বিকল্প
বিকল্প
(নীল আকাশ পত্রিকার অক্টোবর ২০০৪ সংখ্যায় প্রকাশিত প্রতিবেদন)
সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস
কীসের বা কার বিকল্প ? কত কিছুরই তাে বিকল্প হতে পারে – এখানে সেই বহু ধরণের বিকল্প নিয়ে আলােচনা নয় । দেশ ও সমাজে বর্তমানে চলমান সংস্কৃতির বিকল্প নিয়ে কিছু কথা বলার চেষ্টা এখানে ।
পশ্চিমবাঙলায় 'বাঙলা দলিত সাহিত্য সংস্থা ' নামে একটি সংস্থা আছে। সংস্থার একটা মুখপত্র আছে , নাম 'চতুর্থ দুনিয়া'। বিগত কয়েক বছর সময়কাল ধরে মােটামুটি নিয়মিত প্রকাশিত হয় এই পত্রিকা ।
সংস্থা ও পত্রিকাটির অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা এবং বিশেষ ব্যক্তি ছিলেন ড. অচিন্ত্য বিশ্বাস । তিনি এখন সংস্থা ও পত্রিকার সাথে নেই, থাকলে খুবই ভালাে হত । সঙ্গে নেই , এক সময়ের অন্যতম ড. পশুপতিপ্রসাদ মাহাতাে , স্বপনকুমার বিশ্বাস প্রমুখ । কিন্তু এরা লড়াইয়ে আছেন । লিখছেন , সংগঠন করছেন, করার চেষ্টা করছেন ; অর্থাৎ আন্দোলনের বাইরে নন ।
দলিত সাহিত্য ও সংস্কৃতির আন্দোলন শুধু পশ্চিম বাঙলায় নয় – ত্রিপুরা থেকে মহারাষ্ট্র এবং কেরালা-তামিলনাড়ু থেকে কাশ্মীর ; প্রত্যেকটি রাজ্যে সক্রিয় । কোথাও কখনও কম , আবার কোথাও কখনও বেশি । কোথাও কখনও সচেতনভাবে , আধাসচেতনভাবে; আর বেশিরভাগক্ষেত্রে গােলমেলে ধরনের । এই আন্দোলনে এমন সব উৎসাহব্যঞ্জক ও আশাহীন চরিত্র । কিন্তু চলছে , হয়তােবা চলতেই থাকবে ।
পশ্চিম বাঙলার দলিত আন্দোলন ও দলিত সাহিত্য-সংস্কৃতির আন্দোলনে আজকের সময়ে সম্ভবত সবচেয়ে কাজের মানুষ ও জনপ্রিয় নাম অমর বিশ্বাস । কেউ কেউ হয়তাে আমার উপর বিরূপ হতে পারেন । কিন্তু তাঁরা লক্ষ্য করুন —আমি বলেছি জনপ্রিয় ; 'যােগ্যতম' বলছি না । অমরবাবু গত মাসে (৩০ সেপ্টেম্বর '০৪) আয়কর বিভাগের কমিশনারের পদ থেকে অবসর পেয়েছেন এবং বর্তমানে বাঙলা দলিত সাহিত্য সংস্থার সম্পাদক।
সাহিত্য - সংস্কৃতির আন্দোলনে বর্ষীয়ান ডাঃ গুণধর বর্মণ এবং তাঁর পত্রিকা 'আত্মনিরীক্ষণ', বিমল বিশ্বাস ও তাঁর পত্রিকা 'অদল - বদল' , গৌরাঙ্গ সরকার ও তাঁর পত্রিকা 'অধিকার', নকুল মল্লিক ও তাঁর পত্রিকা 'দলিত কন্ঠ', কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর ও তাঁর পত্রিকা ‘ নিখিল ভারত', মনােহরমৌলি বিশ্বাস , ধূর্জটি নস্কর , বিমলেন্দু হালদার , অনিল মল্লিক (বহুজন নায়ক) , ড . নন্দদুলাল মােহান্ত , ড. বিরাট বৈরাগ্য , মঞ্জু বালা , কল্যাণী ঠাকুর (নীড়), বি . বি . দাস (নির্ভীক সংবাদ) , গৌতম আলী ( আপাতত বুদবুদ ) , শান্তিরঞ্জন বিশ্বাস , বিমলেন্দু মল্লিক ও যতীন বালা (ছিয়ানব্বই) , রণজিৎ শিকদার , রণজিৎ সরকার , নারায়ন বিশ্বাস ও সুমন্ত হীরা (পথ সংকেত), নীতীশ বিশ্বাস (ঐকতান) , সুনীলকৃষ্ণ দাস , ড . পুষ্প বৈরাগ্য , কান্তি বিশ্বাস , উপেন কিসকু , অরুণ মাজি (পাললিক) , সন্তোষ রানা , সুস্নাত জানা , গােপাল বিশ্বাস , নাট্যকার রাজু দাস (শান্তিকুঞ্জ ) , অমল রায় , মহাশ্বেতা দেবী , সাহিত্যিক জ্যোতিপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায়, এই প্রতিবেদকের 'নীল আকাশ' পত্রিকা এবং এমন আরও অনেকে আছেন ।
এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রচারিত এবং পরিচিত নাম ড. উপেন্দ্রনাথ বিশ্বাস , সিবিআই-এর নামজাদা অফিসার হিসাবে নামডাক বেশি তাঁর । কিন্তু তিনিও লেখেন , দলিতদের আন্দোলনে থাকেন । তবে নামীদের মধ্যে তাঁর মতিগতিতে স্থিরতা কম । কেউ কেউ মনে করেন , দলিত মতাদর্শের চেয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠার ঝোঁক বেশি । ফলে , কখন কার সাথে জোট বেঁধে বসেন , এ নিয়ে অনেকের উদ্বেগ আছে । তবে এসব নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও , ভরসা এই যে , তাঁর ব্যক্তিগত সততা , নৈতিকতা , ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক ধ্যানধারণা নিয়ে কোনাে সংশয় নেই । এ প্রসঙ্গে তাই ড. আম্বেদকরের একটি মন্তব্য মনে পড়ছে । মােহম্মদ আলী জিন্নাহ যখন মুসলিম রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন , তখন ড. আম্বেদকর বলেছিলেন , "ভরসা একটাই – মুসলিম লীগের নেতৃত্বে আছেন স্বয়ং জিন্নাহ। আর যাই হােক , জিন্নার নেতৃত্বে কোন দল , নিছক একটি সাম্প্রদায়িক পার্টিতে পরিণত হবে , একথা মনে হয় না" ।
এরা সবাই লেখেন । অনেকে ভালাে লেখেন । আবার কেউ কেউ কী যে লেখেন , তা বােঝা অনেকের পক্ষে দুষ্কর হয়ে পড়ে । কী লিখেছেন , লেখক নিজেই তা বােঝেন কিনা সন্দেহ । কারুর কারুর লেখার কোন লক্ষ্য উদ্দেশ্য বােঝা যায় না । কোন কোন ক্ষেত্রে একই লেখার মধ্যে স্ববিরোধিতা। আবার একই লেখকের দুটি লেখায় ভিন্নমুখী দৃষ্টিভঙ্গী , সিদ্ধান্ত ও পথনির্দেশ । তবে একথা ঠিক , ভুল কিছু লিখলে , তাঁরা তা ভুল করেই লেখেন । এদের সবার লক্ষ্য এক , আকাঙ্খা এক---সবাই দলিতদের মুক্তি চান। রাজনৈতিক , অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত ও সামাজিক মুক্তি । দাসত্ব মুক্তির আবেগ কারুর কম নয় ; বরং যারা ভুল করেন , তাঁদেরই আবেগ বেশি । আবেগের আতিশয্যে তাঁরা পথ হারিয়ে বসেন । ভুলে যান যুক্তি ও বিচার-বিশ্লেষণ । ড. আম্বেদকরের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে কার্যত এরা কোন কোন সময়ে ড. আম্বেদকরকেই অস্বীকার করে বসেন, নাকচ করে দেন!
'বাঙলা দলিত সাহিত্য সংস্থা' গঠনের শুরুতেই বােধহয় এই সব লেখকেরা দলিত সাহিত্যের একটা সংজ্ঞা ঠিক করেছিলেন । আমি তাদের কাছেই এই সংজ্ঞা জেনেছি। কপিলকৃষ্ণ ঠাকুরের থেকে আমি বহুবার শুনেছি সে সংজ্ঞা , যা হলাে--- 'টোটাল নেগেশন'। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্যবাদী সাহিত্য সংস্কৃতিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে দলিতদের জীবন ও সংগ্রামের উপর ভিত্তি করে এক নতুন সাহিত্য সৃষ্টি । যেখানে স্রষ্টা হবেন মুলত দলিত মানুষেরাই । প্রগতি সাহিত্যের থেকে দলিত সাহিত্য আরও বেশি এগিয়ে থাকবে এই কারণে যে , এই সাহিত্য হবে নিজের কলমে নিজের জীবনের কথা । নিজেদের জীবনের ঘাম, রক্ত , অশ্রু ; আর সংগ্রামের কথকতা।
কিন্তু সমস্যা হল — সবে যাঁরা লাঙল ছেড়ে কলম ধরেছেন, তাঁরা লেখার জন্য প্রচলিত ভাষা পাবেন কোথায়! হাতে কলম ধরলে শব্দ হারিয়ে যাবে – এতাে খুবই স্বাভাবিক। কীভাবে হবে সাহিত্য রচনা! নিজের জীবনে কঠোর বাস্তবের মুখােমুখি দাঁড়িয়েছে সে বার বার। সেই সংগ্রামে নিষ্ঠুরতা, অবিচার, আর ঘৃণা ছাড়া তাঁরতো আর কিছুই মেলেনি! ভালােবেসে মুখ তুলে কেউ একবারও তাকায়নি , এতটুকু সহানুভূতিও দেখায়নি । তাই , 'সুন্দর', ‘শিল্প’ ইত্যাদি সব কোমল আর মিষ্টি শব্দের সাথে তাঁদের কখনও পরিচয় ঘটেনি।
দলিত সাহিত্য সংস্থা বললাে , লিখুন । নিজের জীবনে ; আর সমাজের পিঠে যতগুলি চাবুক পড়েছে , গুনে গুনে সব কটি কলম দিয়ে কাগজে লিখে ফেলুন । 'চতুর্থ দুনিয়া ' চিৎকার করে সেসব কথা পৌঁছে দেবে মানুষের মগজে , বিচার চাইবে হাত মুঠো করে!--- কাজ শুরু হলাে ।
কাজ শুরু হলাে , সাথে গণ্ডগােলও । চাকা গড়ালে তাপ হবেই - তাতে কোনাে ভুল নেই । কাজ যত এগােবে, নিত্যনতুন সমস্যা এসে পথ রােধ করে দাঁড়াবে এতাে সত্য এবং শাশ্বত , কেউ এ জিনিস এড়িয়ে যেতে পারবেন না । এসবই মেনে নিয়ে যেটা প্রয়ােজন , তা হলাে সমস্যার সাথে নিরন্তর লড়াই চালিয়ে লক্ষ্যপথে এগিয়ে চলা । সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে যাবার চেষ্টা করলে দিগভ্রষ্ট হবে অথবা চলার পথ অযথা দীর্ঘ হবে।
অদ্বৈত মল্লবর্মণের স্মৃতিতে চতুর্থ দুনিয়ার এক বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হলাে । বিদ্বান মহলে হৈচৈ পড়ে গেল । সংখ্যাটি এমন এক উচ্চতায় পৌছে গেল যে , সেই থেকে 'চতুর্থ দুনিয়া’ আর নীচে নেমে আনাড়িদের হাত ধরে উপরে তুলতে চায় না । মাঝে মধ্যে হাত বাড়ালেও কেমন যেন দ্বিধা , স্বতঃস্ফূর্ততার অভাব । তাই নবীনরা আর উৎসাহ পান না, আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
ড. অচিন্ত্য বিশ্বাস , কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর , ড. অনিলরঞ্জন বিশ্বাস , কবি অনিল সরকার , ড. পশুপতিপ্রসাদ মাহাতাে , ধূর্জটি নস্কর , নকুল মল্লিক প্রমুখ এমন কয়েকজন সাহিত্যিক ও প্রবন্ধকার – যাঁরা গােটা বাঙলা সাহিত্যের প্রথম সারির লেখকদের উচ্চস্তরে সাবলীল গতিতে ঘােরাফেরা করার ক্ষমতা রাখেন । অন্যদের (নবীনদের) লেখার সাথে , তাঁদের কেমন যেন মিল খায় না । নীচু থেকে টেনে তােলার চিন্তায় ঘাটতি পড়তে থাকে ; কেমন যেন এক ধরনের ভয় ঢোকে তাঁদের অন্তরে---নবীনরা ওদের নীচে টেনে ধরবে নাতাে! দলিত সাহিত্যের সংজ্ঞা যেন ধীরে ধীরে সংজ্ঞার শব্দগুলির মধ্যে বন্দি হতে থাকে , আর শিল্পগুণের চাহিদা ক্রমেই বেড়ে চলে । নিত্যনতুন আনাড়িরা আর ধার ঘেষতে ভরসা পান না –তাই দলিত সাহিত্য আর নতুন প্রাণের স্পর্শে চঞ্চল হয়ে ওঠে না।
‘চতুর্থ দুনিয়া' ভালাে আছে , নিয়মিত বেরােয় । বাঙলা দলিত সাহিত্য সংস্থা আছে , প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কলেজ স্ট্রীটে ভবানী দত্ত লেনের ২২ নম্বর স্টলের আড্ডায় হাজিরাও মন্দ নয় । কিন্তু নতুন তরুণ মুখ কম। ড. অচিন্ত্য বিশ্বাসের কফি হাউসের আড্ডায় যে প্রাণ ছিল , দাপাদাপি ছিল – তা কেমন যেন হারিয়ে গেছে অনেকটাই । হয়তাে অচিন্ত্য বিশ্বাসরাই কিছুটা পাল্টে নিয়েছেন নিজেদের! মােটকথা সবই আছে , সবাই আছেন ; কিন্তু দলিত সাহিত্য যে নিছক সাহিত্য নয় , তা হলাে এক গভীর ভাঙাগড়ার আন্দোলন , এই সত্যটাই সবাই যেন কেমন ভুলে যাচ্ছেন ! ব্রাহ্মণ্যবাদী সাহিত্যকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করার প্রবণতায় ধার কমছে । বিদ্রোহ করার মানসিকতায় জং ধরছে! ব্রাহ্মণ্যবাদী সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের বিরুদ্ধে আক্রমণের মেজাজ কেমন যেন হারিয়ে গেছে! তার বদলে ব্রাহ্মণ্যবাদী সাহিত্য - সংস্কৃতির সাথে মর্যাদা সহকারে সহাবস্থান ও সহযােগিতার নীতি ও পথ – উচিৎ বলে বিবেচিত হচ্ছে। লেখকরা বােধহয় বুঝতে শিখছেন — সংঘর্ষের পথ বড় কঠিন এবং দীর্ঘ । এই পথে প্রতিষ্ঠা প্রাপ্তির সম্ভাবনা কম।
রাশিয়ার বৈপ্লবিক প্রেক্ষাপটে সৃষ্টি হয়েছিল গাের্কির সাহিত্য-শিল্প সম্ভার । চীনের আগুনঝরা দিনগুলি জন্ম দিয়েছিল লু স্যুনকে । অশান্ত চিলি সৃষ্টি করেছিল পাবলো নেরুদাকে । ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবে বেড়ে ওঠেন সুকান্ত ভট্টাচার্য । আর ভারতবর্ষের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংগ্রাম; আর ইংরেজ বিরােধি সংগ্রামের প্রেরণায় নজরুল-রবীন্দ্রনাথের ঝরঝরে কলম থেমে থাকার অবকাশ পায়নি ।
সে সময়ে ঐসব দেশে লেনিন , মাও সেতুং ও আলেন্দেরা ছিলেন । কিন্তু ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি চূড়ান্ত ব্যর্থ । কমিউনিস্টরা এবং এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম , যুগপৎ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে দলিতদের সাথে । আজ দলিতদের নেতৃত্ব দিতে মহাত্মা জ্যোতিবা ফুলে , গুরুচাঁদ ঠাকুর , রামস্বামী পেরিয়ার , ড. আম্বেদকর অথবা মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের মত কোন নেতা নেই। এমনকি তাঁদের ছায়া খুঁজে পাওয়াও দুস্কর।। ফলে নেই তেমন কোন আন্দোলন ও মতাদর্শের অনুশীলন -- যার ছত্রছায়ায় লেখকেরা নিবিড়ভাবে লিখে যেতে পারেন।
আন্দোলনের ক্ষেত্রে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে । তাই গ্রাস করেছে হতাশা । হতাশা মানুষকে বিপথে ঠেলে দেয়--- যে বিপদের বীজ পুষ্ট হয়ে উঠেছে । এইসব দলিত লেখকদের তাই অনেক বেশি দায়িত্ব দিতে হবে । আন্দোলন গড়ে তােলার দায়িত্ব অনেকাংশে এইসব লেখকদেরই নিতে হবে , প্রয়ােজনে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে আন্দোলনে নেতৃত্ব করতে হবে - যে কাজ তারা মাত্র কিছুদিন আগেও করেছেন শিয়ালদহের খােলা চত্বরে । ড. অচিন্ত্য বিশ্বাস , ড. পশুপতিপ্রসাদ মাহাতাে, কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর , মনােহরমৌলি বিশ্বাস , ধূর্জটি নস্কর, নকুল মল্লিক , প্রমুখ এদের সে যোগ্যতা আছে । মনে হয় না , ইতিমধ্যে তাদের গ্রহণযােগ্যতা বেড়েছে বই কমেছে একটুও ।
নীতীশ বিশ্বাসের সমস্যা একটু আলাদা । যােগ্যতা ও ধৈর্য্য ধরে লেগেপড়ে থাকায় তিনি কারুর থেকে কম নন। বরং কিছু কিছু জায়গায় অন্যদের থেকে তিনি কিছুটা এগিয়ে । তা সত্ত্বেও বুঝতে হবে যে , তিনি চক্রব্যুহে আটকে পড়া একজন মানুষ । মনে হয় — দলিত চেতনা তাঁর মধ্যে পরিপূর্ণ বিকাশলাভ করার আগেই তিনি ভুল জায়গায় আটকে পড়েছেন । ফলে , বেরিয়ে আসতে তাঁর সময় লাগবে আরও কিছুদিন । তাঁকে বের করে আনার অবিরাম চেষ্টা জারি রাখতে হবে । মনে হয় 'প্রগতি সাহিত্য' চর্চা থেকে ক্রমেই তাঁর উত্তরণ ঘটছে 'দলিত সাহিত্য' চর্চার ক্ষেত্রে— যা খুবই আশাপ্রদ । কিন্তু ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার দোলাচলে একটা আশংকাও থাকে । দুই সাহিত্যের টানাপােড়েনে দলিত সাহিত্য ও সাহিত্যিকরা যেন ক্রমেই নিম্নাভিমুখী না হয়ে পড়েন! কেন জানি মনে হয় সেই অশনি সংকেত আজ আর শুধুই কল্পনার আকাশ ছেয়ে নেই।
'বহুজন নায়ক' পন্থিরা হলেন বহুকথিত সেই রাজার অতিভক্ত বাঁদর বন্ধুর মতাে – সে সজোরে মােটা লাঠি মেরে রাজার কপালের মাছি তাড়াতে চায়! বহুজনপন্থীদের আবেগ খুবই মূল্যবান, আকাঙ্খা সঠিক; কিন্তু ওরা আত্মঘাতী । বিচার বিশ্লেষণ বােঝেন না – শুধু এইটুকু বলা যথেষ্ট নয় । তাঁরা এমন একটা আবহাওয়া তৈরি করে চলেছেন , সেখানে যাঁরা যুক্তি ও বিচার বিশ্লেষণের উপর দাঁড়াতে চান , তাঁরা সন্ত্রস্ত । কাউকে মনুবাদীদের দালাল বা he is not our man বলে চিহ্নিত করতে এদের সময় লাগে না । এই চিন্তা ও কর্মপদ্ধতি আসলে ফ্যাসিবাদের ভিত্তি প্রস্তুত করে । তাই, আম্বেদকর মতাদর্শ এমন ভাবনা ও কাজকে নাকচ করে দেয় ।
নাট্যকার হিসাবে রাজু দাস হয়তাে অমল রায় নন ; কিন্তু রাজু দাসতাে রাজু দাসই । গ্রামে-শহরে , ঘাটে - মাঠে দলিত নাটক উপস্থাপনায় তাঁর জুড়ি কোথায় ? তুলনামূলকভাবে রাজু দাস অনেকের থেকে কম লেখাপড়া জানেন । জীবনযুদ্ধে টিঁকে থাকার জন্য ভ্যান রিক্সা চালিয়েছেন দীর্ঘকাল । বাঙলার অন্যতম সেরা দলিত নাট্যশিল্পী রিক্সাচালক সমীর দাসকে তিনি তুলে এনেছেন। এইসব অতি সাধারণ মানুষের সাথে একাত্ম হয়ে চলার এমন গুণ রাজু দাস ছাড়া , এই আন্দোলনে আর কাউকে দেখি না। জীবনের ঐ কঠিন সময়ের ‘গাছি ’ বন্ধুর সাথে দেখা করতে এখনও তিনি বর্ধমানের শেষ প্রান্তে ছুটে যান ।
মানুষ হিসাবে তিনি যত বড় , নাটক রচনায় হয়তাে ততটা নন । ড. আম্বেদকরের জীবন নিয়ে লেখা নাটকটিতে তিনি সংলাপে হয়তো একটি-দুটি ক্ষেত্রে এমনকি ফাউল পর্যন্ত করে বসেছেন! তবে রাজু দাস , অনেকের মতাে নিজেকে মহাজ্ঞানী মনে করেন না। – ত্রুটি ধরিয়ে দিতে পারলে , নিজেকে সংশােধন করতে রাজু দাসের সময় লাগে না । তিনি সবার কাছ থেকে শিখতে চান । তবে শেখার আগ্রহ থাকলে কী হবে ? শিক্ষকদেরও আগ্রহ থাকা জরুরি , নাহলে কাজ ঠিকমতাে এগােয় না । বাঙলা দলিত সাহিত্য সংস্থা এক্ষেত্রে কতটা শিক্ষকের ভূমিকা পালন করতে পারছে তা ঠিক বুঝি না ।
মনে হয় , নকুল মল্লিক সাধারণভাবে দলিত আন্দোলন এবং দলিত সাহিত্য সংস্কৃতির আন্দোলনে সব থেকে প্রবীণ । ডাঃ গুণধর বর্মণ ও এমন কয়েকজন হয়তাে আছেন , যাঁদের ডঃ আম্বেদকরের আন্দোলনের সাথে পরিচয় ঘটেছে আরও আগে । তবে ঐ পর্বের আন্দোলন ও প্রেক্ষিত অনেকটাই আলাদা । বর্তমানে যে পর্যায়ের মধ্য দিয়ে আমরা চলেছি , এখানকার আলােচনায় এই সময়কালকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে । নকুলবাবু খুবই ভালাে লেখেন । কিছুক্ষেত্রে তিনি যে কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর বা ড. অচিন্ত্য বিশ্বাসদের থেকে এগিয়ে – একথা বলতে কোনাে বাধা দেখি না । তাঁর সম্পর্ক অদল - বদলের সাথে , বহুজন নায়কের সাথে , ছিয়ানব্বই , নিখিল ভারত , আত্মনিরীক্ষণ , অধিকার , নির্ভীক সংবাদ , দলিত সাহিত্য সংস্থা (চতুর্থ দুনিয়া)---কার সাথে নয় ! কিন্তু তা সত্ত্বেও সবার সাথে আবার কেমন যেন একটু দূরত্ব । একটা ফাঁকা ফাঁকা ভাব । আমরা জানি তাঁর সৃষ্টি আরেকটি সাহিত্য সংস্থা আছে বা ছিল — যা বয়ঃজ্যেষ্ঠ। তাহলেও ‘বাঙলা দলিত সাহিত্য সংস্থা'র নিউক্লিয়াসের একজন কেন নন তিনি । হওয়া উচিৎ , তাতে আন্দোলন উপকৃত হবে । বাস্তবকে স্বীকার করে আমাদের মেনে নেওয়া উচিত যে, এখন 'বাঙলা দলিত সাহিত্য সংস্থা ’ দলিতদের সাহিত্য-সংস্কৃতি আন্দোলনের ‘মাদার অর্গানাইজেশন' । আর যাঁরা বড় কাজ এবং বড় সংস্থার কর্ণধার হবেন , তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গী হতে হবে আরও বেশি উদার । অমর বিশ্বাসের মতাে মানুষ যখন আছেন, তখন সমাজ নিশ্চয়ই ভরসা পেতে পারে । তবে অমরবাবুকে আরেকটু শক্ত হাতে হাল ধরতে হবে । প্রশাসক যদি প্রয়ােজনে শক্ত হাতে মুঠি না ধরেন, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাবার বিপদ থাকে। বিপদ যে এক্ষেত্রে নেই, তা বলা যাচ্ছে না।
সমাজ গণতন্ত্রী পার্টির শাসন ও নিয়ন্ত্রণের একটা কুপ্রভাব এ রাজ্যে পড়েছে । তাদের সাথে অতীত বা বর্তমান সম্পর্ক কমবেশি যাঁদের ছিল বা আছে , তাঁদের মধ্যে সংকীর্ণতা কোনো না কোনাে মাত্রায় থাকা অস্বাভাবিক নয় । ফলে , বিশেষ করে অমর বিশ্বাস যদি এ ব্যাপারে সচেতন না থাকেন , তাহলে নকুল মল্লিকের মতাে অন্যান্য আরও অভিমানী লােকজনকে একান্ত করে পাওয়া যাবে না । তাঁরা নিজের নিজের 'দলিত কণ্ঠ’- তেই বেশি মনােযােগ দেবেন ।
নকুল মল্লিক সােজা , সামনে তাকিয়ে চলার ভঙ্গীটি যদি পাল্টাতেন একটু , তাহলে বেশি ভাল হতাে । ডাইনে-বাঁয়ে কী ঘটছে , ঘটতে চলেছে, ঘাড় বাঁকিয়ে তাও একটু দেখা দরকার । প্রয়ােজনে গ্রহণ-বর্জন করাও জরুরি ।
বামফ্রন্টি বিধায়কদের সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে বাঙলা দলিত সাহিত্য সংস্থার কর্ণধারদের অংশগ্রহণের ফলে সংস্থার ক্ষতি হয়েছে । 'বহুজন নায়ক' পন্থিরা না থাকলে ক্ষতি হয়তো এতটা হতাে না । কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ground reality তাে মাথায় রাখতে হবে ।
অধ্যাপক বাসুদেব বর্মণ সংস্থার সভাপতি হয়েছেন । তাতে সংস্থা উপকৃত হয়নি , ক্ষতি হয়েছে । নীতীশ বিশ্বাস ও কবি অনিল সরকারদের সাথে ঘনিষ্ঠতার জন্য সংস্থার উপকার ও অপকার দুই-ই হয়ে চলেছে । বুঝতে হবে---চলমান ব্যবস্থায় সরকারি পুরস্কার ও স্বীকৃতির লক্ষ্য দলিত সাহিত্য-সংস্কৃতির আন্দোলন বিকশিত করার জন্য নয়।
সার সংক্ষেপ করে বলা যায় , সাহিত্যে শিল্প মাধুর্যের উপর ক্রমেই গুরুত্ব বৃদ্ধির ফলে এবং ক্ষমতাসীন সমাজ গণতন্ত্রিদের প্রতি নরম মনােভাব গ্রহণের জন্য , হয়তাে সংস্থা ও দলিত লেখকদের মধ্যকার কারুর কারুর আত্মপ্রতিষ্ঠা ও প্রচারের আলােয় আসার কিছু সুযােগ সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে ; কিন্তু তারফলে ব্রাহ্মণ্যবাদী সাহিত্য-সংস্কৃতিকে সম্পূর্ণভাবে নাকচ করার মানসিকতায় ধার কমতে বাধ্য । ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণার সৃষ্টি যদি না করা যায়, তাহলে ঐ ব্যবস্থাকে চুরমার করার মানুষ তৈরি হবে না । শুধুমাত্র সৃষ্টি করলেই তা বিকল্প হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না । দলিত বিকল্প প্রতিষ্ঠা হবে একমাত্র পুরনাে জরাজীর্ণ ও প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তা-চেতনা এবং এইসব কিছুর আঁধার ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যবস্থাকে উচ্ছেদের মধ্যদিয়ে ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন