পূর্ব বঙ্গের হিন্দুরা কেন দেশত্যাগ করেন(২য় কিস্তি)
তথাগত বাবু সন্দ্বীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্ধৃত করেছেন। সন্দ্বীপ বাবুর মতে, " ১৯৪৮-৪৯ সালে হিন্দুদের পূর্ববাংলা ছাড়ার মূল কারণ এইটাই যে, তারা স্বাধীনতা পরবর্তী পরিস্থিতি মেনে নিতে পারছিলেন না এবং একথা সত্য যে, স্বাধীনতা বা দেশভাগের আগে হিন্দুরা মুসলমানদের তুলনায় যে রকম সামাজিক উচ্চতায় বাস করতেন, সেখান থেকে তাদের পতন অবশ্যম্ভাবী ছিল এবং হয়েওছিল "।
তথাগত বাবুর উদ্ধৃত হিরন্ময় বন্দোপাধ্যায় এই সামাজিক উচ্চতা থেকে পতনের বেশ কিছু উদাহরণ দিয়েছেন। " বিক্রমপুরের একজন ব্রাহ্মণ ভারতে চলে যাবেন বলে সিদ্ধান্ত করেছিলেন তার কারণ, তার পরিচিত এক মুসলমান ভদ্রলোক একদিন তার সঙ্গে দেখা করতে এলেন এবং তার সামনে রাখা একটি বেঞ্চিতে বসলেন। স্বাধীনতার আগে হলে তিনি মাটিতে বসতেন। অবস্থাপন্ন হিন্দুরা বেশ অস্বস্তিবোধ করতেন এই দেখে, যে মুসলমানরা এখন তাদের নাম ধরে ডাকছে, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে কথা বলছে --- স্বাধীনতার আগে তাদের কাছে যা অকল্পনীয় ছিল। ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার (বর্তমানে জেলা) পালং থানার কাকদ্বীপ গ্রামের অনেক হিন্দু মনে করেছিলেন যে, তারা আগে মুসলিমদের যেরকম অপমান করতেন, তারা এইবার তার বদলা নেবে --- এই বেলা পালিয়ে যাওয়াই ভালো। মুসলিমরা হিন্দু ভদ্রলোকদের সোজাসুজি বলতেন --- মনে রেখো কর্তা, পাকিস্তান হয়ে গেছে --- এখন আমরা আর ছোট নয় "।
হিরন্ময় এবং সন্দ্বীপ --- দুজনেই এই সামাজিক পতনকে হিন্দুদের দেশত্যাগের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন। " আমি (তথাগত) মনে করি একথা মেনে নেওয়া কঠিন। এই পতন ও তজ্জন্য ক্ষোভ নিশ্চয়ই ছিল --- কিন্তু শুধু এইজন্য মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অনিশ্চিতের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেবে? এগুলি কারণ নিশ্চয়ই --- কিন্তু গৌণ কারণ। আর এই কারণ কাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য? --- শুধু উচ্চ বর্ণের অর্থাৎ ব্রাহ্মণ-কায়স্থ-বৈদ্য এবং অবস্থাপন্ন হিন্দুদের ক্ষেত্রে --- একমাত্র তারাই এসব কারণে চলে যেতে পারেন। সাধারণ হিন্দু দোকানদার, কর্মচারী, ধোপা, নাপিত, জেলে, চাষী, নমোশুদ্র, কৈবর্ত, রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষ এইসব বাবদে মুসলমানদের চেয়ে খুব একটা এগিয়ে ছিলেন না --- তারা শুধু এই কারণে পালাবেন এটা বিশ্বাস করা অসম্ভব "।
তথাগত বাবু ' অসম্ভব ' বলেছেন কিন্তু কেন তারা দেশ ছাড়ছেন তার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেন নি। ১৯৩৭ সাল থেকে বাংলায় মুসলমানদের শাসন। তথাগত বাবু বলেছেন এই সময় থেকে নাকি ভদ্রলোকদের কোমর ভেঙে যায়। তারপরও তারা মুসলমানদের সাথে কি ব্যবহার করতেন, এসব বর্ণনায় তা পরিষ্কার। আর এই ভদ্রলোকেরা নিন্মবর্গিও হিন্দুদের সাথে কি ব্যবহার করতেন তা সহজেই অনুমান করা যায় ! অথচ এইসব মানুষগুলি নাকি ভদ্রলোক এবং সংস্কৃতিবান !
এই বইয়ে তথাগত বাবু ' চোখের বদলে চোখ ' নীতির পক্ষে ওকালতি করেছেন, কিন্তু মুসলমানরা তা করেন নি। প্রায় কিছুই করেন নি বা ১৯৫০ সাল পর্যন্ত সেদেশে প্রায় তেমন কিছুই ঘটেনি। অথচ এই সময়কালের মধ্যে ভদ্রলোকরা প্রায় সবাই দেশ ছেড়ে চলে আসেন। অপরাধবোধ তাদের ভিতর থেকে দুর্বল করে দেয়। কিছু মানুষ দেশ ছাড়লে, অন্যরা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তবুও নিন্মবর্নিয়রা ১৯৫০ সালের দাঙ্গার আগে খুব কম লোক দেশত্যাগ করেছেন। বলা যায় না --- অকারণে পালাবার পথ যদি ভদ্রোলকরা না দেখতেন এবং না পালিয়ে যদি তারা নেতৃত্ব দিতেন, নিন্মবর্নিয়রা তো বটেই, কোনো মানুষ ১৯৫০ সাল বা অন্যান্য গন্ডগোলের পরেও দেশত্যাগ করতেন কিনা বা এমনকি ১৯৫০ সালের দাঙ্গার ঘটনাই হয়তো ঘটতো না। ভদ্রলোকদের উপর নিন্মবর্নিয়োরা নির্ভর করতেন, তাদের নেতা বলে মানতেন। হিন্দুদের মানসম্মান ও মর্যাদার প্রশ্নে ঢাল, সড়কি, রামদা নিয়ে সামনে দাঁড়াতেন ও রক্ষা করতেন। কিন্তু ভদ্রোলকরা দেশ ছেড়ে চলে আসায় নিন্মবর্গীয়দের মন ভেঙে যায়, অসহায়বোধ করেন। ভদ্রলোকরা ছোটলোকদের কথা ভাবেন নি। নানা কায়দায় তারা কলকাতা ও আশেপাশে নিজেদের ব্যবস্থা করে নেন আর ছোটলোকগুলিকে গ্রামে, ভিন রাজ্যে ও আন্দামান ঠেলেন।
পরের দিকে অসহায় নিন্মবর্নিয়রা কোনো রূপ গন্ডগোল বা তার আশংকায় দেশত্যাগ করতে থাকেন। এ এক মানসিক সমস্যা। তাছাড়া ভারত আশ্রয় ও অপর্যাপ্ত হলেও এক ধরণের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছে। সেটাও তাদের দেশত্যাগে সাহস জুগিয়েছে। তবুও আজও ওদেশে দেড় থেকে দুই কোটি হিন্দু আছেন, যার প্রায় পুরোটাই নিচু জাতের হিন্দু। সেখানে সমস্যা ও গন্ডগোল হয় না এমন নয়। অসুবিধা আছে, সমস্যাও হয় তবুও তারা সন্মান নিয়েই সেদেশে আছেন। লেখাপড়ায় উন্নতি করেছেন, চাকরি-বাকরি ভালোই করেন আর তাদের মা-বোনেরা ইজ্জত নিয়েই আছেন---
(চলবে---- ৩য় ও শেষ অংশ কাল পোস্ট করবো)।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন