স্বামী বিবেকানন্দ ও জাতি প্রথার চমৎকার দিক!

বেলুড়মঠের  প্রকাশিত স্বামীজীর বাণী ও রচনার কয়েকটি কথা। প্রসঙ্গ: জাতভেদ প্রথা। :--- বুদ্ধের আবির্ভাবের পূর্বে ভারতের চিন্তাজগত ছিল বিভক্ত। তাহার ধর্মের নির্ভুল ধারণা করিবার জন্য আর একটি বিষয়ের উল্লেখ প্রয়োজনীয় --- উহা হইলো সেই সময়কার  জাতিভেদ প্রথা। বেদ শিক্ষা দেয় যে, যিনি ব্রহ্মকে জানেন, তিনিই ব্রাহ্মণ। যিনি সমাজের সকলকে রক্ষা করেন, তিনি ক্ষত্রিয়। যিনি ব্যবসা বাণিজ্য করিয়া বাঁচেন, তিনি বৈশ্য। এই সামাজিক বৈচিত্র্যগুলির পরে কঠিন জাতিভেদে পরিণতি অর্থাৎ অবনতি। ক্রমে একটি পৌরোহিত্য শাসন সমগ্ৰ জাতির কাঁধে ভর করিয়া দাঁড়াইয়া থাকে। এই সময়ে বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেন।

জাতি বিভাগের মূল তথ্যটির প্রতিবাদ বুদ্ধ কখনো করেন নি। কেন না উহা সমাজ জীবনের একটি স্বাভাবিক প্রবনতারই অভিব্যক্তি এবং সব সময়েই মূল্যবান। কিন্তু যাহা বংশগত বিশেষ সুবিধা দাবি করে, বুদ্ধ সেই অবনত জাতিপ্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।..... জাতি হইলো চরিত্রের  একটি অবস্থা, উহা কোনো কঠোর গন্ডিবদ্ধ শ্রেণী নয় (৬৫-৬৬)।

কোনো জাতির বস্তিতে উৎপন্ন জিনিস ওই জাতিকে বিচার করিবার পরিমাপক নয়। পৃথিবীর সকল আপেল গাছের তলা হইতে কেহ পোকায়
খাওয়া আপেল সংগ্রহ করিয়া একটি বই লিখতে পারেন, তাতে আপেল গাছের সৌন্দর্য বোঝা যায় না। জাতির মহত্তম ও শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের দ্বারাই জাতিকে যথার্থ বিচার করা চলে। যাহারা পতিত তাহারা নিজেরাই একটি শ্রেণী বিশেষ। তাই কোনো একটি রীতিকে বিচার করিবার সময় উহার শেষ্ঠ অভিব্যক্তি এবং আদর্শ দ্বারাই বিচার করা শুধু সমীচীন নয়, ন্যায্য ও নীতিসংগত(৬২)।

আমাদের দৃষ্টিতে সদগুণ ও সৎকুলে জন্মই জাতি নির্ধারণ করে, টাকা নয়। ভারতে টাকা দিয়া সন্মান কেনা যায় না। জাতিপ্রথায় উচ্চতা অর্থ দিয়ে নিরূপিত হয় না। জাতির দিক দিযা অতি দরিদ্র ও ধনীর একই মর্যাদা। জাতিপ্রথার ইহা একটি চমৎকার দিক

ধনলিপ্সা হইতেই জন্মায় হিংসা, ঘৃণা, লোভ এবং চলে প্রচন্ড কর্ম উন্মত্ততা, ছোটাছুটি , কলরব। জাতিপ্রথা মানুষকে এই সকল হইতে মুক্তি দেয়। জাতিপ্রথা তাহাকে অল্প টাকায় জীবন যাপন করিতে সক্ষম করে এবং সকলকেই কাজ দেয়। জাতিপ্রথায় মানুষ আত্মার চিন্তা করিবার অবসর পায়, আর ভারতীয় সমাজে ইহাইতো আমরা চাই।

ব্রাহ্মণের জন্ম দেবার্চনার জন্য। জাতি যত উচ্চ সামাজিক বিধিনিষেধ তত বেশি। জাতিপ্রথা আমাদিগকে হিন্দু জাতিরূপে বাঁচাইয়া রাখিয়াছে। এই প্রথার অনেক ত্রুটি থাকিলেও বহু সুবিধা আছে।...... এই ব্যবস্থায় সবাই নিজ জাতের রীতিনীতি মানিতে বাধ্য (৫২-৫৩)।

হিন্দু গৃহে খ্রিস্টান বা মুসলমানের উপস্থিতিতে কি প্রভাব হয়, বক্তা (স্বামীজী) তাহা বর্ণনা করেন। কোনো শ্বেতকায় ব্যক্তি হিন্দুদের ঘরে ঢুকিলে ঘর অশুচি হইয়া যায়। বিধর্মী গৃহে আসিলে গৃহস্বামী চান করেন। অন্ত্যজ জাতিদের প্রসঙ্গে বক্তা বলেন, উহারা সমাজের মেথরের কাজ, ঝাড়ুদারি প্রভৃতি কাজ করিয়া থাকে এবং উহারা গলিত মাংসভোজী। ভারত বিষয়ে পশ্চিমের যাহারা বই লিখিয়াছেন, তাহারা সমাজের এই সকল নিন্মবর্ণের লোকের সংস্পর্শে আসিয়াছেন......। জাতিপ্রথার স্বপক্ষে বক্তা (স্বামীজী) বলেন যে, উহাই সমতা ও ভ্রাতৃত্বের একমাত্র কার্যকর আদর্শ।..... তাহার (স্বামীজীর)  মতে জাতিভেদ দূর করিতে হইলে সামাজিক অবস্থার সম্পূর্ণ পরিবর্তন এবং এদেশের সমগ্র অর্থনৈতিক প্রণালীর ধ্বংস সাধন একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু ইহা অপেক্ষা বরং বঙ্গোপসাগরের জলে সকলকে ডুবাইয়া মারা শ্রেয়:(৭১-৭২)।

যাঁরা তর্ক করেন যে, স্বামীজী জাত পাতের বিরুদ্ধে, তাঁরা আলোচনায় অংশ নিলে ভালো হয়।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

তৃণমূল নেত্রী ফের সংসদে

যদা যদা হি ধর্মস্য... গীতার এই শ্লোকে ঠিক কী বলা হয়েছে?

ভাতে কেরোসিন যাত্রাপুরে, অভিযোগ বাংলাদেশী