শ্যামাপ্রসাদের জন্মদিনে তথাগতর কেচ্ছা
তথাগত রায় ৯ জুলাই, ২০১৭ তারিখে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির উপর বর্তমান পত্রিকায় একটি গল্প লিখেছেন। অসম থেকে ফোনে একজন আমাকে একথা জানিয়ে এই লেখার উপর আমার মতামত জানাতে অনুরোধ করেন। আমার চোখের অপারেশন হওয়ায় আমি কিছুটা সমস্যায় আছি, তাই দেখি দেখি বলে এড়িয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তিনি এই কদিন টেলিফোন করছেন প্রতিদিন। তাই সংক্ষেপে কয়েকটি কথা লিখছি। বিশদে জানতে চাইলে আমার লেখা বই ' বঙ্গপ্রদেশের ভদ্রোলকশ্রেণী ও সাম্প্রদায়িকতা ' বইটি পড়ে নিতে পারেন।
তথাগত রায় এই গল্পে লিখেছেন, " শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক জীবন শুরু ১৯৩৯ সালে " --- একথা ঠিক নয়। শ্যামাপ্রসাদ রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে কংগ্রেস করতেন। কংগ্রেসের মধ্যে স্বরাজি ছিলেন --- যার নেতা ছিলেন শরৎচন্দ্র বসু। শ্যামাপ্রসাদ ১৯২৯ সালে একজন স্বরাজি হিসাবে বাংলার আইন সভায় মনোনীত হন। তিনি ১৯৩১ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করেন। ১৯৩৭ সালে তিনি নির্দল প্রার্থী হিসেবে বাংলার আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি কলকাতা করপোরেশনেরও সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩৯ সালে তিনি হিন্দু মহাসভায় যোগ দেন। মনে হয় --- শ্যামাপ্রসাদের রাজনীতির শুরু যে কংগ্রেসের হাত ধরে, এই সত্য তিনি গোপন করার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন।
১৯৪১ সালে তিনি যখন মুসলিম মন্ত্রিসভায় ডেপুটি প্রিমিয়ার হন, তখনও তিনি উগ্র হিন্দু হিসাবে বিশেষ পরিচিতি পান নি। তবে একথা ঠিক কংগ্রেসের অসাম্প্রদায়িক অংশের নেতা শরৎ বসুর অবর্তমানে তিনি কংগ্রেসের মধ্যকার হিন্দুত্ববাদী অংশের সমর্থন পান এবং মুসলমানদের সরকারের ২য় ব্যক্তি হন। কার্যত এই সময়কালে বহু সময়ে কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভা হাত ধরাধরি করে কাজ করে। ১৯৩৭ সালের আইন সভার নির্বাচনে এবং ১৯৪৪ সালে কলকাতা করপোরেশন নির্বাচনে ওই দুই দল একসাথে লড়াই করে।
আমরা ইতিহাসে দেখেছি অনেক অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ব্যক্তি সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন। উল্টোটাও হয়েছে। শ্যামাপ্রসাদ রাজনৈতিক জীবন যেভাবে শুরু করেছিলেন, পরে সেখান থেকে সরে গিয়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।
শ্যমপ্রসাদকে ধর্মনিরপেক্ষ প্রমান করতে আবুল মনসুর সাহেবের সার্টিফিকেট জোগাড় করেছেন তথাগত রায়। আবার কাজী নজরুল ইসলামের পাশে দাঁড়াবার গল্প ফেঁদেছেন। এইসব ব্যক্তিগত বিষয়াদির উল্লেখে কিছু প্রমান হয় না, ব্যক্তি সম্পর্ক-সহযোগিতা -- এসব হতেই পারে। এগুলি এইসব ক্ষেত্রে উল্লেখ আসলে নীচতা।
বি জে পি এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রায় সব বড়ো নেতাদের মুসলিম পরিবারের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে। তাতে কি প্রমান হয়!
মুসলিমদের সাথে শ্যমপ্রসাদের ভালো সম্পর্ক ছিল বা মুসলমানরা তাকে খুব পছন্দ করতেন -- যদি তথাগত রায়ের এই দাবি মেনে নেওয়া হয়, তাহলে প্রশ্ন হলো -- তথাগত রায়দের পছন্দ কোন শ্যামাপ্রসাদকে?
শ্যামাপ্রসাদ ১৯৪৬ সালের প্রথম দিক পর্যন্ত বাংলাভাগের বিরুদ্ধে ছিলেন, তার প্রমান আছে। কিন্তু এই শ্যামাপ্রসাদকে তথাগত রায়ের পছন্দ কি! তথাগত রায় তার বই ' যা ছিল আমার দেশ ' -- এই বইয়ে লিখেছেন, " যদি আমরা (হিন্দু-মুসলনান) একসঙ্গেই থাকবো , তাহলে ভারত ভাগ হলো কেন, পাকিস্তান হলো কেন "। --- শ্যামাপ্রসাদ কি তথাগত রায়ের এই বক্তব্যের মতানুসারি ছিলেন? -- তা যদি হবেন তাহলে নেহেরু মন্ত্রিসভায় কেন যোগ দিলেন? তথাগত রায় এই বইয়ে ' চোখের বদলে চোখ ' নেবার নীতির পক্ষে সরাসরি লিখেছেন। বোঝাই যায় তথাগত রায়ের এই নীতিজ্ঞানের গুরুমশায় কে!
তথাগত রায় তার এই জ্ঞান ও মানসিকতা থেকে সোহরাওয়ার্দী ভাইদের উপাচায্য-অধ্যাপক হিসাবে তাদের জ্ঞান ও ভূমিকার বিচার করেছেন। ১৯৩০ সালে যদি সরকার মুসলমানদের খুশি করতে মুসলমান উপাচায্য মনোনীত করে থাকেন, তাহলে ১৯৩৪ সালে যখন শ্যামাপ্রসাদকে সরকার ওই পদে মনোনীত করে, সেটাকে হিন্দুদের খুশি করার জন্য করা হয়, একথা কেন বলা যাবে না? আসলে ধর্মান্ধ এই লোকটি মুসলমানদের ছোট করে দেখানোর মতলব নিয়ে এ সব অপ্রাসঙ্গিক কথার অবতারণা করেছেন আর ভগবান মার্কা বর্তমান এই নিন্ম রুচির লোকটির নিকৃষ্ট ও মিথ্যা তথ্য বিশিষ্ট লেখাটি ছেপে দিয়েছে। তথাগত রায়েরএই জ্ঞানটুকু নেই যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করায় বিশ্ববিদ্যালয় উপকৃত ও সম্মানিত হয়েছে, এর জন্য শ্যমপ্রসাদের সুপারিশের উল্লেখ করে উনি কাকে সম্মানিত ও কাদের অসম্মানিত করছেন!
তথাগত রায় লিখেছেন , " ১৯৩৭ সালের মুসলিম সরকার হিন্দুদের বিরুদ্ধে অসম্ভব পক্ষপাতিত্ব শুরু করে "..... " হিন্দুর পক্ষে চাকরি পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে "। কিন্তু কি করেছিল ওই সরকার? --- সরকার বেঙ্গল প্রজাসত্ব আইন করে, ঋণ সালিশি বোর্ড গঠন করে, মানি লেন্ডার্স বিল এনে ও পাস করে সুদখোরদের সর্বনাশ করে --- এমন অনেকগুলি আইন পাস করেছিল, যাতে জমিদার-সুদখোরদের ক্ষতি হয় এবং হিন্দু- মুসলমান কৃষক ও সাধারণ মানুষ উপকৃত হয়।
তবে একথা ঠিক এইসব আইনের ফলে জমিদার, নায়েব, গোমস্তা এবং তাদের আত্মীয় স্বজন --- এক কথায় বাংলার ভদ্রোলকশ্রেণী সমস্যায় পড়েছিল। কিন্তু তারা হিন্দু সমাজের কত শতাংশ? --- হতে পারে ৫% বা তার সামান্য কমবেশি। তাদের ক্ষতি হয়, যাকে তথাগত রায় গোটা হিন্দুর সমস্যা হিসাবে চালাতে চান। এতে বোঝা যায় -- আসলে তথাগত রায়েরা কাদের প্রতিনিধি, কাদের স্বার্থের ধ্বজাধারী।
তিনি লিখেছেন হিন্দুদের চাকরি পাবার কথা। ১৯৩৭/৩৮ সালে মূলত বামুন-কায়েতের চাকরি নিয়ে মাথা ব্যথা ছিল। হিন্দুদের মধ্যকার ৯৫% লোকের সেটা কোনো ইস্যু ছিল না। ফলে সেটাও বেশির ভাগ হিন্দুর সমস্যা নয়। সে যাহোক, কিন্তু বাস্তবত কি হয়েছিল? বাংলার ৫৫% মুসলমানের জন্য চাকরির মোটামুটি ৫০% চাকরি মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত করে দিয়েছিল।
তাতে কি দাঁড়িয়েছিল? মোট চাকরির অর্ধেকটা, মানে হিন্দুর ভাগেরটা, ৫% হিন্দুর অর্থাৎ ভদ্রলোকের ভোগ করতে অসুবিধা ছিলোনা। কিন্তু তাতে তো তাদের মন ভরার নয়! তারা তো সবটা চান, নাহলে নিজেদের বঞ্চিত ভাবেন!
আগে উল্লেখ করা তথাগত রায়ের বইয়ে তিনি মানে তথাগতবাবু, একটি তথ্য উল্লেখ করেছেন। তাহলো ১৯৪৫/৪৬ সালে কলকাতা পুলিশে হিন্দু -মুসলমানের সংখ্যা। মোট ১৫০০/১৬০০ কলকাতা পুলিশের মধ্যে মুসলমান ছিল ৫০/৬০ জন। অন্যান্য চাকরির ক্ষেত্রেও তাই ছিল। তা তথাগত বাবুর মতে এই অবস্থা কি মুসলমানদের প্রতি ন্যায় হয়েছিল? হিন্দুরা এতই ন্যায় পরায়ণ, তা এমন কেন হলো? যোগ্য লোকের অভাব, এই তো? আপনার কথায় মুসলমানরা ভীতু নয়। তাহলে কনস্টেবলের চাকরি টা কেন তাদের দেওয়া হয় নি? যে পথেই যান/বলেন, এসবের সদুত্তর হবে না। উত্তর একটাই আপনাদের সর্বগ্রাসী ক্ষুধা! দলিত হিন্দুর কথা ছেড়েই দিলাম। ওদেরতো আপনার মানুষই ভাবেন নি, আজও আপনাদের মনের কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয় নি।
তা এই অবস্থায় ১৯৩৭ সালের সরকার অর্ধেক চাকরি সংরক্ষিত করে কি এমন অপরাধ করেছিল, তা যদি একটু বুঝিয়ে বলতেন? ৫০% চাকরি বাংলার হিন্দুদের জন্য থাকা সত্বেও কেন আপনি লিখলেন যে, হিন্দুদের চাকরি পাওয়া অসম্ভব হিয়ে পড়ে?
তথাগত রায় এই গল্পে লিখেছেন, " যখন ভারত ভাগ নিশ্চিত হয়ে গেল, তখন শ্যামাপ্রসাদ বললেন ভারত ভাগ করলে বাংলাকেও ভাগ করতে হবে " --- তার এই কথাটিও মিথ্যা। আসলে ১০ বছর আগে থেকেই বাংলাভাগের চক্রান্ত শুরু হয়েছিল। শুরুতে শ্যামাপ্রসাদ বাংলাভাগের বিরুদ্ধে ছিলেন পরে তিনি ১৯৪৬ সালের শুরুতে মত পাল্টান। তথাগত ১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গার জন্য যতই সহরাওয়ার্দীকে দোষ দিন , আসলে বাংলাভাগের যুক্তি/ক্ষেত্র তৈরি করাই ছিল ওই দাঙ্গা সৃষ্টির মূল কারণ এবং হিন্দুরাই তার জন্য বেশি দায়ী, তাদের প্রস্তুতি বেশি ছিল ও মুদলমানরাই বেশি মারা পড়েন, ক্ষতিগ্রস্থ হন।
তথাগত রায় তার উল্লিখিত বইয়ে লিখেছেন, "কংগ্রেস এই গ্রুপিং প্লানকে মেনে নিল এবং কিছুটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুসলিম লীগও মেনে নিল। অবস্থা দেখে মনে হয়েছিল ভারত আর ভাগ হবে না "। ১৬ মার্চ,১৯৪৬ ক্যাবিনেট মিশন তার প্রস্তাব প্রকাশ করে। তারপরের অবস্থা তথাগতবাবু লিখেছেন। এই অবস্থায় ১৯৪৭ সালের ১লা মে শ্যামাপ্রসাদ সেই কুখ্যাত চিঠি লেখেন বল্লভভাই প্যাটেলকে যে, ভারত ভাগ না হলেও বাংলা ভাগ করতে হবে। ওই চিঠিতে তিনি দলিত হিন্দুদের সমাজের তলানির নোংরা হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন।
আসল কথা হলো --- ১৯৩৭ সালে যখন বর্ণহিন্দুরা বাংলার সরকার গঠন করতে পারলো না, সরকার গঠন করলো মুসলমানরা, সেই দিন থেকে তারা বাংলাভাগের চক্রান্ত শুরু করেন।
স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার প্রস্তাব ও পরিকল্পনা জিন্নার বলে তথাগত রায় যে কথা লিখেছেন তাও মিথ্যা। বাংলার মুসলমান নেতারা এবং হিন্দুদের মধ্যে শরৎচন্দ্র বসু, যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল, কিরণশংকর রায় প্রমুখের নেতৃত্বে এই চেষ্টা হয়। মহাত্মা গান্ধী এই প্রস্তাব সমর্থন করেন। যার জন্য তাকে কংগ্রেস নিন্দা করে, তার উপর চাপ সৃষ্টি করে। জিন্নাহ এই প্রশ্নে সমর্থন বা বিরোধিতা করেন নি। সবাই জানেন --- বাংলার মুসলিম লীগের সাথে জিন্নাহর কোন দিন সম্পর্ক ভালো ছিলো না। পাকিস্তান হবার পরও সে সংঘাত বাধে। ভাষার প্রশ্নে লড়াই হয়, শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ হয়। ১৯৪৭ সালে এই স্বাধীন ঐক্যবদ্ধ বাংলা হতে পারতো। এই চেষ্টায় সবচেয়ে বেশি বাধা দেয় শ্যামাপ্রসাদ। আসলে এই বিরোধিতার মধ্য দিয়েই শ্যামাপ্রসাদ জনপ্রিয় হন। তার আগে তিনি প্রথম সারির নেতাদের মধ্যে গণ্য করা হতো না।
ঐক্যবদ্ধ বাংলা স্বাধীন হলে হিন্দুদের দেশত্যাগ করতে হতো না। উদ্বাস্তু হতে হতো না। স্বাধীন বাংলার প্রশ্নে একটা যুক্তিপূর্ণ চুক্তি হয়েছিল। ৫৫%--৪৫% জনসংখ্যার দেশে হিন্দুরা বেশি শিক্ষিত ছিল, ধনবান বেশি, প্রশাসনে তারা বেশি, লাঠি ছিল নমোদের হাতে --- কিসের সমস্যা ছিল!
আমার মনে হয় না কেউ উদ্বাস্তু হয়ে বিহার, উড়িষ্যার যেতেন। অসমে যারা গেছেন, তারা বুঝতে পারছেন। খাতা- কলম নিয়ে বসে দেখেন বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর যত এবং যত রকমের নির্যাতন হয়, অসমে হিন্দুদের উপর তার থেকে বেশি নির্যাতন হয়। বাংলাদেশের নমোদের শিক্ষা ও সবক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে কিন্তু অসমের নমোদের? তারা আজ আদিবাসীদের মতো দুস্থ, সব ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া। নমো কেন, সবার ক্ষেত্রে একথা ঠিক।
উনি নাকি পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টি করেছেন। উনি তখন কে? কতটুকু তার পার্টি, কী তার শক্তি, কত টুকু তার ক্ষমতা ছিল? তথাগত বাবু এই গল্পে লিখেছেন যে, তাকে কোথাও ডাকা হয় নি। ভালো-মন্দ সবটাই কংগ্রেস।
রাজ্য ধরে দেশ ভাগ না করে জেলা, মহকুমা ধরে ভাগের প্রস্তাব আম্বেদকরের। ১৯৪০ সালে পাকিস্তান অথবা ভারত বিভাগ বইয়ে তিনি এই প্ৰস্তাব দেন গণতন্ত্রের স্বার্থে -- যাতে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বেশি মানুষকে পাকিস্তান বা ভারতে ঠেলে দেওয়া না হয়। এ সব বইয়ে লেখা আছে। বাজে কথা লিখে শ্যামাপ্রসাদকে বড় বানানোর চেষ্টা কেন!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন