সাম্রাজ্যবাদ কিস্তি ৩
৩৯০০ টি খাদ্য হিসাবে , ৫২৫ টি তন্তু উৎপাদনে , ৪০০ টি পশুখাদ্য হিসাবে , ৩০০ টি আঠা ও রঞ্জক প্রস্তুত করতে, ১০০ টি সুগন্ধি হিসাবে এবং বাকিগুলো ওষুধ বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয় । শেতাঙ্গদের গােটা কৃষি ব্যবস্থাটাই ভারত ও অন্যান্য ক্রান্তীয় অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা উদ্ভিদ বীজের উপর নির্ভরশীল। আমেরিকা বা ইউরােপের খাদ্য তালিকা খুটিয়ে দেখলে দেখা যায়, তার মধ্যে ৫ শতাংশ খাদ্য নেই , যা তাদের নিজস্ব প্রাণী বা উদ্ভিদ থেকে সংগৃহীত করা।
আধুনিক যুগে এইসব বিভিন্ন উদ্ভিদ ও ফসলের ভ্যারাইটি সংগ্রহ করে ফোর্ড ফাউণ্ডেশন , রকফেলার ফাউণ্ডেশন এবং ইউ এস এইড - এর টাকায় CGIAR (Consultative Group for Integrated Agricultural Research ) গঠন করা হয় । ব্যাপক গবেষণায় বীজ ও গােটা কৃষি প্রকৌশলের উন্নতি হয় । এখন বিশ্বকৃষি তাদের নিয়ন্ত্রণে ।
পেটেন্ট আইন ইত্যাদির মাধ্যমে তারা ভারত ও অন্যান্য দেশগুলির কৃষিকে একান্ত বিদেশ নির্ভর করে ফেলেছে। ভারতে সবুজ বিপ্লব চালু হবার আগে ৪২ হাজার ধরণের ধান পাওয়া যেত । এখন ২০০০ ধরণের ধানবীজ পাওয়া যেতে পারে । ভারত সরকার দেশি জাতের ধানগুলিকে রক্ষা করার চেষ্টা করেনি । আর.এইচ. রিচারিয়ার মত দেশপ্রেমিক বিজ্ঞানীরা এইসব প্রজাতির ধানবীজ সংরক্ষণের কাজ শুরু করেন। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের চাপে ভারত সরকার এইসব বিজ্ঞানীদের উদ্যোগ ধ্বংস করে দেয় । তাদের সংগ্রহ করা সব বীজ আমেরিকার ঘনিষ্ঠ IRRI (International Rice Research Institute )-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
সংগ্রহ করা এসব বীজের মিশ্রণ ঘটিয়ে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা এমন সব বীজ তৈরি করেছিল, যা উচ্চ ফলনশীল — অথচ সার ও জল কম লাগে এবং পােকার আক্রমন কম । কিন্তু সমস্যা হলাে এই যে , তাদের উদ্যোগ ধ্বংস না করে ভারতীয় কৃষিক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদীদের একক আধিপত্য সম্ভব ছিল না । তাই , সে উদ্যোগ শেষ করে দেওয়া হলাে । এসব ঘটনায় ভারত সরকারের চরিত্র বােঝা যায় । দেশপ্রেমিক আলখাল্লার আড়ালে ওরা সব দেশদ্রোহী নয় কি !
এখন বিদেশিরা নানা জাতের বীজ তৈরি করছে । তার কোনােটা টার্মিনেটর প্রযুক্তি , কোনােটা ভার্মিনেটর প্রযুক্তি ; আবার কোনােটি ' রাউণ্ড আপ রেডি ’ ফসল ইত্যাদি । কোন বীজে ফসল ফলবে ; কিন্তু ঐ ফসলে বীজ হবে না । কোনাে বীজে দেখা যাবে ক্ষেতভরা ফসল; কিন্তু একটি বিশেষ রাসায়নিক স্প্রে না করলে ধানের মধ্যে দানা হবে না।---অর্থাৎ বীজের সাথে ধানের ওষুধের ব্যবসা । 'রাউণ্ড আপ রেডি' বীজ লাগিয়ে আগাছা নাশক বিষ ছড়ালে , আগাছা মরবে ; কিন্তু এই জাতের ধান গাছের ক্ষতি হবে না । — এসবই বিদেশের কাছ থেকে নিতে হবে , তবে চাষ হবে । কিন্তু তাদের কথা মতাে না চললে, ভাতে মেরে দেবে ।
সাদ্দাম হুসেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য জাতিসংঘে ভােটাভুটি হয় (রেজুলেশন ৮)। অসীম স্পর্ধায় ভােটদান থেকে বিরত ছিল তৃতীয় বিশ্বের মাত্র ২ টি দেশ । কিউবা আর ইয়েমেন । কিউবার পিছনে লেগে আমেরিকা কোনদিন বিশেষ কিছু করতে পারে নি । কিন্তু ইয়েমেনকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে আমেরিকা । ইয়েমেনে কোন বােমা পড়েনি ; কিন্তু আমেরিকা এমন সব ব্যবস্থা নেয় ও অন্য অনেক দেশকে নিতে বাধ্য করে, যাতে ইয়েমেনের জাতীয় উৎপাদন ১০ শতাংশ কমে যায়---যেখানে ১ শতাংশ উৎপাদন কমলে তাকে ভয়াবহ বিপর্যয় বলা হয়। রপ্তানি ও পরিষেবা ক্ষেত্রে ইয়েমেনের আয় কমেছিল ৭৫ শতাংশ । মঞ্জুর হয়ে যাওয়া ঋণ আই এম এফ ও বিশ্বব্যাংক ইয়েমেনকে দেয়নি নানা বাহানায় । ৮ লক্ষ ইয়েমেন শ্রমিককে মার্কিনের নির্দেশে সৌদি আরব রাতারাতি বহিষ্কার করেছিল । ইয়েমেনে দুর্ভিক্ষ হয় । বিদেশ নির্ভরতার এই হলো বিপদ এবং এটাই হলাে আজকের দিনের সাম্রাজ্যবাদ ।
ভারতের প্রায় অর্ধেক মানুষ অপুষ্টিতে ভােগেন । অথচ ২০০০-০১ সালে ভারতের গুদামগুলিতে ৪ কোটি ৫৫ লক্ষ টন খাদ্য জমা পড়ে থাকে — যা দিয়ে ৬০ কোটি মানুষকে ৬ মাস ধরে দু’বেলা পেটপুরে খাওয়ানাে যেত । বিদেশের নির্দেশে খাদ্যে ভর্তুকি তুলে নেওয়ায় খাদ্যশস্যের দাম বেড়ে যায় । তাই , মানুষের খাদ্য কেনার সামর্থ কমে যায় । ফলে খাদ্য গুদামে পড়ে থাকে। কিন্তু চুক্তির জন্য ভারত সরকারের নিজের দেশের জনগণকে কম দামে খাদ্য দেবার উপায় নেই । তাই, গুদাম খালি করার জন্য সরকার দুটি পথ নেয় । (১) দেশের মানুষ যখন প্রতিটন ১১৩০০ টাকা অর্থাৎ প্রতি কিলাে ১১.৩০ টাকা করে চাল কিনে খাচ্ছেন , তখন সরকার রফতানিকারকদের কাছে ঐ চাল বিক্রি করে দেয় টনপ্রতি ৫৬৫০ টাকায় । অর্থাৎ ৫.৬৫ টাকা কিলাে দরে । কিন্তু তাতেও গুদাম পুরাে খালি হয় না । সরকার ২ লক্ষ ৫ হাজার টন খাদ্যশস্য সমুদ্রে ফেলে দেবার সিদ্ধান্ত নেয় । লােকসভার 'খাদ্য অসামরিক সরবরাহ ও গণবণ্টন স্থায়ি কমিটি' এই সিদ্ধান্ত নেয় । এই কমিটির সদস্যরা সবাই দেশের না খাওয়া মানুষের ভােটে নির্বাচিত হয়ে লােকসভায় যান ! ভুলে গেলে চলবে না , খাদ্য সমুদ্রে ফেলার জন্যেও একটা বিরাট অংকের খরচ আছে ।
বর্তমানে আমাদের দেশে নিত্যপ্রয়ােজনীয় দ্রব্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে । সাধারণতঃ আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেল , পেট্রল প্রভৃতি জ্বালানী তেলের দাম বৃদ্ধির জন্য আমাদের দেশে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি হয়ে থাকে । কারণ জ্বালানী তেলের দাম বৃদ্ধি হলে তার প্রভাবে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি হয় ও অন্যান্য সব জিনিসের দাম বাড়ে । যেহেতু জ্বালানী তেলের বেশির ভাগটাই আমাদের আমদানি করতে হয় , তাই ভারত সরকারের করার বিশেষ কিছুই থাকেনা । বর্তমান সময়ের মূল্যবৃদ্ধির উপর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব থাকলেও সেটা মূল কারণ নয় । এবারকার মূল্যবৃদ্ধির কারণ খাদ্য সংকট । সারা পৃথিবী জুড়ে খাদ্য সংকট । ভারতে এবার খাদ্য উৎপাদন ভাল হলেও বিশ্বায়নের কৃপায় আমাদের দেশ এই সংকট থেকে বাইরে থাকতে পারেনি , পারে না । আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব এখন আর কোন দেশ একেবারে এড়িয়ে যেতে পারেনা , অনুন্নত এবং বিকাশমান দেশগুলিতাে নয়ই । খাদ্য সংকটের পিছনে খরা , বন্যা , সাইক্লোন , ভূমিকম্প , নার্গিস , সুনামী প্রভৃতি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঘটনা যেমন আছে , তার চেয়েও বেশি সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির ষড়যন্ত্র এবং হৃদয়হীন ক্রিয়াকাণ্ড । আমেরিকা খাদ্যের ব্যবসায় বাড়তি মুনাফা করার জন্য কৃষি জমি ফেলে রেখেছে । চাষ না করার জন্য চাষীদের টাকা দিচ্ছে । খাদ্য থেকে, বিশেষ করে ভুট্টা থেকে ইথানল তৈরি করছে জ্বালানী তেলের চাহিদা মেটাতে । ভুট্টার চাষ বেশি বেশি জমিতে হচ্ছে । গত বছর মার্কিনরা মােট ভুট্টা উৎপাদনের ২০ শতাংশ জৈব জ্বালানী তৈরি করতে ব্যবহার করেছে । তাতে বিশ্ব খাদ্য ভাণ্ডারে টান পড়ছে । ইউরােপীয় ইউনিয়ন তাদের উৎপাদিত ভােজ্য তেলের ৬৮ শতাংশ জৈব জ্বালানীর কাজে ব্যবহার করেছে । সাগরে খাদ্য ফেলে খাদ্যসংকট তৈরি করার পুরণাে কৌশলের সাথে সাম্রাজ্যবাদীদের এইসব নতুন নতুন কৌশল যােগ হয়েছে ।
দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধির জন্য গরিব মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমছে। তারা খাদ্য কিনতে পারছেন না । অভুক্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে । অনুন্নত দেশে অশিক্ষা , অপুষ্টি , দরিদ্রতা যত বাড়বে, সাম্রাজ্যবাদীরা নিশ্চিন্ত থাকবে । সারা পৃথিবীর মােট নিরক্ষর মানুষের তিন ভাগের এক ভাগেরও বেশি নিরক্ষর মানুষ বাস করেন ভারতবর্ষে । সারা পৃথিবীর মােট ক্ষুধার্ত মানুষের প্রায় অর্ধেক ক্ষুধার্ত মানুষ ভারতের নাগরিক । সাম্প্রতিককালে খুচরাে ব্যবসার টানাটানি , এস ই জেড, সি আর জেড বা সি জেড এম — এসব নতুন শব্দগুলি শুনতে শুনতে ভারতের সাধারণ মানুষের মুখস্ত হয়ে গেছে । কিন্তু গােটা কাণ্ডকারখানা মানুষের কাছে পরিষ্কার নয় । বিষয়গুলি পরিষ্কার করে আলােচনা করার জন্য যে বিস্তৃত পরিসর প্রয়ােজন, তা এই লেখায় নেই ; কারণ ইতিমধ্যে এই লেখাটি যথেষ্ট বড় হয়ে গেছে । তবুও অতি সংক্ষেপে দু'চার কথা বলবাে । বলবাে এই কারণে যে , বিষয়গুলি সাম্রাজ্যবাদী শােযণের ও নিয়ন্ত্রণের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত । এ বিষয়গুলি হলাে , এদেশে সাম্রাজ্যবাদী শােষণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য অতি সাম্প্রতিক কৌশল ।
খাদ্য বিপননের ব্যবসা বহুজাতিক কোম্পানীগুলি অনেকদিন ধরেই করছে ; কিন্তু ভারতে সম্প্রতি তারা মুদির দোকানের ব্যবসাতেও ঢুকে পড়ছে । সমীক্ষা করে দেখা গেছে---ভারতে প্রতিবছর ১৩ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি টাকার মুদিখানার ( খুচরাে ) জিনিষপত্র বেচাকেনা হয় ( আনন্দবাজার ৮/১০/২০০৮ ) । কিন্তু এক্ষেত্রে কোন বড় ও সংগঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল না। তাই , এই ক্ষেত্রে ব্যবসা করার জন্য বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানী ও দেশি বড় বড় কোম্পানীগুলি নেমে পড়েছে । ভারতের বড় বড় শহরে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ঝকঝকে আধুনিক মুদি ও খুচরা ব্যবসার দোকান গড়ে উঠছে । ভ্যাম আর্গানিক , আরামবাগ হ্যাচারি , আদানী এক্সপাের্টিং , হিন্দুস্থান লিভার , টাটা , আম্বানী , হর্ষ নেউটিয়া , গােয়েঙ্কা , বিড়লা , মেট্রো ক্যাশ এ্যাণ্ড ক্যারি , ওয়ালমার্ট , ফিউচার গ্রুপ ( পেন্টালুন ও বিগ বাজার শপিং কমপ্লেক্স ) , আই টি সি . গােদরেজ , রিলায়েন্স , স্পেনসার প্রভৃতি সংস্থা ও সংস্থার মালিকেরা এই ব্যবসায়ে নেমে পড়েছেন । বলাই বাহুল্য বিশ্বায়নের কল্যাণে এখন আর দেশি বিদেশি মালিকে তেমন কোন প্রভেদ নেই । অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা এখন পরস্পর সম্পর্কিত ও সহযােগী । প্রাইভেট ব্যাঙ্ক , বীমা , বিভিন্ন উদ্যোগ — সব ক্ষেত্রেই ।
বিদেশি বহুজাতিক দানব কোম্পানীগুলি ধীরে ধীরে চালকের চেয়ারে বসবে, সে কথা অনুমান করতে বেশি কষ্ট হয় না । খুচরাে ব্যবসায় এই দৈত্যদের ঢুকতে দেওয়া বা না দেওয়া নিয়ে ফরওয়ার্ড ব্লক - সি পি এম ঝগড়া বা বামফ্রন্ট-তৃণমূলের আস্তিন গােটানাে---এসব নাটক । ক্ষমতার লােভে ভােটারদের বােকা বানানাের কৌশল । এসব রাষ্ট্রীয় নীতি চলতে থাকলে বড়দের কাছে ছোটদের উচ্ছেদ অথবা অধীনতা, এ শুধু সময়ের অপেক্ষা । ক্রেতা, জনগণ ও কৃষিপণ্য উৎপাদক কৃষকরা — যারা কিছু ব্যাপারে এইসব বড়দের আগমনে ভালোর স্বপ্ন দেখছেন , তা অলীক । শুরুতে কিছু সুবিধা মিললেও সে হবে সাময়িক , তা মাত্র ছােটদের উচ্ছেদ হওয়া পর্যন্ত । এস ই জেড বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে আলােচনা যথেষ্ট বেশি হয়েছে । নন্দীগ্রাম আন্দোলনের জন্যেই তা সম্ভব হয়েছে । এ ব্যাপারে ভারতীয় পার্লামেন্ট এবং পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা আইন তৈরি করেছে । দেশের মধ্যে ছােট ছােট বিদেশ তৈরী করার আইন । বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বলে যে এলাকা ঘােষিত হবে সেখানে ভারতের শ্রম আইন , পরিবেশ আইন , ফৌজদারি আইন কোন কিছুই কার্যকরি হবে না । যে দেশি বা বিদেশি কোম্পানী ঐ সেজের দায়িত্ব নেবেন তিনিই হবেন ডেভেলপার । তিনি তার মনােনীত একজন ডেভলপমেন্ট কমিশনার নিয়ােগ করবেন , ঐ কমিশনারই ঐ অঞ্চলের সর্বেসর্বা । তার কথাই শেষ কথা । ঐ অঞ্চলে কোন ক্রিয়াকাণ্ডের জন্য রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারকে কোন কর দিতে হবে । স্থানীয় কর , শুল্ক , লেভি , জমি বেচাকেনায় কর , কিছুই দিতে হবে না । অথচ বিদ্যুৎ , জল প্রভৃতি বিনা পয়সায় বা নামমাত্র মূল্যে সরকার ব্যবস্থা করবে । রাস্তাঘাট ও অন্যান্য পরিকাঠামাে উন্নয়নে সরকার সাহায্য করবে । এলাকার জমির উন্নয়ন , রাস্তাঘাট ইত্যাদি সরকারি সাহায্য নিয়ে করার পর গােটা অঞ্চলের বেশিটাই ডেভেলপার অন্যদের কাছে বেশি দামে বন্দোবস্ত দিতে পারবেন । লাভ করবেন । বিল্ডিং , শপিংমল , স্কুল , কলেজ , হাসপাতাল , বার , রেষ্টুরেন্ট , সুইমিং পুল ইত্যাদি করতে পারবেন বা করার জন্য অন্য দেশি বিদেশি ব্যবসায়িকে জমি হস্তান্তর করে মুনাফা করতে পারবেন । সালেম ও অন্যান্য কোম্পানী এজন্যই বিশেষ আগ্রহী ।
শ্রমিকদের কম বেতনে বেশি খাটানাে ও নানাভাবে অন্যায় অত্যাচার করলেও প্রতিকারের জন্য শ্রমবিভাগে নালিশ করা যাবে না । ফলে শ্রমিক শােষণ বল্গাহীন হবে। শস্তা মজুরিতে মাল তৈরি করে বিদেশে নিয়ে যাবার এ এক বিশেষ ব্যবস্থা । এখানে মূলত বিদেশিদের স্বার্থ এখানে। বুদ্ধবাবু বলছেন — নন্দীগ্রামে সেজ হলােনা , কী আর করা যাবে , কেমিক্যাল হাব হবে নয়াচরে! বলা হচ্ছে নয়াচরে মানুষ বাস করেন না । এই কথাটা ঠিক নয় । ২৫০০ জন মৎসজীবী মানুষ সেখানে বাস করেন । নিম্নবর্গীয় মানুষ , অস্পৃশ্যরা । ব্রাহ্মণ এবং ব্রাহ্মণ্যবাদীরা তাদের কোনদিন মানুষ বলে স্বীকার করেননি, স্পর্শ করেননি , এমনকি দর্শনের অযােগ্য বলেছেন । সেই হিসাবে বুদ্ধবাবু ঠিকই বলেছেন — নয়াচরে মানুষ বাস করেন না ! কেমিক্যাল হাব করতে সালেম কাদের ডাকছেন ? ডাকছেন আমেরিকান বহুজাতিক ডাউ কেমিক্যালসকে । এদের বিশ্ব জুড়ে অপকর্মের সীমা নেই । জাপানে ‘ নিপ্পন চিসাে ’ কেমিক্যাল কারখানার পারদ দূষণে মীনমাটা উপসাগর বিষাক্ত হয়েছিল। তার থেকে মীনমাটা রােগের সৃষ্টি হয় । পশ্চিমবঙ্গের স্কুলপাঠ্য বইয়ে এসব পড়ানাে হয় । ক্যামিক্যাল শিল্পের দূষণে আমেরিকার প্রধান প্রধান নদীগুলি বিষাক্ত । ক্যামিক্যাল শিল্প বিষ ছড়ায় । অথচ এই শিল্পের উৎপাদিত দ্রব্য মানুষের প্রয়ােজন । ফলে মীমাংশাতাে একটা করতেই হয় । উন্নত দুনিয়ায় পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ আইন কানুন অত্যন্ত কঠোর । সে সব নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করে উৎপাদন করলে বিপুল বেশি উৎপাদন খরচ হয় । ফলে ভারতকে বেছে নেওয়া হয়েছে। বুদ্ধবাবুর সাধের কেমিক্যাল হাব আসলে উন্নত দেশগুলির আস্তাকুড় । সেজন্য বুদ্ধবাবুদের ২০০৩ সালে তৈরি করা সেজ আইন এবং মনমােহন সিং এর ২০০৫ সালে তৈরি করা সেজ আইনে দেশের পরিবেশ সংক্রান্ত আইনকে পাশ কাটাবার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে । এস ই জেড - এ মারণ কারখানা গড়তে পরিবেশ দপ্তরের কোন ছাড়পত্র লাগবে না । এস ই জেড - এর ফলে দেশের আর্থিক ক্ষতিও কম নয় ; বরং বিপুল অংকের ক্ষতি! অর্থমন্ত্রি চিদাম্বরম বলছেন-- এই প্রকল্পের ফলে ব্যবসায়িদের যে কর ছাড় দিতে হবে তার ফলে দেশের রাজস্ব কমবে বছরে ২৩৪৭৫০ কোটি টাকা । -—এ যে আসলে কতটাকা, তা ধারণা করা কঠিন।
দেশে 'সি আর জেড' নীতি ১৯৯১ সাল থেকে ছিল । Coastal Regulation Zone (CRZ) বা উপকুল নিয়ন্ত্রণ অঞ্চল নীতি তৈরি হয় সমুদ্র উপকূল অঞ্চল রক্ষা করার জন্য । এই নীতি ১৯৮৬ সালে চালু হওয়া পরিবেশ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত । সমুদ্র উপকূল অঞ্চলের পরিবেশ রক্ষার জন্য এই নীতি তৈরি হয় । এই নীতির দ্বারা সমুদ্র উপকূলকে ৪ টি ভাগে ভাগ করা হয় । একেবারে সমুদ্র কিনারা অঞ্চল হলো সি আর জেড -১ অঞ্চল । সমুদ্র তীর থেকে উপরের দিকে অর্থাৎ জমির দিকে পর পর সি আর জেড ২ , ৩ এবং সি আর জেড-৪ অঞ্চল। এই নীতির জন্য জেড -১ অঞ্চলের মধ্যে হােটেল , পর্যটন , নগরায়ন , শিল্প স্থাপন , কৃত্রিমভাবে উদ্ভিদ এবং মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী চাষ করা যায় না। তাছাড়াও সৈকত খনন প্রভৃতি করা যায় না ।
কিন্তু এই নীতি না মেনে CRZ-১ অঞ্চলের মধ্যে একটার পর একটা চিংড়ি মাছের চাষ ও ফার্ম তৈরি হয়েছে । হিন্দুস্তান লিভার , লারসেন টুব্রো , আই টি সি , আই এফ বি , এ কে জি প্রভৃতি দেশি এবং বিদেশি সংস্থা এই সব ফার্ম তৈরি করেছে । শংকরপুরে বিশাল চিংড়ির ফার্ম করেন চন্দন বসু, কমরেড জ্যোতিবসুর ছেলে । তার ভায়রা ভাই বিজন নাগের সংস্থা আই এফ বি । চন্দ্রবাবু নাইডুর ৮০,০০০ একরের চিংড়ি মাছের ফার্ম । চিদাম্বরমের চিংড়ি মাছের ফার্মের আয়তন ১৮০০০ একর । আইন রক্ষকদের ব্যবসা সবই বে-আইনী জায়গায় । ১৯৯৬ সালে এক মামলায় এইসব চিংড়ি মাছের ফার্ম বন্ধ করার জন্য সুপ্রীমকোর্ট রায় দেয় । ফলে সমস্যা থেকে বেরােবার জন্য একটা পথ দরকার হয়ে পড়ে ।
ভারতের উপকূল ভূমি ৮২০০ কিলােমিটার বিস্তৃত । এই অঞ্চল জুড়ে সারাভারতে ৩২০০ টি গ্রাম আছে । ৩০ লক্ষ মানুষ সক্রিয়ভাবে মাছ ধরেন এবং আরও ৩০ লক্ষ মানুষ এই মাছ ধরার জন্য আনুষঙ্গিক কাজের সাথে যুক্ত থেকে জীবিকা অর্জন করেন । সমুদ্র, নদী, খাল-বিলে মাছ ধরা যােগ করলে মােট প্রায় ২ কোটি মানুষ এই মাছ ধরা কাজের সাথে যুক্ত । ২০০৬ সালে মাছ রপ্তানির আয় ছিল ৮০০০ কোটি টাকা । আই টি সেক্টরের পরেই সর্বোচ্চ রফতানি মূল্য!
নয়াচরে কেমিক্যাল হাব তৈরি করার কথা বলা হচ্ছে ; কিন্তু কীভাবে ? আইন অনুযায়ী নয়াচর সিআরজেড -১ অঞ্চলের মধ্যে পড়ে । ফলে এটা হতে পারে না । সেই জন্য কায়দা করে গত ২৯ শে নভেম্বর , ২০০৭ তারিখে রাজ্য সরকার নিজেদের পেটোয়া সংস্থা রাজ্য উপকূল নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে দিয়ে নয়াচরকে সি আর জেড -১ অঞ্চলের মধ্য থেকে সরিয়ে সিআরজেড -৩ অঞ্চলে পরিবর্তন করার জন্য জাতীয় উপকূল অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হয় । কয়েকজন সদস্যের বাধা সত্ত্বেও, তা পাশ হয়ে গেছে । পাশ হবার কারণ এ ব্যাপারে কেন্দ্রও আগ্রহী । কেন্দ্র আগ্রহী হবার কারণ হলাে , যেহেতু সালেম সাহেবরা আগ্রহী বলে! সিআরজেড আইনে সিআরজেড -১ অঞ্চলের তটভূমি মৎসজীবীদের মাছ ধরা ছাড়া, অন্যকোন ক্রিয়াকর্ম নিষিদ্ধ ছিল । কিন্তু বিদেশি পুঁজি ও দেশীয় পুঁজিপতিরা আয়ের এতবড় ক্ষেত্র আর গরিব মানুষের জন্য ছেড়ে রাখতে রাজি নন । তার জন্য এই CRZ নীতির পরিবর্তন প্রয়োজন হলাে । সেজন্য, ২০০৭ সালে এই নীতি পাল্টে তৈরি হলো সি জেড এম নীতি বা Coastal Zone Management (CZM) নীতি । সরকার এবার ঠিক উল্টো অবস্থানে গিয়ে CZM নীতি মারফত সমুদ্রতট অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার করার পরিকল্পনা করা হলো।
আসলে আগে সারা পৃথিবীতে ১৮ টি বৃহৎ সমুদ্র মৎস্যক্ষেত্র ছিল, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ টিতে। এই ৬ টার মধ্যে একটা হলাে ভারত মহাসাগর । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সমুদ্রের তলায় প্রচুর মাইন পােতা হয় । পরে তা পরিষ্কার করার জন্য মাইন সুইপার ব্যবহার করা হয় । তাতে সমুদ্রের তলদেশের প্রবাল, উদ্ভিদ, ঘাস এবং বহু মাছের প্রজাতি শেষ হয়ে যায় । এভাবে ১২ টি মৎসক্ষেত্র শেষ হয়ে গেছে । ফলে , ভারত মহাসাগরের মৎসক্ষেত্রের আকর্ষণ এখন আকাশছোঁয়া । দয়ারসাগর ভারত সরকার তাই সাম্রাজ্যবাদীদের জন্য ওটা খুলে দিতে নীতি পরিবর্তন করে নেয়!
এই নতুন CZM নীতি অনুযায়ী সমুদ্র কিনার থেকে সমুদ্রের ভিতরে ১২ নটিকাল মাইল বা ২২ কিলােমিটার পর্যন্ত মৎস্যজীবীরা মাছ ধরার অধিকার হারাবেন । তার অর্থ, কার্যত তারা আর মাছ ধরতে পারবেন না । কারণ সমুদ্রের গভীরে তীর থেকে ২২ কিলােমিটারের থেকে দূরে গিয়ে মাছ ধরার যন্ত্রপাতি ও পুঁজি গরিব মৎস্যজীবীদের হবে বলে মনে হয় না । তাছাড়া দূর অঞ্চলে মাছ ধরলেও, ফিরে আসার সময় জল পুলিশ গ্রেফতার করে কেস দিয়ে বলতে পারে যে, ২২ কিলােমিটারের মধ্যেই মাছ ধরা হয়েছে । ফলে মৎসজীবীরা হয়রানি হবেন । সাধারণ মৎস্যজীবীদের সমুদ্রের মধ্যে ১৮ অথবা ২২ বা ৩২ কিলােমিটার হিসাব মেনে চলার মত প্রযুক্তি জোগাড় করা সম্ভব হবে না । আসলে মাছ ধরার ক্ষেত্র থেকে মৎস্যজীবীদের উৎখাত করে বড় ব্যবসায়ীদের সুবিধা করে দেবার নীতি এই CZM । ফলে প্রায় এককোটি মানুষ বিপর্যয়ের মুখে!
নতুন নিয়ম অনুযায়ী নয়াচয়ে আর কেমিক্যাল হাব হতে কোন অসুবিধা নেই । সেজ তৈরি করতে বাধা নেই। কার্যত ইতিমধ্যে উপকূল অঞ্চলে সেজ তৈরি করার জন্য ৫০ টির মত আবেদন জমা পড়ে গেছে সরকারের ঘরে ।
সমুদ্রের নীচে এক ধরনের ঘাস হয় , যা দিয়ে নেইলপালিশ , লিপস্টিক এবং অন্যান্য দামী প্রসাধনী জিনিষ তৈরি হয় । 'লরিয়েল ’ নামক এক বহুজাতিক কোম্পানী প্রসাধন সামগ্রীর সেজ তৈরি করার জন্য আবেদন জানিয়েছে । সি জেড এম আইন দ্রুত কার্যকরী করার জন্য সি পি এম দাবি করেছে । তাদের আগ্রহের পিছনে অন্য আর এক চক্রান্তের গন্ধ পাওয়া যায় । অতীতে সুন্দরবনতাে সাহারার হাতে প্রায় চলে গিয়েছিল । হিন্দুস্থান লিভার এবং আই টি সি - র মত বহুজাতিক ও বড় পুঁজির মালিকদের হাতে তুলে দেবার লক্ষ্যে মরিচঝাঁপিতে গণহত্যার প্রয়ােজন পড়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নানা কারণে সে চক্রান্ত কার্যকরী হয় না। এখন এই নতুন আইন তাদের হাতে যে ক্ষমতা তুলে দিচ্ছে , তাতে মনে হয় — এতদিনে তাদের যে ইচ্ছা অপূরণ থেকে গেছে , এবার তা পূরণ হতে পারে।
১৮৯৫ সালে সিসিল রােডস বলেছিলেন , “ চিরকালই আমি বলে আসছি , সাম্রাজ্য হলাে পাকস্থলীর প্রশ্ন । গৃহযুদ্ধ ( বৃটেনে ) না চাইলে সাম্রাজ্যবাদী হতেই হবে" । সাম্রাজ্যবাদ ও তার এদেশীয় বংশবদ নেতা ও রাজনৈতিক দলগুলি বিশ্বস্ততার সাথে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। যথেষ্ট ভালভাবে সাম্রাজ্যবাদের সেবা এবং জনগণকে শােষণ ও প্রতারণা করছে। কিন্তু “ নিগ্রোকে মেহনত শেখানাে যদি সাম্রাজ্যবাদের গুণ হয়, তাহলে সাম্রাজ্যবাদের বিপদ এই যে , প্রথমে কৃষি ও খনিতে , পরে শিল্প ক্ষেত্রের অপেক্ষাকৃত স্থূলতর মেহনতগুলাের ক্ষেত্রেও দৈহিক শ্রমের বোঝা ইউরোপ চাপিয়ে দেবে অশ্বেতকায় জাতিগুলির কাঁধে; আর নিজে সন্তুষ্ট থাকবে লভ্যাংশজীবীর ভূমিকা নিয়ে এবং সম্ভবত এইভাবে অশ্বেতকায় জাতিগুলির প্রথমে অর্থনৈতিক এবং পরে রাজনৈতিক মুক্তির পথ প্রশস্ত করবে ” –লেলিন ।
ভারতের নিপীড়িত জনগণের মুক্তির ইচ্ছা আজও প্রবল, তাঁদের চেষ্টা জারি আছে— দেখা যাক!
( সহায়তা : মার্কস-এঙ্গেলস রচনাবলী , লেনিন রচনাবলী , অনীক পত্রিকা , ইকনােমিক এ্যাণ্ড পলিটিক্যাল উইকলি এবং সেজ বিরােধি প্রচার মঞ্চের পুস্তিকা )
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন