ভদ্রলোকশ্রেণী...৩
নবম অধ্যায়
বাঙলার প্রথম মুসলিম মন্ত্রিসভা
১৯৩৭ সালের নির্বাচনের আগে কৃষক প্রজা পার্টি এবং কংগ্রেসের মধ্যে এক ধরনের সমঝােতা হয়েছিল ঠিকই ; কিন্তু বাঙলা প্রাদেশিক সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে কোয়ালিশন সরকার হলাে না । এই কোয়ালিশন না হবার অন্যতম বড় কারণ হলাে — কংগ্রেস জমিদারদের স্বার্থ দেখতে বদ্ধপরিকর এবং উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকদের স্বার্থের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ । অন্যদিকে কৃষক প্রজা পার্টি জোতদার ও প্রজাকৃষক এবং সাধারণভাবে মুসলমানদের চাকরি ও শিক্ষার সুযােগ সৃষ্টির জন্য দায়বদ্ধ ছিল । কোয়ালিশন সরকারের কর্মসূচী নিয়ে আলােচনার সময় কংগ্রেস মুখপত্র শরৎচন্দ্র বসু , ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় ও কিরণশংকর রায় চান যে , রাজবন্দিদের মুক্তির বিষয়টি সরকারের কাছে অগ্রাধিকার পাক এবং প্রয়ােজনে এই ইস্যুতে মন্ত্রীসভাকে পদত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে । কৃষক প্রজা পার্টিরও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে রাজবন্দিদের মুক্তির বিষয়টি ছিল ঠিকই ; কিন্তু তাদের কাছে কৃষকের কল্যাণই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ । তারা মনে করেন — রাজবন্দিদের মুক্তির প্রশ্নে পদত্যাগ করলে কৃষক কল্যাণের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে – তাই তারা তাতে রাজি হননি ।
এই অবস্থায় কৃষক প্রজা পার্টির সাথে মুসলিম লীগের সমঝােতা হয় । এই সমঝােতা ছিল রাজনৈতিক দিক দিয়ে খুবই অস্বাভাবিক । কারণ একই মুসলমান ভােট নিয়ে তাদের মধ্যে ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে আগামীদিনেও । তবুও ঠিক হয় জমিদারদের ক্ষতিপূরণ দেবার শর্তে মুসলিম লীগ জমিদারি বিলােপের জন্য গৃহীত ব্যবস্থাকে সমর্থন করবে ।
ঢাকার নবাবদের মত উচ্চশ্রেণীর মুসলমানদের , তাদের এস্টেটের আর্থিক ক্ষতিপূরণ হিসাবে পুরস্কার স্বরূপ বিভিন্ন সরকারি পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় । কিন্তু ক্ষমতায় না থাকায় এই ধরনের সুবিধা দেবার সুযােগ
(৮৭)
তখন কংগ্রেসের ছিল না । তাই , হিন্দু জমিদাররা আরও বেশি ক্ষতির আশংকা করেন ।
কৃষক প্রজা পার্টি ও মুসলিম লীগের কোয়ালিশন মন্ত্রিসভার প্রধান হিসাবে অর্থাৎ বাঙলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী (প্রিমিয়ার) হিসাবে এ . কে . ফজলুল হক ১৯৩৭ সালের ১ লা এপ্রিল শপথ নেন । ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত বাঙলায় মােট ৪ বার মন্ত্রিসভা ভেঙে যায় এবং নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয় ।
১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত সারাভারতের ৬ টি হিন্দুসংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে কংগ্রেস সরকার পরিচালনা করে । তারপর নভেম্বর মাসে হাইকমাণ্ডের নির্দেশে একযােগে সব মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে । মুসলমানরা কংগ্রেসী শাসনকে দৃঢ়ভাবে বিরােধিতা করেন । তাদের অভিযােগ – ঐসব প্রদেশে কংগ্রেস বাস্তবতঃ হিন্দুরাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে । ড . আম্বেদকর মুসলমানদের এই দাবির সাথে সহমত পােষণ করেন এবং এই পদত্যাগের পর মুসলমানরা যে মুক্তিদিবস পালন করেন তাতে বম্বের ভেনডি বাজারের এক সভায় জিন্নার সাথে ড . আম্বেদকরও অংশগ্রহণ করেন । এই সময়কার কংগ্রেসী শাসনে অস্পৃশ্য , শ্রমিক ও কৃষকরা খুশি ছিলেন না ।
বাঙলার এই সরকার , কোন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সরকার ছিল না ; বরং পরস্পর বিরােধী কর্মসূচী সম্পন্ন দুটি দলের কোয়ালিশন সরকার ছিল । তবুও এই সরকার যেভাবে , সাধারণভাবে হিন্দু ও মুসলমান গরিব প্রজাকৃষক , জোতদার , ধনীকৃষক এবং শিক্ষিত মুসলমান ও তফসিলীশ্রেণীর স্বার্থে বিভিন্ন আইন ও নীতি প্রণয়ন করেছে এবং তার সঠিক বাস্তবায়ন করেছে , তা শিক্ষণীয় ও উল্লেখযােগ্য । সাম্প্রতিককালে ভারতের উত্তর প্রদেশে মায়াবতীর নেতৃত্বে পিছিয়ে পড়া মানুষের হাতে সে সুযােগ এলেও তারা তা কিছুমাত্র কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয় ।
বাঙলায় সর্বপ্রথমে হয়েছিল কৃষক প্রজা পার্টি ও মুসলিম লীগের কোয়ালিশন সরকার এবং একেবারে শেষে হয় মুসলিম লীগ ও তফসিলীদের যৌথ সরকার । মহাপ্রাণ যােগেন্দ্রনাথ মণ্ডল প্রায় দেড় ডজন নির্দল ও অন্যান্য তফসিলী প্রাদেশিক আইনসভা সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ করেন ও মুসলীম লীগকে শর্তযুক্ত সমর্থন দেন সরকার গঠন করার জন্য । এই সময়ে বাঙলার আইন সভায় এমন সব আইন প্রণীত হয় , যাকে , যেকেউ অভিযােগ করতে পারেন – উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণীর স্বার্থের বিনিময়ে মুসলমান স্বার্থকে রক্ষা করার সামিল । কিন্তু বাস্তবতঃ এইসব আইনের ফলে হিন্দু - মুসলমান জোতদার , প্রজা কৃষক ও সাধারণ মানুষই উপকৃত হন ।
এই পর্যায়কালে আইনসভার মুসলমান সদস্যদের প্রস্তাব, সিদ্ধান্ত ও আক্রমণ
(৮৮)
প্রতিহত করার ক্ষেত্রে কংগ্রেস ছিল অসহায় । প্রথমতঃ কংগ্রেস টিকিটে পল্লীএলাকা থেকে যারা জয়যুক্ত হয়ে বাংলার আইনসভার এসেছিলেন , তারা ছিলেন অধিকাংশই নতুন । পল্লী ও মফঃস্বল এলাকায় তারা লালিত পালিত ও বড় হয়েছেন । তাদের অভিজ্ঞতা বলতে ইউনিয়ন , জেলা বাের্ড বা কৃষক সমিতিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা । এই সীমিত অভিজ্ঞতার প্রশ্ন ছাড়াও তারা প্রকৃতপক্ষে কৃষক ও জোতদারের পক্ষে সরব ছিলেন ।--- কারণ তাতেই তাদের স্বার্থ ও লাভ । এদের অনেকেরই এক সময়ের নেতা ছিলেন ফজলুল হক।
বেঙ্গল প্রজাস্বত্ব (সংশােধিত) বিল বাঙলার আইনসভায় উত্থাপন করা হয় ১৯৩৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে । এই আইনের মাধ্যমে জমিদারদের ক্ষমতা অর্ধেক করে দেওয়া হয় , যাতে পক্ষান্তরে জোতদার ও ধনী কৃষকদের হাত শক্ত হয় । প্রজা কৃষকরাও উপকৃত হন । কার্যতঃ এই আইনের ফলে পল্লীএলাকায় হিন্দুকর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখােমুখি দাঁড়ায় । জমিদাররা এই আইনকে সাম্প্রদায়িক বলে আখ্যায়িত করে এবং তা দেশে বিশৃঙ্খলা ডেকে আনবে বলে মন্তব্য করেন ।
এরপর আনা হয় অন্য আরেকটি বিল । এই আইনের ফলে কৃষিপণ্য ও অন্যান্য জিনিসপত্র বিক্রয়ের স্থানীয় বাজার বা জমিদারি হাটের উপর আঘাত আসে । এই হাটগুলি ছিল জমিদারদের অন্যায্য আয়ের একটা প্রধান উৎস । এই আইনের মাধ্যমে সরকারি হাট প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয় এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে হাট বসানাের জন্য লাইসেন্স প্রথা চালু করা হয় । এর মাধ্যমে জমিদারদের হাটগুলাের ক্ষতি করা ও তাদের আয় নষ্ট করার ব্যবস্থা করা হলাে বলে অভিযােগ করে জমিদার ও ভদ্রলােকশ্রেণী । অবশ্য এইসব পদক্ষেপের জন্য সাধারণ হিন্দু মুসলমান মানুষ ও কৃষকরা উপকৃত হন ।
এই মন্ত্রিসভা ১৯৩৫ সালে তৈরি বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ডেটরস্ এ্যাক্ট , ১৯৩৫-এর আশু বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করে । ১৯৩৭ সালে সরকার গঠনের এক বছরের মধ্যে ৩০০০ গ্রামে ঋণ সালিশী বাের্ড গঠন করা হয় । যেখানে সুদ ব্যবসায়ী ও ঋণ গ্রহীতাদের মধ্যে আলােচনার মাধ্যমে এক সমঝোতার ব্যবস্থা করা হতাে ; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে , এরফলে ঋণগ্রহীতারা ঋণ পরিশােধ না করতে উৎসাহ পান । ফলে , সুদখােররা মারাত্মক সংকটে পড়েন ।
এরপর ১৯৪০ সালে বেঙ্গল মানিলেণ্ডার্স এ্যাক্ট তৈরি হয়। এই আইনের দ্বারা সুদখােরদের জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয় এবং সর্বোচ্চ সুদের হার বাৎসরিক শতকরা ৮ টাকা করা হয় । সুদ ব্যবসায়ের কর্তৃত্বে ছিল হিন্দু পেশাগত মহাজন , বেনিয়া , দোকানদার ও ভূমি মালিকরা । দীর্ঘদিন ধরে চক্রবৃদ্ধি হারে ও
(৮৯)
চড়া সুদে ব্যবসা করে তারা ফুলে ফেঁপে ওঠেন । এই আইন তাদের অন্যায্য ব্যবসার মূলে কুঠারাঘাত করে ।
এসব আইনের ফলে মুসলমান জমিদারদের স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে । ঢাকার নবাবদের আত্মীয় পরিজন মিলে মােট ১১ জন জমিদার আইনসভার সদস্য ছিলেন । ছিলেন নাজিমুদ্দিন সাহেবও । তারা চেষ্টা করতে থাকেন আইনে কিছু কিছু সংশােধনী এনে নিজেদের স্বার্থ অক্ষুন্ন রাখতে । এসব কারণে নতুন আইনের ধার অনেক ক্ষেত্রে বেশ কিছুটা ভোঁতা হয়ে যায় ।
এই সরকার শিক্ষিত ও মধ্যবিত্তশ্রেণীর মুসলমানদের সুযােগ সুবিধা সৃষ্টির লক্ষ্যে রাজনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে । মধ্যবিত্ত মুসলমানদের জন্য প্রশাসনিক ও আইনগত সুবিধা দেওয়া হয় , যা পরােক্ষে প্রায় সবক্ষেত্রেই হিন্দু মধ্যবিত্তশ্রেণীর একচেটিয়া আধিপত্য ও স্বার্থকে প্রভাবিত করে । ১৯৩৮ সালে ফজলুল হক মন্ত্রীসভা পুলিশ নিয়ােগের নীতি পরিবর্তন করে । পুলিশ সুপারিনটেনডেন্টকে নিশ্চিত করতে বলা হয় , যেন নিয়ােগকৃত বাঙালি কনস্টেবলের মধ্যে অবশ্যই ৫০ শতাংশ মুসলমান কনস্টেবল হন । ঐ বছরেই সরকার আইন প্রণয়নের মাধ্যমে শতকরা ৬০ ভাগ সরকারি নিয়ােগ মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত করে দেয় । ১৯৩৯ সালে সরকার স্থানীয় সংস্থাগুলােকে সরকারি নীতির সক্রিয় বিরােধী লােকজনের নাম নিয়ােগের জন্য প্রস্তাব করতে নিষেধ করে । ঐসব সংস্থায় বা বাের্ডগুলিতে সরকার মনােনীত সদস্যের সংখ্যা ছিল মােট সদস্যের এক তৃতীয়াংশ । অর্থাৎ এই এক তৃতীয়াংশে সরকারপন্থিরাই বা অন্যকথায় মুসলমানরাই মনােনয়নের সুযােগ পান ।
১৯৩৯ সালে এই সরকারের উদ্যোগে কোলকাতা মিউনিসিপ্যাল (সংশােধনী) আইন পাশ হয় । তাতে বাঙলার ভদ্রলােকদের ক্ষমতার প্রধান ঘাঁটি কোলকাতা কর্পোরেশনে একচেটিয়া হিন্দু কর্তৃত্বের অবসান হয় ।
কিন্তু সবচেয়ে নির্দয় আঘাত আসে ১৯৪০ সালে । এই বছরে সরকার মাধ্যমিকশিক্ষা বিল উত্থাপন করে । এই আইনে প্রদেশের উচ্চশিক্ষার কর্তৃত্ব , কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে অর্পণ করা হয় সেকেন্ডারি এডুকেশন বাের্ডের উপরে । এই বাের্ডে মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রশ্নাতীত । উচ্চশিক্ষা শুধু ভদ্রলােকদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির মূল ভিত্তি ছিল না ; তা ছিল তাদের একচেটিয়া মর্যাদার প্রতীক । এভাবে বাঙলার উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকদের সাংস্কৃতিক প্রাধান্যকে চ্যালেঞ্জ জানানাে হয় – যে সাংস্কৃতিক প্রাধান্য আসলে ভদ্রলােকদের সাম্প্রদায়িক আলােচনার মূল অবলম্বন।
(৯০)
দশম অধ্যায় ।
কংগ্রেস রাজনীতিতে টানাপােড়েন
মুসলিম মন্ত্রিসভার একের পর এক চ্যালেঞ্জের মােকাবিলা করতে না পেরে কংগ্রেসীরা দিশেহারা হয়ে যায় । এই সময়ে কংগ্রেসের দায়িত্বে ছিলেন শরৎচন্দ্র বসু । তিনি বুঝতে পারেন , পুরনাে কালচার ধরে থাকলে বাঙলায় কংগ্রেসের পুনরুজ্জীবন সম্ভব নয় । ভােটের রাজনীতির বর্তমান নতুন যুগে রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে টিকে থাকতে হলে তাকে সমর্থনের ভিত্তিকে প্রসারিত করতে হবে এবং তার মরচে পড়া ধর্মনিরপেক্ষ পরিচিতিকে পুণরায় উজ্জ্বল করার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে । তবে তার সামনে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বাঙলা চুক্তির করুণ পরিণতির অভিজ্ঞতাও ছিল । হাইকমাণ্ড তাকে একান্ত নিজস্ব পথে চলতে দেবে না , তাও তিনি জানতেন । তাছাড়া বাঙলা কংগ্রেসেও তার নিয়ন্ত্রণ একচ্ছত্র ছিল না ; বরং যথেষ্ট দুর্বল ছিল । এ অবস্থায় দলের সােস্যালিস্ট গ্রুপ এবং কমিউনিস্ট গ্রুপকে নিয়ে তিনি কিছু সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের পথ নির্ধারণ করেন । বাম ও ধর্ম নিরপেক্ষ ধারায় চলার চেষ্টা করেন । আইন পরিষদে তার কৌশল ছিল বাম দিক থেকে সরকারের বিরােধিতা করা ; আর বাইরে কংগ্রেসের পক্ষে জনগণের সমর্থন পাবার জন্য আন্দোলন পরিচালনা করা ।
তিনি সংগঠনের ক্ষেত্রে , কৃষকদের প্রতি সহানুভূতিশীল বাঁকুড়া জেলার কমলকৃষ্ণ রায়কে এবং কুমিল্লার কৃষকনেতা আশরাফউদ্দিন আহমেদকে প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সেক্রেটারি নিযুক্ত করেন । তাতে অবস্থার অনেকটা পরিবর্তন হয় ; কিন্তু দলের ভিতর থেকে তাকে কাজে বাধা দেবার প্রক্রিয়া শুরু হয় । মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের সাথে বসু ভ্রাতৃদ্বয় যােগাযোেগ গড়ে তােলার প্রক্রিয়া শুরু করেন । অল বেঙ্গল মুসলিম ছাত্র লীগের সাথে যােগাযােগ গড়ে তােলা হয় । কলকাতা ও অন্যান্য অঞ্চলে অনেক মুসলমান কংগ্রেসে যােগ দিতে থাকেন ।
দলে বামপন্থিদের চাপে বেঙ্গল কংগ্রেসের নীতিগত ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন
(৯১)
হয় এই সময়ে । হতে পারে নীতিগত না হয়ে , তা কৌশলগত পরিবর্তন । ১৯৩৭ সালে দলের ইতিহাসে এই প্রথম শােনা গেল চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাতিলের কথা এবং খাজনা বন্ধের পক্ষ সমর্থনের ঘােষণা । পরবর্তীকালে গণ সংযােগ , কৃষক ও কৃষি সম্পর্কিত কর্মসূচী নির্ধারণের জন্য পার্টি তিনটি সাব কমিটি গঠন করে । ১৯৩৯ সালে কংগ্রেস তার দলীয় কর্মসূচীর অংশ হিসাবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিলােপকে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচী হিসাবে গ্রহণ করে ।
এই বছরের জুন মাসে কৃষক প্রজা পার্টির সাবেক মন্ত্রী নওসের আলি কংগ্রেসে যােগদান করেন । নওসের আলির যােগদানের ফলে মুসলমান কৃষকদের উপর বাঙলার মুসলিম রাজনীতিবিদদের যে প্রভাব ছিল , তা চ্যালেঞ্জের মুখােমুখি হয় । ফলে রাজ্যের নানা প্রান্তে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হতে থাকে ।
গােলাম সরােয়ার হােসেন ছিলেন নােয়াখালীর প্রভাবশালী পীর । একইসাথে নােয়াখালির কৃষক সমিতির জনপ্রিয় নেতা । এই সমিতির মূল দাবি ছিল , “সব খাজনা মাফ করা , জমিদারের বাজার বয়কট করা, ঋণ সালিশি বাের্ড থেকে সুদ ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করা" প্রভৃতি । তিনি কৃষক প্রজা পার্টিতে যােগদান করেননি ; তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে অংশ নেন এবং জয়যুক্ত হন ১২০০০ ভােটেরও বেশি ভােটের ব্যবধানে।
ফজলুল হক মন্ত্রীসভা গঠন করেন , তাতে গোলাম সরোয়ারকে ডাকা হয় না । ক্ষুব্ধ সরােয়ার সাহেব কংগ্রেসে যােগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করেন । গােলাম সরােয়ার ছিলেন তীব্র জমিদার বিরােধী । তার কংগ্রেসে যােগদানের খবরে স্থানীয় ভদ্রলােক কংগ্রেসীরা প্রমাদ গুণতে থাকেন । তারা তাকে পুলিশ দিয়ে হেনস্থা ও গ্রেফতার করানাের চেষ্টা করেন । এ ব্যাপারে তার উত্তেজক বক্তৃতার উল্লেখ করেন । গােলাম সরােয়ার এই ঘটনায় ক্ষিপ্ত হন । সুযােগ বুঝে মুসলিম লীগ তার সাথে যােগাযােগ করে দলে টানার চেষ্টা করে । তখনও কিছু মুসলমান কৃষক কংগ্রেসের সাথে ছিলেন । তাদের জয় করে আনতে সরােয়ার জমিদারদের বিরুদ্ধে বক্তব্যের ঝাঁঝ আরও বাড়িয়ে দেন এবং কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মুসলমান সরকারকে উচ্ছেদ করে তার জায়গায় হিন্দুরাজ কায়েম করার অভিযােগ আরােপ করেন । হিন্দু জমিদারের বিরুদ্ধে মুসলমান কৃষকদের আন্দোলন ধীরে ধীরে ঘুরে যায় সাম্প্রদায়িকতায় এবং তা কুখ্যাত নােয়াখালী দাঙ্গার ভিত্তি তৈরি করে । এভাবে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে মুসলমান কৃষকদের কংগ্রেসের দলে টানার প্রয়াস স্থানীয় মুসলমান নেতাদের ক্রোধকে উসকে দেয় এবং দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক বাতাবরণ তৈরি হতে থাকে । মুসলিম নেতৃবৃন্দের প্রবল প্রতিরােধে বাস্তবতঃ কংগ্রেসের এই গণসংযােগ কর্মসূচী তেমন কোন সুফল আনতে পারেনি ।
(৯২)
কাঁথিতে কংগ্রেসের ঈশ্বরচন্দ্র মাল, সরকারি খাসমহল এস্টেটে খাজনা হ্রাস করার আন্দোলন করেন । দামােদর ক্যানাল ট্যাক্স-এর বিরুদ্ধে দশরথী তা বর্ধমানে আন্দোলন করেন । হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পরিবর্তে কংগ্রেস এভাবে বাস্তবতঃ কৃষক প্রজা পার্টি ও মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ট্যাক্স না দেবার আন্দোলন পরিচালনা করে । আস্তে আস্তে কংগ্রেসের চ্যালেঞ্জ ব্রিটিশ সরকারের পরিবর্তে হয়ে দাঁড়াল মুসলিম নেতৃত্বাধীন বাঙলার সরকারের বিরুদ্ধে।
১৯৩৭ সালে বেঙ্গল প্রজাস্বত্ব (সংশােধনী) বিলের উপর আলােচনার সময়ও শরৎচন্দ্র বসু দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন । কংগ্রেসের জমিদার লবি এবং কৃষক নেতাদের অবস্থান ছিল পরস্পর বিরােধী । তাই , সত্য ঢাকতে তিনি বাক চাতুরির আশ্রয় নেন । তিনি বলেন জমিদার প্রথা অনন্তকাল ধরে চলুক , তা কংগ্রেস অবশ্যই সমর্থন করে না ... তবে জনগণের কোন এক অংশ অন্য অংশকে শােষক বলুক , এটাও কংগ্রেস উৎসাহিত করে না । এভাবে তাকে সভায় দুই সুরে কথা বলতে হতাে । মুসলমানদের সমর্থনের জন্য তাকে একসুরে কথা বলতে হয় , আবার হিন্দুদের কায়েমি স্বার্থরক্ষার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবার সময় তাকে অন্যসুরে কথা বলতে হয় । শেষপর্যন্ত তিনি এই স্ববিরােধিতা ভেঙে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন । তার অনুগামীরাও মনে করেন বাঙলার সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে বাঙালিদের । মুসলিম নেতাদের সাথে ঐক্যের একটা ভিত্তি রচনায় ও দলের সামাজিক ভিত্তি বিস্তৃত করার জন্য বসু ভ্রাতৃদ্বয় গভীরভাবে বিশ্বাস করেন যে , সম্প্রদায়ের সমস্যার সমাধানের চেয়ে সামাজিক সমস্যার সমাধানই ঠিক পথ ; অর্থাৎ সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা দরকার । সব সম্প্রদায়ের মধ্যে সমানাধিকার , সম্মান ও যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়ােজন । ত্রিশের দশকের শেষ প্রান্তে তারা বাঙালি রাজনীতিতে একটা বিকল্প কৌশল তুলে ধরেন। ঐ কৌশলের বৈশিষ্ট্য হলাে – বাঙলার রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের জন্য ধর্মনিরপেক্ষ নীতির প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার ।
সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৮ সালে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি ছিলেন । ১৯৩৯ সালে ত্রিপুরী অধিবেশনে তিনি সভাপতির পদ ত্যাগ করেন বা তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় । নতুন সভাপতি নির্বাচিত হন ড . রাজেন্দ্রপ্রসাদ । এই সময় বসু ভাতৃদ্বয়ের অনুগত বেঙ্গল কংগ্রেসের প্রায় সবাইকে সাসপেন্ড করা হয় এবং হাইকমান্ডের অনুগতদের নিয়ে নতুন প্রদেশ কমিটি গড়া হয় । ১৯৩৯ সালে বসুঅনুগত সবাইকে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কার করা হয় ।
বসুগ্রুপ টিকে থাকলে হয়তাে প্রদেশে গড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির
(৯৩)
বাতাবরণ ভেঙে ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হতে পারতাে ; কিন্তু সমূলে বসুগ্রুপকে বহিষ্কার করার ফলে , কংগ্রেস তার ধর্মনিরপেক্ষ সদস্যদের হারায় । ৪০ এর দশকে নিশ্চিতভাবে এই দল একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সংগঠন এবং তা হাইকমাণ্ডের যথার্থ অনুগত দল । কিন্তু চারিত্রিক দিক দিয়ে এই দল পূর্বের যেকোন সময়ের তুলনায় অধিকতর রক্ষণশীল এবং হিন্দুত্ববাদী দল হিসাবে পরিগণিত হয় । ১৯৪০ সালে সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটি বাঙলা প্রদেশ কংগ্রেসকে এই মর্মে নির্দেশ দেয় যে , তাদের প্রধান কাজ হচ্ছে নিষ্ক্রিয় সত্যাগ্রহী হিসাবে এই খেয়াল রাখা যে , তারা নিজেরা এবং শ্রমিক , কৃষক ও ছাত্ররা ধর্মঘট করছে না ।
সুভাষচন্দ্র বসু এবং শরৎচন্দ্র বসুকে কংগ্রেস দল থেকে বহিষ্কার করার পর দল থেকে তার সমস্ত অনুগামীকে একেবারে ঝেঁটিয়ে বিদায় করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। তাতে দলে ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল শক্তির যেটুকু ছোঁয়া ছিল , তাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং বাংলার মুসলমান জনতাও কংগ্রেসকে একেবারেই বয়কট করেন । দু’একটি উদাহরণ থেকে এই সত্য বােঝা যাবে ।
১৯৪৫ সালে জেল থেকে ছাড়া পাবার পর কুমিল্লার কৃষকনেতা আশরাফউদ্দিনকে কংগ্রেস বহিষ্কার করে । তার অপরাধ তিনি বসু ভ্রাতৃদ্বয়ের ঘনিষ্ঠ ছিলেন । ঐ জেলার প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা ফজলুল করিম চৌধুরীকেও বহিষ্কার করে কংগ্রেস । ঐ সময়ে হাওড়া জেলা কমিটি ছিল বসু নিয়ন্ত্রিত । তারা ১৯৪৫ সালের নির্বাচনের জন্য একজন মুসলমানের নাম সুপারিশ করে পাঠান , কংগ্রেস তার মনােনয়ন বাতিল করে দেয় । এসব কারণে অবশিষ্ট মুসলমানরাও কংগ্রেস পরিত্যাগ করেন ।
এই নির্বাচনে কংগ্রেস মাত্র দু’জন মুসলমানকে মনােনয়ন দেয় । একজন হলেন বিখ্যাত টিএএন নবী এবং অন্যজন আইন সভার স্পিকার সৈয়দ নওসের আলি । প্রথম জন জঙ্গীপুর থেকে মাত্র ১৬১ ভােট পান এবং প্রতিদ্বন্দ্বি মুসলিম লীগ প্রার্থী পান ১৭০০০ ভােট । দ্বিতীয়জন নওসের আলি যশােরসদর কেন্দ্রে পান মাত্র ১৬১৬ ভােট এবং মুসলিম লীগ প্রার্থী পান ৩০০০০ ভােট। তাই , দেখা যায় – কংগ্রেস দল পুরােপুরি একটা হিন্দুদের দলে পরিণত হয় । আমরা এরপর কংগ্রেসের এই রূপান্তরের অন্যান্য কারণগুলি খোঁজার চেষ্টা করবাে ।
বাঙলা প্রাদেশিক আইন সভায় আলােচিত বিভিন্ন আইন তৈরি হওয়ায় উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণীর সবাই সমানভাবে এবং সরাসরিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন , এমনটা নয় । তবে তারা প্রায় সবাই মনে করেন যে , তাদের প্রভাব এবং মর্যাদা দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে এবং গৃহীত নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তাদের জীবন ও
(৯৪)
মূল্যবােধ হুমকির সম্মুখীন । শুরুতে অনেকে কংগ্রেসের সম্ভ্রান্ত রাজনীতিতে নিম্নশ্রেণীর লোকদের অন্তর্ভুক্তিতে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন , পরে তারা প্রমাদ শুনতে শুরু করেন ।
ময়মনসিং জেলার যুগান্তর গ্রুপের সুরেন্দ্রমােহন ঘোষ ২০ - র দশকে সুভাষচন্দ্র বসুর একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত ছিলেন । কিন্তু ১৯৩৭ সালে জেল থেকে মুক্তি পাবার পর তিনি বসুর সঙ্গ এড়িয়ে চলেন । কারণ হিসাবে তিনি উল্লেখ করেন , “আমি মনে করি যে , তিনি ভুল পথে চলেছেন ... সুভাষের বাড়িতে আমি গিয়ে দেখি 'ইতরজন ও রাস্তার লােকে ’ ভর্তি । তারা সেখানে ভিড় করেছিল । আমি শরৎ বসুকে জিজ্ঞাসা করি – এরা কি আপনার অনুসারি ও সমর্থক ? – এরা তাে রাজনৈতিক কর্মী নয় , এরা হলাে ইতরশ্রেণীর লােকজন " (ওটি নং ৩০১ , পু , ২৩৫ , সূত্র : বেঙ্গল ডিভাইডেড)।
অনেকে আবার কংগ্রেসের সদস্যপদ ও কর্মসূচীতে পরিবর্তনের জন্য ভীত হয়ে পড়েন। কলকাতার 'বাঙালি ব্রাহ্মণ সভা'র সদস্যরা মনে করেন , “কংগ্রেস তার পুরনাে ধ্যানধারণা থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং তার চরিত্রের পরিবর্তন হয়েছে । এই দলের রাজনৈতিক নেতারা ও তাদের অনুসারীদের অনেকেই এখন কম শিক্ষিত ও তাদের জানাবােঝা কম । তারা আমদানি করা আধুনিক আইরিশ ইতিহাস , ইতালি ও অস্ট্রিয়ার বিপ্লব , ফরাসি প্রজাতন্ত্রবাদ ও সােভিয়েত শাসন নিয়ে পড়াশুনা করেন । পশ্চিমা সভ্যতার পরীক্ষা - নিরীক্ষা তারা ভারতের উপর প্রয়ােগে আগ্রহী ... এটা করতে গিয়ে তারা ব্রাহ্মণ্যবাদী পুরােহিততন্ত্র ও জমিদারির মতাে ভূস্বামীদের প্রতিষ্ঠানগুলিকে বাতিল করতে চায় ... সামাজিক সংস্কারের নামে তারা হিন্দুত্ববাদের মুলে কুঠারাঘাত করছেন” ( জেটল্যান্ড কালেকশন , বঙ্গীয় ব্রাহ্মণ সভার স্মারকলিপির অংশ)।
পুরনাে এইসব ভুল ধ্যানধারণাকে ভেঙে দেবার জন্য বসু ভ্রাতৃদ্বয় চেষ্টা করেন । ইতর লােকদের প্রভাব বৃদ্ধির বিরােধিতা করা নেতৃবৃন্দকে তারা খুব একটা পাত্তা দেননি । এজন্য অনেকে তাদের ক্ষমা করতে পারেননি ।
পুরনাে ও ভ্রান্ত এইসব দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিফলন ঘটে হিন্দু সংবাদপত্রে । অন্যান্য সংবাদপত্রের সাথে সুর মিলিয়ে অমৃতবাজার পত্রিকা এমন অবস্থান গ্রহণ করে , যা সর্বতোভাবে সাম্প্রদায়িক । হিন্দুস্বার্থকে উপেক্ষা করার জন্য ভদ্রলােকদের সাথে সুর মিলিয়ে ঐ পত্রিকা বসু ভ্রাতৃদ্বয়ের বিরুদ্ধে প্রচারে নেতৃত্ব দিতে থাকে । বসু পরিবারের পুরনাে শত্রু ছিলেন এই পত্রিকার সম্পাদক তুষারকান্তি ঘােষ । বাঙলার রাজনীতিতে সুভাষচন্দ্র ও শরৎচন্দ্র বসুর প্রভাব ক্ষুন্ন করতে এই পত্রিকা প্রয়াস চালিয়ে যায় ।
(৯৫)
একাদশ অধ্যায়
উগ্র হিন্দুত্ব : হিন্দুমন, হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেস
এই প্রেক্ষাপটে বাংলায় 'হিন্দু মহাসভা' পুনর্বার প্রতিষ্ঠিত হয় । ১৯৩৯ সালের ২৭ শে ডিসেম্বর ওয়েলিংটন স্কোয়ারে জাফরান রঙের পতাকা উত্তোলন কোরে বীর সাভারকার কলকাতায় 'হিন্দু মহাসভা'র উদ্বোধন করেন।
ঘটনাক্রমে ঐদিন ভাইসরয় কলকাতায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি ২৩ শে জানুয়ারি ১৯৪০ তারিখে জেটল্যান্ডকে লেখেন , “হিন্দু মহাসভা যথেষ্ট উদ্দিপনা সহকারে আস্তে আস্তে গড়ে উঠছে এবং কতকটা যেন রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে এগােচ্ছে । তারা সবেমাত্র কলকাতায় একটা বড় ধরনের মিটিং করেছে । ঐ মিটিং-এ তারা খুবই সাম্প্রদায়িক ধরনের ও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে নিন্দা করে একাধিক প্রস্তাব গ্রহণ করে । যেভাবে সবকিছু চলছে , তাতে হিন্দু মহাসভা কংগ্রেসের কিছু শক্তি হরণ করতে সমর্থ হলে আমি অবাক হবাে না"।
বাঙলায় হিন্দু মহাসভার নেতৃত্ব দেন ড . শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী । তিনি কংগ্রেসের অভ্যন্তরে একজন স্বরাজী ছিলেন । শরৎচন্দ্র বসু ছিলেন স্বরাজীদের নেতা । ১৯২৯ সালে ড . শ্যামাপ্রসাদ বেঙ্গল কাউন্সিলের সদস্য হন একজন স্বরাজী হিসাবে । — তিনি মনে করেন যে, কংগ্রেস সঠিকভাবে উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করতে ব্যর্থ হচ্ছে । তাই , দু’বছর পর তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করেন।
১৯৩৭ সালে শ্যামাপ্রসাদ স্বতন্ত্র বা নির্দল সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হন । কর্পোরেশনেরও সদস্য নির্বাচিত হন । আইনসভায় হিন্দু স্বার্থ অর্থাৎ উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকদের স্বার্থরক্ষার জন্য তিনি সর্বশক্তি নিয়ােগ করেন । কিন্তু একাজে তিনি নিজেকে অকার্যকর বলে প্রমাণ করেন । ভদ্রলােকদের ক্ষমতা এবং স্বার্থের বিরুদ্ধে বাঙলার আইনসভায় একটার পর একটা বিল আনা হয়; আর প্রায় বিনা প্রতিরােধে তা পাস হয়ে যেতে থাকে । এ অবস্থায় ড , শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী বাঙলায় এমন একটা সংগঠনের প্রয়ােজনীয়তা অনুভব করেন – যা তার প্রচেষ্টাকে শক্তি জোগাবে এবং সহায়তা দেবে ।
(৯৬)
উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকরা যেসব বিষয় নিয়ে চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন ছিলেন , ঠিক সেই বিষয়াদি ও কর্মসূচী হিন্দু মহাসভা গ্রহণ করে – যে কর্মসূচী গ্রহণ করতে বসু ভ্রাতৃদ্বয়ের নেতৃত্বে কংগ্রেস অস্বীকার করে । এ অবস্থায় বিশেষ করে ভদ্রলােকশ্রেণীর উদ্বেগের বিষয়গুলি সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে হিন্দু মহাসভা প্রচার শুরু করে । ১৯৩৯ সালে তারা একটা পুস্তিকা প্রকাশ করে । তার নাম দেওয়া হয় ‘ হিন্দুর সংকটময় পরিস্থিতি : নেতৃত্বের আহবান' । তাতে লেখা হয় , “হিন্দু জনগণকে স্মরণ করে দেবার প্রয়ােজন নেই যে , সম্প্রদায় হিসাবে আমাদের অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে । জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের অধিকার ও স্বার্থ নিষ্ঠুরভাবে পদদলিত হচ্ছে । রাজনীতির ক্ষেত্রে ক্ষতিকর সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ আমাদের অক্ষম করে দিয়েছে । আইন সভায় আমাদের অসহায় অবস্থায় নিক্ষেপ করা হয়েছে । আর প্রদেশের প্রশাসন ও আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া আমাদেরকে দাসে পরিণত করেছে । সরকারি চাকুরিতে নিয়ােগের ক্ষেত্রে মেধা ও যােগ্যতাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে এবং সাম্প্রদায়িক স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে হিন্দুদের জন্য সরকারি পদে নিয়ােগের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে । সামাজিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রেও আমাদের অবস্থা একইরকম কষ্টকর হয়ে পড়েছে । হিন্দু মহিলারা নির্যাতিত হচ্ছে , হিন্দু ছেলেমেয়েদের অপহরণ করা হচ্ছে - . হিন্দু মন্দির অপবিত্র করা হচ্ছে ও হিন্দু প্রতিমা ধ্বংস করা হচ্ছে ... কংগ্রেসের মানসিকতা ও উদারতার ভুল প্রবণতা হিন্দুজীবন ও অগ্রগতির পথে বাধার সৃষ্টি করেছে ... হিন্দুদের নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে । মুসলমানদের অগ্রগতির জন্য একদিকে ব্রিটিশ প্রশাসনের সহযােগিতা এবং অন্যদিকে কংগ্রেসের আপােষমূলক ও বশ্যতার মনােভাব হিন্দু জাতিকে অর্থনৈতিক , রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে শ্বাসরােধ করে হত্যা করছে"।
আস্তে আস্তে বাঙলায় কংগ্রেসের বিকল্প শক্তি হিসাবে হিন্দু মহাসভা জায়গা করে নিতে থাকে । অনেকেই এই ধরনের একটি বিকল্প উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের অপেক্ষায় ছিলেন ।
কংগ্রেসের মধ্যে অনেকে বাঙলার আইনসভায় শরৎচন্দ্র বসুর ব্যর্থতায় এবং দলের মধ্যে প্রগতিশীলদের সাথে তার ঘনিষ্ঠতার কারণে বিরক্ত ছিলেন । হিন্দু মহাসভার এইসব প্রচারের ফলে তাদের অনেকেই ঐ দলে যােগদান করেন । বড় বড় ব্যবসায়িরা শুরুতেই হিন্দু মহাসভার প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করে । কলকাতার টাকাওয়ালা মাড়ােয়ারিরা হিন্দু মহাসভার অর্থভাণ্ডারে হাত খুলে সহযােগিতা করতে শুরু করেন। যে যুগলকিশাের বিড়লা অতীতে সব সময়
(৯৭)
কংগ্রেসকে অর্থ সাহায্য করতেন ; এবার তিনি হিন্দু মহাসভার সম্মেলনগুলির সব খরচের দায়িত্ব নেন । মহাসভাকে অর্থসাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেন শেঠ বংশীধর জালান , বদরিদাশ গায়েঙ্কা , রাধাকিষেণ কানােরিয়া , দেবীপ্রসাদ খৈতান প্রমুখ ধনী ব্যবসায়ীরা । খৈতান আগে সুভাষ বসুকে অর্থ সাহায্য করতেন এবং কংগ্রেস ফান্ডে টাকা জোগাড় করার জন্য বসু ভ্রাতৃদ্বয়কে সহযােগিতা করতেন ।
খৈতান ও তার মাড়ােয়ারি বন্ধু পরিবারগুলি মনে করে হিন্দু মহাসভা শক্তিশালী হলে বাঙলায় তারা তাদের ব্যবসায় অধিকতর বেশি সহযােগিতা ও নিশ্চয়তা পাবেন । নতুন এই হিন্দু পার্টির প্রতি অনেক ধনাঢ্য বাঙলিরাও সমর্থন জানান ও সহযােগিতা করেন । তারা মিলিতভাবে হিন্দু মহাসভার উদ্বোধনী সম্মেলনের জন্য ১০,০০০ টাকা চাঁদা দেন । মফঃস্বল এলাকাতেও অনেক বড় বড় জমিদার বেঙ্গল কংগ্রেসের সাথে তাদের চিরাচরিত সম্পর্ক ছিন্ন করে মহাসভার পক্ষে কাজ শুরু করেন । ময়মনসিংহ জেলার মহারাজা শশীকান্ত আচার্যচৌধুরি , মালদা জেলার জমিদার বাবু ভৈরবেন্দ্রনারায়ণ রায় , ময়মনসিং জেলার অন্য এক জমিদার বাবু হেমন্তচন্দ্র রায়চৌধুরী প্রমুখ হিন্দু পার্টি হিন্দু মহাসভাকে স্বাগত জানান । এরা সবাই ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের পক্ষে কাজ করেছিলেন । এইসব জমিদাররা দলীয় রাজনৈতিক অবস্থান বদল করেন এই কারণে যে , ভূ সম্পর্কিত স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রে বসু পরিচালিত কংগ্রেস থেকে তারা হিন্দু মহাসভাকে বেশি বিশ্বাসযােগ্য বলে মনে করেন ।
১৯২৭-২৮ সাল নাগাদ বাঙলা কংগ্রেসে পাঁচ ক্ষমতাধর ব্যক্তির একজন ছিলেন নলিনীরঞ্জন সরকার । ১৯৩৭ সালে কংগ্রেস হাইকমান্ডের নির্দেশ অমান্য করে তিনি ফজলুল হক মন্ত্রিসভার অর্থমন্ত্রির দায়িত্ব নেন এবং কংগ্রেস থেকে বিতাড়িত হন । বীমা ব্যবসায়ে সরকার মহাশয় প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন । ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে কংগ্রেসী মন্ত্রিসভাগুলি যখন একযােগে পদত্যাগ করে , তখন তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনিও ফজলুল হক মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন । কংগ্রেসে তিনি ছিলেন শরৎচন্দ্র বসুর প্রবল বিরােধী । তাই , শ্রীবসু নেতৃত্বে থাকাকালীন তিনি কংগ্রেসে যােগদান করতে প্রস্তুত ছিলেন না । তিনি যােগাযােগ করেন হিন্দু মহাসভার সাথে । হিন্দু মহাসভাও অনেকদিন ধরে চেষ্টা চালাচ্ছিলেন তাকে দলে পাবার জন্য । নলিনীরঞ্জন হিন্দু মহাসভার সর্বভারতীয় উদ্বোধনী সম্মেলনে যােগদান করেন । মঞ্চে বসেন এবং ভাল অভ্যর্থনাও পান ; কিন্তু তিনি সংগঠনগতভাবে হিন্দু মহাসভার সাথে নিজকে জড়াননি। কারণ হিন্দু মহাসভার ভবিষ্যৎ নিয়ে তার মনে সংশয় ছিল । বাস্তবতঃ ঐ একদিনই মাত্র তিনি
(৯৮)
হিন্দু মহাসভার সভায় যােগদান করেন ।
ত্রিপুরি সম্মেলনের অব্যবহিত পরে গভর্নর উল্লেখ করেন যে , “অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে সাম্প্রদায়িক ধারায় আলােচনা চলছে । .. এ অবস্থায় সার্বিক পরিবর্তন হতে পারে, যদি একটা শক্তিশালী হিন্দু সংগঠনের উদ্ভব হয় — যার উপর আইনসভার হিন্দু সদস্যরা কার্যকর ও অবিচলিতভাবে আস্থা রাখতে পারেন । আমি বিশ্বাস করি – নলিনীরঞ্জন সরকারের মত অনেক হিন্দু আছেন, যারা এমন একটি সংগঠনের প্রয়ােজনীয়তা অনুভব করেন । তবে , শেষ পর্যন্ত, সম্ভবত তারা বেঙ্গল কংগ্রেসের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব পাবার আশা করেন । কারণ তারা বাঙলায় কংগ্রেসকেই একমাত্র যােগ্য হিন্দু সংগঠন বলে মনে করেন |
ক্ৰমে এক সময় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বসু ভ্রাতৃদ্বয় এবং তার অনুসারীদের কংগ্রেস দল থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে । কেউ কেউ এমন দাবি করেন যে , এই কাজ দ্রুততার সাথে হােক এবং অতি ব্যাপকভাবে হােক – যাতে তাদের পক্ষে কথা বলার কেউ না থাকেন । পটুয়াখালী সত্যাগ্রহের নেতা সতীন সেনের মত লােকও ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদকে চিঠি লিখে বসু ভ্রাতৃদ্বয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান ।
সুভাষচন্দ্র বসু , শরৎচন্দ্র বসু ও তার সমর্থক সহযােগীদের কংগ্রেস থেকে বহিষ্কার করায় হিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণী ও জমিদাররা খুশি হন । ক্রমে বেঙ্গলকংগ্রেসের উপর তাদের আস্থা ফিরে আসে । নলিনীরঞ্জন সরকার ও অন্যান্যদের আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসে ফিরিয়ে নেওয়া হয় । আস্তে আস্তে হিন্দু মহাসভার অনুকূলে যারা কংগ্রেসকে পরিত্যাগ করেছিলেন , তারা দলে ফিরে আসতে থাকেন ।
কিন্তু হিন্দু মহাসভা কোনরকম লড়াই ছাড়া মাঠ ছাড়তে প্রস্তুত ছিল না । তারা অতি আক্রমণাত্মক সাম্প্রদায়িক প্রচার কাজ শুরু করে । যারফলে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় । কংগ্রেস মুসলমানদের খুশি করে চলতে চায় বলে হিন্দু মহাসভা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অভিযােগ জানিয়ে জোর প্রচার শুরু করে । তাদের এই উগ্রসাম্প্রদায়িক প্রচারে ফল ফলতে শুরু করে । ১৯৪১ সালে ঢাকায় বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে ।
মুসলমান যুবকরা হিন্দু মহিলাদের সভ্রম নষ্ট করেছে –এই ধরনের অতিরঞ্জিত খবর প্রকাশিত হয় । হােলির দিনে হিন্দু মহিলাকে নাজেহাল করা নিয়ে অমৃতবাজার পত্রিকা যে খবর প্রকাশ করে , পরে দেখা যায় , তা মিথ্যা । এরফলে ঐ জেলার নানা প্রান্তে হিংসাত্মক ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে ।
দাঙ্গার পর দেখা যায় কংগ্রেসের ক্ষতির বিনিময়ে হিন্দু মহাসভা অনেকটাই
(৯৯)
ভিত্তি অর্জন করতে সমর্থ হয়েছে । এই দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ সাহায্যের জন্য কংগ্রেসের ত্রাণ তহবিলে কলকাতার কেউ অর্থ সাহায্য করতে রাজি ছিলেন না । অন্যদিকে হিন্দু মহাসভার ত্রাণ তহবিলে সবাই স্বেচ্ছায় অর্থদান করতে থাকেন । কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অভিযােগ--- তারা হিন্দু এবং মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ সাহায্য দেবে – যা সহ্য করতে হিন্দুরা রাজি নয় ।
মুসলমানদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণে আগ্রহী হিন্দুভদ্রলােকদের সমর্থন ধরে রাখতে বেঙ্গল কংগ্রেসও হিন্দু মহাসভার সাথে সাম্প্রদায়িক মঞ্চে প্রতিযােগিতায় নামে । তারা ঘােষণা করে যে , দাঙ্গার পরের এই ত্রাণ কর্মসূচী শুধুমাত্র হিন্দুদের জন্য । সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, কংগ্রেস ত্রাণ তহবিলে পাওয়া সব অর্থ দাঙ্গার সময় ঢাকা থেকে যারা ত্রিপুরায় আশ্রয় নিয়েছেন , সেইসব হিন্দু উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য ব্যয় করা হবে ।
দাঙ্গা বিষয়ে কংগ্রেস তদন্ত কমিটির সভাপতি ছিলেন প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা কামিনীকুমার দত্ত । তিনি বলেন , “ত্রিপুরার মহারাজা হিন্দু উদ্বাস্তুদের ত্রিপুরা রাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য সবরকম সুযােগসুবিধা দিতে প্রস্তুত আছেন । কিন্তু বাঙলার হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য এর পরিণাম হবে ভয়াবহ । কারণ এ ধরনের উদ্যোগ বাঙলা থেকে হিন্দুদের বিতাড়নের জন্য নির্যাতন প্রচেষ্টাকে আরও উৎসাহিত করবে । কংগ্রেস কর্মীরা উদ্বাস্তুদের ফিরে আসার জন্য রাজি করানাের চেষ্টা করছে । এসব উদ্বাস্তুদের অনেকেরই পুণর্বাসনের জন্য আর্থিক সহায়তার প্রয়ােজন হবে , এটাই হচ্ছে সেই ত্রাণ সাহায্য ” । — ঢাকার কংগ্রেস নেতারা সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে ত্রাণ সাহায্য দেবার যে নীতি গ্রহণ করে , তা কংগ্রেস হাইকম্যাণ্ড অনুমােদন করে ।
কংগ্রেস সভাপতি ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদ এই ব্যবস্থার যুক্তি দেখান এভাবে, “হিন্দু মহাসভার লােকেরা মুসলমানদের সাহায্য করছে না ; আর সেজন্য হিন্দুরা কংগ্রেস কর্মীদের অর্থ সাহায্য দিচ্ছে না এই আশংকায় যে , কংগ্রেস কর্মীরা মুসলমানদেরও সাহায্য করতে পারে । – এই দুঃসময়ে কংগ্রেস যদি জনগণের কোনাে কাজে না আসে , তাহলে কংগ্রেস জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারবে না ” ( ১৬ এপ্রিল , ১৯৪১ সালে গান্ধীর কাছে রাজেন্দ্রপ্রসাদের চিঠি ) ।
দাঙ্গা বিষয়ে কংগ্রেসের তদন্ত কমিটির সভাপতি কামিনীকুমার দত্ত ৮ ই মে ১৯৪১ তারিখে নলিনীরঞ্জন সরকারকে লেখেন , "আমাদের পক্ষে একদিকে কংগ্রেসের আদর্শ অনুসরণ করতে হয় এবং একইসাথে সাধারণ লােকের সামনে কংগ্রেসের নীতিবিরােধী কাজকে জোরালােভাবে সমর্থন করতে হয় । বেঙ্গল প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি লিখিতভাবে এই অঙ্গীকার করতে পারে না যে , এই সাম্প্রদায়িক
(১০০)
দাঙ্গা একপক্ষীয় । আবার একইসাথে আমরা এমন কোন বিবৃতি দিতে পারি না , যাতে , হিন্দু সম্প্রদায়ের বা অন্যকোন হিন্দু সংগঠনের (হিন্দু মহাসভা) অবস্থান বিপন্ন হয়" ।
শেষ পর্যন্ত ঢাকাদাঙ্গা তদন্ত কমিটির সামনে হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা – উভয় দলই একসাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে । কামিনীকুমার দত্ত এবং নলিনীরঞ্জন সরকার কংগ্রেসের জন্য উত্তম পন্থা অবলম্বনের জন্য আরও একবার মত বিনিময় করেন | দত্ত লেখেন , “ঢাকার পল্লীএলাকার দাঙ্গা সম্পর্কে সাক্ষ্যপ্রমাণ পরিচালনায় কংগ্রেস উত্তম অবস্থানে আছে । কিন্তু এজন্য দায়িত্ব নিতে পরামর্শ দেওয়াটা ঠিক হবে না । এটা খুব বড় ধরনের দায়িত্ব এবং এজন্য যথেষ্ট অর্থ ব্যয় হবে । এব্যাপারে কংগ্রেস যৌথভাবে হিন্দু মহাসভার সাথে এই কাজ করতে পারে। হিন্দু মহাসভা এজন্য কংগ্রেসকে অর্থ যােগান দেবে এবং তথ্যপ্রমাণের জন্য আমাদের সাহায্য তাদের খুবই দরকার । কংগ্রেসের সহযােগিতা ছাড়া পল্লীএলাকা থেকে প্রয়ােজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা তাদের জন্য খুবই কষ্টকর । পল্লীএলাকার ঘটনা হিন্দুদের জন্য সবচেয়ে উত্তম । ঢাকা শহরে উভয় সম্প্রদায়ের অপরাধ প্রায় সমান সমান এবং রায়ও প্রায় একই রকম হবে"। এই চিঠিতে এ কথাও উল্লেখ করেন যে , ঢাকার আশপাশের পল্লীএলাকায় হতাহত হিন্দুরা সংখ্যায় বেশি হলেও , ঢাকা শহরে হতাহত মুসলমানের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি । – এই পরিসংখ্যানের আরেক অর্থ হলাে মূলতঃ দলিত এবং মুসলমানরাই ঢাকা দাঙ্গায় নিহত ও আহত হয়েছিলেন ।
ঢাকা দাঙ্গার তদন্ত নিয়ে কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভা একসঙ্গে কাজ করে । এই কাজের মাধ্যমে যে সহযােগিতার সম্পর্ক তৈরি হয় , তা অব্যাহত থাকে । হিন্দুস্বার্থ রক্ষার জন্য পারস্পরিক সহযােগিতার প্রয়ােজনের সময় উভয় দলই একসাথে ঘনিষ্ঠ সহযােগিতার মাধ্যমে কাজ করে । কোথাও হিন্দুস্বার্থ সংকটাপন্ন হলে উভয়দলের রাজনীতি ও আদর্শের মধ্যে প্রায় কোন পার্থক্য থাকতাে না । দেখা যায়--- প্রায় সবক্ষেত্রেই মহাসভা সাম্প্রদায়িক সমস্যা ও বিতর্কের সূত্রপাত করে ; আর কংগ্রেস দল পরিস্থিতির পিছনে ছােটে । অনেকেই ভেবেছিলেন , কাছাকাছি নির্বাচন না থাকায় এ সহযােগিতা সম্ভব হচ্ছে ; কিন্তু নির্বাচনকালে পরিস্থিতি অন্যরকম হবে।
১৯৪২ সালে ব্রিটিশ সরকার কংগ্রেস দলকে নিষিদ্ধ ঘােষণা করে । এই সময় দেখা যায় , এই উভয়দলের সদস্যরা একে অপরের সাথে মিশে যেতে থাকে । অনেক কংগ্রেসনেতা গ্রেফতার এড়াতে হিন্দু মহাসভায় যােগদান করতে
(১০১)
থাকেন । এই সময় দু'টি দলই সাংগঠনিক এবং রাজনৈতিকভাবে একে অপরের কাছাকাছি চলে আসে।
শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর নেতৃত্বে পরের বছর কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভা জোটবদ্ধ হয়ে কলকাতা কর্পোরেশন ইলেকশনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে । ১৬ ই মার্চ ১৯৪৪ সালে দুই পার্টির এক যৌথ নির্বাচনী সভায় হিন্দু মহাসভার নেতা এন.সি. চট্টোপাধ্যায় ঘােষণা করেন যে , তার দল কংগ্রেসের সাথে যােগ দিয়েছে ইউনাইটেড মুসলিম লীগ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরােধিতার জন্য এবং বস্তুত একটা জাতীয় কোয়ালিশন ফ্রন্ট গঠনের আগ্রহ থেকে এটা করা হয়েছে ।
কংগ্রেস দলের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা ইংরেজ সরকার তুলে নেয় । এই নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবার পর যেসব কংগ্রেসী হিন্দু মহাসভায় যােগদান করেন , তারা পুরোনো দলে ফিরে আসতে থাকেন । ফলে , হিন্দু মহাসভার সব স্তরের নেতা কর্মী হ্রাস পায় । কংগ্রেসের লােকজন প্রায় সবাই ফিরে আসেন । অন্য অনেকে হিন্দু মহাসভার সঙ্গে থাকলেও নির্বাচনে কংগ্রেসের হয়েই কাজ করেন ।
কংগ্রেস যখন হিন্দুদের হয়ে বা একেবারেই হিন্দুত্ববাদী কর্মসূচী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে , তখন , কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি ছিলেন মওলানা আবুল কালাম আজাদ । সম্ভবতঃ কৌশলগত কারণেই এইসময়ে কংগ্রেস মওলানা আজাদকে সভাপতি নির্বাচনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে । এই পর্যায়কালে বাঙলার জেলায় জেলায় হিন্দু ঐক্যের নামে জোরদার প্রচার চালায় কংগ্রেস । ভদ্রলােক ও অন্যান্য সব অংশের হিন্দু স্বার্থকে কার্যকরভাবে রক্ষা করতে সক্ষমপার্টি হিসাবে কংগ্রেস দ্রুত প্রতিষ্ঠা পায় ।
পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলিতে বা পূর্ববঙ্গে , যেখানে হিন্দু মহাসভার সংগঠন ছিল সবচেয়ে সূদৃঢ় , সেখানেও কংগ্রেসের পক্ষে হিন্দু সমর্থন দৃঢ় হয় । ময়মনসিংহ জেলায় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির চেয়ারম্যান নিজে হিন্দু ঐক্যকে তুলে ধরে জোরদার প্রচার চালান ।
এরমধ্যে কেন্দ্রিয় আইন সভার নির্বাচন ঘােষিত হয় । এই নির্বাচনে হিন্দু মহাসভাকে কংগ্রেসের বিকল্প হিসাবে তুলে ধরার জন্য সর্বাত্মক লড়াইয়ের পরিকল্পনা করা হয় । তারা যােগ্য প্রার্থীর নামও স্থির করে ফেলেন । কিন্তু দেখা যায় – হিন্দু স্বার্থের শক্তিশালী মুখপত্র শশাঙ্কশেখর রায় কংগ্রেসের টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত ঘােষণা করেন । হিন্দু ঐক্যের জন্য বিপুল উদ্যমে প্রচার চালিয়ে এবং নৈপুণ্যের সাথে প্রার্থী বাছাই করে কংগ্রেস হিন্দুদের জন্য বরাদ্দকৃত কেন্দ্রীয় আইনপরিষদের ৬ টি আসনের সব ক’টি দখল করে নেয় ।
(১০২)
কংগ্রেস এমনভাবে হিন্দু মহাসভার শ্লোগান ও কর্মসূচী ছিনিয়ে নেয় যে , হিন্দু মহাসভার সদস্যরাও মনে করেন যে , পৃথক একটা সংগঠন হিসাবে হিন্দু মহাসভার অস্তিত্বের আর কোন প্রয়ােজন নেই । কোলকাতার হিন্দুদের একটা গ্রুপ ড .শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে এই বলে পরামর্শ দেয় যে , "কংগ্রেস কর্তৃক মুসলিম লীগকে জোরালাে চ্যালেঞ্জ দেবার পর পৃথক একটা রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে হিন্দু মহাসভার অস্তিত্বের আর কোনাে প্রয়ােজন নেই ।... জনগণ আপনাকে আসন্ন বেঙ্গল প্রাদেশিক আইন পরিষদের নির্বাচনে অতি সাম্প্রদায়িক নয় , এমন একটি পার্টি থেকে প্রার্থী হিসাবে দেখতে চান।... মহান লক্ষ্য অর্জনে কংগ্রেসকে নেতৃত্ব দেবার জন্য আপনি হলেন বাঙলার সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি । আমরা আপনাকে কংগ্রেসে যােগদান করার আহ্বান রাখছি ” (হিন্দুদের স্বাক্ষরিতপত্র , শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী পেপার্স , ডিসেম্বর , ১৯৪৫)।
নতুনভাবে পুনর্গঠিত কংগ্রেস কমিটির নেতৃত্বে নলিনীরঞ্জন সরকারের মত ধনাঢ্য ব্যক্তিরা থাকায় মাড়ােয়ারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলি আশ্বস্ত হয় । তারা আবার কংগ্রেসে ফিরে আসে । দেবীপ্রসাদ খৈতান , যিনি হিন্দু মহাসভার অর্থের জোগান দিতেন , তিনি কংগ্রেস টিকিটে জয়যুক্ত হন । সমস্ত জমিদার , রাজা - মহারাজা – যারা ছিলেন হিন্দু মহাসভার স্তম্ভ , সবাই কংগ্রেসে চলে আসেন । জমিদারদের ৫ টি আসনের মধ্যে ৪ টিতে কংগ্রেস জয়লাভ করে । হিন্দু মহাসভা শেষ পর্যন্ত বাঙলা প্রাদেশিক আইন সভার ২৬ টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ; কিন্তু একটা ছাড়া সবক'টিতেই কংগ্রেসের কাছে শােচনীয়ভাবে পরাজিত হয় । শুধুমাত্র কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আসনে ড . শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়যুক্ত হন । কংগ্রেস হয়তাে তাকে এটুকু জায়গা ছেড়ে দেয় ।
আমরা এই অধ্যায়ের আলােচনায় সমাপ্তির প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছি । অন্তিম আলােচনার পূর্বে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখার কিছু অংশের উল্লেখ করবাে । সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র শুধু লেখক ছিলেন না , তিনি রাজনীতিও করতেন । কংগ্রেস দলের সাথে যুক্ত ছিলেন । এখানে তার লেখার যে অংশের উল্লেখ করবাে , তিনি সেই লেখাটি প্রথমে ১৯২৬ সালে ‘হিন্দুসভা ' সম্মেলনে ভাষণ হিসাবে পাঠ করেন । পরে 'বর্তমান হিন্দু - মুসলমান সমস্যা' নামে প্রবন্ধ আকারে প্রকাশ করেন । কথাগুলি এখানে উল্লেখ করা হলাে এই কারণে যে , এটা হলাে ঐ সময়ের ভদ্রলােকশ্রেণীর চিন্তা-চেতনার প্রতিচ্ছবি । তিনি লেখেন , “হিন্দু ও মুসলমান শুধু পৃথক নহে , মৌলিকভাবে তারা অসমান । আর মিলন হয় সমানে সমানে ।... হিন্দু মুসলমানের মধ্যে যে পার্থক্য আছে , তাহা পুনর্মিলনের আযােগ্য ।..
(১০৩)
দুই সম্প্রদায়ের মধ্যকার পার্থক্যের মূল বিষয় হইলাে ‘সংস্কৃতি ' । সংস্কৃতি হইলাে মন ও অন্তরের বৈশিষ্ট্য, যাহা স্বভাবগতভাবে সব হিন্দুর আছে , কিন্তু মুসলমানের তাহা নাই এবং তারা তাহা অর্জন করিবে এমন আশা কম ।.. শিক্ষা মানে যদি লেখাপড়া জানা হয়, তাহা হইলে হিন্দু মুসলমানে বেশি তারতম্য নাই কিন্তু শিক্ষার তাৎপর্য যদি অন্তরের প্রসার ও হৃদয়ের কালচার হয় , তাহা হইলে বলিতেই হইবে উভয় সম্প্রদায়ের তুলনাই হয় না ... শিক্ষা সমান করিয়া লইবার আশা আর যেই করুক , আমি তাে করি না । হাজার বৎসরে কুলায় নাই , আরও হাজার বৎসরে । কুলাইবে না"।
শ্রী চট্টোপাধ্যায় যুক্তি দেখান যে , “মূলতঃ এই সংস্কৃতির অভাবই মুসলমানদের নিষ্ঠুরতা , বর্বরতা ও ধর্মোন্মত্ততার কারণ । এটা হলাে মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রাচীন , সর্বব্যাপী ও অপরিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য এবং তা প্রথম যুগের গজনবী বিজেতাদের মধ্যে স্পষ্টভাবে দেখা যায় । তারা কেবল লুঠ করিয়াই ক্ষান্ত হয় নাই , মন্দির ধ্বংস করিয়াছে , প্রতিমা চূর্ণ করিয়াছে, নারীর সতীত্বহানি করিয়াছে । ঠিক যেন বর্তমানকালের বাঙালি মুসলমানের মত , যারা পাবনার বীভৎস ঘটনার জন্য দায়ি । তাছাড়া , এ প্রেক্ষিতে আদি মুসলমান ও সাম্প্রতিককালের ধর্মান্তরিত মুসলমানদের মধ্যে কাউকে গ্রহণ করার প্রায় কিছু নেই । যারা খ্রীষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয় , তারা তাদের মূল (হিন্দু) সংস্কৃতি অক্ষুন্ন রাখে ; কিন্তু ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার পর তারা তাদের হিন্দু উৎপত্তিকে পরিত্যাগ করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে ও অপরিবর্তনীয়ভাবে মুসলমান হয়ে যায় । ... উচ্চ বা নীচ , সব মুসলমানের কাছ থেকে হিন্দু মহিলাদের সতীত্ব হারানাের হুমকি আছে । হিন্দু নারীহরণ ব্যাপারে সংবাদপত্রওয়ালারা প্রায়ই দেখি প্রশ্ন করেন , মুসলমান নেতারা নীরব কেন ? তাহাদের সম্প্রদায়ের লােকেরা যে পুণঃ পুণঃ এতবড় অপরাধ করিতেছে , তথাপি প্রতিবাদ করিতেছে না কীসের জন্য? মুখ বুজিয়া নিঃশব্দে থাকার অর্থ কি ? – কিন্তু আমার তাে মনে হয় , অর্থ অতিশয় প্রাঞ্জল । তাহারা শুধু অতি বিনয়বশতঃই মুখ ফুটিয়া বলিতে পারেন না , বাপু , আপত্তি করব কী , সময় এবং সুযােগ পেলে ও কাজে আমরাও লেগে যেতে পারি" ।
উচ্চবর্ণহিন্দুরা এমনকি নিজ হিন্দুধর্মের মানুষকে অস্পৃশ্য গণ্য করেন - এটা কী সংস্কৃতি? একি সভ্যতা, না বর্বরতা ? যে সমাজের একজন সুপ্রতিষ্ঠিত লেখক একটা গােটা জনগােষ্ঠী সম্পর্কে এরূপ কুরুচিপূর্ণ শব্দ সমষ্টি লিখতে পারেন , তাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতি নিয়ে কেউ কি আজও কোন প্রশ্ন তুলবেন না!
(১০৪)
দ্বাদশ অধ্যায়
কুখ্যাত কলকাতা হত্যাযজ্ঞ
যুক্ত বাঙলার প্রাদেশিক আইন পরিষদের শেষ নির্বাচন হয় ১৯৪৫ সালে । এই নির্বাচনে প্রচারের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল সাম্প্রদায়িকতা । কোনরকম ঝুঁকি না নিয়ে উচ্চবর্ণ, নিম্নবর্ণ, আদিবাসী প্রভৃতি গােটা হিন্দুসমাজ কংগ্রেসের বাক্সে ভােট দেন । হিন্দুস্বার্থের জন্য কংগ্রেসের উপরেই তারা ভরসা করেন । হিন্দু মহাসভাকে ভােট দিয়ে ভােট ভাগাভাগির পথে যেতে চাননি হিন্দু ভােটাররা ।
পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় গােটা মুসলমান সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয় মুসলিম লীগের পতাকাতলে । কৃষক প্রজা পার্টি গত নির্বাচনে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল , তার বেশিটাই তারা পূরণ করে । ফলে , মুসলমান প্রজা কৃষক ও জোতদারদের কৃষক প্রজা পার্টির কাছে তেমন কিছু আর পাবার ছিল না । তারাও ভােট ভাগাভাগি না করে ঐক্যবদ্ধভাবে মুসলিম লীগকে ভােট দেন ।
এই নির্বাচনে বাংলা প্রাদেশিক আইন পরিষদে কংগ্রেস পায় মােট ৮৬ টি আসন এবং মুসলিম লীগ পায় ১১৩ টি আসন এবং অন্যান্যরা পান ৫১ টি আসন । প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দি । তিনি ১৯৪৬ সালের এপ্রিল মাসে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন । এই নির্বাচনে হিন্দু মহাসভা ২৬ টি কেন্দ্রে লড়াই করে মােট হিন্দু ভােটের ২.৭৩ শতাংশ ভােট পায় ।
১৯৩৭ সালের নির্বাচনে তফসিলী সংরক্ষিত আসনের মধ্যে কংগ্রেস মাত্র ৭ টি আসন পেয়েছিল । ১৯৪৫ সালের এই নির্বাচনে ৩০ টি তফসিলী আসনের ২৪ টি কংগ্রেস দখল করে নেয় । ফলে বােঝা যায় – কংগ্রেস ও হিন্দুমহাসভা নিম্নবর্ণের হিন্দু ও আদিবাসীদের হিন্দু হিসাবে প্রচারের যে কর্মসূচী নিয়েছিল , তা কাজে লেগেছে । এই নির্বাচনে কংগ্রেস মােট হিন্দু ভােটের ৯০% পেতে সমর্থ হয়।
(১০৫)
সােহরাওয়ার্দি ছােট মন্ত্রিসভা গঠন করেন । গতবারের ১৩ জনের পরিবর্তে তিনি ১১ জনের মন্ত্রিসভা গঠন করেন । ফজলুল হকের বিগত মন্ত্রিসভায় হিন্দু ও মুসলমান মন্ত্রির সংখ্যা প্রায় সমান ছিল । বাঙলায় সম্প্রীতির লক্ষ্যেই তা করা হয় । কিন্তু এই নতুন মন্ত্রিসভায় সােহরাওয়ার্দি মাত্র ৩ জন হিন্দুকে মন্ত্রি করেন এবং এই ৩ জনের মধ্যে ২ জন ছিলেন তফসিলী সম্প্রদায়ের । দলিত ও মুসলিমের মধ্যে ঐক্যের প্রবক্তা মহাপ্রাণ যােগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং তাকে মন্ত্রি করা হয় । হিন্দুভােট যেভাবে কংগ্রেসের অনুকূলে ঐক্যবদ্ধ হয় , তাতে প্রধানমন্ত্রির পক্ষে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার হয়তাে বাধ্যবাধকতা ছিল ।
১৯৩২ সালে সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ ঘােষণার পর বাঙলার উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকরা আশংকা করেছিলেন যে , এই প্রদেশে তাদের ক্ষমতা দখলের কোন সম্ভাবনা রইলাে না । পুনাচুক্তিতে যখন তফসিলীদের জন্য ৩০ টি আসন বরাদ্দ হয় , তখন তারা মুষড়ে পড়েন । পরপর দু'টি নির্বাচনে মুসলমানদের প্রাদেশিক ক্ষমতা দখলের পর তাদের সে আশংকা সত্য বলে প্রমাণিত হয় । মন্ত্রিসভায় একজন ভদ্রলােকহিন্দু ; আর ২ জন তফসিলীহিন্দু অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় , তা তাদের আরও পীড়া দেয় । তারা দলিত ও মুসলমানদের মধ্যে 'ঐক্যের ভূত' দেখতে শুরু করেন ।
নানা সত্য ও অসত্য কারণে বাঙলার হিন্দুরা সােহরাওয়ার্দিকে পছন্দ করতেন না । সংবাদপত্রের অর্ধসত্য ও মিথ্যা প্রচারের ফলেই হয়তাে এই ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল । তিনি বাঙলার প্রধানমন্ত্রি হওয়ায় হিন্দুরা আরও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন । সােহরাওয়ার্দিও প্রধানমন্ত্রি হয়ে শুরুতে বিচক্ষণতার পরিচয় দেওয়ার পরিবর্তে দু’একটা এমন ঘােষণা করেন , যাতে , খবরের কাগজগুলির এতদিনকার মিথ্যাপ্রচার সাধারণ বাঙালি হিন্দুদের কাছে বেশি বিশ্বাসযােগ্য হয়ে ওঠে । তিনি শপথ গ্রহণ করার কিছুদিন পর ঘােষণা করেন , “মুসলিম লীগকে কৌশলে পাশ কাটিয়ে কংগ্রেসকে কেন্দ্রের ক্ষমতায় বসানাের সম্ভাব্য পরিণতি হবে বাঙলার পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা ও সমান্তরাল একটা সরকার প্রতিষ্ঠা---এ রকম (মুসলিম লীগের মন্ত্রি ছাড়া) কেন্দ্রীয় সরকার বাঙলা থেকে যাতে কোন রাজস্ব সংগ্রহ করতে না পারে , তা আমরা নিশ্চিত করবাে । আর আমরা নিজেদের পৃথক রাষ্ট্র মনে করবাে , যার সাথে কেন্দ্রের কোন সম্পর্ক নেই" (অমৃতবাজার পত্রিকা, ১৩ আগস্ট , ১৯৪৬)। এর কয়েকদিন পরেই মুসলিম লীগের 'ডাইরেক্ট একশন ডে' ১৬ই আগস্টকে তিনি সরকারি ছুটি হিসাবে ঘােষণা করেন । সােহরাওয়ার্দির এইসব বিবৃতিকে হিন্দু সংবাদপত্রে ব্যাখ্যা করে বলা হয় যে , এ হলাে সমগ্র বাঙলাকে পাকিস্তান বানাবার হুমকি।
(১০৬)
আর হিন্দু বাঙালিদের কাছে পাকিস্তান হলাে চিরকালের জন্য রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব হারানাে ।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়ােজন যে , কয়েক মাস আগে কেন্দ্রিয় আইন পরিষদের নির্বাচন হয় । ঐ নির্বাচনে মুসলিম লীগ ভারতের মােট মুসলমান ভােটের শতকরা ৮৬.৭০ ভাগ ভােট পায় এবং কংগ্রেস পায় মুসলমান ভােটের মাত্র ১.৩০ শতাংশ ।
আর ১৯৪৫ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের ক্ষেত্রে সব প্রদেশের ভােটের হিসাবে মুসলিম লীগ পায় মােট মুসলমান ভােটের ৭৪.৭০ শতাংশ এবং কংগ্রেস পায় মুসলমান ভােটের মাত্র ৪.৬৭ শতাংশ ভােট ।
এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের ক্ষেত্রে মােট আসনের মধ্যে বেশি আসন পাবার যুক্তিতে কংগ্রেস যখন নিজেকে হিন্দু ও মুসলমান সবার প্রতিনিধি হিসাবে দাবি কোরে মুসলিম লীগকে বাদ দিয়ে কেন্দ্রে সরকার গঠন করতে চায়, তার পরিপ্রেক্ষিতে সােহরাওয়ার্দি কিছুআগে আলােচিত বিবৃতি দেন । একথা সত্য ছিল যে , ভারতীয় মুসলমানদের প্রতিনিধি ছিল মুসলিম লীগ , কংগ্রেস নয় । অন্ততঃ ভােটের হিসাবে তা প্রমাণিত । পরে অবশ্য কংগ্রেসের আপত্তি অগ্রাহ্য করে ইংরেজ কেন্দ্রে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মিলিত সরকার করার নির্দেশ দেয় , যে সরকারের অর্থমন্ত্রি ছিলেন মােহম্মদ লিয়াকত আলি খান । মুসলিম লীগের কোটায় তফসিলীদের পক্ষে মহাপ্রাণ যােগেন্দ্রনাথ মণ্ডল আইনমন্ত্রি হিসাবে শপথ নেন । কংগ্রেসের পক্ষ থেকে কেন্দ্রে তফসিলী মন্ত্রি হন বাবু জগজ্জীবন রাম ।
বাঙলায় মন্ত্রিসভা গঠনের প্রথম কয়েক মাসে সােহরাওয়ার্দি মন্ত্রিসভার কিছু অপরিণত আর উদ্ধত কার্যকলাপ ও ঘােষণা এবং হিন্দু সংবাদপত্রগুলির তার অতিরঞ্জিত ও অপব্যাখ্যার ফলে বাঙলার , বিশেষ করে কলকাতার সাম্প্রদায়িক অবস্থা সংকটজনক হয়ে ওঠে। ১৬ ই আগস্ট মুসলিম লীগ ঘোষিত 'ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডে’ কে মুসলমানরা ‘মুক্তি দিবস' হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয় , যার সাথে যুক্ত হয় সাম্প্রতিক নির্বাচনে তাদের সাফল্যের উন্মাদনা । আর ভদ্রলােক হিন্দুরা এটাকে দেখেন , তাদের অস্তিত্বের জন্য আসন্ন হুমকি হিসাবে । ফলে , তারা জীবনপণ করে লড়াই করতে প্রস্তুত ছিলেন । তাদের কাছে এটা ছিল ‘মুসলিম স্বেচ্ছাচারকে প্রতিরােধ করার হিন্দু সংকল্প' ।
এই অবস্থায় ১৯৪৬ সালের ১৬ ই আগস্ট কলকাতায় কুখ্যাত হত্যাযজ্ঞ শুরু হয় । বিভিন্ন বিষয় বিচার বিশ্লেষণ করলে বােঝা যায় , এই কলকাতা হত্যাযজ্ঞ হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোন দুর্ঘটনা নয় । এর পিছনে ছিল পরিকল্পিত চক্রান্ত এবং পূর্ব প্রস্তুতি । মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে , উভয়পক্ষই যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে একে অপরের মুখােমুখি হয় ।
(১০৭)
বাঙলার প্রধানমন্ত্রি হিসাবে শহীদ সােহরাওয়ার্দি ও তার মন্ত্রিসভা এই গণহত্যার জন্য নিশ্চয়ই দায়ি। কিন্তু সাধারণভাবে এটা ব্যক্তি সােহরাওয়ার্দির নিন্দনীয় কাজ হিসাবে এখনও পর্যন্ত তা প্রতিষ্ঠিত কাহিনী হয়ে টিকে আছে । এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে উপন্যাস রচিত হয়েছে ও সােহরাওয়ার্দিকে দায়ি করা হয়েছে ইত্যাদি । কিন্তু এর বিপরীত দিকেও চোখ ফেরানাের অবকাশ ছিল । বিপরীত দিকে চোখ ফেরানোর অনেক ঘটনা ও তথ্য ছিল ; কিন্তু তার বেশিটাই অন্ধকারে থেকে গেছে বা প্রচারের আলাে পায়নি । এখানে সে সব অপ্রচলিত ও অপ্রচারিত কিছু তথ্য ও ঘটনা নিয়ে আমরা আলােচনা করার চেষ্টা করবাে । হিন্দু নেতারাও যে এই হত্যাযজ্ঞের ঘটনার সাথে গভীরভাবে জড়িত ছিলেন , এ সত্যটা তেমন সুবিদিত নয় – আমরা সেদিকে নজর দেবার চেষ্টা করবাে ।
কলকাতা দাঙ্গায় কমপক্ষে ৫০০০ মানুষ নিহত হন । এই নিহতদের বেশিটাই ছিলেন মুসলমান মানুষ । হত্যাযজ্ঞ শুরু হবার ৪ দিন পর স্টেটসম্যান পত্রিকা লেখে , “এটা দাঙ্গা নয় । এ জন্য প্রয়ােজন মধ্যযুগের ইতিহাস থেকে একটা শব্দ খুঁজে আনা – ক্রোধােন্মত্ততা (a fury) ; তবু fury শব্দটির মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততা আছে – এই ক্রোধােন্মত্ততাকে নিজের পথ ঠিক করার জন্য অবশ্যই প্রয়ােজন কিছুটা চিন্তা ও সংগঠন । আট ফুট লম্বা লাঠি নিয়ে পঙ্গপালের মত অসংখ্য লােক ( the horde ) অন্যকে আঘাত করছিল ও খুন করছিল । ঐসব লাঠি তারা আশপাশের স্থান থেকে কুড়িয়ে পেয়েছে বা তাদের নিজের পকেট থেকে বের করেছে , এ কথা বিশ্বাস করা কষ্টকর” (২০ শে আগস্ট , ১৯৪৬)।
অন্য একজন প্রত্যক্ষদর্শী কলকাতা হত্যাযজ্ঞকে দাঙ্গা হিসাবে দেখেননি , দেখেছেন গৃহযুদ্ধ হিসাবে - “উভয় পক্ষ থেকেই ঠাণ্ডা মাথায় মানুষ খুন করা হয়েছে । উভয়পক্ষ থেকেই এ দাঙ্গা ছিল সুসংগঠিত । সােহরাওয়ার্দি নির্মমভাবে এই দাঙ্গা সংগঠিত করেন এটা দেখানাের জন্য যে , ... (মুসলমানরা) কলকাতা দখলে রাখবে । হিন্দু পক্ষে এটা ছিল বাঙলাভাগের জন্য লড়াইয়ের একটা অংশ বিশেষ । এর সংগঠকদের মধ্যে ছিল হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের সদস্য , বিশেষ করে পুরনাে সন্ত্রাসী কংগ্রেস নেতা , যারা কমিউনিস্ট পার্টিতে যােগ দেননি । মাড়ােয়ারিরা প্রচুর সাহায্য করেছিল ; তারা অর্থ দেয় ও দেশবিভাগের আন্দোলনের জন্য তহবিল সংগ্রহ করে । আনুষ্ঠানিকভাবে দেশ বিভাগের আন্দোলন তখন শুরু না হলেও প্রত্যেকে জানতাে যে , এটা এ জন্যেই করা হয়েছে” (নিখিল চক্রবর্তী। সাক্ষাৎকার , ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯ , সাক্ষাৎকার নেন জয়া চ্যাটার্জী)।
বিভিন্ন ঘটনাসমূহের আলােচনার প্রাক্কালে আমরা দেশের একজন জাতীয় নেতা কোলকাতা হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে যে মন্তব্য করেন তা আমরা দেখে নেব ।
(১০৮)
সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল মন্তব্য করেন , “হিন্দুরা এতে তুলনামূলকভাবে বেশি লাভবান হয়েছে” (আর কে সিধওয়াকে লেখা চিঠি । তারিখ ২৭ শে আগষ্ট , ১৯৪৭)। এই মন্তব্য এই কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে , লােকসান পুষিয়ে লাভের জন্যই হয়তাে এই দাঙ্গা ঘটানাে হয় ।
কোলকাতা দাঙ্গায় হিন্দুর চেয়ে অনেক বেশি মুসলমান নিহত হন । অর্থাৎ ‘শান্তিপ্রিয় ও সংস্কৃতিবান’ হিন্দুদের কাছে মুসলমান গুণ্ডারা পরাজিত হয় । এই শক্তি পরীক্ষায় হিন্দুরা এমন এক সময়ে জয়ী হন , যখন বাঙলায় মুসলমান সরকার এবং তার প্রধানমন্ত্রি ও পুলিশমন্ত্রি সােহরাওয়ার্দির মত মানুষ । দাঙ্গা দূর গ্রামাঞ্চলে হয়নি , হয়েছে রাজধানী কোলকাতা শহরে, যেখানে সরকার নিয়ন্ত্রিত পুলিশের পক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ অনেক সুবিধাজনক । ফলে , হিন্দুরা অপ্রস্তুত ছিলেন , এমন নাও হতে পারে । বরং যথেষ্ট প্রস্তুত থাকার জন্য এবং দীর্ঘদিনের প্রস্তুতির ফলেই এমন বিজয় অর্জন সম্ভব হতে পারে ।
সােহরাওয়ার্দিকে যত দোষ দেওয়া হােক না কেন , একথা অস্বীকার করা যাবে না যে , এই দাঙ্গা শুধুমাত্র কোলকাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকে । রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে না দেবার জন্য কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রীর প্রশাসন দাবি করতেই পারে ।
কোলকাতা শহরে মুসলমান জনসংখ্যা ঐ সময়ে মাত্র ৩০/৩২ শতাংশের বেশি ছিল না । কিন্তু এই দাঙ্গা যদি বগুড়া , রংপুর প্রভৃতি ৮০/৯০ শতাংশ মুসলমান অধ্যুষিত জেলাগুলিতে ছড়িয়ে পড়তাে , তাহলে তার পরিণাম কী হতে পারতাে , তা সহজেই অনুমান করা যায় । কিন্তু কেন তেমন কিছু হয়নি? হােসেন সােহরাওয়ার্দিকে মূল্যায়ণ করার সময় , তা খেয়াল রাখা দরকার বলে কারুর মনে হতেই পারে ।
৩০-এর দশকের শেষ এবং ৪০-এর দশকের প্রথম দিক থেকে কোলকাতা ও মফঃস্বল শহরগুলিতে হিন্দু স্বেচ্ছাসেবক গ্রুপের সংগঠন প্রতিষ্ঠার আধিক্য দেখা যায় । ঐসব সংগঠনের ঘােষণা ছিল মূলতঃ হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করা । এইসব সংগঠন ভদ্রলােক যুবকদের দৈহিক যােগ্যতা অর্জন করতে এবং আধা সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে উৎসাহ দিত । এইসব সংগঠনের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে সংগঠিত সংগঠন ছিল ‘ভারত সেবাশ্রম সংঘ' । এটা ছিল হিন্দু মহাসভার স্বেচ্ছাসেবক শাখা । প্রকাশ্যে তা সমাজসেবা করার সংগঠন হলেও , শুরু থেকে এই সংঘ সামরিক কৌশল গ্রহণ করার জন্য আহ্বান জানায় । ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই সংঘের এক সভায় ড . শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী সভাপতিত্ব করেন । এই
(১০৯)
সভায় ২৬০০ লােক যােগদান করেন । সম্প্রদায়গত রােয়েদাদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলা হয় , “এর উদ্দেশ্য বাঙালি হিন্দুদের প্রতিহত করা । সাবেক দণ্ডিত অপরাধি পুলিন দাস ও সতীন সেনের সাহায্য নিয়ে আখড়া তৈরি করতে হবে । দৈহিক গঠনের প্রতি মনােযােগী হতে হবে । এমনভাবে প্রস্তুত হতে হবে , যাতে হিন্দুরা আক্রান্ত হলে এক সাথে হাজার লাঠি উত্তোলিত হয় । বাঙলায় লেখা পােস্টার ছাপানাে হয় । যাতে লেখা হয়---এখনই অহিংসার চেতনা ত্যাগ কর , প্রয়ােজন । হলাে পৌরুষ"।
দু'মাস পর অনুষ্ঠিত সংঘের অন্য এক সভার প্যান্ডেলে প্রদর্শিত প্লাকার্ডে বাঙলায় লেখা হয় , “হিন্দুরা জাগ্রত হও এবং অসুরদের হত্যার শপথ গ্রহণ করাে"।
এর পরের বছর অর্থাৎ ১৯৪০ সালে শিবের ধর্মীয় মূর্তিকে ব্যবহার করে আলােচনা হয় । তার উল্লেখ রয়েছে এভাবে , “৭ তারিখে (১৯৪০) সেবাশ্রম সংঘের উদ্যোগে মহেশ্বর ভবনে একটা হিন্দু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় । মিঃ বিসি চ্যাটার্জী ঐ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। হিন্দুদের সামরিক মানস গড়ে তােলার জন্য সেখানে বক্তৃতা করা হয় । ত্রিশূলসহ শিবের একটা বড় চিত্র প্রদর্শিত হয় । স্বামী বিজনানন্দ বলেন যে , অসুরকে ধ্বংস করার জন্য হিন্দু দেবদেবীরা সবসময় বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত থাকতেন । স্বামী আদিত্যনন্দ মন্তব্য করেন যে , তিনি হিন্দুদের সেবা করার জন্য একটা লাঠি নিয়ে এসেছেন । তিনি বলেন যে , হিন্দুর শত্রুদের মুন্ডচ্ছেদ করতে হবে । ত্রিশূলসহ শিবের চিত্রের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন , তার অনুসারীদের অস্ত্র, কমপক্ষে লাঠি হাতে এগিয়ে আসতে হবে । স্বামী প্রণবানন্দ পাঁচ লাখ লােকের একটা প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে তুলতে চান ।.. তিনি মাড়ােয়ারিদের কাছে অর্থ সাহায্যের আবেদন জানান ।.. হরনাম দাস প্রত্যেক হিন্দুকে সৈনিক হবার আবেদন জানান । পাঁচ লাখ হিন্দুর একটা প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে তােলার জন্য সংঘের প্রস্তাব গৃহীত হয় । এতে সন্তুষ্টির সাথে উল্লেখ করা হয় যে , ইতিমধ্যে বারাে হাজার লােককে সংগ্রহ করা হয়েছে"।
ভারত সেবাশ্রম সংঘ প্রথম থেকেই হিন্দু মহাসভার সাথে যুক্ত ছিল । কিন্তু ৪০-এর দশকে কংগ্রেসীরাও এর সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন । কংগ্রেস নেতা শশাঙ্কশেখর সান্যাল ও অন্যান্যরা সংঘের সাথে যােগাযােগ রেখে চলতে থাকেন । অমৃতবাজারের মৃণালকান্তি ঘােষ , দৈনিক বসুমতীর সম্পাদক হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘােষ, মডার্ন রিভিউ পত্রিকার রামানন্দ চ্যাটার্জী প্রভৃতি কলকাতার ভদ্রলােক বুদ্ধিজীবীরাও ভারত সেবাশ্রম সংঘের এইসব কাজের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন ।
১৯৪৫ সাল নাগাদ কোলকাতার কয়েকটি হিন্দু স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনের
(১১০)
নাম এবং সদস্য সংখ্যা ছিল নিম্নরূপ , “আর এস এস – ১০০ জন , জাতীয় যুব সংঘ – ২০০ জন , বাগবাজার তরুণ ব্যায়াম সমিতি--৩০ জন , দেশবন্ধু ব্যায়াম সমিতি – ৪০ জন , হিন্দুস্থান স্কাউট এ্যাসােশিয়েশন —৩০০০ জন , হিন্দু শক্তি সংঘ – ৫০০ জন , আর্য বীর দল —১৬ জন , বি পি আই এম ভলান্টিয়ার কোর – ২৫০ জন । এইসব বড় বড় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সাহায্য করা হতাে । উদাহরণ হিসাবে বলা যায় – ভারত সেবাশ্রম সংঘকে টাকা দিত মাড়ােয়ারিরা , আরএসএস - কে টাকা দিত বিড়লাগােষ্ঠী এবং সুসঙ্গ রাজপরিবারের বাবু পরিমল সিংহের মত লােকজন । উল্লেখ করা হয়েছে – ঐ সময়ে সারাবাংলায় মােট প্রায় ১ লাখ সদস্য ছিল স্বয়ংসেবক সংঘ বা আর এস এস সংগঠনের ।
আরএসএস তার তালিকাভুক্ত সদস্যদের শারীরিক প্রশিক্ষণ দিত । তারমধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও ছিল । ১৯৩৯ সালে আর এস এস - এর বাঙলা শাখার ভি আর পাঠকী লন্ডনে তার এক বন্ধুকে ‘পার্কার হেল ' নামক এক কোম্পানী থেকে ‘এইমিং রেস্ট' নামক এক যন্ত্র জোগাড় করার জন্য চিঠি লেখেন । এর উপর রেখে বন্দুকের নিশানা ঠিক করা সহজ হয় । নতুনদের জন্য এটা দরকার হয়।
পুলিশ রিপাের্টে দেখা যায় – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অব্যাহতি পাওয়া সৈনিক ও সামরিক কর্মচারিদের হিন্দু সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলি আগ্নেয়াস্ত্র ও গােলাবারুদ সংগ্রহের কাজে লাগায় এবং ক্যাডারদের প্রশিক্ষণ দেবার কাজে ব্যবহার করে । অনুশীলন দলের সদস্যরাও এই কাজের সাথে যুক্ত হন ।
পানাগড়ের প্রাক্তন সামরিক কর্মী সংগঠন-এর সেক্রেটারির নিকট হতে পুলিশ একটি চিঠি আটক করে। ড.শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে লেখা ঐ চিঠির তারিখ ৭ নভেম্বর , ১৯৪৬ সাল । চিঠিতে লেখা হয় , “হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলায় আমাদের বিপজ্জনক শত্রু মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিশােধ গ্রহণের জন্য আমরা বর্ধমান জেলার সৈন্যবাহিনীর সাবেক হিন্দু কর্মকর্তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি ।... আমরা প্রস্তুত আছি , আপনার নির্দেশ আমরা অনুসরণ করবাে ... আমরা শপথ নিয়েছি এবং আমাদের আন্তরিক ইচ্ছা পূরণে আমরা বিরত হব না । আমরা অস্ত্র সজ্জিত এবং যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত ... আমরা মনে করি যে , প্রতিশােধ গ্রহণের এই পদ্ধতিতে প্রদেশের বর্বর মুসলমানদের থামিয়ে দিতে পারবাে এবং এ থেকে তাদের বর্ণশংকর কুখ্যাত নেতা সােহরাওয়ার্দি ও নাজিমুদ্দিন , প্রতিশােধ গ্রহণে হিন্দুদের সাহস সম্পর্কে অনুধাবন করতে পারবে ” ।
(১১১)
১৯৪৫ সালে বিখ্যাত নেতা বি আর মুঞ্জে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছিলেন এভাবে – “হিন্দু মহাসভা স্বাধীনতা চায়। কিন্তু তারা বিশ্বাস করে না যে , অহিংস পথে তা অর্জন করা যাবে । এজন্য আমরা পাশ্চাত্যের অতি আধুনিক বৈজ্ঞানিক ধারায় আক্রমণ পরিচালিত করতে চাই .. গৃহযুদ্ধের জন্য মুসলিম লীগের হুমকির মােকাবিলায় কংগ্রেস যদি হিন্দু মহাসভার ‘অশ্বচালনা ও রাইফেল শুটিং' - এর শ্লোগানে সাড়া দিয়ে যুবকদের শিক্ষা দেয় , তাহলে তা হবে বুদ্ধিমানের কাজ ।
এসব নানা ঘটনা , চিঠি ও তথ্যাদি থেকে বােঝা যায় যে , হিন্দু স্বেচ্ছাসেবীরা কলকাতায় শক্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত ছিলেন । লড়াই যখন শুরু হয়ে যায় , তখন তারা বাঁশের লাঠি , ছােরা ও দেশীয় পিস্তল নিয়ে নেতাদের পরামর্শ মতাে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন । মুসলমানদের মতাে হিন্দুরাও ১৬ আগস্ট যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন । উভয় পক্ষই ছিলেন অস্ত্রসজ্জিত ; সংখ্যায় এবং শক্তিতে হিন্দুরাই এগিয়ে ছিলেন ।
মুসলমান দাঙ্গাকারিদের অধিকাংশই ছিলেন পল্লী এলাকা থেকে শহরে আসা ভাসমানশ্রেণীর মানুষ ; আর অন্যদিকে বহু সংখ্যক হিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণীর লােক দাঙ্গার অভিযােগে গ্রেফতার হন ।
কোলকাতা দাঙ্গায় জড়িত হিন্দু জনতার শ্রেণীচরিত্র নিয়ে আলােচনাকালে সুরঞ্জন দাশ লক্ষ্য করেন , “বাঙালিহিন্দু ছাত্র ও অন্যান্য পেশাজীবী বা মধ্যবিত্তশ্রেণীর লােক সক্রিয় ছিলেন । ধনাঢ্য ব্যবসায়ি , প্রভাবশালী সওদাগর , শিল্পী , দোকানদার---এসব বিভিন্ন শ্রেণীর লােক দাঙ্গার অভিযােগে গ্রেফতার হন । মধ্য কোলকাতায় মুসলমানদের একটি সভা ভেঙে দেবার জন্য অন্যদের সাথে ভদ্রলােকরাও অংশগ্রহণ করেন । ঐ সভায় প্রধানমন্ত্রী নিজে ভাষণ দেন । বিখ্যাত চক্ষু চিকিৎসক ডাঃ জামাল মােহম্মদকে হত্যাকারি জনতার মধ্যে বড় অংশ ছিল শিক্ষিত যুবক । এটা বিস্ময়কর ছিল না যে , তাদের মধ্যে অনেকে পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে ইংরেজীতে কথা বলেন ” ।
হত্যাযজ্ঞের পর অব্যাহতভাবে চলা অসন্তোষের মধ্যে মুসলমান জনতার মাঝে বােমা নিক্ষেপে জন্য হিন্দুদের মধ্য থেকে গ্রেফতার হওয়া একজন হিন্দু ছিলেন বর্ধমানের বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ মহেন্দ্রনাথ সরকার । তিনি স্বীকার করেন যে , তিনি একজন কংগ্রেস নেতা । পূর্বে হিন্দু মহাসভার সদস্য ছিলেন ।
সুরঞ্জন দাশ ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গা পর্যন্ত যে সব বড় বড় দাঙ্গাগুলি হয় , তার উপর গবেষণা করেন এবং এই গবেষণায় দেখা যায় – উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণী এসব দাঙ্গায় ব্যাপকভাবে সরাসরি অংশগ্রহণ
(১১২)
করেছেন – যা সাধারণতঃ শিক্ষিত ভদ্রলােকরা করেন না ।
কিন্তু এসব তথ্য অনেক পরে গবেষকরা খোঁজাখুজি করে আবিষ্কার করেছেন । হিন্দু সংবাদপত্রগুলি – যারা প্রচার জগতকে নিয়ন্ত্রণ করতাে এবং আজও নিয়ন্ত্রণ করে , তারা কখনও এসব কথা লেখেনি বা স্বীকার করেনি । তারা একতরফা দোষারােপ করে সােহরাওয়ার্দি এবং মুসলিম লীগকে । এই হত্যাযজ্ঞকে গণ্য করা হয় ভবিষ্যতে মুসলমান শাসনের অধীনে বাঙালি হিন্দুদের ভাগ্যের ভয়াবহ অশুভ লক্ষণ হিসাবে। এভাবে বাঙলার পশ্চিম অংশ নিয়ে একটা পৃথক হিন্দু রাজ্য গঠনের দাবির পক্ষে হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করার কাজে কোলকাতা দাঙ্গাকে ব্যবহার করা হয় । নােয়াখালী এবং কুমিল্লায় স্থানীয় মুসলমানরা কোলকাতা ও বিহারে নির্বিচারে মুসলমান হত্যার গুজবে একটু বিলম্বে হলেও (মাস তিনেক পর) ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া দেখায় (এই দাঙ্গার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ অন্য কারণও ছিল)। প্রতিশােধ হিসাবে বহু নিম্নবর্ণীয় হিন্দু , মূলত নমঃশূদ্রদের হত্যা করে মুসলমানরা । ভদ্রলোেকরা ঠিক এমনটাই চাইছিলেন । এই সময়ে অমৃতবাজার পত্রিকার সম্পাদকের কাছে জনৈক মৃন্ময়ী দত্তের লেখা একটি চিঠি (তাং ১৯/৪/৪৭) পুলিশ আটক করে । চিঠিতে মৃন্ময়ী লেখেন , “সােহরাওয়ার্দিকে (তার নাম উচ্চারণে আমার ঘৃণা হয়) জানিয়ে দাও যে , হিন্দুরা এখনও মরে যায়নি এবং সে বা তার দুশ্চরিত্র সাঙ্গপাঙ্গরা হিন্দুদের ভয় দেখিয়ে শাসন করতে পারবে না । সােহরাওয়ার্দিকে তার দুষ্কর্মের জন্য খুব শীঘ্রই চরম শাস্তি ভােগ করতে হবে । সেই-ই হিন্দুদের বিদ্রোহী করে তুলেছে । এখন থেকে আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হলাে বিদ্রোহ এবং প্রতিশােধ গ্রহণ । এসাে , আমরা মুসলিম লীগের বর্বরদের সাথে যুদ্ধ করি । বাঙলা ভাগ না হওয়া পর্যন্ত এবং হিন্দুদের স্বদেশভূমি থেকে লীগ কর্মীদের বের করে না দেওয়া পর্যন্ত আমরা যুদ্ধ থেকে বিরত হবাে না ” । এধরনের অনুভূতি অনেক হিন্দু মনে ক্রমবর্ধমান দৃঢ় সংকল্প গ্রহণে উৎসাহিত করে যে , যেকোন মুল্যে , যা কিছুই হােক না কেন , বাঙলাকে অবশ্যই ভাগ করতে হবে । বাঙলার ভদ্রলােকশ্রেণী বােধহয় এতদিনে বুঝতে পারেন যে , ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলন তাদের স্বার্থের পক্ষে শেষ পর্যন্ত ক্ষতি করেছে ; এবার তারা সেই ভুল সংশােধন করতে আদাজল খেয়ে লাগেন ।
(১১৩)
ত্রয়ােদশ অধ্যায়
ক্যাবিনেট মিশনের ঐক্যবদ্ধভারত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, ভদ্রলােকশ্রেণীর বিভক্তির পাঁয়তারা
১৯৪৫ সালের জুলাই মাসে এটলির নেতৃত্বে ব্রিটিশ লেবার পার্টি ব্রিটেনে ক্ষমতাসীন হয় । তারা ১৫ ই মার্চ ব্রিটিশ ভারতের ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় । এটলির গভর্নমেন্ট ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসেই ক্যাবিনেট মিশন ভারতে পাঠায় । ব্রিটিশ ক্ষমতা হস্তান্তর করবে কি করবে না , এটা ক্যাবিনেট মিশনের আলােচনার বিষয়বস্তু ছিল না । বরং কত দ্রুত , কার কাছে এবং কী কী শর্তে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে , এটাই ছিল আলােচনার বিষয় ।
ব্রিটিশের অগ্রাধিকার ছিল ভারতে এমন এক উত্তরাধিকারিকে খুঁজে বের করা , যে আরব - ভারত ভূখণ্ডে ব্রিটিশের সামরিক কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে সক্ষম হবে । স্বাভাবিকভাবেই এজন্য প্রয়ােজন ঐক্যবদ্ধ ভারত - যার একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকবে এবং দেশের থাকবে কেন্দ্রিভূত ক্ষমতা ।
যেহেতু ইংরেজ সরকার দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর চায় , তাই , তারা অতীতের মত ঢিলেঢালা সময়সূচী রাখতে রাজি ছিল না । যেসব বিষয়াদি নিয়ে মতান্তরের সম্ভাবনা , তারা সেগুলি যতদূর সম্ভব এড়িয়ে যেতে চাইলাে । একইসাথে যেসব পক্ষকে আলােচনায় অন্তর্ভূক্ত করলে জটিলতা বাড়বে এবং দ্রুত নিষ্পত্তি হবার সম্ভাবনা কম, সেইসব পক্ষকে আলােচনায় ডাকতে রাজি ছিল না । তারা আলােচনা তিন পক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চায় । হয়তাে দু'পক্ষের মধ্যেই তারা আলােচনা করে সিদ্ধান্তর কথা ভাবতাে , কিন্তু ঐ বছরেই কেন্দ্রিয় আইন পরিষদ এবং প্রাদেশিক আইন সভাগুলিতে মুসলীম লীগ যে অসাধারণ ফলাফল করে , তাকে এড়িয়ে যাওয়া ইংরেজ সরকারের পক্ষে সম্ভব ছিল না । পক্ষান্তরে , কংগ্রেস মুসলমানদের ভােট পেতে ব্যর্থ হয় । তাই , কংগ্রেসের পক্ষে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বের দাবি
(১১৪)
করা সম্ভব ছিল না । ড . আম্বেদকরের তফসিলী ফেডারেশন নির্বাচনে একেবারেই শােচনীয় ফল করে । সারা ভারতে ঐ দল মাত্র একটি আসন লাভে সমর্থ হয়। শুধুমাত্র মহাপ্রাণ যােগেন্দ্রনাথ মন্ডল জয়লাভ করেন । ড . আম্বেদকরও পরাজিত হন । তাই , তাদের দাবিরও জোর ছিল না । এসব কারণে ব্রিটিশের পক্ষে কথা বলার জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি দল---কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ আলােচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে । যতদূর জানা যায় – একজন নবাব ও একজন শিখ প্রতিনিধিকেও আলােচনায় অংশগ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানাে হয়। একজন শিখ প্রতিনিধি বলদেব সিং ওই আলোচনায় ছিলেন। ড . আম্বেদকর এবং মহাপ্রাণ যােগেন্দ্রনাথের কোনাে মতামত নেওয়া হয় না ।
জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ ১৯৪০ সালে লাহাের প্রস্তাবে পাকিস্তানের দাবি করেছিলেন । কিন্তু দেশভাগের কথা উল্লেখ করেননি । পাকিস্তানের অর্থ ভারত ফেডারেশনের মধ্যে পর্যাপ্ত ক্ষমতাসম্পন্ন কোন বিশেষ ব্যবস্থার দাবি কিনা , তা ক্যাবিনেট মিশনের সাথে আলােচনার আগে পরিষ্কার ছিল না । ১৯৪৬ সালের ১৬ ই মার্চ ক্যাবিনেট মিশনের রাষ্ট্রীয় সনদ নামের প্রস্তাবে শিথিল ফেডারেল কাঠামাে এবং সীমিত কেন্দ্রিয় ক্ষমতা সম্পন্ন ঐক্যবদ্ধ ভারতের কথা ছিল । এই প্রস্তাবে জিন্নাহর বিশেষ আগ্রহ দেখে অনেকেরই মনে হয় , এই ধরনেরই একটি ফেডারেশন তিনি চেয়েছিলেন । কংগ্রেস দলের নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীভূত ও এককরাষ্ট্রে , সামান্য অংশীদার হবার কোন ইচ্ছা জিন্নাহ এবং মুসলিম লীগের ছিল না । জিন্নাহ চেয়েছিলেন – একটা শিথিল ফেডারেশন , যেখানে কেন্দ্রের কাছ থেকে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলি প্রয়ােজনীয় স্বায়ত্ত্বশাসনের সুযােগ পাবে । কিছু বিশেষজ্ঞের মতে , জিন্নাহ পাকিস্তানের দাবি করেছিলেন দরকষাকষির অস্ত্র হিসাবে । তিনি ভেবেছিলেন , কংগ্রেস দেশবিভাগ এড়াতে খুবই উদ্বিগ্ন এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল । কিন্তু সত্য ঘটনা ছিল আলাদা ।
একটা সময় ছিল যখন অখণ্ড ভারতীয় জাতীর কোন অংশের বিচ্ছিন্নতার ধারণা সব কংগ্রেস নেতার কাছেই অভিশাপ হিসাবে গণ্য হতাে । মাত্র কিছুকাল কেন্দ্রের অন্তর্বর্তীসরকার পরিচালনার পর বল্লভভাই প্যাটেলের মত কিছু নেতৃবৃন্দ , প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসিত সরকার ও দলের প্রাদেশিক শাখার ক্রমবর্ধমান বিদ্রোহী মনােভাবের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা লাভ করেন যে , একটি শক্তিশালী কেন্দ্র অত্যাবশ্যক । স্বাধীন ভারতে সরকার পদ্ধতির প্রশ্নে কংগ্রেস নেতৃত্ব স্পষ্ট করে বলে যে , একটা শক্তিশালী ও কেন্দ্রীয় একক রাষ্ট্রগঠনে কংগ্রেস অঙ্গীকারবদ্ধ ।
পণ্ডিত নেহেরুর মতাে বাম ঘেষা নেতারাও একই সিদ্ধান্তে উপনীত হন । তার কাছেও অনুভূত হয় যে , সামগ্রিকভাবে সারাদেশের পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক
(১১৫)
অগ্রগতির সমন্বয় সাধনের জন্য কেন্দ্রের হাতে ক্ষমতা থাকা দরকার ।
সেজন্য , এখন তারা দেশের এমন সব অংশ ছেড়ে দিতে আগ্রহী , যেখানে কখনওই তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আশা নেই এবং যা কেন্দ্রে তাদের ক্ষমতার প্রতি হুমকি হিসাবে দেখা দিতে পারে । তারা ভারতের অকিঞ্চিতকর অংশ ছেড়ে দিতে মনস্থির করেন । মােদ্দাকথা , মুসলিম লীগের সাথে পাল্লা দিয়ে কংগ্রেস যেখানে পারবে না বলে মনে করলেন , সেইসব মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা তারা হেঁটে বাদ দিতে চাইলেন ।
জিন্নাহর সাথে বাঙলা প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সম্পর্ক কোনদিনই ভাল ছিল না । বলা ভাল – তাদের মধ্যে তেমন কোন সম্পর্কই ছিল না । কেন্দ্রের আলোচনায় বাংলার মুসলমান নেতাদের কার্যকরভাবে দূরে সরিয়ে রাখা হয় । জিন্নাহ নিজেও বাঙালি মুসলমানদের দাবিগুলি নিয়ে খুব বেশি দরকষাকষি করেননি । এই উদাসীনতা না থাকলে খণ্ডিত বাঙলার ইতিহাস হয়তাে সৃষ্টিই হতাে না ।
বাঙলার ভদ্রলােকশ্রেণীর নেতাদের কংগ্রেস হাইকমাণ্ডের উপর তেমন কোন প্রভাব ছিল না । বরং প্রদেশ কংগ্রেস এবং হাইকমাণ্ডের মধ্যে ছিল দাস এবং প্রভুর সম্পর্ক । তাই , বাঙালি ভদ্রলােকশ্রেণীর আশা আকাঙ্খা পুরণের জন্য তারা দিল্লীর দিকে চেয়ে বসে থাকতে বাধ্য হন । তবে , যেহেতু কেন্দ্রীয় কংগ্রেস নেতাদের কাছে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি বড় ছিল , তার ফলে , ভদ্রলােক বাঙালিরা আশায় ছিলেন যে , পূর্ববঙ্গের মুসলমান প্রধান এলাকাটিকে তারা ছেঁটে দেবেন । আর তারফলে , বাঙলাভাগের জন্য তাদের দাবি সফলতা পাবে ।
১৬ ই মার্চ , ১৯৪৬ তারিখে ঘােষিত ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাবে একটি গণপরিষদ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয় – যারা ভবিষ্যত ভারতের সংবিধান রচনা করবেন এবং একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয় । প্রাদেশিক আইন পরিষদের নির্বাচিত সদস্যদের দ্বারা গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন । গণপরিষদে মােট ২৯৬ জন সদস্য নির্বাচিত হন । ড . আম্বেদকর বাঙলা থেকে গণপরিষদে নির্বাচিত হন । ১৯৪৬ সালের ৯ ই ডিসেম্বর গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে । হাজির থাকেন ২০৭ জন সদস্য । মুসলিম লীগ ঐ সভা বয়কট করে।
২৪ শে আগষ্ট , ১৯৪৬ তারিখে অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভা ঘােষিত হয় । মহাপ্রাণ যােগেন্দ্রনাথ মণ্ডল আইনমন্ত্রি হিসাবে শপথ নেন ২৬ শে অক্টোবর ১৯৪৬ তারিখে । তিনি মুসলিমদের জন্য নির্ধারিত কোটায় মন্ত্রিসভায় স্থান পান – যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।
(১১৬)
ভারতভাগ হওয়া বা না হওয়ার দোলাচলের মধ্যে ১৯৪৭ সালের ২২ শে ফেব্রুয়ারি ড . শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী বাঙলার গভর্নর স্যার ফ্রেডারিক বারােজের সাথে দেখা করে আনুষ্ঠানিকভাবে বাঙলাভাগ করার দাবি জানান । ২৩ শে ফেব্রুয়ারি তিনি সাংবাদিক সম্মেলন করে বাঙলার হিন্দুপ্রধান এলাকাগুলিকে নিয়ে একটি পৃথক প্রদেশ গঠন করার জন্য তার প্রস্তাব পেশ করেন । ৪ ঠা এপ্রিল বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভা এজন্য কার্যকরি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ড . শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে দায়িত্ব দেয় ।
৪ ঠা এপ্রিল , ১৯৪৭ তারিখে তারকেশ্বরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভা সম্মেলনে সভাপতি হিসাবে এন.সি. চ্যাটার্জী যে ভাষণ দেন , তা নিম্নরূপ ; “এখন সময় ঘােষিত হয়েছে । ভগ্নী ও ভাইয়েরা , আমি আপনাদের নমনীয় মনােভাব ত্যাগ করে স্বপ্নরাজ্যের বিহ্বলতার শিখর থেকে বাস্তবের জগতে ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছি । পুরানাে শ্লোগান বারবার আওড়ানাে ও প্রচলিত কথার দাস হওয়া স্বদেশপ্রেম নয় । বিট্রিশ সাম্রাজ্যবাদ আরােপিত বাঙলা ভাগের বিরুদ্ধে ( ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলন ) আন্দোলন হলাে বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় । ঐতিহ্যগতভাবে এবং আবেগের দিক থেকে বাঙলার জনগণ প্রদেশভাগের যেকোন উদ্যোগের বিরুদ্ধে । কিন্তু আমরা যদি অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবন না করে শুধু পুরনাে শ্লোগান উদ্ধৃত করি , তাহলে মাতৃভূমির কাছে আমরা রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হব । স্বদেশী দিনগুলােতে বিভাগবিরােধী আন্দোলন ছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম । ঐ সাম্রাজ্যবাদের উদ্দেশ্য ছিল উভয় প্রদেশে বাঙলার হিন্দুদের সংখ্যালঘিষ্ঠ করে দেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামরত সবচেয়ে বৃহৎ জাতিয়তাবাদীদের শক্তিকে পঙ্গু করে দেওয়া । বিভক্তির জন্য আমাদের আজকের দাবি সেই একই আদর্শ ও লক্ষ্যে অনুপ্রাণিত । অর্থাৎ জাতীয়তাবাদী শক্তির বিচ্ছিন্নতারােধ । বাঙলার সংস্কৃতি রক্ষা এবং বাঙলার হিন্দুদের জন্য একটা স্বদেশ ভূমি অর্জন করা – যা ভারতের অংশ হিসাবে জাতীয় রাষ্ট্রে পরিণত হবে ”।
সভাপতি এন , সি , চ্যাটার্জীর এই বক্তব্যের যুক্তি আজও অনেকের কাছে দুর্বোধ্য । কারণ অবিভক্ত বাঙলাতেই হিন্দুরা সংখ্যালঘিষ্ঠ ছিলেন । বরং বাঙলাভাগের পর (১৯০৫ সালে) এক বাঙলায় অন্ততঃ হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েছিলেন । বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ১৯০৫ সালে যদি ইংরেজরা ভাগ করার চেষ্টা করে থাকে ; তাহলে ১৯৪৬ সাল থেকে ড . শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ও এন , সি চ্যাটার্জীরা বাঙালি জাতিকে ভাগ করার পুরনাে ব্রিটিশ চক্রান্তকে কার্যকরি করার জন্য নতুনভাবে
(১১৭)
লড়াই শুরু করেন । হিন্দু মুসলমানের সম্মিলন বাঙালি জাতি ও তার সংস্কৃতিকে হিন্দু বাঙালির সংজ্ঞায় রূপান্তরণ আসলে জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বেরই প্রতিধ্বনি।
১৯৪৭ সালে মার্চ মাসে কংগ্রেস ঘােষণা করে যে , বাঙলাকে ভাগ করা হবে । এই পরিকল্পনার পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার শুরু হয় ঐ মার্চ মাসেই অমৃতবাজার পত্রিকার এক ঘােষণার মধ্য দিয়ে । ঐ ঘােষণায় বলা হয় যে , বাঙলাভাগের প্রশ্নে জনমতের সঠিক মূল্যায়ন করার জন্য পত্রিকা জনমত যাচাই করবে । কিন্তু বাস্তবতঃ ১৯৪৬ সালের শেষ দিক থেকে ‘বেঙ্গল পার্টিশন লীগ ” নামক সংগঠন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ ধরনের প্রচার ও প্রয়াস ভালভাবে চলছিল । 'পার্টিশন লীগ ’ ১৯৪৬ সাল থেকেই সদস্য সংগ্রহ অভিযান শুরু করে । এইসময় পুলিশ পার্টিশন লীগের ৩ জন সদস্যের কাছ থেকে পূরণ করা ফর্ম আটক করে । তিনজনই ভদ্রলােকশ্রেণীর লােক । তারা হলেন ( ১ ) এন এন ঘােষ -৩৭ , হেয়ার স্কুলের শিক্ষক । ( ২ ) জি এন ঘােষ -২৫ , একজন হিসাব রক্ষক । ( ৩ ) পি ঘােষ -২৯ , জেহাপুর গান ফ্যাক্টরির অডিটর । মূলত , হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলার ভদ্রলােকরাই এই আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসেন ।
মাত্র এক মাসের মধ্যেই ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে অমৃতবাজার পত্রিকা তাদের জনমত যাচাই কর্মসূচীর ফলাফল ঘােষণা করে । তারা প্রচার করে যে , বাঙলাভাগের ক্ষেত্রে হ্যা সূচক ভােট দিয়েছেন ৯৮.৬ শতাংশ মানুষ , বাকি ১.৪ শতাংশ মানুষ বাঙলাভাগের বিরুদ্ধে ভােট দিয়েছেন বলে বলা হয় – যার মধ্যে শরৎচন্দ্র বসু প্রস্তাবিত ‘যুক্ত ও সার্বভৌম বাঙলার' পক্ষে গুটিকয়েক মানুষ ভােট দেন বলে উল্লেখ করা হয় ।
(১১৮)
চতুর্দশ অধ্যায়
যুক্ত ও সার্বভৌম বাঙলার প্রস্তাব--- বাঙলাবিভাগ
এখানে শরৎচন্দ্র বসুর পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছু কথা বলা প্রয়ােজন । শরৎচন্দ্র বসুকে কংগ্রেস দলে ফিরিয়ে নেয় ১৯৪৬ সালের শেষদিকে । তিনি কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য মনােনীত হন । বাঙলার ভাগ্য নির্ধারণ প্রশ্নে মতবিরােধের জন্য শ্রী বসু ১৯৪৭ সালের জানুয়ারি মাসেই আবার পদত্যাগ করেন । বাঙলাভাগের যেকোন পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি । তিনি বলেন , “আমার মনে হয় ধর্মীয় ভিত্তিতে প্রদেশের বিভাগ সাম্প্রদায়িক সমস্যা সমাধানের ভিত্তি হতে পারে না"। তিনি যুক্তি দেন যে , “এই প্রস্তাব ( বাঙলা ভাগ করা ) কংগ্রেসের ঐতিহ্য ও আদর্শ থেকে মারাত্মক বিচ্যুতি । এটা হলাে পরাজিত মানসিকতার ফল"।
এই অবস্থায় তিনি একটি বিকল্প প্রস্তাব পেশ করেন । তার প্রস্তাবের মূল কথা হলাে , ভারত এবং পাকিস্তানের বাইরে একটি নতুন রাষ্ট্র গঠন । যার নাম হবে "যুক্ত এবং সার্বভৌম বাঙলা"। কংগ্রেসের কিরণশংকর রায় এই প্রস্তাবের পক্ষে মত দেন । মুসলিম লীগের আবুল হাশিম ও হােসেন সােহরাওয়ার্দি এই প্রস্তাবে মত দেন । আবুল হাশিম ছিলেন (বর্ধমানের মানুষ) প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং ক্ষমতাবান সাধারণ সম্পাদক । মুসলিম লীগের সাথে এই প্রস্তাবিত রাষ্ট্র গঠনের ব্যাপারে শ্রীবসু একটি চুক্তি করেন । তারমধ্যে ছিল
(১) সমস্ত প্রাপ্তবয়স্কদের সার্বজনীন ভােটাধিকার
( ২ ) যৌথ নির্বাচকমণ্ডলী
( ৩ ) জনসংখ্যা অনুপাতে আসন সংরক্ষণ
( ৪ ) মন্ত্রীসভায় হিন্দু ও মুসলমান সমান সংখ্যক মন্ত্রী থাকবেন
( ৫ ) মুখ্যমন্ত্রী হবেন মুসলমান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হবেন একজন হিন্দু
( ৬ ) সরকারি চাকরিতে হিন্দু এবং মুসলমানের সমান অংশ থাকবে
( ৭ ) আইন সভার দুই তৃতীয়াংশের মতামত ছাড়া এই রাষ্ট্রের ভারত বা পাকিস্তানের সাথে মিশে যাওয়া বা রাষ্ট্রের কোন মৌলিকনীতির পরিবর্তন করা যাবে না।
(৮) স্বাধীন রাষ্ট্র হবে ' সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রী ' ।
(১১৯)
এইসব নেতৃবৃন্দ দাবি করেন যে , সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান আসলে উভয় সম্প্রদায়ের জন্য সমানাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্যে নিহিত রয়েছে ।
এই চুক্তি হয় ১৯৪৭ সালের মে মাসে । কিন্তু আশ্চর্যজনক ঘটনা যে , নতুন রাষ্ট্রের এসব খুঁটিনাটি প্রকাশ হবার একমাস আগে , এপ্রিল মাসেই অমৃতবাজার পত্রিকা জানিয়ে দেয় যে , শরৎচন্দ্র বসু প্রস্তাবিত ‘ যুক্ত ও সার্বভৌম বাঙলার' পক্ষে মানুষের সমর্থন নেই ! বাঙলা প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির প্রায় কেউ শরৎচন্দ্র বসুর প্রস্তাব সমর্থন করেননি । বাঙলা প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে একটি প্রস্তাব পাশ করে , তাতে বাঙলাভাগের প্রস্তাবকে সমর্থন করে বলা হয় , বাঙলার যেসব অংশ ভারতীয় ইউনিয়নের মধ্যে থাকতে আগ্রহী , তাদেরকে সেইভাবে থাকার অনুমতি দেওয়া উচিত । এর মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে বাঙলা থেকে নির্বাচিত গণপরিষদের ১১ জন হিন্দু সদস্য মাউন্টব্যাটেনের সাথে সাক্ষাৎ করে ভারতীয় ইউনিয়নের মধ্যে বাঙলার উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলি ও অঞ্চল নিয়ে একটি পৃথক স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ গঠনের দাবি জানান ।
শরৎচন্দ্র বসুর এই পরিকল্পনায় মহাত্মা গান্ধী শর্ত সাপেক্ষে সমর্থনের কথা ঘােষণা করেন । তবে তাকে এই সমর্থনদানের ঘােষণা প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয় । ২৪ শে মে , ১৯৪৭ তারিখে মহাত্মা গান্ধী একটি চিঠি লেখেন শরৎচন্দ্র বসুকে । ঐ চিঠিতে তিনি লেখেন , “কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিতে আমার (মহাত্মা গান্ধীর) সহকর্মীরা আপনার (শরৎচন্দ্র বসু) উদ্যোগে সমর্থন জানানাের জন্য আমাকে কৈফিয়ৎ তলব করেন"।
শরৎচন্দ্র বসুর যুক্ত ও সার্বভৌম বাঙলার প্রস্তাব নিয়ে জিন্নাহ কোন মতামত ব্যক্ত করেননি । সম্ভবতঃ মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যদের মনােভাবের কারণেই তিনি এই প্রশ্নে মৌন থাকেন । বাঙলাভাগের বিরােধিতা করলে এবং পাকিস্তান সুষ্টির পথে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে ঐ গার্ডের সদস্যরা গুলিভরা পিস্তলের হুমকি দিয়ে যাচ্ছিলেন । এই সময়ে তারা একজন প্রখ্যাত মুসলমান নেতাকে খুন করেন । যাহােক , শরৎচন্দ্র বসু বিশ্বাস করতেন যে , জিন্নাহ তাকে সমর্থন দেবেন এবং এই কারণে তিনি জিন্নাহর সহায়তা কামনা করেন । জিন্নাহ যদিও শরৎচন্দ্রের উদ্যোগের বিরােধিতা করেননি ; কিন্তু তাকে প্রকাশ্যে সমর্থনও করেননি ।
যুক্ত বাঙলার পরিকল্পনায় পূর্ব বাঙলার হিন্দুরাও সেভাবে সমর্থন জানাতে এগিয়ে আসেননি । কিরণশংকর রায় , অখিলচন্দ্র দত্ত , নিশীথনাথ কুণ্ডু এবং আশরাফউদ্দিন – এমন মাত্র কয়েকজন কংগ্রেস নেতা শ্রীবসুর সমর্থনে পাশে দাঁড়ান।
(১২০)
তফসিলীশ্রেণীর নেতা মহাপ্রাণ যােগেন্দ্রনাথ মণ্ডল বাঙলা ভাগের বিরুদ্ধে আপ্রাণ লড়াই চালিয়েছিলেন । কারণ তিনি বুঝেছিলেন বাঙলাভাগ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন পূর্ববঙ্গের তফসিলীশ্রেণীর মানুষেরা । তিনি সাধ্যাতীত চেষ্টা করেছিলেন । জনসভার পর জনসভা করে তিনি বাঙলাভাগের বিপক্ষে জনমত সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন ; কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন । কারণ তার সম্প্রদায়ের মানুষেরা ছিলেন অসচেতন ও গুরুত্বহীন । তারা বাঙলাভাগের বিপদ সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারেননি । যােগেন্দ্রনাথও ভদ্রলােকশ্রেণীর মিথ্যা ও অপপ্রচারের সাথে পাল্লা দিতে পারেননি । ভদ্রলোেকশ্রেণী মহাপ্রাণের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও কুৎসা প্রচার করে তাকে নিজের সম্প্রদায়ের মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়াস নেন এবং তারা অনেকাংশে তাতে সফল হন । এমনকি ভদ্রলােকশ্রেণী তাকে খুন করারও চেষ্টা করেন । এই লক্ষ্যে তারা কলকাতার ভারতসভা হলে বাঙলাভাগ বিরােধী যােগেন্দ্রনাথের সভায় কলকাতায় জেলেপাড়ার গুন্ডাদের ভাড়া করে নিয়ােগ করেন ।
ইতিমধ্যে কংগ্রেস হাইকমাণ্ড একটা শক্তিশালী কেন্দ্র ও একক (unitary) ভারত গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে ফেলে। ভারতের ঐক্য ও সংহতি নিশ্চিত করার উপায় হিসাবে কংগ্রেস মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল কেটে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় । নেহেরু এবং সর্দার প্যাটেলের মধ্যে বহুক্ষেত্রে মতবিরােধ হলেও , এ বিষয়ে তাদের দু'জনের মধ্যে ঐকমত্য ছিল । তারা সিদ্ধান্ত নেন যে , কোন অবস্থাতেই , কোনাে একক প্রদেশকে , বিশেষ করে বাঙলা ও পাঞ্জাবকে ভারতীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাবার অনুমতি দেওয়া হবে না । প্যাটেলের মনােভাব ছিল---নিজে থেকে কংগ্রেস যেটুকু জিন্নাহকে ছেড়ে দিতে মনস্থির করবে , তার বেশি এক ইঞ্চি জমিও দেওয়া হবে না । এই কারণে বাঙালি ভদ্রলােক হিন্দুদের উত্থাপিত বাঙলা ভাগের দাবির প্রতি তিনি দৃঢ় সমর্থন জানান । ২৩ শে মে ১৯৪৭ তারিখে বিনয়কুমার রায়কে সর্দার প্যাটেল এক চিঠিতে জানান (দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত সর্দার প্যাটেল করেস্পণ্ডেন্স) “ভারতীয় ইউনিয়ন থেকে গােটা বাঙলা পৃথক হতে পারে না । 'যুক্ত ও সার্বভৌম বাঙলা' প্রজাতন্ত্রের ধারণা হলাে , বােকার মত মুসলিম লীগের খপ্পরে পড়া । ওটা হলাে তাদের (মুসলিম লীগের) অপ্রত্যাশিত প্ররােচনামূলক ফাঁদ । বাঙলার এই অবস্থা সম্পর্কে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি সম্পূর্ণ সচেতন এবং আপনাদের ভয় পাবার আদৌ কোন প্রয়ােজন নেই । অমুসলিম জনগণের বেঁচে থাকার জন্য বাঙলাকে অবশ্যই ভাগ করা হবে"।
বাঙলায় যে কয়েকজন জাতিয়তাবাদী মুসলমান নেতা তখনও কংগ্রেসের
(১২১)
সাথে ছিলেন , এই অবস্থায় , তারা কংগ্রেসের কাছে বাঙলাভাগ রুখতে মিনতিপূর্ণ আহ্বান জানান । হাইকমাণ্ড তাদের প্রতিও একইরকম কঠোর ব্যবহার করে । ১৩ই মে, ১৯৪৭ সালে জে বি কৃপালনী এক চিঠিতে আশরাফউদ্দিন আহমদ চৌধুরীকে লেখেন , “এখন কংগ্রেস যা করতে চায় , তাহলো , লীগের হুমকিপূর্ণ কর্তৃত্ব ও পাকিস্তান থেকে যতবেশি লােককে সম্ভব উদ্ধার করা । বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাধীন ভারতীয় ইউনিয়নের জন্য কংগ্রেস বাঙলা এবং পাঞ্জাব ভাগ করতে চায় । এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস এছাড়া আর কী করতে পারে , তা আমার জানা নেই"। পূর্ব বাঙলার মাটিতে দাঁড়িয়ে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে লড়াই করে কংগ্রেসকে সেবাদানের দক্ষিণা পেয়ে আশরাফউদ্দিন ভেঙে পড়েন । কারণ এই বিভাগের ফলে তাকে সীমারেখার পূর্বপ্রান্তেই থাকতে হবে । অন্যদিকে ইতিহাসের "জঘন্যতম লােক" (!) হােসেন সােহরাওয়ার্দিকেও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্রের প্রশ্নে কম বিরােধিতার মুখে পড়তে হয়নি । আবুল হাসিম ও সােহরাওয়ার্দির চেষ্টা সত্ত্বেও সার্বভৌম বাঙলার প্রশ্নে মুসলিম লীগ নেতৃত্ব বিভক্ত হয়ে পড়েন ।
মুসলমানদের মধ্যকার সবকটি গ্রুপ, দল ও উপদল বাঙলাকে দু’ভাগে বিভক্ত করার বিরােধিতা করে । তবে সেই অবিভক্ত বাঙলা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে থাকবে , এ ধারণা সব মুসলমান পছন্দ করেননি । বিশেষ করে মওলানা আকরম খাঁ ও খাজা নাজিমুদ্দিন চেয়েছিলেন যে , বাঙলা পাকিস্তানের অংশ হিসাবে থাকবে অথবা নিতান্ত তা সম্ভব না হলে পশ্চিমাঞ্চলের মুসলিম রাষ্ট্রের (পাকিস্তান) সাথে তার (বাঙলার) একটা ঘনিষ্ঠ শাসনতান্ত্রিক সম্পর্ক বজায় থাকবে । মুসলিম লীগের সাধারণ নেতা কর্মীদের মধ্যেও ঐক্য ছিল না । গোঁড়া ইসলামপন্থি একাংশ 'সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রী বাঙলার' বদলে ইসলামের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানকে অগ্রাধিকার দেন । দিল্লীতে মুসলিম লীগের সম্মেলনে আবুল হাশিম 'যুক্ত ও সার্বভৌম বাঙলার' প্রস্তাব পেশ করতে গেলে দলের লােকেরাই চিৎকার করে তাকে থামিয়ে দেন ।
এ প্রসঙ্গে শরৎচন্দ্র বসুর ভাই সুভাষচন্দ্র বসুর অনুগামী ও অনুসারী বলে দাবিদার বাঙলার ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ দল - এর ভূমিকা নিয়েও দু'চার কথা উল্লেখ করা প্রয়ােজন। তাতে বাঙালি ভদ্রলােকশ্রেণীর মানসিকতা আরও খানিকটা স্পষ্ট হতে পারে । এই দলটির বাঙলা কমিটি তাদের সর্বভারতীয় নেতৃত্বের সাথে বাঙলাভাগ প্রশ্নে দ্বিমত পােষণ করে । সর্বভারতীয় সংগঠনের সিদ্ধান্ত ছিল বাঙলাভাগের বিরুদ্ধে । এ অবস্থায় বাঙালি উচ্চবর্ণহিন্দু ও ভদ্রলােকশ্রেণীর নেতৃত্বাধীন কমিটির সিদ্ধান্ত জানিয়ে ১৯৪৭ সালের ৫ মে একটি চিঠির মাধ্যমে সর্বভারতীয় সংগঠনকে
(১২২)
এই দ্বিমতের কথা অবহিত করা হয় এভাবে----"গত সপ্তাহে বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল ফরওয়ার্ড ব্লকের নির্বাহী পরিষদের ৩২ জন সদস্য , প্রস্তাবিত বাঙলাভাগ সম্পর্কিত সর্বভারতীয় সংগঠনের সিদ্ধান্ত পুণর্বিবেচনা করার জন্য অনুরােধ জানাচ্ছে । কারণ বাঙলাবিভাগের প্রতি ক্রমবর্ধমান জনসমর্থন সত্ত্বেও ফরওয়ার্ড ব্লক যদি বাঙলাভাগের বিরােধিতার নীতি অব্যাহত রাখে , তাহলে ফরওয়ার্ড ব্লক সংগঠন সম্ভবত বিভক্ত হয়ে পড়বে এবং শেষে তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে"।
ফরওয়ার্ড ব্লকের ৩২ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র ৮ জন সদস্য শরৎচন্দ্র বসুর উদ্যোগের পক্ষে ছিলেন এবং বাকিরা বাঙলাভাগের পক্ষ সমর্থন করার জন্য মত দেন। যে ৮ জন বাঙলাভাগের বিরুদ্ধে সর্বভারতীয় কমিটির পক্ষে মত দেন , তারা হলেন – লীলা রায় , অনিলবরণ রায় , হেম ঘােষ , জ্যোতিষ জোয়ারদার , সত্যরঞ্জন বকসী প্রমুখ ।
সুভাষচন্দ্র বসুর বাঙালিভদ্রলােক অনুগামীরা এই সময় একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন । তার নাম দেওয়া হয় বাঙলার হিন্দু সাবধান । তাতে লেখা হয় "তােমরা দেখতে পাবে আমরা কীভাবে প্রতিশােধ গ্রহণ করি । বাঙলাভাগের আন্দোলন থামবে না । আজ শরৎচন্দ্র বসু ও তার কয়েকজন অন্ধ সমর্থক , ঘৃণ্য পুরুষ ও মহিলা , বাঙলাবিভাগ আন্দোলনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। কারণ তারা নিরাপদ এলাকায় বসবাস করেন । আজ যদি তার বীরভাই (সুভাষচন্দ্র) আমাদের মাঝে থাকতেন এবং যদি বিবেচনা করতেন যে , বাঙলাভাগের আন্দোলন বন্ধ করা উচিত , তাহলে তিনি ঐসব বিপজ্জনক স্থানে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের মনে আস্থা জাগিয়ে তুলতেন । শরৎচন্দ্র বসু যে কাপুরুষতা প্রদর্শন করেছেন , তারজন্য আমরা তাকে চিরতরে থামিয়ে দিতে পারতাম , যদি তিনি নেতাজীর ভাই না হতেন । আমরা বাঙলাভাগ বা একটা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার চাই । কিন্তু শরৎবাবুর মতাে লােক দিয়ে এ ধরনের সরকার গঠন করা যাবে না । কারণ তারা হলেন – মুসলমানদের অনুচর । সরকারে শ্যামাপ্রসাদের মতাে হিন্দুদের অবশ্যই থাকতে হবে" ।
এ অবস্থায় , সব কিছু বিচার বিশ্লেষণ করে শরৎচন্দ্র বসু দৃঢ়তার সাথে বলেন, "পশ্চিমবাঙলার উচ্চ মধ্যবিত্তশ্রেণীর কিছুলােক প্রদেশভাগের জন্য সংকল্প ঘােষণা করেছে"। কিন্তু শরৎচন্দ্র বসু প্রমাণ করতে পারেননি যে , পূর্ববাঙলার সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা এই বিভাগের বিরুদ্ধে ।
বাঙলাভাগের জন্য উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকরা ব্যাপক প্রচার আন্দোলন সংগঠিত করে । সম্ভাব্য সমস্ত ধরনের পদ্ধতি তারা এ কাজে ব্যবহার করে । আগেই আলােচনা করা হয়েছে যে , কলকাতা ও নােয়াখালির দাঙ্গা তাদের এই বিচ্ছিন্নতার দাবিকে গ্রহণযােগ্য করে তােলার জমি তৈরি করে দেয় ।
(১২৩)
বাঙলাভাগের দাবিতে হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেস কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে । বাঙলাভাগের দাবিতে মােট ৭৬ টি উল্লেখযােগ্য জনসভার আয়ােজন করা হয় বলে জানা যায় । এরমধ্যে কংগ্রেস একাই করে ৫৯ টি জনসভা । হিন্দু মহাসভার উদ্যোগে হয় ১২ টি জনসভা এবং ৫ টি জনসভা হয় এই দুই দলের যৌথ উদ্যোগে ।
বসু ভ্রাতৃদ্বয়ের অপসারণের পরে ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় এবং নলিনীরঞ্জন সরকারের নেতৃত্বে পার্টি বেশি বেশি হিন্দুত্ববাদী লাইন অনুসরণ করে এবং পার্টি অনেকটাই দৃঢ়ভিত্তির উপর দাঁড়ায় । চল্লিশের দশকে সদস্যভুক্তি এবং নীতির ক্ষেত্রে কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভার মধ্যে প্রায় কোন পার্থক্য থাকে না । বিশেষ করে সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে বাঙলায় হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেসের মধ্যে প্রায় কোন পার্থক্যই থাকে না । প্রয়ােজনে দুই দল একসঙ্গে কাজ করতে থাকে ।
উদাহরণ হিসাবে একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে । পাঞ্জাবি পুলিশের নৃশংসতার প্রতিবাদে ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসে হিন্দু মহাসভার ওয়ার্কিং কমিটি একদিন হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত নেয় । পাঞ্জাবি পুলিশের নৃশংসতার কথা প্রচার করা হলেও , বাস্তবত এ ছিল বাঙলা বিভক্তির আন্দোলনের জন্য প্রথম বড় পদক্ষেপ । হিন্দু মহাসভা সিদ্ধান্ত নিলেও , তারা অপেক্ষা করে প্রদেশ কংগ্রেসের কার্যকরি কমিটির সিদ্ধান্তের জন্য । মে মাসে কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভা বাঙলা ভাগের দাবিতে যৌথভাবে কলকাতায় এক বিশাল জনসভার আয়ােজন করে । ঐ সভায় সভাপতিত্ব করেন ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার । প্রাদেশিক পর্যায়ে এই সহযােগিতার ধারা স্থানীয় স্তর পর্যন্ত প্রসারিত হয় । বাঙলাভাগের জন্য যত জনসভা হয় , তারমধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযােগ্য এবং বহুল প্রচারিত সভাটি হয় কলকাতার বালিগঞ্জে । কংগ্রেসের নিজস্ব উদ্যোগেই হয় এই জনসভা । এই সভায় সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট গান্ধীবাদী নেতা ড. প্রফুল্লচন্দ্র রায় । এই বিভক্তির আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বর্ধমান জেলা ।
অনেকেই মনে করেন এবং প্রচার করা হয় যে , ড . শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ছিলেন বাঙলা ভাগের মহানায়ক। সেই দিক দিয়ে কেউ কেউ তাকে পশ্চিমবঙ্গের স্রষ্টাও বলে থাকেন । কিন্তু এই কথা ও দাবি আংশিক সত্য। কারণ বাঙলাভাগের দাবি হয়তাে তিনি প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে তুলেছিলেন ; কিন্তু বাঙলাভাগের লক্ষ্যে যে আন্দোলন পরিচালিত হয় , তার কৃতিত্ব কংগ্রেসেরও---প্রদেশকংগ্রেস এবং হাইকমান্ড উভয়ের। চল্লিশের দশকে হিন্দু মহাসভা ছিল একেবারেই হীনবল এবং ড .শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী বাঙলার শীর্ষস্থানীয় নেতা হিসাবেই পরিচিতি পান নি।
(১২৪)
বাঙলাভাগের আন্দোলনে বিড়লা ও তার সম্প্রদায়ের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন । জি.ডি. বিড়লা ১৯৪২ সালেই মহাদেব দেশাইয়ের কাছে স্বীকার করেন যে , তিনি বাঙলাভাগের পক্ষে ; কারণ তা বাস্তবসম্মত এবং হিন্দুদের স্বার্থের পক্ষে সংগতিপূর্ণ । কোলকাতার মাড়ােয়ারিরা বাঙলাভাগের পক্ষে কাজ করেন । বাঙলাভাগের আন্দোলনের জন্য তারা প্রচুর অর্থ সাহায্য করেন ।
উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকরা বিভিন্ন জেলা থেকে বাঙলা ভাগের দাবি জানিয়ে আবেদনপত্র পাঠাবার কর্মসূচী নেন ; যাতে প্রমাণ হয় যে , অধিকাংশ হিন্দুরা বাঙলাভাগ করতে ইচ্ছুক । প্রকৃতপক্ষে একটি বয়ান লিপিবদ্ধ করে, তা ছাপানাে হয় এবং তাতে স্বাক্ষর করিয়ে হাইকমান্ডকে পাঠানাে হয় । ছাপানাে দরখাস্তের বয়ান হলাে---
“বিষয় : পৃথক পশ্চিমবাঙলা প্রদেশ গঠনের দাবী
শ্রদ্ধাপূর্ণ প্রার্থনাসহ জানাই – আমরা স্বাধীনভারতীয় ফেডারেশনের অধীন থাকতে চাই । প্রস্তাবিত 'পশ্চিমবাঙলা প্রদেশ'-এর জন্য দাবির কথা আমরা আপনাদের অবহিত করছি । এই প্রদেশ থাকবে স্বাধীন ভারতীয় ফেডারেশনের অধীন ।
মুসলিমলীগ সরকার জীবন , সম্পত্তি ও স্বাধীনতা রক্ষায় ব্যর্থ হয়ে বাঙালি হিন্দুদের জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে । মুসলিম রাজ-এর অধীন অগ্রহণযােগ্য অবমাননার জীবন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রদেশকে বিভক্ত করতে হবে"।
অধিকাংশ ছাপানাে দাবিপত্রের নীচে স্বাক্ষরকারির পূর্ণ নাম , ঠিকানা , পেশা ও বয়স লেখার ব্যবস্থা ছিল ।
জেলাভিত্তিক একটি হিসাবে দেখা যাচ্ছে বর্ধমান জেলা থেকে এরকম দরখাস্ত পাওয়া গেছে বা করা হয়েছে ৪৩ টি , বীরভূম থেকে ২ টি , বাঁকুড়া থেকে ৩৪ টি , মেদিনীপুর থেকে ৩৪ টি , হুগলী থেকে ১৮ টি , হাওড়া থেকে ৩৭ টি , কোলকাতা থেকে ৯৪ টি , ২৪ পরগনা থেকে ২৩ টি , মুর্শিদাবাদ থেকে ৫ টি , নদিয়া থেকে ১৮ টি , যশাের থেকে ৩ টি , খুলনা থেকে ১৫ টি , রাজশাহী থেকে ৩ টি , দিনাজপুর থেকে ৬ টি , জলপাইগুড়ি থেকে ১২ টি , দার্জিলিং থেকে ৬ টি , মালদা থেকে ১২ টি , রংপুর থেকে ১ টি , বগুড়া জেলা থেকে ০ টি , পাবনা থেকে ১ টি , ঢাকা থেকে ৬ টি , ময়মনসিংহ থেকে ৬ টি , ফরিদপুর থেকে ৩ টি , বরিশাল থেকে ১৪ টি , ত্রিপুরা থেকে ১ টি , নােয়াখালী থেকে ২ টি , এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ১ টি অর্থাৎ মােট ৪০০ টি দরখাস্ত পাওয়া যায় । দেখা যাচ্ছে---পশ্চিমাঞ্চলের হিন্দুপ্রধান জেলাগুলি থেকেই বেশি আবেদনপত্র জমা পড়ে (এআই সি সি পেপার্স থেকে সংগৃহীত তথ্য : জয়া চ্যাটার্জি)।
(১২৫)
এই সমস্ত দাবিপত্র বা আবেদনপত্রগুলি সম্বােধন করা হয়েছে তৎকালীন সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির প্রেসিডেন্ট আচার্য জে বি কৃপালনীর নামে । মাত্র ৪ টি দাবিপত্রে সম্বােধন করা হয় ড .শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর নামে । হিন্দু মহাসভার বরিশাল শাখা থেকে ঐ ৪ টি দাবিপত্র পাঠানাে হয় । এরদ্বারা বােঝা যায় যে , বাঙলাবিভাগ আন্দোলনের প্রধান সংগঠক ছিল বেঙ্গলকংগ্রেস এবং ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর গুরুত্ব কার্যতঃ খুবই কম ছিল ।
নিম্নবর্ণীয় হিন্দু সংগঠনের পক্ষ থেকেও বাঙলা বিভাগের দাবি জানিয়ে কয়েকটি আবেদনপত্র জমা পড়ে । যেমন : বারাসাতের ‘তফসিলী সম্প্রদায়, হিন্দু' , বর্ধমানের পরাতল ইউনিয়নের 'আদিবাসী সমিতি' , ময়মনসিং জেলার 'ইসলামপুর হরিজন সেবা সংঘ', খুলনার 'তফসিলী সম্প্রদায় সমিতি' , জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং এর 'আদিবাসী সমিতি' , 'বঙ্গীয় সদ্গােপ সভা' ’বঙ্গীয় মাহিষ্য সমিতি' , খুলনার ‘বঙ্গীয় যাদব মহাসভা' , এবং জয়নগরের ‘তফসিলী সম্প্রদায়, হিন্দু' - এই সংগঠনগুলিও বাঙলা বিভাগের দাবি জানিয়ে আবেদনপত্র পাঠায় । এই আবেদনপত্রগুলি পড়ে বােঝা যায় যে , 'হিন্দু মহাসভা'র শুদ্ধি অভিযান যথেষ্ট কাজ দেয় । তবে এ কথাও ঠিক যে , এই সমস্ত সংগঠনের প্রায় সবগুলিই মূলতঃ পশ্চিমবঙ্গ ভিত্তিক সংগঠন । আর খুলনা জেলার সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা হয়তাে ঐ জেলার ভারতভুক্তির আশা করেছিলেন ।
পূর্ব বাঙলার একমাত্র জেলা বরিশাল , যেখানে 'হিন্দু মহাসভা'র যথেষ্ট শক্তি ছিল এবং জেলায় তারাই বাঙলা বিভাগের দাবি জোরদার করেন । মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এই জেলার হিন্দুরা হিন্দু মহাসভার নেতৃত্বে বাঙলাভাগের দাবিকে জোরদার করে এবং পরে এক অবাস্তব দাবি উত্থাপন করেন । তারা দাবি করেন যে , যেকোনােভাবেই হােক বরিশালের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ মহকুমা ও অঞ্চলগুলিকে প্রস্তাবিত হিন্দু রাজ্যের অর্থাৎ পশ্চিমবাংলার অন্তর্ভুক্ত করা হােক । বাঙলাবিভাগের দাবি সমর্থন করে বরিশাল জেলা হিন্দু মহাসভা মে মাসে এক স্মারকলিপিতে বরিশাল ও ফরিদপুর জেলার কিছু অংশকে নতুন হিন্দুপ্রদেশের (পশ্চিমবঙ্গের) অন্তর্ভূক্ত করার জন্য এভাবে যুক্তি উত্থাপন করে – ‘এটা এখন সুপ্রতিষ্ঠিত সত্যে পরিণত হয়েছে যে , সাম্প্রদায়িক সংহতি , শান্তি ও সুস্থিরতার স্বার্থে এবং হিন্দু সংস্কৃতি ও ধর্মীয় , অর্থনৈতিক , রাজনৈতিক অধিকার এবং সুযােগ সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য বাঙলায় হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগঠন প্রয়ােজন হয়ে পড়েছে । গত ১০ বছর মুসলিম লীগ প্রশাসনের অধীনে , বিশেষ করে ১৬ ই আগষ্ট ‘ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডে' ঘােষণার পর এবং এরফলে সৃষ্ট নৃশংসতায় হিন্দুদের সংস্কৃতি ও অন্যান্য সুযােগ সুবিধা মারাত্মকভাবে বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
(১২৬)
তাই, এমতাবস্থায় যেন একটি নতুন বরিশাল জেলা গঠন করা হয়, যারমধ্যে থাকবে পুরাে গৌরনদী , উজিরপুর, ঝালকাঠি, স্বরূপকাঠি থানা, বাবুগঞ্জ , নলছিটি , বাকেরগঞ্জ , কোনাখালি ও পিরােজপুর থানার অংশ এবং নতুনভাবে গঠিত এই বরিশাল জেলাকে নতুনভাবে গঠিত হিন্দুরাজ্যের (পশ্চিমবঙ্গের)অন্তর্ভুক্ত করতে হবে ।
এর মাত্র কয়েকদিন পর ৩ রা জুন , ১৯৪৭ তারিখে মাউন্টব্যাটেন বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানান যে , বাঙলা প্রদেশভাগ হবে কি হবে না , সে সিদ্ধান্ত নেবে বাঙলার প্রাদেশিক আইন সভার সদস্যরা । ভােটের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে বলে জানানাে হয় । শর্ত উল্লেখ করা হয় যে , প্রাদেশিক আইনসভার হিন্দু সদস্য এবং প্রাদেশিক আইন সভার মুসলমান সদস্যরা পৃথকভাবে ভােটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবেন । তাতে দু’পক্ষেরই সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যবৃন্দ বাঙলাভাগ না চাইলে বাঙলা ভাগ হবে না ; কিন্তু এক অংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা বাঙলাভাগ চাইলে বাঙলাকে ভাগ করা হবে ।
বাঙলা প্রাদেশিক আইন সভার মুসলমান সদস্যরা জনাব নুরুল আমিনের সভাপতিত্বে ভােটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন । মুসলমান সদস্যদের মধ্যকার অধিকাংশ সদস্য বাঙলাভাগের বিরুদ্ধে ভােট দেন । বাঙলা প্রাদেশিক আইনসভার হিন্দু সদস্যরা বর্ধমানের মহারাজা উদয়চাঁদ মহতাব-এর সভাপতিত্বে ভােটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন । অধিকাংশ হিন্দু সদস্য প্রত্যাশিতভাবেই বাঙলাভাগের পক্ষে ভােট দেন । বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ঘটনা হলাে – প্রয়াত কমরেড জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে ৩ জন কমিউনিস্ট পার্টির প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য বাঙলাভাগের পক্ষে ভােট দেন এবং মহাপ্রাণ যােগেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে প্রায় সব তফসিলী প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য বাঙলাভাগের বিরুদ্ধে ভােট দেন । অবশ্যই শরৎচন্দ্র বসুও বাঙলাভাগের বিপক্ষে ভােট দিয়েছিলেন । ফলে , ভারতভাগের সিদ্ধান্ত হবার ৫৫ দিন আগে বাঙলাভাগের সিদ্ধান্ত পাকা হয়ে যায় ।
পূর্ব বাঙলার হিন্দু, যারা বাঙলা বিভাগের দাবি জানান, তারা হয়তাে কেউ এই নির্মম সত্যের মুখােমুখি হবার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না যে , বাঙলাভাগের পর তার নিজের গ্রাম , শহর বা থানা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবে । কিন্তু যখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নতুন হিন্দুপ্রদেশের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বাগাড়ম্বরকারি নেতাদের তাঁদের জন্য কোন বিশেষ উদ্ধারপ্রকল্প নেই , তখন তাদের কোলকাতা ও পশ্চিমবাঙলায় পাড়ি জমানাে উদ্বাস্তুদের স্রোতে যােগ দেওয়া অথবা কল্পিত পাকিস্তানের ভূত কাঁধে নিয়ে বসবাস করা ছাড়া গত্যন্তর রইলাে না!
বাঙলার উচ্চবর্ণহিন্দু ভদ্রলােকশ্রেণীর জাত্যাভিমান , লােভ ও ক্ষমতালিপ্সার পরিণতি হলাে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি মানুষের বাস্তুত্যাগের ঘটনা । (১২৭)
কয়েক কোটি মানুষের দেশান্তরণ । ভিটেমাটি হারিয়ে উদ্বাস্তু জীবনের অসম্মান , অনিশ্চয়তা ও শিকড় ছেড়ার যন্ত্রণা । কিন্তু সে বেদনা ভদ্রলােক সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত মানুষেরও মনকে ছুঁতে পারে না । ১৯৪৭ সালের ২৫ শে জুন তিনি এক চিঠিতে লেখেন , “বঙ্গ ভাগ হয়ে গেল, নুতনবঙ্গ হলো, ভালই হলাে । বাঙালি হিন্দুরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে (শেষ)
তথ্যসুত্রঃ
১) ড . আম্বেদকর রচনাবলী , খণ্ড - ২ , পৃ . ৪১৪
২) ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম : সুপ্রকাশ রায় , পৃ . ১৩৪
৩) ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম : সুপ্রকাশ রায় , পৃ . ৫
৪) শারদোৎসব – সাম্রাজ্যবাদী উৎসব : মােহম্মদ হেলালউদ্দিন , পৃ . ১৬-১৭
৫) ড . আম্বেদকর রচনাবলী , খণ্ড -২ , পৃ . ৪০৯
৬) ড. আম্বেদকর রচনাবলী , খণ্ড -২ , পৃ . ৪১৯
৭) ড.আম্বেদকর রচনাবলী , খণ্ড -২ , পৃ . ৪২৩-৪২৪
৮) ড. আম্বেদকর রচনাবলী , খণ্ড -২ , পৃ . ২৮২
৯) ড . আম্বেদকর রচনাবলী , খণ্ড -২ , পৃ . ৩৮
১০) ডিসকভারি ইণ্ডিয়া : নেহেরু , পৃ . ৩৫৩
১১) বঙ্গভঙ্গ রদ্ : বাঙালি হিন্দুর গর্বকথা , না সর্বনাশের পাঁচালি ? – ড . অশােক মিত্র
১২) ভারতে বৈপ্লবিক সংগ্রামের ইতিহাস : সুপ্রকাশ রায়, পৃ . ১৯
১৩) বঙ্গভঙ্গ রদ : বাঙালি হিন্দুর গর্বকথা , না সর্বনাশের পাঁচালি ? - ড . আশােক মিত্র
১৪) পরিকথাঃ অম্লান দত্ত , পৃ .১৪৮ , ১৪৯, ১৫০
১৫) স্বদেশ স্বদেশ করছি কাকে : সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৬) ড . আম্বেদকর রচনাবলী ; খণ্ড -২ , পৃ . ৫৩০
১৭) ভারতের বৈপ্লবিক সংগ্রামের ইতিহাস : সুপ্রকাশ রায় , পৃ . ১৬৪
১৮) ভারতের বৈপ্লবিক সংগ্রামের ইতিহাস ও সুপ্রকাশ রায় , পৃ ২৮৯
১৯) বাঙলা ভাগ হল ; — জয়া চ্যাটার্জী , পৃ . ৯
২০) ড . আম্বেদকর রচনাবলী - খণ্ড -২ , পৃ . ৪৩৭
২১) একশ ' বছরের রাজনীতি ও আবুল হাসাদ বাংলাদেশ , ( উল্লেখ : সাম্রাজ্যবাদী উৎসব – মােঃ হেলালউদ্দিন )
২২) পরিকথাঃ বঙ্গভঙ্গের শতবর্ষ
[ এছাড়া অন্যান্য যেসব বই ও প্রবন্ধ এবং তথ্যের সহযােগিতা নেওয়া হয়েছে , তার উল্লেখ লেখার মধ্যে যথাস্থানে করা হয়েছে )
(তথ্যসূত্রের যে নোট, বইয়ের মধ্যে আছে, এই কপিতে তা মুছে গেছে, ঠিক করতে পারলাম না, দুঃখিত)
(১২৮)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন