দলিতদের করণীয় কাজ
দিলীপ গাইন একটা পোস্ট করে বলেছেন ---- বড় দলে গিয়ে কোনো লাভ নেই, হয়নি। ভাবতে হবে ইত্যাদি----
আমি লিখেছি --- ভারতীয় পরিস্থিতিতে দলিত এবং মুসলমানদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণাধীন পার্টি প্রয়োজন, সেটা দুই সমাজের ঐক্যবদ্ধ পার্টিও হতে পারে। প্রয়োজন যৌথ এবং যোগ্য নেতৃত্ব ও পরিষ্কার ঘোষিত কর্মসূচি। --- এটা আমার মূল কথা।
কিন্তু আজকের দিনে রাজনীতির গতি সরল পথ ধরে এগোয় না, তাই সতর্কতার সাথে পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য নানা ধরণের পারমুটেশন-কম্বিনেশন করার প্রয়োজন হলে তা করতে হবে। তার জন্য নিজেদের যোগ্য, দক্ষ ও সাহসী হতে হবে।
দলিত- মুসলিমদের সমস্যা সমাধানের জন্য যা যা প্রয়োজন সে সবের জন্য সবার আগে প্রয়োজন দেশে একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও পরিবেশ। সে জন্য আম্বেদকর গণতন্ত্রের পক্ষে এত বেশি সরব ছিলেন। আর এই গণতন্ত্রের শিক্ষা ও অনুশীলনের সূতিকাগার হলো নিজ নিজ পার্টি। পার্টির নাম যাই হোক, এই শর্ত পূরণ করতে না পারলে সেই পার্টি আম্বেদকরবাদী বলে দাবি করার অনধিকারী।
সেই জন্য দলিতদের নিজস্ব দাবির সাথে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কোন দিকে চলছে, সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কোন চ্যালেঞ্জের মুখে কিনা, সেটা গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। কংগ্রেস ও বি জে পি -- দুইই মনুবাদী দল, এমন সরল সমীকরণ করা ঠিক নয়। কোনো সন্দেহ নেই, দুটোই মনুবাদী দল কিন্তু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তার কোনো একটির পাশে দাঁড়িয়ে অন্যটির মোকাবিলা করার প্রয়োজন হয়। আমাদের দেশে সেই পরিস্থিতি এখন। তার মানে এই নয় যে, আমি সবাইকে কংগ্রেসে যোগ দিতে বলছি। বলছি, সার্বিকভাবে দেশের পরিস্থিতির কথা। বর্তমান সময়ে কংগ্রেসের পক্ষ নেওয়া যায় এভাবে, যেমন আমি এখানে দুকথা বললাম। অফিস-আদালতে, ট্রেনে-বাসে এজাতীয় কথা বলা। নীরবে বা সরবে ভোট দেওয়া যায় -- ক্ষেত্র বিশেষে। তাদের সাথে যৌথ আন্দোলন করা যায়, জোট গঠন করা যায়, কংগ্রেসে যোগ দেওয়া যায়। এসবই নির্ভর করবে নানা অবস্থা বিবেচনা করে।
সর্বশেষ বার যখন আম্বেদকর গণ পরিষদে যান, পার্লামেন্টে যান, কার্যত ও আইনত কংগ্রেসের হয়ে। তিনি কংগ্রেসকে অপছন্দ করতেন, তাই তাদের সহযোগিতা নেবনা বলে বসে থাকলে হয়তো তার নীতি বাঁচত কিন্তু দলিতদের ক্ষতি হতো। এটা বিচক্ষণতা। সময়, সুযোগ, পরিস্থিতি ও নিজেদের শক্তি- সামর্থ সম্পর্কে অবহিত থাকতে হবে।
অবশ্যই আম্বেদকর এবং জগজীবন রামের ভূমিকা, অবস্থান আলাদা ছিল। একই সাথে আমাদের বুঝতে হবে সংসদীয় রাজনীতি কিছু সুবিধা দিতে পারে, সংস্কার করতে পারে কিন্তু বৈপ্লবিক পরিবর্তন করতে পারে না। আম্বেদকর তাই করেছেন, তার জন্যই লড়াই করেছেন। জগজীবন রামের ভূমিকা আম্বেদকরের সাথে তুলনীয় নয়, কিন্তু তিনি দলিতদের জন্য কিছু কাজ করেছেন, যাতে দলিতরা উপকৃত হয়েছেন। স্বাধীন ভারতে সংরক্ষণ কার্যকরী করার ক্ষেত্রে, যা শুরু হয় মূলত জগজীবন রামের কর্তৃত্ব অধীন রেল বিভাগ থেকে, তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। আম্বেদকর সংরক্ষণ নীতির জনক; স্বাধীন ভারতে বিশেষ করে কেন্দ্রীয় সরকারি দফতরে তা কার্যকরী করার প্রধান ভূমিকায় জগজীবন রাম (আম্বেদকরকে বাদ দিয়ে)।--- অবিভক্ত বাংলায় তা কার্যকরী হয় যোগেনবাবুর চেষ্টায় ও নেতৃত্বে। এদের নস্যাৎ করা বা নিন্দা করা বেঠিক, হঠকারিতা। রাজনীতির ময়দানের বক্তব্য আলাদা হতে পারে নানা কারণে, কিন্তু মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তা করা যায় না। কান্তি বাবু ও অন্যদের ক্ষেত্রেও সাবধানী হতে হবে।
আম্বেদকর ও যোগেনবাবুর ভূমিকা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক মতাদর্শগত লাইন প্রতিষ্ঠার চেষ্টার জন্য, যা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, ভবিষ্যতের জন্য। কিন্তু অতীত ও বর্তমানের সংস্কার সাফল্য যে ভবিষ্যতের ভিত, একথা ভোলা ঠিক নয়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন