(সাম্রাজ্যবাদ)
ঘাস , লতাপাতা না খাইয়ে গবাদি পশুদের মানুষের খাদ্য খাওয়ানাে অলাভজনক । তাতে হয়তো পশু দ্রুত বাড়ে ; কিন্তু তা মানুষের খাদ্যের ভাণ্ডারে টান মারে । এক পাউণ্ড গরুর মাংস তৈরি করতে গরুকে খাওয়াতে হয় আট পাউণ্ড ভুটা । শুয়ােরদের লাগে পাঁচ পাউণ্ড ভূট্টা ; আর মুরগীর ক্ষেত্রে তিন পাউণ্ড ।
খাদ্যের সংকট ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির সাথে সমস্ত নিত্য প্রয়ােজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ার সম্পর্ক কী ? পৃথিবী জুড়ে তার প্রভাব কেন ?--- এটা বিশ্বায়নের ফল । কোন দেশের অর্থনীতি এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং পরস্পর সম্পর্কিত । বিশ্ব অর্থনীতির ভাল বা মন্দের প্রভাব, কম বা বেশি প্রত্যেক দেশকে ছুঁয়ে যাবে ।
চাহিদার তুলনায় বাজারে খাদ্যের অপ্রতুলতার জন্য খাদ্যের দাম বাড়ছে ; আর তার চাপ পড়ছে নিত্য প্রয়ােজনীয় সব জিনিষের উপর । খাবার সবাইকে কিনতে হয় । গাড়িতে তেল না ভরে দু’দিন কাটানাে যায় ; কিন্তু খাদ্য না খেয়ে চলে না । এমন জিনিষের দাম বাড়লে সব বিক্রেতাই চাইবেন নিজের দ্রব্যটি বাড়তি দামে বিক্রি করে খাবারের টাকাটা তুলতে । কাউকে শ্রমবিক্রির অর্থে খাদ্য কিনতে হয় । আবার কেউ বা খাদ্য পান ফসলের জমির উপর মালিকানার জোরে । হয়তো অন্য কাউকে খাদ্যের বাজারে আসতে হয় মুনাফার অর্থ পকেটে নিয়ে । আর অনেকের কাছেই খাদ্য থাকে অধরা । তাই , খাদ্যদ্রব্যের দামের সাথে অন্য জিনিষের দামের সম্পর্ক থাকেই ।
পৃথিবীতে দেশ ভেদে খাদ্য উৎপাদনে পার্থক্য আছে । আফ্রিকায় ৯.৯ কোটি হেক্টর চাষের জমিতে ১৪.৬ কোটি টন খাদ্য উৎপাদন হয় । উত্তর আমেরিকায় ৭.১ কোটি হেক্টর জমিতে ৩৯.৮ কোটি টন খাদ্যশস্য উৎপাদন হয় । ইউরােপে ১১.৮ কোটি হেক্টর জমিতে খাদ্য উৎপাদিত হয় ৪০.৪ কোটি টন । দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় ৫.৩ কোটি হেক্টর জমিতে ১৯.৯ কোটি টন খাদ্য উৎপাদন হয় । এটা কয়েক বছর আগের হিসাব । এশিয়ায় খাদ্য উৎপাদন অনেকটা বেড়েছে । ভারতে এ বছর উৎপাদন হয়েছে ২৩ কোটি টনের সামান্য বেশি খাদ্যশস্য ।
চীনে এক হেক্টর জমিতে ৬.২৬ টন ধান উৎপাদন হয় । হেক্টর প্রতি ভারতে ধানের ফলন হয় ৩.১২ টন । মার্কিন দেশে হেক্টর প্রতি ধান হয় ৭.৬৯ টন । নাইজেরিয়ায় মাত্র ১.৪৪ টন । গমের ক্ষেত্রে হেক্টর প্রতি উৎপাদন ভারতে ২.৬ টন , নাইজেরিয়ায় ১.১ টন , চীনে ৪ . ৪৫ টন । মার্কিন দেশ ও ইউরােপে গমের উৎপাদন হেক্টর প্রতি আরও বেশি ।
ফলনের এই পার্থক্যের কারণ দেশ ভেদে কৃষির উৎপাদন ক্ষমতার ভিন্নতা । একটা সময় পর্যন্ত উৎপাদন ক্ষমতার ভিন্নতা হতো জমি ভেদে উর্বরাশক্তির পার্থক্যের জন্য। কিন্তু এখন উৎপাদন ক্ষমতায় ভিন্নতার কারণ আলাদা। মূলত কৃষি প্রকৌশল যে দেশের উন্নত, সেদেশের জমিতে ফলনের হার বেশি। জমির উর্বরতা প্রশ্নে বলা যায়--- ভারতের জমি, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের জমি উর্বরশ্রেণীর। এখানে জলের পর্যাপ্ত উৎস আছে, তাই এখানে ফলনবৃদ্ধির চেষ্টায় সফলতা অর্জন করাও সহজ।
আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশ, এমনকি চীনে কৃষি উৎপাদনে বিপুল অগ্রগতির কারণ প্রকৌশলের উন্নতি। কৃষির উন্নয়নে তারা পুঁজি বিনিয়োগ করেছে। কৃষিতে পুঁজি বিনিয়োগ অলাভজনক নয়; তবে অকৃষিক্ষেত্রে পুঁজি বিনিয়োগ, কৃষিক্ষেত্রে বিনিয়োগের থেকে লাভ বেশি হয়। ফলে মুক্তবাজার অর্থনীতির নিয়মে শিল্পের থেকে কৃষিতে পুঁজি বিনিয়োগ হয় ধীরগতিতে। তাই খাদ্যসংকট দেখা দেওয়ার বিপদ থেকেই যায়।
কৃষিতে সংকট মানেই খাদ্যসঙ্কট। আর খাদ্য সংকট হলে শিল্প-কারখানা ও অফিস কাছারীর শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন বাড়াতে হয়। আমাদের দেশে যা মহার্ঘভাতা নামে পরিচিত। আমাদের দেশে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি হলে শ্রমিক-কর্মচারীর মহার্ঘভাতা বাড়িয়ে ক্ষতি পুষিয়ে দেবার রীতি আছে। কিন্তু কর্মচারীদের বেতন বাড়ালে শিল্প কারখানার মালিকদের মুনাফা কমে যায়।
বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করে হয়তো খাদ্যসংকট সামাল দেওয়া যায় কিন্তু সব সময় তা নাও হতে পারে। খাদ্য নিয়ে এই ঝুঁকি নেওয়া মারাত্মক হতে পারে। তাই উন্নত দেশগুলি এই ঝুঁকি নিতে চায় না, তারা কৃষিতে প্রচুর পরিমাণ টাকা ভর্তুকি দেয়--- যা এখনও চালু আছে। যথেষ্ট বিনিয়োগ করে কৃষিক্ষেত্রকে মজবুত রাখা হয় বলেই সেসব দেশে ফসলের ফলনহার ভালো থাকে।
শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রে পুঁজি বিনিয়োগে মুনাফা বেশি হয় ; কিন্তু কৃষি হল এমন একটা উৎপাদন ক্ষেত্র যা মার খেলে শিল্পক্ষেত্র বা পরিষেবা টিকতে পারেনা। এ বিদ্যা বা জ্ঞান ইউরোপ-আমেরিকা অর্জন করেছে; কিন্তু দুঃখের কথা বিশ্বায়নের হিড়িকে বিদেশি পুঁজি নিয়ে শিল্প গড়তে পাগল হয়ে ওঠা তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রের কর্ণধাররা এই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিতে রাজি নন। উন্নত দেশের ভর্তুকি পুষ্ট কৃষিপণ্য বিনা বাধায় নিজেদের দেশে ঢুকতে দিয়ে তারা কৃষকদের সর্বনাশ করেছেন এবং কৃষি অলাভজনক হওয়ায়, কেউ আর কৃষিতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নন। ফলে, কৃষির ভিত্তিটাই নড়বড়ে হয়ে গেছে। সেই জন্য বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্যের দাম বাড়লে তৃতীয় বিশ্বের সরকারের পক্ষে তা সামাল দেওয়া কঠিন কাজ। এখন ভারতও ধাক্কা খাচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে কৃষির পরিকাঠামো উন্নয়নের একটা প্রচেষ্টা এদেশে সত্তরদশক পর্যন্ত ছিল। নয়া উদার আর্থিক ও শিল্পনীতির ধাক্কায় তা উঠে গেছে। অলাভজনক হওয়ায় বেসরকারি পুঁজিও কৃষিতে বিনিয়োগ হচ্ছে না। যতটুকু যা বেসরকারি পুঁজি বিনিয়োগ হচ্ছে তা রপ্তানির নির্ভর ক্ষেত্রে অর্থাৎ উৎপাদন করে বিদেশে রফতানি করে মুনাফা করার জন্য। তার সঙ্গে দেশের মানুষের খাদ্যের প্রয়োজনের কোন সম্পর্ক নেই। ফলে, আমাদের দেশ ও অন্যান্য বহু দেশ "ক্ষুধিত মানুষের প্রজাতন্ত্রে" রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারে।
রাষ্ট্রপুঞ্জের হিসাব মতো 1950 সালে পৃথিবীতে মাথাপিছু খাদ্য উৎপাদন হয়েছিল 248 কিলোগ্রাম। বর্তমানে পৃথিবীতে 660 কোটি মানুষ এবং খাদ্যশস্য উৎপাদন 207.5 কোটি টন অর্থাৎ মাথাপিছু 318 কিলোগ্রাম খাদ্য উৎপাদিত হয়েছে।
জাতিসংঘের হিসাবে একজন মানুষের দৈনিক 1960 ক্যালরির বেশি খাদ্যের প্রয়োজন। যারা 1960 ক্যালরির কম খাদ্য পান, তাদের দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী মানুষ বা ক্ষুধার্ত মানুষ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু উপরের হিসাব মত পৃথিবীর মানুষের মাথাপিছু যে 318 কিলোগ্রাম খাদ্য উৎপাদন হয়, তাতে প্রতিটি মানুষ প্রায় 3000 ক্যালরি শক্তি ওই খাদ্য থেকে পেতে পারেন। কিন্তু খাদ্যের সুষম বন্টন না হওয়ার কারণে পৃথিবীর 100 কোটি মানুষ 12 মাস ক্ষুধার শিকার এবং আরো 200 কোটি মানুষ পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাবে অপুষ্টির শিকার।
হিসাবে দেখা যাচ্ছে মার্কিন দেশের মাথাপিছু যে খাদ্যের সংস্থান থাকে, তা ভারতের মাথাপিছু খাদ্য সংস্থানের চেয়ে 6 গুণ বেশি। মার্কিন দেশে মাথাপিছু খাদ্য সংস্থান বছরে 990 কিলোগ্রাম; আর ভারতে 155 কিলোগ্রাম। অন্য একটি মতে এই হিসাব মার্কিন দেশে জনপ্রতি 1046 কিলোগ্রাম, ভারতে 178 কিলোগ্রাম (2008 সালে ভালো ফসল উৎপাদনের জন্য তা কমবেশি 200 কিলোগ্রাম), চীনে 291 কিলোগ্রাম প্রভৃতি। অর্থাৎ সাহেবরা দৈনিক খাবার খান 3 কিলোগ্রামের কাছাকাছি খাদ্য। অনেকেরই অসম্ভব বলে মনে হয় নাকি?-- গরু শুয়োর ও হাঁস-মুরগি খাদ্য খায়, তারপর সাহেবরা ওই মাংসটা খেয়ে নেন। অর্থাৎ কিছু খাদ্য পরোক্ষভাবে খাওয়া হয়। পরোক্ষভাবে খাদ্যশস্য সাহেবদের মতো সব দেশের মানুষ কমবেশি খেয়ে থাকেন। সাহেবরা বছরে মাথাপিছু মাংস খান 117.7 কিলোগ্রাম। ভারতীয়রা বছরে মাথাপিছু 3.5 কিলোগ্রাম মাংস খান, চীনারা খেয়ে থাকেন 49.5 কিলোগ্রাম মাংস। সাহেবরা প্রতিজন, প্রতিদিন গড়ে আধা কিলোগ্রাম খাদ্য নষ্ট করেন--- যা দিয়ে প্রায় 50/60 কোটি মানুষকে প্রতিদিন পেটপুরে খাওয়ানো যায়। অসম বন্টনের জন্য ভারতের 67 শতাংশ মানুষ প্রয়োজনীয় ক্যালরির সমান খাদ্য পান না।--- যদিও ভারতের গুদামে বাড়তি চাল-গম পচে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। অন্যদিকে মার্কিন দেশে এত প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও, সে দেশের প্রায় 4 শতাংশ মানুষ খাবারের জন্য দুশ্চিন্তায় থাকেন। ইচছা করে খাদ্য নষ্ট করার রেকর্ড আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতেরও।
একর বা হেক্টর প্রতি উৎপাদনের হিসাব থেকে বোঝা যায়--- আমাদের দেশে উন্নত পদ্ধতি ও কৌশল ব্যবহার করে ফলন বাড়ানোর বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তার জন্য প্রয়োজন কৃষিতে বিনিয়োগ। সরকার তা করতে পারে। উন্নত দেশের মতো ভর্তুকি দিতে পারে কৃষিশিল্প চাঙ্গা রাখার যিনি। কৃষিক্ষেত্র চাঙ্গা রাখতে পারলে শিল্পসহ গোটা দেশ ও জাতি চাঙ্গা হয়ে উঠবে। কিন্তু কেন্দ্রতো বটেই, এমনকি যারা বলছেন 'কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প ভবিষ্যৎ'--- তারাও রাজ্যের কৃষি উন্নয়নে কিছুই করেনি। 30 বছর ধরে ভূমি সংস্কার ও অপারেশন বর্গা নামের ভাঙা রেকর্ড বাজিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে! পশ্চিমবঙ্গের সেচ ব্যবস্থার উন্নতি হয়নি, এমনকি তা বিহারের থেকেও খারাপ! কৃষিভিত্তিক ছোট- মাঝারি শিল্প গড়ে তোলা হয়নি। কৃষকরা যাতে ফসলের ন্যায্য দাম পান, সরকার তারজন্য কোন ব্যবস্থা করেনি। কৃষকদের পুঁজির জোগান দিয়ে সুদখোর মহাজনদের হাত থেকে কৃষকদের রক্ষা করার চেষ্টা করেনি। খরা- বন্যার মোকাবিলা করার জন্য কোনো পরিকল্পনা নেই। সস্তায় উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক সরবরাহের জন্য কোনো বরাদ্দ করেনি, করেনি তারজন্য কোন আন্দোলন। কৃষক পরিবারের সন্তান-সন্ততিদের শিক্ষিত ও সচেতন করার কোন পরিকল্পনা নেয়নি। গ্রামগুলির মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোন চেষ্টা নেই। শুধু নেই আর নেই!
মূল্যবৃদ্ধির কামড় গায়ে লাগেনা, যদি মানুষের আয়ু বৃদ্ধি হয় অথবা আয় বৃদ্ধি হলে মূল্যবৃদ্ধি জনিত কষ্ট কম হয়। দেশের মধ্যে এ রাজ্যের মানুষের মাথাপিছু আয় সব থেকে কম। মজুরশ্রেণীর মানুষের ভিন রাজ্যে পাড়ি দেবার মধ্য দিয়ে তা প্রমাণ হয়ে যায়। কৃষি মজুরদের সারা ভারতের গড় মজুরি 61.23 টাকা (পুরুষ) এবং 44.60 টাকা (মহিলা), যেখানে পশ্চিমবঙ্গে তা অনেক কম। মানুষের আয় বৃদ্ধির ব্যাপারে বামফ্রন্ট সরকার যে চূড়ান্ত ব্যর্থ, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
বিপিএল তালিকাভুক্ত মানুষেরা কিছু সুযোগ-সুবিধা পান। বামফ্রন্ট সরকারের মিথ্যা মর্যাদা রক্ষার জন্য বহু গরিব মানুষকে বিপিএল তালিকাভুক্ত করতে অস্বীকার করেছে। যত বেশি মানুষ ওই তালিকাভুক্ত হবেন, ততোই বামফ্রন্ট সরকারের উন্নয়নের মিথ্যা গল্পের ফানুস ফুটো হয়ে যায়। তাই তাদের অনেককে বিপিএল তালিকাভুক্ত করা হয় নি। ফলে গরিব মানুষ আরো বেশি সমস্যায় পড়ে অবস্থা ঘোরানো হচ্ছে। বামফ্রন্ট কেন্দ্রের বঞ্চনা বলে শুধুই চিৎকার করে গলা ফাটাচ্ছে--- যাতে মানুষকে বোকা বানানো যায়!
গ্রামীণ মানুষের দরিদ্রতম ও দুর্বলদের খাদ্য সুরক্ষার জন্য অন্ত্যদয় ও অন্নপূর্ণা যোজনা তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে 19 লক্ষ অন্ত্যদয় এবং 60 হাজার অন্নপূর্ণা যোজনার কার্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় কুড়ি লক্ষ মানুষের সরকারের কাছ থেকে দুবেলা খাবারের জন্য সহায়তা পাওয়ার কথা। তারা তা ঠিকমতো পাচ্ছেন না। দুর্নীতিবাজদের কবলে পড়ে যোজনা উচ্ছন্নে যাচ্ছে। রেশন ব্যবস্থা অবস্থাও শোচনীয়। প্রকৃতপক্ষে 20 লক্ষ কয়, এই সব যোজনায় পশ্চিমবঙ্গের এক কোটিরও বেশি মানুষ কার্ড পাওয়ার যোগ্য।
গরিব মানুষের রোজগারের জন্য 'জাতীয় গ্রামীণ রোজগার সুরক্ষা প্রকল্প' আছে। পশ্চিমবঙ্গে এই প্রকল্পের কাজ এত খারাপ যে, এবছর 650 কোটি টাকা কেন্দ্রে ফেরত গেছে। পাবার যোগ্য অসংখ্য মানুষ জব কার্ড পাননি। যারা পেয়েছেন মাত্র গড়ে 14 দিনের কাজ পেয়েছেন তারা। বামফ্রন্ট সরকারের অপদার্থতার এর থেকে বড় প্রমান আর কী হতে পারে! পশ্চিমবঙ্গের কৃষিক্ষেত্রে পুরুষ মজুরদের গড় মজুরি 44.58 টাকা, মহিলাদের 32.35 টাকা। প্রকল্পটি কার্যকর হলে মজুরি বেড়ে দাঁড়ায় 75 টাকা। তাই গ্রামের জমির মালিকদের স্বার্থে এই সরকার ওই প্রকল্প কার্যকরী করতে চায় না। ন্যূনতম মজুরি আইন এই রাজ্যে কার্যকরী হয় না। এসব কার্যকরী না করার অন্য এক গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো---এই প্রকল্প ঠিক মত কার্যকরী হলে দলিত মুসলমান মানুষের উপকৃত হন---যা এই সরকার চায়না।
জাতীয় গ্রামীণ রোজগার সুরক্ষা প্রকল্পে তামিলনাড়ুতে 61 দিন, মহারাষ্ট্রে 56 দিন, রাজস্থানে 53 দিন, পাঞ্জাবে 42 দিন, ছত্রিশগড়ে 45 দিন, ঝাড়খন্ডে 32 দিন কাজ পেয়েছেন কার্ডধারী গরিব মানুষেরা। পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তরে সব প্রকল্প নিয়ে যা বরাদ্দ থাকে, হিসাবে দেখা যাচ্ছে সেই বরাদ্দ থেকে খরচ হয় গড়পড়তা 30 শতাংশ, তার বেশি কোন মতেই নয়।
দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করার জন্য সরকার রাজ্যের 4612 টি গ্রামকে পিছিয়ে পড়া গ্রাম হিসেবে চিহ্নিত করে। গ্রামগুলি মূলত উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদা, পুরুলিয়া ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার। গ্রামগুলির 20 শতাংশ মানুষ দিনে এক বেলা খাবার পান। জেলাগুলির 92 টি ব্লকে আদিবাসী মানুষের সংখ্যা 30 শতাংশ, তপশিলি জাতির মানুষের সংখ্যা 28 শতাংশ এবং মুসলিম জনসংখ্যা 27%। মোট জনসংখ্যার 32% ভূমিহীন। 82% চাষ বৃষ্টির উপর নির্ভরশীল। পরিবারগুলির মধ্যকার 51% এর আয় 500 টাকা থেকে 1 হাজার টাকার মধ্যে। খাদ্য কেনারও সামর্থ তাদের নেই।
গোটা বিষয়টি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়--- মূল্যবৃদ্ধি ও তজ্জনিত যে সমস্যা দেশের মানুষ ভোগ করছেন, তার জন্য দেশের কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকারগুলি--- উভয়ের দায় ও দায়িত্ব আছে। কেউ সে দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না। আবার কিছু বিষয় আছে যা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির উপর নির্ভরশীল। সেখানে দেশের সরকারের করার বিশেষ কিছু নেই। তবে সমস্যা মোকাবিলায় সরকার স্বল্পকালীন ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করে বিপর্যয় মোকাবিলা করতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো--- কেন্দ্র বা রাজ্য, কেউ যখন দায়িত্ব স্বীকার করতে চায় না, তখন তাদের কাছ থেকে কি বা প্রতিকার আশা করা যায়!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন