ত্রিপুরা-কলকাতায় মূর্তি ভাঙা প্রসঙ্গে
ভাঙা হলো লেনিন, শ্যামাপ্রসাদ, আম্বেদকর, পেরিয়ার, গান্ধী আর হনুমানের মূর্তি। এটা এমন একটা দেশ -- যেখানে গান্ধী, আম্বেদকর, লেনিনের মূর্তি গড়েন মানুষ; আবার সেই দেশের মানুষ শ্যামাপ্রসাদ ও হনুমানের মূর্তিও গড়েন। তাই ভাঙাভাঙিও আর অস্বাভাবিক কি!
মানুষ মূর্তি গড়ে কেন? আর ভাঙেনও বা কেন?--- মনে হয় প্রচারের জন্য। মতাদর্শ প্রচারের কথা মাথায় রেখে ও শ্রদ্ধা-কৃতজ্ঞতা জানাবার জন্য। মূর্তি মানুষের মনে আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসা সৃষ্টি করবে, মানুষ তাদের মতাদর্শ জানবেন এবং উদ্বুদ্ধ হবেন -- এসব ভেবেই হয়তো মূর্তি প্রতিষ্ঠা।
আর ভাঙার প্রশ্ন তাহলে বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়। মতাদর্শ প্রচারের সংঘাত; জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি ও সংকোচনের সংঘাতের পরিণতিতে এই ভাঙার সিদ্ধান্ত হতে পারে। আর হতে পারে পাগল ও মাতালের ঝোঁক -- তাদের চিত্তবিনোদন।
গণতন্ত্রে যদি প্রত্যেকের বক্তব্য, মতাদর্শ প্রচারের অধিকার থাকে তাহলে গান্ধীর মূর্তি ও মহাত্মাকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপকারী আম্বেদকরের মূর্তি পাশাপাশি খাড়া থাকতে পারে। ভগবানে অবিশ্বাসী পেরিয়ারের পাশে হনুমানের মূর্তি থাকতে পারে। পুঁজিবাদী-সামন্ততান্ত্রিক দেশের রাস্তার মোড়ে সমাজতন্ত্র ও সমানাধিকারের প্রবক্তা লেনিনের মূর্তি আঙুল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।
ভাঙার মধ্যে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। এক হলো--- নিছক বিদ্বেষ, বেশি কিছু চিন্তা ভাবনা না থাকা। দুই --মতাদর্শের দুর্বলতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব, যুক্তির লড়াইয়ে পিছু হটার অবশ্যম্ভাবিতা। তিন-- মানুষের বিচার বুদ্ধির উপর অনাস্থা ইত্যাদি।
মূর্তি বসানোর ঘটনা ঘটে দুই ভাবে -- সরকারি উদ্যোগে, আর বেসরকারি উদ্যোগে। বেসরকারি উদ্যোগে ব্যক্তি উদ্যোগে হতে পারে, সমষ্টি বা সংস্থার উদ্যোগে মূর্তিস্থাপন হতে পারে। এক্ষেত্রে মতাদর্শ নির্ণায়ক হয়। সরকারি ক্ষেত্রে সাধারণত কি হয়, তা আমরা জানি কিন্তু হওয়া উচিত --- কোনো মূর্তি না গড়া বা জনগণের ইচ্ছায় সাড়া দেওয়া।
এখন অবধি যা খবর --- ত্রিপুরায় এবং কলকাতায় মূর্তি ভাঙার পিছনে মতাদর্শের প্রশ্ন পরিষ্কার এবং তা ঘোষণা করেই করা হয়েছে। অন্য ক্ষেত্রগুলোতে মাতাল, পাগলের কাজ বলা হচ্ছে, তা না হলেও রাতের অন্ধকারে কৃত কাজকে দুস্কৃতির কাজ বলেই ধরে নেওয়া ভালো, তাকে ত্রিপুরার ও কলকাতার ঘটনার সাথে পুলিশ এক করে দেখলেও আমি আলাদাভাবে দেখতে চাই।
সাধারণভাবে পৃথিবীর মানুষ জানেন যে, লেনিন শ্রমজীবী ও গরিব মানুষের স্বার্থে লড়াই করেছিলেন ও তাদের মুক্তির পথ-প্রকরণ রচনা করেছিলেন, স্বৈরাচারী জারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছিলেন ও জয়যুক্ত হয়েছিলেন। সে তত্ত্ব ও পথে কিছু ভুল থাকতে পারে, অসম্পূর্ণতা থাকতে পারে, কিন্তু তাঁর ইচ্ছা ও আন্তরিকতা নিয়ে কোন প্রশ্ন আমি আজও শুনিনি। রবিঠাকুরের মতো অন্য মত ও পথের পথিক পর্যন্ত তার প্রতিষ্ঠীত রাশিয়ান ব্যবস্থার অকুন্ঠ প্রশংসা করেছিলেন।
তাহলে, যারা দল বেঁধে বুলডোজার নিয়ে লেনিনের মূর্তি ভাঙছেন, তারা কি প্রতীকী হলেও বোঝাতে চান যে, তারা গরিব-মেহনতি মানুষের স্বপ্ন ভাঙতে চান? তারা যে জার-হিটলারের জমানার আহবান জানাতে চান -- এর মধ্যে কি তারই ঘোষণা? -- এসব ভাবনা কি পাগলের প্রলাপ?
শ্যামাপ্রসাদের বিশেষ কৃতিত্ব কি? তিনি হিন্দুত্বের প্রবক্তা ছিলেন, মুসলিমদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতা প্রচার করেছিলেন ও তার জন্য সংগঠন গড়েছিলেন। বাংলা প্রদেশ বিভাজনের জন্য কাজ করেছিলেন। তার কাজ ও ক্ষমতা ছিল নগন্য, তবুও তার সেই কাজের মধ্যে নিচুজাতের হিন্দুদের প্রতি তার ঘৃণার নানা প্রকাশ দেখা যায়, তাদের ন্যায্য অধিকার দানের তিনি বিরুদ্ধে ছিলেন। অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক --- হিন্দুত্ববাদ মানে উচ্চবর্ণ হিন্দুর স্বার্থের লীলামৃত।
গতকাল টি ভি তে শুনছিলাম -- সুমন বাবু বলছেন, শ্যামাপ্রসাদ নিশ্চিতভাবে মহামানব। তা তিনি কোন কাজের জন্য মহান বলে আখ্যায়িত হতে পারেন, তা যদি জানা যেত!
কিছু ছাত্র-যুবক শ্যমপ্রসাদের মূর্তিতে হাতুড়ি মেরেছেন। এটা প্রতিক্রিয়া, লেনিনের মূর্তি ভাঙার প্রতিক্রিয়া। অন্যান্যরা সে প্রতিক্রিয়া অন্যভাবে ব্যক্ত করেছেন।
তা এই ছেলেগুলো অন্য কারুর মূর্তির উপর আঘাত না করে শ্যামাপ্রসাদের মূর্তির উপর কেন আঘাত করলেন? কারণ ত্রিপুরায় যারা মূর্তি ভেঙেছে তারা হিন্দুত্ববাদী। পাল্টা মার!
এই পাল্টা ব্যবস্থার প্রকৃতি নিয়ে মতভেদ। হতেই পারে। তবে পাল্টা প্রতিক্রিয়া যে দরকার, তা নিয়ে সংশয় থাকা অনুচিত। ভোটপন্থীরা সব সময়েই ক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া একভাবে দেখেন ও ভাবেন। হতে পারে এই ছেলেগুলো অন্যপথের পথিক।
আমার মনে হয়, ছেলেগুলোর কাজ সঠিক, আবার বেঠিকও। সঠিক ভাবছি এই জন্য যে, মুগুর ঠিক করতে হয় কুকুরের সাইজ দেখে। বাঙালিদের সামনে ল্যাটিন ভাষায় ভাষণ দিলে কেউ বুঝবেন? বুঝবেন না। লেনিন আর শ্যমপ্রসাদকে নিয়ে কিছু কথা হোক।
অনেকেই বলবেন --- ভাঙার বদলে ভাঙা, এটা ঠিক নয়। কথাটা ভালো, হয়তো ঠিক। কিন্তু ঠিক বেঠিকের অন্যদিকও আছে, নাহলে আক্রমণ আত্মরক্ষার উপায় -- কথাটি এলো কোত্থেকে! একদিন কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধ বাধলো, বন্দুক গুটিয়ে নিয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘে না ছুটে ভারত আক্রমণ করলো লাহোর, লাহোর কিন্তু বিতর্কিত ছিল না। এই টক্কর দেওয়া সম্ভব হলো, তাই শান্তি চুক্তিও হলো, যুদ্ধ থামল।
আর দেখুন, কেউ গালি দিলে --- শুয়োরের বাচ্চা বললে, জানা কথা যে, পাল্টা গালি দিয়ে লাভ হয় না। যিনি পাল্টা গালি না দিতে উপদেশ দেবেন, বাস্তবে দেখবেন তিনি হয়তো হাত চালিয়ে দেবেন। যদিও সবার জানা যে, অন্যের গালিতে আমাদের বাবা-মা পাল্টে যায় না। আমাদের অনেকের সাহসে কুলায় না, তাই ভদ্রলোক সাজি, মাফ করে দিয়ে খালাস হই। দুচার জন যাদের সাহস হয়, তাদের জ্ঞান দিয়ে থাকি, দিচ্ছি।
বেঠিক ভাবছি কারণ-- দুই চারজন মিলে একাজ করে কি হবে! মানুষকে বোঝাতে হবে, মানুষের বুঝতে হবে। তোমরা এখন বলে যাও, একদিন এদেশের লোক এসব আবর্জনা পরিষ্কার করে দেবে। মানুষকে করতে দাও।
ছেলেগুলোর বিরুদ্ধে নাকি কড়া ধারায় কেস দেওয়া হয়েছে, কেন? যেমন হওয়া বাঞ্ছনীয় তাই করা হোক। এই কঠোরতা কি হিন্দু ভোটারদের কোনো বার্তা দেওয়া? না এটা সরকার প্রধানের অন্তরের অনুভূতির অভিব্যক্তি?
শ্যামাপ্রসাদ হিন্দুত্বের পূজারী, যে হিন্দুত্বের লাইনের আধুনিক প্রবক্তা স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি গোড়া হিন্দুধর্মের প্রচারক। তিনি জাত-বর্ণ ব্যবস্থার শুধু সমর্থক নন, এই জঘন্য ব্যবস্থার পক্ষে দেশ বিদেশে প্রচার করে বেড়িয়েছেন, যুক্তি খাড়া করেছেন। বিধবা বিবাহের বিরোধিতা করেছেন, বাল্য বিবাহের পক্ষে যুক্তি সাজিয়েছেন, সহমরণ প্রথার পক্ষ নিয়েছেন। ব্যবহারিক উন্নতি ও প্রয়োজনকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে, আত্মা-জন্মান্তর প্রচার করে বেড়িয়েছেন। মমতাদেবী বিবেকানন্দর ভক্ত, সুভাষচন্দ্রও তাই ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তা ছিলেন না, তিনি স্বামীজিকে পছন্দ করতেন না, মমতাদেবী আবার রবীন্দ্রনাথের ভক্ত বলে পরিচয় দেন। একই অঙ্গে এত রূপ হলে বোঝা ও বিচার করা কঠিন!
কাগজে দেখলাম, বিবেকানন্দর শিকাগো ভাষণের ১২৫ বছর উপলক্ষ্যে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ হচ্ছে। কেন? টাকাটা কার? ওটাতো ছিল হিন্দুধর্মের বিষয়ে, হিন্দুদের পক্ষে ভাষণ। সে কাজ ও তার স্মরণে সরকারি টাকা দেওয়া যায়? মুখ্যমন্ত্রীর ধর্মনিরপেক্ষতা এসবে আন্দাজ করা যায়। আর বোঝা যায় ছেলেগুলোর বিরুদ্ধে কেস কেন কঠোর!
পক্ষে বিপক্ষে মিছিল, সভাসমিতি চলছে, আরো হবে হয় তো। লেনিন আর শ্যামাপ্রসাদ --- তাদের ভাঙা মূর্তি নিয়ে কিছু বললাম কিন্তু আম্বেদকর, পেরিয়ার, গান্ধী আর হনুমানের মূর্তি নিয়ে কার বিরুদ্ধে, কি বলি বলুনতো?
এই লোকটি সম্পুর্ন দালাল।
উত্তরমুছুনভাবাদর্শ, মতাদর্শ অনেক শব্দ পড়লাম ওনার নিজের আদর্শটা বুঝতে পারলাম না।
আমরা যদি ভারতের সংবিধানকে একটি নাম দিয়ে ধর্ম বলে প্রচার করি তাহলে ওটাও একটি ধর্ম বলে পরিগনিত হবে ওটা একটি দর্শন তৈরী হবে।
সেইরুপ বিভিন্ন নামধারি ধর্ম নিতি বইগলোও ওনার পড়া উচিত,
যেমন সনাতনের বেদ, ইসলামের কোরান হাদিস, খৃস্টানে বাইবেল আর কি কি আছে প্রভৃতি।
সাধারন পাবলিক এতো পড়ে না বা জানে না এটাই এইসব লেখকদের প্লাস পয়েন্ট।
কিছু পাবলিক তো এই লেখা খাবেই।
https://manabsblog.blogspot.com/2017/05/blog-post_16.html?m=1