পূর্ববাংলার হিন্দুরা কেন দেশত্যাগ করেন


তথাগতবাবু পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের দেশত্যাগের কারণ বোঝাতে ' যা ছিল আমার দেশ ' নামে বেশ বড় আকারের একটি বই লিখেছেন। তিনি প্রমান করার চেষ্টা করেছেন যে, মুসলমানদের অত্যাচারে পূর্ববঙ্গের হিন্দুরা দেশত্যাগ করে ভারতে এসেছেন। তিনি হিন্দুদের উপর বীভৎস অত্যাচারের নানা কাহিনী বলার চেষ্টা করেছেন --- যাতে তা আজকের হিন্দুত্ববাদীদের প্রচার ও দাবির সাথে মিলে যায়।

কিন্তু কোনো পাঠক যদি তার বইটি মনোযোগ দিয়ে পড়েন এবং বিশ্লেষণ করেন, তাহলে দেখা যাবে তার দাবি পুরোপুরি ঠিক নয়। তিনি যে সমস্ত তথ্য এই বইয়ে উল্লেখ করেছেন এবং তার উপর নির্ভর করে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন --- তা বহু ক্ষেত্রে পরস্পর বিরোধী। আমি মূলত তার বইয়ে যে সব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে এখানে তার কিছু কিছু তুলে ধরবো --- যাতে পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের দেশত্যাগের মূল কারণ অনেকটাই বোঝা যাবে। মুসলমানদের অত্যাচার যে আসল কারণ নয় --- এই সত্য উদঘাটিত হবে।

তথাগত বাবু লিখেছেন, " ১৯৫০ এর আগে পর্যন্ত হিন্দুরা পূর্ব পাকিস্তান ছাড়ছিলেন কিছু অত্যাচারিত হয়ে কিন্তু বেশিরভাগ নিরাপত্তাবোধের অভাবে। এদের মধ্যে একটা অংশ ছিলেন উচ্চবর্ণের অর্থাৎ ব্রাহ্মণ-কায়স্থ-বৈদ্য বা ধনী ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের বৈশ্য সাহা বা তিলী। এরা বেশিরভাগ ঢাকা, ময়মনসিংহ বা রাজশাহীর মতো বড় শহরে বাস করতেন এবং দুনিয়ার খবর রাখতেন। পেশায় এরা ছিলেন জমিদার, জমিদারের কর্মচারী, সওদাগরি সংস্থার কর্মচারী, ডাক্তার, উকিল ইত্যাদি পেশাজীবী, স্কুল বা কলেজ শিক্ষক, ব্যবসায়ী ইত্যাদি। এরা রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিলেন এবং পরিষ্কার বুঝতে পারছিলেন যে, এই ইসলামিক রাষ্ট্রে তাদের জায়গা হবে না। জায়গা করে নেবার চেষ্টা করলে অনর্থ হবে। সময় থাকতে প্রস্থান করার ফলে এরা মোটামুটিভাবে গুছিয়ে যেতে পেরেছিলেন --- অনেকেই পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের সাথে সম্পত্তি বিনিময় করতে পেরেছিলেন এবং পুনর্বাসনের জন্য তাদের রাষ্ট্রের উপর নির্ভর করতে হয় নি। এদিকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ভাবতে লাগলেন তারা সৌভাগ্যবান কারণ পাঞ্জাবের মতো কুৎসিত দাঙ্গা তাদের দেখতে হয় নি "।

এসব কথাগুলি তথাগত বাবুর নিজের উপলব্ধি। এখন প্রশ্ন হলো --- হিন্দুরা ভয় পাচ্ছিলেন বা নিরাপত্তাবোধের অভাববোধ কেন করছিলেন এবং তারা কিসের ভয় পাচ্ছিলেন ? আর অত্যাচারিত হয়ে নয়, কত মানুষ অত্যাচারের ভয়ে দেশত্যাগ করলেন ?

নানা সূত্রে যা বলা হয়েছে এবং যে কথা গৃহীত হয়েছে, তাহলো --- ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান থেকে ৫৫ ০০ ০০০ মানুষ দেশান্তরিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন। এই বইয়ে তথাগত বাবু পরিসংখ্যান উল্লেখ করে লিখেছেন যে, ১৯৪৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৩ ০৪ ৫১৪ জন হিন্দু পশ্চিমবঙ্গে পুনর্বাসন চেয়েছিলেন। তথাগত বাবু লিখেছেন যে, দেশান্তরিত মানুষ অনেকেই পুনর্বাসন চান নি। অন্যান্য নানা তথ্যেও দেখা গেছে যে, পশ্চিমবঙ্গে এক বড় অংশের উদ্বাস্তু মানুষ নিজেদের মতো ব্যবস্থা করে নিয়েছেন, সরকারি পুনর্বাসন খাতায় নাম লেখান নি। আমরা ধরে নিতে পারি ১৯৫০ সালের আগেই অন্তত ৩০ ০০ ০০০ মানুষ পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন --- যারা সরাসরি মুসলমানের দ্বারা অত্যাচারিত হয়ে আসেন নি।

হিন্দুদের ভয়ের একটি কারণ তথাগত বাবু এই বইয়ে উল্লেখ করেছেন। তাহলো --- ইসলামিক শাসন, শরিয়তি আইন ইত্যাদি প্রবর্তনের ভয়। কিন্তু সে আশংকা যে সত্য নয়, তা আমরা এতো বছর ধরে দেখছি। পূর্ব পাকিস্তান সরকার বা বাংলাদেশ সরকার এতো বছর হয়ে গেলো আজও সেখানে শরিয়তি আইন কার্যকরী করে নি বা তা লাগু করার কথা বলেনি। বরং ওখানকার সরকার মুসলমান সমাজের জন্য এমন কিছু আধুনিক পদক্ষেপ ও নীতি গ্রহণ করেছে --- যা আজও ভারত সরকার নিতে পারে নি। বিপরীতে বরং স্বাধীনতার পর পাকিস্তান সরকার তাদের দেশের সংখ্যালঘুদের জন্য এমন কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করে ১৯৪৭ সাল থেকে অন্তত ৯ বছর (নুতন সংবিধানের আগে পর্যন্ত) চালু রাখে, যা ভারত সরকার এ দেশের সংখ্যালঘুদের জন্য দিতে পারে নি।

পূর্ব পাকিস্তান সরকার সেদেশের সংখ্যালঘুদের জন্য ২০% চাকরি --- ১০% তফসিলি শ্ৰেণীর হিন্দুদের জন্য, ৯% উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের জন্য এবং ১% বৌদ্ধদের জন্য এবং আইন সভার সদস্য পদ সংরক্ষিত করে দেয়। তফসিলিদের জন্য শিক্ষায় সটাইপেন্ড চালু রাখে। অন্যদিকে স্বাধীনতার পূর্বে ভারতে এবং বাংলায় মুসলমানরা সংরক্ষণের যে সুযোগ পেয়েছিলেন ভারত সরকার ১৯৪৭ এর পর তা বন্ধ করে দেয়। --- এসব কিছুতে বোঝা যায় শরিয়তি শাসনের ভয় যেমন অমূলক ছিল বা মিথ্যা প্ৰচার ছিল , তেমনি ভারতের মুসলমানরাও এখানে জামাই আদর পান নি।

প্ৰকৃত ভয় ছিল বর্ণহিন্দু বা ভদ্রলোক শ্রেণীর মনে এবং এই ভয়ের প্রকাশ বিভিন্ন লেখকের লেখা উদ্ধৃত করে তথাগত বাবু তার এই বইয়ে নিজেই প্রমান করেছেন। তিনি এই বইয়ে লিখেছেন যে, পূর্ববঙ্গ থেকে হিন্দু বিতাড়নের ব্যাপারটা পুরোপুরি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক নয়। এই কথাটিও বেঠিক। কারণ এই বইয়ে তথাগত বাবু এমন কথা ও ঘটনার উল্লেখ করেছেন, যাতে দেশত্যাগের জন্য অর্থনৈতিক কারণও প্ৰমানিত হয়েছে।

তথাগত বাবু লিখেছেন, " লেখক প্রফুল্লকুমার চক্রবর্তী পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের যন্ত্রনা খুব যত্ন সহকারে বর্ণনা করেছেন। ..... (প্ৰফুল্ল বাবু) হিন্দুদের প্রতি মুসলিমদের মনোভাব দেশভাগ হবার সঙ্গে সঙ্গে যেন রাতারাতি বদলে গেল। আগে নিঃসন্দেহে হিন্দুরা মুসলমানদের অশ্ৰদ্ধা করতেন --- ' হেরারে আমরা দাওয়ায় উঠতে দিই নাই, নীচে দারা করাইয়া কথা কইতাম।' --- এই পরিস্থিতি যে আমূল বদলে যাবে তারজন্য ভদ্রলোক হিন্দু সমাজ তৈরি হয়েছিল.....।... এই সময় সাধারণ মুসলিমদের হিন্দু ঘৃণা নানা কারণে এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে, সেই জনতার মুখোমুখি হবার চাইতে বাস্তুত্যাগই হিন্দুরা শ্রেয় মনে করেছিলেন "

" কলকাতার সংবাদপত্রে এবং তখনও যে সব পূর্ববঙ্গের কাগজ হিন্দুদের হাতে ছিল, তাতে প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছিলো। বরিশালের 'দেশপ্রিয়' লিখেছিল হিন্দুরা সন্মান নিয়ে বাঁচবার জন্য ভারতে চলে যাচ্ছেন। ঐ কাগজে সম্পাদকের কাছে লেখা একটি পত্রে লেখা হয়েছিল হিন্দুদের অন্যতম ভয় বলপূর্বক ধর্মান্তরিত হওয়া। ২০ অক্টোবর ১৯৪৮ তারিখের আনন্দবাজার লিখেছিল, পূর্ববাংলায় সর্বব্যাপী গণ অত্যাচার না হলেও হিন্দু ব্যবসায়ীদের বয়কট করা হচ্ছে, হিন্দুদের ভয় দেখানো হচ্ছে, একটা থমথমে ভীতির ভাব বিরাজ করছে এবং এরই ফলে হিন্দুরা পূর্ব বাংলা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন "। --- এখন যে কেউ প্ৰশ্ন করতে পারেন, বীভৎস দাঙ্গা হলো কলকাতায়। --- নোয়াখালীতেও সাংঘাতিক ও পৈশাচিক দাঙ্গা হয় কিন্তু তা কলকাতা দাঙ্গার তুলনায় অনেক কম ভয়াবহ । তাহলে মুসলমানরা দলে দলে পশ্চিমবঙ্গ ত্যাগ না করার কারণ কি ? তাদেরও তো পূর্ব বাংলার হিন্দুদের মতো দেশত্যাগ করার কথা। অথচ  (তথাগতর মতে) 'পূর্ব বঙ্গের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভদ্রলোকশ্রেণী (মূলত ব্রাহ্মণ-কায়স্থ-বৈদ্য) বাংলার অগ্নিযুগে ব্রিটিশের সঙ্গে বাঘের মতো লড়াই করেছিল', তারা কেন শুধুমাত্র আশংকায় দলে দলে দেশত্যাগ করলেন ! যদিও তথাগত বাবু এই বইয়ে অন্যত্র বলেছেন যে, হিন্দুদের মধ্যে নিন্ম বর্গিও মানুষ বিশেষ করে নমশুদ্র রাই বেশি সাহসী ও শক্তিধর। --- এইসব বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচণা করলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, ভদ্রলোকশ্রেণীর প্ৰচাৰ যন্ত্রগুলি কয়েক বছর ধৰে হিন্দুদের এককাট্টা করার জন্য মুসলমানদের জন্তু, জানোয়ার ও দানব হিসাবে চিত্রিত করার যে প্ৰচারাভিজান চালায়, তাতে হিন্দুদের মনে মুসলমান সম্পর্কে মিথ্যা ভীতির চিত্র তৈরি হয়েছিল । সেই ভয়ের জন্যই তারা পালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। এর সংগে যুক্ত হয় ' ভারত হিন্দুর দেশ এবং পাকিস্তান মুসলমানের ' এই ধারণা --- যা বিশেষ করে বাংলায় পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছিল। এই মানসিক অবস্থার জন্যই সামান্য কারণে অথবা কারণ ছাড়াই তারা দেশত্যাগ শুরু করেন----

(চলবে)।

মন্তব্যসমূহ

  1. এই লেখক টি কি কাটা?
    নাকি তেল মারছে।
    বাস্তব দেখেও মিত্থে লেখে।

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

তৃণমূল নেত্রী ফের সংসদে

যদা যদা হি ধর্মস্য... গীতার এই শ্লোকে ঠিক কী বলা হয়েছে?

ভাতে কেরোসিন যাত্রাপুরে, অভিযোগ বাংলাদেশী