অসমে এন আর সি নিয়ে সমস্যা

বন্ধুদের বিচার - বিবেচনার জন্য

অসমে এন আর সি অর্থাৎ নাগরিকপঞ্জি থেকে ৪০০৭৭০৭ জন অসমবাসীর নাম বাদ গেছে। যার জন্য তারা বে-নাগরিক বলে ঘোষিত হবার মুখোমুখি। বিভিন্ন সূত্রে যে খবর প্রকাশিত হচ্ছে তাতে পরিষ্কার যে, তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের প্রায় সবাই ভারতের বৈধ নাগরিক। তাই কর্তৃপক্ষের এই কাজ অন্যায়, দায়িত্বজ্ঞানহীনতার  পরিচয়, মানুষের প্রতি চরম অবিচার। আমরা এই কাজের তীব্র প্রতিবাদ জানাই, নিন্দা করি ও তালিকায় সমস্ত ভারতীয় মানুষের নাম অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানাই।

নাগরিকপঞ্জি তৈরির কাজ হঠাৎ কোন গজিয়ে ওঠা বিষয় নয় বা অসম সরকারের খেয়াল খুশির ব্যাপার নয়। তবে একথা ঠিক যে, এই কাজ সর্বপ্রথম অসম রাজ্যেই শুরু হয়েছে।

১৯৮৫ সালে অসম চুক্তি যখন স্বাক্ষরিত হয়, তখন অসমে নাগরিকপঞ্জি তৈরি করার কথা হয় বলে জানা যায়। সে যাহোক, এখন নাগরিকপঞ্জি তৈরি হচ্ছে নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ২০০৩- এর ১৪এ ধারার নির্দেশ মেনে। অটলবিহারীর প্রধানমন্ত্রী থাকা কালে ২০০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে এই আইন তৈরি হয়। আইনটি কার্যকরী করার জন্য রুলসও তৈরি হয়, যে রুলস-এ সামান্য রদবদল ও সংযোজন হয় ২০০৯ সালে।

ওই আইনে বলা আছে যে, সারা দেশে নাগরিকপঞ্জি তৈরি করতে হবে এবং এই কাজ করা বাধ্যতামূলক। অসমে সেই কাজ সমাপ্তির পথে, মনিপুর বিধানসভা বিল পাশ করেছে নাগরিকপঞ্জি তৈরি করার জন্য, ঝাড়খন্ড সরকারও ঘোষণা করেছে যে, সেই রাজ্যে নাগরিকপঞ্জি তৈরি করা হবে। সংসদে এই প্রশ্নে যা কথা হয়েছে, তাতে বোঝা গেল -- কোন প্রায় দলই নাগরিকপঞ্জি তৈরি করার বিরুদ্ধে নয়।

দেখা যাচ্ছে বি জে পি শাসিত রাজ্যগুলি নাগরিকপঞ্জি তৈরি করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে বি জে পি মিছিল করেছে, আন্দোলন করছে নাগরিকপঞ্জি তৈরি করার দাবিতে। বি জে পি-র সভাপতি অমিত শাহ ও  রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বারবার হুংকার ছাড়ছেন যে, তাঁরা অনুপ্রবেশকারীদের গলাধাক্কা দিয়ে দেশ থেকে বের করে দেবেন।

বি জে পি উদ্যোগী হয়ে ২০০৩ সালে নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করেছিল, নিশ্চয়ই তাদের কোন পরিকল্পনার ফসল ওই আইন সংশোধন। তাই তারা সেই আইন কার্যকরী করতে উদ্যোগী হবে, সেটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু প্রশ্ন হলো-- কারা এই সম্ভাব্য অনুপ্রবেশকারী, যাঁদের বি জে পি গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেবার জন্য উৎসাহী? আগে আমাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে দুকথা বলি। অসমে ইতিমধ্যে চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে --- হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সব ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুসের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। কাদের সংখ্যা বেশি বা কম তা আমরা এখনও নিশ্চিত করে জানি না ঠিকই, তবে নানা সূত্রে খবর যে উভয় সম্প্রদায়ের প্রায় সমান সংখ্যক মানুষের নাম বাদ গেছে। অসমের বি জে পি দলের এক এম এল এ শিলাদিত্য সাংবাদিক সম্মেলন করে দেয়বলেছেন যে, হিন্দুর নাম নাকি বেশি বাদ পড়েছে। নিশ্চয়ই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও খোঁজখবর নিয়ে বলেছেন। সে যাই হোক --- এটা বোঝা যাচ্ছে যে, বিপুল সংখ্যক  হিন্দুর নামও যে বাদ পড়েছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তার অর্থ--- ২০০৩ সালে বি জে পি যে আইন  করেছিল তাতে হিন্দু-মুসলমান সবাইকে অনুপ্রবেশকারী হতে হয়-- হিন্দুরা শরণার্থী আর মুসলমানরা অনুপ্রবেশকারী আইনটা এমন নয়।
বি জে পি গত ১৫/১৬ বছর মিথ্যা কথা বলে গ্রামের সাধারণ হিন্দুদের বিভ্রান্ত করেছে।

এবার আইন সম্পর্কে আরো কয়েকটি কথা বলি -- ২০০৩ সালে যে আইন তৈরি হয়, তার ২(১)(বি) ধারায় অনুপ্রবেশকারী কারা তা সংজ্ঞায়িত করা হয়। বলা হয়--- যে কেউ পাসপোর্ট ছাড়া ভারতে আসলে তিনি অনুপ্রবেশকারী। আবার পাসপোর্ট নিয়ে এসেও ভিসার মেয়াদ শেষ হবার পর ভারতে থেকে গেলে তিনিও অনুপ্রবেশকারী। হিন্দু বা মুসলমান --- সবার ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য। এই আইন এখনো বলবৎ আছে। সে জন্য অসমে হিন্দুরা কোন ছাড় পাচ্ছেন না, যদিও সেখানে বি জে পি-র সরকার।

তাই পশ্চিমবঙ্গে যখন বি জে পি এক কোটি অনুপ্রবেশকারীকে গলাধাক্কা দিয়ে বের করার হুংকার দিচ্ছেন, তা কার্যত এখানকার হিন্দু উদ্বাস্তুদের গলাধাক্কা দেবার কথাই বলছেন। কারণ যে আইন বলবৎ আছে, তাতে মানে তাই হয়।

এখন একটা মুলোর ঝুটির কথা বলা হচ্ছে। তা হলো-- নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিল, ২০১৬। কিন্তু তা যদি পাস না হয়? রাজ্য সভায় এখনো বি জে পি- সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই, তাই সেই সম্ভাবনা আছে। লোকসভাতেও বি জে পি র সংখ্যাগরিষ্ঠতা সুতোয় ঝুলছে। কোন শরিক দল এই প্রশ্নে তার পক্ষে দাঁড়াবে বলে মনে হয় না। তাহলে? এই বাংলার মুসলমানরা এখানকার আদি বাসিন্দা, তাদের এই দেশ থেকে বের করে দেবার ক্ষমতা বি জে পি কেন দলের হবে না। এখানে মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী সাজানো অসম্ভব। অসমে তবু একটা অজুহাত আছে, অবশ্যই তা মিথ্যা। তাহলো বহু মুসলমান পূর্ববাংলা থেকে অসমে গিয়েছিলেন ১৯৪৭ সালের আগে, তাদের আজ বাংলাদেশি সাজানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু এখানে তেমন কোন অজুহাত ধোপে টিকবে না। তাই, আসলে ওই এক কোটি সংখ্যা যা বলা হচ্ছে তা আসলে হিন্দু উদ্বাস্তুদের তাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে।

২০১৬ সালের বিল, যা জয়েন্ট পার্লামেন্টরি কমিটির বি জে পি দলের চেয়ারম্যান রিপোর্ট জমা  না দেবার জন্য আটকে আছে , তাতে আছে কি? বলা হচ্ছে ওই বিল পাশ হলে হিন্দু উদ্বাস্তুরা নাগরিকত্ব পাবেন। কিন্তু তা মিথ্যা কথা। ওই বিলে নাগরিকত্ব শব্দই নেই। বিলটিতে এ সম্পর্কে মাত্র একটা লাইন আছে। তাহলো -- বে-আইনিভাবে হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, খ্রিস্টানরা ভারতে এসেছে যাঁরা, তাদের অনুপ্রবেশকারী বলা হবে না, ব্যস! আর কিছু নেই। তার মানে কি? তার মানে কি ভারতের নাগরিক হয়ে যাওয়া? না।

এখানেও এই বিলে কিছু শর্ত আছে ১) বাংলাদেশ, পাকিস্তান আর আফগানিস্তান থেকে এসে থাকলে এই সুযোগ পাওয়া যাবে। ২) ধর্মীয় কারণে অত্যাচারিত হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হলে এই সুযোগ মিলবে। ৩) ২০১৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বরের আগে ভারতে এসে থাকলে ইত্যাদি। আসলে হয়তো তিনটি শর্তই আপনার ক্ষেত্রে সঠিক কিন্তু প্রমান করতে পারবেন তো? প্রমাণপত্র না হলে তো সুযোগ পাওয়া যাবে না। এসব ভাবছেন তো। তফসিলিরা তো জানেন-- একটা কাস্ট সার্টিফিকেট পেতে বা পাসপোর্ট পেতে কিভাবে কাগজপত্র সাজিয়ে দিয়েও ৫ বছর অফিসে হাটতে হয়, ধর্ণা দিতে হয়। ২০১৬ সালের বিলের সুযোগ নেওয়া তাই উদ্বাস্তুদের জন্যে প্রায় অসম্ভব। ওটা প্রকৃতপক্ষে গাধার নাকের সামনে মুলোর ঝুটি ঝুলিয়ে রাখা, যতই ছুটুন ওটা অধরাই থাকবে।

যদি শেষ পর্যন্ত বিলটি যেরকম আছে হুবহু সেভাবে পাশ হয়ে যায়, তাহলে হিন্দু উদবাস্তুরা এদেশে থাকতে পারবেন, কিন্তু নাগরিকত্ব পাবেন না। বি জে পি নেতা তথাগত রায় ও মোহিত রায় দিল্লিতে ২৯ শে জুলাই এক সভায় পরিষ্কার বলেছেন, বিল পাশ হলে হিন্দু উদ্বাস্তুরা এদেশে থাকতে পারবেন কিন্তু নাগরিক না হবার কারণে এন আর সি তে নাম উঠবে না। আইনও সেই কথাই বলছে-- নাগরিকপঞ্জি হলো শুধুমাত্র নাগরিকদের তালিকা।

আসলে বি জে পি নাগরিকত্ব বিহীন একটা জনগোষ্ঠী তৈরি করতে চায়। সে জন্য তারা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দেবার পথ বন্ধই রাখতে চায়। সেজন্য প্রস্তাবিত ২০১৬ সালের বিলটিতে বি জে পি ২০০৩ সালে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব  অর্জনের যে পথ বন্ধ করেছিলো, তা খুলে দেয় নি, সংশোধনীতে সে সম্পর্কে কোন কথা নেই।

বলা হচ্ছে যে, এটা একটা খসড়া তালিকা। সে কথা ঠিক, সেটা আইনের মারপ্যাঁচের কথা। রুলস-এ আছে যাদের নাম বাদ পড়বে তারা ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে পারবেন। তার পরেও ট্রাইব্যুনালে যেতে পারবেন কিন্তু প্রচলিত আদালতে মামলা করতে পারবেন না, অবিচার হলে মেনে নিয়ে আত্মবিসর্জন দিতে হবে। এটা আসলে কালক্ষেপ করার কৌশল হতে পারে, ক্ষোভের বিস্ফোরণ যাতে না হয়, তার কৌশল হতে পারে। আমার ধারণা-- যদি মানুষের উত্তাল ক্ষোভ সুনামির মত আছড়ে পড়তো বা পড়ে, তাহলে খসড়া তালিকা খানিকটা লম্বা হতে পারে।

এ রাজ্যে বি জে পি বাদে সব রাজনৈতিক দল অসমের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে, তাকে স্বাগত জানাতে হবে। কিন্তু একথাও মনে রাখুন যে, অতীতে সব রাজনৈতিক দলগুলো উদ্বাস্তু মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এইসব আইন ও রুলস তৈরির সময় এইসব দলগুলি সমর্থন করেছে। তবে তা মনে রাখুন, এটা সেকথা বলার সময় নয়, এটা ঐক্যের সময়। সকলের সমর্থন প্রয়োজন। পরিস্থিতি অনেক কিছু পাল্টায়।

কিন্তু এইসব দলগুলি কি চায়, কি দাবি করছে, তা কিন্তু পরিষ্কার নয়। আহা, উহু করা কোন কাজের কথা নয়। কিন্তু আজ অবধি তারা তাই করছে। অসমে কাজটি করার ক্ষেত্রে অনিয়ম হছছে সেটা ঠিক। তার প্রতিবাদ প্রয়োজন, প্রতিবাদ হোক। কিন্তু মনে রাখতে হবে, অসমে ১৯৭১ সাল হলো সীমারেখা , আর সে রাজ্যে  সেই সংখ্যক উদ্বাস্তু গেছেন, যার ২০ গুণ বেশি উদ্বাস্তু এসেছেন পশ্চিমবঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গ সহ অন্যান্য সব রাজ্যে সীমারেখা কিন্তু ১৯৪৮ সাল বা কেউ তা একটু শিথিল করে বলছেন ১৯৫০। মনিপুর বিধানসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে ১৯৫০ সাল। তাহলে এখানে নাগরিকপঞ্জি হলে কী অবস্থা হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

তাই মূল কাজ হলো আইনটি পরিবর্তন করা। দেশভাগের ইতিহাস, সরকার ও নেতাদের প্রতিশ্রুতি, বাস্তব অবস্থা, মানবিকতা এসব বিবেচনায় রেখে ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী সমস্ত উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্বর দাবি জানাতে হবে। কারণ তাদের ফেরত পাঠানোর  কোন জায়গা নেই। তাছাড়া থাকতে দিতে যদি সমস্যা না হয়, নাগরিকত্ব দিতে সমস্যা কোথায়! আর জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার শর্তমুক্ত করে সংবিধানের মূল অবস্থানে ফিরতে হবে অর্থাৎ এদেশে জন্মগ্রহণ করলেই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দেবার জন্য আইন পুনর্বার পরিবর্তন করতে হবে। মুলমানরা এদেশের মূল নাগরিক, তাদের নীতিগতভাবে সেই স্বীকৃতি দেওয়া দরকার। কাগজপত্র নেই বলে কোন মূল ভারতীয় যাতে বিদেশি বলে গণ্য না হন, তা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

মন্তব্যসমূহ

  1. কিন্তু এড়ানো আসামে লিস্ট বেরোনোর কথা বলা হচ্ছে ।

    উত্তরমুছুন
  2. Caesars Palace: Casino & Resort In Reno, NV - KSNV
    Is Caesars Palace available on 양주 출장마사지 mobile? · Where can I legally 통영 출장마사지 play 충청북도 출장마사지 and wager at Caesars 성남 출장안마 Palace? · What is Caesars Palace? · 서산 출장마사지 What type of

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

তৃণমূল নেত্রী ফের সংসদে

যদা যদা হি ধর্মস্য... গীতার এই শ্লোকে ঠিক কী বলা হয়েছে?

ভাতে কেরোসিন যাত্রাপুরে, অভিযোগ বাংলাদেশী