আমার কৈফিয়ত
আমার কৈফিয়ত
(নীল আকাশ পত্রিকার ১৬ মার্চ , ২০১৩ সংখ্যায় প্রকাশিত প্রতিবেদন)
আমি রাজনৈতিক ক্রিয়াকাণ্ডের সাথে জড়িত স্কুলজীবন থেকে । মােটামুটি ১৯৬৮/৬৯ সাল থেকে--- যখন পূর্ব পাকিস্তানে নকশালপন্থি আন্দোলনের সূচনা হয় । ঐ একই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে আয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের ঝড় ওঠে । এ সবের মধ্যদিয়ে আমি রাজনৈতিক ঘটনাবলীর সাথে কমবেশি জড়িয়ে পড়ি । ছাত্রজীবনে চীনপন্থি বলে পরিচিত সংগঠন 'ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ)'-এর সাথে যােগাযােগ হয় । এ যােগাযােগ নিতান্ত স্থানীয় স্তরে । যা বুঝেছিলাম , তাই , আশপাশের স্কুলে গিয়ে বক্তৃতা করে বলার চেষ্টা, এভাবে ছাত্র রাজনীতির শুরু ।
মার্কসবাদের নাম শুনি। আর 'ছােটদের রাজনীতি' বা এমন কোন একটি বই পড়ে সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হই । ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি । ভারতে অস্ত্র ট্রেনিং হয় তেজপুরের আর্মি ট্রেনিং সেন্টারে এবং সন্নিহিত ভালুকপং-এর জঙ্গলে গেরিলা ট্রেনিং । তারপর ফ্রন্টে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযােদ্ধার স্বীকৃতি ।
সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের স্থানীয় মোড়ল-মাতব্বর, রাজনৈতিক টাউট, ত্রাণ সামগ্রী আত্মসাৎকারী চক্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করি ও ঝামেলায় জড়িয়ে যাই। বলতে গেলে এই গোটা চক্রটাই ছিল স্থানীয় আওয়ামী লীগ, তারা চক্রান্ত শুরু করে। বাংলাদেশে আমার উপর পুলিশ , রক্ষী বাহিনী ও সামরিক বাহিনী অকথ্য অত্যাচার করে ও হত্যা করার চেষ্টা হয়। আড়াই/তিন বছর জেল ও হাজতবাস এবং বিনাবিচারে আটক থাকতে হয়। এই টালমাটাল সময়কালে পরিবারের চাপে দেশান্তরণে বাধ্য হয়েছিলাম।
ভারতে ব্যাঙ্কে চাকরি পাই। সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী নকশালপন্থি রাজনীতির অনুশীলন এবং একই সাথে তফসিলী কর্মচারি আন্দোলনে নেতৃত্বদান করি । এভাবে ড . আম্বেদকরের চিন্তার সাথে পরিচয় হয়। ড. আম্বেদকর সম্পর্কে ভারতীয় মার্কসবাদীদের ছিল ভুল ধারণা ও মূল্যায়ন । যারফলে তাদের সাথে আমার মতবিরােধ হয় ও নকশালপন্থি পার্টি পরিত্যাগ করি।
১৯৯৫ সাল থেকে রিপাবলিকান পার্টির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি ছিলাম। বিজেপি-শিবসেনার সাথে রিপাবলিকান পার্টি নির্বাচনী সমঝােতা করে। প্রতিবাদে আমরা ২০১২ সালে আর.পি.আই দল ত্যাগ করি ও এ.আই ইউ.ডি.এফ - এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি গঠনের কাজে অংশগ্রহণ করি। আমি ঐ পার্টির রাজ্য কমিটি ও কেন্দ্রিয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হই। কিন্তু নানা কারণে ২০১৩ সালেইএ.আই.ইউ.ডি.এফ পার্টিতে ইস্তফা দেই এবং বহুজন মুক্তি পার্টির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি গড়ে তােলার জন্য দায়িত্ব নিয়েছিলাম। এআইইউ ডিএফ এবং বিএমপি গড়ে তোলার কাজে আমরা প্রায় সবাই একসাথে কাজ করি, যারা আরপিআই ছেড়ে চলে এসেছিলাম।
এ অবস্থায় অনেকেই আমাকে নানা অপ্রীতিকর প্রশ্ন করেছেন এবং বিরূপ মন্তব্য করছেন । অনেকে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল পর্যন্ত করেছেন । এইসব প্রশ্নগুলি ভাল লাগার কথা নয়, আমারও যে ভালো লাগে তা নয়। তবে এইসব কথা ও প্ৰশ্ন যে একেবারে অবান্তর – এমন আমি মনে করি না । এখানে সেইসব বহু প্রশ্নের মধ্যকার কিছু বাছাই করা বা কমন প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করলাম "আমার কৈফিয়ত" লেখাটির মাধ্যমে---যাতে , যারা প্রশ্ন করেন ও খিস্তিখেউর করেন এবং যারা প্রশ্ন না করলেও, প্রশ্নগুলি তাদের মনে ও মুখে আছে , তাদের সেসব জানাবোঝার আগ্রহ কিছু পরিমাণে নিরসন হয়।
প্রশ্ন : যে মুসলমানদের জন্য আমরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হলাম , আপনি সেই মুসলমানদের পক্ষে কথা বলেন । মুসলমানরা যদি আপনার এত প্রিয় হয় , তাহলে ঐদেশে থেকে গেলেন না কেন ?
উত্তর : আমি মুসলমানদের অত্যাচারের জন্য বা অত্যাচারের ভয়ে দেশত্যাগ করিনি । আমার বাবা-মা ও এক দাদা-বৌদি এবং তাদের পরিবার আজও বাংলাদেশেই আছেন ।। ইতিমধ্যে বাবা ওদেশেই মারা গেছেন । তারা সবাই শিক্ষিত এবং এলাকায় যথেষ্ট পরিচিত । মর্যাদা নিয়েই তারা আজও ওদেশে আছেন । আমি আওয়ামি লীগ বিরােধি ছিলাম । ছাত্রলীগ না করে , ছাত্র ইউনিয়ন করতাম । স্থানীয় কলেজে জিএস ছিলাম । এলাকার ছাত্র-যুবদের মধ্যে প্রভাব ছিল । এলাকার কিছু হিন্দু মাতব্বর ও আওয়ামি লীগ আমাকে পুলিশ-রক্ষী বাহিনী দিয়ে জব্দ করার নানা অপকৌশল নেয় । মা-বাবা এবং বাড়ির লােকজন আতঙ্কিত হয়ে আমাকে দেশত্যাগের জন্য চাপ দেয় । কারণ তখন রক্ষীবাহিনী ক্যাম্পে খুন ও গুম করা সাধারণ ঘটনা ছিল। এসব অপকর্মের মধ্যে কোন মুসলমান ছিলেন না। এইসব অপকর্ম করেছিলেন আমাদের এলাকার মোড়ল-মাতব্বরদের একটা বড় চক্র, স্থানীয় এমপি পীযুষ ভট্টাচার্য ছিলেন তাদের মূল শক্তি। যদিও শেষ পর্যন্ত আমি দুর্ভোগ এড়াতে পারিনি
আমি মুসলমানদের পক্ষে কথা বলি না । আমি ন্যায় ও যুক্তিসংগত কথা বলার চেষ্টা করি । তবে সবদেশের সংখ্যালঘুদের কিছু বাড়তি সহযােগিতা ও সহানুভূতি প্রাপ্য বলে আমার অভিমত, কারণ সংখ্যালঘু হিসাবে তাদের কিছু সমস্যার মোকাবিলা করতেই হয়। । আমার সব কথা ও লেখা মুসলমানদের ভাল লাগে বা পছন্দ হয় , এমন নয় ।
ভারত ও পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের দেশান্তরণের কারণ ভারত ভাগ । ভারতভাগের জন্য হিন্দুদের যেমন দেশত্যাগ করতে হয়েছে ; বহু মুসলমানকেও দেশত্যাগ করতে হয়েছে । হিন্দু ও মুসলমান – উভয় সম্প্রদায়ের কিছু নেতা এর জন্য দায়ি । সাধারণ হিন্দু বা মুসলমান মানুষ দায়ি নন । হিন্দু নেতৃত্ব রাজি না থাকলে , শত চেষ্টাতেও মুসলমান নেতৃত্ব দেশভাগ করতে পারতেন না। সেদিক দিয়ে ও অন্যান্য নানাভাবে তথ্য বিশ্লেশন করলে দেখা যায় যে , দেশভাগের জন্য মূলতঃ হিন্দু নেতারাই দায়ি ছিলেন। দেশভাগ মুসলমানদের জেহাদি আন্দোলনের ফলে হয়নি , হয়েছে আলাপ-আলােচনার মাধ্যমে নিজেরা অর্থাৎ হিন্দু ও মুসলমান নেতারা ঐক্যমত হতে না পারার কারণে।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা – তাতে উভয় সম্প্রদায় দোষী। কোনক্ষেত্রে কোনপক্ষ কম দায়ী, কোনপক্ষ বেশি দোষী। শুধু মুসলমানদের দোষ দেওয়া ঠিক নয় । কোরান যদি মুসলমানদের হিন্দু নিধনে প্ররােচিত করে থাকে , তাহলে হিন্দুদের মুসলমান হত্যা করতে কোন শাস্ত্র প্ররােচিত করেছে ? দাঙ্গার কারণ ধর্মগ্রন্থের মধ্যে খুঁজে বেড়ালে সত্য উদঘাটিত হবে না , দাঙ্গার কারণ মূলতঃ রাজনীতির অপকৌশল ।
প্রশ্ন : আপনি বারবার মত ও দল বদল করেন । মার্কসবাদ ছেড়ে আম্বেদকরের অনুগামী কেন হলেন ?
উত্তর : আমি কোনদিন মত বা মতাদর্শের বদল ঘটাইনি। স্কুল জীবনে মার্কসবাদে আকৃষ্ট হই । প্রায় কিছুই না বুঝে । ধীরে ধীরে খানিকটা বুঝতে শিখি । মার্কসবাদে আমি আজও বিশ্বাস হারাইনি । আমি মনে করি কার্ল মার্কস শ্রেণীসংগ্রাম ও শােষণমুক্ত সমাজ গঠনের প্রবক্তা । আর আম্বেদকর গণতান্ত্রিক সংগ্রামের নেতা – চিন্তায় ও অনুশীলনে । ইউরােপ ও ভারত সমাজের বিকাশ একই স্তরে নেই । ভারতের গণতান্ত্রিক সংগ্রামে নেতৃত্ব দান করার কথা ছিল মার্কসবাদীদের, যাকে তারা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব বা জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করেন । কিন্তু তাতে তারা ব্যর্থ । ড . আম্বেদকর সেই কাজ শুরু করেছিলেন । একই কাজ এখন আমরা করার চেষ্টা করছি । তখনও ভারতের তথাকথিত মার্কসবাদীরা আম্বেদকরকে ব্রিটিশের চর বলে উল্লেখ করেন, এই সময়েও তাই বলতেন। এই বিষয় নিয়ে পার্টিতে (CPI-ML PU) আমার সাথে দ্বন্দ্ব হয় এবং পরিণতিতে পার্টি ছেড়ে দিয়েছিলাম।
ড . আম্বেদকরের লড়াইয়ের পথ প্রকরণের সাথে তথাকথিত মার্কসবাদীদের ঝগড়া/সংঘাত আছে ; কিন্তু মার্কসবাদের লক্ষ্যের সাথে আম্বেদকরের চিন্তা-ভাবনার উল্লেখযোগ্য কোন বিরোধ নেই । লড়াইয়ের পদ্ধতি ও কৌশলের নানা প্রশ্নে মার্কসবাদীদের সাথে ড . আম্বেদকর সব ক্ষেত্রে সহমত হন নি ঠিকই, তবে নীতিগত প্রশ্নে মৌলিক কোন পার্থক্য আছে বলে আমি মনে করি না।
কাজের ক্ষেত্রে মতপার্থক্যের জায়গা চিহ্নিত করতে হলে তা এক কথায় এভাবে বলা যায়--- ভারতে শােষণমুক্ত সমাজ গঠনের লড়াই খানিকটা পেছন থেকে শুরু করা প্রয়ােজন বলে ড. আম্বেদকর মনে করতেন। তাঁর সুস্পষ্ট ধারণা ছিল যে জাত-বর্ন সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই না করে ভারতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আর বর্ন সমস্যা ও সাম্প্রদায়িকতার সমস্যামুক্ত এক গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা হলো শ্রেণীসংগ্রাম বিকশিত করার বা কমিউনিস্টদের সাফল্যের পূর্বশর্ত।
আম্বেদকরের এই ভাবনাকে সঠিক বলে মনে করেছি , তাই আম্বেদকরবাদী আন্দোলনে আছি। দলিত এবং মুসলমানদের প্রতি অবিচারের বিরোধিতা করি, তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সহযোগী হবার চেষ্টা করি। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে , এই ব্যবস্থার মধ্যে দলিতদের কিছু ক্ষমতায়ন হলেও দলিতদের মধ্যকার অধিকাংশ গরিবের মুক্তি আসবে না । তারজন্য শুরু করতে হবে শ্রেণীহীন সমাজ গঠনের লড়াই।
প্রশ্ন : তাহলে রিপাবলিকান পার্টি ত্যাগ করলেন কেন ?
উত্তর : রিপাবলিকান পার্টি ড. আম্বেদকরের পরিকল্পনা ও ঘােষণার ফসল। তিনি এই পার্টির লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি তৈরী করেছিলেন, গঠনতন্ত্র লিখেছিলেন ; কিন্তু পার্টি তৈরি করার সুযোগ পান নি। হটাৎ মারা গিয়েছিলেন। তফসিলী ফেডারেশন ভেঙে দিয়ে তিনি রিপাবলিকান পার্টি তৈরি করার জন্য ঘােষণা করেন, তার কারণ তিনি বুঝেছিলেন যে , শুধু তফসিলীদের নিয়ে একটি পার্টি গড়ে তোলা যায় না । কিন্তু তিনি হঠাৎ মারা যাওয়ায় তার অনুপস্থিতিতে রিপাবলিকান পার্টি কার্যত হয়ে দাঁড়ায় তফসিলি ফেডারেশনের পরিবর্তিত নাম। যারা ছিলেন তফসিলি ফেডারেশনের নেতা-কর্মী, তারাই হলেন রিপাবলিকান পার্টির নেতা-কর্মী। অন্যান্য সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ যারা রিপাবলিকান পার্টিতে যোগ দেবেন বলে ড . আম্বেদকরকে কথা দিয়েছিলেন , তার অনুপস্থিতিতে তারা আর নুতন তৈরি আরপিআই পার্টিতে যােগদান করেন না ।
তবুও আরপিআই দলিতদের কাছে এক আবেগ। এই পার্টি এখন বহুধা বিভক্ত পার্টি । ১৯৯৫ সালে পার্টি ঐক্যবদ্ধ হয় । দলিত যুবকরা সপ্তাহব্যাপী অনশন করেন আরপিআই - এর ঐক্যের দাবিতে । ঐক্যবদ্ধ পার্টি মহারাষ্ট্রে ৪ টি লােকসভায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৪ টিতেই জয়ী হয় । পশ্চিমবঙ্গেও মানুষ উৎসাহিত হন । আমরা পার্টিটাকে পুনর্গঠন করি। বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ পার্টিতে যােগদান করেন । কিন্তু মহারাষ্ট্রে আবার পার্টি খণ্ড খণ্ড হয়ে যায় । আর পশ্চিমবঙ্গে কর্মীরা হতাশ হয়ে বসে পড়েন ।
মূলতঃ এক সময়ের আরপিআই - এর লােকজনই পশ্চিমবঙ্গে বিএসপি , গড়ে তােলেন । পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিএসপি-র আবেগের বিরুদ্ধে আরপিআই রাজ্যে পায়ের নীচে বিশেষ জমি পায়নি । প্রতিকূল অবস্থাতেও ১৯৯৫ সাল থেকে ২০১২ সাল , মােট ১৭ বছর আমরা পার্টিকে টিকিয়ে রেখেছিলাম কোন এক অনুকুল সুযােগের আশায় । ধার, দেনা, লােন করেও চেষ্টা করেছি পার্টির শ্বাসটুকু যেন বন্ধ না হয় । কিন্তু , পার্টির কেন্দ্রিয় নেতৃত্ব বিজেপি - শিবসেনার সাথে জোট করে বসলেন । অথচ বাবাসাহেব বলেছেন , হিন্দুরাজ হলাে ভারতের পক্ষে সবচেয়ে বড় বিপদ । এই অবস্থায় একদিন আবেগ হার মানলাে – পার্টি ছেড়ে দিলাম । পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি সর্বসম্মতভাবে আর.পি.আই ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আমরা সবাই মিলে আরপিআই ছেড়ে দিয়েছিলাম।
প্রশ্ন : এআইইউডিএফ-এ কী হলাে, ওই পার্টি ছেড়ে দিলেন কেন?
উত্তর : আরপিআই , সিদ্দিকুল্লাহ নেতৃত্বাধীন পিডিসিআই , আইএনএল এবং মুসলিম লীগের একাংশ নিয়ে আমরা এআইইউডিএফের – পশ্চিমবঙ্গ কমিটি গঠন করি অর্থাৎ এই রাজ্যে নুতন একটি পার্টি গড়ে তোলার চেষ্টা শুরু করলাম। এই পার্টিটি মূলতঃ আসামে আছে । সেখানে প্রধান বিরােধী দল । এমপি আছে , আছে অনেকগুলি এমএলএ। দলিত-মুসলিম-ওবিসি ঐক্যের ভিত্তির উপর একটি ধর্মনিরপেক্ষ-গণতান্ত্রিক দল গঠনের স্বপ্ন দেখি আমি । একটা চেষ্টা শুরু করলাম। । পুরনাে আরপিআই - এর সবাই মিলে আলােচনা করেই সিদ্ধান্ত নিলাম, আশংকাও ছিল । বলতে পারেন ঝুঁকি নিলাম--- সভায় সে রকমই আলােচনা ও সিদ্ধান্ত হয় । শেষ পর্যন্ত আশংকাটাই সত্য হলাে , আশাহত হলাম ।
যদি প্রশ্ন করেন পার্টিটি কি সাম্প্রদায়িক ? – তা কিন্তু নয় । কর্মীবাহিনী ভীষণ ভাল। । ব্যক্তিগতভাবে আমাকে তারা খুবই ভালবাসে ও পছন্দ করে । আমি পার্টি ছেড়ে দেওয়ায় তারা অনেকেই খুব হতাশ হয়েছেন। আসলে এরপর এই রাজ্যে পার্টিটাই উঠে যায়। তারা দলিত মুসলিম ঐক্যের পক্ষের শক্তি । এই সমীকরণকে তারা যথার্থ বলে মনে করেন ও বিশ্বাস করেন । কিন্তু ওদের নেতা চৌধুরি সাহেবের সাথে কাজ করা মুস্কিল । মানুষ হিসাবে তিনি খারাপ নন ; কিন্তু কর্তৃত্ববাদী ও সন্দেহবাতিকগ্রস্ত । স্বৈরাচারির রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দক্ষতা থাকলে খুব অসুবিধা হয় না ; তার সাথে কিছুদূর চলা যায় ; কিন্তু তিনি সে স্তরের নেতা নন । ফলে পার্টির কোন ভবিষ্যৎ নেই বলেই মনে হয়। তিনি নুতন লােকজনকে পার্টিতে নিতে ভয় পান । তার বিশ্বস্ত মওলানা ও মৌলবী নির্ভর পার্টিতে তিনি নিরাপদবােধ করেন । তােষামােদপ্রিয় মানুষ তিনি । আত্মসম্মানবােধ সম্পন্ন মানুষে তার বিরক্তি । তিনি মূলতঃ ধর্মীয় নেতা । রাজনীতি তার দ্বিতীয় পছন্দ বলে মনে হতে থাকে।
প্রশ্ন : সিদ্দিকুল্লাহ সাহেবকে দেখে নয় , আপনারা তাে আজমল সাহেবকে দেখে পার্টিতে যান।
উত্তর : সেটা অনেকটাই ঠিক । তাছাড়াও পার্টির ঘােষিত নীতি ও আদর্শ আম্বেদকরের ভাবনার অনুরূপ বলেই আমরা ঐ পার্টিতে যাই । কিন্তু বাস্তবতঃ দেখা যাচ্ছে আজমল সাহেব চৌধুরি সাহেবের মতের বাইরে কোন কথা বলেন না এবং কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না । হতে পারে দিল্লীর জমিয়তে উলেমা হিন্দের কোন নির্দেশ - নিয়ন্ত্রণ আছে ।
একটি ঘটনা বলি – আজমল সাহেব আমাকে লিখিত অনুমােদন দেন , পশ্চিমবঙ্গের কিছু হিন্দু - মুসলমান রাজনৈতিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তির সাথে বৈঠকের ব্যবস্থা করার জন্য । আমি তা করি – তারা পার্টিতে আসলে পার্টি খুবই উপকৃত হতাে । নির্দিষ্ট দিনে আজমল সাহেব কলকাতায় এলেন ; কিন্তু চৌধুরী সাহেবের আপত্তির কারণে আজমল সাহেব ঐ সভায় এলেন না। চৌধুরি সাহেবের আপত্তির কারণ এই হতে পারে যে , এতগুলি বিশিষ্ট মানুষ পার্টিতে আসলে তার কব্জা শিথিল হয়ে যেতে পারে ; আর আমার অবস্থান পার্টিতে দৃঢ় হতে পারে! এই ধরণের বাতিক! আজমল সাহেব না আসায় আমি বেইজ্জত হই ; আর পার্টি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। আজমল সাহেবের পার্টি ব্যক্তিনির্ভর পার্টি , যা বাইরে থেকে বুঝতে না পেরে আমরা ভুল করেছিলাম ।
প্রশ্ন : অনেকে বলেন যে , আপনি পদলােভী, কিছু বলবেন?
উত্তর : শুধু পদলােভী অপবাদ কেন , এমন কথাও শুনেছি যে , যেখানে টাকা , আমি নাকি সেখানে । যারা আমার বিরােধী তারা যে এসব কথা বলেন , তা আমি জানি । তবে আমার ধারণা – বিরােধিরা এসব বলেন আমাকে কোণঠাসা করার জন্য , কিন্তু তারা যে অপবাদ আমার বিরুদ্ধে দেন , তা তারা নিজেরাই বিশ্বাস করেন না ।
আমি ইউনিয়ন ব্যাঙ্কের তফসিলী কর্মচারি সংগঠনের রাজ্য ও সারাভারত সংগঠনের মূল নেতা ছিলাম । ওই দায়িত্বে ছিলাম প্রায় দু'দশক ধরে । অনেক টাকা-কড়ি নাড়াচাড়া করার সুযােগ ছিল সেখানে, আর আমার প্রতিদ্বন্দ্বি প্রায় কেউ ছিলেন না । সব ব্যাঙ্কের তফসিলিদের যৌথ সংগঠন অল ইন্ডিয়া এসসি/এসটি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ফেডারেশনেরও (অল্ ইন্ডিয়া) সেক্রেটারী জেনারেল ছিলাম । ১৫ বছর চাকরি বাকি থাকতে চাকরি ছেড়েছি , একইসাথে সাথে সব পদ ছেড়ে চলে এসেছি । প্রায় সব ব্যাঙ্কের নেতারা অবসরের পরেও সেখানে নেতাগিরি করেন । সংগঠন থেকে মাইনে নেন , গাড়ি নেন , ড্রাইভারের মাইনে নেন ইত্যাদি। আমাদের ব্যাঙ্কের সংগঠন ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী । আর্থিক সংস্থাও বানিয়েছিলাম, টাকা পয়সার সমস্যা ছিল না। অবসরের পর সংগঠনে থেকে যাবার জন্য আমাকে প্রস্তাবও দিয়েছিলেন তারা । আমি রাজি হইনি। আমি নাকি তাদের অনাথ করে এসেছি – এমন অভিযােগ-অভিমানও শুনি , অনুভব করি ।
সংগঠনের ফান্ড বলতে যা বােঝায় , তা কিছু পরিমাণে ওখানে ছিল । সবই নিজের হাতে তৈরি করা । অন্যরাও সাথে ছিলেন । টাকা - কড়ি নিয়ে কোন অভিযােগ কোন সময় উঠেছে কিনা খোঁজ নিন , কোন অভিযােগ পাবেন না ।
'১৪ ই এপ্রিল কমিটি ' তৈরি করেছিলাম । ১১ দিন ব্যাপী অনশন আন্দোলন হয় শিয়ালদহে এই সংগঠনের নেতৃত্বে । সংগঠন বেশ শক্তি অর্জন করে । আমার দু’চারজন বন্ধু প্রশ্ন তুললেন যে , আমি পার্টি করি , তাই , অন্য কেউ সম্পাদক হলে সংগঠনের নাকি আঙুল ফুলে কলাগাছ হবে! তাদের হাতে ছেড়ে দিলাম । সংগঠন আঁকড়ে থাকতে চাইনি । যদিও সংগঠনটি তারা ধরে রাখতে পারেননি ।
মতুয়াদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছি । কায়দা করে সংগঠনে ঢােকা যেত না , এমন নয় । ওসব চাইনি। তবু তারা রাখেন কোন না কোন জায়গায়। সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেবার প্রস্তাবও এসেছে ; কিন্তু ওটা আমার পছন্দ নয়। নিজের মত করে চলি , সেভাবে চলতে চাই । আরপিআই - এর রাজ্য সভাপতি , আর সারা ভারতের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম । ছেড়ে দিয়েছি । এআইইউডিএফ - এর রাজ্য কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রিয় কমিটিরও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলাম । ছেড়ে দিতে সময় লাগেনি ।
তবে ছেড়ে দেওয়াটা কোন কৃতিত্ব নয় , তাও আমি বুঝি। আর একথাও ঠিক যে , একটা লক্ষ্য নিয়ে কাজে নেমেছি , সংগঠন ও অনুশীলন তার অনুরূপ না হলে , সেখানে থাকার অর্থ হয় না । আসলে আমি ও আমরা দলবদল করছি না । আমরা একটা দল ও আন্দোলন গড়ে তােলার নিরন্তর চেষ্টায় ব্রতী আছি । আমি এমএলএ বা এমপি অথবা মন্ত্রি হতে কংগ্রেস , তৃণমূল বা সিপিএম - এ যাবার কথা ভাবিনি । তাদের দরজায় হত্যে দেইনি কখনাে ।
দল গড়ে তােলার প্রক্রিয়ায় এসব হোঁচট , ধাক্কা , তিরস্কার হয়তাে সবারই প্রাপ্য হয় । ড , আম্বেদকর , মহাপ্রাণ যােগেন্দ্রনাথ – এমন সব মহামনীষীদের হোঁচট খেতে হয়েছে । আমি ও আমরা তাে কোন হিসাবেই আসি না।
প্রশ্ন : মুসলমানদের কাছে ধাক্কা খেলেন , এবার কি ওদের সম্পর্কে মত বদলাবেন ?
উত্তর : মুসলমানদের কাছে কোন ধাক্কা আমি খাইনি । বরং দেখেছি তারাও দলিতদের সাথে একাত্ম হতে কত ব্যগ্র । আমার স্বজাতির কেউ কেউ তাে গতকালও আমাকে রামছাগল , রাজাকার এসব বলে ফেসবুকে গালি দিয়েছে । মুসলমান সমাজ আমাকে ভালবাসে। কখনও অসম্মান করেনি ; বরং যতটা দেয় , ততটা সম্মানের যােগ্য আমি নই। দলিত - মুসলমান ঐক্য যে সম্ভব – এ আই ইউ ডি এফ পার্টিতে কয়েক মাসের অভিজ্ঞতায় আমি তাতে নিশ্চিত হয়েছি । এ এক বড় পাওনা , সুন্দর অভিজ্ঞতা । দলিত , মুসলমান, ওবিসি এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেই ব্রাহ্মণ্যবাদ উচ্ছেদ সম্ভব ; অন্যকোন পথ নেই । এই পথ ধরেই কাজ করবাে , তাতে পার্টির নাম যাই হােক না কেন ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন