মুসলমান সমাজ ও তিন তালাক

          মুসলমান সমাজ ও তিন তালাক 
(এই লেখাটি ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লেখা)
                  সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস

কোরানের বিষয়বস্তু হলো মানুষ এবং তার লক্ষ্য হলো মানব সমাজের কল্যাণ সাধন। কীসে মানুষের কল্যাণ হয় , আর কীসে অকল্যাণ হয় ; মানুষের কী করা উচিত,  কী করা উচিত নয় – এসবই অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে সাধারণ মানুষের জন্য সহজবোধ্যভাবে কোরানে আলােচনা করা হয়েছে । অন্যায়ের বিরুদ্ধে ও ন্যায়ের পক্ষে ; ঘৃণা ও অসাম্যের বিরুদ্ধে এবং শান্তি ও সাম্যের লক্ষ্যে কোরাণ এক শক্তিশালী দর্শন।

 শুধু কোরাণ বা ইসলাম ধর্ম নয়; বৌদ্ধ ধর্ম ও খৃষ্টান ধর্মের মতাে আন্তর্জাতিক ধর্মমত ও ধর্মীয় দর্শনেও অন্যায় , অত্যাচার , শােষণ , ঘৃণা ও অসাম্যের বিরুদ্ধে শান্তি, সাম্য , মৈত্রী ও সৌভ্রাতৃত্বের পক্ষে দৃঢ়মত পােষণ করা হয়েছে । মতুয়াধর্ম , শিখ , জৈন প্রভৃতি ধর্মের ঘােষণার মধ্যেও আপাত মিল খুঁজে পাওয়া যায় ।

 তুলনামূলক যথেষ্ট প্রাচীন হিন্দুধর্ম এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম । এই ধর্মের পরিকাঠামােয় রচিত বিভিন্ন শাস্ত্র এবং ধর্মগ্রন্থে বিভেদ , অন্যায় , নীতিহীনতা , ঘৃণা , অসাম্য ও পক্ষপাতিত্বের পক্ষে সওয়াল করা হয়েছে । স্বয়ং ভগবান এই অন্যায় , বিভেদ ও অসাম্যের জনক বলে দাবি জানাচ্ছে !

 বৌদ্ধধর্ম, খ্রিষ্টধর্ম ও ইসলাম –এই  তিনটি আন্তর্জাতিক ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে পৃথিবীর একই প্রান্তে – ভারত ও আরবসন্নিহিত ভুখণ্ডে ; মােটামুটি ৬০০ + ৬০০ বছরের ব্যবধানে । ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুধর্মের প্রভাবাধীন অঞ্চলে ঘৃণা ও অসাম্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ফল এইসব ধর্মমত। অত্যাচারিত , দলিত , ঘৃণিত , কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষগুলিকে প্রগতির পথে নিয়ে আসার লক্ষ্যে কিছু মহামানবের নেতৃত্বে যে ন্যায়নীতির সংগ্রাম/জেহাদ পরিচালিত হয়েছিল , তারই ফসল হিসাবে বিভিন্ন ধর্মমতের সৃষ্টি হয়েছে ।

 বয়ঃকনিষ্ঠ ইসলাম ধর্মের যেকোন নীতি-নির্দেশের ব্যাখ্যা ও ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে , তাই , আমাদের সব সময় মানুষের কল্যাণ ও প্রগতির বিষয়টি অগ্রাধিকার দিতে হবে । 

সাধারণ মানুষের ধারণা হলো--- তালাক ! তালাক ! তালাক!  শব্দটি তিনবার উচ্চারণ করাকেই তিন তালাক বলা হয় । অর্থাৎ শব্দটি এক মুহূর্তে তিনবার উচ্চারণ করলেই স্ত্রী বা স্বামী তালাকপ্রাপ্ত হন । কিন্তু কোরাণে তা বলা হয়নি । কোরাণের সুরা 'আল বাকারা ' - তে আয়াত নম্বর ২২৬ থেকে ২৩২ এর মধ্যে তালাক সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । কোরাণ তালাক দেওয়াকে মােটেই উৎসাহিত করেনি । বরং তালাক দেওয়াকে কোরাণ অনুচিত , খারাপ ও পাপকাজ বলে বিবেচনা করেছে । এমনকি তা আল্লাহর কাছে শাস্তিযােগ্য অপরাধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে । ইসলামের পবিত্র নবি হযরত মােহাম্মদও তালাক দেওয়াকে গভীর ঘৃণার সাথে পরিহার করেছেন এবং তার অনুগামীদের জোরের সাথে তালাক দেওয়া থেকে বিরত থাকতে উপদেশ দিয়েছেন ।

 কোরাণ তালাক অনুমােদন করে একমাত্র সেই ক্ষেত্রে , যখন দেখা যাবে কোনাে অবস্থাতেই স্বামী - স্ত্রী আর সুখে - শান্তিতে ও বিশ্বাসের সাথে বা ঈমানের সাথে একসঙ্গে বসবাস করার অবস্থায় নেই--- একমাত্র তখন স্বামী - স্ত্রী পরস্পরকে তালাক দিতে পারেন ।

 স্বামী - স্ত্রীর মধ্যে ভুল বােঝাবুঝি ও মনােমালিন্য যেমন হতে পারে , আবার তা মিটে যেতেও পারে । যারজন্যে কোরাণ প্রথম এবং দ্বিতীয়বার তালাকের পর পুনরায় স্বামী - স্ত্রী হিসাবে বসবাস করার ক্ষেত্রে কোনাে বিধি - নিষেধ আরােপ করেনি । বরং প্রথম এবং দ্বিতীয়বার তালাকের পর চারমাস অপেক্ষা করার জন্য ও আলাদা থাকার জন্য নির্দেশ জারি করেছে।  যাতে দূরে দূরে থেকে ইতিমধ্যে পারস্পরিক রাগ, মান-অভিমান ভুলে, মতবিরােধ ও ভুলের সংশােধন হয়ে , আবারও স্বামী-স্ত্রীরূপে বসবাস করার সুযােগ তৈরি হয় । যদি চারমাসের মধ্যে সম্পর্কের কোনাে উন্নতি না হয় , তাহলে কোরাণ স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক ছিন্ন করার অনুমতি দেয় ।

 এভাবে তালাক দেওয়ার পর, দু'বার নিজেদের সংশােধন করার সুযােগ থাকলেও ঐ স্বামী - স্ত্রী যদি তৃতীয়বার তালাক দেন বা তালাকপ্রাপ্ত হন , তাহলে আর মিমাংসার কোনাে সুযােগ কোরাণ রাখেনি । সম্ভবত , সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে , এই মিলন আর সম্ভব নয় । তবে , তৃতীয়বার তালাক পাওয়ার পর যদি স্বামী বা স্ত্রীর অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে থাকে এবং সেখানে তিনি তালাক পেয়ে থাকেন ; তাহলে তাদের পুনরায় বিয়ে করায় কোরাণ কোনাে বাধা দেয় না ।

কিছু মানুষ অনেক সময় মােহগ্রস্ত হয়ে নানা সুখস্বপ্ন দেখেন। কেউ কেউ ভাবেন--"ওপারেতে যত সুখ আমার বিশ্বাস"। কিন্তু দ্বিতীয় স্বামী বা স্ত্রীর সাথে ঘর করার পর অনেক সময় সে মােহ কেটে যেতেও পারে । সে ক্ষেত্রে প্রথম স্বামী-স্ত্রীর পুনরায় একসঙ্গে ঘর বাধার ইচ্ছায় বাধা হয়ে না দাঁড়াবার জন্যেই হয়তাে কোরাণের এই নির্দেশ ।

 তালাকের ক্ষেত্রে – বিয়েতে প্রদত্ত যৌতুক , উপহার ও সম্পদ – যাকিছু, তার অধিকারিণী হবেন স্ত্রী । এক্ষেত্রে কোরাণ সঠিকভাবে স্ত্রীর পক্ষে পক্ষপাতিত্ব করেছে । স্বামী - স্ত্রীর সম্পর্ক যদি খুবই তিক্ত হয় এবং সেক্ষেত্রে যদি স্বামী শুধুমাত্র কষ্ট দেবার জন্য স্ত্রীকে তালাক না দিয়ে আটকে রাখেন , তাহলে কোরাণ তাকে পাপ কাজ বলে বিবেচনা করে । এমনকি তালাক হয়ে যাবার পর, প্রাক্তন স্ত্রীর অন্য কোথাও বিয়ের ক্ষেত্রে কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করাকে কোরাণে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে । উল্লেখ করা প্রয়ােজন , কোরাণ স্ত্রীর পক্ষ থেকেও স্বামীকে তালাক দেওয়ার ব্যবস্থা বহাল রেখেছে।

 কিন্তু তালাক বিষয়টিকে বর্তমান মুসলমান সমাজ বহুক্ষেত্রে কোরাণ বর্ণিত ভাবাদর্শে গ্রহণ ও প্রয়ােগ করতে ব্যর্থ হয়েছে । তালাক নামের নীতি - নিয়ম  অনেকক্ষেত্রে মুসলমান নারীদের নির্যাতন ও অবিচার করার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে । এক ধরণের মৌলবী ও ধর্মব্যবসায়ীরা এই কুকাজের জন্য দায়ী।

ফলে , মুসলমানদের বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত নতুন আইন ও নীতি প্রণয়ণেরও প্রস্তাব উঠছে । 'অল ইণ্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বাের্ড'  দাবি করেছে যে , মুসলমান সমাজের জন্য আইন ও নীতি প্রণয়ণের অধিকারি তারাই এবং এ সম্পর্কে তারা যা ফতােয়া দেবেন , মুসলমান সমাজের কাছে তাই - ই আইন । এই বাের্ড তিন তালাক বন্ধের কথা এখনও ভাবছে না । কিন্তু মুসলমান সমাজের বহু বুদ্ধিজীবী ল' বাের্ডের এই দাবি মানতে রাজি নন । তাদের মতে ল' বাের্ড তৈরি হয়েছে মাত্র কয়েক দশক আগে । এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মৌলানা আবুল হাসান আলি নাগভী , যিনি আলি মিয়ান বলে বেশি পরিচিত ছিলেন । তিনি একজন অত্যন্ত জ্ঞানী মানুষ এবং দারুল উলুম দেওবন্দ-এর রেক্টর ছিলেন । ফলে , ল' বাের্ডের জন্ম থেকে সেখানে দেওবন্দিদের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায় । বেরিলীপন্থিরা ল' বাের্ডকে মান্যতা দিতে রাজি নন । ভারতের বহু শতাংশ সুন্নী মুসলমান বেরিলীপন্থিদের সাথে একাত্মতা বােধ করেন । 

এইসব মুসলমান বুদ্ধিজীবীরা মনে করেন , ইসলামিক ধর্মীয় আইন সৃষ্টির একমাত্র সূত্র এবং পথনির্দেশ করতে পারে কোরাণ এবং হাদিস । তারা কোরাণ এবং হাদিস নির্দেশিত পথে পার্লামেন্টে আইন প্রণয়ন বা সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ প্রয়ােজন বলে মনে করেন । তাদের কেউ কেউ মনে করেন – এই আইন প্রণয়নকালে কমপক্ষে নিম্নলিখিত ভাবধারার উলেমাদের সাথে আলােচনা করে ঐক্যমতে আসা প্রয়ােজন , যাতে মুসলমান সমাজের কাছে এই আইন গ্রহণযােগ্য হয়ে ওঠে । প্রতিষ্ঠানগুলি হলাে — ইসলামিক ফিক , হানাফিয়া , শাফি , মালিকী ও হমবালী [ আল - ই - হাদিস এবং জাফরি ( শিয়া ) ] । 

বস্তুতপক্ষে বেশ কয়েকটি নেতৃত্বদানকারি মুসলমান দেশ ইতিমধ্যে তিন তালাকের নীতিকে পরিবর্তন করে বিবাহ বিচ্ছেদের নতুন আইন ও নীতি প্রণয়ন করেছে । তিন তালাক নীতির ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় , প্রকৃতপক্ষে এই দেশে যে তিন তালাক নীতি আজও বলবৎ আছে , তা এদেশের কোর্টের আদেশ অনুসারেই। বৃটিশরা এদেশে আসার পর থেকে সমস্ত মুসলিম ব্যক্তিগত আইনকে বলা হতাে মহমেডান ল ’ এবং তা কোর্টের দ্বারা ঠিক হতাে । ১৯১৯ সালে রশিদ আহমেদ বনাম মিসেস আনিছা - র মধ্যে যে মামলা হয় , তার রায় হলাে , আজও দেশে বলবৎ থাকা তিন তালাকের নীতি ।

 ফলে , চলমান তিন তালাকের নীতি শুধুই ধর্মীয় ফতােয়া নয় , বৃটিশ কোর্টের প্রিভি কাউন্সিলের রায়ের দ্বারাই তিন তালাকের নীতি আইনসিদ্ধ হয় । ফলে , হয়তাে মুসলিম ল' বাের্ডের পুরাে ক্ষমতাই নেই এই আইনকে রদ করার । ভারতের সুপ্রীমকোর্ট , প্রিভি কাউন্সিলের রায় বদলাতে পারে বলে মনে হয় । ১৯৩৮ সালে কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে শরিয়ত আইন নিয়ে আলােচনা হয় । কিছু কিছু মুসলমান সদস্যের বক্তব্য ছিল – শরিয়তী আইনের আওতাভুক্ত সমস্ত কেস মুসলিম বিচারকের দ্বারা বিচার ও রায়দান করতে হবে । কিন্তু মুসলিম লীগ নেতা মােহাম্মদ আলী জিন্নাহ এই মতের তীব্র বিরােধিতা করেন । ফলে , এ জাতীয় কোন নির্দেশ শরিয়তী আইনে অন্তর্ভুক্ত হয় না । 
               (শেষ)

( ভারতীয় সমাজে , বিশেষ করে হিন্দুদের মধ্যে তালাক সম্পর্কে এক ধরনের ভুল ধারণা আছে । তাঁরা জানেন যে, তালাক ! তালাক ! তালাক ! ---শব্দটি তিনবার এক নিঃশ্বাসে উচ্চারণ করলেই স্বামী স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় । – এই ভুল ধারণাকে মুসলমান এবং ইসলামের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াবার কাজে ব্যবহার করা হয়। মূলতঃ হিন্দু সমাজের মানুষকে তালাক সম্পর্কে একটা সাধারণ ধারণা দেবার লক্ষ্যে এই প্রতিবেদন লেখা )

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

তৃণমূল নেত্রী ফের সংসদে

যদা যদা হি ধর্মস্য... গীতার এই শ্লোকে ঠিক কী বলা হয়েছে?

ভাতে কেরোসিন যাত্রাপুরে, অভিযোগ বাংলাদেশী