বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা আমার বউ
আমি মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম। অসমের তেজপুর জেলার সেলুনিবাড়ি আর্মি ট্রেনিং ক্যাম্পে আমাদের আগ্নেয়াস্ত্র ট্রেনিং হয় এবং ভালুকপঙ-এর জঙ্গলে আরো একমাস গেরিলাযুদ্ধের ট্রেনিং/অনুশীলন হয়। যুদ্ধ শেষে যশোরে চাচড়ায় মিলিশিয়া ক্যাম্পে আমাদের ডাকা হয়, অস্ত্র জমা নেওয়া হয় এবং সর্বাধিনায়ক আতাউল গনি ওসমানীর স্বাক্ষরিত মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে একটি সনদপত্র দেওয়া হয়। এর ৪/৫ বছর পর নানা কারণে এদেশে চলে আসি।
আমরা যারা একসঙ্গে ট্রেনিং নেই এবং কাজ করি তাদের মধ্যকার, আমাদের এলাকার ১০/১২ জন এখন স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধা, ভাতা পান। আবার ৫/৬ জনের কিছু হয় নি। শুনলাম ৩/৪ জন ভাতা পাচ্ছেন, যারা নাকি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। ঠিক কিনা জানি না। কারণ কতজন কত বিভিন্ন জায়গায় ও ক্ষেত্রে লড়াই করেছেন। তবে জেনুইন কয়েকজনের হয় নি চেষ্টা/দরখাস্ত করা সত্ত্বেও। আমি সময়মতো দরখাস্ত করি নি। তবে ৫/৬ মাস আগে একটা আবেদন সাদা কাগজে করেছি যাচাই বাছাইয়ের সময় বাংলাদেশে গিয়ে পড়ায়। তবে কোনো উত্তর বা কিছুই খবর পাই নি বা আমাকে জানানো হয় নি।
আমার স্ত্রীও বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা ছিল। তার ট্রেনিং হয় কলকাতার পার্কসার্কাস এলাকার গোবরা নারী মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং ক্যাম্পে। ক্যাম্পের পরিচালক ছিলেন সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী -- যিনি এখনো বাংলাদেশ সংসদের ডেপুটি লিডার। ফার্স্ট এইড ট্রেনিং দেয় সেন্ট জর্জ এম্বুলেন্স। নার্সিং ট্রেনিং হয় শিয়ালদহের বি আর সিং হাসপাতালে। তারপর তাদের পাঠানো হয় ত্রিপুরার বিশ্রামগঞ্জ আহত মুক্তিযোদ্ধা হাসপাতালে। একেবারে যুদ্ধের ময়দানে। প্রথম ব্যাচে মাত্র ১৫ জনকে পাঠানো হয়। ৮/১০ টি পাকা কলার কান্দি, ৬৫/৭০ প্যাকেট পাউরুটি, প্রত্যেককে একটি সোয়েটার, একটি পাতলা কম্বল, একটা কেটস দিয়ে ট্রেনে তুলে দেওয়া হয় হাওড়া থেকে। সাথে একজন অবাঙালি ভারতীয় সেনা অফিসার। ১৫ জনের ২ জন ১২ ক্লাস পড়ুয়া, বাকি ১০ম ক্লাস পড়ুয়া ও স্কুল ফাইনাল পরীক্ষার্থী। আমার স্ত্রী তখন স্কুল ফাইনাল পরীক্ষার্থী।
বিশ্রামগঞ্জে অন্য অনেকের সাথে তারা সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ থেকে মার্চের (১৯৭২) প্রথম ভাগ পর্যন্ত কাজ করে। তারপর অবশিষ্ট ৭/৮ জন আহত মুক্তিযোদ্ধাকে সাথে নিয়ে গোটা টিম ঢাকায় ফিরে আসে।
তারা কাজ করে ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডা: নাজিম প্রমুখের নেতৃত্বে। বিশ্রামগঞ্জের সেই হাসপাতালের ধারাবাহিকতায় ঢাকার সাভারে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও হাদপাতাল।
ওই ১৫ জন নারী মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে আমাদের অঞ্চলের ৪ জন। একজনও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পান নি। তবে ৩ জন ভারতে চলে আসায় তারা চেষ্টা/দরখাস্ত করে নি। কিন্তু বাকি যিনি দেশে আছেন, তিনি প্রতিবার উপযুক্ত সময় দরখাস্ত করেছেন, চেষ্টা করেছেন কিন্তু কিছুই হয় নি।
এবার যাচাই বাছাইয়ের সময়ে আমি বাংলাদেশে গিয়ে পড়ি। উনি (আমি দিদি বলি), মানে যে দিদি আজও চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন, তিনি আমাকে বলেন যে, তার জন্য তাকে নিয়ে ঢাকায় যেতে হবে, চেষ্টা করতে হবে। আমার স্ত্রীও বলে সেও যাবে এবং একটা দরখাস্ত করবে।
আমরা ঢাকায় সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সাথে দেখা করি তাঁর ঢাকার বাড়িতে। ভারত থেকে যাওয়ায় দেখা করা সহজ হয়। ওদের দুজনকে আইডেনটিফাই করতে পারেন। খুব আদর-যত্ন করেন -- যা কেউ আমরা আশা করিনি। ঘন্টা খানেক কথা বলার পর, নানা কিছু খাওয়ানোর পর ফটোগ্রাফার ডেকে ভি ডি ও করলেন, দুজনের যুদ্ধের সময়ের কাজের বিস্তারিত বিবরণ ভি ডি ও করলেন।
পার্লামেন্ট চলছিল। সকালে আর যেতে পারলেন না। বললেন, বিকেলে পার্লামেন্টের মধ্যে দেখা করতে, উনি মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে নাম নথিভুক্ত করার জন্য সুপারিশ পত্র লিখে দেবেন বললেন।
চিঠি লিখে দিলেন। জামুকায় (জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল) গিয়ে দরখাস্ত জমা দিলাম। মহাপরিচালক পুনব্রত চৌধুরী মহাশয়ের সাথে দেখা করে কথা বললাম।
ডা: জাফরুল্লা চৌধুরীর সাথে দেখা হলো। তিনি চিনলেন। তিনি এক রকম জোর করে আমাদের সাভারে গণস্বাস্থ্যের গেস্ট হাউসে পাঠিয়ে দিলেন। বললেন --- ওটার মূল প্রতিষ্ঠাতা তোমরা, তোমরা যখন আসবে, ওখানেই থাকবে, কেন অন্য জায়গায় উঠবে! আমরা ওখানে ছিলাম দুদিন। ডা: নাজিম সাহেব টুঙ্গি থাকেন শুনলাম। দেখা হলো না, ফোনে কথা হল।
সাজেদা চৌধুরী ১৫ জন মেয়ের ঠিকানা, কোথায় থাকেন -- এসব জোগাড় করে দেবার জন্য বললেন। আমি উদ্যোগ নিয়ে সেটা জোগাড় করে পাঠাই। সাজেদা চৌধুরী ১৫ জনের জন্য সুপারিশ করে পাঠিয়েছেন, আমাদের সে চিঠির একটি কপি পাঠিয়েছেন।
এরমধ্যে জামুকা গণস্বাস্থ্যকে চিঠি দিয়ে বিশ্রামগঞ্জ হাসপাতালে যারা আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় কাজ করেছিলেন(ডাক্তার, নার্স) তাদের তালিকা চেয়েছে। ডা:নাজিম সাহেবকে তালিকা তৈরি করার ও পাঠানোর দায়িত্ব দিয়েছে। তিনি যোগাযোগ করে আমার স্ত্রীর সব কিছু তথ্য জেনে নিয়েছেন।
১৫ জন মেয়ের একজন ইরা কর। তিনি সাভারে গণস্বাস্থ্যের কর্মী, তিনিও আজও স্বীকৃতি পান নি। আমরা কাকতালীয় ভাবে যাচাই বাছাইয়ের সময় গিয়ে এই চেষ্টা করায় হয়তো কাজটি এগোলো। দেখা যাক।
যুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতারের সাথে যুক্ত থাকা যোদ্ধাদের স্বীকৃতির খবর দেখলাম এক বন্ধুর ফেসবুক পোস্টিংয়ে, তাই লিখলাম এসব কথা।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন