আমাদের দেশ : ধর্ম ও রাজনীতি
প্রশান্তকুমার বিশ্বাসের পোস্ট নিয়ে কথা-----
তোমার লেখার মধ্যে অনেকগুলি কথা নিয়ে আলোচনা করা দরকার। আমার মনে হয়, কথাগুলোর দ্বারা তোমার ইচ্ছার বিপরীত ফল ফলতে পারে।
কোরানের একটি কথা (শত্রু ভেবে কাউকে মেরে ও মরে স্বর্গলাভ হয়) তুমি ' নাকি ' শব্দ যোগ করে উল্লেখ করেছো। বিষয়টা তোমার নিঃসন্দেহ হয়ে বলা উচিত। যদি দেখা যায় যে, কথাটা ঠিক নয়। তাহলে কি প্রমান হয়। প্রমান হয় --- বুঝে বা না বুঝে তুমিও মনুবাদীদের প্রচারে বিভ্রান্ত।
আম্বেদকর সম্পর্কে কোনো খারাপ কথা/ দলিত স্বার্থ বিরোধী কথা কেউ উল্লেখ করলে তোমার কি মনে হবে? মনে হবে, কথাটা ঠিক নয়। কেউ কোনো উদ্ধৃতি দিলে মনে হবে যে, প্রেক্ষিত কি? ভুল ব্যাখ্যা হচ্ছে না তো?--- কেন এমন হয়? হবার কারণে হলো, আম্বেদকরের মতো মানুষ দু রকম কথা বলতে পারেন না এই জোর থেকে। কিন্তু কোরানের ক্ষেত্রে তোমার কেন তেমন মনে হচ্ছে না? কারণ যে কোনো মাত্রায় হোক, একটা বিভ্রান্তি তোমার আছে বলে যদি আমি অভিযোগ আরোপ করি, তোমার ডিফেন্স কি?
বিশ্বজোড়া মুসলিম আগ্রাসন--- এ কথার মানে কি? ফলাফল কি? সংঘ পরিবারের অপ প্রচারের সাথে প্রভেদ কি? --- তার সাথে আমার আরো প্রশ্ন, এ কথার সত্যতা কি?
এ হলো ধর্মের সাথে রাজনৈতিক ঘটনাবলিকে জড়িয়ে নেবার গুরুচন্ডালিকা দোষ। একথা হলো সংঘ পরিবারের প্রচারের সম্পূর্ণ অনুরূপ। সংঘ পরিবার হিন্দু রাষ্ট্র করতে চায়। তার মানে --- হিন্দুধর্ম ও ভারত রাষ্ট্র একাকার করে নিতে চায়। কিন্তু বললেই তো আর হয় না, তার জন্য মানুষের সমর্থন চাই। মানুষের সমর্থন আদায় করা চাই। ওই মুসলমান আগ্রাসন, কোরআনের অপব্যাখ্যা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, তালাক, পাকিস্তান-বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন --- এসব সত্য-মিথ্যা, ঠিক-বেঠিক, কম-বেশিকে উল্টো-সিধা করে প্রচারের মাধ্যমে হিন্দু জনমত নিজের দিকে টেনে আনা।
তুমি যদি বলো সন্ত্রাস হলো আদতে ইসলামিক সন্ত্রাস। অর্থাৎ তার উৎস হলো কোরআন। আরবের মুসলিম দেশগুলি হলো তার অর্থের যোগানদার, তাহলে হিন্দু সব এক হও, হিন্দু রাষ্ট্র বানাও, এই স্লোগানে সংঘ পরিবারের ভুল/দোষ কোথায়?
তুমি একটি সন্ত্রাসী ঘটনার ক্ষেত্রে দেখাতে পারো, মুসলিম সমাজ তাকে সমর্থন করেছে? বা নিন্দা করেনি? মুসলিম ধর্ম গুরু বা মুসলিম সংগঠন নিন্দা করে নি। প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা বলেছে, ইসলামের সাথে সন্ত্রাসের কোনো সম্পর্ক নেই, সন্ত্রাসীরা মুসলমান নয়, স্বীকার করে না। আজমল কাসবের অন্তেষ্টি করতে কেউ রাজি হন নি। মুসলিম সন্ত্রাসীর মা সন্ত্রাসী ছেলের চরম শাস্তি দাবি করেছে। হয়তো এই শিক্ষা কোরআন দিয়েছে।
মোল্লাতন্ত্র ও টিকির সমস্যা আলাদা। কুসংস্কার, ব্যাকওয়ার্ড চিন্তা-চেতনার সমস্যা, তার জন্য নিজ নিজ সমাজের মানুষকে এগিয়ে এসে নেতৃত্ব দিতে হবে। সব কিছু তালগোল পাকিয়ে লাভ নেই
জিন্না বিদেশে পড়া মানুষ। নেতৃত্ব দিলেন মুসলিম লীগকে। মৌলানা আবুল কালাম আজাদ একই সময়ে,একই প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ ভারতের পক্ষে দাঁড়ালেন। ব্যক্তি শুধু নয় --- আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আধুনিক শিক্ষিতরা পাকিস্তানের পক্ষে গেলেন, দেওবন্দীরা দাঁড়ালেন হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যবদ্ধ ভারতের পক্ষে।
হিন্দুরা সংঘ পরিবারের সাথে আছে, কংগ্রেস করে, সি পি এম করে, মাওবাদিও আছে। মুসলমানরা জামাতের সমর্থক আছে, আওয়ামী লীগ আছে, কম্যুনিস্ট আছে। খ্রিস্টানরা কমিউনিস্ট ও তার বিরোধী আছে, বুদ্ধিস্টদের ক্ষেত্রেও তাই। ধর্ম দিয়ে রাজনৈতিক সমস্যা ব্যাখ্যা করে মেলানো যায় না।
সন্ত্রাসবাদীদের আমেরিকা অস্ত্র, টাকা এসব দেবার বহু অভিযোগ শুনেছি, কিন্তু আরব দেশগুলি টাকা দেয়, একথা বিশেষ শোনা যায় না। পাকিস্তান-ভারত ব্যাপারটা আলাদা। এর মূল কারণ কাশ্মীর বিতর্ক, সমস্যা। বিষয়টা একতরফা একথা বলা যাবে না। এটাও সমস্যা হিন্দু-মুসলমান বা কোরআন নয়, রাজনীতি। আমরা বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকায় খুশি। পাকিস্তান ভাবতেই পারে --- পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ভারত কেন নাক গলাল, কেন সেনা অভিযান করলো? শক্তিতে বা সম্মুখ যুদ্ধে না পেরে তারা হয়তো চিমটি কেটে বিরক্ত করার পথ বেছে নিয়েছে। সত্য পৌঁছতে নিরপেক্ষ ভাবে ভাবতে হবে। শুধু নিজের যুক্তিতে অনড় থাকার কারণে সমস্যা সমস্যাই থেকে যাচ্ছে, দেশের মানুষের জীবন যাচ্ছে।
পৃথিবীর বড় বড় সন্ত্রাসী হামলার খল নায়ক কে আছেন, যিনি মাদ্রাসায় পড়েছেন? কোন মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি শিক্ষার সুযোগ আছে? শ্রীলঙ্কায় অতো লম্বা লড়াই। এক দিকে হিন্দু-খ্রিস্টান অন্যদিকে বুদ্ধিস্ট। অসমের উলফা কোনো মুসলমান নেই। কিন্তু অসমে মাদ্রাসা কি কম আছে? নকশাল এবং মাওবাদীদের যারা সন্ত্রাসবাদী বলেন, ওদের মধ্যে মাদ্রাসায় পড়া বা ইসলামের প্রতি আসক্ত কতজন আছেন? তাহলে কি প্রেসিডেন্সি, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাসবাদী শিক্ষা দেওয়া হয়? অবশ্যই নয়, তাহলে?
সন্ত্রাসবাদের সমস্যা একটি বড় রাজনৈতিক সমস্যা। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বদলা নিতে এই ভ্রান্ত পথের সৃষ্টি। আফগানিস্তান, ইরাক প্রভৃতি দেশে আমেরিকার পাহাড় প্রমান অন্যায়-সন্ত্রাসের বদলা নিতে এই বিকৃত পথে পা বাড়ান কিছু যুবক। স্বাভাবিক ভাবেই মুসলমান যুবক তারা। বিশ্বের ক্ষেত্রে তাদের মূল টার্গেট আমেরিকা ও তার সহযোগী শক্তি। বৌদ্ধ, হিন্দু, খ্রিস্টান এভাবে নয়, দেখতে হবে রাজনীতি দিয়ে। ভারতে যদি তেমন কিছু ঘটে এবং মার্কিন বা অন্য কোনো দেশের কোনো দালাল সরকার এখানে ক্ষমতায় বসানো হয়/হতো--- হতে পারে এদেশে কিছু হিন্দু যুবকেরা সন্ত্রাসী হয়ে যেত।
বাংলাদেশ নিয়ে তুমি যা লিখেছো তা সত্য নয় এবং সংঘ পরিবারের কথাই তুমি বলেছ। তোমার আবেদন সংঘ পরিবারের থেকে আলাদা কিন্তু বর্ণনা এক। ফলাফল সংঘের পক্ষে যাবে। বাংলাদেশে তেমন কিছু হয় না। বেশি লিখছি না, একদিন বসে আলোচনা করতে চসি। অসমে হিন্দুরা যত সমস্যায়, বাংলাদেশের হিন্দুরা ততটা নিয়ে। তবে একেবারেই সমস্যা নেই, তা নয়। দেশ ত্যাগ করার মতো সমস্যা নয়। বাংলাদেশে অন্যায় অত্যাচারের ক্ষেত্রে হিন্দুর পাশে দাঁড়ানো লোকের সংখ্যা অনেক বেশি। সরকারও যথেষ্ট না হলেও মোটামুটি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে।
আরেকটি কথা বলি ভেবে দেখতে পারো --- কাশিরামকে সামনে রেখে ও মাথায় রেখে সংঘ পরিবারের মোকাবিলা/বিরোধিতা করা যায় না। নানা ক্ষেত্রে ধরাশায়ী হতে হবে। এই প্রশ্নে তিনি অনেক ফাউল করেছেন। আর ভাগীদারীর ওই মৌলিক কথাটি কাশিরামের নয়, ওটাই হলো আম্বেদকরের সারাজীবনের লড়াইয়ের মূল পয়েন্ট। আম্বেদকরবাদের মূল কথা ওটা। মিথ্যা কৃতিত্ব দেবার জন্য ওই কথার সাথে কাশিরামের নাম যোগ করা হয়, ওটা করো না। ওটা আম্বেদকরকে নস্যাৎ করার জন্য ব্যবহার করা শুরু হয়েছিল। কাশিরামের আন্দোলন মুখ থুবড়ে না পড়লে ওই অস্ত্রে আম্বেদকরকে ঘায়েল করা হতো।
দেখো, আমার সাথে তো কাঁশিরামের কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। একবারই মাত্র তাঁর সাথে আমার দেখা হয়, যখন প্রখর রোদে তিনি আমার মছলন্দপুরের বাড়ির উঠোনের কোনে চারা নারকেল গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি তাকে ওখানে বসার জন্য একটা প্লাস্টিকের চেয়ার ও এক গ্লাস জল জল খেতে দি। তেমন কোনো কথা হয় না। উনি আমাকে চিনতেন না। বাংলাদেশে আমাদের গ্রামের একটি মেয়ের জন্য কোনো একটি প্রজেক্ট করে দেবার জন্য আমার বাড়ির ঠিক পাশের প্লটটি তিনি দেখতে গিয়েছিলেন (কারণটা পরে জেনেছিলাম)।
আমার গুরুচাঁদ ঠাকুর, আম্বেদকর, যোগেন্দ্রনাথ, জ্যোতিবা ফুলে, পেরিয়ার --- এদের কাউকে নিয়ে সমস্যা নেই, কাশিরামকে নিয়ে অকারণে কেন সমস্যা হবে! দেখো, গান্ধী দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, মুজিবর রহমান বাংলাদেশ তৈরি করায় নেতৃত্ব দিয়েছেন, জ্যোতি বসুও সফল রাজনীতিক, তার মানে কি তারা অনুকরণীয় রাজনীতিবিদ?
আমি মনে করি, তুমি, প্রশান্ত, ভাস্কর--- তোমরা আম্বেদকরের পথে হাঁটতে চাও কিন্তু পথ চেনাবার যন্ত্রটির ব্যবহার ঠিক মতো শিখতে পার নি। যে পথ অনেক আঁকাবাঁকা ও দীর্ঘ, সে পথ চলতে কিছু সূত্র অনুসরণ করতে হয়, পথ চলতে চলতে জিজ্ঞাসা করে করে সঠিক পথে যাওয়া যায় না, লক্ষ্যে পৌঁছনো যায় না।
স্যার,দয়া করে বলবেন দার-উল ইসলাম আর দার-উল হারব কথাদুটির মানে কি?
উত্তরমুছুন