ভারতভাগ ও যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল
ভারতভাগ ও যােগেন্দ্রনাথ মণ্ডল
সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস
ভারতভাগের জন্য দায়ী কে ? – যদি এই প্রশ্ন করা হয় , তাহলে নমোদের এক বড় অংশ উত্তরে বলবেন যে , ভারতভাগের জন্য দায়ী হলেন যােগেন্দ্রনাথ মণ্ডল । বলাই বাহুল্য যে , ভারতভাগ মানে তাদের কাছে খুব খারাপ কাজ ।
আমি অন্যদের ছেড়ে শুধু নমােদের কথা বলছি এই জন্য যে , যােগেন্দ্রনাথ ছিলেন নিজে নমাে – তাঁকে নিন্দা - মন্দ বলা এইসব নমোদের নিজের জাতের মানুষ। এই কথা তােলা বা বলা আরও এই কারণে যে , দেশভাগের ইতিহাস ও তার কার্যকারণ সম্পর্কে এই নমাে জাতের মানুষ তখন পর্যন্ত আর প্রায় কিছুই জানতেন না, শুধু জানতেন যােগেন মণ্ডল দেশভাগ করেছেন ; আর দেশভাগের জন্য নমোদের দুর্ভোগের কারণ একমাত্র তিনি!
এইসব উদ্দেশ্যপ্রণােদিত প্রচার করা হয় , ভুল ধারণা গড়ে দেওয়া হয় ; আর আজ পর্যন্ত সেই ভুল ও মিথ্যা ধারণার খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি । দেশভাগ সম্পর্কে আর বিশেষ কিছুই নমােরা জানতে পারলেন না , শুধু নিজেদের নেতার দুর্নামটুকু ছাড়া!---এটা কীভাবে সম্ভব? এটা তখনই সম্ভব হয় , যদি সেই নেতা সত্যিই সাংঘাতিক কোন গর্হিত কাজ করেন ; অথবা তা সম্ভব হয়---যদি, কোন বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে কেউ বা কোন গােষ্ঠী ও পক্ষ এই কুৎসা প্রচার করেন । আমরা এই প্রবন্ধে দেশভাগের ইতিহাস নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলােচনা করবাে এবং তাতে যােগেন্দ্রনাথের ভূমিকা কী এবং কতটা ছিল , তা বােঝার চেষ্টা করবাে ।
আমাদের দেশ ভারতবর্ষ বিভাজনের কারণ হল--- সম্প্রদায়গত সমস্যা । আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষের অধিকার ও দাবি সমূহের সুষ্ঠু মীমাংসার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা । বিশেষ করে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে বিভিন্ন প্রশ্নে মতৈক্যে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে ব্যর্থতার কারণে দেশভাগ হয় ।
দেশভাগের আগে ১৫/২০ বছর ধরে দেশের মধ্যে মােটামুটিভাবে চারটি শক্তির মধ্যে স্বার্থ , অধিকার ও দাবিদাওয়া নিয়ে টানাপােড়েন শুরু হয় । পক্ষগুলি হলাে---হিন্দু , মুসলমান , অনুন্নতশ্রেণী (তফসিলীশ্রেণী) এবং শিখদের শক্তি ও সংগঠন । দ্বন্দ্ব যেমন ছিল ব্রিটিশের সাথে ভারতীয়দের ; একইসাথে ভারতীয়দের মধ্যকার এইসব বিভিন্ন পক্ষ, অংশ ও শ্রেণির মধ্যে স্বার্থের টানাপােড়েন চলে । আলোচনার টেবিলে বসে ভারতীয়দের মধ্যকার স্বার্থ ও দ্বন্দ্বের সুষ্ঠু মীমাংসা করতে না পারার কারণে দেশভাগ হয়ে যায় ।
দেশে শিখদের সংখ্যা তুলনায় অনেক কম হলেও, চেতনা ও সংঘশক্তিতে তারা ওই সময়ের ৮ কোটি অনুন্নতশ্রেণীর মানুষের তুলনায় খানিকটা এগিয়ে ছিলেন । মূলতঃ হিন্দুদের সংগঠন কংগ্রেস অনেক বেশি শক্তিশালী হলেও , মুসলমানদের সংগঠন মুসলিম লীগেরও যথেষ্ট শক্তি ছিল , প্রতিপক্ষের সাথে লড়াই করার জন্য তারা সক্ষম ছিলেন । এই সমীকরণ থেকেই বােঝা যায় – দেশভাগ হয় মূলতঃ কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের স্বার্থের সংঘাতে । তারাই ছিলেন নিয়ামক ভূমিকায় ; আর অনুন্নতশ্রেণীর রাজনৈতিক সংগঠন তফসিলী ফেডারেশন এবং শিখ শক্তির ভূমিকা ছিল গৌণ – যদিও কংগ্রেসের বাইরে শিখদের তেমন কোন আলাদা ভূমিকা ছিল না । শিখ নেতারা কংগ্রেসের সাথে পারস্পরিক সহযােগিতার মধ্য দিয়ে চলেছিলেন।
তাই , ভারতবর্ষের তৎকালীন রাজনৈতিক ঘটনাবলীর যা কিছু ভালো, তার মূল কৃতিত্ব যেমন তফসিলী ফেডারেশন দাবি করতে পারে না ; তেমনি যা কিছু খারাপ তারও দায়ভাগ তফসিলী ফেডারেশন ও তার নেতৃবৃন্দের উপর চাপানাে যায় না । তাছাড়া তফসিলী ফেডারেশনের সর্বভারতীয় নেতা ছিলেন ড . আম্বেদকর; আর যােগেন্দ্রনাথ ছিলেন তফসিলি ফেডারেশনের বাংলার সভাপতি ও নেতা । সেজন্য ভাল কোনকিছুর জন্য যােগেন্দ্রনাথ বিশেষ কৃতিত্ব যেমন দাবি করতে পারেন না ; খারাপ কোন কিছুর জন্য তাঁকে বিশেষভাবে দোষী এবং দায়ীও করা যায় না । কিন্তু বাস্তবতঃ যােগেন্দ্রনাথকে দেশভাগের জন্য দায়ী করা হয়ে থাকে ।
ড . আম্বেদকর ছিলেন তফসিলী ফেডারেশন ও অনুন্নতশ্রেণীর অবিসংবাদিত নেতা । তিনি ১৯৪০ সালেই একটি বই লেখেন। বইটির নাম 'পাকিস্তান অথবা ভারত বিভাগ' । সেই বইয়ে তিনি প্রমাণ করেন যে, পাকিস্তানের দাবি অযৌক্তিক---তা মুসলমানদের কোন সমস্যার সমাধান না করে ; বরং তাদের সমস্যা বাড়িয়ে তুলবে । ধরে নেওয়া যেতে পারে সেটাই ছিল তফসিলী ফেডারেশনের রাজনৈতিক অবস্থান । আর এই ভারতভাগের প্রশ্নে যােগেন্দ্রনাথের সুস্পষ্ট মতামত আমরা জেনে নেব আর.এস.এস ও বিজেপি নেতা তথাগত রায়ের লেখা 'যা ছিল আমার দেশ' বইয়ে অনুবাদ করে প্রকাশিত যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের পদত্যাগপত্র থেকে। তথাগত রায় তাঁর এই বইয়ের ৩১২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, “ আমি ( যােগেন্দ্রনাথ মন্ডল ) সত্যিই বিশ্বাস করতাম যে, ভারতে মুসলিমদের ক্ষুব্ধ হবার সঙ্গত কারণ আছে । কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার মত ছিল যে, পাকিস্তান সৃষ্টি কখনােই সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান করতে পারবে না । তার পরিবর্তে সাম্প্রদায়িক হিংসা ও তিক্ততার সৃষ্টি হবে । দেশভাগ হলে দুটি অংশের মেহনতি মানুষেরই দারিদ্র , নিরক্ষরতা এবং দুর্দশা আরও প্রলম্বিত হবে , এমনকি চিরস্থায়ীও হতে পারে । উপরন্তু আমি বলেছিলাম যে, পাকিস্তান হয়তাে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম দরিদ্র ও অনুন্নত দেশ হয়ে দাঁড়াবে ”।
তথাগত রায় যোগেন্দ্রনাথের পদত্যাগপত্র অনুবাদ করে তাঁর বইয়ের পরের পৃষ্ঠায় লিখেছেন, "একথাও বলা প্রয়োজন যে, আমি (যোগেন্দ্রনাথ) বাংলা বিভাজনের বিপক্ষে ছিলাম। এই ব্যাপারে প্রচার করতে গিয়ে আমি শুধু প্রচন্ড বিরোধিতার সম্মুখীন হই নি, সঙ্গে পেয়েছি অকথ্য গালাগালি, অপমান ও অসম্মান"
....(যা ছিল আমার দেশ, পৃষ্টা ৩১৩)।
১৯১৯ সালের 'ভারত শাসন আইন' পুনর্বার সংস্কার করে 'নতুন ভারত শাসন আইন' তৈরি করার জন্য সাইমন কমিশন ভারতে আসে দু'বার । প্রথমবার ১৯২৮ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয়বার ১৯২৮-২৯ সালে । কংগ্রেস সাইমন কমিশন বয়কট করে , নির্যাতিতশ্রেণী (প্রতিনিধি ড . আম্বেদকর) এই সাইমন কমিশনের সাথে সহযােগিতা করেন । ১৯৩০ , ১৯৩১ এবং ১৯৩২ সাল– এই তিন বছরে তিনটি গােলটেবিল বৈঠক হয় লন্ডনে। এই বৈঠকে সম্প্রদায়গত অধিকার ও সুযােগ - সুবিধার ক্ষেত্রে নির্যাতিতশ্রেণীর স্বার্থের মূল বিরােধী পক্ষের ভূমিকা পালন করে কংগ্রেস , যা আসলে কংগ্রেসের বকলমে উচ্চবর্ণ হিন্দুশ্রেণী এই বিরোধিতা করেন। আর এই বৈঠকে বহুক্ষেত্রে মুসলিম লীগ ও মুসলিম সমাজ নির্যাতিতশ্রেণীর অধিকার ও দাবির পক্ষে দাঁড়ায় ।
ভােটাধিকার সংক্রান্ত লােথিয়ান কমিটি ভারতে আসে ১৯৩২ সালের একেবারে শুরুতে । ভোটাধিকার প্রশ্নেও কংগ্রেস নির্যাতিতশ্রেণীর স্বার্থের বিরােধিতা করে---যাতে নির্যাতিতশ্রেণীর অধিকাংশ মানুষ ভােটাধিকার না পান তার চেষ্টা করে কংগ্রেস ।
১৯৩২ সালের ১৪ ই আগস্ট সম্প্রদায়গত রােয়েদাদ ঘোষিত হয় অর্থাৎ সম্প্রদায়গুলির পৃথক পৃথক অধিকার কী কী হবে সে সম্পর্কে ঘােষণা করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রি ম্যাকডােনাল্ড । এই ঘোষণায় নির্যাতিতশ্রেণীর জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার অধিকার দেওয়া হয় ঐ রােয়েদাদে বা ঘোষণায়। অর্থাৎ নির্যাতিত মানুষের প্রতিনিধি শুধুমাত্র নির্যাতিতদের ভোটে নির্বাচনের অধিকার। নির্যাতিতশ্রেণীকে ছাড়াও পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার অধিকার দেওয়া হয় মুসলমান , শিখ , এ্যাংলাে ইন্ডিয়ান – এমন অনেক সম্প্রদায়কেও । কিন্তু দেখা গেল--- মিঃ গান্ধী এবং কংগ্রেস শুধুমাত্র নির্যাতিতশ্রেণীর জন্য ঘোষিত এই অধিকারের বিরােধিতা করেন । মিঃ গান্ধী পুণায় আমরণ অনশন শুরু করেন এই পৃথক নির্বাচনের অধিকার থেকে নির্যাতিতশ্রেণীকে বঞ্চিত করার জন্য এবং নির্যাতিতশ্রেণীর এই গুরুত্বপূর্ণ অধিকার তিনি কেড়ে নিতে সক্ষম হন। মি: গান্ধী বহুবার অনশন আন্দোলন করেছেন কিন্তু তারমধ্যে আমরণ অনশনের কথা ঘোষণা করেছিলেন মাত্র এই একবার, তা ছিল নির্যাতিত মানুষের অধিকার কেড়ে নেবার জন্য!
স্বাধীন ভারতের সংবিধান তৈরির জন্য গণপরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ড . আম্বেদকরকে গণপরিষদে ঢুকতে না দেবার জন্য কংগ্রেস সর্বস্ব পণ করে লড়াই করে – যাতে নির্যাতিতশ্রেণীর অধিকারের কথা বলার জন্য সংবিধানসভায় বা গণপরিষদে কোন যােগ্য নেতা না থাকেন । ১৯৩০ সালের পূর্ব পর্যন্ত নির্যাতিতশ্রেণীর মানুষকে হিন্দু হিসাবে গন্য করা হতো না, জনগণনায় তাঁদের হিন্দুদের বাইরে আলাদা জনগোষ্ঠী বলে গণনা করা হতো। কিন্তু এই সময়কালে গান্ধী ও কংগ্রেস নির্যাতিতশ্রেণীকে হিন্দু বলে দাবি করেছেন ঠিকই এবং একইসাথে নির্যাতিতশ্রেণীর স্বার্থের প্রতিটি ক্ষেত্রে কংগ্রেস , মিঃ গান্ধী ও উচ্চবর্ণ হিন্দুশ্রেণী বিরােধিতা করে চলেন !
এসব কিছু ছাড়াও সামাজিক ক্ষেত্রে মাহাদ সত্যাগ্রহ , মন্দিরে প্রবেশের অধিকার আদায়ের আন্দোলন , নির্যাতিতশ্রেণীর শিক্ষার অধিকার অর্জনের চেষ্টা । –এসব প্রতিটি ক্ষেত্রে বাধার প্রাচীর তুলে দাঁড়িয়েছে উচ্চবর্ণ হিন্দুশ্রেণী ও তাদের সংগঠন কংগ্রেস । এইসব কি নির্যাতিতশ্রেণীর নেতৃবৃন্দ ও জনগণের শত্রু - মিত্র চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উপাদান নয় ? নির্যাতিতশ্রেণীর নেতৃবৃন্দের কর্তব্য স্থির করার জন্য প্রয়ােজনীয় দিগনির্দেশনা নয় ? ---বাস্তবত উচ্চবর্ণ হিন্দু নেতৃবৃন্দ এভাবে নির্যাতিতশ্রেণীর চলার পথ উচ্চবর্ন হিন্দুদের থেকে আলাদা করে দেন ।
এ অবস্থায় যে কেউ ভাবতে পারেন যে , দেশভাগ প্রশ্নেও উচ্চবর্ণ হিন্দু এবং নির্যাতিতশ্রেণী হয়তো পরস্পর বিরােধী ভূমিকা বা সিদ্ধান্ত নেবে বা নিয়েছিল। বাস্তবত তাঁদের পক্ষে সেই রকম সিদ্ধান্ত নেওয়াই স্বাভাবিক নয় কি? কিন্তু সত্য এবং তথ্য হলাে এই যে , তফসিলী ফেডারেশন ; অর্থাৎ ড. আম্বেদকর বা যােগেন্দ্রনাথ দেশভাগ প্রশ্নে অন্যরকম অর্থাৎ অন্যান্য হিন্দুদের থেকে আলাদা কোন সিদ্ধান্ত নেবার কথা ভাবেন নি, আম্বেদকর ও যোগেন্দ্রনাথ দেশভাগ চান নি।। তবে ইতিহাস হলো এই যে, ইংরেজ সরকার ও কংগ্রেস, এমনকি ড.আম্বেদকর বা যোগেন্দ্রনাথকে দেশভাগ প্রশ্নে তাঁদের মতামত জানাবার কোন সুযোগই দেননি, তাঁদের দেশভাগ অথবা দেশ বিভাজন নয়, এসব সম্পৰ্কীয় আলোচনা সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয় না।
দেশভাগ বা স্বাধীনতা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ আলােচনায় নির্যাতিতশ্রেণীর মধ্যকার কাউকে আমন্ত্রণ জানানাে হয়নি । কারণ হিসাবে বলা হয়--- ১৯৪৫-৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে তফসিলী ফেডারেশন দলের শােচনীয় ফল। তাছাড়াও নির্যাতিতশ্রেণীর (তফসিলীশ্রেণী) কোন প্রতিনিধিকে আলোচনা সভায় আমন্ত্রণ জানানাের প্রশ্নে কংগ্রেসের বিরােধিতা ছিল আর এক বড় কারণ।
১৯৪৫-৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে তফসিলি ফেডারেশন দলের হয়ে সারাভারতে একমাত্র যােগেন্দ্রনাথ জয়মুক্ত হতে পেরেছিলেন । এমনকি ড. আম্বেদকর নিজেও হেরে যান । এই ফলাফলকে অজুহাত করে ব্রিটিশ সরকার কংগ্রেসের বিরোধিতা মেনে নির্যাতিতশ্রেণীর কোন প্রতিনিধিকে ঐসব আলোচনায় আমন্ত্রণ জানায়নি , তাদের কোন গুরুত্ব দেয়নি ।
তবু কংগ্রেস যখন দেশভাগ মেনে নেয় , নির্যাতিতশ্রেণীর নেতা , বিশেষ করে যােগেন্দ্রনাথ দেশভাগ ও বাংলাভাগের বিরুদ্ধে সীমিত সামর্থ নিয়েও রুখে দাঁড়ান, কংগ্রেসীদের দেশভাগ মেনে নেবার সিদ্ধান্তের বিরােধিতা করেন ।
এখানে আমরা সেই সময়ের কিছু ঘটনা ও তথ্যের উল্লেখ করবাে । এই প্রসঙ্গে বুঝতে হবে যে , অবস্থানগত কারণে , বিশেষ করে বাংলাপ্রদেশ ভাগের কারণে যােগেন্দ্রনাথ অনেক বেশি কঠিন পরিস্থিতির মুখােমুখি হন --- যে সমস্যা ড .আম্বেদকরকে মােকাবিলা করতে হয়নি । ১৯৪৭ সালে দেশের স্বাধীনতা এবং ভারতভাগ একসূত্রে গাঁথা । এই দেশভাগ প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায় শুরু হয় ক্যাবিনেট মিশনের ভারতে আগমন ও তাদের পেশকৃত প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে । ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রি মিঃ এটলি লন্ডন থেকে তাঁর মন্ত্রিসভার (ক্যাবিনেটের) তিনজন মন্ত্রির এক কমিটি বা কমিশন / মিশন ভারতে পাঠান । ঐ তিনজন হলেন – স্যার স্টাফোর্ড ক্রিপস , এ.ভি, আলেকজান্ডার এবং লর্ড পেথিক লরেন্স । তাঁরা ১৯৪৬ সালের ২৪ শে মার্চ নতুন দিল্লীতে পৌঁছান। দিল্লীতে এসে তাঁরা স্বাধীনতা ও তার জন্য শর্তাদি নিয়ে আলােচনার জন্য রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে মিলিত হন , সেটাই ক্যাবিনেট মিশনের প্রথম বৈঠক । এই বৈঠকে ভারতীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যকার পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু , সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল , মােহম্মদ আলি জিন্নাহ , ড .শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী , মৌলানা আবুল কালাম আজাদ , ভুপালের নবাব এবং মিঃ করমচাঁদ গান্ধী আমন্ত্রণ পান । ঐ সভায় কংগ্রেসকে নেতৃত্ব করেন মৌলানা আবুল কালাম আজাদ , মুসলিম লীগের পক্ষে নেতৃত্ব করেন মহম্মদ আলি জিন্নাহ এবং নবাব ও রাজন্যবর্গের প্রতিনিধিত্ব করেন ভুপালের নবাব – এই তিনজন মুসলমান নেতা । মিঃ গান্ধী ও কংগ্রেসের আপত্তির কারণে ওই বৈঠকে কোন নির্যাতিতশ্রেণীর প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানাে হয় না ।
এই অবস্থায় ১৯৪৬ সালের ২ রা এপ্রিল দিল্লীতে তফসিলী ফেডারেশনের সভা অনুষ্ঠিত হয় । বাংলা থেকে যােগেন্দ্রনাথ মন্ডল এবং অমূল্যধন রায় ঐ সভায় অংশগ্রহণ করেন । ঐ সভায় নির্যাতিতশ্রেণীর অধিকার ও দাবি সম্বলিত একটি স্মারকলিপি ক্যাবিনেট মিশনের কাছে পেশ করার সিদ্ধান্ত হয় । স্মারকলিপিতে দেশের ঐক্য ও স্বাধীনতার দাবি করা হয়, ভারতভাগের বিরোধিতা করা হয় এবং একই সাথে ৮ কোটি (ওই সময়ের মোট নির্যাতিতশ্রেনী) নির্যাতিতশ্রেণীর মানুষের অধিকার সুরক্ষিত করার জন্য রক্ষাকবচ দাবি করা হয়। উচ্চবর্ণ হিন্দুর মানবতাবিরােধী ভূমিকার উল্লেখ করে, নির্যাতিতশ্রেণীর ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার তাদের নিজেদের স্থির করার দায়িত্ব অর্পণের কথা বলা হয় । আর অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মতোই অনুন্নতশ্রেণীর জন্য স্বতন্ত্র/পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা দাবি করা হয়। চাকরি , শিক্ষা ও শাসন পরিষদে পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্বের জন্য রক্ষাকবচ দান ও তাদের জন্য স্বতন্ত্র পল্লী গঠন করা প্রভৃতি দাবি করা হয়। এই সভার পর তফসিলি ফেডারেশনের তরফে ক্যাবিনেট মিশনের কাছে সাক্ষাৎকার চেয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়।
ক্যাবিনেট মিশন ৫ ই মে , ১৯৪৬ তারিখে ৮ কোটি নির্যাতিতশ্রেণীর প্রতিনিধি হিসাবে ড . আম্বেদকরকে ক্যাবিনেট মিশনের সাথে সাক্ষাৎ করার সুযােগ দেন (এটা কোন অর্থেই আলােচনা সভা / বৈঠক নয় ) । তিনি ক্যাবিনেট মিশনের সাথে দেখা করে স্মারকলিপি দেন এবং এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে নির্যাতিতশ্রেণীর দাবিসমূহের সমর্থনে ব্যাখ্যা করেন । দিল্লীর বড়লাট ভবনে এই বৈঠক হয়।
১৫ ই মে ( মতান্তরে ১৬ ই মে ), ১৯৪৬ তারিখ সন্ধ্যায়
ক্যাবিনেট মিশন এবং ভারতের বড়লাটের পক্ষ থেকে স্বাধীন ভারতের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ঘােষণা করা হয় । যার মূল কথা হলাে – গােটা ব্রিটিশ ভারত এবং বিভিন্ন দেশীয় রাজ্যসমুহ (রাজা , মহারাজা ও নবাব-বাহাদুরদের ছােট ছােট রাজ্যসমুহ ) নিয়ে একটি স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ ভারত ( ইউনিয়ন ) তৈরি হবে, দেশভাগ হবে না ।--- যেখানে কেন্দ্রের হাতে থাকবে শুধুমাত্র পররাষ্ট্র বিষয় , প্রতিরক্ষা এবং যােগাযােগ ব্যবস্থার দায়িত্ব । আর বাকি সবক্ষেত্রে রাজ্যগুলির স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার থাকবে ।
ওই প্রস্তাবে গােটা দেশকে তিনটি গ্রুপ বা বিভাগে ভাগ করার কথা বলা হয় । তিনটি বিভাগের মধ্যে দুটি বিভাগ মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা ; অন্য বিভাগ হলো হিন্দুসংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা। তিনটি বিভাগের মধ্যে দ্বিতীয় বিভাগে থাকে পাঞ্জাব , সিন্ধু ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ। এখানে সংবিধান প্রণয়নের জন্য যে গণপরিষদ গঠন করা হবে তার সদস্যসংখ্যা থাকবে (নির্বাচিত হবেন) ৩৫ জন। এই ৩৫ জনের মধ্যে সাধারণশ্রেণীর সদস্য ৯ জন + শিখ ৪ জন + মুসলমান ২২ জন। আর তৃতীয় বিভাগ হলো বাংলা ও অসম প্রদেশ নিয়ে। এখানে বাংলাপ্রদেশ থেকে গণপরিষদ সদস্য সংখ্যা নির্বাচিত হবেন মোট ৬০ জন। তার মধ্যে সাধারণশ্রেণীর ২৭ জন + মুসলমান ৩৩ জন এবং অসমে ১০ জন গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হবেন। তার মধ্যে সাধারণশ্রেণীর ৭ জন + মুসলমান ৩ জন ) । এই দুই গ্রুপে মুসলমান মানুষের সংখ্যা বেশি।
ভারতের বাকি সব অংশ নিয়ে প্রথম বিভাগ বা গ্রুপ তৈরি হবে। এই প্রথম বিভাগে গণপরিষদ সদস্য সংখ্যা নির্বাচিত হবেন মোট ১৮৭ জন। তার মধ্যে ১৬৭ জন সাধারণশ্রেণীর + ২০ জন মুসলিম সদস্য নির্বাচিত হবেন।
এইভাবে এবং এই হারে নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্যবৃন্দ দেশের শাসনতন্ত্র বা সংবিধান রচনা করবেন । ফলে এই গণপরিষদ সদস্য নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয় । প্রাথমিকভাবে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ ক্যাবিনেট মিশনের এই প্রস্তাব গ্রহণযােগ্য বলে ঘােষণা করে । ফলে দেশভাগের বিপদ কেটে গেল বলে সবার মনে ধারণা জন্মায় । লক্ষ্য করার বিষয় ক্যাবিনেট মিশনের এই ঘােষণায় নির্যাতিতশ্রেণীর কোন দাবি মানা হয় না ও তাদের জন্য কোন বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয় না । ফলে , তাদের আলাদা অস্তিত্বের বিলােপ ঘটার আশঙ্কা দেখা দেয় ।
এই অবস্থায় নির্যাতিতশ্রেণীর মধ্যে ঐক্যের প্রয়ােজন বিশেষভাবে অনুভূত হয় এবং মরণপণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া তাদের জন্য আর কোন বিকল্প পথ খােলা থাকে না । ক্যাবিনেট মিশনের এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে এবং নির্যাতিতশ্রেণীর দাবি মেনে নেবার জন্য তফসিলী ফেডারেশনের নেতৃত্বে ১৫ ই আগস্ট , ১৯৪৬ তারিখে কলকাতায় বিশাল মিছিল হয় । খুলনা , পিরােজপুর , গােপালগঞ্জ , বাগেরহাট , যশোর জেলার পণ্ডিতপুর প্রভৃতি জায়গায় হাজার হাজার মানুষ তফসিলী ফেডারেশনের নেতৃত্বে মিটিং - মিছিলে সামিল হন । মহারাষ্ট্রের পুণায় ২০০ জন আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করে কংগ্রেস সরকার । জনতার মাঝে পুলিশঘােড়া ছুটিয়ে দিয়ে বহু মানুষকে হতাহত করে । এভাবে ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলতে থাকে । তবুও বলা যায়---যােগেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে বাংলায় আন্দোলনে যতটুকু গতি আনা সম্ভব হয় , মহারাষ্ট্র ছাড়া দেশের আর কোন প্রান্তে তা তেমন ছাপ ফেলতে পারে না । এই অবস্থায় নেতৃত্ব অনেকটাই অসহায়বােধ করেন ।
বাংলায় সেই সময়কালে নির্যাতিতশ্রেণীর দুটি সংগঠন ছিল । বঙ্গীয় প্রাদেশিক তফসিলী জাতি ফেডারেশন এবং তফসিলী এ্যাসােসিয়েশন । একটির নেতা যােগেন্দ্রনাথ ; অপরটির নেতা ছিলেন মুকুন্দবিহারী মল্লিক । রাজনৈতিক আকাশে তখন দুর্যোগের ঘনঘটা। ক্যাবিনেট মিশন নির্যাতিতদের কোন হিসাবে আনতেই রাজি নয়। সেই কঠিন অবস্থায় ৮ ই জুন বঙ্গীয় নমঃশূদ্র সমিতির উদ্যোগে আলােচিত দুটি সংগঠনের এক যৌথসভা অনুষ্ঠিত হয় ১১ নং চিংড়িঘাটায় । ঐ সভায় তফসিলী ফেডারেশনের পতাকাতলে দাঁড়িয়ে ঐক্যবদ্ধ লড়াই করার শপথ গ্রহণ করেন সমস্ত নেতাকর্মীগণ । এ্যাসােসিয়েশনের অধিকাংশ নেতা - কর্মী ঐ সভায় হাজির ছিলেন; কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে মুকুন্দবিহারী মল্লিক অনুপস্থিত থাকেন ।
এই সময়কালে ১৯৪৬ সালের ১৯ শে জুলাই যােগেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে বাংলার অনুন্নতশ্রেণীর (তফসিলীশ্রেণী ) চেষ্টায় এবং মুসলিম মন্ত্রিসভার সহযােগিতায় ড . আম্বেদকর বাংলা থেকে গণপরিষদে নির্বাচিত হন এবং আরও তিনমাস পর ১৯৪৬ সালের ১ লা নভেম্বর যােগেন্দ্রনাথ ভারতের অন্তর্বর্তী সরকারের আইনমন্ত্রী হিসাবে কার্যভার গ্রহণ করেন । নির্যাতিতশ্রেণীর নিজেদের মধ্যে ইতিমধ্যে ঐক্য স্থাপিত হওয়ায় এবং গণপরিষদে ড.আম্বেদকর নির্বাচিত হওয়ায় ও যোগেন্দ্রনাথের মন্ত্রী হওয়ার কারণে ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অনুন্নতশ্রেণীর আন্দোলন বাংলায় যথেষ্ট গতি পায় ।
১৯৪৫ সালের মে মাসে বড়লাট লর্ড ওয়াভেল সিমলাতে একটা সর্বদলীয় বৈঠক ডেকেছিলেন । তফসিলী ফেডারেশনের সভাপতি এন. শিবরাজ ঐ সভায় অংশগ্রহণ করেন । সেইসভায় স্থির হয় যে , অনুন্নতশ্রেণীর মানুষকে সংখ্যালঘুশ্রেণীর মানুষ হিসাবে ধরা হবে এবং সেমত রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক সুযােগ - সুবিধা দেওয়া হবে । ঐ সভায় আরো স্থির হয় যে , শাসন পরিষদে অনুন্নতশ্রেণীর ২ জন মন্ত্রি নেওয়া হবে ।
কিন্তু ১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসে যখন ভারতের অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভা গঠন করা হয় , তখন প্রকৃতপক্ষে নির্যাতিতশ্রেণীর কোন প্রতিনিধিকে মন্ত্রি করা হয় না । জগজীবন রামকে মন্ত্রি করা হয় ঠিকই ; কিন্তু তিনি ছিলেন কংগ্রেসের প্রতিনিধি , অনুন্নতশ্রেণী বা তফসিলী ফেডারেশনের প্রতিনিধি ছিলেন না । তাছাড়াও ক্যাবিনেট মিশনের দুই সদস্য মিঃ আলেকজান্ডার ও পেথিক লরেন্স ঘােষণা করেছিলেন যে, অনুন্নতশ্রেণীকে সংখ্যালঘুশ্রেণীর মর্যাদা ও সুবিধা দেওয়া হবে । কিন্তু কংগ্রেসের বিরােধিতায় তাদের পিছু হটতে হয় । গান্ধীর পরামর্শ মেনে মৌলানা আজাদ চিঠি লিখে মিঃ আলেকজান্ডার ও পেথিক লরেন্সের ঘােষণার বিরােধিতা করেন । কংগ্রেসের যুক্তি হলো অনুন্নতশ্রেণী হিন্দুদেরই অংশ তাই তাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া যাবে না ।
এই কারণে ও অন্যান্য নানা কারণে বাংলার কিছু অনুন্নতশ্রেণীর কংগ্রেসী এম.এল.এ ক্ষুব্ধ হন এবং ১৯৪৬ সালের ২১ শে সেপ্টেম্বর এক বিবৃতি দিয়ে তাঁরা একসঙ্গে কংগ্রেস দল ত্যাগ করেন এবং তফসিলী ফেডারেশন দলে যােগদান করেন । ঐ চারজন এম.এল.এ হলেন – দ্বারিকনাথ বারুরি (ফরিদপুর) , ভােলানাথ বিশ্বাস (যশাের) , হারানচন্দ্র বর্মন (পাবনা / বগুড়া) এবং গয়ানাথ বিশ্বাস (ময়মনসিং) । ঐ বিবৃতিতে তাঁরা আরও অভিযােগ করেন--- কংগ্রেস ও উচ্চবর্ণ হিন্দুরা অনুন্নতশ্রেণীর মানুষকে কোনক্ষেত্রে সহযােগিতা করা বা সুবিধাদান করাতো দূরে থাক , প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুন্নতশ্রেণীর স্বার্থের বিরােধিতা করে চলেছে । এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে ইংরেজ ও মুসলমানরা অনুন্নতশ্রেণীর প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেও, উচ্চবর্ণ হিন্দু ও কংগ্রেস তাতে বাধাদান করে যাচ্ছে ।
'ভারত ভাগ হবে না ’ – এই সুখস্বপ্ন ক্ষণস্থায়ী হয় । মে মাসে ক্যাবিনেট মিশনের ঘােষণার তিনমাস পর ভারতের অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয়ে ওই সরকারে যােগদান করে । নেহেরু প্রধানমন্ত্রী হন এবং লিয়াকত আলি হন অর্থমন্ত্রি। এই মন্ত্রিসভা ৯/১০ মাস স্থায়ী হয় । দেশ শাসনের এই পর্যায়কালে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ নতুন নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে । কংগ্রেস মনে করে মুসলিম লীগকে ট্যাকল করা সমস্যার এবং তাদের লক্ষ্য অর্জনের পথে মুসলিম লীগ এক কঠিন বাধা । এই বাধা অতিক্রম করার সহজ উপায় হিসাবে তারা মুসলমান প্রধান অঞ্চলকে ভারত থেকে ছেঁটে বাদ দেবার সিদ্ধান্ত নেন । অর্থাৎ ঐক্যবদ্ধ স্বাধীন ভারতের জন্য যে কংগ্রেস এতদিন অটল-অনড় ছিল , সেখান থেকে সরে এসে দেশভাগ মেনে নেওয়া শ্রেয় মনে করে । মুসলমানদের সাথে দলিতদের বা অনুন্নতশ্রেণীর ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সম্পর্ক ও ঐক্যের সম্ভাবনাও তাদের আতঙ্কিত করে থাকতে পারে ।
অন্যদিকে মুসলিম লীগও এই ৯/১০ মাসের অভিজ্ঞতায় অনেক সতর্ক হয়ে যায় । তাঁদের কংগ্রেস বা হিন্দুদের প্রতি আস্থার ভাগ কমে, অবিশ্বাসের পাল্লা ভারি হয়ে ওঠে । ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্রের নানা বিষয়ে তারা ব্যাখ্যা দাবি করে এবং নির্দেশাদি আরও স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল করার দাবি তােলে । কংগ্রেস খুঁটিনাটি বহু বিষয়ে শর্ত চাপানাের চেষ্টা করে ; আর মুসলিম লীগও অনমনীয় মনােভাব নিতে থাকে এবং ক্রমেই দেশভাগ অনিবার্য হয়ে যায় । এরই মধ্যে ১৯৪৭ সালের মার্চ মাসে মাউন্টব্যাটেন ভারতের বড়লাট হয়ে আসেন ।
এভাবে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা একেবারেই ভেঙে যায় এবং দেশভাগ নিশ্চিত বলে মনে হয় । এই অবস্থায় ২ রা জুন , ১৯৪৭ তারিখে মাউন্টব্যাটেন ভারতের কয়েকজন নেতার সাথে বৈঠকে বসেন । তাঁরা হলেন--- কংগ্রেসের পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু , সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল , আচার্য কৃপালিনী এবং সর্দার বলদেব সিং (তিনি একইসাথে শিখ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি)। মুসলিম লীগের পক্ষে ছিলেন – মােহম্মদ আলি জিন্নাহ , লিয়াকত আলি খান এবং আবদুর রব নিস্তার । এই সভায় ভারত ভাগ করে ভারত এবং পাকিস্তান – এই দুটি দেশ গঠন করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয় ।
লক্ষ্য করার বিষয় হলাে , বাংলার মুসলিম লীগ ছিল গােটা মুসলিম লীগের শক্তির অর্ধেকটাই , তাদের কোন প্রতিনিধি ঐ সভায় যােগদান করেন না বা আমন্ত্রণ পাননি । তার হয়তো এক কারণ এই যে, তাঁরা দাবি করেছিলেন – দেশভাগ হলে দেশ তিনভাগে ভাগ হােক । বাংলাপ্রদেশ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করুক । হিন্দুদের মধ্যেও সুভাষচন্দ্র বসুর মেঝদা শরৎচন্দ্র বসু , কিরণশংকর রায় , যােগেন্দ্রনাথ মণ্ডল প্রমুখ এই দাবির পক্ষে ছিলেন । যদিও কংগ্রেসের সদস্য হওয়ায় শরৎচন্দ্র বসু, কিরণশংকর রায় ও অন্যান্যরা এই দাবিতে রাস্তায় নামেননি ; রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছিলেন যােগেন্দ্রনাথ মন্ডল।
স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার পক্ষে বিবৃতি দিয়েছিলেন বাংলার মুসলমান নেতৃবৃন্দ ও যােগেন্দ্রনাথ । স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার পক্ষে বিবৃতি দিয়েছিলেন মিঃ গান্ধীও, যদিও কংগ্রেসের চাপে পড়ে তিনি শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যান । মােহম্মদ আলি জিন্নাহ এই প্রশ্নে প্রকাশ্যে কোন বিবৃতি দেননি ঠিকই, তবে জানা যায় যে, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা গঠনে তাঁর আপত্তি ছিল না। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার শাসনতন্ত্র কেমন হবে কিছু হিন্দু নেতা ও মুসলমান নেতৃবৃন্দ তাও স্থির করে ফেলেন। যেমন মুখ্যমন্ত্রী হবেন একজন মুসলমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হবেন হিন্দু ইত্যাদি। তাছাড়া চাকরি ইত্যাদিতে হিন্দু ও মুসলমানের অনুপাত, এসব নিয়েও ঐক্যমত্য হয়। কিন্তু মূলত বাংলা কংগ্রেসের বৃহত্তম অংশের ইচ্ছায় ও চাপে এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা গঠন সম্ভব হয় না । ড . শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর নেতৃত্বে হিন্দু মহাসভাও প্রদেশকগ্রেসকে সমর্থন করে এবং পরিণতিতে বাংলা ভাগ হয়ে যায় ।
বড়লাট মাউন্টব্যাটেনের ভবনে অনুষ্ঠিত উপরে আলােচিত সভায় স্থির হয় যে , এক বেতার ভাষণের মাধ্যমে পরদিন অর্থাৎ ৩ রা জুন , ১৯৪৭ তারিখে মাউন্টব্যাটেন ভারতভাগ ও পাকিস্তান সৃষ্টির আনুষ্ঠানিক ঘােষণা করবেন। আর ঐ পরিকল্পনাকে সমর্থন জানিয়ে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু , মােহম্মদ আলি জিন্নাহ এবং সর্দার বলদেব সিং বেতারে ভাষণ দেবেন ।
তাঁরা সবাই এই সিদ্ধান্ত অনুসারে বেতার ভাষণ দিয়ে এই সিদ্ধান্ত দেশবাসীকে জানিয়েছিলেন । ৪ ঠা জুন , ১৯৪৭ তারিখে আনন্দবাজার পত্রিকা এই বেতার ভাষণ প্রকাশ করে । খবরের হেডিং ছিল – “ ঔপনিবেশিক সরকারের মর্যাদা সম্পন্ন এক বা একাধিক গভর্নমেন্ট, আগামী কয়েকমাসের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তর, ভারত বিভাগ অনিবার্য হওয়ায় প্রদেশ বিভাগের দাবি অখণ্ডনীয়"। আনন্দবাজারে প্রকাশিত মাউন্টব্যাটেনের ঘােষণার সারাংশ ছিল এইরকম – "ভারতের ঐক্য রক্ষার জন্য ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব বা অন্য কোন পরিকল্পনা উভয়পক্ষের কাছে গ্রহণীয় না হওয়ায়, এই দেশভাগের সিদ্ধান্ত। পাঞ্জাব , বাংলা এবং অসমের যে সীমারেখা হবে, তা সাময়িক । সীমা নির্ধারণ কমিশন এই এলাকার সীমারেখা চূড়ান্তভাবে স্থির করবে" ।
পণ্ডিত হওহরলাল নেহেরু বেতার ভাষণে বলেন--- "ব্রিটিশ সরকারের দেশভাগের ঘােষণা ও অন্যান্য ঘােষিত বিষয়াদি গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে । দেশভাগের এই সিদ্ধান্ত আনন্দের সাথে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে , এমন নয় । কিন্তু এ বিষয়ে কোন সংশয় নেই যে , বর্তমান পরিস্থিতিতে এটাই ঠিক কাজ । বৃহত্তর স্বার্থের দিক দিয়ে এই সিদ্ধান্তই সমীচীন । গােটা বিষয়টি কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় অনুমােদনের জন্য পেশ করা হবে" ইত্যাদি ।
এসব ঘটনার অব্যবহিত পরে প্রার্থনা সভায় মিঃ গান্ধী বলেন, "দেশভাগ করার জন্য ব্রিটিশ সরকার দায়ী নয়। দেশভাগের জন্য ভাইসরয়ের কোন বিশেষ ভূমিকা নেই; বরং সত্য হলাে – দেশভাগের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের যেমন আপত্তি আছে , ভাইসরয়েরও তেমনই আপত্তি আছে । কিন্তু দেশের হিন্দু এবং মুসলমান উভয়েই যদি দেশভাগ ছাড়া অন্য কোন ব্যবস্থায় রাজি না হয় , তাহলে ভাইসরয় আর কী করতে পারেন" !
১৯৪৭ সালের ৩ রা জুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রি মিঃ এটলী ব্রিটিশ পার্লামেন্টে (হাউস অফ কমনস) যে বিবৃতি দেন, তা ৪ ঠা জুন আনন্দবাজার পত্রিকা প্রকাশ করে । প্রকাশিত খবর মােটামুটি এইরকম, '‘ ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট ভারতবর্ষে দুটি গভর্নমেন্টকে যে মর্যাদা দিতে চেয়েছে (তার অর্থ ভারত ও পাকিস্তান ) কংগ্রেস , মুসলিম লীগ এবং শিখ – এই তিন দল ও পক্ষ, তা গ্রহণ করেছে । ভারতবর্ষের জন্য চূড়ান্ত গঠনতন্ত্র অর্থাৎ সংবিধান প্রণয়নের ইচ্ছা ব্রিটিশের নেই । ভারতীয়রাই তা প্রণয়ন করবেন । যুক্তভারত গঠন করার জন্য এরপরও ভারতের বিভিন্ন সম্প্রদায় যদি আলােচনা করেন , ব্রিটিশ তাতেও কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না । বাংলা এবং পাঞ্জাবপ্রদেশ ভাগ করার জন্য সেখানকার ব্যবস্থা পরিষদের সদস্যরা (এম.এল.এ) সিদ্ধান্ত নেবেন। সেখানকার হিন্দু এবং মুসলমান এম.এল.এ - রা পৃথকভাবে মতামত দেবেন । একপক্ষের গরিষ্ঠ সদস্যরা বিভাগের পক্ষে মত দিলে প্রদেশ বিভাগ করা হবে" ।
এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো---ভারতভাগে সম্মতি দেবার ব্যাপারে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রি তিনটি দলের কথা উল্লেখ করেছেন । ড . আম্বেদকর বা যােগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ও তাঁদের দল তফসিলী ফেডারেশনের কথা বলা হয়নি। কারণ ভারত ভাগের জন্য ড.আম্বেদকর বা যােগেন্দ্রনাথ এবং তাদের দল তফসিলী ফেডারেশন সম্মতি দেয়নি ; এমনকি তাদের মতামতও জানতে চাওয়া হয়নি ।
বাংলাপ্রদেশ ভাগের প্রশ্নে ১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসের শেষার্ধে বাংলা প্রদেশকংগ্রেস কমিটি কলকাতার সিংহী পার্কের সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাপ্রদেশ ভাগের দাবি জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাশ করে – যা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় । আসলে এটা ছিল আনুষ্ঠানিকতা , কার্যতঃ কয়েক বছর ধরে বাংলার কংগ্রেস এবং উচ্চবর্ণ হিন্দুদের নানা সংগঠন বাংলাপ্রদেশ বিভক্ত করার পক্ষে জনমত গঠনের কাজ করে চলেছিল । প্রদেশকংগ্রেস কমিটির বাংলাপ্রদেশ বিভক্ত করার সিদ্ধান্তের কথা খবরের কাগজে পড়েন যােগেন্দ্রনাথ । তখন তিনি কেন্দ্রিয় আইনমন্ত্রি । তিনি সাংবাদিক সম্মেলন আহ্বান করেন দিল্লীতে । তারিখ ২১ শে এপ্রিল , ১৯৪৭ (মতান্তরে ২২ শে এপ্রিল)। এই সাংবাদিক সম্মেলনে যোগেন্দ্রনাথ বাংলাপ্রদেশ বিভক্ত করার চেষ্টার বিরুদ্ধে বিবৃতি দেন । পরের দিন ইংরেজী হিন্দুস্তান টাইমসে তার বিবৃতির পূর্ণ বিবরণ প্রকাশিত হয় । ঐ বিবৃতিতে তিনি জানান – "বাংলাপ্রদেশ ভাগের মাধ্যমে বাঙালি হিন্দুর কোন সমস্যার সমাধান হবে না । বাংলাপ্রদেশ ভাগ করা হলে বহু হিন্দুদের ভিটেমাটি ছেড়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে হবে । সম্প্রদায়গত সমস্যার সমাধানে যে ওষুধ প্রস্তাব করা হয়েছে , তাতে নিরাময়ের বদলে রােগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাবে । পূর্ববঙ্গে হিন্দুরা আরও বেশি সংখ্যালঘু হয়ে পড়বেন এবং তাঁদের সমস্যা বাড়বে" । তাই তিনি এই পরিকল্পনা ত্যাগের আহ্বান জানান । তিনি বলেন , "বাংলার অনুন্নতশ্রেণী বাংলাপ্রদেশ ভাগের বিরুদ্ধে , তারা বিভক্ত করার এই প্রস্তাব ও পরিকল্পনাকে সমর্থন করেন না"।
বাংলাপ্রদেশ ভাগের দাবি ও পরিকল্পনাকে জনপ্রিয় করে মানুষের সমর্থন আদায়ের জন্য কংগ্রেস ও উচ্চবর্ণ হিন্দুরা কলকাতা দাঙ্গা ও নােয়াখালির দাঙ্গাকে হাতিয়ার করে প্রচার শুরু করে । তাদের যুক্তি এই বীভৎস দাঙ্গা -হাঙ্গামার পর আর হিন্দু ও মুসলমান একসাথে, একই রাজ্যে ও দেশে বাস করতে পারেন না ।
এই অপপ্রচারের মােকাবিলা করতে যােগেন্দ্রনাথ দিল্লী থেকে কলকাতায় আসেন । তিনি বলেন , "সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চিরস্থায়ী ঘটনা নয় ; কিন্তু দাঙ্গার সমাধান হিসাবে বাংলাপ্রদেশ ভাগ করা কোন কাজের কথা নয় , তা দাঙ্গার থেকে আরও খারাপ হবে । বিশেষ করে অনুন্নতশ্রেণীর (তফসিলীশ্রেণী) জন্য তা বেশি ক্ষতির কারণ হবে" । কলকাতার দাঙ্গা - হাঙ্গামায় যে পাশবিক ক্রিয়াকাণ্ড হয় , তিনি তার নিন্দা করেন । বলেন--- "কে বা কারা দায়ি এবং কারা কলকাতা দাঙ্গার জন্য মূল দোষী , তা তদন্তের জন্য ভারতের প্রধান বিচারপতি স্যার পেট্রিক স্পেন্স - এর নেতৃত্বে তদন্ত কমিশন গঠিত হয়েছে । তাদের রিপাের্টে সব কিছু বিশদে জানা যাবে"। তবে যােগেন্দ্রনাথের মতে কলকাতার দাঙ্গা - হাঙ্গামা সাম্প্রদায়িক রূপ পরিগ্রহ করলেও , তা মূলত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছিল না , তা ছিল মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ফলাফল ।
নােয়াখালি দাঙ্গা শুরু হয় ১০ অক্টোবর , ১৯৪৬ তারিখে। ১৮ অক্টোবর দাঙ্গার ভয়াবহতার কথা কাগজে প্রকাশিত হয় । ২০ শে অক্টোবর যােগেন্দ্রনাথের কেন্দ্রিয় মন্ত্রি হিসাবে শপথ নেবার কথা ছিল। কিন্তু তিনি ২২ শে অক্টোবর চলে যান নােয়াখালির দাঙ্গাদুর্গত এলাকায়। তাই, তাঁর শপথ পিছিয়ে যায় । তিনি ১ লা নভেম্বর দিল্লী গিয়ে শপথ নেন ।
কলকাতা দাঙ্গার পাল্টা নােয়াখালি দাঙ্গা সৃষ্টি করা হয় বলে যে প্রচার , তাও ঠিক নয় । নােয়াখালির গােলাম সরােয়ার ছিলেন একজন পীরসাহেব ও জনপ্রিয় কৃষক নেতা । তিনি ছিলেন প্রচণ্ড জমিদার বিরােধী । মুসলিম লীগের বহু নেতা ছিলেন মুসলিম জমিদার , যে কারণে মুসলিম লীগকে তিনি একেবারেই অপছন্দ করতেন । তিনি ঐ দলের সদস্যপদ নিতে কখনওই রাজি হননি । নোয়াখালীর জমিদারগণ অধিকাংশই ছিলেন হিন্দু এবং কংগ্রেসের মদতপুষ্ট । তাই, গোলাম সরোয়ারের নেতৃত্বে জমিদার বিরােধী কৃষক আন্দোলনকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেবার চেষ্টা করে জমিদারগণ । কংগ্রেসের সহযােগিতায় পুলিশ লেলিয়ে দিয়ে গােলাম সরােয়ারকে জব্দ করার চেষ্টা হয় – যে দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রূপ নেয় । ২১৮ জন মানুষ মারা যান এই দাঙ্গায়, যার অধিকাংশই ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের ।
আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাপ্রদেশ ভাগের দাবি জানানাের পর কংগ্রেস জনমত নিজের পক্ষে টেনে নেবার জন্য মিটিং , মিছিল ও অন্যান্য প্রচার আন্দোলন জোরদার করে । খবরের কাগজগুলি বাংলা প্রদেশভাগের জন্য প্রচার চালিয়ে যায় । প্রথম দিকে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী বাংলাদেশ ভাগের বিপক্ষে ছিলেন ; কিন্তু শেষ পর্যায়ে তিনি ও তাঁর দল হিন্দু মহাসভা বাংলাপ্রদেশ ভাগের পক্ষে প্রচারে নামে । যদিও তাদের সংগঠন , শক্তি ও সামর্থ ছিল নগণ্য ।
যােগেন্দ্রনাথ ও তফসিলী ফেডারেশন বাংলাপ্রদেশ ভাগের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন । তিনি বাংলাপ্রদেশ ভাগের বিরুদ্ধে ২৪ পরগনা , রংপুর , দিনাজপুর , যশাের , খুলনা , বর্ধমান , হাওড়া , হুগলী , বাঁকুড়া , বীরভূম , নদিয়া , বরিশাল , ফরিদপুর , জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং জেলায় জনসভা করেন। তিনি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা নামে পৃথক দেশ গঠনের জন্য প্রচার চালান । জনমত ক্রমেই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার পক্ষে চলে আসতে থাকে । ১৯৪৭ সালের ১৬ ই মে তিনি সভা করেন কলকাতার ভারত সভা হলে । – যা পরের দিন ইংরেজী দৈনিক স্টেটসম্যান ও দৈনিক কৃষক পত্রিকায় প্রকাশিত হয় । কিন্তু সাধারণ বাঙালিরা যাতে যোগেন্দ্রনাথের প্রচেষ্টার কথা জানতে না পারেন তারজন্য আনন্দবাজার , যুগান্তর - এইসব বড় বড় বাংলা খবরের কাগজ যােগেন্দ্রনাথকে কোন প্রচার দেয় না, তাঁর সভার খবরগুলি ছেপে প্রকাশ করে না ।
ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ অনুযায়ী ২০ শে জুন , ১৯৪৭ তারিখে বাংলার হিন্দু ও মুসলমান এম.এল.এ - রা ভােটাভুটি করেন পৃথকভাবে । হিন্দু এম.এল.এ রা বর্ধমানের মহারাজা উদয়চাঁদ মহতাবের নেতৃত্বে ভােটাভুটি করেন এবং মুসলমান এম.এল.এ - রা জনাব নুরুল আমিনের নেতৃত্বে ভােটাভুটি করেন । অধিকাংশ মুসলমান ও তফসিলী এম.এল.এরা বাংলাপ্রদেশ ভাগের বিরুদ্ধে ভােট দেন ; কিন্তু মােট হিন্দু ভােটের বেশি অংশ বাংলাপ্রদেশ ভাগের পক্ষে ভােট দেবার জন্য বাংলাপ্রদেশ ভাগ করা নিশ্চিত হয়ে যায় । জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে তিনজন কমিউনিস্ট এম.এল.এ বাংলাপ্রদেশ ভাগের পক্ষে ভােট দেন । তাই বলা যায়--- দেশভাগ হবার আগেই, ২০ শে জুন থেকেই বাংলাপ্রদেশ বিভক্ত হয়ে যায় ।
যুক্তবাংলায় তখন মােট মুসলমান এম.এল.এ সংখ্যা ছিল ১৪১ জন। তার মধ্যে ১০৬ জন বাংলাভাগের বিরুদ্ধে ভােট দেন এবং মাত্র ৩৫ জন মুসলমান সদস্য বাংলাপ্রদেশ ভাগের পক্ষে ভােট দেন । আর তখন মােট হিন্দু এম.এল.এ ছিলেন ৭৯ জন । তারমধ্যে ৫৭ জন এম.এল.এ বাংলাপ্রদেশ ভাগের পক্ষে ভােট দেন এবং মাত্র ২২ জন এম.এল.এ বাংলাপ্রদেশ ভাগের বিরুদ্ধে ভােট দেন । এই ২২ জন হিন্দু এম.এল.এ - র মধ্যে ১৯ জন ছিলেন তফসিলি এম.এল.এ। তাঁরা যােগেন্দ্রনাথের কথায় এবং প্রভাবে বাংলাপ্রদেশ ভাগের বিরুদ্ধে ভােট দেন । মাত্র ৩ জন বর্ণহিন্দু এম.এল.এ শরৎচন্দ্র বসুর সাথে থেকে বাংলাভাগের বিপক্ষে ভােট দেন ।
যােগেন্দ্রনাথ ছিলেন বাংলার তফসিলী সমাজের সবচেয়ে বেশি যােগ্য , সমাজের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ এবং সৎ ও সাহসী রাজনীতিক । পূর্ববঙ্গ ছিল তার জন্মভূমি ও রাজনীতির ভিত্তিভূমি , তাই এই ভাগাভাগির সময়ে তাঁর সামনে সমস্যা ছিল বেশি জটিল ও কঠিন । মূলতঃ তার সুযােগ্য নেতৃত্বের কারণে উচ্চবর্ণ হিন্দুরা এবং কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা তাঁদের সংকীর্ণ স্বার্থে তফসিলী সমাজকে যথেচ্ছ ব্যবহার করার পথে বার বার বাধা পেয়েছেন ও ব্যর্থ হয়েছেন । সেজন্য উচ্চবর্ন হিন্দুরা যােগেন্দ্রনাথের উপর খড়গহস্ত ছিলেন , তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও কুৎসা প্রচার করে যোগেন্দ্রনাথকে তাঁর নিজের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শেষ করে দেবার চক্রান্ত করেন এবং সাময়িকভাবে হলেও অনেকাংশে উচ্চবর্ন হিন্দুরা সফল হন।
কিন্তু সত্য আজ আর ধামাচাপা দিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে । অনুন্নত সমাজ ও সাধারণ মেহনতি মানুষের স্বার্থে যােগেন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক কীর্তিসমূহ ক্রমেই প্রকাশিত হয়ে চলেছে এবং মানুষকে তা আকৃষ্ট করছে। দেশে বিদেশে তাঁর অমর কীর্তি নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে, আরো গবেষণার কাজ চলছে ।
পরিশেষে আর একটি বিষয়ের অবতারণা করে এই প্রবন্ধ শেষ করব । উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা প্রচার করে থাকেন যে , পাকিস্তানে এবং পাকিস্তান মন্ত্রিসভায় যােগেন্দ্রনাথ নাকি কী দারুণ দুর্দশার মধ্যেই না পড়েছিলেন! মুসলমানদের সাথে মিলেমিশে চলতে গিয়ে তিনি নাকি কী ভয়ঙ্কর বিপদের মধ্যে পড়েছিলেন ইত্যাদি ! কিন্তু তথ্য ও সত্য আমরা তাঁর পদত্যাগপত্রের মধ্যেই দেখতে পাই । ইতিহাস হলাে--- তিনি তাঁর পার্টি তফসিলী ফেডারেশনের পক্ষ হয়ে মুসলিম লিগের সাথে পাকিস্তানের কোয়ালিশন সরকারে যােগ দেন । একজন পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে সেটাই তাঁর পক্ষে স্বাভাবিক ছিল । জিন্নাহর মৃত্যুর পর পাকিস্তান সরকারের প্রধান ছিলেন লিয়াকত আলি খান, তিনি ধর্মান্ধ নেতা ছিলেন । মুসলিম লিগের গােষ্ঠী কোন্দলে তখন পূর্ব পাকিস্তানের সােহরাওয়ার্দি , ফজলুল হকের মতাে নেতারা ব্রাত্য হয়ে পড়েছিলেন । মুসলিম লিগের মধ্যে যােগেন্দ্রনাথের বন্ধু ছিলেন এইসব বাঙালি মুসলিম নেতারা । তাই , লিয়াকত আলি যােগেন্দ্রনাথকেও কোণঠাসা করতে তফসিলী ফেডারেশনের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে দ্বারিকনাথ বারুরিকে ব্যবহারের চেষ্টা চালান । এসব নানা কারণে তিনি লিয়াকত আলির উপর বিরক্ত ছিলেন । তাছাড়া ১৯৫০ সালের দাঙ্গায় তিনি লিয়াকত আলি নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান সরকারের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ হন। তিনি লিয়াকত আলির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে পাকিস্তানের হিন্দুদের নিরাপত্তা দানে ব্যর্থতার অভিযোগ তোলেন । তিনি নিজেকে উপেক্ষিত মনে করেন এবং লিয়াকত আলি নেতৃত্বাধীন মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন । তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলির বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের কথা নিজের পদত্যাগপত্রে লিখেছেন ।
এমন পদত্যাগের ঘটনা রাজনীতিতে হামেশাই ঘটে এবং ঘটছে। প্রায় একই সময়ে ড. আম্বেদকর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর বিরুদ্ধে আরো গুরুতর অভিযোগ তুলে নেহেরু মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তাই যােগেন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে এই পদত্যাগ করার ঘটনা আলাদা কিছু ছিল না । তিনি কোথাও, কোনােদিন, কোনাে ব্যাপারে মুসলিম সমাজকে দায়ী করেননি । মুসলমানদের সাথে সম্পর্ক এবং সহযােগিতার রাজনৈতিক পথ গ্রহণের জন্য আক্ষেপ করেননি ; বরং এই সহযােগিতার সুফল নিয়ে সন্তুষ্ট ও গর্বিত ছিলেন ।
(সহযােগিতা সূত্র --- আমার দু'চার কথা : যােগেন্দ্রনাথ মণ্ডল , Caste System, Untouchability and the Depressed : H . Katani এবং যােগেন্দ্রনাথ মণ্ডল--- প্রকাশক মহাপ্রাণ পাবলিশিং সােসাইটি প্রভৃতি )
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন