যোগেন্দ্রনাথের কুৎসার জবাবে
TDN Bangla আমার একটা সাক্ষাৎকার প্রচার করে। তাতে তপন ঘোষ, কিছু বামুন ও নমো আমাকে এবং যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলকে নিয়ে কুৎসা করছে, তার জবাবে এই কথাগুলি---
যোগেন বাবু এই বাংলা থেকে আম্বেদকরকে গণ পরিষদে পাঠাবার কাজে নেতৃত্ব দেন।
তিনি বাংলার তফসিলিদের জন্য সংরক্ষণ নীতি কার্যকরী করার জনক এবং তিনিই বাংলার তফসিলি ছাত্র-ছাত্রীদের stipend চালু করেন। ১৯৪৩ সালে মুসলিম মন্ত্রিসভার সহযোগিতায় তিনি এই কাজে সফল হন। এর প্রতিটি কাজে উচ্চ বর্ণ হিন্দুরা বাধা দেন। ব্যর্থ হয়ে তাঁরা যোগেনবাবুর কুৎসা শুরু করে, যা আজও চলছে। দলিতরা শুধু এইটুকু কাজের জন্য তাকে সুদীর্ঘকাল মনে রাখবেন। দলিতদের মধ্যে আবোলতাবোল বলা মানুষের সংখ্যা কম নয়, তাদের কথাগুলি হলো আস্তাকুঁড়ের জঞ্জাল।
দেশ ভাগ এবং বাংলা ভাগের জন্য দায়ী উচ্চ বর্ণ হিন্দু সমাজের নেতারা। যোগেন বাবু দেশ ভাগ এবং বাংলাভাগের বিরোধিতা করেন। মূলত বাংলাভাগের জন্য বাঙালিরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, উদ্বাস্তু হয়েছেন। তাই দেশ ত্যাগের কারণ উচ্চ বর্ণ হিন্দু নেতৃত্ব। কংগ্রেসি নেতারা এবং শ্যামাপ্রসাদ।
পূর্ববঙ্গের ১/২ কোটি হিন্দু যেমন পালিয়ে ভারতে এসেছেন, বরিশালের বাড়ি ছেড়ে যোগেন বাবুও তেমনি চলে আসতে বাধ্য হয়েছেন এবং এর জন্য মূলত বাংলাভাগ দায়ী বা বলা যায় উচ্চ বর্ণ হিন্দু নেতৃবৃন্দ দায়ী।
যোগেন বাবুর বাড়ি দেশভাগের পর পাকিস্তানে। তিনি সেখানে থাকবেন সেটাই স্বাভাবিক। কিরণ শংকরের মতো তাবড় কিছু কংগ্রেস নেতাও সে চেষ্টা করেছিলেন। কোটি মানুষের মতো তারাও পরে দেশত্যাগ করেন। তা যোগেনবাবুকে নিয়ে এত কথা কেন? তার যোগ্যতা ছিল তিনি পাকিস্তানের মন্ত্রী হয়েছিলেন, সে দেশে এখনও হিন্দুরা, দলিতরা মন্ত্রী আছেন। ভারতেও মুসলমানরা মন্ত্রী আছেন, আবার অনেক মুসলমান পাকিস্তান-বাংলাদেশে চলেও গেছেন। হিন্দু এবং মুসলমান --- উভয়ের দেশ ত্যাগ করার জন্য দুই দেশের সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার, অবিচার ও তার আশংকা অংশত দায়ী। কিন্তু মূল কারণ দেশ ভাগ ও বাংলা-পাঞ্জাব ভাগ। যার জন্য মূলত দায়ী উচ্চ বর্ণ হিন্দু নেতারা। মুসলমান নেতারা অংশত দায়ী কারণ তারা ছিলেন ছোট শরিক। বড় দাদারা না চাইলে কিছুতেই দেশ ভাগ হতো না। আর মুসলমানরাতো বাংলা ভাগের বিরোধিতা করেন।
এরপর তর্ক, আলোচনা, বিশ্লেষণের মূল জায়গা হলো সত্যি যোগেনবাবুর দেশ ভাগ বা বাংলা ভাগের ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা ছিল কি না, থাকলে কতটা? যারা ওই সময়ের ইতিহাস জানেন, তারা স্বীকার করবেন যে, ক্যাবিনেট মিশন দেশ ভাগের আলোচনায় আম্বেদকরকেই ডাকে নি। যোগেন বাবুর পার্টি তফসিলি ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন আম্বেদকর, আর যোগেনবাবু ছিলেন বাংলার সভাপতি। তাই যোগেনবাবুর কোনো ভূমিকার প্রশ্নই ওঠেনা। ক্যাবিনেট মিশন ডেকেছিল কংগ্রেস, মুসলিম লীগ আর শিখদের প্রতিনিধি বলদেব সিং কে। তারা দেশভাগের জন্য সম্মতি দেয়।
সবশেষে আমি বর্ণ হিন্দু এবং দলিত হিন্দুদের মধ্যকার হনুমান বাহিনীর জন্য তাদের নেতা তথাগত রায়ের সাম্প্রতিকালে লেখা "যা ছিল আমার দেশ" বইয়ের ৩১২ এবং ৩১৩ পাতায় লেখা দুটি কথা তুলে দিয়ে শেষ করবো। এটা হলো যোগেনবাবুর পদত্যাগপত্রের দুটো কথা, যা তথাগত বাবু অনুবাদ করেছেন।---- "আমি (যোগেনবাবু) সত্য সত্যই বিশ্বাস করতাম যে ভারতে মুসলিমদের ক্ষুব্ধ হবার সঙ্গত কারণ আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার মত ছিল যে পাকিস্তান সৃষ্টি কখনোই সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। তার পরিবর্তে সাম্প্রদায়িক হিংসা ও তিক্ততার সৃষ্টি হবে। আমি এও বলেছিলাম যে এতে মুসলমানদেরও কোনো সুবিধা হবে না। দেশভাগ হলে দুটি অংশের মেহনতি মানুষেরই দারিদ্র, নিরক্ষরতা এবং দুর্দশা আরো প্রলম্বিত হবে, এমনকি চিরস্থায়ীও হতে পারে"।
"একথাও বলা প্রয়োজন যে আমি বাংলা বিভাজনের বিপক্ষে ছিলাম। এই ব্যাপারে প্রচার করতে গিয়ে আমি শুধু প্রচন্ড বিরোধিতার সম্মুখীন হই নি, সঙ্গে পেয়েছি অকথ্য গালাগালি , অপমান ও অসম্মান"।
এই অসম্মান, অপমান কারা করেছিল? উচ্চ বর্ণ হিন্দুরা, তাদের প্রচার যন্ত্রগুলো করেছিল। মনে রাখতে হবে যে তখনও দেশ ভাগ বা বাংলাভাগ হয় নি। অনেকে যে পাকিস্তানের কথা তুলে তাকে গালি মারছেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তান হবার আগে থেকে তাকে টার্গেট করে গালি দেওয়ার কাজ চলছিল। সত্য হলো --- দলিতদের ধোঁকা দেওয়া, বোকা বানানো, ব্যবহার করার জন্য উচ্চ বর্ণ হিন্দুদের প্রতিটি অপচেষ্টা তিনি রুখে দিচ্ছিলেন, যোগেন বাবুর জন্য উচ্চ বর্ণ হিন্দুদের প্রতিটি চক্রান্ত ও গেম প্লান মাঠে মারা যাচ্ছিল। তাই তাঁকে অর্থাৎ যোগেনবাবুকে তার নিজের সমাজের মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য বর্ণ হিন্দুরা কুৎসা শুরু করে, যা আজও চলছে। আর দলিত সমাজের কিছু অশিক্ষিত ও অর্ধ শিক্ষিত মানুষ তাদের সুরে সুরে মেলাচ্ছেন। সাথে আমাকেও গালি মারছেন!
যোগেন বাবু ছিলেন ১৯৩৭ সালে বিধায়ক, অবিভক্ত বাংলার মন্ত্রী, ঐক্যবদ্ধ ভারতের প্রথম আইন মন্ত্রী, পাকিস্তানের প্রথম অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট, পাকিস্তানের মন্ত্রী কিন্তু তবুও তার একটা থাকার জায়গা পর্যন্ত ছিলোনা। কলকাতার একজনের কাঠের দোকানের সিলিংয়ের উপর দিন কাটিয়েছেন। আজকের দুনিয়ায় তাকে আদর্শ রাজনীতিক হিসাবে প্রচারের আলোয় আনা উচিত ছিল, কিন্তু তার বদলে যা হচ্ছে, তা শুধু এদেশেই সম্ভব!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন