শান্তি-সম্প্রীতির পথ কী ?

ভারত একটি ভৌগোলিক এলাকা ও একটি জনসমষ্টি  নিয়ে যাত্রা শুরু করে ১৯৪৭ সালে। এই জনসমষ্টি ভারতের নাগরিক -- তাদের সবার সমান অধিকার ও দায়িত্ব-কর্তব্য পালনের জন্য দায়বদ্ধ।

এই নাগরিকবৃন্দ নানা ভাষা, ধর্ম, বর্ণ এবং মত ও পথের পথিক। ভারতীয় সংবিধান প্রত্যেকের ভাষার ব্যবহার, ধর্ম পালনের অধিকার এবং আচার, অনুষ্ঠান, রীতি-নীতি পালন ও বিশ্বাস অনুযায়ী চলার স্বাধীনতা স্বীকার করেছে। অন্যের উপর হস্তক্ষেপের অনুমতি দেয় নি। বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম, আচার-অনুষ্ঠান, রীতি-নীতি-বিশ্বাস মেলাতে বা কেন্দ্রীভূত করার নির্দেশ দেয় নি, বরং প্রত্যেকের স্বকীয়তা বজায় রেখে সহাবস্থানের কথা বলেছে -- যাকে বলা হয় বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য।

ভারতের সরকার, পার্লামেন্ট, সংবিধানের এইসব নির্দেশ ১৯৪৭ সালের পরের নির্দেশ। পাকিস্তান ও ভারত সৃষ্টির পরের সিদ্ধান্ত। তাই ভারতের নাগরিক, যারা ধর্মে মুসলমান, তাদের অধিকার ও দায়িত্ব-কর্তব্যের সাথে পাকিস্তান সৃষ্টি এবং পাকিস্তানের ভালো-মন্দ কোনো ভূমিকার সাথে কোনো ভারতীয় নাগরিকের নাম জড়ানো বেঠিক ও বে-আইনী।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটা ঠিক যে, আজ পর্যন্ত ভারত-পাকিস্তান ৪/৫ টি যুদ্ধ লড়েছে। এমনকি চীনের সঙ্গেও একটি যুদ্ধে ভারত লড়াই করেছে। স্বাধীনতার লড়াইয়ে ভারতীয় মুসলমানদের গৌরব জনক ভূমিকার মতোই এইসব কঠিন যুদ্ধেও ভারতীয় সৈনিক -- যারা ধর্মে মুসলমান তারা অন্যদের মতোই বীরত্বের সাথে আত্মোৎসর্গ করেছেন, সাহসের সাথে লড়াই করেছেন ও বিজয় অর্জন করেছেন। ভারতীয় অন্য সকল জনগণের মতোই মুসলমান নাগরিকবৃন্দ দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়ে চলেছেন, দেশের প্রগতিতে অংশ নিচ্ছেন।

ব্যতিক্রম যদি থাকে, তা ব্যতিক্রম। দেশ বিরোধী শক্তি যারা ও যা কিছু, তারা দেশ বিরোধী। ওরা কোনো বিশেষ ভাষাভাষী, ধর্ম বা বর্ণের হয় না। সব অংশের মানুষের মধ্যে এই কলঙ্ক থাকতে পারে। তাদের আলাদা করে দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তি তাদের প্রাপ্য।

মনুষ্যত্বের দাবি সাম্য, সমানাধিকার, সম মর্যাদা, সুবিচার। আমরা সৌভাগ্যবান যে, আমাদের সংবিধানের নির্দেশ এই সব মহান উদ্দেশ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। আমাদের সেই লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে। একই সাথে এই লক্ষ্যের বিরোধী যারা, যারা এই লক্ষ্য অর্জনের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করবে, তাদের চিহ্নিত করতে হবে এবং তাদের তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে ও পরাস্ত করতে হবে।

আমাদের দেশের নাগরিকদের মধ্যকার আদিবাসী মানুষেরা সবচেয়ে পিছনে পড়ে আছেন, তফসিলিরা অনুন্নত, ও বি সি মানুষেরাও মধ্যবর্তী স্তরে। তবে স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত তাদের উন্নতি আশানুরূপ না হলেও উন্নয়নের রেখচিত্র উর্ধমুখী। আর আমরা নানা কথা শুনি ঠিকই কিন্তু সরকারের প্রকাশিত তথ্য এই যে, একমাত্র মুসলমান সমাজের সার্বিক অবস্থা -- আর্থিক, শিক্ষা, চাকরি প্রভৃতি ক্ষেত্রে অন্যান্যদের তুলনায় ক্রমেই অধগামী হয়েছে। এটা শুধু মুসলমানদের ব্যর্থতা নয়। এটা আমাদের সংবিধান ও রাষ্ট্রের ঘোষণা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ব্যর্থতা। এ অবস্থার বা এই গতিধারার পরিবর্তন করতে হবে। সে জন্যই সংরক্ষণ জাতিয় ব্যবস্থার সমালোচনা করতে হবে তা তুলে দেবার জন্য নয়, তার সঠিক প্রয়োগ করার জন্য বা আরও ভালো ব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে।

মুসলমানদের মধ্যে বেশি জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমালোচনা করা হয়। আমাদের দেশে সব সম্প্রদায়ের মধ্যে বৃদ্ধির হার অন্য অনেক উন্নত দেশের তুলনায় বেশি। কেন? কারণ অনুন্নয়ন, শিক্ষার অভাব, অশিক্ষা-কুশিক্ষা। এই কারণগুলো দূর করতে পারলে গোটা দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে যাবে। মুসলমানদের ক্ষেত্রেও কমবে। বাস্তবত হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ব্যবধান ক্রমেই কমতে কমতে ২০১১ সালের জন গণনায় দেখা যাচ্ছে তা প্রায় সমান হয়ে গেছে।

আমাদের এই দেশ ভারতবর্ষে ১০টি রাজ্যে মুসলমানদের মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হিন্দুদের থেকে কম। সাচার কমিটির রিপোর্টে তার উল্লেখ আছে। ওই রাজ্য গুলিতে মুসলমানদের আর্থিক ও শিক্ষার মান ভালো। তাই অর্ধ শিক্ষিত মুসলমান ও হিন্দু ধর্ম গুরুদের এ সম্পর্কে কোনো উল্টো নির্দেশ ও ব্যাখ্যা মেনে নেবার কোনো যুক্তি নেই, দরকার নেই। তাই মুসলমান বিদ্বেষী কোনো অপপ্রচারে কান না দিয়ে দেশের সার্বিক উন্নতির দিকে নজর দিতে হবে, ও লড়াই করতে হবে।

পরিবারের যে সদস্য অসুস্থ্য, দুর্বল পরিবারের শান্তির জন্য তার দিকে বিশেষ নজর ও যত্ন নিতে হয়। দেশটাও আমাদের পরিবার। সব নাগরিক তার সদস্য। আদিবাসী, দলিত, মুসলমানরা যদি অশিক্ষিত থাকেন, দুঃস্থ থাকেন, চোর-বদমাশ হন, তাহলে তা দেশের জন্য ভালো হতে পারে না। দেশের অন্য নাগরিকের জন্য ভালো হয় না, শান্তির হয় না, দেশের মর্যাদা বাড়ে না।

দেশে ২০ কোটি মুসলমান। তাদের তাড়িয়ে দেওয়া যাবে না, মেরে ফেলা আজকের দুনিয়ায় অসম্ভব। এদেশ তাদেরও জন্মভূমি। তাই এক দেশে বসবাস করাই আমাদের ভবিতব্য। তাই শান্তি ও সহাবস্থানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। সবার উন্নতির পথ খুঁজে  বের করতে হবে।

যারা বিদ্বেষের কথা বলছেন, তারা শুধু মুসলমানদের সর্বনাশের কথা বলছেন না, দেশের সব মানুষের সর্বনাশ হবে তাতে, অশান্তি হবে। এমনকি গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি হতে পারে, আবার দেশ ভাগ হবার মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি ঠেলে দিতে পারে।

তাই দেশবাসীর কাছে আহবান সংবিধান মেনে শান্তি, সম্প্রতির সাথে সহাবস্থানের পথ গ্রহণ করুন, বিদ্বেষ ও বিভেদপন্থীদের প্ররোচনায় পা দেবেন না, তাদের বর্জন করুন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

তৃণমূল নেত্রী ফের সংসদে

যদা যদা হি ধর্মস্য... গীতার এই শ্লোকে ঠিক কী বলা হয়েছে?

ভাতে কেরোসিন যাত্রাপুরে, অভিযোগ বাংলাদেশী