উদ্বাস্তু, তাঁদের নাগরিকত্ব ও সুপ্রীমকোর্টে মামলা
mআগামী ১৩ জুলাই, ২০১৭ সুপ্রীমকোর্টে ভারতীয় নাগরিকত্ব আইনের কিছু বিষয় নিয়ে ব্যাখ্যা, পর্যালোচনা, সওয়াল-জবাব হবে এবং রায় ঘোষিত হবে। এর জন্য একটি সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠিত হয়েছে সুপ্রিমকোর্টের ৫ জন বিচারপতিকে নিয়ে।
দেশভাগের শিকার হয়ে পূর্ববঙ্গের বাঙালিরা, বিশেষ করে বাঙালি হিন্দুরা ভারতে আসেন। আবার অনেক মুসলমান মানুষ ভারত থেকে পাকিস্তানে চলে যান। যথেষ্ট সংখ্যক বাঙালি মুসলমানও পশ্চিমবঙ্গ ও অসম থেকে পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ববঙ্গে চলে যান। হিন্দু ও মুসলমানের এই দেশান্তরণ যদি সংখ্যায় হিসাব করা হয়, তাহলে দেখা যাবে মুসলমানের থেকে হিন্দুর দেশান্তরণ কিছু বেশি হয়েছে। কিন্তু দেশ হিসেবে বা দেশের ক্ষমতার বিচারে উদ্বাস্তু মানুষের চাপ/বোঝা কিন্তু পাকিস্তানের কম বইতে হয় নি, হতে পারে তাদের ঘাড়েই বোঝা বেশি চেপেছে।
সংখ্যায় বেশি-কম বা বোঝা কম-বেশি সে যাহোক, পাকিস্তান সরকার উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ভালো-মন্দ যাই করুক, তারা কিন্তু দেশান্তরিত মানুষের নাগরিকত্ব নিয়ে হয়রানি করে নি, বেনাগরিক বলে উদ্বাস্তুদের জেলে ঘানি টানায় নি, শিক্ষা ও চাকরিতে 'না' করে নি।
উদ্বাস্তু আগমনের শুরু থেকে ভারতে/পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তুদের দুইভাগে ভাগ করে দেখা হয়। এক অংশ দলিত উদ্বাস্তু অন্য অংশ অদলিত উদ্বাস্তু। দেশভাগের আগে থেকে কলকাতার রাজনীতিতে অদলিত ও বাঙাল হিন্দুর আধিপত্য থাকার জন্য এটা সম্ভব হয়। 'বাঙাল' শব্দটি এই জন্য ব্যবহার করলাম, ওদের আধিপত্য না থাকলে উদ্বাস্তুদের হয়তো আরেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো, যে সমস্যায় অসমের উদ্বাস্তুরা জর্জরিত। অর্থাৎ 'ঘটি' ও 'বাঙাল' সমস্যা সামনে আসতে পারতো।
দলিত-অদলিত হিসাবে দেখার জন্য কলকাতায় ও নিকটবর্তী অঞ্চলে কলোনি গড়ে যারা ধীরে ধীরে মাথা তোলার সুযোগ পেলেন, তারা সবাই অদলিত। দেশভাগের পর প্রথম দিকের দলিত উদ্বাস্তুদের একটা অংশ পশ্চিমবাংলায় জায়গা পেয়েছে, তবে গ্রামাঞ্চলে, অজ পাড়াগাঁয়ে। তবে তারাই কিন্তু এই রাজ্যকে সুজলা-সুফলা করে গড়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে। বলা যায় হরেক প্রকারের জমি আবাদ করার কৌশল এবং নানা শস্য ও সব্জীর চাষ তারাই শুরু করে, এপার বাংলার চাষীরা তা শিখে নেয়।
দলিত উদ্বাস্তুদের পাঠানো হয় বাংলার বাইরে, পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে যে অঞ্চলে মানুষ বাস করে নি অথবা কোন আদিবাসী মানুষ সেখানে টিকে থাকলেও কখনো চাষাবাদ হয় নি, সভ্যতার কোনো আলো প্রবেশ করে নি।
দণ্ডকারণ্য প্রজেক্ট --- এখান থেকে পাঠানো হয় অন্ধ্রপ্রদেশের আদিলাবাদ জেলায়, মহারাষ্ট্রের চন্দ্রাপুর ও গরচিরুলি জেলায়, কর্ণাটকের রাইচুর জেলা, সাবেক মধ্যপ্রদেশের বস্তার (এখন অনেকগুলি জেলা), পারুলকোট ও অন্যান্য জায়গায়, উড়িষ্যার মালকানগিরি, কোরাপুট, নবরংপুর জেলায় --- এইসব জেলার সবচেয়ে অনুর্বর, পিছিয়ে পড়া ও দুর্গম এলাকায়।
পাঠানো হয় আন্দামানে। প্রথম সভ্য মানুষের বসতি। এ ছিল এক পরীক্ষা --- দ্বীপটি মানুষের বাসযোগ্য করা যায় কিনা। যেমনভাবে গবেষণা হয় ইঁদুর, গিনিপিগ নিয়ে।
নৈনিতালের হিমালয়/পাহাড়ের পাদদেশ এলাকা মানুষের বাসযোগ্য ও আবাদযোগ্য করার চেষ্টা শুরু হয় দেশ স্বাধীন হবার সময় থেকে। পাহাড়ের মানুষকে নানা সুযোগ সুবিধা দিয়ে ওই অঞ্চলে বসানো হয়। কিন্তু তারা টিকতে পারে নি। পালিয়ে যায়। নেহেরুর আমলে দুই বার এই চেষ্টা হয় কিন্তু সফল হয় না। তৃতীয় চেষ্টায় পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তুদের পাঠানো হয়।
কাটাগাছে পূর্ণ এলাকা। মশার জন্য শ্বাস নেওয়া যায় না, নাকে মশা ঢুকে যায়, এমন মশার উপদ্রব। একটু লবন কিনতে কাটা গাছ ঠেলে ১০ কিলোমিটার যেতে হয়। সরকার কোনো পরিকাঠামো তৈরি না করে তাদের সেখানে পাঠায়।
কত মানুষ পালিয়ে গেছে। কষ্ট সহ্য করতে পারে নি। কত শিশু, মানুষ মারা গেছে। এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায়, এক ক্যাম্প থেকে আরেক ক্যাম্পে, এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেছেন। সেই নদীর এপার কহে .... প্রবাদে যে কথা বলা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তারা একটা পর্যায় পার করে এসেছেন। ওইসব এলাকা আজ শস্য শ্যামল হয়েছে, তারা বেঁচে আছে, দেশ উপকৃত হয়েছে।
এখন শুরু হয়েছে নুতন নুতন আক্রমণ। নানা ধান্দায় স্থানীয় আদিবাসীদের উস্কানি দেওয়া হচ্ছে এদের বিরুদ্ধে। ধূসর, কাকর, টিলা-পাহাড়ের জমি এখন সবুজ ফসলে স্বপ্নের মতো। তাই স্থানীয় মানুষের নজর পড়ছে সেদিকে। তাদের আজ বহিরাগত, অবাঞ্চিত, বাঙালি মনে হচ্ছে রাজ্যের আদিম অধিবাসীদের।
কিছু মানুষ লেখাপড়া শিখে চাকরি করছেন, চাকরি চাইছেন। সে ক্ষেত্রে তারা লাল চোখ দেখছেন। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার এই বাজারে এটা খুব অস্বাভাবিক নয়। উড়িষ্যা ও অন্যান্য জায়গায় এসব নিয়ে কিছু সংঘর্ষও হয়ে গেছে।
পুরীর চিলকা, পারাদ্বীপের মহাকালপাড়া এলাকার উদ্বাস্তুরা মাছ ধরতেন চিলকা হ্রদ ও মহানন্দার মোহনায়। স্থানীয় মানুষ জানতেন না মাছ ধরতে, জানতেন না মাছ ধরার যন্ত্রপাতি তৈরি করতে। এখন তারা শিখে নিয়েছেন আর প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছেন বাঙালিদের। মাছ যত কমছে দ্বন্দ্ব ঝগড়ায় গড়াচ্ছে, হাতাহাতি, থানা- পুলিশ পর্যন্ত গড়াচ্ছে।
৫০/৬০/৬৫ বছর ভোট দেবার পর ভিনরাজ্যে এখন এইসব উদ্বাস্তুদের নাম ভোটার তালিকা থেকে কেটে দেওয়া হচ্ছে। অজুহাত হলো --- আইনি প্রক্রিয়া মেনে তারা ভারতের নাগরিক হয় নি। লিজে দেওয়া জমি, বহু ক্ষেত্রে আজও মালিকানা দেওয়া হয় নি। পঞ্চায়েত স্থানীয় বা স্থায়ী বাসিন্দা হিসাবে সার্টিফিকেট দিতে অস্বীকার করছে বহু জায়গায়। ফলে চাকরি, উচ্চ শিক্ষা , ব্যবসায়ের জন্য লাইসেন্স পেতে সমস্যা হচ্ছে।
কলকাতার আশেপাশে দলিত উদ্বাস্তুরা পরে এসেছেন, নিজেদের মতো ব্যবস্থা করে নিয়েছেন। গোটা রাজ্যেই তাই। অনেকের ২০/৩০ বছরেও ভোটার তালিকায় নাম ওঠেনি। নানাভাবে যাদের নাম ভোটার তালিকায় উঠেছে তারা ভয়ে থাকেন। কারণ আইন তাদের বিপক্ষে। চাকরি, পাসপোর্ট ও অন্য সরকারি কাজে নানা কাগজপত্র দাবি করে, যা মেটানো যায় না। টাকা দিয়ে ও অন্যান্য নানা অসাধু উপায়ে মেটাতে হয়। পুলিশ ও সরকারি কর্তাদের টাকার ক্ষিধে এখন আকাশ ছুঁয়েছে।
আজ পর্যন্ত মোট প্রায় এক কোটি হিন্দু দেশান্তরিত হয়ে ভারতে এসে উদ্বাস্তু জীবন যাপন করছে। তার মধ্যে মাত্র ৬ লক্ষর মতো উদ্বাস্তু অসমে আশ্রয় নেয়। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের মতোই উদ্বাস্তুরা বিশেষ কোনো পুনর্বাসন সহযোগিতা পান নি। বরং অন্যান্য অনেক অবিচার/অন্যায়ের সাথে ১৯৫০, ১৯৬০ সালে বাঙালি খেদাও/ বাঙালি বিরোধী দাঙ্গা করা হয়েছে। তাদের নানাভাবে কোণঠাসা করা হয়েছে।
এসব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, সমস্যার সমাধানের উদ্দেশ্যে ১৯৮৫ সালে একটি ত্রিপাক্ষিক চুক্তি হয়, যাকে অসম চুক্তি বলা হয়। নানা বিষয়ের সাথে ওই চুক্তিতে অসমের উদ্বাস্তুদের নাগরিক সমস্যার সমাধান হিসাবে একটি সীমারেখা ঠিক হয়। বলা হয় --- ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পরে কেউ বাংলাদেশ থেকে অসমে গেলে তিনি বিদেশি হিসাবে গন্য হবেন এবং তাকে বহিস্কার করা হবে। এই নীতি হিন্দু-মুসলমান সবার ক্ষেত্রে এক।
এ ব্যাপারে আরো কিছু বিষয় ঠিক হয়, যা এখানে পরিষ্কার করে উল্লেখ করা সমস্যার। তবুও দু কথা বলি। --- যেমন, ১৯৬৫ সাল অবধি যারা ওই রাজ্যে গেছেন, তাদের 'ধরে নেওয়া' হবে ভারতীয় নাগরিক। অসমে তাদের কোনো সমস্যা নেই। তবে তাদের প্রমানপত্র থাকা চাই যে তারা ওই সময়কালে অসমে ছিলেন।
আর যারা ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে ওখানে গেছেন ও ১৯৭১ সালের ভোটার তালিকায় নাম আছে, তাদের ট্রাইবুনাল বা আদালত বিদেশি বলে ঘোষণা করলে তাদের দেশ থেকে বহিস্কার করা হবে না। তবে যে দিন আদালত কাউকে বিদেশি বলে রায় দেবে, সেদিন থেকে ১০ বছর সে ভোটার হতে পারবে না। এমন খুঁটিনাটি আরো কিছু। এসবই হিন্দু-মুসলমান সবার ক্ষেত্রে একই।
এসব থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদের সেখানে হয়রানি করার কাজ চলছে। ডি ভোটার, ডিটেনশন --- এসব নানা কিছু। তারপরেও কিছু অসমীয়া মানুষ খুশি নন। তারা সুপ্রিমকোর্টে মামলা করেন। বেশ কয়েকটি মামলা। সবই উদ্বাস্তুদের বিরুদ্ধে -- যাতে তাদের অসম থেকে বের করে দেওয়া হয়।
অসমের একজন বা একটি বাঙালি এন জি ও একটি মামলা করে ২০১২ সালে। তাদের আবেদন ছিল যে, হিন্দু উদ্বাস্তুদের অনুপ্রবেশকারী বলা যাবে না। ঘুরিয়ে মানে দাঁড়ায় তারা শরণার্থী। অর্থাৎ তাদের ভারতে থাকতে দাও, গ্রেফতার করা যাবে না। এসব দেখে আমাদের (Joint Action Committee for Bangali Refugees) খটকা লাগে। আমরা ভাবি যে, সুপ্রিমকোর্ট একটা রায় দিয়ে দিলে সবার ক্ষেত্রে কার্যকরী হবে, সমস্যা হতে পারে। তাই আমরাও একটা মামলা করি ২০১৪ সালে।
এইসব অনেকগুলি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে একটা সাংবিধানিক বেঞ্চ হয়েছে এবং ৮/৯ টি মামলা এক জায়গায় করে একসাথে শুনানি শুরু হচ্ছে আগামী ১৩ জুলাই থেকে।
এই মামলার বেশ কিছু বিষয় বিচার্য । কিছু অসম চুক্তির খুঁটিনাটি বিষয়। আর মূল যে বিষয় বিচার্য তাহলো --- (১) নাগরিকত্বের ভিত্তিবর্ষ কি হবে? অসমের কয়েকটা সংগঠন আবেদন করেছে ১৯৭১ সাল নয়, ভিত্তিবর্ষ করতে হবে ১৯৪৮ সালের ১৯ জুলাই। তাদের যুক্তি হলো -- সারা দেশে এই ভিত্তিবর্ষ একই হওয়া উচিত, শুধু অসমের ক্ষেত্রে আলাদা ভিত্তিবর্ষ হওয়া ঠিক নয়। (২) আমরা আবেদন করেছি যে, যারা দেশভাগের শিকার তাদের কোনোভাবেই অর্থাৎ পাসপোর্টে বা বিনা পাসপোর্টে আসুক, অনুপ্রবেশকারী বলা যাবে না। তাই ২০০৩ সালের আইনের ২(১)(বি) ধারা সংশোধন করতে হবে এবং দেশভাগের শিকার সবাইকে ভারতীয় নাগরিক বলে ঘোষনা করতে হবে (without fulfilling statutory requirements)। এজন্য আমরা ১৯৮৯ সালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের নিযুক্ত এস্টিমেট কমিটির সুপারিশের উল্লেখ করেছি এবং পঞ্জাব ও অসমের দৃষ্টান্ত যুক্তি হিসাবে এনেছি। (৩) আমরা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাবার পথ শর্তযুক্ত করাকে সংবিধানের মূলনীতি বিরোধী বলে উল্লেখ করে ২০০৩ সালের আইনের সংশ্লিষ্ট সেকশনকে বাতিল ঘোষণা করার আবেদন করেছি, যাতে এদেশে কেউ জন্মগ্রহণ করলেই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পান। ২০০৩ সালের আইনে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাবার জন্য বাবা-মার নাগরিকত্ব থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়।
আমরা অনেক পরে জানলাম --- অসমের যে বাঙালি এন জি ও ওই মামলাটি করে তার মালিক রাজদীপ রায়। তিনি অসম রাজ্যের বি জে পি দলের রাজ্য কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও ওই রাজ্যের পার্টির মুখপত্র। তারা এই বেঞ্চের শুনানিতে থাকবে না বলে মামলা সরিয়ে নিয়েছে। একবার ভাবুন --- যদি ১৯৪৮ সাল সীমারেখা হয়ে যায়, তাহলে কি পিরিস্থিতি হবে! শুনানিতে তারা থাকলে ১৯৪৮ সীমারেখা করার যুক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারতো। আমরা একজন সহযোদ্ধা বা সাথী পেতাম। কাদের কথায়/চাপে বা কি যুক্তিতে কে জানে! তারা সরে পড়লো! বি জে পি বোধহয় এমনি!
আইনি যুক্তি কোন পক্ষের কি কি? --- সে কথার আগে বলে নেওয়া দরকার তা হলো, কেন্দ্রীয় সরকার হলফ নামা আদালতে জমা দিয়েছে, আমরাও পেয়েছি। তারা বলেছে --- ২০১৪ সাল পর্যন্ত যারা, মানে মুসলিম বাদে যারা ভারতে এসেছেন পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তান থেকে তাদের অনুপ্রবেশকারী বলা হবে না। তবে তারা যদি ধর্মীয় কারণে অত্যাচারিত হয়ে বা তার ভয়ে এসে থাকেন। অর্থাৎ ২০০৩ সালে তাদের নিজের করা আইনের ২(১)( বি) ধারায় একটা সংশোধনের স্বীকারোক্তি দিয়েছে কোর্টে। আসলে এটাই হলো তাদের প্রস্তাবিত বিল, যা কয়েক মাস আগে নোটিফিকেশনের মাধ্যমে জানিয়েছিল।
সরকার যেটা মেনে নেবে বলে হলফনামা দিয়েছে অর্থাৎ ২(১)(বি) সেকশনে সংশোধন, ওটা নিয়ে আলোচনায় বা যুক্তির বিষয়ে আর যাচ্ছি না। আমাদের বাকি বিষয়টা হলো জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব এবং এটাই সব থেকে প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে প্রস্তাবিত বিলে কিন্তু এই সরকার জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে কোনো পরিবর্তনের কথা বলে নি।
আমরা মূল সংবিধানের ৫(এ) ধারার কথা বলেছি। সেখানে বলা আছে ভারতের মাটিতে জন্মগ্রহণ করলেই, সে জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিকত্ব পাবার অধিকারী। এটাই সংবিধানের নির্দেশ, এর পরিপন্থী কোনো আইন তৈরি করার অধিকার পার্লামেন্টের নেই। নাগরিকত্ব হয় কোনো ব্যক্তির, পরিবারের নয়। তাই কারুর নাগরিকত্বর সাথে বাবা-মাকে জুড়ে দেওয়া মূল সংবিধান বিরোধী। তাই পার্লামেন্টে তৈরি আইন বাতিল ঘোষণা করতে হবে।
অনেকের ধারণা আছে যে, পার্লামেন্ট যে আইন তৈরি করে তা নিয়ে আদালত কোনো কথা বলতে পারে না। এই ধারণা ঠিক নয়। পার্লামেন্টে তৈরি করা কোন আইনকে যদি সুপ্রিমকোর্ট মনে করে তা সংবিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তাহলে তা বাতিল বলে ঘোষণা করতে পারে। অনেকবার এটা হয়েছে।
অসমের যারা ১৯৪৮ সীমারেখা চাইছেন, মনে হয় তাদের যুক্তি হলো --- মূল সংবিধানের ৬(বি) ধারা। সেখানে বলা হয়েছে --- যে কেউ, যিনি বর্তমান পাকিস্তান এলাকাভুক্ত অঞ্চল থেকে ভারতে এসেছেন, তিনি যদি ১৯৪৮ সালের ১৯ জুলাই বা তার আগে ভারতে এসে থাকেন, তাহলে সংবিধান গ্রহণের সময় তাকে ভারতীয় নাগরিক হিসাবে মেনে নেওয়া হবে। অর্থাৎ এর পরে যারা আসবেন তারা ভারতীয় নন, তাদের ভারতীয় নাগরিক হতে হবে।
কিভাবে নাগরিক হতে হবে এবং তার কি শর্ত এসবই সংবিধানে বলা হয়েছে। যেমন একটি নির্দিষ্ট ফর্মে দরখাস্ত করতে হবে। একটি নির্দিষ্ট সময়কাল ভারতে বাস করার পর দরখাস্ত করা যাবে ইত্যাদি। তারপর যদি উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ মেনে নেয় বা সার্টিফিকেট দেয়, তাহলে সে ভারতের নাগরিক, না হলে নয়। আমাদের জন্য শুরুতে সময়কাল ছিল ৬ মাস, তারপর ৫ বছর, এখন তা করা হয়েছে ৭ বছর।
অসমীয়া আবেদনকারীরা হয়তো বলবেন --- ওই যে ১৯৬৫ বা ১৯৭১ এর আগে আসলে ভারতীয় হিসাবে ধরে নেওয়া হলো --- এসব চুক্তি বা ৬এ ধারা ( অসম চুক্তি ২০০৩ সালের আইনে ৬এ ধারা হয়) মূল সংবিধান বিরোধী। সংবিধান অনুযায়ী ওভাবে কেউ নাগরিক হতে পারে না, তাকে নিয়ম মেনে দরখাস্ত করে নাগরিক হতে হবে এবং সে আইন সারা দেশের জন্যই এক।
বিষয়টি যথেষ্ট জটিল। এখন দেখা যাক, বিচারকরা হুবহু সংবিধান ধরে ধরে এগোবেন, না উদ্বাস্তুর কষ্ট ও বাস্তব সমস্যাকেও গুরুত্ব এবং অগ্রাধিকার দেবেন!
মনে রাখতে হবে, এ লড়াইটাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক কিছু নির্ভর করবে এই মামলায় সুপ্রিমকোর্টের রায়ের উপর।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন