদের (মুসলিম লীগের) অপ্রত্যাশিত প্ররােচনামূলক ফাঁদ । বাঙলার এই অবস্থা সম্পর্কে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি সম্পূর্ণ সচেতন এবং আপনাদের ভয় পাবার আদৌ কোন প্রয়ােজন নেই । অমুসলিম জনগণের বেঁচে থাকার জন্য বাঙলাকে অবশ্যই ভাগ করা হবে"।
বাঙলায় যে কয়েকজন জাতিয়তাবাদী মুসলমান নেতা তখনও কংগ্রেসের
(১২১)
সাথে ছিলেন , এই অবস্থায় , তারা কংগ্রেসের কাছে বাঙলাভাগ রুখতে মিনতিপূর্ণ আহ্বান জানান । হাইকমাণ্ড তাদের প্রতিও একইরকম কঠোর ব্যবহার করে । ১৩ই মে, ১৯৪৭ সালে জে বি কৃপালনী এক চিঠিতে আশরাফউদ্দিন আহমদ চৌধুরীকে লেখেন , “এখন কংগ্রেস যা করতে চায় , তাহলো , লীগের হুমকিপূর্ণ কর্তৃত্ব ও পাকিস্তান থেকে যতবেশি লােককে সম্ভব উদ্ধার করা । বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাধীন ভারতীয় ইউনিয়নের জন্য কংগ্রেস বাঙলা এবং পাঞ্জাব ভাগ করতে চায় । এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস এছাড়া আর কী করতে পারে , তা আমার জানা নেই"। পূর্ব বাঙলার মাটিতে দাঁড়িয়ে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে লড়াই করে কংগ্রেসকে সেবাদানের দক্ষিণা পেয়ে আশরাফউদ্দিন ভেঙে পড়েন । কারণ এই বিভাগের ফলে তাকে সীমারেখার পূর্বপ্রান্তেই থাকতে হবে । অন্যদিকে ইতিহাসের "জঘন্যতম লােক" (!) হােসেন সােহরাওয়ার্দিকেও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্রের প্রশ্নে কম বিরােধিতার মুখে পড়তে হয়নি । আবুল হাসিম ও সােহরাওয়ার্দির চেষ্টা সত্ত্বেও সার্বভৌম বাঙলার প্রশ্নে মুসলিম লীগ নেতৃত্ব বিভক্ত হয়ে পড়েন ।
মুসলমানদের মধ্যকার সবকটি গ্রুপ, দল ও উপদল বাঙলাকে দু’ভাগে বিভক্ত করার বিরােধিতা করে । তবে সেই অবিভক্ত বাঙলা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে থাকবে , এ ধারণা সব মুসলমান পছন্দ করেননি । বিশেষ করে মওলানা আকরম খাঁ ও খাজা নাজিমুদ্দিন চেয়েছিলেন যে , বাঙলা পাকিস্তানের অংশ হিসাবে থাকবে অথবা নিতান্ত তা সম্ভব না হলে পশ্চিমাঞ্চলের মুসলিম রাষ্ট্রের (পাকিস্তান) সাথে তার (বাঙলার) একটা ঘনিষ্ঠ শাসনতান্ত্রিক সম্পর্ক বজায় থাকবে । মুসলিম লীগের সাধারণ নেতা কর্মীদের মধ্যেও ঐক্য ছিল না । গোঁড়া ইসলামপন্থি একাংশ 'সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রী বাঙলার' বদলে ইসলামের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানকে অগ্রাধিকার দেন । দিল্লীতে মুসলিম লীগের সম্মেলনে আবুল হাশিম 'যুক্ত ও সার্বভৌম বাঙলার' প্রস্তাব পেশ করতে গেলে দলের লােকেরাই চিৎকার করে তাকে থামিয়ে দেন ।
এ প্রসঙ্গে শরৎচন্দ্র বসুর ভাই সুভাষচন্দ্র বসুর অনুগামী ও অনুসারী বলে দাবিদার বাঙলার ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ দল - এর ভূমিকা নিয়েও দু'চার কথা উল্লেখ করা প্রয়ােজন। তাতে বাঙালি ভদ্রলােকশ্রেণীর মানসিকতা আরও খানিকটা স্পষ্ট হতে পারে । এই দলটির বাঙলা কমিটি তাদের সর্বভারতীয় নেতৃত্বের সাথে বাঙলাভাগ প্রশ্নে দ্বিমত পােষণ করে । সর্বভারতীয় সংগঠনের সিদ্ধান্ত ছিল বাঙলাভাগের বিরুদ্ধে । এ অবস্থায় বাঙালি উচ্চবর্ণহিন্দু ও ভদ্রলােকশ্রেণীর নেতৃত্বাধীন কমিটির সিদ্ধান্ত জানিয়ে ১৯৪৭ সালের ৫ মে একটি চিঠির মাধ্যমে সর্বভারতীয় সংগঠনকে
(১২২)
এই দ্বিমতের কথা অবহিত করা হয় এভাবে----"গত সপ্তাহে বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল ফরওয়ার্ড ব্লকের নির্বাহী পরিষদের ৩২ জন সদস্য , প্রস্তাবিত বাঙলাভাগ সম্পর্কিত সর্বভারতীয় সংগঠনের সিদ্ধান্ত পুণর্বিবেচনা করার জন্য অনুরােধ জানাচ্ছে । কারণ বাঙলাবিভাগের প্রতি ক্রমবর্ধমান জনসমর্থন সত্ত্বেও ফরওয়ার্ড ব্লক যদি বাঙলাভাগের বিরােধিতার নীতি অব্যাহত রাখে , তাহলে ফরওয়ার্ড ব্লক সংগঠন সম্ভবত বিভক্ত হয়ে পড়বে এবং শেষে তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে"।
ফরওয়ার্ড ব্লকের ৩২ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র ৮ জন সদস্য শরৎচন্দ্র বসুর উদ্যোগের পক্ষে ছিলেন এবং বাকিরা বাঙলাভাগের পক্ষ সমর্থন করার জন্য মত দেন। যে ৮ জন বাঙলাভাগের বিরুদ্ধে সর্বভারতীয় কমিটির পক্ষে মত দেন , তারা হলেন – লীলা রায় , অনিলবরণ রায় , হেম ঘােষ , জ্যোতিষ জোয়ারদার , সত্যরঞ্জন বকসী প্রমুখ ।
সুভাষচন্দ্র বসুর বাঙালিভদ্রলােক অনুগামীরা এই সময় একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন । তার নাম দেওয়া হয় বাঙলার হিন্দু সাবধান । তাতে লেখা হয় "তােমরা দেখতে পাবে আমরা কীভাবে প্রতিশােধ গ্রহণ করি । বাঙলাভাগের আন্দোলন থামবে না । আজ শরৎচন্দ্র বসু ও তার কয়েকজন অন্ধ সমর্থক , ঘৃণ্য পুরুষ ও মহিলা , বাঙলাবিভাগ আন্দোলনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। কারণ তারা নিরাপদ এলাকায় বসবাস করেন । আজ যদি তার বীরভাই (সুভাষচন্দ্র) আমাদের মাঝে থাকতেন এবং যদি বিবেচনা করতেন যে , বাঙলাভাগের আন্দোলন বন্ধ করা উচিত , তাহলে তিনি ঐসব বিপজ্জনক স্থানে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের মনে আস্থা জাগিয়ে তুলতেন । শরৎচন্দ্র বসু যে কাপুরুষতা প্রদর্শন করেছেন , তারজন্য আমরা তাকে চিরতরে থামিয়ে দিতে পারতাম , যদি তিনি নেতাজীর ভাই না হতেন । আমরা বাঙলাভাগ বা একটা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার চাই । কিন্তু শরৎবাবুর মতাে লােক দিয়ে এ ধরনের সরকার গঠন করা যাবে না । কারণ তারা হলেন – মুসলমানদের অনুচর । সরকারে শ্যামাপ্রসাদের মতাে হিন্দুদের অবশ্যই থাকতে হবে" ।
এ অবস্থায় , সব কিছু বিচার বিশ্লেষণ করে শরৎচন্দ্র বসু দৃঢ়তার সাথে বলেন, "পশ্চিমবাঙলার উচ্চ মধ্যবিত্তশ্রেণীর কিছুলােক প্রদেশভাগের জন্য সংকল্প ঘােষণা করেছে"। কিন্তু শরৎচন্দ্র বসু প্রমাণ করতে পারেননি যে , পূর্ববাঙলার সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা এই বিভাগের বিরুদ্ধে ।
বাঙলাভাগের জন্য উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকরা ব্যাপক প্রচার আন্দোলন সংগঠিত করে । সম্ভাব্য সমস্ত ধরনের পদ্ধতি তারা এ কাজে ব্যবহার করে । আগেই আলােচনা করা হয়েছে যে , কলকাতা ও নােয়াখালির দাঙ্গা তাদের এই বিচ্ছিন্নতার দাবিকে গ্রহণযােগ্য করে তােলার জমি তৈরি করে দেয় ।
(১২৩)
বাঙলাভাগের দাবিতে হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেস কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে । বাঙলাভাগের দাবিতে মােট ৭৬ টি উল্লেখযােগ্য জনসভার আয়ােজন করা হয় বলে জানা যায় । এরমধ্যে কংগ্রেস একাই করে ৫৯ টি জনসভা । হিন্দু মহাসভার উদ্যোগে হয় ১২ টি জনসভা এবং ৫ টি জনসভা হয় এই দুই দলের যৌথ উদ্যোগে ।
বসু ভ্রাতৃদ্বয়ের অপসারণের পরে ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় এবং নলিনীরঞ্জন সরকারের নেতৃত্বে পার্টি বেশি বেশি হিন্দুত্ববাদী লাইন অনুসরণ করে এবং পার্টি অনেকটাই দৃঢ়ভিত্তির উপর দাঁড়ায় । চল্লিশের দশকে সদস্যভুক্তি এবং নীতির ক্ষেত্রে কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভার মধ্যে প্রায় কোন পার্থক্য থাকে না । বিশেষ করে সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে বাঙলায় হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেসের মধ্যে প্রায় কোন পার্থক্যই থাকে না । প্রয়ােজনে দুই দল একসঙ্গে কাজ করতে থাকে ।
উদাহরণ হিসাবে একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে । পাঞ্জাবি পুলিশের নৃশংসতার প্রতিবাদে ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে হিন্দু মহাসভার ওয়ার্কিং কমিটি একদিন হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত নেয় । পাঞ্জাবি পুলিশের নৃশংসতার কথা প্রচার করা হলেও , বাস্তবত এ ছিল বাঙলা বিভক্তির আন্দোলনের জন্য প্রথম বড় পদক্ষেপ । হিন্দু মহাসভা সিদ্ধান্ত নিলেও , তারা অপেক্ষা করে প্রদেশ কংগ্রেসের কার্যকরি কমিটির সিদ্ধান্তের জন্য । মে মাসে কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভা বাঙলা ভাগের দাবিতে যৌথভাবে কলকাতায় এক বিশাল জনসভার আয়ােজন করে । ঐ সভায় সভাপতিত্ব করেন ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার । প্রাদেশিক পর্যায়ে এই সহযােগিতার ধারা স্থানীয় স্তর পর্যন্ত প্রসারিত হয় । বাঙলাভাগের জন্য যত জনসভা হয় , তারমধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযােগ্য এবং বহুল প্রচারিত সভাটি হয় কলকাতার বালিগঞ্জে । কংগ্রেসের নিজস্ব উদ্যোগেই হয় এই জনসভা । এই সভায় সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট গান্ধীবাদী নেতা ড. প্রফুল্লচন্দ্র রায় । এই বিভক্তির আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বর্ধমান জেলা ।
অনেকেই মনে করেন এবং প্রচার করা হয় যে , ড . শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ছিলেন বাঙলা ভাগের মহানায়ক। সেই দিক দিয়ে কেউ কেউ তাকে পশ্চিমবঙ্গের স্রষ্টাও বলে থাকেন । কিন্তু এই কথা ও দাবি আংশিক সত্য। কারণ বাঙলাভাগের দাবি হয়তাে তিনি প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে তুলেছিলেন ; কিন্তু বাঙলাভাগের লক্ষ্যে যে আন্দোলন পরিচালিত হয় , তার কৃতিত্ব কংগ্রেসেরও---প্রদেশকংগ্রেস এবং হাইকমান্ড উভয়ের। চল্লিশের দশকে হিন্দু মহাসভা ছিল একেবারেই হীনবল এবং ড .শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী বাঙলার শীর্ষস্থানীয় নেতা হিসাবেই পরিচিতি পান নি।
(১২৪)
বাঙলাভাগের আন্দোলনে বিড়লা ও তার সম্প্রদায়ের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন । জি.ডি. বিড়লা ১৯৪২ সালেই মহাদেব দেশাইয়ের কাছে স্বীকার করেন যে , তিনি বাঙলাভাগের পক্ষে ; কারণ তা বাস্তবসম্মত এবং হিন্দুদের স্বার্থের পক্ষে সংগতিপূর্ণ । কোলকাতার মাড়ােয়ারিরা বাঙলাভাগের পক্ষে কাজ করেন । বাঙলাভাগের আন্দোলনের জন্য তারা প্রচুর অর্থ সাহায্য করেন ।
উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকরা বিভিন্ন জেলা থেকে বাঙলা ভাগের দাবি জানিয়ে আবেদনপত্র পাঠাবার কর্মসূচী নেন ; যাতে প্রমাণ হয় যে , অধিকাংশ হিন্দুরা বাঙলাভাগ করতে ইচ্ছুক । প্রকৃতপক্ষে একটি বয়ান লিপিবদ্ধ করে, তা ছাপানাে হয় এবং তাতে স্বাক্ষর করিয়ে হাইকমান্ডকে পাঠানাে হয় । ছাপানাে দরখাস্তের বয়ান হলাে---
“বিষয় : পৃথক পশ্চিমবাঙলা প্রদেশ গঠনের দাবী
শ্রদ্ধাপূর্ণ প্রার্থনাসহ জানাই – আমরা স্বাধীনভারতীয় ফেডারেশনের অধীন থাকতে চাই । প্রস্তাবিত 'পশ্চিমবাঙলা প্রদেশ'-এর জন্য দাবির কথা আমরা আপনাদের অবহিত করছি । এই প্রদেশ থাকবে স্বাধীন ভারতীয় ফেডারেশনের অধীন ।
মুসলিমলীগ সরকার জীবন , সম্পত্তি ও স্বাধীনতা রক্ষায় ব্যর্থ হয়ে বাঙালি হিন্দুদের জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে । মুসলিম রাজ-এর অধীন অগ্রহণযােগ্য অবমাননার জীবন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রদেশকে বিভক্ত করতে হবে"।
অধিকাংশ ছাপানাে দাবিপত্রের নীচে স্বাক্ষরকারির পূর্ণ নাম , ঠিকানা , পেশা ও বয়স লেখার ব্যবস্থা ছিল ।
জেলাভিত্তিক একটি হিসাবে দেখা যাচ্ছে বর্ধমান জেলা থেকে এরকম দরখাস্ত পাওয়া গেছে বা করা হয়েছে ৪৩ টি , বীরভূম থেকে ২ টি , বাঁকুড়া থেকে ৩৪ টি , মেদিনীপুর থেকে ৩৪ টি , হুগলী থেকে ১৮ টি , হাওড়া থেকে ৩৭ টি , কোলকাতা থেকে ৯৪ টি , ২৪ পরগনা থেকে ২৩ টি , মুর্শিদাবাদ থেকে ৫ টি , নদিয়া থেকে ১৮ টি , যশাের থেকে ৩ টি , খুলনা থেকে ১৫ টি , রাজশাহী থেকে ৩ টি , দিনাজপুর থেকে ৬ টি , জলপাইগুড়ি থেকে ১২ টি , দার্জিলিং থেকে ৬ টি , মালদা থেকে ১২ টি , রংপুর থেকে ১ টি , বগুড়া জেলা থেকে ০ টি , পাবনা থেকে ১ টি , ঢাকা থেকে ৬ টি , ময়মনসিংহ থেকে ৬ টি , ফরিদপুর থেকে ৩ টি , বরিশাল থেকে ১৪ টি , ত্রিপুরা থেকে ১ টি , নােয়াখালী থেকে ২ টি , এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ১ টি অর্থাৎ মােট ৪০০ টি দরখাস্ত পাওয়া যায় । দেখা যাচ্ছে---পশ্চিমাঞ্চলের হিন্দুপ্রধান জেলাগুলি থেকেই বেশি আবেদনপত্র জমা পড়ে (এআই সি সি পেপার্স থেকে সংগৃহীত তথ্য : জয়া চ্যাটার্জি)।
(১২৫)
এই সমস্ত দাবিপত্র বা আবেদনপত্রগুলি সম্বােধন করা হয়েছে তৎকালীন সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির প্রেসিডেন্ট আচার্য জে বি কৃপালনীর নামে । মাত্র ৪ টি দাবিপত্রে সম্বােধন করা হয় ড .শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর নামে । হিন্দু মহাসভার বরিশাল শাখা থেকে ঐ ৪ টি দাবিপত্র পাঠানাে হয় । এরদ্বারা বােঝা যায় যে , বাঙলাবিভাগ আন্দোলনের প্রধান সংগঠক ছিল বেঙ্গলকংগ্রেস এবং ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর গুরুত্ব কার্যতঃ খুবই কম ছিল ।
নিম্নবর্ণীয় হিন্দু সংগঠনের পক্ষ থেকেও বাঙলা বিভাগের দাবি জানিয়ে কয়েকটি আবেদনপত্র জমা পড়ে । যেমন : বারাসাতের ‘তফসিলী সম্প্রদায়, হিন্দু' , বর্ধমানের পরাতল ইউনিয়নের 'আদিবাসী সমিতি' , ময়মনসিং জেলার 'ইসলামপুর হরিজন সেবা সংঘ', খুলনার 'তফসিলী সম্প্রদায় সমিতি' , জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং এর 'আদিবাসী সমিতি' , 'বঙ্গীয় সদ্গােপ সভা' ’বঙ্গীয় মাহিষ্য সমিতি' , খুলনার ‘বঙ্গীয় যাদব মহাসভা' , এবং জয়নগরের ‘তফসিলী সম্প্রদায়, হিন্দু' - এই সংগঠনগুলিও বাঙলা বিভাগের দাবি জানিয়ে আবেদনপত্র পাঠায় । এই আবেদনপত্রগুলি পড়ে বােঝা যায় যে , 'হিন্দু মহাসভা'র শুদ্ধি অভিযান যথেষ্ট কাজ দেয় । তবে এ কথাও ঠিক যে , এই সমস্ত সংগঠনের প্রায় সবগুলিই মূলতঃ পশ্চিমবঙ্গ ভিত্তিক সংগঠন । আর খুলনা জেলার সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা হয়তাে ঐ জেলার ভারতভুক্তির আশা করেছিলেন ।
পূর্ব বাঙলার একমাত্র জেলা বরিশাল , যেখানে 'হিন্দু মহাসভা'র যথেষ্ট শক্তি ছিল এবং জেলায় তারাই বাঙলা বিভাগের দাবি জোরদার করেন । মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এই জেলার হিন্দুরা হিন্দু মহাসভার নেতৃত্বে বাঙলাভাগের দাবিকে জোরদার করে এবং পরে এক অবাস্তব দাবি উত্থাপন করেন । তারা দাবি করেন যে , যেকোনােভাবেই হােক বরিশালের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ মহকুমা ও অঞ্চলগুলিকে প্রস্তাবিত হিন্দু রাজ্যের অর্থাৎ পশ্চিমবাংলার অন্তর্ভুক্ত করা হােক । বাঙলাবিভাগের দাবি সমর্থন করে বরিশাল জেলা হিন্দু মহাসভা মে মাসে এক স্মারকলিপিতে বরিশাল ও ফরিদপুর জেলার কিছু অংশকে নতুন হিন্দুপ্রদেশের (পশ্চিমবঙ্গের) অন্তর্ভূক্ত করার জন্য এভাবে যুক্তি উত্থাপন করে – ‘এটা এখন সুপ্রতিষ্ঠিত সত্যে পরিণত হয়েছে যে , সাম্প্রদায়িক সংহতি , শান্তি ও সুস্থিরতার স্বার্থে এবং হিন্দু সংস্কৃতি ও ধর্মীয় , অর্থনৈতিক , রাজনৈতিক অধিকার এবং সুযােগ সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য বাঙলায় হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগঠন প্রয়ােজন হয়ে পড়েছে । গত ১০ বছর মুসলিম লীগ প্রশাসনের অধীনে , বিশেষ করে ১৬ ই আগষ্ট ‘ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডে' ঘােষণার পর এবং এরফলে সৃষ্ট নৃশংসতায় হিন্দুদের সংস্কৃতি ও অন্যান্য সুযােগ সুবিধা মারাত্মকভাবে বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
(১২৬)
তাই, এমতাবস্থায় যেন একটি নতুন বরিশাল জেলা গঠন করা হয়, যারমধ্যে থাকবে পুরাে গৌরনদী , উজিরপুর, ঝালকাঠি, স্বরূপকাঠি থানা, বাবুগঞ্জ , নলছিটি , বাকেরগঞ্জ , কোনাখালি ও পিরােজপুর থানার অংশ এবং নতুনভাবে গঠিত এই বরিশাল জেলাকে নতুনভাবে গঠিত হিন্দুরাজ্যের (পশ্চিমবঙ্গের)অন্তর্ভুক্ত করতে হবে ।
এর মাত্র কয়েকদিন পর ৩ রা জুন , ১৯৪৭ তারিখে মাউন্টব্যাটেন বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানান যে , বাঙলা প্রদেশভাগ হবে কি হবে না , সে সিদ্ধান্ত নেবে বাঙলার প্রাদেশিক আইন সভার সদস্যরা । ভােটের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে বলে জানানাে হয় । শর্ত উল্লেখ করা হয় যে , প্রাদেশিক আইনসভার হিন্দু সদস্য এবং প্রাদেশিক আইন সভার মুসলমান সদস্যরা পৃথকভাবে ভােটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবেন । তাতে দু’পক্ষেরই সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যবৃন্দ বাঙলাভাগ না চাইলে বাঙলা ভাগ হবে না ; কিন্তু এক অংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা বাঙলাভাগ চাইলে বাঙলাকে ভাগ করা হবে ।
বাঙলা প্রাদেশিক আইন সভার মুসলমান সদস্যরা জনাব নুরুল আমিনের সভাপতিত্বে ভােটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন । মুসলমান সদস্যদের মধ্যকার অধিকাংশ সদস্য বাঙলাভাগের বিরুদ্ধে ভােট দেন । বাঙলা প্রাদেশিক আইনসভার হিন্দু সদস্যরা বর্ধমানের মহারাজা উদয়চাঁদ মহতাব-এর সভাপতিত্বে ভােটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন । অধিকাংশ হিন্দু সদস্য প্রত্যাশিতভাবেই বাঙলাভাগের পক্ষে ভােট দেন । বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ঘটনা হলাে – প্রয়াত কমরেড জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে ৩ জন কমিউনিস্ট পার্টির প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য বাঙলাভাগের পক্ষে ভােট দেন এবং মহাপ্রাণ যােগেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে প্রায় সব তফসিলী প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য বাঙলাভাগের বিরুদ্ধে ভােট দেন । অবশ্যই শরৎচন্দ্র বসুও বাঙলাভাগের বিপক্ষে ভােট দিয়েছিলেন । ফলে , ভারতভাগের সিদ্ধান্ত হবার ৫৫ দিন আগে বাঙলাভাগের সিদ্ধান্ত পাকা হয়ে যায় ।
পূর্ব বাঙলার হিন্দু, যারা বাঙলা বিভাগের দাবি জানান, তারা হয়তাে কেউ এই নির্মম সত্যের মুখােমুখি হবার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না যে , বাঙলাভাগের পর তার নিজের গ্রাম , শহর বা থানা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবে । কিন্তু যখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নতুন হিন্দুপ্রদেশের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বাগাড়ম্বরকারি নেতাদের তাঁদের জন্য কোন বিশেষ উদ্ধারপ্রকল্প নেই , তখন তাদের কোলকাতা ও পশ্চিমবাঙলায় পাড়ি জমানাে উদ্বাস্তুদের স্রোতে যােগ দেওয়া অথবা কল্পিত পাকিস্তানের ভূত কাঁধে নিয়ে বসবাস করা ছাড়া গত্যন্তর রইলাে না!
বাঙলার উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণীর জাত্যাভিমান , লােভ ও ক্ষমতালিপ্সার পরিণতি হলাে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি মানুষের বাস্তুত্যাগের ঘটনা । (১২৭)
কয়েক কোটি মানুষের দেশান্তরণ । ভিটেমাটি হারিয়ে উদ্বাস্তু জীবনের অসম্মান , অনিশ্চয়তা ও শিকড় ছেড়ার যন্ত্রণা । কিন্তু সে বেদনা ভদ্রলােক সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত মানুষেরও মনকে ছুঁতে পারে না । ১৯৪৭ সালের ২৫ শে জুন তিনি এক চিঠিতে লেখেন , “বঙ্গ ভাগ হয়ে গেল, নুতনবঙ্গ হলো, ভালই হলাে । বাঙালি হিন্দুরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে ।
তথ্যসুত্রঃ
১) ড . আম্বেদকর রচনাবলী , খণ্ড - ২ , পৃ . ৪১৪
২) ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম : সুপ্রকাশ রায় , পৃ . ১৩৪
৩) ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম : সুপ্রকাশ রায় , পৃ . ৫
৪) শারদোৎসব – সাম্রাজ্যবাদী উৎসব : মােহম্মদ হেলালউদ্দিন , পৃ . ১৬-১৭
৫) ড . আম্বেদকর রচনাবলী , খণ্ড -২ , পৃ . ৪০৯
৬) ড. আম্বেদকর রচনাবলী , খণ্ড -২ , পৃ . ৪১৯
৭) ড.আম্বেদকর রচনাবলী , খণ্ড -২ , পৃ . ৪২৩-৪২৪
৮) ড. আম্বেদকর রচনাবলী , খণ্ড -২ , পৃ . ২৮২
৯) ড . আম্বেদকর রচনাবলী , খণ্ড -২ , পৃ . ৩৮
১০) ডিসকভারি ইণ্ডিয়া : নেহেরু , পৃ . ৩৫৩
১১) বঙ্গভঙ্গ রদ্ : বাঙালি হিন্দুর গর্বকথা , না সর্বনাশের পাঁচালি ? – ড . অশােক মিত্র
১২) ভারতে বৈপ্লবিক সংগ্রামের ইতিহাস : সুপ্রকাশ রায়, পৃ . ১৯
১৩) বঙ্গভঙ্গ রদ : বাঙালি হিন্দুর গর্বকথা , না সর্বনাশের পাঁচালি ? - ড . আশােক মিত্র
১৪) পরিকথাঃ অম্লান দত্ত , পৃ .১৪৮ , ১৪৯, ১৫০
১৫) স্বদেশ স্বদেশ করছি কাকে : সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৬) ড . আম্বেদকর রচনাবলী ; খণ্ড -২ , পৃ . ৫৩০
১৭) ভারতের বৈপ্লবিক সংগ্রামের ইতিহাস : সুপ্রকাশ রায় , পৃ . ১৬৪
১৮) ভারতের বৈপ্লবিক সংগ্রামের ইতিহাস ও সুপ্রকাশ রায় , পৃ ২৮৯
১৯) বাঙলা ভাগ হল ; — জয়া চ্যাটার্জী , পৃ . ৯
২০) ড . আম্বেদকর রচনাবলী - খণ্ড -২ , পৃ . ৪৩৭
২১) একশ ' বছরের রাজনীতি ও আবুল হাসাদ বাংলাদেশ , ( উল্লেখ : সাম্রাজ্যবাদী উৎসব – মােঃ হেলালউদ্দিন )
২২) পরিকথাঃ বঙ্গভঙ্গের শতবর্ষ
[ এছাড়া অন্যান্য যেসব বই ও প্রবন্ধ এবং তথ্যের সহযােগিতা নেওয়া হয়েছে , তার উল্লেখ লেখার মধ্যে যথাস্থানে করা হয়েছে )
(তথ্যসূত্রের যে নোট, বইয়ের মধ্যে আছে, এই কপিতে তা মুছে গেছে, ঠিক করতে পারলাম না, দুঃখিত)
(১২৮)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন