মতুয়া ধর্ম ও আন্দোলন
মতুয়া ধর্ম-দর্শন ও আন্দোলনের স্রষ্টা হরিচাঁদ ঠাকুর। তাঁর পূর্ব নাম ছিল হরিদাস বিশ্বাস। তাঁরা ছিলেন পাঁচ ভাই, হরিদাস মেজোভাই। সবাই ধার্মিক, ধর্মপরায়ন ভাল মানুষ ছিলেন। তাই এলাকার লোকজন ঠাকুর নামে ডাকতেন, পরে পদবী হয়ে যায় ঠাকুর। হরিদাস নামে না ডেকে গুণমুগ্ধরা বলতে শুরু করেন হরিচাঁদ।
এই পরিবারের আদি গ্রাম ফরিদপুর জেলার সফলাডাঙ্গা গ্রামে। সম্পন্ন চাষী পরিবার ছিল ; কিন্তু জমিদার-গোমস্তার সাথে বিবাদ ও বিরোধের কারণে মিথ্যা মামলা/অভিযোগ দায়ের করে তাঁদের সর্বস্বান্ত করা হয়, পরিবারটি ভিটা থেকে উচ্ছেদ হয়। কিছুদিন রামদিয়া গ্রামের সেনদের বাড়িতে থাকার পর তাঁরা তাঁদের মামাদের গ্রাম ওড়াকান্দিতে স্থায়ী হন।
ওড়াকান্দি ও সংলগ্ন বিস্তীর্ণ অঞ্চল হলো ডোবা বিল এলাকা এবং এ ছিল চন্ডাল মানুষ অধ্যুষিত।
হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্ম হয় ১৮১২ সালে, মারা যান ১৮৭৮ সালে ৬৬ বছর বয়সে। মতুয়া ধর্ম ও আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে দুটি নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হয়। অন্য নামটি হরিচাঁদ পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুর, তাঁর জন্ম ১৮৪৬ সালে এবং মৃত্যু ১৯৩৭ সালে। অর্থাৎ দুইজন প্রতিষ্ঠাতাদের কর্ম চঞ্চল সময়কাল মোটামুটি ১০০ বছর।
বাংলার অধিকাংশ চন্ডালের (পরে পরিবর্তিত নাম নম:শূদ্র) বসবাস পূর্ববঙ্গে। হরিচাঁদ ঠাকুরের বয়স যখন ২৫ বছর, তখন সম্ভবত চন্ডালদের মধ্যে একজন মানুষ ছিলেন না, যিনি স্বাক্ষর। হরিচাঁদ ঠাকুর নিজেও ছিলেন নিরক্ষর। বাংলার সমাজে চন্ডালরাই ছিলেন সবচেয়ে ঘৃণিত, দরিদ্র, নিন্দিত ও অবিচারের শিকার! তাঁরাই হলেন বাংলার অস্পৃশ্য সমাজের সিংহভাগ।
হরিচাঁদ ঠাকুরের বাল্যকাল শুরু হয় রাখালের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে, তিনি গরু চরাতেন। তাঁদের পরিবারে সাধু-সন্যাসী ও নানা ধরণের মানুষ যাতায়াত করতেন। সেই সূত্রে বা কোনভাবে হরিচাঁদ কিছু চিকিৎসা বিদ্যা অর্জন করেন। অল্প বয়সেই কিছু পশু ও মানুষের চিকিৎসার ক্ষেত্রে তিনি সাফল্য পান। ওইসব প্রত্যন্ত গ্রামে চন্ডালদের চিকিৎসা পাওয়ার কোন সুযোগই ছিল না। তাই
তাঁর এই চিকিৎসা বিদ্যা ও ক্ষমতার কথা এক গ্রাম থেকে অন্যগ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলের চন্ডালদের মধ্যে পরিচিতি পান, গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেন। তাঁর এই পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা পরবর্তী জীবন ও কর্মে কাজে লাগে।
বর্ন বিভক্ত হিন্দু সমাজে সেই সময়কালে চন্ডালদের কী দুরবস্থা ছিল, তার বর্ণনা প্রয়োজন পড়ে না। শুধু এটুকু বলে রাখা যায় যে, হৃদয়হীন ও অমানবিক ব্রাহ্মণ সমাজ এবং অন্যান্য বর্ণ হিন্দুরা চন্ডালদের পশুর থেকে অধম মনে করতেন এবং নিরন্তর তাঁদের প্রগতির পথ আটকাতে চক্রান্ত করে যেতেন!
হরিচাঁদ ঠাকুরের পরিচিতি হবার কারণে এবং মানুষের প্রয়োজনে তাঁকে গ্রামান্তরে যেতে হত এবং হয়তো সেই সূত্রে তিনি চন্ডালদের দুরবস্থা সম্পর্কে অনেক বেশি ওয়াকিবহাল হন। তাঁর সংবেদনশীল মন এবং অসাধারণ মনীষা মানুষের দুরবস্থা মোচন করে মুক্তি দেবার জন্য আকুল হয়, সৃষ্টি করেন এক মহান দর্শন, মতাদর্শ---মতুয়া ধর্ম ও আন্দোলন।
বলা যায়---মতুয়া ধর্ম ও মতাদর্শের মূল গ্রন্থ দুইটি। শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত এবং শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ চরিত। লীলামৃত লিখেছেন লোককবি তারক সরকার এবং গুরুচাঁদ চরিত লিখেছেন মহানন্দ হালদার মহাশয়। তারক সরকার সামান্য লেখাপড়া জানতেন এবং তিনি ছিলেন বিখ্যাত লোককবি, কবিগান করতেন। আর মহানন্দ হালদার ছিলেন আরো খানিকটা পরবর্তীকালের আধুনিক শিক্ষিত মানুষ। তিনি ছিলেন গ্রাজুয়েট, এল এল বি। ভালো চাকরি করতেন, চাকরি ছেড়ে রাজনীতির সাথে যুক্ত হন এবং বিধায়কও নির্বাচিত হন।
মতুয়া ধর্ম, দর্শন ও আন্দোলনের যা কিছু, তা এই দুটি গ্রন্থ নির্ভর, এগুলিকে মতুয়া ধর্ম-দর্শনের প্রামাণ্য দলিল/তথ্য হিসাবে মানা হয়। প্রকৃতপক্ষে এই দুই গ্রন্থের মধ্যে এক নুতন দার্শনিক ভাবনা ও বহু অজানা, অপ্রচারিত ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছে।
শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছেন শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ চরিতের লেখক মহানন্দ হালদার। তিনি ভূমিকার এক জায়গায় লিখেছেন, " (লীলামৃত গ্রন্থের) গ্রন্থকর্তা কবি রসরাজ (তারক সরকার) মহোদয় কবিগান করিতেন এবং 'চৈতন্য চরিতামৃত' গ্রন্থ তাঁহার প্রিয়পাঠ্য ছিল, সুতরাং শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত রচনাকালে অজ্ঞাতসারে তাঁহার প্রিয়পাঠ্যের ভাবধারা নিজ গ্রন্থে ফুটিয়া উঠিয়াছে।"---মহানন্দ হালদারের এই বক্তব্য বেঠিক নয়, বরং তিনি যা লিখেছেন সেটাই স্বাভাবিক ও সত্য। তাই লীলামৃত গ্রন্থ পাঠ করে মতুয়া মতাদর্শের মৌলিকতা অনুধাবনের জন্য এই বিশেষ বিষয়টি খেয়াল রাখা দরকার। নাহলে নানা ধরণের বিচ্যুতির সম্ভাবনা থেকে যায়। প্রকৃতপক্ষে এই বিচ্যুতি ও বিকৃতি ইতিমধ্যে ঘটে গেছে শুধু নয়, বিচ্যুতি ও ভুল ব্যাখ্যা এখন প্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। সেজন্য পাঠকদের উচিত---হরিচাঁদ ঠাকুরের নিজের মুখনিসৃত কথা এবং লেখক ও ভক্ত-শিষ্যদের বলা কথাগুলি, বর্ণনা ও ব্যাখ্যা আলাদা করে বিবেচনা করা। তাহলেই হরিচাঁদের ভাবনার কাছাকাছি পৌঁছনো সম্ভব।
এ বিষয়ে মহানন্দ হালদার সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। তিনিও একটি রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত ছিলেন, তাই তাঁর ভাবনার উপরেও দলীয় রাজনীতির প্রভাব পড়ে। গুরুচাঁদ ঠাকুরের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনার সময়ে তাঁরও কিছু ভ্রান্তি হয়েছে বলে মনে করার কারণ আছে।
অন্যান্য অনেক চন্ডাল পরিবারের মতোই হরিচাঁদ ঠাকুরের পরিবার ছিল বৈষ্ণব ভক্ত, তাঁদের বাড়িতে বৈষ্ণবদের যাতায়াত ছিল। কৈশোর থেকেই হরিচাঁদ এইসব বৈষ্ণবদের ক্রিয়াকান্ড লক্ষ্য করতেন। তাঁদের কথাবার্তা, চালচলন, শুচি-অশুচি, কর্মবিমুখতা--- মনে হয় এসব তাঁর খুব অপছন্দ ছিল। লীলামৃত গ্রন্থে আমরা বালক হরিচাঁদের কিছু বর্ণনা পাই---
"ঝোলা রাখি বৈষ্ণবেরা স্নানে, পানে যায়।
উজাড় করিয়া ঝোলা ঠাকুর ফেলায়।।
মনে মনে বলে 'হারে ভেকধারী ভন্ড।
ভাবে করো চোরাচুরি এমনি পাষন্ড'।।
দুরন্ত অশান্ত পুত্রে পিতা দেয় দন্ড।
কেঁদে বলে হরিচাঁদ বৈরাগীরা ভন্ড।।"
এই বর্ণনায় বোঝা যায় যে, কিশোর বয়স থেকেই হরিচাঁদের প্রচলিত হিন্দুধর্মের নানা কুসংস্কার, আচার সর্বস্বতা, অনাচার, অমানবিক নীতি নির্দেশ অপছন্দ ছিল এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে তিনি বিষয়গুলি সম্পর্কে আরো বেশি অবগত হন। তাঁর মন ব্যথিত ও বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তিনি সমাজকে পরিবর্তন করে নুতন দিশা দেবার চেষ্টায় ব্রতী হন।
হিন্দুধর্মের শুচি-অশুচি, আচার অনুষ্ঠান সম্পর্কে তাঁর ধ্যানধারণার আরো কিছু আভাস পাওয়া যায় লীলামৃত গ্রন্থে---( দশরথ বিশ্বাস নামে এক ধার্মিক ব্যক্তিকে হরিচাঁদ বলছেন)
"তুইতো বিশ্বাস , আমি বড় অবিশ্বাস।
তন্ত্রে মন্ত্রে শৌচাচারে না হয় বিশ্বাস।।
কেনবা আসিলি বাছা আমার নিকটে।
তুই শুদ্ধাচারী, শৌচ মোর নাই মোটে।।
তিন বেলা সন্ধ্যা কর, আরো স্নানাহ্নিক।
স্নান পূজা সন্ধ্যা আহ্নিক মোর নাহি ঠিক।।
কুকুরের উচ্ছিষ্ট প্রসাদ পেলে খাই।
বেদ বিধি সদাচার/শৌচাচার নাহি মানি তাই।।
তিন বেলা স্নান করে কে হয় বৈরাগী?
জলে ডুবে পানকৌড়ি সেও কি বৌরাগী?
অঙ্গ ধৌত বস্ত্র ধৌত ছাপা জপমালা।
বহিরঙ্গ বাহ্যক্রিয়া সব খেলাধুলা।।
যতদিন নাহি ঘোচে চিত্ত অন্ধকার।
ততদিন শৌচাচার ডুবাডুবি সার।।"
হরিচাঁদ নিজে নিরক্ষর ছিলেন। জন্মগ্রহণ করেন এমন এক পিছিয়ে পড়া সমাজে, যেখানে বৌদ্ধিক বিকাশে সহযোগিতা পাবার ও দেবার কেউ ছিলেন না। বসবাস করতেন এক বিচ্ছিন্ন সমাজে, যাঁদের পৃথিবীর প্রগতির সাথে যোগাযোগের কোন পথ ছিল না। এই সমাজের মধ্যে থেকে আলোর সন্ধান করার একমাত্র সংকেত ছিল চন্ডাল সমাজের প্রতি ঘৃণা, অন্যায় ও অবিচার। হরিচাঁদ ঠাকুর তাঁর অসাধারণ মনীষা নিয়ে নিজের মত করে সেই কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, শুরুতে হরিচাঁদ ঠাকুরের পরিচিতির মূল কারণ ছিল চিকিৎসা বিদ্যায় তাঁর পারদর্শিতা। তাঁর চিকিৎসা পদ্ধতির কিছু বর্ণনা আমরা লীলামৃত গ্রন্থে পাই--
"প্রভু বলিতেন যদি রোগে মুক্তি চাও।
যে রোগের বৃদ্ধি যাতে তাই গিয়ে খাও।।
তিল চাউলের ছাতু পাকা রম্ভা দিয়া।
খাওয়াস পিতলের পাত্রতে মাখিয়া।।
সরিষার তৈল তাঁর সর্ব অঙ্গে মেখে।
নিশিভোরে সপ্তাহ খাওয়াস বালকে।।
পান্থাভাত প্রাত:কালে উদর পুরিয়া।
ইলিশ মাছের সাথে খাবে উদর ভরিয়া।।
গোচনা মাটি নিয়ে মাখ নিজ গায়।
দূর না করিও তাহা যাবৎ শুকায়।।
শুকাইয়া গেলে তাহা ধুয়ে ফেল জলে।
তিল তেল মাখ পরে অতি কুতুহলে।।
বেদনা অজীর্ণ বমি কিংবা অম্ল পিত্তে।
তেঁতুল গুলিয়া খায় পিতলের পাত্রে।। ইত্যাদি
হরিচাঁদ জাত-বর্ণের অবিচার ও অন্যায়ের সাথে সমাজের নারীদের প্রতি বঞ্চনা, অসহায়তা এবং বিচ্ছিন্নতার সমস্যাও লক্ষ্য করেছিলেন। সেজন্য তিনি তাঁর সব কাজ, প্রচার ও আন্দোলনের সাথে নারীদের যুক্ত করে নেন, তাঁদের সমান সম্মান ও গুরুত্বের কথা প্রচার করতে থাকেন, নারীদের গুরুত্ব বোঝাতে নানা উদ্যোগ নিতে থাকেন।
এ প্রসঙ্গে লীলামৃতে লিখিত একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়। ঘটনা হলো---নায়েব অন্যায়ভাবে জুতো পেটা করেছেন দশরথ নামে এক ভক্তকে। দশরথের বিরুদ্ধে কাছারিতে নালিশ হয়---
"কী মত এ গ্রামে আনিয়াছে দশরথ।
গ্রাম্য লোক নষ্ট হবে থাকিলে এ মত ।।
মেয়ে পুরুষেতে বসি একপাতে খায়।
মেয়েদের এঠে খায় পদধূলা লয়।।"
নায়েব দশরথকে প্রশ্ন করেন---
"এত মেয়েলোক কেন দেখি তোর ঘরে?
ঠাকুরে লইয়া কেন এত প্রেম করে?
দশরথ বলে বাবু মোর দোষ কিসে।
যাঁর যাঁর নারী সেই সেই লয়ে আসে।।
মালাদেবী লুটে পড়ে ঠাকুরের পায়।
ইহার বিচার প্রভু হইবে কোথায়?
প্রভু বলে তবে তোরা আয় সব নারী।
মিলাইব ধর্মসংঘ ধর্মের কাছারি।।
ভাল ভাল বস্ত্র দিল চারিদিকে ঘিরে।
চৌকি সিংহাসন করি পাতি দিল ঘরে।।
তারপর বসাইয়া দিল এক মেয়ে।
কুসুম মুকুট তাঁর মস্তকেতে দিয়ে।।
পদ্ম পুষ্প মালা গাঁথি গলে দিল তাঁর।
ঝুলাইয়া দিল মালা বক্ষের উপর।।"......
একজন নারীকে বিচারক সাজিয়ে বিচারের জন্য সভা অনুষ্ঠিত হল। এভাবে এবং নানাভাবে হরিচাঁদ নারীদের সন্মান ও গুরুত্ব দেবার শিক্ষা দিতে থাকেন।
হরিচাঁদ ঠাকুর চন্ডালদের আর্থিক দুর্গতি সম্পর্কে জানতেন এবং বুঝতে পারেন যে, তাঁদের আর্থিক সঙ্গতি না হলে সার্বিক প্রগতি সম্ভব নয়। যে ব্যাপারে তিনি মানুষকে সচেতন করতে থাকেন।
"গৃহস্থের মূলভিত্তি অর্থনীতি বটে।
বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী এই বাণী রটে।।
বাণিজ্য করিয়া হরি শিখায় সকলে।
গৃহি কত বড় হয় ব্যবসায়ী হলে।।" (লীলামৃত)
লোকশিক্ষার জন্য তিনি জমিতে/পতিত জমিতে চাষও করেন এবং অন্যান্যদের উৎসাহিত করেন। কৃষকের দুর্দশা মোচনের লক্ষ্যে তিনি নীলকুঠি (জোনাসুর কুঠি) অভিযানও করেন।
এভাবে দিনে দিনে হরিচাঁদ ঠাকুরের সুনাম গ্রামের পর ছড়িয়ে পড়তে থাকে। অনুগামী ও অনুসারী বাড়তে থাকে। তিনি বেশ ভাল সংখ্যক একান্ত অনুগত, যোগ্য ও প্রভাবশালী সহযোদ্ধা পান---যাঁদের নাম লীলামৃত ও গুরুচাঁদ চরিতে শ্রদ্ধার সাথে লিপিবদ্ধ আছে। তাঁদের সহযোগিতার ফলে এই মতাদর্শের প্রচার ও বিস্তার দ্রুত বাড়তে থাকে।
স্বাভাবিকভাবেই বর্ণহিন্দু সমাজ ও তাঁদের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো হরিচাঁদ ঠাকুরের এই উত্থান ও মতাদর্শ বরদাস্ত করতে চান নি, তাঁদের দমন করার চেষ্টা করেন, চক্রান্ত করতে থাকেন। লীলামৃত গ্রন্থে তার কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়--
"ওড়াকান্দি দাসবাড়ি এ কান্ড ঘটিল।
গ্রামবাসী দ্বিজ যত সকলে রাগিল।
ব্রাহ্মণ বৈষ্ণবে ভক্তি মোটে কিছু নাই।
দিবারাত্রি হরি বলে সেজেছে গোঁসাই।।
বেদ বিধি নাহি মানে না মানে ব্রাহ্মণ।
নিশ্চয় করিতে হবে এ দলে শাসন।।"
কাজের মধ্য দিয়ে হরিচাঁদ ঠাকুর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে থাকেন এবং এভাবে ধীরে ধীরে তিনি তাঁর চিন্তা ও ভাবনাকে সমৃদ্ধ করেন। সৃষ্টি করেন এক যুগান্তকারী মতবাদ, এক অভিনব দর্শন, মতুয়া ধর্ম ও আন্দোলন!
হরিচাঁদের গোটা নির্দেশগুলির মধ্যে ১২ টি নির্দেশ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, যাকে দ্বাদশ আজ্ঞা বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বলা যায় এই দ্বাদশ আজ্ঞাই হল মতুয়া ধর্ম ও দর্শন। এই নির্দেশগুলিকে লীলামৃত গ্রন্থে এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে---
"সুযুক্তি বিধানে প্রভু অবতীর্ণ হল।
হরিচাঁদ নামে যত ভক্তে শিক্ষা দিল।।
ভক্তি অঙ্গ জানাইতে নাম হরিদাস।
আপনা আপনি লীলা করেন প্রকাশ।।
করিবে গার্হস্থ্য ধর্ম লয়ে নিজনারী।
গৃহে থেকে ন্যাসী বানপ্রস্থি ব্রহ্মচারী।।
গৃহধর্ম রক্ষা করে বাক্য সত্য কয়।
বানপ্রস্থি পরমহংস তার তুল্য নয়।।
ঋতুরক্ষা করিবেক জীবহত্যা ভয়।
কেহবা পূর্ণ সন্যাসী নিষ্কাম আশ্রয়।।
পরনারী মাতৃতুল্য মিথ্যা নাহি কবে।
পর দুঃখে দুঃখী সদা সচ্চরিত্র রবে।।
দীক্ষা নাই, করিবে না তীর্থ পর্যটন।
মুক্তি স্পৃহাশূন্য নাই সাধন ভজন।।
যত যত তীর্থ আছে অবনী পরে।
সত্যবাক্য সমকক্ষ হইতে না পারে।।
দেহের ইন্দ্রিয় বশ না হয়েছে যার।
তীর্থে গেলে ফল প্রাপ্তি না হইবে তাঁর।।
দেহের ইন্দ্রিয় বশ করেছে যে জন।
তাঁর দরশনে সব তীর্থ দরশন।।
গৃহেতে থাকিয়া যাঁর ভাবোদয় হয়।
সেই সে পরম সাধু জানিবে নিশ্চয়।।
গৃহধর্ম গৃহকর্ম করিবে সকল।
হাতে কাম মুখে নাম ভক্তিই প্রবল।।
কিসের রসিক ধর্ম কিসের বাউল।
ধর্ম যজি নৈষ্ঠীকেতে অটল আউল।।
কেবা শূদ্র কেবা ন্যাসী কেবা যোগী হয়।
যেই জানে আত্মতত্ত্ব সেই শ্রেষ্ঠ হয়।।
জীবে দয়া নামে রুচি মানুষেতে নিষ্ঠা।
ইহা ছাড়া আর যত, সব ক্রিয়া ভ্রষ্টা।।
মতুয়া ধর্ম দর্শন তার অনুগামীদের চরিত্র গঠনের উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। এই ধর্মের নির্দেশ হলো---
"সংসারে সংসারী থাক তাতে ক্ষতি নাই।
চরিত্র পবিত্র রাখি সত্য বলা চাই।।
লৌকিক সম্বন্ধে যদি আপন স্বজন।
চরিত্রতে পবিত্রতা যদি না করে রক্ষণ।।
তাঁর সাথে খাওয়া বসা মতুয়ার নাই।
জাতিভেদ বলিলেতো এই অর্থ পাই।।
পর নারী মাতৃজ্ঞানে দুরেতে থাকিবে।
পরিহাস বাচালতা কভু না করিবে।।
মদ গাজা নাহি খাবে করিবে না চুরি।
তাস দাবা জুয়াখেলা সব দাও ছাড়ি।।
পবিত্রতা সত্যবাক্য মানুষে বিশ্বাস।
তিন রত্ন যাঁর আছে হরি তাঁর বশ।।
পর পতি পর সতী স্পর্শ না করিবে।
না ডাক হরিকে হরি তোমায় ডাকিবে।।"(লীলামৃত)
মতুয়া ধর্মে এইসব কাজ করণীয় বলে নির্দেশ যেমন আছে, একই সাথে হরিচাঁদ ঠাকুর প্রচলিত হিন্দুধর্মকেও আক্রমণ করেছেন----
"দুস্কৃতি দমন আর ধর্ম সংস্থাপন।
গৌরাঙ্গের প্রেমবানে ধরা ডুবে যায়।
সেই প্রেম শুষ্ক হলো কলির মায়ায়।।
দুরন্ত কলির মায়া প্রকৃতি সহায়ে।
ভাঙিল প্রেমের হাট কু-স্রোত বহায়ে।।
নামধর্ম নিয়ে এলো শ্রীগৌরাঙ্গ রায়।
অনিত্য সংসার বলি জীবে শিক্ষা দেয়।।
আদর্শ দেখাতে গোরা সন্ন্যাসী হইল।
সংসারের জীব কিন্তু সংসারে রহিল।।
জগত তারিতে এসে সংসার ছাড়িল।
সংসার সং-সার হলো, জগৎ ডুবিল।।(লীলামৃত)
এরপর মতুয়া ধর্ম সরাসরি ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ধর্ম ও তার শাস্ত্রগ্রন্থকে আক্রমণ করে ঘোষণা করে---
"ব্রাহ্মণ রচিত যত অভিনব গ্রন্থ।
ব্রাহ্মণ প্রধান মার্কা বিজ্ঞাপন যন্ত্র।।
ব্রাহ্মণ বর্ণের শ্রেষ্ঠ এই নীতি বলে।
শূদ্র বলি ক্ষুদ্র করে অপর সকলে।।
কথা উপকথা কত সৃজন করিল।
ঘাটে মাঠে গাছে পথে দেবতা গড়িল।।(লীলামৃত)
আমরা এই আলোচনায় বুঝতে পারি হরিচাঁদ ঠাকুরের হিন্দুধর্ম দর্শন ও তার রীতিনীতি এবং অনুশীলনের উপর কোন আস্থা, বিশ্বাস, ভরসা ছিল না। কারণ তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে বেদ, বিধি ও সদাচর-কে অস্বীকার করেছেন। আর এই তিনের বাইরে হিন্দুধর্মের কোন অস্তিস্ত নেই। তিনি পরিষ্কারভাবে হিন্দুধর্মের শাস্ত্রগ্রন্থসমূহকে ব্রাহ্মণের রচিত বলে ঘোষণা করেছেন এবং তাঁর মতে তা রচনা করা হয়েছে ব্রাহ্মণের স্বার্থে, ব্রাহ্মণের বিজ্ঞাপন হিসাবে--- ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ, ব্রাহ্মণ উপঢৌকন পাবেন, ব্রাহ্মণ অবধ্য ইত্যাদি তাতে লেখা হয়েছে। তিনি এইসব কিছুকে শাস্ত্র বলে মানেন নি এবং সবাইকে তা অস্বীকার করতে বলেছেন।
কিন্তু আজও বাস্তবত তা হয় নি ; বরং মতুয়ারা হিন্দুধর্মের একটা অংশ বা ধারা হিসাবেই রয়ে গেছেন। এমনটা কেন এবং কীভাবে হল, তার উত্তর খোঁজ করা এক জরুরি কাজ।
এর একটা কারণ আমরা শুরুতে উল্লেখ করেছি। তাহলো--- লেখক তারক সরকার লীলামৃত গ্রন্থে হিন্দুধর্মের বহু প্রভাব আরোপ করে ফেলেছেন। লোককবি হিসাবে তিনি চর্চা করতেন হিন্দু শাস্ত্রগ্রন্থসমূহ। তাই তাঁর লেখনীতে হিন্দুধর্মের প্রভাব এড়ানো সম্ভব হয় নি--- এই সমালোচনা মহানন্দ হালদার মহাশয় লীলামৃত গ্রন্থের ভূমিকা লিখতে গিয়েই স্বীকার করে নিয়েছেন। এমনকি মহানন্দ হালদার নিজেই ফাউল করে ওই ভূমিকার এক জায়গায় লিখেছেন, "তাঁহার (হরিচাঁদ) অভয়বানী শুনিয়া বাঙালি ফিরিয়া দাঁড়াইল।হিন্দু রক্ষা পাইল। গন্ডি হিসাবে হিন্দু ও হিন্দুধর্মের রক্ষা করা এবং বিরাট বিশ্বজীবনে শান্তিময় গার্হস্থ্য জীবনের পূর্ণ শান্তি উপলব্ধি করানোই শ্রীশ্রী হরিঠাকুরের আবির্ভাবের অন্তর্নিহিত সত্য।"--- এসব কিছুতে বোঝা যায় যে, হরিচাঁদের মিশন বয়ে নিয়ে যাবার দায়িত্ব যাঁদের উপর বর্তায়, তাঁরা পুরোপুরি সক্ষম ছিলেন না। ফলে বিচ্যুতি ও বিকৃতি এড়ানো যায় নি।
লীলামৃত গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, হরিচাঁদের দুই প্রধান শিষ্য--- দশরথ এবং মৃত্যুঞ্জয় এই গ্রন্থ রচনা করার পরিকল্পনা করেন এবং মৃত্যুঞ্জয় নিজ শিষ্য তারক সরকারকে তা লিখতে বলেন। তারক প্রথমে রাজি হন নি ; কিন্তু তাঁকে চাপ দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত তারক রাজি হন, অনেকটা লিখে ফেলেন। লিখিত অংশ তাঁরা হরিচাঁদকে পাঠ করে শোনান। পাঠ শুনে হরিচাঁদ গ্রন্থ লেখায় আপত্তি করেন এবং গ্রন্থ না লেখার জন্য কড়া নির্দেশ দেন---
"মহাপ্রভু (হরিচাঁদ) ডেকে বলে শুন মৃত্যুঞ্জয়।
লীলাগীতি লেখা এবে উচিত না হয়।।(লীলামৃত)
নিষেধ করার পরও লেখার জন্য জোরাজুরি করায় হরিচাঁদ বলেন---
"মহাপ্রভু বলে জান এ কর্মে পুরস্কার।
কুষ্ঠ ব্যাধি হবে চেষ্টা করিলে আবার।।"(লীলামৃত)
যদিও এই ঘটনার প্রায় ২৪ বছর পর সেই তারক সরকারই লীলামৃত রচনা করেন এবং আরো বহু বছর পর ১৯১৭ সালে কলকাতার ছিদাম মুদি লেন থেকে তা কিছুটা সংশোধিত আকারে মুদ্রিত হয়। চন্ডালদের ঘরে ভগবান জন্মগ্রহণ করেছেন বলে লেখা গ্রন্থ কলকাতার প্রেসগুলি ছাপতে চায় নি।
এখন প্রশ্ন হলো--- হরিচাঁদ কেন তারক সরকার লিখিত গ্রন্থঅংশ পাঠ শুনে এতটা কঠোরভাবে গ্রন্থ রচনার বিরোধিতা করেন?--- মনে করার যুক্তি আছে যে, তারকের লেখা তাঁর পছন্দ হয় নি। বাস্তবিক অর্থে তারকের লেখা এই গ্রন্থ হিন্দুধর্মের গন্ডি অতিক্রম করতে পারে নি, অথচ হরিচাঁদের নির্দেশাদি নিশ্চিতভাবে হিন্দুধর্মকে অস্বীকার করে এক নুতন ও প্রগতিশীল মতাদর্শের কথা বলেছে। কেউ তর্ক করতে পারেন যে, হরিচাঁদ আত্মপ্রচার চান নি বলেই গ্রন্থ রচনার বিরোধিতা করেন। কিন্তু মনে হয় এই যুক্তি ঠিক নয়। তেমন হলে লিখিত অংশ তিনি শুনতেই চাইতেন না। পাঠ শোনার পর নিষেধ করার অর্থ হলো--- লেখা তাঁর পছন্দ হয় নি।
আমার এই কথার অর্থ এই নয় যে, আমি তারক সরকারের নিন্দা করছি বা তাঁকে অযোগ্য বলছি। আসলে আমরা তারক সরকারের এই কাজের জন্য হরিচাঁদের মহান দর্শনের খোঁজ পেয়েছি, নাহলে সবই হয়তো হারিয়ে যেত। আমাদের এখন লীলামৃত গ্রন্থ থেকে মধুটুকু আহরণ করতে হবে, মানুষের উপর দেবত্ব আরোপের চেষ্টাকে যুক্তি দিয়ে প্রতিহত করতে হবে, হরিচাঁদের নির্দেশের নির্যাস খুঁজে নিতে হবে।
হরিচাঁদের মিশনকে অনেকটাই সফলভাবে এগিয়ে নিয়ে যান তাঁর যোগ্য পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুর। তিনি তাঁর পিতা হরিচাঁদের তুলনায় অনেকটা বেশি সময়ও পেয়েছিলেন। হরিচাঁদ যেখানে মাত্র ৬৬ বছর বেঁচে ছিলেন ; আর গুরুচাঁদ সুস্থ-সবল অবস্থায় বেঁচে ছিলেন ৯১ বছর। তাছাড়াও গুরুচাঁদ সহযোগিতা পান অস্ট্রেলিয়ান মিশনারি পাদ্রী ডাক্তার মিড সাহেবের, যা গুরুচাঁদের কাজ অনেকটা সহজ করে দেয়। হরিচাঁদ সৃষ্টি করেছিলেন মতবাদ--- যা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ; আর গুরুচাঁদ জোর দেন এই মতাদর্শের প্রয়োগ ও অনুশীলনের উপর।
হরিচাঁদ জীবনের অভিজ্ঞতায় শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন এবং এই শিক্ষা আন্দোলনের সূচনাও করেছিলেন। যদিও সেই কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবার বিশেষ সুযোগ ও সময় তিনি পান নি।
"বয়স সপ্তমবর্ষ পরিপূর্ণ হলো।
হরিচাঁদ গুরুচাঁদে নিকটে ডাকিল।।
বলে শুন বাপধন বলি তব ঠাঁই।
নম:শূদ্র কূলে দেখ বিদ্যাশিক্ষা নাই।।
আমার প্রাণের ইচ্ছা তোমাকে পড়াই।
বিদ্যার অমূল্য মূল্য জগতে শিখাই।। (গুরুচাঁদ চরিত)
গুরুচাঁদের বিদ্যাশিক্ষা শুরু হলো বটে ; কিন্তু তা বেশিদূর এগোয় না। কারণ শিক্ষার সুযোগ ছিল না। কিছু দূরে পরিচিতজনের বাড়িতে রেখে গুরুচাঁদকে লেখাপড়া শেখানোর যে চেষ্টা শুরু হয়েছিল, গুরুচাঁদের ১২ বছর বয়সেই তাতে ছেদ পড়ে যায়। গুরুচাঁদ মুসলমানদের মক্তবে পড়ে আরবি ও ফারসি ভাষা কিছুটা শিখেছিলেন। তখন বর্ণ হিন্দুদের বিদ্যালয়ে চন্ডালদের পড়ার কোন সুযোগ ছিল না।
গুরুচাঁদ নিজে শিক্ষার সুযোগ পান নি, তাই সমাজকে শিক্ষিত করার কাজকে তিনি একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন। তাছাড়া এই শিক্ষা আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবার নির্দেশ তাঁর পিতা হরিচাঁদের। গুরুচাঁদ চরিতে আমরা পাই----
"মোর পিতা হরিচাঁদ বলে গেছে মোরে।
বিদ্যাশিক্ষা স্বজাতিকে দিতে ঘরে ঘরে।।
বিদ্যা বিনা সব বৃথা দেখ মনে ভেবে।
বিদ্যা পেলে ধন মান সব কিছু পাবে।।
শোন স্বজাতিগণ সবে মনোকথা।
বিদ্যাশূন্য ধন মান সব জানো বৃথা।।
নম:শূদ্র জাতি যদি বাঁচিবারে চাও।
যাক প্রাণ তাও ভাল বিদ্যা শিখে লও।।
আমি বলি বিদ্যাশূন্য রবে সেই জন।
নম:শূদ্র যেন তাঁরে বলনা কখন।।
বিদ্যাবান সেই জন তাঁকে মান্য দাও।
বিদ্যার ভিত্তিতে সবে সমাজ গড়াও।।
যেইজন বিদ্যাবান পরম পন্ডিত।
সমাজের পতি তাঁরে মানিবে নিশ্চিত।।
বিদ্যা ছাড়া কথা নাই বিদ্যা কর সার।
বিদ্যা ধর্ম বিদ্যা কর্ম অন্যসব ছার।।
বাঁচ না বাঁচ প্রাণে বিদ্যাশিক্ষা চাই।
বিদ্যাহীন হলে বড় তাঁর মূল্য নেই।।
বারে বারে বলি তাই স্বজাতির গন।
শেখ বিদ্যা রাখ বিদ্যা করে প্রাণপণ।।
সবকারে বলি আমি যদি মানো মোরে।
অবিদ্বান পুত্র যেন নাহি থাকে ঘরে।।
খাও বা না খাও তাতে দুঃখ নাই।
ছেলে মেয়ে শিক্ষা দাও এই আমি চাই।।
জনে জনে ভক্তগনে প্রভু ডাকি কয়।
পাঠশালা করো সবে নিজ নিজ গাঁয়।।
গুরুচাঁদের এই উদাত্ত আহ্বান নিরক্ষর পতিত মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তা তাঁদের অন্তরের উপলব্ধিতে কম্পন জাগায়। শত সহস্র বছরের ঘুমন্ত চেতনার আগ্নেয়গিরি বিদ্যার আকাশে ডানা মেলতে উন্মুখ হয়ে ওঠে। তাঁরা যেন বিদ্যুৎ স্পর্শের মত ঝটকা খেয়ে জেগে ওঠেন এবং শিক্ষা গ্রহণের জন্য শপথ নেন--
"এত যদি বলে প্রভু সভার ভিতরে।
জনে জনে সবে মিলি করে অঙ্গীকার।।
আজ হতে সবে মোরা অঙ্গীকার করি।
বিদ্যা ঘরে নিব তাতে বাঁচি কিংবা মরি।।
ঘরে ঘরে জনে জনে করে আলোচনা।
প্রাণ দিয়ে কর সবে বিদ্যার সাধনা।। (গুরুচাঁদ চরিত)
গুরুচাঁদের আহ্বানে চন্ডালরা সাড়া দেন। নিজেদের উদ্যোগে গ্রামে গ্রামে তাঁরা পাঠশালা গড়ে তোলেন। পাঠশালাগুলি তৈরি হয় ঘরের লম্বা বারান্দায়, গাছের তলায়। কোন কোন ক্ষেত্রে গোয়াল থেকে গরু বের করে দিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে সেখানে পাঠশালার কাজ চলতে থাকে। পাঠশালা হলো বটে, কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা শিক্ষকের। চন্ডালদের কেউ শিক্ষাদানে রাজি হতে চান না। কেউ রাজি হলেও অনেক বেশি পারিশ্রমিক দাবি করেন।
এই সময়কালের একজন শিক্ষকের কথা সবাই স্মরণ করেন, তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। তাঁর নাম রঘুনাথ পন্ডিত। ঢাকা জেলার মানুষ। নিজে চন্ডাল, কোনভাবে ম্যাট্রিক পাস করেন ; কিন্তু কোন চাকরি পান না। কারণ ১৮৯২ সালে সরকার সার্কুলার জারি করে অস্পৃশ্যদের সরকারি চাকরি পাবার পথ বন্ধ করে দেয়। বর্ণহিন্দুদের চাপে সরকার এই সিদ্ধান্ত নেয় ; কারণ অস্পৃশ্যদের সাথে বসে তাঁদের পক্ষে কাজ করা সমস্যার! এই রঘুনাথ পন্ডিত গুরুচাঁদের শিক্ষা আন্দোলনে যথেষ্ট সহযোগিতা করেন।
নানা সমস্যার মধ্যে পাঠশালা তৈরি হয়, বন্ধও হয়ে যায়।আবার পাঠশালা খোলা হয়। এভাবে চলতে থাকে। এই অবস্থায় গুরুচাঁদ নিজের বাড়িতেও পাঠশালা খোলেন। কিন্তু বাঁচিয়ে রাখতে পারেন নি। অন্যান্য সমস্যার সাথে সবচেয়ে বড় সমস্যা হতে থাকে বর্ণ হিন্দুদের বিরোধিতা, তাঁরা চন্ডালদের বিদ্যাশিক্ষা রুখে দিতে বদ্ধপরিকর! শিক্ষা আন্দোলন প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ে। কিন্তু গুরুচাঁদ পরাজয় স্বীকার করতে রাজি নন, তিনি আবার নিজের গ্রাম ওড়াকান্দিতে পাঠশালা খোলেন এবং তাকে উচ্চতর বিদ্যালয়ে উন্নীত করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন।
ওড়াকান্দির পাশের গ্রাম ঘৃতকান্দি গ্রাম। এই গ্রামটি উচ্চবর্ণ হিন্দু প্রধান। এই গ্রামের একজনের কলকাতায় বড় কাঠের ব্যবসা ছিল। নাম গিরিশচন্দ্র বসু। গুরুচাঁদের ঐকান্তিক চেষ্টা দেখে তিনি বিদ্যালয় ও একটি দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য গুরুচাঁদকে সহযোগিতা করবেন বলে কথা দেন---
"এই দেশে চিকিৎসার বন্দোবস্ত নাই।
দাতব্য চিকিৎসালয় করে দিতে চাই।।
প্রভু (গুরুচাঁদ) বলে মহাশয় বড় ভাল কথা।
ব্যাধি দূর করা বটে অতি উদারতা।।
অজ্ঞান ব্যাধিতে ভরা আছে এই দেশ।
জ্ঞানের আলোকে ব্যাধি তুমি কর শেষ।।
উচ্চ বিদ্যালয় এই দেশে কোথা নাই।
উচ্চ বিদ্যালয় কর এই ভিক্ষা চাই।।
তব আজ্ঞা শিরোধার্য আমি করিলাম।
করিব ইংরাজী স্কুল কথা যে দিলাম।। (গুরুচাঁদ চরিত)
গিরিশ্চন্দ্রের এই প্রতিশ্রুতির কথা গ্রামে রটে যায়। বর্নহিন্দুরা ক্ষিপ্ত হন এবং বিরোধিতায় নামেন। তাঁরা গিরিশ্চন্দ্রকে ডেকে পাঠান এবং নিরস্ত করার চেষ্টা করেন---
"হিংসুক ব্রাহ্মণ যত ভাবে মনে মন।
উচ্চশিক্ষা পায় যদি নম:শূদ্র গণ।।
কিছুতেই নিস্তার মোরা নাহি পাব আর।
নম:শূদ্র করিবেক সব অধিকার।।
কেন সে করিবে স্কুল নমোর ভিতরে।
শিক্ষা পেলে নমো আর নাহি মানে কারে।।
চিকিৎসালয় দিবে দাও নাহি করি মানা।
স্কুল দিবে কোন মর্মে কিছুতো বুঝি না।।
নমো জাতি চিন তুমি বিদ্যা শিক্ষা নাই।
বিদ্যাহীন বলে মোরা তাঁদের চরাই।।
স্কুল যদি পায় তাঁরা বিদ্বান হইবে।
আমাদের মান বাপু কভু না রহিবে।। (গুরুচাঁদ চরিত)
গিরিশচন্দ্র পিছিয়ে যান। কিন্তু গুরুচাঁদ থেমে থাকেন নি। বরং তাঁর জিদ আরো বেড়ে যায়। নিজেদের চেষ্টায় গুরুচাঁদের নেতৃত্বে চন্ডালদের শিক্ষা আন্দোলন এগিয়ে চলে। শেষ পর্যন্ত ১৯০৮ সালে ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় ওড়াকান্দিতে এবং সেটাই হলো পূর্ববঙ্গে চন্ডালদের নিজেদের জন্য নিজেদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত প্রথম স্কুল। শুধু যে স্কুল প্রতিষ্ঠায় বাঁধা দিয়ে বর্নহিন্দুরা চন্ডালদের প্রগতি আটকানোর চেষ্টা করেছেন তা নয়। নানা পথে তাঁরা চক্রান্ত করেছেন।--- মুসলমানদের সাথে চন্ডালদের দাঙ্গায় প্ররোচিত করেছেন, পরে পিটুনি পুলিশ বসিয়ে চন্ডালদের জব্দ করার ফন্দি করেছেন। চন্ডালদের বিরুদ্ধে সরকারের দফতরে বর্নহিন্দুরা নানা খারাপ রিপোর্ট/অভিযোগ দায়ের করে তাঁদের সম্পর্কে সরকারের দৃষ্টি বিষিয়ে দেবার চেষ্টা করেছেন, যাতে সরকার তাঁদের উন্নয়নের দিকে নজর না দেয় ইত্যাদি। কিন্তু গুরুচাঁদের সফল নেতৃত্বে এইসব চক্রান্ত শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়।
গুরুচাঁদ চরিতে বর্ণ হিন্দুদের চক্রান্তের কিছু কিছু আভাস পাওয়া যায়---
"বড়ই জঘন্য কথা রিপোর্টেতে লেখা।
বিষম দায়ের হাতে পড়িয়াছি ঠেকা।।
নিজ মুখে উচ্চারণ করিতে না পারি।
আভাসেতে কিছু কিছু ব্যাখ্যা আমি করি।।"
গুরুচাঁদ ঠাকুর মুসলমানদের সাথে ঐক্য ও শান্তির সাথে বসবাসের উপর জোর দেন। তার বহু প্রমান লুকিয়ে আছে গুরুচাঁদ চরিত গ্রন্থটিতে---
"বিশেষত এক কথা কহি সকলেরে।
হিন্দু মুসলমান আছি দেশ ভরে।।
এক ভাষা এক আশা এক ব্যবসাতে।
কেনবা করিবে রণ তাঁহাদের সাথে।।
দুই ভাই এক ঠাঁই রহ মিলেমিশে।
ভাই মেরে বল কেন মর হিংসা বিষে।।
সেই সময়কালে বিধবা বিবাহের সমস্যা ছিল। গুরুচাঁদ এই সমস্যার সমাধানের জন্য চেষ্টা করেন---
বিধবার বিয়ে দিতে প্রভু রাজি হলো তাতে
ভক্তগনে জানাল সেকথা।
সেই আজ্ঞা শুনি কানে চিন্তা হল ভক্ত গনে
কারো কারো ঘুরে গেল মাথা।
সবে চুপ করে রয় কেহ নাহি কথা কয়
চিন্তা হলো ভক্ত সমাজে।
বীরমূর্তি দেবীচাঁদ হয়ে এলো আগুয়ান
করজোড়ে কহে গুরুরাজে।
পদে এই নিবেদন শুন পতিত পাবন
মঙ্গলা মঙ্গল নাহি জানি।
বিবাহ বড়ই তুচ্ছ ইহা হতে আরো উচ্চ
যদ্যপি কঠিন কিছু কহ।
দেহে প্রাণ যদি রয় আমি বলি সুনিশ্চয়
দিব তাহা তুমি যাহা চাও।
দেবীচাঁদ মহাশয় অতঃপর গৃহে যায়
বিবাহের জন্য ভারী ব্যস্ত।
বিধবার বিয়ে হল বিভিন্ন জেলায়।
প্রভু বলে থাক দেবী আর বেশি নয়।।
গুরুচাঁদের আর এক বড় কাজ নারী শিক্ষার প্রচলন। আমরা জানি যে, মাও সে তুং বলেছিলেন, "পৃথিবীর অর্ধেক আকাশ হলো নারী"। কিন্তু গুরুচাঁদ যে আরো খানিকটা অগ্রপথিক, তা আমরা অনেকেই জানি না। তিনি নারী শিক্ষার বন্দোবস্ত করেছিলেন। অজ পাড়াগাঁয়ে মাতৃসদন গড়েছিলেন। নারীর উন্নয়ন ও সম মর্যাদার জন্য প্রচার আন্দোলন চালিয়েছিলেন----
"আর কথা বলি যাহা শোন মন দিয়া।
নর নারী বিদ্যা শিক্ষা কর এক হইয়া।।
মাতা ভাল নাহি হলে পুত্র ভাল নয়।
মার গুনে ছা ভাল জানিবে নিশ্চয়।। (গুরুচাঁদ চরিত)
আর্থিক উন্নয়নের জন্যেও তিনি সবাইকে উৎসাহ দেন---
অর্থশূন্য বাক্য যথা প্রলাপ বচন।
অর্থশূন্য গৃহিজনে জানিবে তেমন।।
মহাশক্তি এই অর্থ সবে যাকে চায়।
গৃহীর অর্থতে দেখ জগৎ বাঁচায়।।
'অর্থ অনর্থের মূল' কহে যেই ভন্ড।
অর্থের জানে না অর্থ সেই অপগন্ড।।
অর্থ দেয় অন্নজল অর্থ রাখে প্রাণ।
অর্থের সংহতি রহে জীবের কল্যাণ।। (গুরুচাঁদ চরিত)
মতুয়া ধর্মের আরেক নাম গার্হস্থ্য ধর্ম। গৃহীর ধর্ম। সমাজ, ব্যক্তি ও পরিবারের উন্নতি, শিক্ষা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার রীতিনিয়ম ও উপায় নিয়ে এই ধর্মের প্রতিষ্ঠাতাবৃন্দ চর্চা করেছেন।
খুব স্বাভাবিকভাবেই সমাজ ও দেশের নানা সমস্যা ও ঘটনাবলী নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়েছে এই মতাদর্শ ও আন্দোলনের নেতাদের এবং তার মধ্যে দিয়েই তৈরি হয়েছে নানা নীতি নির্দেশ ও মতুয়াদের জন্য পথনির্দেশ।
গুরুচাঁদের শিক্ষা আন্দোলনের ফলে ১৯০০ সালের শুরুতেই চন্ডালদের মধ্যে কয়েকজন মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হন কিন্তু কোন চাকরি জোগাড় করতে পারছিলেন না। কারণ ১৮৯২ সালের সরকারি নির্দেশ--- অস্পৃশ্যরা সরকারি চাকরি পাবেন না। ফলে গুরুচাঁদের শিক্ষা আন্দোলন সতেজ রাখতে ও এগিয়ে নিয়ে যেতে ওই কালা নির্দেশ প্রত্যাহার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। চাকরির দরজা খুলতে না পারলে শিক্ষায় আগ্রহ কমে যেতে বাধ্য। তিনি এই কাজে সফল হন। ১৯০৭ সালে বাংলার সরকার এই নির্দেশ প্রত্যাহার করে নেয় এবং কয়েকজন চন্ডাল চাকরি পান। একজন ম্যাজিট্রেট, একজন সাব রেজিস্টার, একজন দারোগা, একজন ডাক্তার ও অন্য কয়েকজন চাকরি পান। ডাক্তার মিড এই কাজে গুরুচাঁদকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেন। চন্ডালদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়, শিক্ষা আন্দোলন আরো বেশি গতি পায়।
এরপর গুরুচাঁদের আন্দোলন ও চেষ্টার ফলে চন্ডালদের নাম পরিবর্তন করে নম:শূদ্র হয় ১৯১০ সালে। এটা ছিল মর্যাদার প্রশ্ন। যদিও এই নাম পরিবর্তন নিয়ে সমাজে ছোট্ট বিতর্ক আছে---এটার আদৌ প্রয়োজন ছিল কিনা। জানা যায় যে, গুরুচাঁদ নমো নামকরণ দাবি করেছিলেন কিন্তু বর্নহিন্দু অফিসারেরা চক্রান্ত করে ওই শব্দের পিছনে শূদ্র যোগ করে দেন।
গুরুচাঁদের জীবনকালে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত ও আন্দোলনের ঘটনা ও ১৯০৬ সাল থেকে অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা। এই আন্দোলন ও গুরুচাঁদের সিদ্ধান্ত থেকে বহু কিছু শিক্ষার আছে, যা প্রকৃতপক্ষে মতুয়া ধর্মের অংশ হয়ে আছে।
গুরুচাঁদ ঠাকুর নিজের গ্রাজুয়েট পুত্র শশীভূষণকে ঢাকার নবাব সলিমুল্লার কাছে পাঠান এই প্রস্তাব দিয়ে যে, নমো-মুসলমান ও অন্যান্য কৃষকদের উচিত বঙ্গভঙ্গের পক্ষে দাঁড়ানো। মন্ত্রী নবাব আলী, সলিমুল্লা ও শশীভূষণের মধ্যে কথা হয় এবং গুরুচাঁদের সেই প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং কার্যকরী করা হয়---
"সেই পরামর্শ লাগি তাঁর কাছে যাই।
তাঁর গৃহে তব পুত্রে আমি দেখা পাই।।
একসঙ্গে পরামর্শ করিনু আমরা।
মোরা নাহি মানি লব আন্দোলন ধারা।
সেই মতে দেশে আসে শশী।
নম:শূদ্র মুসলমানে করে মেশামিশি।।" (গুরুচাঁদ চরিত)
পূর্ববঙ্গে মুসলমান এবং নমোরা যদি বিরোধিতা করেন, তাহলে যেকোন আন্দোলনের জন্য যে তা বড় সমস্যা সে কথা কংগ্রেস নেতৃত্ব বুঝতে পারেন। তাই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ও সুরেন্দ্রনাথ গুরুচাঁদ ঠাকুরকে তাঁদের সাথে আন্দোলনে যোগ দেবার অনুরোধ করে চিঠি লেখেন। গুরুচাঁদ উত্তরে লেখেন---
"সত্য কথা দেশবন্ধু করি নিবেদন।
এই পথে স্বাধীনতা আসে না কখন।।
সমাজের অঙ্গে আছে যত দুর্বলতা।
আগে তাহা দূর করা আবশ্যক কথা।।
এই যে দলিত জাতি যত বঙ্গ দেশে।
ইহাদের দুঃখ কেহ দেখে নাকি এসে।।
যদি উচ্চ বর্ণ আজি তাঁহাদের চায়।
সেই পথে আছে মাত্র একটি উপায়।।
সরল উদারভাবে ভাই বলে বুকে।
টানিতে হইবে মনে নহে মুখে মুখে।। (গুরুচাঁদ চরিত)
এই প্রবন্ধ/প্রতিবেদনের এক জায়গায় মহানন্দ হালদার মহাশয়ের লেখায় কিছু ফাউল হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কৈফিয়ত হিসাবে অন্তত একটি ঘটনার উল্লেখ করে নিতে চাই। গুরুচাঁদ চরিত গ্রন্থে তিনি লিখেছেন---
"একদেশ এক ভাষা মনে এক আশা।
বিভাগ করিলে কার্য হবে সর্বনাশা।।
বঙ্গভঙ্গ রদ হল খুশি বঙ্গবাসী।
ছিন্ন বঙ্গ যুক্ত হল একসঙ্গে মিশি।।"
মহানন্দ হালদারের এই বক্তব্য যে, গুরুচাঁদ ঠাকুরের সিদ্ধান্ত ও মতামতের সম্পুর্ন বিপরীত, তা নিয়ে আলোচনার কোন অবকাশ নেই। মহানন্দ হালদারের এই ভ্রান্তির কারণ হলো--- তাঁর উপর কংগ্রেস রাজনীতির প্রভাব!
মতুয়া ধর্ম বলছে---
"যে জাতির দল নেই, সে জাতির বল নেই।
যে জাতির রাজা নেই, সে জাতি তাজা নেই।।" (গুরুচাঁদ চরিত)
মতুয়া মতাদর্শের এই তত্ত্ব মাথায় রেখে গুরুচাঁদের নেতৃত্বে খুলনায় রাজনৈতিক সম্মেলন হয়। গুরুচাঁদ নিজে সভাপতিত্ব করেন। যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল, মুকুন্দবিহারী মল্লিক, পি আর ঠাকুর প্রমূখ সেখানে অংশ নেন। গুরুচাঁদ চরিতে তার কিছু উল্লেখ আছে---
"এই সম্মেলন হতে নম:শূদ্র কোন পথে
চালনা করিবে রাজনীতি।
যাহা বলে দয়াময় (গুরুচাঁদ) সভামধ্যে পাঠ হয়
তাতে সবে জানালো স্বীকৃতি।
স্বাধীনতা পাবে যবে কারা উপকৃত হবে
সেই কথা পার কি বলিতে?
কর্তা আজ যাঁরা যাঁরা সেদিন একত্রে তাঁরা
রচনা করিবে শাসনতন্ত্র।
রাজাদের সে সভায় তোমাদের স্থান নয়
তোমরাতো বাদ্যযন্ত্র।
যুদ্ধকালে প্রয়োজন বাদ্যযন্ত্র অগণন
যুদ্ধ শেষে কে করে সন্ধান?
যদি থাক সেনাপতি তবে হতে পারে গতি
সেই গুণ তুমি আজ আন।
হরিচাঁদ ঠাকুর নীতির প্রশ্নে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন, কোন রকম আপস করতে রাজি হন নি। পক্ষান্তরে
গুরুচাঁদ ঠাকুর নিজে সংসারী, মোড়ল ও সামাজিক মানুষ ছিলেন। সমাজ, পরিবার--- সবাইকে নিয়ে তাঁকে চলতে হত। এই সব কারণে তাঁকে কিছু ক্ষেত্রে আপস-সমঝোতা করতে হয়েছে। আজ মনে হয় তার ফলাফল খারাপ হয়েছে। উদাহরণ হিসাবে ঠাকুর বাড়িতে দুর্গাপূজার কথা উল্লেখ করা যায়। গুরুচাঁদ নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁর জীবদ্দশায় ছেলে শশীকান্তের চাপে এই পূজার অনুমতি দেন পরিবারের ঐক্যের স্বার্থে। পরবর্তীকালে এখন অনেকেই এগুলিকে দৃষ্টান্ত হিসাবে উল্লেখ করেন ও নিজেদের দুর্বলতার সাফাই দেন।
এপার এবং ওপারে----ঠাকুরবাড়ির মূল জীবিকা হলো ভক্তদের দেওয়া প্রনামী, মেলার আয় ইত্যাদি। ফলে তাঁরা হরি-গুরুচাঁদকে নিজেদের পারিবারিক সম্পত্তি হিসাবে মনে করেন এবং এই সংগঠন ও আন্দোলনকে নানা কৌশলে তাঁরা কুক্ষিগত করে রেখেছেন, যোগ্য অনুগামী-অনুসারীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেন নি বরং বাঁধা দিয়ে আসছেন। আর এই পরিবারে গুরুচাঁদের পর তেমন কেউ জন্মগ্রহণও করেন নি, যিনি যোগ্যতার সাথে মতুয়া মতাদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। ফলে এই মহান মতাদর্শ আজ নানা বিকৃতির শিকার। কার্যত এখন হিন্দু রীতিনীতির সাথে মতুয়া রীতি পদ্ধতির ব্যবধান খুঁজে পাওয়া দুষ্কর!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন